০১. শেষ বিকেলটা অন্ধকারে ভরে আসছিল

কালবেলা – সমরেশ মজুমদার

শেষ বিকেলটা অন্ধকারে ভরে আসছিল। দুপুরের পর থেকেই আকাশ মেঘলা, মাঝে মাঝে তরল মেঘেরা উড়ে উড়ে যাচ্ছিল আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোর মাথা মুড়িয়ে। বাতাস আর্দ্র কিন্তু বৃষ্টিটাই যা হচ্ছিল না।

জানালা খুললে অনেকটা দূর দেখা যায়। অনিমেষ চুপচাপ বসেছিল। এরকম মেঘের দুপুর কিংবা বিকেলে মন কেমন বিষণ্ণ হয়ে যায়। খুব আলস্য লাগে তখন। চোখ বন্ধ করলেই সেই মেঘগুলোর কথা মনে পড়ে যায় যারা ভূটারন পাহাড় থেকে দল বেঁধে উড়ে এসে স্বৰ্গছেঁড়া চা বাগানের ওপর বৃষ্টি ঝরাতো। তখন সেইসব বুনো লম্বাটে গাছগুলো কি উল্লাসে আকাশটা ছুঁয়ে রাখত। কান পাতলেই সেই শব্দ।

এ বছর ঘন মেঘের বিকেলে এই প্রথম। মেঘেদের চেহারা কি পৃথিবীর সব জায়গায় একই রকম থাকে তা হলে স্বৰ্গছেঁড়া এমনকি জলপাইগুড়ির মেঘগুলোর চেহারা চালচলন এখানকার থেকে একদম আলাদা কেন? ভীষণ ময়লা আর ঠুনকো মনে হচ্ছে এদের। যেন খুব কষ্ট করে আসছে ওরা, জমতে হয় তাই জমছে।

মেঘ দেখতে গিয়ে অনিমেষ কাছের দূরের ছাদগুলো দেখে ফেলল। তিনতলার ওপর ঘর বলে বেশ কিছু দূর দেখতে পাওয়া যায়। কোলকাতার মেয়েরা বিকেলের এই সময়টা ছাদে ছাদে কাটিয়ে দেয়। হয়তো ওদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই কিংবা এই বিরাট শহরে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি মেলে না। অন্তত এপাড়ার মেয়েদের দেখলে ওর তাই মনে হয়। কিন্তু এই মেঘ-থমথমে সন্ধ্যেবেলায় যখন সব ছাদ খালি হয়ে গেছে তখন ওই মেয়েটি ঘাড় বেঁকিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে অমন করে কি দেখছে? খুব বিষণ্ণ সময় এলেই মানুষ অমন ভঙ্গীতে দাঁড়াতে পারে। মেয়েটিকে এর আগে সে কখনো দ্যাখেনি। ওই হলুদ বাড়িটার ছাদে প্রায় সময় এক বিশাল চেহারার ফর্সা মহিলা ঘোরাফেরা করেন। মেয়েটি মাথা নামিয়ে কিছু ভাবল, তারপর এদিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই কি হল কে জানে, এক ছুট লাগালো মেয়েটি, আর দেখা গেল না। অনিমেষ হেসে ফেললে। তখন থাকলে বলত, বালিকা জানে না। যে ও মরে গেছে। এই সময় ছটফটিয়ে বৃষ্টিটা নামল। জানলা বন্ধ করে আলো জ্বালালো অনিমেষ।

এই ঘরের অন্য খাটটায় থাকে ত্রিদিব–ত্রিদিব সেনগুপ্ত, জামসেদপুরের ছেলে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া অথচ বাংলা কবিতা লেখে। ত্রিদিবের বিছানায় দিকে তাকালেই বোঝা যায় ওর বেডকভারটা খুব দামী, একরাশ নীল রঙের পাখি সেখানে ভীড় করে আছে; দেওয়ালে আট হুকে ত্রিদিবের যে সব জামা-কাপড় ঝুলছে সেগুলো ওর পারিবারিক স্বাচ্ছল্যের সুন্দর বিজ্ঞাপন। ওর টেবিলের কোণে যে সব প্রসাধন দ্রব্য তা কোলকাতায় আসে। অনিমেষ দেখেনি। অনিমেষ দেওয়ালে টাঙানো ত্রিদিবের আয়নার দিকে এগিয়ে গেল। কোলকাতার জল পেটে পড়লে মফস্বলের মানুষ নাকি ফরসা হয়ে যায়। অনিমেষ নিজেকে সুন্দর দেখল। সামান্য বড় চুল, খুব অল্প এবং কালচে গোঁফদাড়ি মুখের আদল পাল্টে দিয়েছে। চোখ আর নাকে আলো পড়তেই চট করে কদিন আগে দেখা ছবিটার কথা মনে পড়ে গেল। যুবক রবীন্দ্রনাথের মুখ কি এরকম দেখতে ছিল? ভাবতে গিয়েই লজ্জা পেল সে দ্যুৎ, রবীন্দ্রনাথের গায়ের রঙ ভগবানের মত ছিল।

কোলকাতায় দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর হয়ে গেল। কলেজের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে এখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে। সময়টা কম নয় কিন্তু অদ্ভূত নির্জনতা নিয়ে এখনও কোলকাতা থেকে বিচ্ছন্ন রয়ে গেল। কলেজে থাকার সময় সে বাবার আদেশ পুরোপুরি মেনে চলেছে। জলপাইগুড়ি থেকে নিয়মিত দুটো চিঠি সপ্তাহে বিভিন্ন নির্দেশ নিয়ে তার কাছে আসে, একটা ঠাকুরদা সরিৎশেখর, অন্যটা বাবা মহীতোষের। প্রথমবার এই কোলকাতায় আসামাত্রই যে ঘটনাটা ওর শরীর-মনে ছাপ রেখেছিল পাকাপাকিভাবে তার কাঁপুনি থেকে নিজেকে সরাতে সময় লেগেছিল অনেকদিন। ফলে ওই সব চিঠিগুলোর নির্দেশ মান্য করা ছাড়া ওর কোন উপায় ছিল না। আর তাই এই কলেজের সময়টা অদ্ভূত নিঃসঙ্গ হয়ে কোলকাতায় কাটিয়ে দিল।

এই হোস্টেল মূলত কলেজ ছাত্রদের, কিন্তু প্রাক্তন যারা, এখন বিশ্বদ্যিালয়ে পড়ছে তারা ইচ্ছে করলে থাকতে পারে। সেই সুবাদে অনিমেষের এখানে থাকা। ত্রিদিব এখানে নতুন এসেছে। ও কোলকাতার বাইরে যে কলেজ থেকে পাশ করেছে সেই কলেজ আর অনিমেষদের কলেজ একই মিশনারীদের সংস্থার অন্তর্গত। তাই প্রাক্তন ছাত্র না হয়েও ওর এখানে থাকতে কোন অসুবিধে হয়নি। মিশনারী হোস্টেল বলেই প্রতি বছর বেশ কিছু বিদেশী ছাত্র কোলকাতায় পড়তে এসে এখানে থাকে; হোস্টেলের অর্ধেক তারাই। বেশির ভাগই আফ্রিকার, কিছু বর্মামুলুকেরও আছে। আফ্রিকার ছেলেদের ভাবভঙ্গীতে কোন সঙ্কোচ নেই, বিদেশে আছে বলে মনে হয় না। বিশাল চেহারাগুলো নিয়ে সব সমসময় হইচই করছে। প্রথম প্রথম ওদের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত অনিমেষ। যে-কোন আফ্রিকানকে দেখলেই আঙ্কল টমকে মনে পড়ে যায়। ক্রীতদাস করে রেখেছিল সাদা মানুষেরা এই সেদিন পর্যন্ত অথচ ওদের হাবভাবে সেসব কষ্টের কোন চিহ্ন নেই। আর একটা স্মৃতি চট করে অনিমেষের সামনে উঠে আছে। আসাম রোডে ছুটে যাওয়া মিলিটারী কনভয়ের নিগ্রো অফিসারটার মুখ যেন স্পষ্ট দেখতে পায়। লোকটা এখন কোথায় আছে কে জানে। আমরা কাউকে অকারণে মনে রেখে দিই চিরকাল, যার হয়তো আমাদের মনে রাখার কোন কথাই নেই।

শব্দ করে বৃষ্টি পড়ছে এক নাগাড়ে। অনিমেষ দরজা খুলে ভেতরের বারান্দায় এল। হোস্টেলের অনেক ঘর বন্ধ, খোলা দরজাগুলো থেকে আলো এসে বাইরের বৃষ্টিতে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। ইউ প্যাটার্নের এই বাড়িটার মাঝখানের বাস্কেটবল কোর্টটা অন্ধকারে ডুবে আছে। ওপাশের একটা ঘর থেকে মাউথ অর্গানের সুর ভেসে আসছে। টানা এবং কান্নার সুর। আন্তরিক না হলে এ রকম বাজানো যায় না। কোন চেনা গান বা পরিচিত ভঙ্গী সুরটায় নেই। নিশ্চয়ই ওটা ওইসব আফ্রিকানদের কেউ বাজাচ্ছে, হাজার হাজার মাইল দুরে এসে যার খুব কষ্ট হচ্ছে দেশের জন্য কিংবা ফেলে আসা কোন মানুষের কথা সে ভাবছে। অনিমেষের খুব ইচ্ছে হল ছেলেটিকে একবার দেখে আসে। মুশকিল হল ওদের দেখলে সে চট করে আলাদাভাবে চিনতে পারে না, কেউ খুব লম্বা, মোটা অথবা রোগা এইভাবে বুঝতে হয়। তিনতলার বারান্দা ধরে বেশ কিছুটা এগিয়ে সেই ঘরটার সামনে এল অনিমেষ। একটু সঙ্কোচ হচ্ছিল, গায়ে পড়ে কথা বলতে কেমন যেন লাগে।

ঘরের ভেতর ছেলেটি একা চিৎপাত হয়ে খাটে শুয়ে চোখ বন্ধ করে মাউথ অর্গান বাজাচ্ছে। বেশ ঢ্যা চেহারা, জুতো সুদ্ধ পা দুটো খাটের বাইরে ঝুলছে। ঘরটা দারুণ অগোছালো, সাজগোছ করায় কোন চেষ্টাই নেই। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে সে ফিরে আসছিল এমন সময় ছেলেটি বাজনা থামিয়ে, উঠে বসে বলল হে-ই! কথাটা জড়ানো, মানে না বুঝলেও অনিমেষ অনুমান করল যে তাকেই কিছু বলছে ছেলেটি। পরমুহূর্তেই এক লাফে দাঁড়িয়ে দু-হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকল ছেলেটি, গেট ইন, প্লিজ!

এবার বুঝতে পারলেও অনিমেষ লক্ষ্য করল ওর উচ্চারণে একটা মোটা আওয়াজ এমন জড়িয়ে থাকে যেটা অন্য শব্দগুলোকে স্পষ্ট হতে দেয় না। অনিমেষ ভেতরে ঢুকতেই চকচকে সাদা দাঁতে হাসল ছেলেটি, ইয়া–!

ওর আসার কারণটা বোঝাতে গিয়ে বিপদে পড়ল অনিমেষ। মনে মনে দ্রুত ইংরেজি করে নিয়েও ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছে না সে। সঙ্কোচ হচ্ছিল ইংরেজিটা ভুল হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সহজ রাস্তাটা বেছে নিল অনিমেষ, আঙ্গুল তুলে মাউথ অর্গানটাকে দেখাল। ছেলেটি যেন খুব খুশি হয়েছে এমন ভঙ্গীতে বাদ্যযন্ত্রটা শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে ফের লুফে নিয়ে বলল, য়ু লাইক ইট?

ইয়েস! অনিমেষ ধাতস্থ হল, তারপর জুড়ে দিল, ভেরি সুইট।

থ্যাঙ্কু! ইটস মাই ফ্রেও। মাদার গেভ ইট। সিট ডাউন, সিট হেয়ার প্লিজ।

ওর টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারটাকে টেনে নিয়ে খাটের পাশে রেখে সে অনিমেষকে ইঙ্গিত করল বসার জন্য।

এর এগে ইংরেজিতে কখনো কথা বলেনি অনিমেষ। জলপাইগুড়িতে যখন ছিল তখন এ প্রশ্ন উঠতই না। ত্রিদিব যখন বাংলা হিন্দী বলতে বলতে নিজের অজান্তে অনর্গল ইংরেজি বলে যায় তখন সেটা লক্ষ্য করেছে অনিমেষ। অনেক শব্দ যার অর্থ অন্য রকম ছিল, ব্যবহারে তার চেহারা পাল্টে যায়। এই যেমন ছেলেটি তাকে ভেতরে আসার জন্য বলল, গেট ইন। অনিমেষ নিজে গেট কথাটা ভাবতেই পারত না, বলত কাম ইন। অথচ বেরিয়ে যাওয়ার জন্য গেট আউট তো স্বচ্ছন্দে মনে আসে। জলপাইগুড়ির বাঙালি স্কুলে ইংরেজি ভাষাটা যেভাবে শিখিয়েছে তাতে নিজের মত করে কথা বলা যায় না। এই মুহূর্তে সে বিব্রত হয়ে পড়েছিল।

চতুর্দিকে ছেলেটির রঙবেরঙের জামা-কাপড় ঝুলছে। ওর রুমমেটটি এখনও বোধ হয় ফেরেনি। কেউ যে রঙিন জাঙ্গিয়া পরে জানা ছিল না অনিমেষের। চেয়ারে বসে ছেলেটিকে ভাল করে দেখল সে। চামড়ার রঙ কালো হতে হতে তা থেকে কেমন নীলচে জেল্লা বেরুচ্ছে। চোখ দুটো ছোট, মাথার চুলে চিরুনি বোলানো অসম্ভব, এত কোঁকড়া এবং পাক খাওয়া বোধ হয় চুল আঁচড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। শরীর ওর বেতের মত হিলহিলে, সামান্য মেদ নেই।

মাই রুম, চকচকে সাদা দাঁত একবার ঝিলিক খেল। এই প্রথমবার, সে যে ইন্ডিয়ান তা কেউ অনিমেষকে বলল। তার হঠাৎ খেয়াল হল থম্বোটোর মাতৃভাষা ইংরেজি নয় অতএব সামান্য ভুলভাল হলে নিশ্চয়ই সে গ্রাহ্য করবে না। অনিমেষ নিজের নাম বলল, এখন কিছুটা স্বচ্ছন্দ হয়েছে সে।

অনিমেষ জিজ্ঞাসা করল, তুমি তো স্কটিশেই পড়?

হ্যাঁ, বি. এস-সি ফার্স্ট ইয়ার, তুমি?

আমি এম এ-তে অ্যাডমিশান নিয়েছি, এখনও ক্লাস শুরু হয়নি। আর্টস।

ও গড, তুমি তা হলে আমার সিনিয়ার, বাট য়ুলুক সো ইয়াং। অবাক চোখে তাকে দেখছিল থম্বোটো। সত্যি কি তাকে এম এ ক্লাসের ছাত্র বলে মনে হয় না? কি জানি।

সে জিজ্ঞাসা করল, এখানে কেমন লাগছে তোমার?

ভালই। তবে ওই মশলা দেওয়া খাবারগুলো যদি না থাকতো! দ্যাটস হরিবল। আমার স্টমাক প্রায়ই গোলমাল করছে, এ মান ক্যান নট লিভ অন মেডিসিন। তুমি হোস্টেলে থাকছ কেন, তোমার বাড়ি এখানে নয়?

না। আমি এখানে থেকে কয়েক শ মাইল দূরে ডুয়ার্স বলে একটা জায়গা থেকে এসেছি।

সেটা কি ভারতবর্ষ নয়?

কেন নয়? এই পশ্চিম বাংলারই একটা অংশ।

থম্বোটো চট করে টেবিল থেকে একটা বড় ভারতবর্ষের ম্যাপ সামনে বিছিয়ে বলল, শো মি হোয়ার ইট ইজ!

অনিমেষ ঝুঁকে পড়ে পশ্চিম বাংলার মাথায় জলপাইগুড়ি লেখা অঞ্চলটায় আঙুল রাখল। ও দেখল আলিপুরদুয়ার এবং ফালাকাটা ম্যাপে লেখা আছে কিন্তু স্বৰ্গছেঁড়ার উল্লেখ নেই। থম্বোটো জায়গাটা ভাল করে দেখে নিয়ে বলল, এ জায়গা তো হিমালয় পর্বতমালার নিচে, তুমি কি পাহাড়ী মানুষ?

না, না, আমি বাঙালী! হেসে ফেলল অনিমেষ।

স্টেঞ্জ! তোমাদের এই ভারতবর্ষে স্নো-রেঞ্জ আছে, সমুদ্র আছে, মরুভূমি আছে, আবার ডিফারেন্ট টাইপ অফ পিপল উইদ ডিফারেন্ট ল্যাঙ্গুয়েজেস এক সঙ্গে বাস করছ, কেউ বাঙালী কেউ পাঞ্জাবী আবার সকলেই ইন্ডিয়ান, তোমাদের কোন অসুবিধে হয় না? কি করে তোমরা ইউনাইটেড হলে? জানবার আগ্রহ থাম্বোটোর মুখে।

অনিমেষ এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, আমাদের চেহারা এবং ভাষা আলাদা হলেও কালচারের কোথাও কোথাও এবং ধর্মের মিল রয়েছে। তা ছাড়া ইতিহাস বলে, বার বার বিদেশী–আক্রমণ হয়েছে আমাদের ওপর। বোধ হয় আক্রান্ত হলেই ইউনিটি গড়ে ওঠে।

মন দিয়ে কথাটা শুনে থম্বোটা বলল, বাট দেয়ার আর হিন্দুস অ্যান্ড মুসলিমস, ক্রিশ্চিয়ানও কম নেই। এরা তো কমপ্লিট আলাদা ধর্মের মানুষ এবং প্রত্যেকের মানসিকতা আলাদা, তাই না?

অনিমেষ একটু থতমত হয়ে বলল, হ্যাঁ, কিন্তু ধর্ম তো ঘরের ব্যাপার, বাইরে আগুন লাগলে সেটা ঘরে রেখেই মানুষ আগুন নেবাতে বেরিয়ে আসে।

হাসল থম্বোটা, তাই যদি হয় তোমরা এত বছর ব্রিটিশকে থাকতে দিলে কেন? খুব দেরীতে হলেও অবশ্য তোমরা ব্রিটিশকে তাড়াতে পেরেছিলে আর এইটে অন্যদের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশগুলোকে সাহায্য করেছিল।

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে অনিমেষ বলল, হ্যাঁ, ওরা আমাদের হাতে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছে।

বিস্মিত হলো থম্বোটা, ফ্রিডাম কেউ কাউকে দেয় না, ফ্রিডাম আর্ন করতে হয়। তুমি কি বলতে চাইছ তোমরা ফ্রিডাম আর্ন করনি?

কথাটা অনিমেষকে হঠাৎ উত্তেজিত করে ফেলল। স্কুল জীবনের শেষ দিকে সনীলদা যে সব নতুন ব্যাখ্যা ওকে শুনিয়েছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সম্পর্কে, কোলকাতায় আসার পর হাতখরচের পয়সা বাঁচিয়ে কেনা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সেই শোনা ব্যাখ্যাকে আরো দৃঢ় করেছে। সে বলল, আমরা চেষ্টা করেছিলাম বিভিন্ন পথে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওরা আমাদের দিয়ে গেছে। রক্ত না দিলে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না আর যদি তা পাওয়াও যায় তা হলে সে স্বাধীনতা সম্পর্কে দেশের মানুষের মমতা থাকে না। এই প্রথম অনিমেষ প্রকাশ্যে এসব কথা বলল। এতদিন এই সব বিষয় ওর ভাবনায় ঘোরাফেরা করত। কিন্তু এখন বলার সময় ওর মনে হল নিজের দেশের এই রকম দুর্বল জায়গা নিয়ে একজন বিদেশীর সঙ্গে আলোচনা করা ঠিক হচ্ছে না। থম্বোটা তার নিজের দেশের সমস্যা নিয়ে কোন কথা বলেনি। এ সব কথা বললে ও নিশ্চয়ই ভুল বুঝবে এবং সেটা ওর দেশের মানুষ জানুক তা কাম্য নয়। অনিমেষ গলার স্বর পাল্টে বলল, এর মধ্যে অনেকগুলো বছর গেছে, এবার আমরা পুরনো ভুলগুলো শুধরে নেব। এবার তোমার কথা বল, আমরা একই পৃথিবীতে থাকি অথচ তোমাদের দেশের খবর ভারতবর্ষের মানুষ কিছুই জানে না। থম্বোটা বলল ওয়েল, আমাদের দেশ খুবই গরীব এবং বড়লোকেরা যাকে বলে আনডেভেলপড বোধ হয় তাই। প্র্যাকটিক্যালি আমরা আফ্রিকানরা এত ছোট ছোট স্টেটে ডিভাইডেড যে–।

ঠিক এ সময় একজন খর্বকায় মানুষ দরজায় এসে দাঁড়াল। সর্বাঙ্গ ভেজা, পোশাক থেকে টুপটাপ জল ঝরছে মুখ চোখে খুব বিরক্তি। একে অবশ্য অনিমেষ কয়েক বার দেখেছে, এর মত বেঁটে এবং রোগা এ হোস্টেলের কোন আফ্রিকান নয়। তবে এর গায়ের রঙ নিকষ কালো নয় বরং তামাটে ভাবটাই বেশি। মোটা নাক এবং পুরু ঠোঁট থাকা সত্ত্বেও একটা আলগা শ্ৰী আছে। মাথার চুলে একটু বেশি স্প্রিং থাকায় বৃষ্টির জলেও এলোমেলো হয়নি। ছেলেটি ঘরে ঢুকে খুব উত্তেজিত হয়ে হাত পা নেড়ে থম্বোটাকে কি সব বলতে লাগল নিজের ভাষায়। থম্বোটা হাসছে কিন্তু কোন উত্তর দিচ্ছে না। ছেলেটা পাগলের মত দু-তিনবার পাক খেয়েও কথা থামাচ্ছে না। ভাষা ঠাওর না হলেও অনিমেষের মনে হল ছেলেটি বোধ হয় এই ঘরে ওকে দেখে রেগে গেছে। আফ্রিকান ছেলেদের ঘরে কোন ভারতীয়কে সে আড্ডা দিতে দ্যাখেনি, ওরাও কারো ঘরে যায় না। হঠাৎ ছেলেটি অনিমেষের দিকে তেড়ে এসে উল্টোদিকের খাটে বসে তড়বড় করে যে কথাগুলো বলল সেটা যে ইংরেজি ভাষায় তা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত লাগল। অনিমেষ দ্বিতীয়বার ওকে উচ্চারণ করতে শুনল, ইউ মাস্ত প্রতেস্ত। কি প্রতিবাদ করার কথা বলছে ও বুঝতে না পেরে অনিমেষ থম্বোটার দিকে তাকাতেই ছেলেটি একটা আঙুল ওর দিকে উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ইউ লিভ দিস হোস্তেল?

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল অনিমেষ। একটু আশ্বস্ত হল এই ভেবে যে ওর রাগের কারণ সে নয়, তা হলে প্রতিবাদ করার কথা বলত না। থম্বোটা এবার কথা বলল এই ছেলেটি ওর রুমমেট। আজ বিকেলে এক সদ্যপরিচিতা মহিলার সঙ্গে ওর বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু বৃষ্টি এসে যাওয়ায় ওর হোস্টেলে ফিরে এসে আড্ডা মারবে ঠিক করেছিল। কিন্তু গেটে যে দারোয়ান আছে সে নাকি বাগড়া দিয়েছে এই বলে যে এখানে নাকি মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ। যেহেতু এখন আটটা বেজে গেছে তাই ভিজিটার্স রুমটাও বন্ধ ছিল। থম্বোটোর বন্ধু এতে ভীষণ অপমানিত বোধ করছে। তারা কেউ বাচ্চা ছেলে নয়, নিজের ভালমন্দ বুঝতে জানে, এই ধরনের আইন মেয়েদের হোস্টেলে থাকতে পারে কিন্তু ওদের ওপর প্রয়োগ করা মানে রীতিমত অপমান করা। একটু হেসে থম্বোটা যোগ করল, মহিলাটি আমার বন্ধুর মুখ আর দর্শন করবে না জানিয়ে গেছে।

থম্বোটোর বন্ধু এতক্ষণ চুপ করে কথাগুলো শুনছিল, এবার চিৎকার করে বলে উঠল, শি টোল্ড মি কি-ড।

অনিমেষ হেসে ফেলল বলার ধরন দেখে। থম্বোটোর বন্ধু চট করে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত হাতে নিজের জামাকাপড় খুলতে লাগল। গেঞ্জিটেঞ্জি পরেনি, নির্লোম তামাটে বুক দেখলে কেউ নিগ্রো বলে ভাবতে পারবে না। এরপর সে নির্দ্বিধায় প্যান্টের বোতাম খুলে সেটাকে ছুঁড়ে দিল ঘরের এক কোণায়। অনিমেষ এতটা আশা করেনি, চট করে একটা অস্বস্তি ওকে বিব্রত করে তুলল। পরিচিত কিংবা অপরিচিত যে-কোন মানুষের সামনেই এইরকম জামাকাপড় ছেড়ে শুধু জাঙ্গিয়া পরে দাঁড়ানোর কথা সে চিন্তাও করতে পারে না। এদের কি কোন সঙ্কোচের বালাই নেই? ওর আশঙ্কা হচ্ছিল এবার হয়তো জাঙ্গিয়াটাও শরীরে থাকবে না। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই ছেলেটির খুব ঘেন্নার সঙ্গে বলে উঠল, ইউ ইন্ডিয়ান আর উইদাউট ব্যাকবোন, কাওয়ার্ড। এবার শব্দগুলো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে না হওয়ায় অনিমেষের মাথায় রক্ত উঠে গেল। চট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে ছেলেটির দিকে এগিয়ে গেল। ওর শরীর উত্তেজনায় কাঁপছে, দুটো হাতের আঙুল মুঠোয় ধরে রাখতে পারছে না। অনিমেষের মুখচোখের ভাব দেখে ছেলেটি বোধ হয় ভয় পেয়ে দুপা পিছিয়ে গেল। থম্বোটা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই ছুটে এসে অনিমেষকে জড়িয়ে ধরল। ওর বিরাট শরীরের কাছে অনিমেষ এই মুহূর্তে অসহায় হলেও প্রাণপণে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছিল। জোর না খাঁটিয়ে থম্বোটা বলল, আমার বন্ধুর কথায় কান দিনও না, ও ঠিক জানে না কাকে কি বলতে হয়। তারপর হেসে বলল, তুমি রাগ করেছ দেখে আমি খুশি হয়েছি।

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল অনিমেষ। এখন শরীর কেমন ঝিমঝিম করছে। থম্বোটো এসে বাধা না দিলে ও নির্ঘাত ছেলেটিকে মারত। উনি মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা দেবেন আর সেটা সমর্থন না করলে জাত তুলে গালাগাল দেবেন। কোন রকমে থম্বোটার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এল অনিমেষ। আজ অবধি কখনো কারো গায়ে হাত তোলেনি সে, ছেলেটাকে মারলে ও নিশ্চয়ই কোন প্রতিরোধ করতে পারত না। ওরকম দুর্বল শরীর নিয়ে এ ধরনের কথা বলার সাহস পায় কি করে! মারতে পারেনি বলে জীবনে এই প্রথম বার আফসোস হল অনিমেষের। বাইরে এখনো সমানে বৃষ্টি পড়ছে। মেজাজটা খিঁচড়ে গেছে, আফ্রিকান ছেলেদের মানসিকতা এ রকম হয় কিনা কে জানে, তবে থম্বোটার সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছিল। কয়েক পা এগোতে না এগোতেই পেছনে ডাক শুনতে পেল সে, হেই, হনিমেস।

ঘাড় ফিরিয়ে সে দেখল থম্বোটা আসছে। নিজের নামটার এ রকম উচ্চারণ শুনে বিরক্তিটা যেন সামান্য মরে গেল। কাছে এসে থম্বোটা বলল, আমার খারাপ লাগছে। আমার বন্ধুটি কিন্তু খুব নিরীহ, শুধু মেয়েদের ব্যাপারে দারুণ সেনসিটিভ। যা হোক, তোমার সঙ্গে কথা বলে আমার খুব ভাল লেগেছে, তুমি কি আবার আসবে?

কথা বলার ভঙ্গীতে এমন একটা আন্তরিকতা ছিল যে অনিমেষ রাগ করতে পারল না। সে বলল, আজ থাক, আর একদিন হবে। ঠিক এই সময় থম্বোটার ঘর থেকে একটা উদাম সুর ভেসে এল। মাউথ অর্গানটা যেন ঝড় তুলছে। হেরে যাবে নিশ্চিত জেনে মানুষ যখন মরিয়া হয়ে ওঠে, সুরটা সেই রকম তেজী এবং উদ্দাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ ওরা বাজনাটা শুনল। এই শব্দ করে বৃষ্টিপড়া রাত্রে যখন সমস্ত হোস্টেলটা নিঝুম তখন এই রকম ঝিমঝিমে সুর যেন অবশ করে ফেলছিল ওকে। নীচু স্বরে থম্বোটো বলল, আমার চাইতে অনেক ভাল বাজায় ও, না?

অনিমেষ কি বলবে ঠাওর না করতে পেরে নিজের মনে ঘাড় নেড়ে বারান্দা দিয়ে হাঁটতে লাগল। যে সুরটা ওর পেছন পেছন আসছিল আচমকা সেটা থেমে যেতেই অনিমেষের মনে হল একটা ভারী নিস্তব্ধতা ওর চারপাশ চেপে ধরেছে। ঘরের শেকল খুলে অন্ধকারের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল সে। নিজেকে ভীষণ একা মনে হচ্ছে, এই বিরাট কোলকাতা শহরে তার কোন বন্ধু নেই, আত্মীয় নেই। আলো না জ্বেলে ঘরে ঢুকে চুপচাপ খাটে শুয়ে পড়ল সে।

অস্বস্তিটা তবু যাচ্ছিল না। কি সহজে ছেলেটি ওকে গালাগালিটা দিল! থম্বোটো না থাকলে আজ কি হতো বলা যায় না। হঠাৎ মাথায় রক্ত উঠে যাওয়ায় যে উত্তেজনা সমস্ত শরীরকে কাঁপাচ্ছিল তাতে সে কতখানি আঘাত করতে পারত কে জানে কিন্তু সেটা করতে পারলে বোধ হয় এখন ভাল লাগত। একটা ছেলে অতদূর থেকে কোলকাতায় পড়তে এসে অমন সামান্য কারণে একটা দেশের মানুষের চরিত্র সম্পর্কে এ রকম ইঙ্গিত দিতে যাবে কোন যুক্তিতে?

নিস্তেজ হয়ে অনিমেষ শুয়ে শুয়ে দরজা দিয়ে বাইরের বৃষ্টি দেখছিল। বারান্দায় জ্বেলে রাখা আলোয় বৃষ্টি মাখামাখি হয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে। উত্তেজনা কমে আসায় ক্রমশ এক ধরনের অবসাদ এল । অনিমেষ কথাটা নিয়ে নাড়াচড়া করছিল, ইউ ইন্ডিয়ানস্ আর উইদাউট ব্যাকবোন, কাওয়ার্ড। শব্দগুলো হঠাৎ কেমন নিরীহ হয়ে গেল, সে যেন সামান্য ওপরে উঠে এসে ঝুঁকে পড়ে শব্দগুলোকে দেখতে লাগল। এই তিন বছর কোলকাতা শহরে সে যে জীবন কাটিয়েছে, প্রতিদিনের খবরের কাগজে অথবা চারপাশের যে মানুষগুলোকে শহরে সে যে জীবন কাটিয়েছে, প্রতিদিনের খবরের কাগজে অথবা চারপাশের যে মানুষগুলোকে নিত্য সে দেখছে তারা কি ধরনের? জলপাইগুড়ি শহর থেকে সেই প্রথমবার ট্রেনে চেপে আসবার সময় ভারতবর্ষের মাটিতে নতুন কিছু গড়ার জন্য যে ভাঙচুর শুরু হয়েছে বলে উত্তেজনায় টগবগে হয়েছিল সে, এই কয় বছরে তা কোথায় মিলিয়ে গেছে। এখন এই শহরের মানুষগুলোর দিকে তাকালে মনেই হয় না তারা বা তাদের কেউ কেউ ওসব কথা কখনো ভেবেছিল। গড্ডালিকা প্রবাহ সে বইতে পড়েছে কিন্তু সেটা কি জিনিস তা এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা না দেখলে বুঝত না। মেরুদণ্ডহীন কথাটা কি একদম প্রযোজ্য নয়? এখনও ভারতবর্ষের নব্বইভাগ মানুষ জানে না যে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। যারা জানে তাদের অনেকের মানসিকতায় ব্রিটিশ শাসন আর স্বাধীন ভারতবর্ষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

তার কলেজে পড়ার ব্যাপারে মহীতোষের সঙ্গে কিছুটা তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল। মহীতোষ চাননি যে অনিমেষ স্কটিশচার্চ কলেজে ভর্তি হোক। ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে পড়াশুনাটা তিনি পছন্দ করেন না। তাছাড়া হোস্টেলটা যখন কলেজ কম্পাউন্ডে নয় তখন কোলকাতার রাস্তায় ছেলেকে হাঁটাচলা করতে দিতে তিনি রাজী ছিলেন না। প্রায় আট মাস বিছানায় শুয়ে থেকে অনিমেষ খুব কাহিল এবং রোগা হয়েছিল, দ্রুত হাঁটাচলা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একটু নজর করলেই বোঝা যায় যে সে একটা পা খুঁড়িয়ে হাঁটছে। বস্তুত কোলকাতার কলেজে পড়তে পাঠানোর ইচ্ছাই চরে গিয়েছিল মহীতোষের। মাসকাবারী রিকশার ব্যবস্থা করে জলপাইগুড়ির বাড়ি থেকে আনন্দচন্দ্র কলেজে পড়ার ব্যাপারেই জোর দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মানুষের সহজে শিক্ষা হয় না, বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনিমেষ, যে আরো একগুয়ে হয়ে গেছে সেটা প্রমাণ হল তার কোলকাতায় পড়তে যাওয়ার জেদে। আর একবার ঠাকুর্দা সরিৎশেখর তাকে সমর্থন করলেন। দুর্ঘটনা বারবার ঘটে না। প্রায় বাধ্য হয়ে মহীতোষ ছেলেকে নিয়ে কোলকাতায় এলেন, এবার একা ছাড়েননি। প্রেসিডেন্সীর পাশেই হিন্দু হোস্টেল, কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা বিফল হল। প্রথম ডিভিসনে পাশ করেও যে কোন কোন কলেজে জায়গা পাওয়া যায় না সেটা জেনে হতবাক হয়ে গেলেন মহীতোষ। ফলে কোলকাতার তিনটি মিশনারী কলেজের দিকে ঝুঁকলেন মহীতোষ, সেন্ট জেভিয়ার্সে মন মানল না। সব দিক দিয়ে দেখেশুনে সেন্ট পলস আসল জায়গা বলে মনে হল। কলেজের মধ্যেই হোস্টেল, রাস্তায় পা দিতে হবে না একবারও। কিন্তু অনিমেষ আকৃষ্ট হল তৃতীয়টিতে। স্কটিশচার্চে বিবেকানন্দ সুভাষচন্দ্র বসু পড়েছেন। কে কবে ঘি খেয়েছেন এখন গন্ধ শোকার কোন মানে হয় না–মহীতোষ এই কথাটা বোঝাতে পারেননি। মা-মরা ছেলেরা বোধ হয় চিরকাল এ রকম জেদী হয়। ছেলের সঙ্গে দুদিন কলেজে গিয়ে ভেতরে ভেতরে কেমন যেন অসহায় বোধ করেছিলেন তিনি। গাদা গাদা মেয়ে রঙবেরঙের পোশাকে জটলা করছে জলেজ চত্বরে, তাদের কারো কারো ভঙ্গী বেশ বেপরোয়া। এখানে ছেলের পড়াশুনা কতদূর হবে সন্দেহ থেকে গেল তার । যে চিন্তাটা তাকে আরো বিহ্বল করে দিচ্ছিল তা হল সায়েন্সের বদলে অনিমেষ আর্টসে অ্যাডমিশন নিয়েছে। বাবা হয়ে ছেলেকে ডাক্তার করার বাসনা জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি দেখলেন এখানেও অনিমেষের ঠাকুর্দার রায়ই শেষ কথা হল। যাওয়ার আগে বার বার তিনি ছেলেকে উপদেশ দিয়ে গেলেন। পড়াশুনা করে ভাল রেজাল্ট করতে হবে। এই কোলকাতা শহর নতুন ছেলেদের নষ্ট করে দেবার জন্য ওত পেতে থাকে, অনিমেষ যেন কখনও অসতর্ক না হয়। কোন বন্ধুবান্ধবকে বিশ্বাস করা উচিত হবে না কারণ বিপদের দিনে তারা কেউ পাশে থাকবে না। কলেজের য়ুনিয়ন থেকে যেন সে সাত হাত দুরে থাকে কারণ মধ্যবিত্ত সংসারের ছেলের এই বিলাসিতা সাজে না। রাজনীতি যাকে নেশা ধরায় তার ইহকাল পরকাল একদম ঝরঝরে হয়ে যায়। যাদের বাপের প্রচুর টাকা আছে তারাই ওসব করুক, যেমন জহরলাল, চিত্তরঞ্জন, সুভাষ বোস।

বাবার এ সব উপদেশ অনিমেষ মন দিয়ে শুনতে বাধ্য হয়েছিল। সে লক্ষ্য করেছিল বাবা যখন কথা বলেন তখন তিনি ভুলে যান ভারতবর্ষ এখন স্বাধীন। কিন্তু বাবার একটা কথার সঙ্গে সে একমত, ইতিমধ্যে তার একটা বছর নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মন্টু তপন অর্ক এখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। মানুষের জীবন বড় অল্প সময়ের, তা থেকেও যদি একটি বছর অকেজো হয়ে যায় তাহলে সেটা কম ক্ষতি নয়। অনিমেষ মহীতোষকে কথা দিয়েছিল সে সময় নষ্ট করবে না। তাই বি এ পাস করা পর্যন্ত সে শুধু দেখে গেছে চারধার। স্কটিশচার্চের ছাত্র যুনিয়ন অবশ্যই ছাত্র ফেডারেশনের দখলে কিন্তু মাঝে মাঝে মিছিল করা ছাড়া তাদের কোন সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। পৃথিবীর কোন প্রান্তে কি হল তার জন্য ওরা মিছিল বের করে অথচ কলেজের জলের কলটা তিনদিন খারাপ হয়েছিল সেদিকে খেয়াল করেনি। অনিমেষ শুধু ওদের দেখে গিয়েছিল এই কটি বছর। দ্রুত হাঁটা অথবা শারীরিক উদ্যম ফিরে আসতে যে এতটা সময় লাগবে তা সে ভাবেনি, মনে মনে ভেবে যাওয়া ছাড়া তার কোন উপায় ছিল না। আশ্চর্য, কেউ তাকে কোনদিন জিজ্ঞাসা করেনি তার পায়ে কি হয়েছে!

ত্রিদিব কখন এসেছে টের পায়নি অনিমেষ। ঘরে আলো জ্বলতেই চোখে লাগল, হাতের আড়ালে চোখ রাখল। ত্রিদিব একা নয়, সঙ্গে আরো দুজন এসেছে। খাওয়ার ঘরে ওদের দেখেছে কিন্তু আলাপ হয়নি। এই হোস্টেলে দুটো খাওয়ার ঘর, একটা বিদেশীদের অন্যটা ওদের। কে এই নিয়ম চালু করেছিল জানা নেই তবে এখনও তা চলে আসছে। অনিমেষ উঠে বসতে একটা তীব্র গন্ধ পেল। ত্রিদিবরা দাঁড়িয়ে আছে আর ওদের শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া জলে মেঝে ভেসে যাচ্ছে। তিনজনেই ভিজে কাক। অনিমেষ ত্রিদিবকে বলল, কি ব্যাপার, বৃষ্টিতে ভিজে এলে, অসুখ করে যেতে পারে।

ত্রিদিব হাসল। বৃষ্টিতে ভিজলে চুলগুলো এমন নেতিয়ে থাকে যে অনেক সময় মানুষের চেহারা পাল্টে যায়। ত্রিদিবকে এখন অন্যরকম দেখচ্ছে, আরে এরকম ফাইন বৃষ্টির মধ্যে রোড দিয়ে হাঁটতে কি আরাম তা তুমি বুঝবে না। নিজেকে দেওয়ানা মনে হয়।

কিন্তু নিমোনিয়া হলে কি হবে? কথার ভঙ্গীটায় অনিমেষ মজা পেল।

কবিদের নিমোনিয়া হয় না। ঈশ্বর কবিদের সিনায় এত রকমের ভালবাসা দিয়েছেন যে সেখানে নিমোনিয়া জায়গা পায় না। কথা বলতে বলতে ত্রিদিব নিজের অস্থিরতা লুকোতে পারল না। এবার অনিমেষ লক্ষ্য করল ওরা তিনজনে ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। ত্রিদিবের গলার স্বরটা একটু অন্যরকম, অনিমেষ, মাই রুমমেট, এদের সঙ্গে তোমার আলাপ আছে? নেই। আমরা এই হোস্টেলে থাকি তবু কেউ কাউকে চিনি না, আমরা একই পৃথিবীতে থাকি তবু মানুষের আজও জানাশোনা হল না। এ হচ্ছে দুর্গা–দুর্গাপদ, গোবিন্দ। আঙুল দিয়ে দ্বিতীয়জনকে দেখাল ত্রিদিব। গোবিন্দ যার নাম সে যখন কথা বলল তখনই গন্ধটার রহস্য বুঝতে পারল অনিমেষ।

তুমি তো গুড বয়, এখনও মফস্বলের আলোয়ান গায়ে জড়ানো!

কথাগুলো জড়ানো, মদ্যপানের প্রতিক্রিয়া প্রতিটি শব্দে। তার মানে ত্রিদিব এবং দুর্গাপদ মদ খেয়েই এসেছে। গোবিন্দর কথায় বিদ্রূপ থাকলেও অনিমেষ জবাব দিল না। এটা জানা কথা, মত্ত হলে মানুষের চিন্তা-ভাবনা অসংলগ্ন হয়ে যায়, তখন যুক্তি অচল। সে শুধু ত্রিদিবকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি মদ খেয়েছ?

কোলকাতার এই প্রবাস-জীবনে ত্রিদিবকে গৃহসঙ্গী পেয়ে খুশি হয়েছিল অনিমেষ। ছেলেটা কবিতা লেখে, অন্য রকম কবিতা, মনটা ভাল । অবশ্যই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে কিন্তু আচরণে কোন চালিয়াতি নেই। শুধু, অনিমেষের ইচ্ছে হোক না হোক ত্রিদিব ওকে কবিতা শোনাবেই। কিন্তু আজ অবধি ত্রিদিবকে সে মদ্যপান করা অবস্থায় দ্যাখেনি। কেউ মদ খেলেই সেই অনেক বছর আগের দেখা মহীতোষের চেহারাটা ওর সামনে উঠে আসে। মত্ত মহীতোষ আর শীর্ণচেহারার ছোটমাকে ভুলে গেছে অনিমেষ, তবু–। মানুষ দুঃখ পেলে নাকি মদ খায়, বড়লোকেরা মেজাজ আনতে ড্রিঙ্ক করে কিন্তু ত্রিদিবের ক্ষেত্রে তো এ দুটোর কোন প্রয়োজন আছে তার জানা নেই। তাছাড়া এই হোস্টেলের যে নিয়মাবলী দরজায় টাঙানো তাতে এ ধরনের আচরণের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

ত্রিদিব কথাটার জবাব না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল জানলার দিকে। পাল্লা দুটো খুলে দিতে দিতে বলে, কেন, মদ খেতে তোমার খারাপ লাগে? পেটে মদ মাথায় বৃষ্টি–লন্ডভন্ড হয়ে যাক সৃষ্টি। তুমি খাবে?

না। নিজের অজান্তেই শব্দটা জোরে বলে অনিমেষ।

কেন গুডি বয়। মদ খেলে মানুষ খারাপ হয়ে যায়? গোবিন্দ টিপ্পনী কাটল জড়ানো গলায়। অনিমেষ দেখল দুর্গাপদ জামার তলা থেকে একটা চ্যাপ্টা বোতল বের করছে। নাক সিটকে অনিমেষ বলল, মদ খেলে মানুষ কি হয় আমি জানি, আমার দেখা আছে।

দুর্গাপদ খিক খিক করে হাসল, অনেকের জামাইষষ্ঠী থাকে না, ভাইফোঁটা নিতে নেই, তোমার বুঝি এরকম ব্যাপার–মদ খেতে নেই!

ত্রিদিব জানলা খুলে দিতেই হু হু করে বৃষ্টির জল ঘরে ঢুকতে লাগল। অমিমেষ দেখল ওর পড়ার টেবিল জলে ভিজে যাচ্ছে। সে তড়াক করে নেমে জানলা বন্ধ করতে গিয়ে ত্রিদিবের কাছে বাধা পেল। দুহাত দুপাশে বাড়িয়ে ত্রিদিব বলল, নিয়ম না ভাঙলে নিয়মটাকে বোঝা যায় না, মাই রুমমেট।

আমার বইপত্র ভিজে যাচ্ছে।

কাল আমি শুকিয়ে দেব।

অনিমেষ লক্ষ্য করল ত্রিদিব ভাবপ্লুত অবস্থায় কথা বললে হিন্দী শব্দ একদম বলে না। যেমন কবিতা লেখার সময় ওর হয়। হাল ছেড়ে দিয়ে সে ফিরে আসছিল এমন সময় গোবিন্দ ওর সামনে এসে দাঁড়াল, ইনডাইরেক্ট না ডাইরেক্ট? বোতলটা সামনে ধরে সে ইঙ্গিত করতেই অনিমেষ মাথা নাড়ল,

আমি খাব না।

তা কি হয়! এক যাত্রায় পৃথক ফল।

আশ্চর্য! আমি না খেলে তোমরা জোর করে খাওয়াবে নাকি?

ত্রিদিব এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখল, সংস্কার ভাঙার কথা হচ্ছিল না সেদিন, তুমি নিজেই তো সংস্কারগ্রস্ত। নাও, খেয়ে নাও–লাথি মারো বিবেকের মাথায়।

ওটা সস্তা নয়, আমি মরে গেলেও খাব না। অনিমেষ ফুঁসে উঠল। হঠাৎ কি হল ত্রিদিবের, ওর চোখ মুখ হিংস্র হয়ে গেল। ধস্তাধস্তি শুরু হল বৃষ্টিভেজা ঘরটায়। অনিমেষ ভাবল চিৎকার করে ওঠে। সুপার ছুটে এলে এদের হাত থেকে বাঁচা যাবেই। কিন্তু তারপর যেটা হবে সেটা ভেবে সে চিৎকার করল না। নিঃশব্দ ছিল বাকী তিনজনই। সে কিছুতেই ওই তিন প্রায়-মাতালের সঙ্গে পেরে উঠছিল না। প্রচণ্ড শক্তিতে ওরা অনিমেষকে মাটিতে চিত করে ফেলে মুখের মধ্যে মদের বোতল গুঁজে দিল। গলগল করে নেমে আসা বিশ্রী স্বাদের তরল পদার্থটিকে জিভ দিয়ে প্রতিরোধ করতে পারল না অনিমেষ। উগরে ফেলতে গিয়ে কিছুটা পেটের ভেতর চলে গেল। জ্বলছে গলা–কি দুর্গন্ধ। অনিমেষ শেষবার দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিরোধ আনছিল। গোবিন্দ খিঁচিয়ে উঠল, শালা খাচ্ছে না। ঠিক আছে, ওর শাস্তি হল আগাগোড়া ন্যাংটা করা।

নগ্নতা কবিতা নয় অথবা আরো কিছু বেশি। ত্রিদিব বিড় বিড় করে উঠল। ওদের হাত চলছে। দুজন চেপে ধরেছে অন্যজন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দুপায়ের প্রতিবাদ সত্ত্বেও অনিমেষের নিম্নদেশ নগ্ন হয়ে গেল। পরবর্তী আক্রমণ কি হবে সেটা ভাববার আগেই একটা অস্ফুট আর্তনাদ শুনতে পেল অনিমেষ।

গোবিন্দ বলছে, আরে ব্বাস, এ শালার থাইতে এত বড় দাগ কিসের? চোখ বন্ধ অনিমেষের শরীরে আচমকা সেই যন্ত্রণাটা ছড়িয়ে পড়ল। সে শূন্যে সামান্য লাফিয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। ত্রিদিব ওকে ছেড়ে দিয়ে অপারেশনের জায়গাটায় হাত দিয়ে অন্য রকম গলায় কথা বলল, কি হয়েছিল এখানে? কিসের দাগ?

মুখের ভেতর বিশ্রী স্বাদ, গলা জ্বলছে, শরীরে অবসাদ, অনিমেষ থুতু ফেলার চেষ্টা করে জবাব দিল, বুলেটের।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

One thought on “০১. শেষ বিকেলটা অন্ধকারে ভরে আসছিল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *