০১. শেষবিকেলটা অন্ধকারে ভরে আসছিল

শেষবিকেলটা অন্ধকারে ভরে আসছিল। যেন কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হয়ে গেছে, বাতাসে একটা ঠাণ্ডা আমেজ টের পাওয়া যাচ্ছিল। অবশ্য কদিন থেকেই আকাশের চেহারাটা দেখার মতো ছিল। চাপ-চাপ কুয়াশার দঙ্গল বাদশাহি মেজাজে গড়িয়ে যাচ্ছিল সবুজ গালচের মতো বিছানো চা-গাছের ওপর দিয়ে খুঁটিমারীর জঙ্গলের দিকে। বিচ্ছিরি, মন-খারাপ করে-দেওয়া দুপুরগুলো গোটানো সুতোর মতো টেনে টেনে নিয়ে আসছিল স্যাঁতসেঁতে বিকেল-ঘষা সেলেটের মতো হয়েছিল সারাদিনের আকাশ। বৃষ্টির আশঙ্কায় প্রত্যেকটা দিন যেন সুচের ডগায় বসে থাকত এই পাহাড়ি জায়গাটায়, কেবল বৃষ্টিই যা হচ্ছিল না।

কিন্তু কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। হয়তো ভুটানোর পাহাড়ে বৃষ্টি নেমেছে। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। পুরো হাতওয়ালা হলুদ পুলওভার পরে অনি দেখল দিনটা ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির সামনে পাতাবাহারের গাছগুলোর ওপর নেতিয়ে-পড়া হলুদ বরোদটা কোথায় হারিয়ে গেল টুক করে। আরও দূরে, আঙরাভাসা নদী জড়িয়ে বিরাট খুঁটিমারীর জঙ্গলের মাথায় লাল বলের মতো যে-সূর্যটা হঠাৎ উঁকি দিয়েছিল একবার, যাকে সকাল থেকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল ও, কেমন করে, ব্যাডমিন্টনের কর্কের মতো ঝুলে পড়ল ওপাশে, একরাশ ছায়া ছড়িয়ে দিল চারধারে। অনির খুব কান্না পাচ্ছিল।

খালিপায়ে বাড়ির পেছনে চলে এল অনি। ঘাসগুলো কেমন ঠাণ্ডা, ন্যাতাননা। পায়ের তলায় শিরশির করে। চটি না পরে বেরুলে মা রাগ করবেন, কিন্তু অনি জানে এখন ওদের কাউকে পাওয়া, যাবে না। এই বিরাট কোয়ার্টারটার ঠিক মধ্যখানের ঘরে এখন সবাই বসে গোছগাছ করছে। এদিকে নজর দেবার সময় নেই কারও।

এই বাড়িটার চারপাশে শুধু গাছপালা। দাদু এখানে এসেছিলেন প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে। সবকটা গাছের আলাদা আলাদা গল্প আছে, মন ভালো থাকলে দাদু সেগুলো বলেন। এই যে বিরাট ঝাপড়া.কাঁঠাল গাছ ওদের উঠানের ওপর সারাদিন ছায়া ফেলে রাখে, যার গোড়া অবধি রসালো মিষ্টি কাঠাল থোকা থোকা হয়ে ঝুলে থাকে, সেটা বড় ঠাকুমা লাগিয়েছিলেন। প্রায় চল্লিশ বছর বয়স হয়ে গেছে গাছটার। প্রথমদিকে নাকি মাটির নিচে কাঁঠাল হত, পেকে গেলে ওপরের মাটি ফেটে যেত, গঙ্কে চারদিক ম-ম করত তখন। রাত্রির বেলায় শেয়াল, আসত দল বেঁধে সেই কাঁঠাল খেতে। বড় ঠাকুমা শুয়ে শুয়ে চিৎকার করতেন তখন। শেষ পর্যন্ত দাদু কাঁঠাল গাছের ওপরে একটা টিনের ঘোট ড্রাম বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই ড্রামের মধ্যে একটা ঘণ্টা দড়িতে বাঁধা থাকত। দড়িটা টিনের ছাদের নিচ দিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে খাটের সঙ্গে বাঁধা ছিল। ভালো থাকলে দাদু হেসে বলেন, রাতদুপুরে ঘুম ভেঙে গেলে দেখতাম তোমার ঠাকুমা শুয়ে সেই দড়ি টানছেন আর বাইরে প্রচণ্ড শব্দ করে ড্রামটা বাজছে। শেয়ালের সাধ্য কী এর পরে আসে!

উঠানের শেষে গোয়ালঘর যাবার খিড়কিদরজার গায়ে যে-তালগাছটা, যার ফল কোনদিন পাকে না, ছোট ঠাকুমা লাগিয়েছিলেন। মেজোপিসিকে তিনদিনের রেখে বড় ঠাকুমা মারা যান। হোট ঠাকুমা বড় ঠাকুমার বোন। এই তাল গাছটা কোনো কর্মের নয়। পিসিমা বলেন, ব্যাটাছেলে গাছ। বাবা কাটতে দেন না ছোটমা লাগিয়েছিল বলে, ছায়া-ফায়া সব বাজে কথা। ছোটমাকে তো বাবা খুব ভালোবাসতেন। গাছটাকে অনেকবার কেটে ফেলার কথা হয়েছিল। বাবুই পাখিরা সারা গাছে বাসা, করে আছে। সারাদিন রঙিন পাখির কিচিরমিচির, দেখতেও ভালো লাগে। তা ছাড়া ছায়া হয় উঠানে এইসব বলে দাদু কাটতে দেননি। তাই পিসিমা বলেন, ছায়া-ফায়া সব বাজে কথা। সত্যিই বাবুই পাখি বাসা করে বটে। এক-একদিন সকালে সারারাত ঝড়ের পরে অনি. দেখেছে মাটিতে পড়া বাসাগুলো হাতে নিয়ে, কী নরম! অথচ পাখিগুলোর ক্ষেপ নেই, আবার বাসা করতে লেগে গেছে। ঝাড়িকাকু একদিন ওকে বলেছিল, কত্তামশাই-এর দুই বউ, কাঠালগাছ আর তালগাছ। বেশ মজা লেগেছিল অনির।

খিড়কিদরজা দিয়ে বেরুতেই ও কালীগাই-এর হাম্বা ডাক শুনতে পেল। এমন মানুষের মতে ডাকে গরুটা, বুকের মধ্যে কেমন করে ওঠে। কালী দাঁড়িয়ে আছে গোয়ালঘরের সামনে। ওর ছেলেমেয়েরা কোথায়? বেশি গরু বাড়তে দেন না মা। চারটে বেশি হয়ে গেলে লাইন থেকে পাতরাস আসে, হাটে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। সে টাকা মায়ের কাছে জমা থাকে-গরুগুলো সব মায়ের। কালীকে বিক্রি করা হবে না কখনো । দুধ দিক বা না-দিক, ও এখন বাড়ির লোক হয়ে গিয়েছে। অনি দেখল কালী বড় বড় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখ দুটো আজ এত গম্ভীর কেন? বুকের মধ্যে কেমন করে উঠল অনির। ও কি কিছু বুঝতে পেরেছে গরুরা কি টের পায়? হাত বাড়াল অনি, সঙ্গে সঙ্গে মুখটা ওপরে তুলে ধরল কালী। গলার কম্বলে হাত বোলাল অনি অনেকক্ষণ। নাক দিয়ে শব্দ করছে কালী। রোজ যেরকম আদর করে খাবার মুখে নেয়, আজ সেরকমটা না। যেন ও সত্যিই বুঝতে পারছে অনি। বড় বড় মাথা সমান আকন্দ গাছগুলো ঘোয়ালঘরের চারপাশে বেড়া দিয়ে লাগানো হয়েছে। অনি সেগুলো পেরিয়ে আসতে আসতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, কালী ঘুরে দাঁড়িয়ে ওকে একদৃষ্টে দেখছে। অনি দৌড় লাগাল।

গোয়ালঘরের পেছনদিকে কোনো বাড়িঘর নেই। বড় বড় জঙ্গলে গাছের সঙ্গে আম কুল ছড়িয়ে আছে। এখন আলো প্রায় নেই বললেই চলে। দৌড়ে আসতে আসতে অনিত সেই ডাহুকটার গলা শুনতে পেল। রোজকার মতো কেমন নিঃসঙ্গ গলায় ঝাকড়া কুলগাছটার তলায় বসে একটানা ডেকে যাচ্ছে। ডাহুকটার গলার কাছটা সাদা থালার মতো। অনেকদিন দেখেছে অনি। ঝাড়িকাকু বলে ডাহুকের মাংস খেতে নাকি খুব ভালো। গুলতি দিয়ে মারার চেষ্টা করেও পারেনি ঝাড়িকাকু। ভীষণ চালাক ডাহুকটা। এখন প্রায়-সন্ধে-হওয়া সময়টায় ডাহুকটার গলার শব্দে কোন বিষণ লাগছিল চারপাশ। অনি আঙরাভাসা নদীর গায়ে-রাখা কাপড়কাচার পাথরটার ওপরে এসে দাঁড়াল। চকচকে ঢেউগুলো যেন ওদের স্কুলে নতুন-আসা গম্ভীর-দিদিমণির মতো দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে কোনোদিন না তাকিয়ে। ঝুঁকে পড়ে নিজের ছায়া দেখল ও আঙরাভাসার কালো জলে। মাকে লুকিয়ে ওরা প্রায়ই এই নদীতে স্নান করে। ছোট ছোট নুড়ি-বিছানো হাঁটুজলের নদী। এর নিচে লাল লাল চিড়িগুলো গুড়ি মেরে পড়ে থাকে, হাত বাড়ালেই হল, রোজকার মতো অনি আর ধরতে পারবে না। যাবার বাকি দিনগুলো কেমন দ্রুত, মুখের ভিতর নরম চকোলেটের মতো দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। অনির ভীষণ খারাপ লাগছে, ভীষণ।

এখন এখানে কেউ নেই। আঙরাভাসার দুধারে বড় বড় আমগাছগুলোতে ফিরে-আসা পাখিরা জোরালো গলায় চ্যাঁচামেচি করে নিচ্ছে শেষবার। অদ্ভুত একটা আঁষটে গন্ধ উঠছে নদীর গা থেকে। চওড়ায় পনেরো ফুট, তীব্র স্রোতের এই নদী চলে গেছে নিচে চা-ফ্যাক্টরির ভিতর দিয়ে। ফ্যাক্টরির বিরাট হুইলটা চলছে এর স্রোতে। বলতে গেলে স্বৰ্গছেঁড়া হৃৎস্পন্দনের মতো এই নদীর ঢেউগুলো। অথচ ওরা, পায়ের তলায় নড়বড়ে পাথর রেখে কতবার পার হয়ে যায়। ওপাশের লাইনের মদেসিয়া মেয়ের দল যখন নদী পেরিয়ে এপারে আসে তখন ওদের হাঁটু অবধি নামা কালো পাহাড়ের ঘেরটা পদ্মপাতার মতো স্রোতে ভাসে। কাপড়টাকে ওরা বলে আঙরা। নদীর নাম তাই আঙরাভাসা।  স্রোত আর জল কম তাই বড় মাছেরা এদিকে আসে না। তবু একটা জলজ আঁষটে গন্ধ বেরোয় নদীর গা থেকে। চোখ বন্ধ করলে জলের শব্দ খনির মতো বেজে যায়।

পুলওভার গুটিয়ে উবু হয়ে চট করে কাপড়কাচা পাথরটা তুলে ধরল অনি। হালকা চ্যাপটা পাথর। সামান্য ঘোলা জল সরে গেলে অনি দেখল একটা বিরাট দাড়াওয়ালা কালো কাঁকড়া, গোল গোল চোখ তুলে জলের তলায় বসে ওকে দেখল সেটা। তারপর নাচের মতো পা ফেলে ফেলে সরে যেতে লাগল সেটা নদীর ভিতরে। একগাছা চুনোমাছের বাচ্চা খলবলিয়ে চলে গেল। ছোট সাদা পাথরের ফাক দিয়ে লম্বা শুড়ওয়ালা একটা লাল চিংড়িকে দেখতে পেল অনি। হঠাৎ মাথার ওপর থেকে পাথরের ছাদটা উঠে যেতে বেচারা বুঝতে পারছিল না কী করবে। বাঁ হাতে পাথরটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে ডান হাতে খপ করে ধরে ফেলল ও মাছটাকে। পাথরটাকে নামিয়ে দিয়ে আবার উঠে বসল তার ওপর। হাতের মুঠোয় চিংড়িটা ছটফট করছে। পেটের তলায় অজস্র পায়ের মতো শুড়গুলো নাচাচ্ছে এখন। নাকের কাছে নিয়ে এল অনি, চমৎকার জলের গন্ধ। কী ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বুকের মধ্যে, এই চিড়িটাকে আর কোনোদিন সে দেখতে পাবে না। হাতের মুঠোটাকে জলের মধ্যে রান নি। আঙুলের ফাক গলে জল ঢুকছে। চিড়িটা মোচড় দিয়ে খুব। হাত ওপরে তুলতেই জল বেরিয়ে যেতেই চিংড়িটা লাফ দিল হঠাৎ। আর সেই সময় গলার শব্দ পেল ও। চোখ তুলে তাকাতেই নি দেখল ওপারে জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে টুকরি-কাঁধে দুটো মদেসিয়া মেয়ে ঘাটে আসছে। ফ্যামির বোধহয় ছুটি হল। মেয়ে দুটো মা-মেয়েও হতে পারে। তপূপিসির মতো ছোটটার বয়স। টুকরিটা পাড়ে রেখে ওরা চট করে ঠাণ্ডা জলে নেমে পড়ল। জল ছিটিয়ে মুখ ভেজাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে অনিকে দেখল। ছোট মেয়েটাকে বড়কে আঙুল দিয়ে অনিকে দেখাল, বুড়ো বাবাকে লাথি।

বড়জন বিরাট খোপাসমেত মাথাটা ঘুরিয়ে অনিকে দেখে হাসল, কর-লে, ও ছোউয়া গো নাই হলেক। অনি বুঝল, ওর গোঁফ হয়নি এখনও, বাচ্চা ছেলে। বড়টা ছোটকে কিছু করে নিতে বলছে। কথাটা শুনে ছোটটা পেছন ফিরে কাপড় আভরা গুটিয়ে জলের মধ্যে প্রায় হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। এই প্রাকৃতিক শব্দ, যার সঙ্গে এই নির্জন আরাভাসা নদীর কোনো সম্পর্ক নেই, কানে যেতেই অনি ঘুরে দাঁড়াল আর তারপর কোনোদিকে না তাকিয়ে অন্ধকার নেমে-যাওয়া মাঠের মধ্যে দিয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগল বাড়ির দিকে। পেছনে হঠাৎ মেয়ে দুটো হেসে উঠলা খুলে, সরমাতিস রে-এ ছোউয়া-হি-হি-হি। ওদের গলার শব্দেরই কি না বোঝা গেল, একদম চুপ।

উঠোনে ঢুকে অনি দেখল হারিকেন জ্বালানো হয়ে গেছে। স্বৰ্গছেঁড়া চা-বাগানে এখনও ইলেকট্রিক আসেনি। শুধু ফ্যাক্টরিতে ডায়নামো চালিয়ে বাতি জ্বালানো হয়। মহীতোষ বাড়ির পেছনে সম্প্রতি একটা ছোট টিনের চালাঘর করেছেন। বড় শৌখিন মানুষ মহীতোষ, কলকাতা থেকে ডায়নামো আনার ব্যবস্থা করেছেন। এখন যে-কোনো দিনই সেটা এসে যেতে পারে। অয়ারিং হয়নি, এমনি তার ঝুলিয়ে ঘরে-ঘরে বাতি জ্বালাবার ব্যবস্থা পাকা। এই রাত্তিবেলায় তালগাছের মাথায় জমে থাকা অন্ধকার, কাঠালগাছের ডালে-ডালে যে অদ্ভুত রহস্যের ভূতটা দলা পাকিয়ে বসে থাকে-অনির ভীষণ ইচ্ছে করে ইলেকট্রিক জ্বললে সেগুলোকে কেমন দেখবে। মহীতোষ ডায়নামো বসালে এটাই হবে এই তল্লাটের প্রথম ইলেকট্রিক আসেনি। কিন্তু মুশকিল হল, কবে আসবে ডায়নামোটা? ওরা চলে বাবার পর এলে অনির কী লাভ হবে! বাবা কেন কলকাতায় তাগাদা দিয়ে চিঠি লিখছে না! এই তো কিছুদিন আগে ওদের বাড়িতে প্রথম রেডিও এল। ওদের বাড়ি মানে স্বৰ্গছেঁড়ায় প্রথম রেডিও এল। মহীতোষ নিজে দুটিতে গিয়েছিলেন কলকাতায় বেড়াতে। ফেরার সময় বড়সড় রেডিও সেটটা কিনে নিয়ে এলেন। শুধু রেডিও সেট নয়, সঙ্গে একটা আলাদা স্পিকার। বাইরের ঘরে রেডিও বাজত, সেই রেডিও শুনতে ভিড় করে আসতেন বাবুরা। মহীতোষ ওর সঙ্গে একটা তার জুড়ে শিকারটাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন পঞ্চাশ গজ দূরে-আসাম রোডের কাছে। বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে বেঁধে স্পিকারটা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। আর রাস্তা জুড়ে বসে যত মদেসিয়া কুলিকামিন ভিড় করে শুনত, অল ইণ্ডিয়া রেডিও, কলকাতা।

রেডিও আসার পর বাড়িটার চেহারাই যেন বদলে গেল । সরিৎশেখর সকাল-বিকেল রেডিওর পাশে বসে থাকেন একগাদা বুড়ো নিয়ে, খবর শুনবেন। ছোট কাকু আধুনিক গান শুনবে চুপিচুপি, কেউ না থাকলে।রাত্তিরবেলা নাটক হলে স্পিকারটা ভিতরবাড়িতে চালান করে দিয়ে মহীতোষ উচ্চঘামে রেডিও বাজিয়ে দেন। সেদিন সন্ধের মধ্যে রান্না শেষ করার তাড়া দেখা দেয় মা-পিসিদের মধ্যে আটটা বাজলেই সব হাত-পা গুটিয়ে বাবু হয়ে ভিতরের বারান্দায় সতরঞ্জি পেতে বসেন নাটক শুনতে। তখন বলা নিষেধ-অনি নাটক শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে এক-একদিন। এখন অবশ্য শুধু এ-বাড়ি নয়-নাটক শুনতে আশেপাশের সব কোয়ার্টারের মেয়েরা সন্ধের মধ্যে চলে আসে অনিদের বাড়ি। একটা সতরঞ্জিতে আর কুলোয় না এখন। সঙ্গের বাচ্চা র একজোট করে মা বলেন, অনি, যাও, এদের সঙ্গে খেলা কর। বিচ্ছিরি লাগে তখন। বরং বাই র ঘুটঘুটি অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে নাটক শুনতে শুনতে, রেডিও ফাটিয়ে একটা গল যখন চিৎকার করে কাঁদে-আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল তখন বুকের মধ্যে কেমন করে ওঠে। মাকে আচলে চোখ মুছতে দেখে নিজেরই কান্না পেয়ে যায়।

এখন বাইরের ঘরে রেডিও বাজছে না। সরিৎশেখর বা মহীতোষ ফেরেননি এখনও তুলসীগাছের নিচে প্রদীপ জ্বালা হয়ে গিয়েছে। ভিতরের বারান্দায় উঠতেই মা বললেন, হ্যাঁরে–কোথায় ছিলি এতক্ষণ? অনি কোনো কথা বলল না। দৌড়ে আসার জন্য ওর ফরসা মুখ লাল-লাল দেখাচ্ছিল। রান্নাঘরে যেতে যেতে আমায় আবার বললেন, খিদে পেয়েছে। অনি ঘাড় নাড়ল, তারপর বাইরে চলে এল। বাইরের ঘরে বিরাট হারিকেন জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। সামনে পাতাবাহার গাছের পাশে ওযেক্লাবঘর, তার দরজা খুলে ঝাটফাট দিয়ে ঝাড়িকাকু হ্যাজাক জ্বালাচ্ছে উবু হয়ে বসে। ওপাশে অন্ধকারে ডুবে-থাকা আসাম রোড দিয়ে হুশহুশ করে একটার পর একটা গাড়ি ঝুলিয়ে দিল ঝাড়িকাকু সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত চত্বরটা দিনের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। হ্যাজাকের তলায় ঝাড়িকাকুকে কেমন বেঁটে লাগছে। হাঁটু অবধি ঢালা হাফপ্যান্ট আর ফতুয়া গায়ে দিয়ে মুখ উঁচু করে ঝাড়িকাকু হ্যাজাকটা দেখছে।

ঠিক এই সময় অনি সাইকেলের ঘন্টিগুলো শুনতে পেল। চা-বাগানের ভিতর দিয়ে সাদা নুড়ি-বিছানো যে-রাস্তাটা ফ্যাক্টরির মুখে গিয়ে পড়েছে, সাইকেলগুলো সেই রাস্তা দিয়ে আসছিল। অন্ধকার হয়ে-যাওয়া চরাচরে এখন সবে জ্বলে ওঠা-তারার আলো একটা আবছা ফিকে ভাব এনেছে, যার জন্য এতদূরে ওদের বারান্দায় দাড়িয়েও অনি-চা-গাছগুলোর মধ্যে মধ্যে বসানো শেডট্রিগুলোকে বুঝতে পারল। দশ-বারোটা সাইকেলের পরপর আসছে ঘন্টি বাজাতে বাজাতে মাঝে-মাঝে টর্চ জ্বেলে রাস্তা দেখে নিচ্ছে ওরা। প্রায় দেড় মাইল লম্বা এই রাস্তার দুধারে ঘন চা-গাছ আর শেডট্রি । সন্ধের পর একা বরং একা কেউ যায় না।

ভোর ছটার বেজে গেলে বাবুরা দল বেঁধে সাইকেলে চেপে বাড়ি ফেরেন। এখন একটু একটু হাওয়া দিচ্ছে। সামনে মাঠে একা দাড়িয়ে-থাকা লম্বাটে কাঠালিচাপা গাছে একদল ঝিঝি করাত চালানোর মতো শব্দ করে যাচ্ছে। সাইকেলের ঘটিগুলো আরও জোর হল। তারপর একসময় ওরা মোড় ঘুরে চা-বাগানের গেট পেরোতেই অনি ওদের দেখতে পেল। পরপর সাজানো কোয়ার্টারের সামনে পড়ে-থাকা বিরাট মাঠের মধ্যে ঢুকে সাইকেলগুলো এবার আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এক-একটা টর্চের আলো ধারালো তলোয়ারের মতো লম্বা হয়ে এক-একটা কোয়ার্টারের দিকে চলে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বাবাকে দেখতে পেল অনি। আবছা আবছা বাবার জামা-প্যান্ট দেখা যাচ্ছে। সাইকেলের গতি কমিয়ে টর্চের আলো নিবিয়ে দিলেন মহীতোষ। তারপর বাড়ির সামনে লম্বা বেঞ্চিতে সাইকেলটাকে খাড়া করে বারান্দায় উঠে এলেন। বছর বত্রিশের যুবক মহীতোষ প্যান্ট পরেন, ফুলপ্যান্ট। এই চাবাগানের কেউ তা পরে না। হাঁটু অবধি মোজা গার্টারে বাঁধা, খাকি হাফপ্যান্ট আর হাফহাতা বুশশার্ট-এই হল এখানকার বাবুদের পোশাক। পাতিবাবু মশাবাবু-যাদের কাজ রোদুরে ঘুরে ঘুরে, তারা অবশ্য মাথায় একটা সোলার হ্যাট ঝুলেন।-কিন্তু মহীতোষ এই বয়সে হাফপ্যান্ট পরতে রাজি নন। ফুলপ্যান্টের পায়ের কাছটা ক্লিপ দিয়ে গুটিয়ে রাখেন সাইকেল চড়ার সময়। সারামুখে নিটোল করে দাড়িগোঁফ কামানো মহীতোষের মাথার চুল নিগ্রোদের মতন কোঁকড়া। হাসতে গেলে গজদাঁত দেখা যায়। বারান্দায় উঠে মহীতোয ছেলেকে দেখে বললেন, আজ রাত্রে নদী বন্ধ হবে, বুঝলি! বলে

অনির মাথায় হাত বুলিয়ে ভিতরে চলে গেলেন।

হাঁ করে তাকিয়ে থাকল অনি। নদী বন্ধ হবে মানে আঙরাভাসা আজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর আগে গত বছর, তখন অনি অনেক ছোট ছিল, আঙরাভাসাকে বন্ধ করা হয়েছিল। সেটা হয়েছিল শেষরাতে। অনিরা সবাই ঘুমিয়ে ছিল। শুধু পরদিন সকালে ঝাড়িকাকু এক ড্রাম ভতি চিংড়ি আর কাঁকড়া এনে দেখিয়ে যখন বলল যে নদী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে ওগুলো ধরা গে. তখন একদৌড়ে আঙরাভাসার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে ভীষণ আফসোস হয়েছিল অনির। খটখট করছে নদী, কোথাও এক ফোঁটা জল নেই। ভিজে শ্যাওলা আর নুড়িপাথরের ওপর কয়েকটা কুকুর কী শুকছিল। পায়ে পায়ে নদীর ঠিক মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে ছিল অনি। চারদিকে শুকনো পাথর, ছবিতে দেখা কঙ্কালের মতো লাগছিল নদীটাকে। এমন সময় পায়ের তলায় কী সুড়সুড় করতে অনি দেখল একটা ছোট্ট লাল কাঁকড়া গর্ত থেকে মুখ বের করছে। অনিকে দেখেই সেটা সুড়ৎ করে ভিতরে ঢুকে গেল। এখানে-ওখানে কিছু চুনোমাছ, গেঁড়ি শুকিয়ে পড়ে আছে। অনির খুব আফসোস হচ্ছিল তখন, যদি সে দেখতে পেত হঠাৎ জল শেষ হয়ে যাওয়াটা! মাছগুলো তখন কী করছিল। তারপর আবার রাত্তির হলে জল ছাড়া হয়েছিল নদীতে। সেটাও অনি দেখতে পায়নি। পরদিন সকালে গিয়ে দেখল ঠিক আগের মতো যে-কে সে-ই। কুলকুল করে স্রোত বইছে। ওধু কাপড়কাচার পাথরের নিচে কোনো মাছ ছিল না এই যা। বছরে একবার এইরকম হয়। শ্মশানের কালীবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে-আসা আঙরাভাসা নদীটাকে ওয়োরকটা মাঠের পাশে দুভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এক ভাগ গেছে নিচেধানের জমির গা দিয়ে দুনম্বর কুলিলাইনের পাড় ঘেঁষে ডুডুয়া নদীতে। আর অন্য বাঁকটার মুখে সিমেন্টের বাঁধমতো করে তার তলা দিয়ে জল আনা হয়েছে ফ্যাক্টরিতে। স্রোতটা এদিকেই বেশি। ফ্যাক্টরির সেই বিরাট হইলটায় যখন আবর্জনা জমে জমে পাহাড় হয়ে যায় তখন বাঁধের মুখটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। জল তখন ওপাশে চলে যায়-এদিকটা খটখটে। ফ্যাক্টরিতে তখন হইল পরিষ্কার করবার কাজ চলে। আজ আবার নদী বন্ধ হবে। কখন? উত্তেজনায় পায়ের তলা শিরশির করে উঠল অনির। আজ দেখতেই হবে। অনি ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে আর-একটা টর্চের আলো দেখতে পেল। মহীতোষ বাড়িতে এসে রেডিও চালিয়ে দিয়েছেন। কী একটা আসর হচ্ছে এখন। অনি দেখল একটা টর্চের আলো লাফাতে লাফাতে এগিয়ে আসছে। এই আলোটাকে অনি চেনে। অন্ধকারে নেমে পড়ল অনি। পায়ের তলায় ভিজে-থাকা শিশির আর ঠান্ডা বাতাসে ওর শীত করছিল। এগিয়ে-আসা টর্চের দিকে ও দৌড়াতে লাগল। ক্রমশ অনি অন্ধকার কুঁড়ে এগিয়ে-আসা একটা বিরাট লম্বাচওড়া শরীর দেখতে পেল। হাঁটুর নিচ অবধি ধুতি, ঢোলা পাঞ্জাবি, হাতে লাঠি-সরিৎশেখর আসছেন। পেছনে ওঁর ব্যাগহাতে বকু সর্দার। সরিৎশেখর হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়লেন হঠাৎ। তারপর পাঁচ-ব্যাটারির টর্চ জ্বেলে সোজা করে ধরলেন সামনে। লম্ব আঁকশির মতো আলোটা ছুটন্তু অনিকে টেনে নিয়ে আসছিল। যেন এক লাফে দূরত্বটা অতিক্রম করে অনি দাদুর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে টর্চ বিনিয়ে অনিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে সরিৎশেখর বললেন, কী হয়েছে দাদু?

ফিসফিস গলায় বুকে মুখ রেখে অনি বলল, আজ আমি নদীর বন্ধু হাওয়া দেখব।

পঁয়তাল্লিশ বছর চাকুরি করার পর আর ছদিন বাদে সরিৎশেখর অবসর নেবেন। এই তো আজ বিকেলে সাহেবের সঙ্গে ওর বাংলায় বসে কথা হচ্ছিল। একটা ফাইল সই করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন সরিৎশেখর। কাজকর্ম মিটে গেলে হে সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, রিটায়ার করে কী করবে ঠিক করেছ বড়বাবু? সরিৎশেখর হেসেছিলেন, দেখি। সঙ্গে সঙ্গে ওঁর মনে পড়ে গিয়েছিল বছর পাঁচেক আগেকার কথা। এই চেয়ারে বসে ম্যাকফার্সন সাহেবকে সেদিন এই প্রশ্ন করেছিলেন সরিৎশেখর। প্রায় বাইশ বছর একসঙ্গে কাজ করেছিলেন ওঁরা। ম্যাকফার্সনের ছেলে ডেমন্ডকে জন্মাতে দেখেছেন উনি। বিলিতি কোম্পানির এই চা-বাগানে চিরকাল স্কচ নাহেবরাই ম্যানেজারি করেছে। ম্যাকফার্সনের মতে এত বেশিদিন কেউ স্বৰ্গছেঁড়ায় থাকেননি। সরিৎশেখরের দেখা ম্যানেজারদের মধ্যে ম্যাকফার্সন সবচেয়ে মাই-ডিয়ার লোক। এই তো সেদিন অনি জন্মাতে মিসেস ম্যাকফার্সন একগাদা প্রেজেন্টশন নিয়ে ওঁর নাতির মুখ দেখে এলেন। চা-বাগানের ম্যানেজারদে যেসব নিয়মকানুন মানতে হয় সেগুলো প্রায়ই মানতেন না মিসেস ম্যাকফার্সন। বাবুদের সঙ্গে ওঁদের বেশি মেলামেশা বারণ। কেউ তা করলেই তেলিপাড়া ক্লাবে কথা উঠবে। তারপর সেটা চলে যাবে কলকাতার সদর দপ্তরে। নির্দিষ্ট ম্যানেজারের নামের পাশে লাল টেড়া পড়বে। সরিৎশেখরের প্রশ্ন শুনে ম্যাকফার্সন চটপট বলেছিলেন, রিটায়ার মানে একদম বিশ্রাম। কোনো কাজকর্ম করব না। ডেসমন্ড অস্ট্রেলিয়া থেকে লিখেছে একটা মাঝারি ফার্ম করেছে ক্যাটলের-ওটাই দুজনে দেখাশোনা করব। ছেলেকে সেই ছোটবেলায় শালীর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সাহেব অস্ট্রেলিয়ায়। মিসেস ম্যাকফার্সন বলেছিলেন, চিঠি লিখব কিন্তু আমি-তুমি উত্তর দেবে বাবু। আই ওয়ান্ট এভরি ডিটেল। তা যাবার দুদিন আগেও বউমাকে কীসব সেলাই শিখিয়ে গিয়েছেন মিসেস ম্যাকফার্সন। আর গিয়ে অবধি প্রত্যেক মাসে একটা করে চিঠি লেখেন উনি। সবকিছু লিখতে হয় সরিৎশেখরকে। এমনকি সাহেবের বাংলোর গেটের পাশে যেবাতাবিলেবু গাছটা-সেটার কথাও। ওদিকে মেমসাহেব এখন একা। ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। সাহেব মাছ ধরতে গিয়ে নদীতে ডুবে মারা গেছেন। এইসব ব্যাপার। বছর কুড়ি আগে তোলা মেমসাহেবের যুবতী অবস্থার একটা ছবি আছে সরিৎশেখরের কাছে। ভুড়ুয়া থেকে একটা বিরাট কালবোস মাছ ধরে উপহার দিয়েছিলেন তিনি সাহেবকে। মেমসাহেব সেই মাছটা দুহাতে সামনে ধরে ছবি তুলিয়ে সরিৎশেখরকে প্রেজেন্ট করেছিলেন। কী সুন্দর দেখতে ছিলেন মেমসাহেব–পায়ের পাতা অবধি গাউন-পরতেন তখন। সেই মাছ ধরতে গিয়েই সাহেব মারা গেলেন।

আজ বিকেলে হে সাহেব আফসোস করলেন, তুমি চলে গেলে আমি কী করে চালাব জানি না। কোম্পানি আর এক্সটেন্ড করতে চাইছে না–তোমার বয়স কত হল বাবু?

বাষট্টি। উত্তর দিয়েছিলেন সরিৎশেখর।

জানি, তোমারও ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে, কী করা যাবে বলে। ওয়েল, তোমার জলপাইগুড়ির বাড়ি বানাতে যা যা দরকার তুমি বাগান থেকে নিয়ে যেও। হে সাহেব বলছেন।

ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে? হ্যাঁ, তা হচ্ছে বইকী। এমন তো হয়নি যখন বড়বউ চলে গেল! ছোটবউ যাবার সময় খুব কষ্ট হয়েছিল এখন মনে পড়ে। শোক জীবনে কম পাননি তো। বড় মেয়ে বিধবা হল তেরো বছর বয়সে। এই তিন মাস আগে মেজো মেয়ে মরে গেল দুম করে বাচ্চাকাচ্চা রেখে। বড় ছেলে পরিতোষ বখাটে হয়ে কোথায় চলে গেছে-ওকে শুধরোতে পারলেন না উনি। কিন্তু এইসব দুখ পাওয়া কেমন সহ্যের মধ্যে ছিল। অন্য কাউকে টের পেতে দেননি। এমনিতেই সকলে বলে লোকটা পাষাণ! দয়ামায়া নেই একবিন্দু। ঠিক বুঝতে পারেন না নিজেকে উনি। কিন্তু চলে যাবার সময় যত এগিয়ে আসছে বুকের ভিতরটা তত ভার বোধ হচ্ছে কেন?

পঁয়তাল্লিশ বছর আগে উনি যখন স্বৰ্গছেঁড়া চা-বাগানে ছোটবাবুর চাকরি নিয়ে এসেছিলেন তখন আসাম রোডে সন্দে হলেই বাঘ ডাকত। সাকুল্যে দুজন বাবু ছিল এই চা-বাগানে। চা-বাগান বললে ভুল বলা হবে, তখন তো সবে চা-গাছ লাগানো হচ্ছে। তিনকড়ি মণ্ডল কুলি চালান নিয়ে আসছে রাচি থেকে। স্বৰ্গছেঁড়ার তিন রাস্তার মোড়ে চা-বিড়ি-সিগারেটের কোনো দোকান ছিল না তখন। আর আজ বেশ রমরমে চারধার। তিন তিল করে জায়গাটা শহরে শহুরে হয়ে গেল। চা-বাগানে বাবুদের সংখ্যা বেড়েছে, তাই ছুটির তো বাজলেই কেউ আর সিটে থাকতে চায় না। আজ ভীষণ বিরক্ত হয়েছেন নতুন ছোরাটার ওপর। গ্রাজুয়েট ছেলে। হে সাহেব অফিসারের ঘরে আলো জ্বলছে। কে আছে-কৌতুহল হল দেখার। নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সরিৎশেখর উকি দিলেন। নতুন হোকরা মনোজ হালদার মাথা ঝুকিয়ে ডিকশনারি দেখছে। ওঁকে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল ছেলেটি।

কী ব্যাপার, এখন বাড়ি যাওনি? সরিৎশেখর জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তো-ততা করেছিল মনোজ, এই, মানে চিঠিটা শেষ করে। হাত বাড়িয়ে বাংলায় লেখা একটা চিঠি তুলে ধরেছিলেন উনি। চিঠিটা পড়ে মাথার ভিতর দপদপ করতে লাগল। আজ দুপুরে উনি ছোকরাকে বলেছিলেন, ফয়ারউড সাপ্লাই দেয় যে-কন্ট্রাক্টর, তাকে চিঠি লিখে সাবধান করে দিতে যে ওর লোকজন ঠিকমতো সাপ্লাই দিচ্ছে না। মনোজ বাংলায় লিখেছে সেটা।

বাংলায় কেন? কোনোরকমে বললেন তিনি।

এই, ইংরেজিতে ট্রানস্লেশন করে নিচ্ছিলাম। হাসল মনোজ।

রাগে গা গরম হয়ে গেল সরিৎশেখরের। কী অবস্থা! একটা চিঠি লিখতে এদের কলম ভেঙে যায়, আবার গ্রাজুয়েট বলে ঢুকেছে! তিন মিনিটের কাজ তিন ঘন্টায় হয় না-এই হল ইয়ংম্যান! অথচ তিনি তো মাত্র ফাস্ট ক্লাস অবিধি পড়া বিদ্যা নিয়ে এসেছিলেন। বাবা মারা যেতে পরীক্ষার ফি যোগাড় করতে পারেননি। আজ অবধি তার ইংরেজির ভুল কোনো সাহেব-ম্যানেজার ধরতে পারেননি। মাত্র আট টাকা মাইনেতে ঢুকেছিলেন তিনি। এরা তো ঢুকেই আড়াইশো টাকা হাতে পায়।

আলোটা নিবিয়ে বাড়ি চলে যাও। বলে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। ইচ্ছে হচ্ছিল সোজা বাংলোয় গিয়ে সাহেবকে বলে সাসপেন্ড করেন ওকে। কিন্তু অনেক কষ্টে সামলে নিয়েছিলেন নিজেকে। আর তো কটা দিন আছেন এখানে, মিছিমিছি এই ছেলেটার ভবিষ্যৎ নষ্ট করার দায়ভোগ করবেন কেন? অবশ্য ভবিষ্যৎ যা নষ্ট হবার তা তো হয়েই গেছে ওর। শুধু লোকে বলবে, বুড়োটা যাবার আগে চাকরি খেয়ে গেল। বড় বড় ঝোলা সাদা গোঁফে হাত রাখলেন উনি। কোনোকিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটলেই উনি আশু মুখুজ্যের মতো ঠোটের দুপাশে ঝোলা গোঁফে অজান্তেই হাত বোলান।

অফিস থেকে বেরিয়ে আঙরাভাসার ওপর পাতা ছোট্ট পুল পেরিয়ে ফ্যাক্টরির সামনে এলেন উনি, পেছনে বকু সর্দার। বকু প্রায় তিরিশ বছর আগে ওঁর সঙ্গে। বকুর ছেলে এবার বিনাগুড়ির মিশনারি স্কুল থেকে পরীক্ষা দেবে। কী নেশা হয়েছিল সরিৎশেখরের, জোর করে বকুর ছেলে মাংরাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। মিশনারিরা নাম রেখেছে জুলিয়েন। মদেসিয়া ছেলের সাহেব নামে বকু সর্দার কিন্তু আপত্তি করেনি। অবশ্য স্বৰ্গছেঁড়ায় এলে সবাই ওকে মা বলেই ডাকে। তা এই ছেলে পাশ করলে বাবুদের চাকরিতে নেবার জন্য বন্ধু ওকে সম্প্রতি ধরেছে। ব্যাপারটা অন্য কুলিসর্দাররা কেমন চোখে দেখছে তা জানেন না সরিৎশেখর। এখন অবধি এই বাগানে কোনো নেবার-ট্রাবল হয়নি কখনো-কিন্তু কু যেভাবে ছেলে ব্যাপারে কথা বলছে। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন উনি। মাথায় সাদা কাপড় পাগড়ির মতো বাধা, হাঁটুর ওপর গুটিয়ে পরা খাটো ধুতি, খালিগায়ে বন্ধু একটা লাঠির ডগায় সরিৎশেখরের ব্যাগটা বুলিয়ে কাঁধে নিয়ে হাঁটছে। সাহেবের কানে বকুর ছেলের কথা পৌছেছে। ইঙ্গিতে আকারে বোঝা যায়, জুলিয়েনের চাকরি প্রায় হয়ে গেছে বললেই হয়। কেমন অস্বস্তি হতে লাগল তার। ভাগ্যিস উনি কদিন পরেই রিটায়ার করে যাচ্ছেন। মহীতোষরা বুঝবে পরে। বাগানের বাবুদের পোষ্টে স্থানীয় ছেলে থাকলে বাইরে থেকে লোক নেওয়া চলবে না-মোটামুটি এই প্রস্তাব এতদিনে কার্যকর করেছেন সরিৎশেখর। এতে সুবিধা হল, নতুন যারা ঢেকে তাদের জন্মাতে দেখেছেন, উনি, ফলে কোনোদিন মাথা তুলে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। এই প্রস্তাবটাকেই আঁকড়ে ধরেছে অন্যান্য চা-বাগানের কুলিরা তারাও তাদের ছেলেমেয়েদের আগে সুযোগ দেবার দাবি জানাচ্ছে। লাঠি দিয়ে সামনের পাথরের নুড়ি সরিয়ে সরিৎশেখর হাসলেন, স্বাধীনতা এসে যাচ্ছে। ওঁর রিটায়ার করার দিন পনেরোই আগস্ট।

 

ফ্যাক্টরির সামনে আসতেই ননু চায়ের গন্ধ পেলেন উনি। নিজে পঁয়তাল্লিশ বছর এখানে কাজ করে গেলেন, কিন্তু চায়ের অভ্যেস কখনো হল না তার। তবে এই ফ্যাক্টরির সামনে দিয়ে যেতে তার খুব ভালো লাগে। নতুন পাতার রস নিংড়ে যখন চা বাক্সবন্দি হবার চেহারা নিয়ে ফ্যাক্টরিতে লুপ হয়ে থাকে তখন হেঁটে যেতে যেতে নাক ভারী হয়ে ওঠ মিষ্টি গন্ধে। প্রচণ্ড একটা টানা আওয়াজ আসছে ফ্যাক্টরি থেকে। আঙরাভাসার জলে ফ্যাক্টরির হইলটা ঘুরছে। ডায়নামো ফিট করে ইলেকট্রিক আলে জেলে দেওয়ায় জায়গাটা কেমন ম্যাড়মেড়ে দেখাচ্ছে। ফ্যাক্টরির সামনে ডিসপেনসারি। হলুদ রঙ-করা একতলা বাড়ির সামনে আলো জ্বলছে। ডিসপেনসারির খোলা দরজা দিয়ে ডাক্তার ঘোসালকে দেখতে পেলেন উনি। একটা বাচ্চা ছেলের হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছেন। মাথা-ভরতি পাকা চুল এই লোকটির ডাক্তারি ডিগ্রি থাকুক বা না-থাকুক, ওঁর দিনরাত খেটে যাবার ক্ষমতাকে শ্রদ্ধা করেন সরিৎশেখর।

বাড়ি যাবে নাকি হে ডাক্তার? গলাখাকারি দিলেন উনি।

চকিতে মুখটা ঘুরিয়ে ডাক্তার ঘোষাল বাইরের দিকে তাকালেন, তারপর দুটো হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন, নমস্কার, স্যার।

কী হে, উঠবে?

এই হয়ে এল, আপনি এগোন, আমি আসছি। ডাক্তার হাসলেন।

পা বাড়ালেন সরিৎশেখর, কিন্তু এগানো হলো না তার। ডিসপেনসারির পাশের অন্ধকারে ঘাপটি মেরে কোথায় বসেছিল, ছিলা-ছাড়া তীরের মতো ছিটকে এসে পড়ল সরিৎশেখরের পায়ে। এসে দুহাতে পায়ের পাতা জড়িয়ে ধরে ঢুকরে উঠল, তুই কিনো চলি যাবি রে-এ-এ।

হাহা করে উঠলেন সরিৎশেখর, কিন্তু ছাড়াতে পারলেন না। দুহাতে শক্ত করে ওর হাঁটু জড়িয়ে ধরেছে, মাথাটা ঠুকছে এক-একবার। লাঠিতে ভর রেখে নিজেকে সামলালেন একবার। তারপর অসহায় চোখে পেছনে দাঁড়ানো বকুর দিকে তাকালেন। হলদে দাঁত বের করে বন্ধু হাসল। তারপর মাথা দোলাল।

এই ওঠ, ওঠ বলছি! হেঁকে ওঠেন সরিৎশখর।

তু কাঁহা যাহাতিস রে-এ-এ-এ। মুখ তুলল কামিনটা। একমুখ ভাঙাচোরা খো, মাথায় কাঁচাপাকা প্রায় নুড়ি-হয়ে-আসা চুল, খালিগায়ে কোনোরকমে জড়ানো শাড়ি কুচকুচে কালো কামিনটার তেঁতুলের খোসার মতো আঙুল সরিৎশেখরের পায়ে চেপে বসেছিল। শেষ পর্যন্ত বকু সর্দার এগিয়ে এসে মেয়েটাকে ছাড়িয়ে নিল। সরিৎশেখর দেখলেন, কোনোরকমে উঠে দাড়াল ও, দাড়িয়ে টলতে লাগল। চিনতে পারলেন এবার, তিন নম্বর কুলি-লাইনের এককালের সাড়াজাগানো কামিন সেরা। হাড়িয়া টেনেছে খুব। মদেসিয়া মেয়ের নাম সেরা বিশ্বাস করতে পারেননি উনি তিরিশ বছর আগে। হপ্তা নিতে এসেছিলে এক শনিবার। টিপসই নিয়ে টাকা দিচ্ছিল ক্যাশিয়ার ব্রজেনবাবু অফিসের বারান্দায় বসে। আগের শনিবার পেমেন্টের একটা গোলমাল হয়েছিল বলে সরিৎশেখর সামনে দাড়িয়ে ছিলেন। মাথায় ফুলগোজা আঁটোসাটো শরীরের লম্বা এই মেয়েটাকে চোখে পড়েছিল ভিড়ের মধ্যে। ডুরে শাড়ি, লাল ব্লাউজ, আর শাড়ির ওপর হাঁটু অবধি নামা আঙরা-জড়ানো শরীরটা নিয়ে রঙচঙ করছিল মেয়েটা। অন্য সবাই যখন সরিৎশেখরকে দেখে চুপচাপ টাকা নিয়ে যাচ্ছিল তখন এই মেয়েটা চোখ ঘুরিয়ে তিন-চারবার দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়েছিল ওর দিকে তাকিয়ে। ব্ৰজেনবাবু যখন নাম, ডাকলেন তখন বুঝতে পারেননি সরিৎশেখর প্রথমটায়। মেয়েটা যখন তিন দুলিয়ে শালিকপাখির মতো হেঁটে এল, তখন বুঝতে পারেননি সরিৎশেখর ব্রজেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কী নাম বললেন?

সঙ্গে সঙ্গে কপট শব্দ করেছিল গলায় মেয়েটা, হাত নেড়ে ব্ৰজেনবাবুকে নাম বলতে নিষেধ করেছিল। তারপর আচমকা হেসে উঠে বলেছিল, সেরা-সেরা ওঁয়াও। ফাস্টো কেলাস।

এখন কী বলবেন এই মাতালপ্রায় বুড়ি-হয়ে-যাওয়া সেরাকে। দুটো পায়ে শরীরের ভর ঠিক রাখতে পারছে না। টলতে টলতে বাঁ হাত ঘুরিয়ে সেরা কী বলতে চেষ্টা করল আর একবার। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যেন এই প্রথম বকু সর্দারকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট বেঁকিয়ে মুখ-ভরতি থুতু মাটিতে ছিটকে ছিটকে ফেলল সেরা। সরিৎশেখর বুঝলেন, ও এখন হঠাৎ রেগে গেচে। বোধহয় এখন সরিৎশেখর ওর মাথায় নেই। রেগে যাওয়ায় সেরার জরাজীর্ণ মুখ-চোখ আরও কদাকার দেখাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ সেই দৃশ্যটা চোখের মধ্যে চমকে উঠল তার। বকু সর্দার হয়নি। অফিসে পিয়নের চাকরি করে বলে অন্য কুলিদের থেকে মর্যাদা বেশি এই যা। সেরা সম্পর্কে তখন অনেক গল্প জেনে গেছেন। দুএকজন অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজারের বাংলোয় রাতে ওকে দেখা গেছে; যারা একটু লাজুক তারা, সন্ধের পর অন্ধকারে রাস্তায় দাঁড়ানো সেরাকে জিপে তুলে নিয়ে খুঁটিমারী ফরেস্টে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে আসে-এইসব। কিন্তু মাংরার মা যখন ওঁর কাছে কেঁদে পড়ল বাড়িতে এসে তখন ছোটবউ বলেছিল, দূর করে দাও-না মেয়েছেলেটাতে! বিশ্বাস নেই কিছু–।

কী বিশ্বাস নেই সেটা আর জিজ্ঞাসা করেননি তিনি। চা-পাতি তুলতে গিয়ে সারাদিন সেরা গাছের তলায় পা ছড়িয়ে বসে পাতিবাবুর সঙ্গে গল্প করে এ-খবর ছোটবউ-এর কানে এসেছিল। ইঙ্গিতটা যে এবার তার দিকে সেটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। বকুকে ধমক দিয়েছিলেন সেদিনই-কিন্তু চুপচাপ মাথা গুঁজে দাড়িয়ে ছিল মাংরার বাবা। শেষ পর্যন্ত ব্ৰজেনবাবুকে এক শনিবার বলে রেখেছিলেন, সেরা টাকা নিতে এলে যেন ওর সঙ্গে দেখা করে।

সেদিন সন্ধেবেলায় তার অফিস-ঘরে বসে তিনি অবাক হয়ে সেরাকে দেখলেন। কথাটা শুনেই নাকের পাটার পেতলের ফুলটা নেচে উঠল সেবার। কোমরে দুহাত রেখে মুখভর্তি থুতু ছড়িয়েছিল অফিস-ঘরের মেঝেতে। চিৎকার করে বলেছিল, বকুর প্রতি ওর কোনো লাভ নেই। কী জন্য থাকবে–ওটা তো মেড় য়া-না আছে টাকপয়সা, না তাগদ। তা ছাড়া কত বড় বড় রইস আদমি ওর চারপাশে ঘুরঘুর করছে, বন্ধুর মতো তেলাপোকার দিকে নজর দেবার সময় কোথায়? এই এখন, সেরার কোরের হাত রেখে দাঁড়ানো দড়ি-পাকানো চেহারাটা দেখে চট করে সেই ছবিটা মনে পড়ে গেল ওঁর। মেয়েদের এক-একটা ভঙ্গি আছে সময় যাকে কেড়ে নিতে পারে না। বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে এবং সম্পূর্ণ নিজের অজান্তে সেগুলো তাদের শরীরে ফিরে আসে আচমকা। প্রত্যেক মেয়ের মধ্যে অভিমান এত দীর্ঘ সময় ধরে একইভাবে গোপনে গোপনে কী আশ্চর্য সততায় বেঁচে থাকে যা কোনো পুরুষমানুষ লালন করতে পারে না। কবে কোন যৌবনে বকুর প্রতি ওর যে অভিমান ঘৃণা বা অহংকারে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল, এখন এতদিন পরে নেশার চুড়ান্ত মুহূর্তে সেগুলো ফিরে পেল সেরা-পেয়ে বোধহয় আজ সারারাত বুদ হয়ে থাকবে। ভরবিকেলে আচমকা ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয় না এই সবে সকাল হয়েছে।

নিজের মনে হেসে আবার হাঁটতে লাগলেন সরিৎশেখর। পেছনে বকু সর্দার। সেরা তখনও টলছে। ওরা যে চলে যাচ্ছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। সাদা নুড়ি-বিছানো বাগানের পথ দিয়ে ওরা হাঁটতে লাগল। ফ্যাক্টরির আলো ফুরিয়ে যেতেই টর্চ জ্বাললেন তিনি। পাঁচ-ব্যাটারির জোরালো আলো। ঘুটঘুটে অন্ধকার চমকে চমকে সামনের পথটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে। দুপাশে ছোট শুকনো নালার ধারে থরে থরে চা-গাছ। রাস্তাটার বাকে দাড়িয়ে পেছনে তাকালেন উনি। দূরে ঝিম হয়ে থাকা ফ্যাক্টরির হলদে-মেরে-যাওয়া আলোয় ডিসপেনসারি-বাড়িটা আনাড়ি হাতের তোলা ছবির মতো মনে হচ্ছে। আর তার সামনে একা রোগাটে শাড়ি জড়ানো শরীর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলছে। সরিৎশেখর লক্ষ করলেন, বকু পেছন ফিরে দেখল না। মাথা নিচু করে পেছন পেছন আসছে তাঁর। দুপাশের চা-গাছের মধ্যে দিয়ে চলে-যাওয়া অন্ধকার রাস্তায় টর্চ জ্বেলে যেতে-যেতে সরিৎশেখর লক্ষ করলেন, বকু পেছন ফিরে দেখল না। মাথা নিচু করে যেতে-যেতে সরিৎশেখর হঠাৎ এক অদ্ভুত ঘ্রাণ পেলেন। ছোটবউ কবে চলে গেছে। তখন তো তার মধ্যযৌবন। এই এতদিন ধরে তিনি কী ভীষণ একা! আর আশ্চর্য, কথাটা এমন করে কই কখনো মনে পড়েনি তাঁর। এই স্বৰ্গছেঁড়া চা-বাগানে তার শিকড়গুলো কত গভীরে নেমে গেছে-নিজের কথা মনে পড়ার সুযোগই দেয়নি। এখন ছেলেরা বড় হয়ে গিয়েছে। দুটো সরল কথা বলার মতো সম্পর্ক নেই আর। বড় মেয়ে বিধবা হয়ে তার কাছেই আছে। ওঁর দেখাশুনা সেই করে। কিন্তু তাকেও তো সহজ হয়ে কিছু বলতে পারেন না তিনি। এই বয়সে নিজের চারদিকে এত রকমের দেওয়াল নিজেই খাড়া করে রেখেছেন দিনদিন-আজ বর কষ্ট হল সরিৎশেখরের। ভারী পা টেনে টেনে চা-বাগানের রাস্তা ছেড়ে কোয়ার্টারের সামনে মাঠে এলেন উনি। টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে হঠাৎ চেয়ে দেখলেন, এটা ছোট্ট শরীর সারা গায়ে তার টর্চের আলো মেখে দুর্গাঠাকুরের পায়ে ছুঁড়ে দেওয়া অঞ্জলির মতো ছুটে আসছে। হঠাৎ আলো নিবিয়ে ফেললেন এবার। এই ঘন অন্ধকারে দাড়িয়ে তার শরীরে লক্ষ কদম ফুটে আসছে। হঠাৎ আলো নিবিয়ে ফেললেন তার শীত বোধ হল যেন। দুহাত বাড়িয়ে নিজের বিশাল দেহে নরম শরীরটাকে প্রায় লুফে নিয়ে কী গাঢ় মমতায় তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে দাদু?

এখন তাঁর চারপাশে কোনো দেওয়াল নেই। আকাশ হাতের কাছে, বুকের ওপরে।

ক্লাবঘরে মাঝে-মাঝে শোরগোল উঠছে। পটাপট তাস ফেলার শব্দ, এর ওর ভুল বুঝিয়ে দেবার চেষ্টায় কান পাতা দায় ওখানে। যাজাকে পূর্ণ আলো দরজা-জানালা দিয়ে ঠিকরে পড়েছে বাইরের অন্ধকারে। মহীতোষ ওখানে আছেন। তাস-পাগল লোক। ব্রিজ টুর্নামেন্টে আশেপাশের চা-বাগান থেকে অনেক ট্রফি জিতে এনেছেন মালবাবুকে পার্টনার করে। সরিৎশেখরের যৌবনকালে কোনো ক্লাবঘর ছিল না স্বৰ্গছেঁড়ায়। মহীতোষরা খালি-পড়ে-থাকা খড়ের ছাদ দেওয়া ঘরটাকে ক্লাবঘর বানিয়ে নিয়েছেন মেরামত করে। অবশ্য স্বৰ্গছেঁড়া বাজারে এখন বিরাট ক্লাবঘর হয়েছে। টিম্বার মার্টেন্টস আর কন্ট্রাক্টররা এসে আঁকিয়ে বসেছে চা-বাগানের পাশে স্বৰ্গছেঁড়া বাজারে। ওটা খাসমহলের এলাকা। মাঝে-মাঝে মহীতোষরা ঐ ক্লাবে তাস খেলতে যান। শুধু ব্রিজ নয়, পয়সা বাজি রেখে রামি, এমনকি কালীপূজার রাত্রে তিনতাস খেলাও হয়ে থাকে ওখানে। সরিৎশেখর ব্যাপারটা একদম পছন্দ করেন না। ফলে মাঝে-মাঝে ইচ্ছে হলেও রামি বা তিনতাস নিজেদের ক্লাবে খেলেন না মহীতোষরা।

অনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ক্লাবঘরের দিকে একবার তাকাল। বাবার গলা শোনা যাচ্ছে, মালবাবুকে কল ভুল দেবার জন্য বকছেন। এখন যদি অনিকে দেখতে পান, চিৎকার করে উঠবেন, কী চাই এখানে-যাও! অথচ মহীতোযকে বলার দরকার ছিল। সরিৎশেখর অনুমতি দিয়েছেন শুনে মা বলেছেন, বেশ যাও, বাবাকে বলে যেও। আনন্দে লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছে করেছিল কিন্তু বাবাকে বলার ব্যাপারটা ভালো লাগেনি অনির। ক্লাবঘরে যাওয়া নিষেধ ওর। ও আবার ভিতরের ঘরে ফিরে এল। এটা সরিৎশেখরের ঘর। একপাশে খাটে বিছানা সাজানো। লম্বা ইজিচেয়ারে উনি বসে আছে। বিরাট পেটমোটা হারিকেনটা একটা স্ট্যান্ডের ওপর জ্বলছে। সামনে-রাখা টিপয়ের ওপর একটা দাবার বোর্ড।কালো গুটি খুব পছন্দ সরিৎশেখরের। বা হাতের তালুতে মুখ রেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন বোর্ডের দিকে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে খেলা চলতে চলতে ওর প্রতিদ্বন্দী একটু উঠে গেছে। কিন্তু অনি জানে এটা দাদুর অভ্যেস। এই একা একা দাবা খেলা। হোটবাবু মারা যাবার পর থেকে দাদু একাই দাবা খেলেন। আগে ফিস থেকে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে ছোটবাবু চলে আসতেন এখানে। জখাবার খেতে দাদুর সঙ্গে। তারপর দাবাখেলার বোর্ড পাতা হত। প্রায় দাদুর বয়সি মানুষ মাথা জুড়ে টাক, সন্ধের পর আর বাঁধানো দাঁত পরতেন না বলে মুখটা বিশ্রী দেখাত। দাদুর সঙ্গে অনেকদিন এই চা-বাগানে কাটিয়েছিলেন উনি। বলতে গেলে দাদুর বন্ধু বলতে উনিই ছিলেন। খেলতে খেলতে কাশি হত ওর, আর চট করে উঠে-আসা কফ গিলে ফেলে দাদুর দিকে অপরাধীর ভঙ্গিতে তাকাতেন ছোটবাবু। সঙ্গে সঙ্গে ঝের্ড থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে মাথা নাড়তেন সরিৎশেখর, নিজেই নিজের মৃত্যু ডাকছ হে, আমার , শুধু সন্ধের পর এই খেলাটা বন্ধ হবে এই যা। যেদিন ছোৰু মারা গেলেন অনির মনে পড়েছিল ঐ কফগেলার কথাটা। নিশ্চয়ই কক্ষগুলো জমে জমে ছোটবাবুর পেটটা ভরতি হয়ে গিয়েছিল। সেদিন চা-বাগানের লোকজন ছোটবার বাড়িতে ভেঙে পড়েছিল। অনেকদিনের মানুষ। কিন্তু সরিৎশেখর যাননি। অনিদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন হোটবাবুকে কাঁধে করে মহীতোষরা। মা ঘোমটা টেনে এসে বলেছিলেন, উনি তো নেই। তারপর সন্ধে পেয়ে গেলে ছোটবাবুকে নিয়ে ওরা অনেকক্ষণ চলে যাবার পর চোরের মতো বাড়ি ফিরেছিলেন সরিৎশেখর। এক হাতে অনিকে জড়িয়ে ধরে দাবার বোর্ড পাততে পাততে সেই সবে রাত-হওয়া হারিকেনের আলোয় ফিসফিস করে বলেছিলেন, ব্যাটা চলে গেল। বুঝলে!

তুমি এলে না কেন? অনি জিজ্ঞাসা করেছিল।

মাথা-খারাপ! যদি ডাক দেয়, বলে চলো, বিশ্বাস আছে কিছু! গুটি সাজাতে সাজাতে বলরেন সরিৎশেখর। আর হঠাৎ সমস্ত শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল অনির। ঝাড়িকাকু বলেছিল, মানুষ মরে গেলে ভূত হয়।

এখন সরিৎশেখর একা একমনে দাবা খেলছেন। সম্প্রতি দাত বাধিয়েছেন তিনি। বাঁদিকের টেবিলে একটা পেয়ালার জলে ডুবে ওঁর খোলা দাঁত হাসছে। তোবড়ানো গাল দেখতে দেখতে অনির মনের হল ছোটবাবুর সঙ্গে দাদুর মুখের এখন কী ভীষণ মিল! হঠাৎ কী হল, অনি দৌড়ে ভিতরে চলে এল। আর ঠিক তখন দূরে ফ্যাক্টরিতে আটটার ভো বেজে উঠল। ঝাড়িকাকু খবর এনেছিল আটটায় নদী বন্ধ হবে।

রান্নাঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মা বললেন, অনি, হাওয়া দিচ্ছে খুব, চটি পরে গলায় মাফলার জড়িয়ে যাও।

তর সইছিল না অনির!একটু একটু ঠাণ্ডা বাতাস বইছে বটে তবে তার জন্যে মাফলার পরার দরকার হয় না। মায়ের সবতাতেই বাড়াবাড়ি। অবশ্য ওর টনসিলের ধাত আছে একটু, ডাক্তারবাবু ঠাণ্ডা কিছু খেতে নিষেধ করেছেন। তাই বলে এই হাওয়ায় আর কী হবে! এপাশের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ও মায়ের দিকে তাকাল। বারান্দার সিলিং থেকে ঝোলানো শিকে রাখা হারিকেনের আলোয় মাকে কেমন দেখাচ্ছে। লাল শাড়ি পরেছে মা। কাপড়টা যেন সব আলো শুয়ে নিচ্ছে এখন। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অনির বুকের ভিতর কেমন করে উঠল। আস্তে আস্তে ও ভিতরের ঘরে ঢুকে আলনা থেকে মাফলারটা টেনে গলায় জড়িয়ে নিন।

ঝাড়িকাকু একটা খালুই-হাতে উঠোনে দাড়িয়ে ছিল। শীত-ফিত বেশি লাগে না ওর। পূজোর পর থেকে একটা মালোয়নি ফতুয়ার ওপর জড়িয়ে নেয়। এখন যে-কে সেই। তাড়াতাড়ি চল। ঝাড়িকাকু ডাকল।

উঠোনে নেমে এল অনি। পিসিমার গলা পেল ও। নিজের ছোট ঘরে বসে এতক্ষণ পুজো করছিলেন, এইবার গুরুদেব দয়া করে দীনজনে বলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর অনিকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলেন, তাড়াতাড়ি চলে আসিস বাবা, যা পচা শরীর তোর! ঝাড়িটারও খেয়েদের কাজ নেই, ছেলেটাকে নাচাল।

ঝাড়িকাকু কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই অনি নেমে গেছে উঠোনে। ঝাড়িকাকু কী বিড়বিড় করে টর্চের আলো জ্বালাল। ছোট্ট টর্চ। প্রায়ই বিগড়োয়। ফ্যাকাশে আলো পড়েছে মাটিতে। আকাশ মেঘলা বলেই অন্ধকার বেশি লাগছে। এমনকি সামনের গোয়ালঘর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। ওরা হাঁটতে লাগল। একটু ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। অনিকাড়িকাকুর পিছনে যেতে-যেতে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে ওর ফতুয়ার কোণটা চেপে ধরল। এরকম অন্ধকারে এর আগে কোনোদিন হাঁটেনি ও।

গোয়ালঘরের পেছনে লম্বা গাছগুলোর তলা দিয়ে যেতে-যেতে ওরা চিৎকার শুনতে পেল। দ্রুত পা চালাচ্ছিল ঝাড়িকাকু। প্রায় ছুটতে ছুটতে ওরা আঙরাসার পাড়ে এসে দাঁড়াল। আর দাঁড়াতেই একটা লুত দৃশ্য চোখে পড়ল অনির। পুরো নদীটা জুড়ে যতদূর দেখা যায়, সেই ধোপার ঘাট পর্যন্ত, অস্ত্র হারিকেন আর টর্চের আলো জোনাকির মতো নাচছে। আচমকা দেখলে মনে হয় যেন দেওয়ালির রাতটাকে কে উপুড় করে দিয়েছে নদীতে। সমস্ত কুলিলাইন ভেঙে পড়েছে এখানে। আঙরাভাসার দিকে তাকিয়ে কেমন বিশ্রী লাগল অনির। জল এখন পায়ের তলায়। কাপড়কাচা পাথরটা ভেজা মুড়ির ওপর পড়ে আছে। জল মাঝখানে। তাও কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। লাফ দিয়ে নেমে পড়ল ঝাড়িকাকু। একটি বিরাট লম্বা বানমাছ ঠিক সামনেটায় খলবল করছিল। একটা মদেসিয়া মেয়ে মাছটার দিকে এগোবার আগেই ঝাড়িকাকু বা হাতে সেটাকে তুলে খাইতে ঢুকিয়ে নিল। মেয়েটা চিৎকার করে গাল দিয়ে উঠল। হাত বাড়িয়ে ওকে ডাকল ঝাড়িকাকু। অনি ভেজা নুড়ির ওপর সাবধানে হেঁটে এল। পায়ের কাছে একটা পাথরঠোকা মাছ জল না পেয়ে লাফাচ্ছে। দুই-তিনবারের চেষ্টায় ওটাকে ধরে অনি ঝড়িকাকুর খালুইতে ফেলে দিল।

তোর তো রবারের চটি জল লাগলে কিছু হবে না তুই টর্চটা ধর। যেখানে ফেলতে বলব সোজা করে আলো ফেলবি। হাত বাড়িয়ে টর্চটা দিল ঝাড়িকাকু। জল এখন নেমে গেছে পুরোপুরি। শ্যাওলা আর ভাঙা ডালপালা নদীর বুকে ছড়িয়ে আছে এখন। মাঝে-মাঝে কাদা জমেছে। স্রোতের সময় কাদা দেখা যায় না। অজস্র পোকামাকড় উঠছে এখন। এরা সব কোথায় ছিল কে জানে! তিনটি মেয়ে দল । বেঁধে হাতে কুপি জ্বেলে মাছ খুঁজছে। অনি দেখল ওরা খুব হিহি করে হাসছে। আলো পড়ে ওদের কালো শরীর চকচক করছে। কাড়িকাকুকে খেপাচ্ছে ওরা। একটা গর্তের মুখে টর্চ ফেলতে বলল ঝাড়িকাকু। নদীর কিনারে চ্যাপটা পাথরের গা-ঘেঁষে গর্তের মুখে। আলো ফেলে অনি দেবল তিনচারটে মোটা মোটা পা গর্তের মুখে বেরিয়ে আছে। পকেট থেকে একটা শক্ত সুতো বের করে তার ডগায় একটু শ্যাওলা বাঁধলো ঝাড়িকাকু। তারপর টানটান করে সুতো ধরে শ্যাওলাটাকে গর্তের মুখে নাচিয়ে নাচিয়ে ভিতরে ঢোকাবার চেষ্টা করতে লাগল। অনি দেখল চট করে পাগুলো ভিতরে ঢুকে গেল! গর্তের মধ্যে জমা জলে একটু বুদ্বুদ উঠল। আলোটা নিবিয়ে দিল অনি। যাঃ, চলে গেল। কিন্তু ঝাড়িকাকু চাপাগলায় বলল, আঃ, নেলি কেন? আবার আলো জ্বালাল অনি। চাপা নিশ্বাসের শব্দ কানে যেতে অনি দেখল মেয়ে তিনটে পেছনে এসে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে ব্যাপারটা দেখছে। ঝাড়িকাকুও ওদের দেখেছে, কিন্তু এখন তার মনোযোগ গর্তের দিকে। গর্তের মুখটাতে শ্যাওলাটাকে নাচাচ্ছে একমনে। হাত টনটন করতে লাগল অনির। মুখ ঘুরিয়ে ও নদীর চারপাশে তাকাল। আজ রাতে আর নদীতে কোনো মাছ পড়ে থাকবে না। লণ্ঠন কুপি আর টর্চের আলোয় নদীটা পরিস্কার। হঠাৎ তিনটে মেয়ে একসঙ্গে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠতেই অনি চট করে মুখ ফেরাল। ঝাড়িকাকু একগাল হেসে হাতটা মাথার ওপরে তুলে ধরেছে। আর সুতোর শেষে মাটি থেকে ওপরে একটা বিরাট কাঁকড়া খলবল করে ঝুলছে। শেষ পর্যন্ত সেটা সুতো ছেড়ে পাথরের নুড়ির ওপর পড়তেই ঝাড়িকাকু খাইটা ওর ওপর চেপে ধরল। তারপর অতি সন্তর্পণে খালুই-এর তলা দিয়ে বেরিয়ে আসা মোটা দাড় দুটো ধরে কাঁকড়াটাকে বের করে আনল। টর্চের আলোয় কুচকুচে কালো কাঁকড়াটাকে মুদৃষ্টিতে দেখল অনি। অত বড় কাঁকড়া এর আগে কখনো দেখেনি সে। দুটো গোল গোল চোখ ঘুরিয়ে অনিকে দেখছে ওটা। খালুই-এর ভিতরে টপ করে ফেলে দিল ঝাড়িকাকু। কাঁকড়াটাকে ফেলে দিয়ে সেই হাতে পাশে দাঁড়ানো তিনটে মেয়ের একটার চিবুকে টোকা দিয়ে দিল। টর্চের আলোটা সম্মোহিতের মতো ঘুরিয়েছিল অনি। ফ্যাকাশে আলোটা মেয়েটির মুখে পড়তেই ও দেখল কেমন থতমত হয়ে গেল মেয়েটি। সঙ্গীরা খিলখিল করে হেসে উঠতেই ও লাজুক লাজুক মুখ করে মাথা নামাল।

 

আধঘন্টার মধ্যেই খাই ভরতি হয়ে গেল। বান, কাঁকড়া, পাথরঠোকা, চিংড়ি আর পেটমোটা পুঁটি এরকম কত মাছ। ঝাড়িকাকু বলল, তুই এখানে দাঁড়া, আমি মাছগুলো বাড়িতে রেখে আসি। হঠাৎ অনির কেমন ভয়-ভয় করতে লাগল। এই অন্ধকারে যদিও নদীতে প্রচুর মদেসিয়া আলো জ্বেলে ঘুরছে, তবু ওর শরীর শিরশির করতে লাগল। আবছা আলো-অন্ধকারে মানুষগুলোর মুখ স্পষ্ট করে চেনা যাচ্ছে না, কেমন রহস্যময় দেখাচ্ছে চারপাশ। ওরা ওদের ঘাটে কাপড়কাচা পাথরটার ওপর ফিরে এল। অনির পায়ের গোড়ালি অবধি কাধা মাখা, রবারের চটি চপচপ কমছে। ঝাড়িকাকুর ফতুয়া ধরে ও পাড়ের দিকে তাকাল। ফুলগাছ ডুমুরগাছ আর বুনো ফুলের গাছগুলোর মধ্যে চুপচাপ যেঅন্ধকার জমে আছে সেদিকে চেয়ে ওর বুকের মধ্যে তিরতির করে উঠল। হঠাৎ একটা লম্বা মর্তি সেই অন্ধকার জমে আছে সেদিকে চেয়ে ওর বুকের মধ্যে তিরতির করে উঠল। হঠাৎ একটা সশ্ব মৃতি সেই অন্ধকারে চলে গেল, পেছন পেছন আর-একজন শাড়ি-পরা। মুখ দেখতে পেল না ও। মূর্তি সেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। কারা ওরা? এটা তো ওদের দিকের পাড়। মদেসিয়ারা এখন নিশ্চয়ই এদিকে আসবে না। ফিসফিস করে ও বলল-কাড়িকাকু মুখ ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাল ঝাড়িকাকু। কাঁচাপাকা সাতদিন না-কমানো দাড়ি, হাফপ্যান্ট আর ফতুয়া পরা বেঁটেখাটো এই মানুষটাকে অনির এখন খুব আপন মনে হচ্ছিল। এক হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে ঝাড়িকাকু বলল, কী হয়েছে?

ওরা কারা? ফিসফিস করে বলল অনি। ভালো করে অন্ধকারে চোখ বুলিয়েও কিছু ঠাওর করতে পারল না ঝাড়িকাকু। অনির হাত থেকে টর্চ নিয়ে অন্ধকারে আলো ফেলল ও। ফ্যাকাশে আলো দূরে গেল না।

কী দেখছিস? ঝাড়িকাকু জিজ্ঞাসা করল।

একজন, তারপর আর-একজন। কারো মাথা নেই। অনি প্রায় কেঁদে ফেলে আর কি।

ও কিছু না, কাড়িকাকু মাথা নাড়ল, রামনাম বল। ওরা হলে চলে যাবেন। মাছ বড় ভালোবাসেন তো।.বলতে বলতে খালুইসুদ্ধ হাত জোড়া করে নমস্কার করল। অনি মনে মনে রাম রাম বলতে শুরু করে দিল এবার। এখানে এই নদীতে এত লোক, তবু সাহস হচ্ছে না কেন?

ঠাণ্ডা বাতাস যা এতক্ষণ বইছিল এলোমেলো, হঠাৎ গাছের পাতা নাচিয়ে দিল এবার।–ঘুমুতে-পারা পাখিগুলো নির্জন নদীতীরে হঠাৎ-আসা একদল মানুষের চিৎকারে কিচিমিচির করছিল এতক্ষণ, ডালপালা নড়ে উঠতেই ডানা ঝাপটাতে লাগল। হিমবাতাস নদীর মধ্যে নেমে একটা শোশে শব্দ তুলে চিরুনির মতো গাছপালার ফাক গলে কোথায় উধাও হয়ে যাচ্ছিল। পুলওভার থাকা সত্ত্বেও অনির শীতবোধ হল।

ঝাড়িকাকু বলল, ডাক্তারবাবুর ছেলে হরিশ বড় মাছ খেতে ভালোবাসত। ঝাড়িকাকুর মুখর দিকে তাকাল অনি। অন্ধকার কালির মতো লেপটে আছে। ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। ডাক্তারবাবুকে অনি ভালো করেই চেনে। ডাক্তারবাবু আর দিদিমা, ওদের বাড়িতে কোনো ছেলেমেয়ে নেই। তা হলে কার কথা বলছে ঝাড়িকাকু! কে হরিশ! এই নামের কাউকে চেনে না তো ও!

হরিশ কে আমি দেখিনি তো! অনি বলল।

তুই দেখবি কী করে? হাসল ঝাড়িকাকু, তুই তো এই সেদিন হলি। তোর বাবার চেয়ে বছর তিনের ছোট ছিল হরিশ। সেই যেবার ডুডুয়া নদীতে যখন খুব জল বেড়ে গেল, রাস্তার ওপর জল উঠে বাস বন্ধ হল, সেবার এই কুলগাছের মাথা থেকে ধুপ করে পড়ে গেল ছোঁড়াটা। খুব ডানৰ্পিটে ছিল তো! আমি তখন এই ঘাটে বসে বাসন মাজছি। কাজ শেষ করে বাসন মাজতে তিনটে চারটে বেজে যেত। ভরদুপুরবেলা বাসন মাজছি বসে, হঠাৎ হরিশ এল। গাছটায় কুল হত তখন, পাতা যেখা। যেত না। তা হরিশ তলার ডালের ফুলগুলো শেষ করে দিয়েছিল পাকার আগেই। হরিশ লাফ দিয়ে তরতর করে মগডালে চলে গিয়ে হাত বাড়িয়ে ল ছিড়ে অর্ধেক খেয়ে আমাকে ঢিল মারছিল। ডাক্তারবাবুর ছেলে আমি কী বলব বল। ঐ মগডালে বসে বসে ও আমাকে বলল, ভুডুয়াতে জল কমে গেলে বানমাছ মারতে গেলে কেমন হয়? বানমাছ ধরার বঁড়শি আমার কাছে ছিল হরিশ জানত। কর্তাবাবু কত রকমের সুতো আর বঁড়শি শহর থেকে পোষ্ট অফিস দিয়ে আনাতেন। আমি দুটো বঁড়শি চেয়ে নিয়েছিলাম। মুশকিল হত বানমাছ বড়দি রান্না করতে চাইত না কিছুতেই। ধরলে খাব কী করে? হরিশের মা রান্না করে ভালো। বড়দি বলত, ঢাকার মেয়ে তো, তাই পারে। আমি একদনি খেয়েছিলাম, বড় ঝাল! তা আমি বললাম, বউদি যদি যেতে দেয় যাব। কথাটা বলে ফোস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে অন্ধকারে দাঁড়ানো কুলগাছটার দিকে তাকাল ঝাড়িকাকু।

পিসিমাকে বড়দি ঝাড়িকাকু। বাবা ছোটকাকরাও বড়দি বলে। এই সেদিন আগে পর্যন্ত শুনে শুনে অনিও বলত বড়দিপিসি। তখন কি ছোট ঠাকুমা ছিল না? না সেই কুমড়ো নিয়ে দেশের বাড়িতে গিয়েছিল বলে মরে গিয়েছিল। মা তখন ছিল না এটা বুঝতে পারছে অনি। পিসিমা বলেন, বিশ বছর বয়সে বাবার বিয়ে হয়েছিল। বাবা যখন কুল খেত তখন নিশ্চয় ছোট ছিল। অনি বলল, তারপর?

কথা বলার সময় ঝাড়িকাকুর একটা পিতনে বাধানো দাত দেখতে পাওয়া যায়। রোজ ই দিয়ে দাঁত মাজে বলে চকচক করে। বাড়িকাকু বলল, বাসন মাজতে মাজতে হঠাৎ শুনতে পেলাম বুকফাটা চিল্কার। চমকে উঠে দাড়িয়ে দেখি হরিশ পড়ে যাচ্ছে। অত উঁচু ডাল ভেঙে পড়ে যাচ্ছে হরিশ, আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম। পড়ে গিয়ে কেমন দলা পাকিয়ে গেল ও। আমি চিৎকার করে সবাইকে ডেকে আনলাম। ডাভারবার দুপুরে খেতে এসেছিলেন। চিৎকার শুনে ছুটে এলেন। সাহেবের গাড়ি করে, জলপাইগুড়ি নিয়ে গেল যদি বাঁচানো যায়, পাগলের মতো সবাই ছুটল ওকে নিয়ে। ভুডুয়ার জল বেড়েছে সকাল থেকে রাস্তার ওপরে জল, এত জল আগে কখনো হয়নি। সন্ধেবেলা মড়া নিয়ে ফিরে এল ওরা, যেতে পারেনি। তা হরিশ চলে যাবার তিনদিন পরই ঘটে গেল ব্যাপারটা। তখন কর্তাবাবু লোক দিয়ে এই ঘাটে খড়ের ছাউনি করে দিয়েছিলেন। বৃষ্টিবাদলায় ভিজতে হবে না বলে। সেদিন রাত্তিরে খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে বাসনগুলো নিয়ে এসেছিলাম মেজে ফেলতে। চাঁদের রাত হলে রাত্রেই বাসন মাজতাম। রাত হয়ে গেলে নদীতে কেউ আসে না। কিন্তু আমার ভয়টয় করত না। বাসন মাজা হয়ে গেলে উঠে দাঁড়িয়েছি, হঠাৎ শুনি মাথার উপর খড়ের চালে মচমচ শব্দ হচ্ছে। এঘাটের ওপর তো কোনো গাছপালা নেই, ব্যাপারটা কী দেখবার জন্য মুখ বাড়িয়েছে তো আমার শরীর ঠাণ্ডা। হরিশ বাঁশের চালায় পা ঝুলিয়ে বসে হাসছে। আমায় দেখে বলল, কী মাছের কাঁটা ফেললি রে নদীতে, কালবোস? আমায় দিবি? কেমন খোনা-খোনা শব্দ। কিন্তু একদম হরিশ। আমি একছুটে বাড়ি এসে বড়দিকে বললাম। বাসন-টাসন সব রইল নদীর পাড়ে। বড়দি তক্ষুনি এক প্লেট ভাজা মাছ আমাকে দিয়ে বলল ঘাটে রেখে আসতে। আমি রাম রাম বলতে বলতে মাছ নিয়ে আবার এসে এখানে রেখে দৌড়ে ফিলে গেলাম। বাসন নেবার কথা মনে নেই। আর চালার দিকেও তাকাইনি। পরদিন সকালে দেখি বাসনগুলো তেমনই আছে, প্লেটটাও, শুধু মাছগুলো নেই। তারপর থেকে যদ্দিন ডাক্তারবাবু পিণ্ডি দেননি ততদিন ওর মা ওর জন্যে এক প্লেট মাছ নদীর ধারে রেখে যেত। আমি অবশ্য আর সন্ধের পর এখানে আসিনি। অনেকে জড়িয়ে ধরে টর্চ জ্বেলে হাঁটতে লাগল ঝাড়িকাকু, নে চল।।

এতক্ষণ হাওয়া দিচ্ছিল, এখন টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা পড়ল। তাড়াতাড়ি পা চালা। ঝাড়িকাকু বেশ দ্রুত হাঁটছিল। দুপাশে অন্ধকার রেখে ফ্যাকাশে আলোর বৃত্তে পা ফেলে ওরা এগিয়ে আসছিল। এখন চারপাশে শুধু বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছু নেই। অবশ্য ঝাড়িকাকুর হাতে খাইতে বড় কাঁকড়াটা ভীষণ শব্দ করছে। ওরা গোয়ালঘরের পাশ দিয়ে আসতে হঠাৎ কালীগাই-এর গম্ভীর গলার ডাক নতে পেল। যেন পরিচিত কেউ যাচ্ছে বুঝতে পেরেছে ও। জিভ দিয়ে একটা শব্দ করে সাড়া দিল কাড়িকাকু। অনির মনে হচ্ছিল, এখন যে-কোনো মুহূর্তেই হরিশ ওদের সামনে এসে হাত বাড়িয়ে মাছ চাইতে পারে। আর ঠিক তখনি অন্ধকারে একটা আকন্দগাছের পাশে দুটো মূর্তিকে নড়ে উঠতে দেখে অনি দুহাতে শাড়িকাকুকে জড়িয়ে ধরল। ঝাড়িকাকুও দেখতে পেয়েছিল ওদের। খানিকক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থেকে মাথা দোলাল একবার। তারপর অনির হাত ধরে সোজা হেঁটে খিড়কিদরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে বলল, তোর যা ভয়, ও তো প্রিয়। চমকে গেল অনি। প্রিয়? মানে কাক কাকু এত রাত্রে ঐ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কী করছে? সঙ্গে শাড়ি-পরা মেয়েটা কে? চট করে নদীর পাড়ে দেখা দুটো মূর্তির কথা মনে পড়ে গেল ওর। অন্ধকারে মনে হয়েছিল যাদের মাথা নেই। তাহলে ঝাড়িকাকু আর একটা মেয়ে নদীর পাড়ে গিয়েছিল মাছধরা দেখতে মেয়েটা কে জানতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল অনির।

উঠোনে ওদের দেকেই মা আর পিসিমা একসঙ্গে বকাঝকা শুরু করলেন। পিসিমা বকছিলেন ঝাড়িকাকুকে, কেন এতক্ষণ ও অনিকে নিয়ে নদীতে ছিল, আর মা অনিকে। অনি যখন টিউবওয়েলের জলে পা ধুচ্ছে ঠিক তখন নদীর মধ্যে প্রচণ্ড শোরগোল হচ্ছে শুনতে পেল। কারা ভয় পেয়ে উত্তেজনায় চিৎকার করছে। একবার ফিরে তাকিয়ে ঝাড়িকাকু আবার ছুটে গেল অন্ধকারে টর্চ জ্বেলে। কী হয়েছে জানতে ওরা উঠোনে এসে দাঁড়াল। উঠোনের এখানটায় অন্ধকার তেন নেই। শিকে টাঙানো হারিকেনের আলো অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ঝাড়িকাকু চলে যেতে ওরা দেখল তিনচারটে লণ্ঠন গোয়ালঘরের পিছনদিকে ছুটে ডাক্তারবাবুরকোয়ার্টারের দিকে চলে গেল।

এমন সময় প্রিয়তোষ খিড়িকিদরজা খুলে ভিতরে এল। পিসিমা জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে রে?

কী জানি! প্রিয়তোষ হাঁটতে হাঁটতে বলল।

তুই কোথায় ছিলি? পিসিমা আবার জিজ্ঞাসা করলেন।

চটপট পা চালিয়ে কাকু ততক্ষণে ভিতরে চলে গিয়েছে। অনি দেখল থমথমে-মুখে পিসিমা মায়ের দিকে তাকালেন। মা চোখাচোখি হতেই মুখ নামিয়ে নিলেন। পিসিমা মনে মনে বিড় বিড় করে বললেন, বড় বেড়ে যাচ্ছে, বাবা ওনলে রক্তে রাখবে না।

একটু বাদেই ঝাড়িকাকু ফিরে এল হাঁপাতে হাঁপাতে। ওর কাছে শোনা গেল ব্যাপারটা। মাছ ধরার নেশায় সবাই নেমে পড়েছে নদীতে। তা ঐ লাইনের বংশী, বয়স হয়েছে বলে চোখে ভালো করে দেখে না, পা দিয়ে দিয়ে কাদা সরিয়ে পাকাল মাছ খুঁজছিল। কয়েকটা মাছ ধরে নেশাটা বেশ জমে গিয়েছিল ওর। হাড়িয়া খেয়েছে আজ সন্ধে থেকে। হঠাৎ একটা লম্বা মোটা জিনিসকে চলতে দেকে মাছ ভেবে কোমরে হাত দিতেই ঘুরে দাঁড়িয়ে সেটা ছোবল মেরেছে হাতে। নেশার ঘোরে ওর কোমর ছাড়েনি বংশী। সাপটা দু-তিনটে ছোবল মারার পর খেয়াল হতেই চিৎকার করে কেঁদে উঠছে। ততক্ষণে সাপটা অন্ধকারে লুকিয়ে পড়েছে ছাড়া পেয়ে। এখন কেউ বলছে সাপটা নিশ্চয়ই জলটোড়া, বিষফিষ নেই। কেউ বলছে, ছোবল মেরেছে যখন তখন নিশ্চয়ই গোখরো। বংশী বলছে, সাপটার রঙ ছিল কুচকুচে কালো। তা নেশার চোখ বলে কথাটা কেউ ধরছে না। হাতে দু-তিনটে দড়ি বাধা হয়ে গেছে। হাঁটতে পারছে না বংশী। ডাক্তারবাবুকে আনতে লোক গেছে কোয়ার্টারে।

ব্যাপারটা শুনে পিসিমা বললেন, জয়গুরু। বলে অনির চিবুকে হাত দিয়ে চুমু খেয়ে নিলেন, তখন বলেছিলেন নদীতে নিয়ে যাস না ঝাড়ি, যদি এই ছেলের কিছু হত-তুমি কালই সোয়া পাঁচআনার পুজো দিয়ে দিও মাধুরী।

এমন সময় জুতোর আওয়াজ উঠল ভিতরের ঘরে। ঝাড়িকাকু সুড় করে রান্নাঘরে চলে গেল। মা হাত বাড়িয়ে মাথার ঘোমটা টেনে দিলেন। সরিৎশেখর এসে বারান্দায় দাঁড়ালেন। বাড়িতে বিদ্যাসাগরি চটি পরেন, আওয়াজ হয়। অনিকে বললেন, হ্যা রে, ভবানী মাস্টার এসেছিল একটু আগে, কাল তোর স্কুলে পরীক্ষা?

পিসিমা বললেন, ও তো আর ওই স্কুলে পড়ছে না, পরীক্ষা দিয়ে কী হবে?

সরিৎশেখর বললেন, তা হোক, কাল পরীক্ষা দিতে যাবে ও। বলে আর দাঁড়ালেন না।

এই সময় কান্নার রোল উঠল নদীর ধারে। অনিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে পিসিমা বললেন, কালই পাঁচসিকের পুজো দিও মাধুরী।।

শেষ পর্যন্ত রাত্রিবেলায় বৃষ্টি নামল।

খানিক আগেই ওদের খাওয়াদাওয়া হয়ে গিয়েছে। দাদুর সঙ্গে বসে খাওয়া অনির অভ্যেস। খেতে খেতে দাদু বলেছিলেন, আজ ঢালবে, তোমরা তাড়াতাড়ি কাজকর্ম চুকিয়ে নাও। দাদুর খাওয়ার সময় হাতপাখা নিয়ে পিসিমা সামনে বসে থাকেন। গরমকালে তো বটেই, শীতকালেও এরকমটা দেখেছে অনি। হাতপাখা ছাড়া দাদুর খাওয়ার সময় পিসিমার বসা মানায় না। কাজ-করা উঁচু চওড়া পিড়িতে বসে সরিৎশেখর খান, পাশেই ছোট মাপের পিড়িতে অনি। আজ বাইরের হাওয়ার জন্য জানালা-দরজা বন্ধ। কাচের জানালা দিয়ে হঠাৎ চমকানো গিতের আলো ঘরে এল। মা মাথায় ঘোমটা দিয়ে খাবার দিচ্ছিলেন।

পিসিমা বললেন, বংশীটা মরে গেল।

আমসত্ত্ব দুধে মাখতে মাখতে সরিৎশেখর বলরেন, দুধটা আজ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে-কতবার বলেছি ঠাণ্ডা দুধ দেবে না।

মা তাড়াতাড়ি একবাটি গরম দুধ নিয়ে এসে বললেন, একটু ঢেলে দেব বউদি?

পিসিমা বললেন, দাও।

সরিৎশেখর বিরাট জামবাটিটা এগিয়ে দিয়ে খানিকটা দুধ নিলেন, নিয়ে বললেন, কে বংশী?

লাইনের বংশী। আগে জল এনে দিত আমাদের।

কি হয়েছিল?

মাছ ধরতে গিয়ে লতায় কেটেছে।

কথাটা শুনে সরিৎশেখর চট করে অনির দিকে তাকালেন, তারপর জানালা দিয়ে বাইরের দিকে। বাইরে তখন ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আলোয় আলোয় ঝলসে যাচ্ছে গাছপালা। সেইদকে চোখ রেখে সরিৎশেখর বললেন, বড় ভালো মাংস কাটত লোকটা, এক কোপে মাথা নামিয়ে দিত।

কথাটা শুনে চট করে একটা কথা মনে পড়ে গেল অনির। সরিৎশেখর আজকাল আর মাংস খান । বাড়িতে মাংস এলে আলাদা রান্না হয়। একদিন পিসিমা দাদুর মাংস খাওয়ার গল্প করছিলেন। যৌবনে তিন সের মাংস একাই খেতেন উনি। মা বলেছিলেন, তিন সের?

পিসিমা হাত নেড়ে বলেছেন, হবে না কেন? নদীর ধারে গাছে ঝুলিয়ে বংশী পাঁঠা কাটাত। তারপর সেই মাংসের অর্ধেক বাড়িতে রেখে বাকিটা অন্য বাবুদের বাড়ি বাবা দিয়ে দিতেন। আমাদের বাড়িতে খাওয়ার লোক তেমন ছিল না। মহী ছুটিতে বাড়ি এলে ওকে ধরলে চার পাঁচজন। বাবাই অর্ধেক খেতেন।

মা হেসে বললেন, একটা অর্ধেক পাঁঠার মাংস কী করে তিন সের হয় বউদি?

অনিও হেসে বলল । পিসিমা নাকি হিসেব পারে না-দাদু বলেন। সেই বাবা মাংস ছেড়ে দিলেন একদিন, পিসিমা বললেন, ভীষণ পাষাণ লোক ছিলেন বাবা। এখন কী দেখছিস, একদিন এমন জোরে বকেছিলেন যে ঝাড়ি প্যান্টে হিসি করে ফেলেছিল। গমগম করত গলা। তখন শাকবার ক্ষেতে অন্য লোকের গরু-ছাগল ঢুকলে বাবা রেগে কাই হয়ে যেতেন। পাঠা নিয়ে বাবা সেটার কানের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন। যন্ত্রণায় মরে যেত জীবটা। তখন যার পাঠা তাকে বলা হত দোষ করেছে তাই শাস্তি দিয়েছি। বাবাকে ভয় পেত সবাই, কিছু বলত না। বংশী এসে সেই পঁঠার মাংস কেটে বাড়ি-বাড়ি দিয়ে আসত। যার পাঠা তার বাড়িও বাদ যেত না। শেষ পর্যন্ত আমি আর সরষে দিতাম না, পাপের ভাগী হবে কে? এর মধ্যে হয়েছে কী, বাগানে কে এক সন্ন্যাসী এসেছে, বাবা দেখতে গিয়ে নমস্কার করলেন। সন্ন্যাসী মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, তোর তো বহুদিন প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে দেখছি!

বাবা বললেন, কেন, কী জন্যে?

সন্ন্যাসী হাত নেড়ে বলেছিলেন, তোর গায়ে খুনির গন্ধ।

চুপ করে ফিরে এসেছিলেন বাবা। আর ছাগল ধরতেন না, মাংস খাওয়া ছেড়ে দিলেন শেষ পর্যন্ত। তাও ছাড়া কী-একদিন খেতে বসেছেন, মাংস দেওয়া হয়েছে। একটু মুখে দিয়েই টান দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন। চিৎকার করে বললেন, মাংস বেঁধেছে না বোষ্টমি করেছে! না হয়েছে নুন না ঝাল। আর আমাকে মাংস দেবার কষ্ট তোদের করতে হবে না। আমি তো ভয়েভয়ে মহীকে বললাম, খেয়ে দ্যাখ তো! মহী বলল, কই, খারাপ হয়নি তো। আসলে একটা বাহানা দরকার তো, সন্ন্যাসীর কথায় ছেড়ে দিলে লোকে বলবে কী।

এখন দাদুর শরীরের দিকে তাকালে অনির মনেই হই না এসব হতে পারে। একমাথা পাকা চুল, ঠোটের দুপাশে ঝুলে-থাকা সাদা গোঁফ, বিরাট বুকে মেদ কিছুটা ঝুলে পড়েছে, বাঁ হাতে সোনার তাগা আর হাঁটু অবধি ধুতিপরা এই লম্বাচওড়া মানুষটাকে অনির বড় ভালো লাগে। দাদুর সঙ্গে রোজ শোয় ও। ছেলেবেলা থেকেই। আর শুয়ে শুয়ে যত গল্প। পিসিমা বলেন, শুয়ে শুয়ে ও পুটুস পুটুস করে বাবাকে সব লাগায়। আসলে দাদু যখন রোজ জিজ্ঞাসা করেন, আজ কী < বল তখন কোন কথাটা বাদ দেবে বুঝতে না পেরে সব বলে ফেলে অনি।

আজ রাত্রে দাদুর ঘর থেকে নিজের বালিশ নিয়ে এল ও, তারপর সোজা মায়ের বিছানায় শুয়ে পড়ল। মহীতোষ খানিক আগে ক্লাব বন্ধ করে ফিরেছেন। রোজ দশটা অবধি ক্লাব চলে, আজ বৃষ্টির জন্য একটু আগেই ভেঙে গেছে ; শুয়ে শুয়ে অনি দাদুর গলা শুনতে পেল, ওকেই ডাকছেন। উঠে এল ও, দরজায় দাড়িয়ে আস্তে আস্তে বলল, আমি মায়ের কাছে শোব। বিছানায় বাবু হয়ে বসে সরিৎশেখর ওকে দেখলেন, তারপর হেসে ঘাড় নাড়লেন। আর এই সময় ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে গেল। বাড়ির টিনের ছাদে যেন অজস্র পাথর পড়ছে, কানে তালা লেগে যাবার যোগাড়। অনি একছুটে মায়ের ঘরে ফিরে এল। বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ চেপে ও বৃষ্টির শব্দ শুনতে লাগল। মাঝে-মাঝে শব্দ করে বাজ পড়ছে। মাথার পাশে কাচের জানলা দিয়ে বিদ্যুতের হঠাৎ-জাগা আলোয় পাশের সবজিক্ষেত সাদা হয়ে যাচ্ছে, সেই এক পলকের আলোয় বৃষ্টির ধারাগুলো কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। সবজিক্ষেতের মধ্যে বড় পেঁপেগাছটা হিড়িম্ব রাক্ষসীর মতো হাত-পা নাড়ছে হাওয়ার ঝাপটে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল অনি। তারপর তখন কেমন করে জলের শব্দ শুনতে শুনতে ও ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতে পারেনি।

মহীতোষ গলা শুনতে পেয়ে ও থতমত খেয়ে গিয়েছিল। মাধুরী ওকে ভালো করে শুইয়ে দিচ্ছিলেন বলে ঘুমটা ভেঙে গেল। ওর মনে পড়লও আজ মায়ের ঘরে শুয়ে আছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে সমান তালে। চোখ একটু খুলে অনি দেখল ঘরের কোণায় রাখা হারিকেনের আলো কমিয়ে দেওয়া, হয়েছে। পাশে-শোয়া মায়ের শরীর থেকে কী মিষ্টি গন্ধ আসছে, অনির খুব ইচ্ছে হচ্ছিল মাকে জড়িয়ে ধরে। ঠিক এমন সময় মহীতোষ হঠাৎ বললেন, ও আজ এখানে শুয়েছে যে!

মাধুরী হাসলেন, কিছু বললেন না।

কী ব্যাপার? মহীতোষ আবার জিজ্ঞাসা করলেন।

বোধহয় মন-কেমন করছে! মাধুরী বললেন।

অনির বুক দুরুদুরু করতে লাগল। এখন যদি মহীতোষ ওকে তুলে দাদুর ঘরে পাঠিয়ে দেন, তা হলে–বাবাকে বিচ্ছিরি লোক বলে মনে হতে লাগল অনির। ওর ইচ্ছে হল মাকে আঁকড়ে ধরে।

ঘুমিয়েছে। মহীতোষের চাপা গলা শুনতে পেল অনি। সঙ্গে সঙ্গে ও চোখ বন্ধ করে ফেলল। মড়ার মতো পড়ে থাকল অনি। ও অনুভব করল বুকের ওপর মায়ের একটা হাত এসে পড়ল। তারপর হাতটা ক্রমশ ওর চিবুক, গাল, চোখের ওপর দিয়ে আলতো করে বুলিয়ে গেল। মা বললেন, হুঁ।

বউদি চলে গেলে তোমার অসুবিধে হবে? মহীতোষ বললেন।

হুঁ, এতদিনের অভ্যেস। বাড়িটা ফাঁকা হয়ে যাবে। অনি না গেলে কী আর হত। পরে গেলেও পারত। একটু বিষণ্ণ গলা মাধুরীর।

না, এখনই যাক। জলপাইগুড়িতে ভালো স্কুল আছে, নিচু ক্লাস থেকে ভরতি হলে ভিতটা ভালো হবে। আমি ভাবছি, অনি হবার সময় বড়দিই তো সব করেছিল, এবার কী হবে! একটু চিন্তিত গলা মহীতোষের, তুমি কি বড়দিকে বলেছ?

দেরি আছে তো। এই শোননা, তোমার ছোট ভাই-এর বোধহয় কিছু গোলমাল হচ্ছে। মাধুরী বেশ মজা-করে বললেন।

কী হল আবার একটু নিস্পৃহ গলা মহীতোষের।

তুমি বাবাকে বলবে না তো?

ব্যাপারটা কী?

বড়দি আজ খুব রেগে গিয়েছিল। ঝাড়িকে জিজ্ঞাসা করেছিল বড়দি। প্রিয় নদীর ঘাটে যায়নি জল বন্ধ হবার পর। অথচ ও অন্ধকারে জঙ্গলে ছিল। ঝাড়ি বলেছে, ওর সঙ্গে একটা শাড়ি পরা মেয়ে ছিল। বোঝো!

শাড়ি-পরা মেয়ে? কী যা-তা বলছ! মহীতোষ প্রায় উঠে বসলেন।

আঃ, আস্তে কথা বলো। গুদামবাবুর মেয়ে তপু।

ও কুচবিহারে চলে যায়নি?

না।

এইভাবে ছেলেদের মাথা খাবে নাকি?

তা তোমার ভাইটি যদি মাথা বাড়িয়ে দেয়, ওর দোষ কী?

বাবা শুনলে বাড়ি থেকে দূর করে দেবেন ওকে।

তুমি কিছু বোললা না। যার যা ইচ্ছে করুক, আমাদের কী দরকার? গুদামবাবু শুনেছি মেয়ের বিয়ের চেষ্টা করছে, হলে ভালো।

তুমি তো বলে খালাস, বাবা চলে গেলে প্রিয় এখানেই থাকবে, তখন সামলাবে কে? আমার এসব ভালো লাগে না। আসলে মেয়েটাই খারাপ, মালবাবু বলছিল কুচবিহারে ও নাকি কী গোলমাল করেছে একটা ছোড়ার সঙ্গে। মালবাবুর বড় শালী কুচবিহারে থাকে-তা সে-ই বলেছে। আমি প্রিয়কে বুলব সাবধান হতে।

না, তুমি কিছু বলবে না। যা করার বড়দিই করবে।

কিছুক্ষণ অনি আর কিছু শুনতে পেল না। ও তপুপিসির মুখটা মনে করল। খুব সুন্দর দেখতে তপুপিসি, গায়ের রঙ কী ফরসা! আজ নদীর ধারে আকন্দগাছের পাশে তা হলে তপূপিসিই ছিল? ও বুঝতে পারছিল কাকু আর তপুপিসি নিশ্চয়ই খারাপ কিছু করছে, যেটা মহীতোষ পছন্দ করছেন না, দাদু শুনলে রেগে যাবেন। কী সেটা? কাকুকে ভালো লাগে না ওর। টানতে টানতে ওর কান কাকু লম্বা করে দিয়েছে। বাঁ কানটা। আয়নায় ছোট-বড় দেখায় দুটো।

আমি তা হলে ঘুমোলাম। মহীতোষের গলা পেল অনি।

হুঁ। বলে মাধুরী অনির দিকে ফিরে শুলেন। শুয়ে এক হাতে অনির গলা জড়িয়ে ধরলেন। একটু বাদেই মহীতোষের নাম ডাকতে শুরু করল। অনির গলার কাছে মায়ের হাতের বালার মুখটা একটু চেপে বসেছিল। ধার আছে মুখটায়। ওর চিনচিন করছিল গলার কাছটা। কিন্তু তবু সিটিয়ে শুয়ে থাকল অনি। চোখ বন্ধ করে ও মাথার ওপর টিনের ছাদে পড়া বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে মায়ের শরীর থেকে আসা মা-মা গন্ধটার মধ্যে সাঁতার কাটতে লাগল চোরের মতো। গলার ব্যথাটা কখন হারিয়ে গেল একসময় টের পেল না অনি।

পাতাবাহার গাছগুলো সার দিয়ে রাস্তার দুপাশে লাগানো, রাস্তাটা ওদের বাড়ি থেকে সোজা উঠে এসে আসাম রোডে পড়েছে। অনি দেখল বাপী আর বিশু বইপত্তর-হাতে ওর জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ওদের স্কুলে কোনো ইউনিফর্ম নেই। তবু মহীতোষ ওর জন্য সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট করে দিয়েছেন, অনি তা-ই পরে স্কুলে যায়। ওর স্কুলের অন্য ছেলেমেয়েরা যে যেমন খুশি পরে আসে। জুতো পরার চল ওদের মধ্যে নেই, অন্তত স্কুলে জুতো পরে কেউ আসে না। অনি চটি পরে যায়। মা আর পিসিমা বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন। সরিৎশেখর আর মহীতোষ অফিসে চলে গেছেন সকালে। একটু বাদেই জলখাবার খেতে আসার সময়। সরিৎশেখর আসেন না, বকু সর্দার এসে ওঁর খাবার নিয়ে যায়। বাড়ি থেকে বেরুবার আগে পিসিমা ঠাকুরঘরে ওকে নিয়ে গিয়ে প্রণাম করিয়েছেন। তারপর পুজোর বেলপাতা ওর বুকপকেটে ভালো করে রেখে দিয়েছেন। অনি আজ জীবনের প্রথম পরীক্ষা দেবে। সকালে কাকু পরীক্ষার কথা শুনে বলেছে, যত বুজরুকি ভবানী মাস্টারের!

আজ সকাল থেকেই কেমন পরিষ্কার সোনালি রোদ উঠেছে। গাছের পাতা এমনকি ঘাসগুলো অবধি নতুন নতুন দেখাচ্ছে। ওরা আসাম রোড দিয়ে হাঁটতে লাগল। পি. ডর. ডি.-র পিচের রাস্তার দুধারে লম্বা লম্বা গাছ, যার ডালগুলো এখনও ভেজা, মাথার ওপর বেঁকে আছে। দুবেলায় ছায়ায় ভরে থাকে এই রাস্তা। বাদরলাঠি ফ, এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে।

চা-বাগানের সীমানা ছাড়ালেই হাট। দুপাশে ফাকা মাঠের মধ্যে মাঝে-মাঝে চালাঘর করা। বাঁদিকে মাছমাংসের হাট, চালও বসে, ডানদিকে ওয়োরাটার মাঠ। আজ অবশ্য সব ফাকা। রবিবার সকাল থেকে গিজগিজ করতে থাকে লোক। বানারহাট ধূপগুড়ি থেকে হাট-বাস বোঝাই ব্যাপারিরা এসে হাজির হয় বড় বড় ঝুড়ি নিয়ে। একটু বেলায় আসে খদ্দেররা। তখন চোঙায় করে কলের গান বাজায় অনেকে। কী জমজমাট লাগে চারধার। ফাকা হাট দুপাশে রেখে ওরা ছোট্ট পুলের ওপর এল। দুপাশে রেলিং দেওয়া, নিচে প্রচণ্ড শব্দ করে আঙরাভাসা নদী বয়ে যাচ্ছে ফ্যাক্টরির দিকে। পুলের ওপর দাঁড়িয়েই লকগেটটা দেখতে পাওয়া যায়। ওপাশে পুকুরের মতো থইথই জল দাঁড়িয়ে। গেটের তলা দিয়ে অজস্র ফেনা তুলে ছিটকে বেরিয়ে আসছে এধারের ধারা। বিশু বলল, একদিন স্নান করার সময় এখানে এসে নামব আর আমাদের ঘাটে গিয়ে উঠব।

বাপী বলল, যাঃ, মরে যাবি একদম-কী স্রোত!

বিশু কিছু বলল না, কিন্তু অনি ওর মুখ দেখে বুঝল বিশু নিশ্চয়ই এইরকম একদিন করবে। যা ডানপিটে ছেলে ও! তালগাছে উঠে বাবুইপাখির বাচ্চা ধরতে চেয়েছিল একদিন। মা ভীষণ রাগ করবে বলে অনি কোনোরকমে ওকে বারণ করেছে। আজ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে অনির চট করে হরিশের কথা মনে পড়ে গেল। গায়ের মধ্যে শিরশির করে উঠল অনির।

পলু ছাড়ালেই ভরত হাজামের দোকান। ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া, নিচে একটা টুল পাতা। ভরত খদ্দেরকে টুলে বসিয়ে চুল ছাঁটে। ওদের বাড়িতে মাসে দুবার যায় ভরত। দাদু দুবারই চুল ছাঁটান। কাঠালতলায় পিড়ি পেতে এক এক করে বসতে হয় ওদের। একটা কাপড় আছে ভরতের যার রঙ কোনোকালে হয়তো সাদা ছিল, দাদু বলেন ওটাতে ছারপোকা আর উকুন গিজগিজ করছে। খালিগায়ে বসে ওরা। মহীতোষ বলেন, ব্যাটা বাটিছাট ছাড়া আর কিছু জানে না। বুড়ো ভরত অনিকে চুল ছাঁটার সময় মজার-মজার গল্প বলে। সবসময় মাথা নিচে করে বসে থাকতে পারে না। নড়লেই চাটি মারে ভরত। সঙ্গে সঙ্গে ছাড়াও কাটে, ‘নাচ বুড়িয়া নাচ, কান্ধে পর নাচ’ হেসে ফেলে অনি। ছেলেবেলায় ছোটকাকাকেও চুল কেটে দিত ভরত। এখন তেমাথার মোড়ে যে নতুন মডার্ন আর্ট সেলুন হয়েছে, ছোটকাকা সেখানে গিয়ে চুল ছটিয়ে আনে। কিন্তু চোখে কম দেখলেও সরিৎশেখরের ভরতকে ছাড়া চলে না। ছোট ঠাকুমার বিয়ের সময় নাকি ভরত হাজাম ছিল।

এখন সেলুনটা ফাঁকা। ভরতের তিনপায়া কুকুরটা টুলের ওপর উঠে বসে আছে। দোকানে ভরত নেই। আর একটু এগোলেই ছোট ছোট কয়েকটা স্টেশনারি দোকান, বিলাসের মিষ্টির দোকানে বিরাট কড়াই-এ দুধ ফুটছে। এর পরেই রাস্তাটা গুলতির বাঁটের মতো দুভাগ হয়ে গিয়েছে। ঠিক মধ্যেখানে একটা বিরাট পাথরে সম্প্রতি লেখা হয়েছে গৌহাটি, নিচে বাঁদিকে একটা ভীর, ডানদিকে লেখা নাথুয়া। বাঁদিকের রাস্তাটায় আর একটু গেলে জমজমাট তিনমাথার মোড়। কতরকমের দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট, পেট্রল পাম্প, সবসময় লোক গিজগিজ করছে। ডানদিকের রাস্তাটা ধরে এগোলেই বড় বড় কাঠোর গোলা চোখে পড়ে। কাছেই একটা স-মিলে কাজ হচ্ছে। করাত-টানার শব্দ হচ্ছে একটানা। ফরেস্ট অফিস এদিকটাতেই। রেজার সাহেবের অফিসের সামনে একটা জিপ দাড়িয়ে আছে। ডানদিকে মিশনারিদের একটা বাগানওয়ালা বাড়ি। ওখানে মদেসিয়া ছেলেমেয়েদের অক্ষর-পরিচয় হয়। রাস্তটা বাক নিতেই ঘোট মাঠ আর মাঠের গায়ে ওদের স্কুল।

ভবানী মাস্টার স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। একঘরের স্কুল। বারান্দায় মাঝে-মাঝে ক্লাস নেন উনি। ওদের নতুন-আসা দিদিমণি ভেতরের ঘরে ক্লাস ওয়ানদের পড়ান, ঘরের আর-এক পাশে বা বারান্দায় ক্লাস টু-কে পড়ান ভবানী মাস্টার। নতুন দিদিমণি পি. ডব্লু. ডি. অফিসের বড়বাবুর বোন। কদিন আগে ভবানী মাস্টারের অসুখের সময় হতে উনি এসে স্কুল দেখাশুনা করছেন। ভীষণ গম্ভীর।

স্বৰ্গছেঁড়ার তালেবর মানুষজন সম্প্রতি নতুন একটা স্কুলবাড়ি তৈরি করছেন হিন্দুপাড়ার মাঠে। বেশ বড়সড় স্কুল। এই কদিন ওদের এই একচালাতেই ক্লাস হচ্ছে। মাইনেপত্তর কোনো ছাত্রকে দিতে হয় না। ক্লাব থেকে চাঁদা তুলে ভবানী মাস্টারের মাইনে দেওয়া হয়। নতুন দিদিমণি এখনও মাইনে নেন না।

আসলে এই ঘরটা বারোয়ারি পুজোর জন্যে বানানো হয়েছিল। দরজাটা তাই বেশ বড়। দুর্গাপুজোর খ্যাতি আছে স্বৰ্গছেঁড়ার। পুজোর একপক্ষ আগে থেকে স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। বুড়ো হারান ঘোষ তাঁর দুই ছেলেকে নিয়ে এসে যান ঠাকুর গড়তে। সেই থেকে উৎসব লেগে যায় স্বৰ্গছেঁড়ায়। ভবানী মাস্টার তখন চলে যান দেশে। বাংলাদেশে। মাঝে-মাঝে ওর কথা বুঝতে পারে না অনি। কথা না শুনলে চুল ধরে মাথা নামিয়ে পিঠের ওপর শব্দ করে যখন কিল মারেন ভবানী মাস্টার তখন বিড়বিড় করে নিজের ভাষায় কী বলেন কিছুতেই বুঝতে পারে না অনি। তবে অনি কোনোদিন মারটার খায়নি। দাদু বলেন উনি ময়মনসিংহ না কী জেলার লোক। ভীষণ রাগী লোক।

ভবানী মাস্টার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদের দেখলেন। তারপর ওরা কাছে যেতে বিশুর দিকে তাকিয়ে বললেন, বেড়াতে যাও বুঝি, বেশ বেশ, তা এবার ভিতরে গিয়ে আমাকে উদ্ধার করো বাবা সব। ঘরে ঢুকে অনির মনে হল আজ সবাই কেমন যেন আলাদা, অনেকের কপালে দই-এর টিপ। ভবানী মাস্টার আজ ক্লাস ওয়ান টু-দের পাশাপাশি বসতে বললেন। লম্বা লম্বা ডেস্কের সঙ্গে বেঞ্চি। সামনে একটা ব্ল্যাকবোর্ড। ব্ল্যাকবোর্ডে এক দুই করে প্রশ্ন লেখা। বাঁদিকে ক্লাস ওয়ানের জন্য, ডানদিকে ক্লাস ট। আজকে ভবানী মাস্টারের গলা ভীষণ ভারী এবং রাগী লাগছিল। সবাইকে বলে দিলেন, যে একটা কথা বলবে তাকে ইট মাথায় করে তেমাথা অবধি দৌড়ে ঘুরে আসতে হবে।

এমন সময় নতুন দিদিমণি স্কুলে এলেন। সাদা শাড়ি জামা, নাকের ডগায় তিল থাকায় সবসময় মনে হয় কিছু উড়ে এসে ওখানে বসেছে। দিদিমণি এসে প্রথমে রোলকল করলেন। তারপর বানী মাস্টারের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কী বললেন। ভবানী মাস্টারের মুখটা কেমন মজার মজার হয়ে গেল। ঘাড় নেড়ে কী যেন বলে ওদের দিকে তাকালেন, এখন তোমরা দিদিমণির কাছে গান করবে। একটার পর পরীক্ষা। বলে বাইরের বারান্দায় চলে গেলেন।

গানের কথা শুনে সবাই গুনগুন করে উঠল। গোপামাসি বসেছিল অনির পাশে। অনেক বড় গোপামাসি। স্কুলে শাড়ি পরে আসতে পারে না বলে ফ্রক পরে। অনিকে গোপমাসি বলল, গান গাইতে আমার খুব ভালো লাগে। দেখিস গানের পরীক্ষা নেবে। তুই পারবি?

ঘাড় নাড়ল অনি, না।

এমন কী আর, শুধু জোরে জোরে সুর করে বলবি, সে হয়ে যাবেখন। আমি তো হাটের দিনে গান শুনে শুনে শিখে গিয়েছি। কথা বলতে বলতে চুপ করে গেল গোপমাসি। দিদিমণি ওর দিক তাকিয়ে আছেন একদৃষ্টে। তারপর একটু গলাখাকারি দিয়ে বললেন উনি, আর কদিন বাদেই, তোমরা হয়তো জান, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবস। জান তো?

হ্যাঁ দিদিমণি। পুরো ঘরটা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।

স্বাধীনতা মানে আমরা আর পরাধীন থাকব না। ইংরেজদের হুকুম আমাদের মানতে হবে না। আমরাই আমাদের রাজা। দিদিমণি হাত নেড়ে বললেন, এখন সেই দিনটি হল পনেরোই আগস্ট। এই পনেরোই আগষ্ট হবে উৎসবের দিন। আমরা স্কুলের সামনে আমাদের জাতীয় পতাকা তুলব। শহর থেকে একজন গণ্যমান্য লোক আসবেন তোমাদের কিছু বলতে। তখন তোমরা সবাই মিলে একটা গান গাইবে। আমাদের হাতে সময় আছে মাত্র পাঁচ দিন।এর মধ্যে তোমরা গানটা মুখস্থ করে নেবে। প্রথম আমি গাইছি তোমরা শোননা। দিদিমণি এবার সবার দিকে তাকিয়ে নিলেন। একসঙ্গে অনেক কথা বলায় ওঁর নাকের ডগায় তিলের ওপর একটু ঘাম জমতে দেখল অনি। আঁচল দিয়ে সেটা মুছে নিলেন উনি। তারপর একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে হাতের বইটা সামনে খুলে ধরে খুব নরম গলায় গাইতে লাগলেন, ধন্যধান্য পুষ্পভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা…।

সমস্ত ঘর চুপচাপ, গান গাইছেন গম্ভীর-দিদিমণি। এত সুন্দর যে উনি গাইতে পারেন অনি তা জানত না। সকলে কেমন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে, এমনকি গোপামাসিও। এক-একটা লাইন ঘুরেফিরে গাইছেন উনি, কী সুন্দর লাগছে। একসময় অনি গানের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তারপর যেই দিদিমণি কেমন করুণ করে গাইলেন-ও মা তোমার চরণ দুটি বৃক্ষে আমার ধরি, তখন হঠাৎ অনির শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠল, ওর হাতের লোমকূপগুলো কাটা হয়ে উঠল, এই মুহূর্তে মা কাছে থাকলে অনি তাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ রাখত।

দিদি তখনও গেয়ে যাচ্ছেন, অনির শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল। ও জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। স্কুলের পেছনের রাস্তাটা চলে গেছে খুঁটিমারীর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে নাথুয়ার দিকে। বেশ চনমুনে রোদ উঠেছে। রাস্তাটা তাই ফাঁকা। সামনের বকুলগাছটায় একটা লেজঝোলা পাখি ঘাড় ঘুরিয়ে ডাকছে। তার লেজের হলদে নীল লম্বা পালকে রোদ পড়ে চকচক করছে। পাশেই একটা লম্বা ইউক্যালিপটাস গাছ। ওরা বলে সাহেবগাছ। সাহেবগাছের একদম ওপরডালে মৌচাক বেঁধেছে মৌমাছিরা। গাছের তলায় গেলেই শব্দ শোনা যায়। ওরা কি ফুলের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়ে শিশু বলে, মৌচাকের মধ্যে মধু জমা আছে। গুলতি দিয়ে একদিন ভাঙবে ও মৌচাকটাকে। দিনের বেলা বলে ও পারছে না, চাক ভেঙে দিলে মৌমাছিরা নাকি ছেড়ে দেবে না। ভীষণ হুল। অনির কোনো ভাই নেই, গানটায় ভাই-এ ভাই-এ এত স্নেহ বলেছেন দিদিমণি। আচ্ছা ওর ভাই নেই কেন? পিসিমা গল্প করার সময় বলেন, তুই যেমন মায়েরর পেটে এসেছিলি-তেমনি একটা ভাই তো মায়ের পেটে আসতে পারে! অনি দেখল রেতিয়া সামনের রাস্তাটা দিয়ে যাচ্ছে ওদের চেয়ে বয়সে বড়, এক নম্বর লাইনের মদেসিয়া ছেলে। ও চোখে দেখতে পায় না। অথচ পা দিয়ে রাস্তা বুঝে রোজ বাজারে চলে আসে। বাজারে গিয়ে মতি সিংয়ের চায়ের দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চিতে চুপ করে বসে থাকে। মতি সিং ওকে রোজ চা খাওয়ায়। সারা মুখে বসন্তের দাগ, ছেলেটা খোঁড়াতে খোড়াতে যাচ্ছে। হঠাৎ অনির খুব দুঃখ হল ওর জন্য। দিদিমণি যে এমন মন-কেমন-করা গান গাইছে বেচারা শুনতে পেল না। অথচ ওর খুব বুদ্ধি। এখন যদি অনি ছুটে ওর কাছে যায়, গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, এই বল তো আমি ওকে, সঙ্গে সঙ্গে রেতিয়া মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাবে, ওর বসন্তের দাগওয়ালা কপালে ভাজ পড়বে, দুটো সাদা চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইবে, তারপর হঠাৎসব সহজ হয়ে গিয়ে ওর হলদে ছাতা-লাগা দাঁতগুলোয় শিউলি ফুলের বোঁটার মতো হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠবে, ও মুখ নিচু করে বলবে, অনি।

একসময় গান শেষ হয়ে গেল। এত সুন্দর গান এমন কথা অনি শোনেনি আগে। ও দেখল, ভবানী মাস্টার দরজায় এসে দাড়িয়েছেন। বোঝাই যাচ্ছে উনি গান শুনছিলেন, তাই ওঁর মুখটা অন্যরকম দেখাচ্ছিল। এরপর দিদিমণি ওদের গানটা শেখাতে আরম্ভ কররেন। গোপামাসির গলা সবার ওপরে। এমনিতে অনি কোনোদিন সবার সামনে গান গায়নি। কিন্তু আস্তে আস্তে ওর গলা খুলতে লাগল। গানের লাইনগুলোর সব মানে বুঝতে পারছিল না, এই যা।

কেমন ঘোরের মধ্যে সময়টা কেটে গেল। একসময় দিদিমণি থাকলেন। এখন টিফিন। অনি টিফিনের সময় কিছু খায় না। কেউই খায় না। দুটোয় ছুটি । বাড়ি ফিরে পিসিমার আলোচালের ভাত সুন্দর নিরামিষ তরকারি দিয়ে একসঙ্গে বসে খায়। এতক্ষণে ওর নজর পড়ল সামনের ঘর ফাকা। সবাই বাইরের মাঠে রোদুরে হইহই করছে। স-মিলের করাতের শব্দ এখানে আসছে। একটা কাঠঠোকরা পাখি সামনের সাহেবগাছে বসে একটানা শব্দ করে যাচ্ছে।

অনি দেখল গোপমাসি বাইরে থেকে ফিরে এল। এসে। ওর পাশে বসল, কেমন গাইলাম রে?

অনি হাসল। সবাই মিলে একসঙ্গে গান করেছে, অথচ পামাসি এমন ভাব করছে যেন একাই গেয়েছে।

আমি বড় হলে খুব গাযিকা হব, জানিস, কাননবালা।

কথাটা বলে চোখ বন্ধ করল গোপামাসি। গোপামাসি তত বড়ই হয়ে গিয়েছি, শুধু শাড়ি পরে–এই যা।

তুই নাকি চলে যাবি এখান থেকে হঠাৎ গোপামাসি বলল।

হুঁ।

আর আসবি না?

আসব তো! ছুটি হলেই আসব।

আমার সঙ্গে দেখা করবি তো?

বাঃ, কেন করব না! ঘাড় নিচু করে গোপামাসি বলল, তোরা ছেলেরা কেমন টুকটুক করে চলে যাস। আমি দ্যাখ এই এক ক্লাসে সারাজীবন পড়ে থাকলাম। পাশ করলেও কী হবে, আমার তো পড়া হবে না আর।

নতুন স্কুল হচ্ছে, সেখানে পড়বে। অনি বলল।

ঠোঁট ওলটালে গোপামাসি, মা পড়তে দেবে না। ছোঁড়া ছোড়া মাস্টার আসবে যে সব! অথচ দেখ ক্লাস ওয়ানের পরীক্ষা একেবারে আমি পাশ করে গেছি। হঠাৎ ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে গোপামাসি বলর, দাঁড়া, তোর খাতাটা দে দেখি।

কিছু বুঝতে না পেরে অনি নতুন পাতাটা এগিয়ে দিল। গোপামাসি বলল, আমি তো ফল করবই। পাশ করলে তো মা বাড়ি থেকে বেরুতে দেবে না। আমি তোর পরীক্ষার উত্তর লিখে দিচ্ছি।। তুই চুপ করে বসে থাক।

অনির খুব মজা লাগল। বোর্ডের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নগুলো দেখে গোপামাসি র খাতায় উত্তর লিখছে। এইসব প্রশ্নের উত্তর ও জানে, কিন্তু সেগুলো লেখার হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছে বলে ওর সাইকেলে আনন্দ হচ্ছিল। গোপামাসি লিখছে-ও জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল আবার। ওভারসিয়ারবাবু সাইকেল চেপে আসছেন ঠাঠা রোদুরে খুঁটিমারীর দিক থেকে। মাথায় সোলার হ্যাট। খাকি হাফপ্যান্টের নিচে ইয়া মোটা মোটা পা। পাছা দুটো সিটের পাশে ঝুলে পড়েছে। দুহাতে সামনের হ্যান্ডেলে শরীরের ভর রেখে চোখ বন্ধ করেই বুঝি চালাচ্ছেন। চোখ এত ছোট আর মুখটা এত ফোলা যে বোঝা যায় না তাকিয়ে আছেন না ঘুমোচ্ছন। হঠাৎ একটা প্রচন্ড শব্দ হতেই চমকে উঠল অনি। একটা মোটা পা আকাশে তুলে অন্যটায় নিজেকে কোনোরকমে সামলাচ্ছেন ওভারসিয়ারবাবু মাটিতে ভর দিয়ে। পেছনের চাকা চুপসে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে হইহই শব্দ উঠল। মাঠে যারা খেলছিল তারা ব্যাপারটা দেখেছে। ভবানী মাস্টারের গলা শোনা গেল, অবোধ্য ভাষায় গালাগাল দিনে বোধহয়, সবাই হুড়মুড় করে ঘরে ফিরে এল। বিশু ছড়া কাটছিল, ওভারবাবুর চাকা, চলতে গেলেই বেঁকা।

চোরের মতন খাতটা দিয়ে দিল গোপামাসি, নে, শুধু একটা পারলাম না। যা শক্ত! এতেই পাশ করে যাবি।

খাতাটা খুলে দেখল অনি। খুব সুন্দর হাতের লেখা গোপামাসির। খাতার ওপরে ওর নাম লিখে দিয়েছে।

পরীক্ষা আরম্ভ হয়ে গেল। গোপামাসি কী সব লিখছে নিজের খাতায়। লে র ভঙ্গিতে অনি বুঝল, মন নেই। ভবানী মাস্টার একটা লম্বা বেত হাতে নিয়ে মাঝখানে বসে। সবাই মুখ নিচু করে লিখছে। ভবানী মাস্টার অনিকে দেখলেন, কী অনিমেষ, লিখ লিখ।

পাশ থেকে গোপামাসির চাপা গলা শুনতে পেল অনি, আরে বোকা, ছবি আঁক না পেছন পাতায়। চুপ করে বসে থাকলে ধরা পড়ে যাবি না!

এতক্ষণে আনির ভয়-ভয় করতে লাগল। ও বুঝতে পারল ব্যাপারটা অন্যায় হয়ে গিয়েছে। আস্তে-আস্তে খাতা খুলে ও পেছনের পাতায় চলে এল। তারপর মাথা ঝুকিয়ে পেন্সিল একটা গোল দাগ আঁকল। তার মধ্যে আর দুটো গোল, গোলের মধ্যে গোল। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়াতে গোপামাসি যে-উত্তরটা শক্ত বলেছিল সেটা চট করে লিখে ফেলল।

একসময় সময়টা শেষ হয়ে গেল। পরীক্ষা শেষ। সকলে এক এক করে খাতা জমা দিয়ে গেল। অনি কাছে দাঁড়াতেই ওর হাত থেকে খাতা নিলেন ভবানী মাস্টার, সব উত্তর দিয়েছ।

ঘাড় নাড়তে গিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল অনি। ওর কেমন শিরশির করতে লাগল। ভবানী মাস্টারের ভাঙাচোরা মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনে দাদুর মুখটা ভেসে উঠল। ঘাড় নাড়ল ও, না।

কোনটা পার নাই।

হঠাৎ অনির ঠোঁট কাঁপতে লাগল। ভবানী মাস্টার একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। ঘর প্রায় ফাঁকা। সবাই চলে যাচ্ছে। দরজায় বিশু আর বাপী দাঁড়িয়ে, ওরা অনির জন্যে অপেক্ষা করছে। গোপামাসি নেই। মাটির দিকে মুখ নামাল অনি। ওর চিবুক থরথর করছিল। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল শেষ পর্যন্ত।

কী হল-আরে কাঁদ কেন? ব্যস্ত হয়ে উঠলেন ভবানী মাস্টার।

আমি লিখিনি কান্না-জড়ানোর গলায় বলল অনি।

এক হাতে ওকে জড়িয়ে কাছে আনলেন ভবানী মাস্টার, কী লিখ নাই?

গোপমাসি নিজে থেকে লিখে দিয়েছে। আমি লিখতে বলিনি। জোরে কেঁদে উঠল ও।

ডান হাতে খাতাটা খুললেন ভবানী মাস্টার। উত্তরগুলো দেখলেন। মুহূর্তে ওঁর কপালের রগ দুটো নাচতে লাগল। তারপর অনির দিকে তাকালেন, তুমি এগুলান দেখছ।

ঘাড় নাড়ল অনি, না।

বাঃ, ভালো। এখন চোখ থিকা জল মোছে। গোপটার মাথায় গোবর থাকলে সার হত, তাও নাই। ও যা ভুল করছে তুমি তা শুদ্ধ করো। বসো। কথাটা বলে অনির হাত ধরে সামনে বসিয়ে দিলেন উনি। তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে বিওদের দেখতে পেয়ে ধমক দিলেন, এই তোরা বাগানে থাকিস না। আয় বস, ঐ দেখল একটা যোগ একদম বুল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ও সেটা ঠিক করল।

শেষ পর্যন্ত ভুল ঠিক করা হয়ে গেলে ও খাতটা মাস্টারের হাতে দিল। চটপট দেখে নিলেন উনি। দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, বাঃ, ফাস্ট ক্লাস।

তারপর অনির দিকে ফিরে ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন উনি। অনি বুঝতে পারছিল না ও কী করবে। ওঁর শরীর থেকে আসা ঘামের গন্ধে, নস্যির গন্ধে অনির কষ্ট হচ্ছিল। ভবানী মাস্টার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বললেন, একটা কথা মনে রাখবা বাবা, নিজের কাছে সৎ থাকলে জীবনে কোনো দুঃখই দুঃখ হয় না। তুমি অনেক বড় হবা একদিন, কিন্তু সৎ থাকবা, আমাকে কথা দাও।

কথাগুলো শুনতে শুনতে অনি আবার কেঁদে ফেলল। তারপর ঐ নস্যির গন্ধ, ঘামের গন্ধ মাথা বুকে মাথা রেখে ও কান্না-জড়াননা গলায় কী বলে থরথর করে কাঁপতে লাগল।

স্কুলের মাঠে বিকেলে ফুটবল খেলা হয়, কিন্তু অনিদের সেখানে যাওয়া হয় না। ওদের কোয়ার্টার থেকে স্কুলের ফুটবল মাঠ অনেক দূর। তাছাড়া গেলেই যে খেলতে যাবে এমন নয়। একদিন অনিরা গিয়ে দেখেছিল তাদের বয়সি কেউ খেলছে না। হাফপ্যান্ট বা ধুতি গুটিয়ে পরে বড় বড় মানুষ হইহই করে ফুটবল খেলছে ওখানে। তাদের বিশাল বিশাল লোমশ পা দেখে ওরা ভয়ে ফিরে এসেছিল। বাগানের কোয়ার্টারের সামনে অঢেল খোলা জমি। মাঝে-মাঝে উঁচুনিচু অবশ্য, তাছাড়া দুটো কাঁঠালচাপার গাছ শক্ত হয়ে বসে আছে মধ্যিখানে-তাও খেলাটেলা যেত, কিন্তু মুশকিল হল ওদের বয়সি ছেলে এই কোয়ার্টারগুলোতে বেশি নেই। অনিদের বাতাবিলেবু গাছ থেকে গোলগাল একটা লেবু নিয়ে ওরা মাঝে মাঝে খেলে, কিন্তু সেটা ঠিক জমে না।

অনিরা বাড়ির সামনের মাঠে গোল হয়ে বসে ধনধান্য পুষ্পভরা গাইছিল। মোটামুটি কথাগুলো এখন মুখস্থ হয়ে গেছে। গান করে গাইলে যে-কোনো কবিতা চট করে মুখস্থ হয়ে যায়। হঠাৎ ওরা শুনলো গোঁ গোঁ করে শব্দঠছে সামনের রাস্তায়। সাধারণত যেসব লরি বা বাস এই রাস্তায় রোজ চলাচল করে এ শব্দ তার থেকে আলাদা। কি গম্ভীর, যেন সমস্ত পৃথিবী কঁপিয়ে শব্দটা গড়াতে গড়াতে আসছে। খানিকবাদেই ওরা দেখতে পেল ত্রিপলে মোড়া ভারী ভারী মিলিটারি ট্রাক একের পর এক ছুটে আসছে। মুখ-থ্যাবড়া গাড়িগুলো দেখতে বীভৎস, অনেকটা খেপে-যাওয়া বুলডগের মতো। প্রত্যেকটি গাড়ির নাকের ডগায় সরু লোহার শিক লিকলিক করছে। ট্রাকগুলো থেকে বেখাপ্লামতো কিছু বাইরে বেরিয়ে আছে, তবে সেগুলোর ওপর ভালো করে ত্রিপল ঢাকা। তার পরই ওরা দেখতে লরিভরতি কালো কালো বিকট চেহারার মিলিটারির দল। ট্রাকে বসে হইহই করে চিৎকার করছে। এই ধরনের চেহারার মানুষ ওরা কখনো দেখেনি। এত দূর থেকেও ওদের সাদা দাঁত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ বিশু ওরে বাবা গো বলে চোচো দৌড় দিল নিজের বাড়ির দিকে। ওর দেখাদেখি বাপীও ছুটল। মিলিটারি ট্রাক দেখলে কেউ বাড়ির বাইরে যাবে না-এরকম একটা আদেশ ছোটদের জন্যে দেওয়া আছে। কিন্তু কী করে অনিরা বুঝবে কখন ওরা আসবে! দৌড়তে গিয়ে নি টের পেল ওর, দুটো পা যেন জমে গেছে। পা-ঝিনঝিন শুরু হয়ে গেল হঠাৎ। গলার কাছটায়, টনসিলের ব্যথাটাই বোধহয়, কেমন করে উঠল ঘুমন্ত গাড়িগুলো দেখতে দেখতে ও নিজের অজান্তে ধনধান্য পুষ্পরা ফিসফিস করে গাইতে লাগল। আর গাইতে গাইতে ওর শরীরের শিরশিরানিটার কমে যাওয়া টের পেল। অনিক অবাক হয়ে দেখল একটা গাড়ি ঠিক ওদের বাড়ির সামনে ব্রেক কষে থেমে গেছে। গাড়িটা থামতেই একটা লোক লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এল। এত লম্বা লোক অনি কোনোদিন দেখেনি, দুনম্বর লাইনের ভেটুয়া সর্দারের চেয়েও লম্বা। আর তেমনি মোট। এদিক ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে জায়গাটা দেখে নিল লোকটা, তারপর অনিকে লক্ষ করে হনহন করে এগিয়ে আসতে লাগল। অনি দেখল লোকটার হাতে দোল খাচ্ছে হাঁটার তালে। জয়ে সিটকে গিড়য়ে অনি প্রায় কান্নার সুরে ধন্যধান্য পুষ্পভরা বিড়বিড় করে যেতে লাগল বারংবার।

ওয়াতার, ওয়াতার; পানি!

অনি চোখ খুলে দেখল সামনে একটা ওয়াটার টু ঝুলছে আর তার পেছনে পাহাড়ের মতো উঁচু একটা লোক যার গায়ের রঙ মিশমিশে কালো। লোকটা হাসছে, কী সাদা দাঁতগুলো। লোকটা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আবার বলল, ওয়াতার, প্লিজ। জল চাইছে লোকটা, অনি পা দুটোয় ক্রমশ সাড় ফিরে পেল। ও তাকিয়ে দেখল পেছনের সব কোয়াটারের জানালা-দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ওদের বাড়ির জানালায় অনেকগুলো মুখ কী ভীষণ ভয় নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।

এগিয়ে-দেওয়া ওয়াটার বটটা হাতে নিয়ে অনি নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে ও টের পেল এখন আর একদম ভয় করছে না, বুকের মধ্যে একটুও শিরশিরানি নেই। বরং নিজেকে খুব কাজের বলে মনে হচ্ছে, বেশ বড় বড় লাগছে নিজেকে।

বারান্দায় উঠতেই দরজা খুলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো হাত অনিকে জড়িয়ে ধরে ভেতরে টেনে নিল। সবাই মিলে বলতে লাগল, কী ছেলে রে বাবা, একটুও ভয় নেই, যদি ধরে নিয়ে যেত, আসুক আজ বাবা, হবে তোমার ইত্যাদি। বেঁকেচুরে নিজেকে ছাড়িয়ে অনি ঝাড়িকাকুর দিকে ওয়াটার বটুটা এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, জল নিয়ে এস শিগগির, লোকটা দাড়িয়ে আছে।

অনির গলার স্বরে এমন একটা কিছু ছিল যে, মাধুরী অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। অনি যে এই গলায় কথা বলতে পারে মাধুরীর জানা ছিল না। ওয়াটার বটটা নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন উনি।

পিসিমা বললেন, হ্যারে, তোকে কী বলল রে?

অনি বলল, কী আর বলবে, জল চাইল!

পিসিমা আবার বললেন, তোকে কি ভয় দেখাল?

বিরক্ত হয়ে অনি বলল, ভয় দেখাবে কেন? জল চাইতে হলে কি তুমি ভূঢ় দেখাও?

এমন সময় মাধুরী ওয়াটার বটলটা নিয়ে ফিরে এলেন। কম্বলে মোড়া বটলটা এখন বেশ ভারী। মাধুরী জলের সঙ্গে একটা প্লেটে বেশকিছু বাতাসা দিলেন। বাতাসাটা নিয়ে অনি মায়ের দিকে তাকাতে মাধুরী হাসলেন, শুধু জল দিতে নেই রে, যা। এক হাতে জল অন্য হাতে বাতাসা নিয়ে অনি গটগট করে বাইরে বেরিয়ে এল। এইজন্যে মাকে ওর এত ভালো লাগে।

মাঠের মধ্যে গাছের মতো লোকটা একা দাড়িয়ে ছিল। অনিকে আসতে দেখে একগাল হাসল। হাসি দেখে অনির সাহস আরও বেড়ে গেল। কাছাকাছি হতে লোকটা হাত বাড়িয়ে ওয়াটার বলটা নিয়ে বলল, থ্যা। কথাটা অনি ঠিক বুঝল না, কিন্তু ভঙ্গিতে বেশ মজা লাগল। ও বাতাসার প্লেটটা এগিয়ে ধরতে লোকটা চোখ কুঁচকে সেটাকে দেখে বলল, হোয়াতিজ দ্যাটা মানেটা ধরতে না পারলেও অনি বুঝতে পারল লোকটা কী বলতে চাইছে। এখনও ওদের স্কুলে ইংরেজি শুরু হয়নি। সরিৎশেখর অবশ্য ওকে মাঝে-মাঝে ইংরেজি শব্দ শেখান, কিন্তু বাতাসার ইংরেজি কোনোদিন গুনেছে বলে মনে করতে পারল না। বরং বাতাসা খেতে মিষ্টি, আর মিষ্টির ইংরেজি সুইট-এটা বলে দিলেই তো হয়! শব্দটা শুনে লোকটা ঠোঁট দুটো গোল করে অবাক হবার ভান করে বলল, শো গুড় ইংলিশ? আই টু। ওকে, ওকে। বলে এক থাবায় বাতাসাগুলো নিয়ে মুখে পুরে চিবোতে লাগল। স্বাদ জিভে যেতে লোকটার মাথা দুলতে লাগল চিবোনার তালে তালে। তারপর ঢকঢক করে কয়েকটা ঢোক জল খেয়ে নিতেই পেছন থেকে ট্রাকের লোকগুলো হইহই করে ডাকতে শুরু করল। অনি দেখল পেছনের লোকগুলোকে ইংরেজি নয়, অন্য কোনো ভাষায় জবাব দিয়ে একহাতে অনিকে শূন্যে তুলে নিয়ে ট্রাকের দিকে হাঁটতে লাগল। লোকটার গায়ের ঘেমো বেটিকা গন্ধ আর ট্রাকের একদল নিগ্রোর হইহই, পেছনের বারান্দায় বেরিয়ে আসার পিসিমার আর্তচিৎকারে অনির শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল, ওর হাত থেকে প্লেটটা টুপ করে পড়ে গেল। ওর মনে হল ও ছেলেধরার কবলে পড়েছে, এখন ঐ ট্রাকে চাপিয়ে পৃথিবীর কোনো দূরান্তে ওকে নিয়ে যাবে ওরা। বাবা মা দাদু কাউকে কোনোদিন দেখতে পাবে না ও। প্রচণ্ড আক্রোশে লোকটার চোখদুটো দুই আঙুলে টিপে অন্ধ করে দিতে গিয়ে অনি শুনল ওকে মাথায় তুলে হাটতে হাটতে লোকটা অদ্ভুত ভাষায় ভীষণ চেনা সুরে গান গাইছে। গাইবার ধরন দেখে বোঝা যায়, খুব মগ্ন হয়ে গাইছে ও। ওর ভাষা বোঝা অসম্ভব, কিন্তু সুর শুনে অনির মনে হল পুজো করার সময় পিসিমা এইরকম সুরে গুনগুন করেন। অনির হাত লোকটার শিংএর মতো চুলের ওপর এসে থেমে গেল। ট্রাকের কাছে এসে লোকটা কিছু বলতে ট্রাকের ওপর দাড়ানো লোকগুলো হইহই করে উঠে হাত বাড়িয়ে অনির দিকে চার-পাঁচটা প্যাকেট এগিয়ে দিল। লোকটার কাঁধের ওপর থাকায় অনি ট্রাকের সবটাই দেখতে পাচ্ছে। একগাদা কম্বল পাতা, বন্দুক, কাচের বোতল ছড়ানো। প্যাকেটগুলো ওর হাতে গুছিয়ে দেওয়া হয়ে গেলে লোকটা ওকে মাটিতে নামিয়ে দিল। তারপর বিরাট থাবার মধ্যে ওর মুখটা ধরে কেমন গলায় বলল, থাঙ্ক ইউ মাই সন। বলে লাফ দিয়ে ট্রাকে উঠে গেল। ওয়াটার বলটা তখন ট্রাকের ভেতর হাতে-হাতে ঘুরছে।

ট্রাকটা চলে যেতে রাস্তাটা ফাঁকা হয়ে গেল। বিরাট আসাম রোড চুপচাপ-শব্দ নেই কোথাও। অনি ওর বুকের কাছে ধরা প্যাকেটগুলোর দিকে তাকাল। গন্ধ এবং ছবিতে বোঝা যাচ্ছে, এগলো বিস্কুট এবং টফির প্যাকেট। ওরা ওকে এগুলো ভালোবেসে দিয়ে গেল। অথচ ও কী ভয় পেয়ে গিয়েছিল! লোকগুলোকে ছেলেধরা বলে ভেবেছিল। হঠাৎ অনি অনুভব করল ওর প্যান্টের সামানেটা কেমন ভেজা-ভেজা। এক হাতে প্যাকেটগুলো সামলে অন্য হাতে জায়গাটা কত ভালো! নিজের বাড়ির দিকে তাকিয়ে ও দেখল পিসিমা মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে, পাশে ঝাড়িকাকু, অনেক পেছনে মা। হঠাৎ ওর পিসিমার ওপর রাগ হল, পিসিমাই শুধুশুধু মিলিটারিদের ছেলেধরা বলে ভয় দেখায়। অনি আর দাঁড়াল না। একছুটে মাঠটা পেরিয়ে পিসিমার বাড়ানো হাতের ফাঁক গলে মায়ের শরীর জড়িয়ে ধরল।

মাধুরী বললেন, কী হয়েছে?

মাকে জড়িয়ে ধরতে মুঠো আলগা হওয়ায় আনির হাত থেকে প্যাকেটগুলো টুপটুপ করে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। সেই অবস্থায় মায়ের বুকে মুখ গুজে অনি বলল, লোকটা খুব ভালো, কিন্তু মা, কিন্তু বোকার মতো হিসি করে ফেলেছি। ভরত হাজাম সরিৎশেখরের চুল কাটছিল। কাঁঠালতলার রোদুরে কাঠোর পিড়ি পেতে উনি বসেছিলেন। চুল কাটার সব সরঞ্জাম বাড়িতে রেখেছেন উনি। বারো ভূতের চুল-কাটা কাচি ক্ষুরে ওঁর বড় ঘেন্না, কার কী রোগ আছে বলা যায় না। ভরত তাই খালি হাতে এবাড়িতে আসে। এমনকি কাটা চুল থেকে গাঁ-বাঁচানোর জন্যে ত্রিশ বছরের পুরনো লং ক্লথ যেটা এই মুহূর্তে সরিৎশেখর জড়িয়ে বসে আছেন সেটাও আনতে হয় না।

কিচকিচ শব্দ করে উঠছিল ভারতের দুই আঙুলের চাপে। বেশিক্ষণ মাথা নিচু করতে পারেন না বাবু, তাই মাঝে-মাঝে হাত সরিয়ে নিচ্ছিল অত। আজ ত্রিশ বছর এই বাড়ির চুল কাটছে ও, অনেককেই জন্মাতে দেখেছে, মরতেও। বিয়ে দিয়ে এনেছে কয়েকজনকে। কিন্তু এখন আর তেমন জোর নেই ওর। কেমন যে ও পুরনো হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারে না। এই বাড়ির সেজোবাবু ওর কাছে চুল কাটে না। একদিন বলতেই হেসে উঠেছিল, কেন বাবা, আমাকে আর দয়া না-ই-বা করলে, তোমার বাটিছাট নেবার পার্টি এ-বাড়িতে অনেক আছে। বাবা টু অনি। অল ফাউন্ড দুটাকা! মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ভরতের হ্যাঁ, দুটাকায় ও সবাইয়ের এমনকি ঝাড়ির চুলটাও কেটে দেয়। প্রথম ছিল আট আনা, বছর পাঁচেক আগে বেড়ে গিয়ে দুটাকা হল।

সরিৎশেখর মাথা তুলতেই হাত সরিয়ে নিল ভরত হাজাম, তোর কাছে এই শেষ চুল কাটা, না? ভরত কোনো উত্তর দিল না। বাবুর চাকরি, শেষ, এই বাগান থেকে শহরে বাড়ি করে বাবু চলে যাচ্ছেন। এই মাথার কালো চুলগুলো চোখের সামনে ফুলের মতো সাদা হয়ে গেল-আজ ত্রিশ বছর ধরে এই মাথার চুল কেটেছে ও, আর কোনোদিন কাটতে পারবে না। লোকমুখে শুনেছে ও, বাবু নাকি এই বাগানে আর কোনোদিন পা দেবেন না। কথাটা ভাবতেই বুকের মধ্যে কেমন করে উঠল। পানসে চোখে জল আসতে লাগল।

হঠাৎ সরিৎশেখর বললেন, ভরত, যাবার সময় এই খুরচিগুলো নিয়ে যাস। খুব চাইতিস তো এককালে?

সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড চিৎকার করে কেঁদে উঠল ভরত। দুহাতে মুখ গুঁজে ফেঁপাতে লাগল বাচ্চা ছেলের মতো।

কান্নার শব্দ শুনে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। রান্নাঘরে অনিকে খেতে দিচ্ছিলেন মাধুরী, শব্দ শুনে এঁটোহাতে একছুটে বেরিয়ে এল অনি, পিছনে পিছনে মাধুরী। ঝাড়িকাকু ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে হাসছে। মহীতোষকে দেখে মাথায় ঘোমটা তুলে দিরেন মাধুরী। শ্বশুরমশাই পিছন ফিরে বসে, সামনে ভরত হাজাম মাটিতে বসে কাঁদছে। একটু আগে স্নান হয়ে গেছে মহীতোষের। এই বাড়িতে লুঙ্গি পরা নিষেধ ছিল এককালে। মহীতোষ নিয়ম ভেঙ্গেছেন। শীতকাল নয় তবু ঠাণ্ডা আছে, তাই লুঙ্গির ওপর পুরোহাতের গেঞ্জি চাপাননা। অনি দেখল পিসিমা দাদুর কাছে এগিয়ে গেলেন। মহীতোষ বারান্দায় দাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে। সরিৎশেখর মুখ ঘুরিয়ে সবাইকে দেখলেন। অনি দেখল দাদুর মুখ কেমন করে কাঁদছে কেন? চুল কাটার সময় ব্ৰত এমন করে ওর ঘাড় ধরে থাকে যেন অনিরই কান্না পেয়ে যায়। একটু নড়াচড়া করলে মাথায় গাঁট্টা মারে। আবার মন ভালো থাকলে গানও শোনায় কাঁচি চালাতে চালাতে। একটা গান তো অনিরই মুখস্থ হয়ে গেছে-বুড়া কাঁদে বুড্ডি নাচে, বুড়া বোলে ভাগো। মা অবশ্য খুব বারণ করে দিয়েছে গানটা গাইতে। কিন্তু বাবা দাদু বাড়িতে না থাকলে ছোটকাকু গলা ছেড়ে ঠাট্টা করে গানটা মাঝে-মাঝে গায়।

সরিৎশেখর গম্ভীর গলায় বললেন, মহী, আমি যখন এখানে থাকব না তখন যেন ভরতের এবাড়িতে আসা বন্ধ না হয়।

মহীতোষ বললেন, কী আশ্চর্য, বন্ধ হবে কেন?

সরিৎশেখর বললেন, আর ও তো বুড়ো হয়ে গেছে, যখন চুল কাটা ছেড়ে দেবে তখনও যেন প্রতি মাসে টাকা দেওয়া হয়।

মহীতোষ হাসলেন, আচ্ছা।

পিসিমা জিজ্ঞাসা করলেন, ও বাবা, এইজন্যে ভরত কাঁদছে?

সরিৎশেখর মাথা নাড়লেন, না। তারপর ঘাড় ফিরিয়ে হেঁকে উঠলেন, আয় বাবা ভরত, বাকি চুলটা কেটে দে, আমি সারাদিন বসে থাকতে পারব না।

বাঁধাছ্যাঁদা শেষ। টুকিটাকি যাবতীয় জিনিসপত্র পিসিমা জড়ো করেছেন। চিরকালের জন্য যেন স্বৰ্গছেঁড়া ছেড়ে চলে যাওয়া-এই যে মাধুরী মহীতোষরা এখনে থাকছেন একথাটা আর মনে নেই। শহরে গিয়ে অসুবিধে হতে পারে বলে পুরো সংসারটা তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন পিসিমা। অনির জামাকপড় বাক্সে তোলা হয়ে গিয়েছে। সময়টা যত গড়িয়ে যাচ্ছে অনির বুকের ভেতর তত কী খারাপ লাগছে! অথচ দাদুর মুখ দেখে মোটেই মনে হচ্ছে না, এখান থেকে যেতে একটুও খারাপ লাগছে। এই চা-বাগান নাকি দাদু নিজের হাতে তৈরি করেছেন। দাদুর তো বেশি মন-কেমন করা উচিত। বরং দাদু চলে যাচ্ছেন শুনে এত যে লোকজন দেখা করতে আসছে, তাদের সঙ্গে বেশ হেসে হেসে দাদু কথা বলছেন। মাঝে আর একটা দিন। পনেরোই আগষ্ট। তার পরদিনই চলে যেতে হবে এখান থেকে। বাগান থেকে দুটো লরি দেবে মালপত্র নিয়ে যেতে-আজ অবধি অনি শহরে যায়নি কখনো।

অন্ধকারে অনি চারপাশে চোখ বোলাল। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এখন রাত কটা? ভোর পাঁচটার সময় বিশু আর বাপী ওদের বাড়ির সামনে আসবে। রাত্রে শোওয়ার সময় মাধুরী অনির জন্য সাদা শার্ট কালো প্যান্ট ইস্ত্রি করিয়ে রেখে দিয়েছেন। পাঁচটা বাজতে আর কত দেরি! অনির মোটেই ঘুম আসছিল না। ওর বুকের ওপর মাধুরীর একটা হাত নেতিয়ে পড়েছে। ওপাশে মহীতোষের নাক ডাকছে। কান খাড়া করে অনি কিছুক্ষণ শুনতে চেষ্টা করল বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে কি না। যাক বাবা, বৃষ্টি হচ্ছে না। কাল সারাটা দিন যদিও রোদের দিন গেছে, তবু সন্ধেনাগাদ মেঘ-মেঘ করছিল। হঠাৎ মাধুরীর হাতটা একটু নড়ে উঠতে অনি চমকে উঠল। মাধুরীর শরীর থেকে অদ্ভুত মিন্ধি গন্ধটা বেরুচ্ছে। আর একদিন একটা রাত – মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিতে মাধুরীর ঘুম ভেঙে গেল! জড়ানো গলায় বললেন, আঃ, ঠেসছিস কেন? আর সঙ্গে সঙ্গে অনি শুনতে পেল কে যেন তার নাম ধরে বাইরে ডাকছে। তড়াক করে উঠে পড়ল ও। মাধুরী জিজ্ঞাসা করলেন, কী হল? অনি বলল, ওরা এসে গেছে। অনি দেখল, ওর গলা শুনে মহীতোষের নাক ডাকা থেমে গেল। বাবার ঘুমটা অদ্ভুত, অনি ঠিক বুঝতে পারে না।

পাটভাঙা জামাপ্যান্ট, বুকে কাগজের গান্ধীর ছবি পিন দিয়ে এঁটে, হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে বীরের মতো পা ফেলে অনি বাইরের ঘরে এসে দাঁড়াল। বাইরের ঘরের জানালা খুলে দেওয়া হয়েছে। দরজাও খোলা। বাইরে এখনও আলো ফোটেনি। অন্ধকারটা ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। সেই ফ্যাকাশে অন্ধকারটা ঘরময় জুড়ে রয়েছে। ঘরের একপাশে ইজিচেয়ারে সরিৎশেখর চুপচাপ বসে আছেন। আনির পায়ের শব্দে উনি মুখ ফিরিয়ে ওকে দেখলেন। দাদু এভাবে বসে আছেন কেন? দাদু কি কাল রাত্রে ঘুমোননি? দাদুর মুখটা অমন দেখাচ্ছে কেন? হাত বাড়িয়ে সরিৎশেখর অনিকে ডাকলেন, কোথায় চললে?

স্কুলে। আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। অনি বলল।

স্বাধীনতা মানে জান? সরিৎশেখর বললেন।

হ্যাঁ, আমরা নিজেরাই নিজেদের রাজা এখন। অনি শোনা কথাটা বলল।

গুড। গো অ্যাহেড। এগিয়ে যাও। পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন সরিৎশেখর।

ওকে দেখে বিশু বলল, তাড়াতাড়ি চল, আরম্ভ হয়ে গেল বলে।

বাপী বলল, কাল রাত্রে তোদের রেডিওটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল, না?

অনি বলল, জানি না তো!

বাপী বলল, কাল বারোটার সময় সবাই রেডিও শুনতে গিয়ে দেখে খারাপ হয়ে গিয়েছে। বাবা বাড়ি ফিরে বলল। অনি ব্যাপারটা জানে না, ও শুনেছিল রাতে রেডিওতে নাকি কিসব বলবে, কিন্তু ওদের রেডিওটাই খারাপ হয়ে গেল, যাঃ!

দেরি হয়ে গেছে বলে ওরা দৌড় শুরু করল। আসাম রোডের দুপাশে সার দিয়ে দাঁড়াননা পাইনদেওদার গাছের শরীরে অন্ধকার ঝুপসি হয়ে বসে আছে। রাস্তাটা এখন স্পষ্ট দেকা যাচ্ছে। পুব দিকটায় একটি লালচে আভা এসেছে। ওরা তিনজন পাশাপাশি তিনটে পতাকা সামনে ধরে দৌড়াচ্ছিল। হাওয়ায় পতাকা তিনটে পতপত করে উড়ছে; একটু শীতের ভাব থাকলেও বেশ আরাম লাগছে ছুটতে। অনির ভারি ভালো লাগছিল। আর আমরা নিজের রাজা নিজে। দৌড়তে দৌড়তে বাপী চিল্কার করল, পনেরোই আগস্ট, ওরা চিৎকার করে জবাব দিল, স্বাধীনতা দিবস। এখন এই রাস্তার চারপাশে কেউ জেগে নেই। নির্জন আসাম রোডের ওপর ছুটে-চলা তিনটে বালকের চিৎকার শুনে একরাশ পাখি দুদিকের গাছের মাথায় বসে কলরব করে জানান দিল। ভারতবর্ষের কোন এক কোণে এই নিঝুম প্রান্তরে সাতচল্লিশ সালের পনেরোই আগস্টের এই ভোর-হতে-যাওয়া সময়টায় তিনটে বালক কী বিরাট দায়িত্ব নিয়ে পতাকা উঁচু রেখে দৌড়তে দৌড়তে গান ধরল, ওদের একটিমাত্র শেখা গান, ধন্যধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা। দৌড়বার তালে অনভ্যস্ত গলার সুর ভেঙেচুরে যাচ্ছে, তবু দুপাশের প্রকৃতি যেন তা অঞ্জলির মতো গ্রহণ করছিল।

স্কুলবাড়ির কাছাকাছি এসে ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল। এখনও আলো ফোটেনি, কিন্তু কষ্ট করে অন্ধকার খুঁজতে হয় । ওরা দেখল একটি মূর্তি খুব সতর্ক পায়ে রাস্তার একপাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বিশু বলল, রেতিয়া না রে

ওরা তিনজন তিন পাশে গিয়ে দাঁড়াতে রেতিয়া চমকে সোজা হয়ে দাড়াল, মুখটা ছুঁচলো করে, শংকর চোখ দুটো বন্ধ করে কিছু টের পেতে চেষ্টা করর। গলা ভারী করে অনি জিজ্ঞাসা করল, কাঁহা যাহাতিস রে?

চট করে উত্তর এল, স্কুল। ওরা-মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, তারপর আবার দৌড় শুরু করল। অনি ঠিক বুঝতে পারছিল না রেতিয়ার কাছে কী করে খবর গেল যে আজ স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা মানে আমি নিজেই নিজের রাজা। রাজার ইংরেজি কিং। বাবারা তাস খেলার সময় কিংকে সাহেব বলে। আমরা আজ থেকে সব সাহেব হয়ে গেলাম। রেতিয়া পর্যন্ত।

স্কুলের মাঠটা এই সাতসকালে প্রায় ভরে গেছে। ওদের বাগান থেকে মাত্র ওরা তিনজন কিন্তু ওপাশের বাজার, হিন্দুপাড়া কলিন পার্ক থেকে ছেলেমেয়ের দল এসে মাঠটা ভরিয়ে দিয়েছে। স্কুলের সামনে একটা লম্বা বাঁশ পোঁতা হয়েছে যার ডগা থেকে একটা দড়ি নিচে নামানো। পাশে টেবিলের ওপর মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ছবি। এই নামটা অনি সবে শিখেছে। এত বড় নাম মনে না থাকলে গান্ধীজি বলা যেতে পারে, নতুন দিদিমণি বলেছেন। ভবনী মাস্টারকে দেখে অবাক হয়ে গেল ও। ধোপভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি পরলেও অনেককে ভালো দেখায় না, ভবানী মাস্টারকেও কেমন দেখাচ্ছে। তার ওপর মাথায় সাদা নৌকো-টুপি। সুভাষচন্দ্র বসুর ছবিতে দেখেছে ও। নতুন দিদিমণি গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। টেবিলের ওপাশে দুটো চেয়ার, একটাতে ব্যানার্জি স-মিলের বড় কর্তা, অন্যটাতে মোটামতন একটা লোক নৌকো-টুপি পরে বসে ঘড়ি দেখছেন মাঝে-মাঝে।

অনিরা ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেল। স্বৰ্গছেঁড়ার বেশ বড় বড় কয়েকজন ছেলে যারা স্কুলে পড়ে না তারা ভিড় ম্যানেজ করছিল। পূর্বদিকটা ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। ব্যানার্জি স-মিলের বড়কর্তা ভবানী মাস্টারকে ডেকে ফিসফিস করে কী বলতে ভবানী মাস্টার হাত তুলে সবাইকে শান্ত হতে বললেন। গোলমাল থেমে যেতেই নতুন দিদিমণি চিল্কার করে উঠলেন, বন্দে-এ মারতম্। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকশো শিশুর গলায় উঠল, বলে-এ মাতরম্। তিনবার এই ধ্বনিটা উচ্চারণ করে অনির মলে হল ওদের চারপাশে অদ্ভুত একটা ফুলের দেওয়াল তৈরি হয়ে গেছে। ভবানী মাস্টার চিৎকার করে উঠলেন, তোমরা জান, আজ ইংরেজদের দাসত্বমোচন করে আমরা স্বাধীন হয়েছি। দুশো বছর পরাধীনতার পরে আমাদের ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, গান্ধীজির জন্যে আজ এই দেশে স্বাধীনতা এসেছে। নতুন দিদিমণি ফিসফিস করে কিছু বলতেই ভবানী মাস্টার বললেন, হ্যাঁ, এইসঙ্গে সুভাষ বোসের নাম ভুলে গেলে চলবে না।। স্বাধীনতা এই পুণ্যদিনে আমরা সমবেত হয়েছি। তোমরা যা এখনও নাবালক তারা শশানো, এই দেশটাকে ছিড়ে শুষে নষ্ট করে দিতে চেয়েছে ইংরেজরা। এই দেশটাকে নিজের মায়ের মতো ভেবে নিয়ে তোমাদের নতুন করে গড়তে হবে। বলল সবাই বন্দে মাতরম্। অনিরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল, বন্দে মাতরম্। অনি দেখল ভবানী মাস্টারের চোখ থেকে জল নেমে এসেছে, তিনি মোছর চেষ্টা করছেন না। সেই অবস্থায় ভবানী মাস্টার বললেন, তাকিয়ে দ্যাখো পূর্ব দিগন্তে সূর্যদের উঠেছেন। এই মহালগ্নে আমাদের স্বর্গছেড়ার আকাশে প্রথম জাতীয় পতাকা উড়বে। শহর থেকে বিশিষ্ট জননেতা শ্রীযুক্ত হরবিলাস রায় মহাশয় আজ আমাদের এখানে এসেছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অবদানের কথা আমরা সবাই জানি। আমি তাঁকে অনুরোধ করছি এই পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণ করতে। সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। স্বৰ্গছেঁড়ার মানুষের জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে যার গুরুত্ব সম্পর্কে কেউ হয়তো কোনোদিন সচেতন ছিল না। এখন এই মুহূর্তে সবাই উন্মুখ হয়ে দাড়িয়ে।

হরবিলাসবাবু দাড়ালেন, সামনের জনতার ওপর ওঁর বৃদ্ধ চোখ দুটো রাখলেন খানিক, তারপর খুব পরিচ্ছন্ন গলায় বললেন, আজ সেই মুহূর্ত এসেছে যার জন্য আমরা সারাজীবন সগ্রাম করেছি। গান্ধীজির অনুগামী আমি, আমাদের সগ্রাম শান্তির জন্য, ভালোবাসার জন্য। কিন্তু আমার তো বয়স হয়েছে। এই পতাকা আমার যৌবনের স্বপ্ন ছিল, একে আমি আমার রক্তের চেয়ে বেশি ভালোবাসি। আজ এই পতাকা মাথা উঁচু করে আকাশে উড়বে-এই দৃশ্য দেখার জন্যই আমি বেঁচে আছি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এই পতাকা আকাশে তোলার যোগ্যতা আমার নেই। এই পতাকা তুলবে আগামীকালের ভারতবর্ষের দায়িত্ব যাদের ওপর তারাই যোগ্যতা আমার নেই। এই পতাকা তুলবে আগামীকালের ভারতবর্ষের দায়িত্ব যাদের ওপর তারাই। সাতচল্লিশ সালের পনেরোই আগস্টের এই সকাল তাদের সারাজীবন দেশগড়ার কাজে শক্তি যোগাবে। তাই আমি আগামীকালের নাগরিকদের মধ্যে একজনকে এই পতাকা তোলার জন্য আহ্বান করছি। সবাই অবাক হয়ে কথাগুলো শুনল। হরবিলাসবাবু কয়েক পা এগিয়ে এসে সামনের দিকে তাকালেন। তার চোখ ছোট ছোট ছেলেদের মুখের ওপর, কাকে ডাকবেন তিনি ভাবছেন। হঠাৎ অনি দেখল হরবিলাসবাবু তার দিকে তাকিয়ে আছেন । খানিকক্ষণ দেখে তিনি আঙুল তুলে অনিকে কাছে ডাকলেন। অনি প্রথমে বুঝতে পারেমি যে তাকেই ডাকা হচ্ছে। বোঝমাত্রই ওর বুকের মধ্যে দুদুক শুরু হয়ে গেল। হাঁটুর তলায় পা দুটোর অস্তিত্ব যেন হঠাৎই নেই। বাপী ফিসফিস করে বলল, তোকে ডাকছে, যা।

হরবিলাসবাবু ডাকলেন, তুমি এসো ভাই।

কী করবে ভেবে না পেয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল অনি। স্বর্গহেঁড়ার ছেলেমেয়ের দল অনির দিকে তাকিয়ে আছে। হরবিলাসবাবু এক হাতে অনিকে জড়িয়ে ধরে পতাকার কাছে নিয়ে গেলেন। ভবানী মাস্টার বাশের গায়ে জড়ানো দড়িটা খুলে অনিকে ফিসফিস করে বললেন, এইদিকের রশিটা টানবা, পুঁটলিটা একদম ডগায় গেলে রশিটা জোরে নাচাবা।

অনি সম্মোহিতের মতো মাথা নাড়ল। হরবিলাসবাবু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী ভাই?

অনি, অনিমেষে।

হরবিলাসবাবু সোজা হয়ে সামনের দিকে তাকালেন, আপনারা সবাই প্রস্তুত হোন। এখন সেই ব্রাহ্মণমুহুর্ত, আমাদের জাতীয় পতাকা স্বাধীন ভারতের আকাশে মাথা উঁচু করে উড়বে। তাকে তুলে ধরছে আগামীকালে ভারতবর্ষে অন্যতম নাগরিক শ্রীমান অনিমেষ। কথাটা শেষ হতেই ভবানী মাস্টার ইঙ্গিত করে অনিমেষকে দড়িটা টানতে বললেন।

দুহাতে হঠাৎ যেন শক্তি ফিরে পেল অনি, সমস্ত শরীরে কাঁটা দিচ্ছে, মা কোথায়-মা যদি দেখত, অনি দড়িটা ধরে টানতে লাগল। এপাশের দড়ি বেয়ে একটা রঙিন পুঁটলি উঠে যাচ্ছে, ওদিকে দড়ি নেমে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে হরবিলাসবাবু চিৎকার করে উঠলেন, বন্দে মাতরম। সঙ্গে সঙ্গে স্বৰ্গছেঁড়া কাঁপিয়ে চিক্কার উঠল, বন্দে মাতরম্। চিক্কারটা থামছে না, একের পর এক ডাকের নেশায় সবাই পাগল সেইসঙ্গে শখ বাজতে লাগল। নতুন দিদিমণি ব্যাগ থেকে শখ বের করে গাল ফুলিয়ে সেই ডাকে সঙ্গে মিলিয়ে সেই শখধনি করতে করতে লাগলেন। অনি তাকিয়ে দেখল পুঁটলিটা ওপরে . উঠে গেছে। দড়িটা ধরে ঝাকুনি দিতেই চট করে সেটা খুলে গিয়ে ঝুরঝুর করে কিসব আকাশ থেকে অনির মাথার ওপর ঝরে পড়তে লাগল। অনি দেখল একরাশ ফুলের পাপড়ি ওর সমস্ত শরীর ছুঁয়ে নিচে পড়ছে আর সকালের বাতাস মেখে প্রথম সূর্যের আলো বুকে নিয়ে তিনরঙা পতাকা কী দরুণ গর্বে দোল খাচ্ছে। চারধারে হইহই চিৎকার, এ ওকে জড়িয়ে ধরছে আনন্দে, কারও কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। ওপরের ঐ গর্বিত পতাকার দিকে তাকিয়ে অনির মনে হল ও এখনও ছোট, পতাকাটা ওর নাগালের অনেক বাইরে।

সরিৎশেখর ফেয়ারওয়েল নিতে রাজি হলেন না। পনেরোই আগষ্টের দুপুরে হে সাহেব নিজে গাড়ি চালিয়ে সরিৎশেখরের কাছে এলেন। সরিৎশেখর তখন বারান্দায় বেতের চেয়ারে অনিকে নিয়ে। বসে ছিলেন। আর স্বৰ্গছেঁড়ায় অনি একটা খবর হয়ে গিয়েছে। হরবিলাসবাবু অনিকে দিয়ে প্রথম জাতীয় পতাকা তুলিয়েছেন, এই কথাটা সবার মুখে-মুখে ঘুরছে। পতাকা তোলার পর ছবি তোলা হয়েছে অনিকে সামনে রেখে। ভবানী মাস্টার বলেছেন ছবিটা বাঁধিয়ে স্কুলের বারান্দায় টাঙিয়ে রাখবেন। খবরটা শুনে সরিৎশেখর সেই যে অনিকে সঙ্গে রেখেছেন আর ছাড়তেই চাইতেন না।

হে সাহেবের বাড়ি স্কটল্যাণ্ডে। চা-বাগানের ম্যানোজারি করে গায়ের রঙটা সামান্য নষ্ট হলেও আচার-আচরণে পুরো সাহেব। গাড়ি থেকে নামতেই সরিৎশেখর উঠে দাঁড়ালেন। এই দীর্ঘ তাঁদের মধ্যে কেউ তার বিরুদ্ধে অসৌজন্যের অভিযোগ করতে পারেননি। ম্যাকফার্সন সাহেব একসময় অভিযোগ করতেন সরিৎশেখর কংগ্রেসিদের সঙ্গে বেশি মেশামেশি করছেন, হিন্দু-মুসলমান গননার সময় তিনি কংগ্রেসকে সাহায্য করেছেন, কিন্তু সেটা ছিল তাদের অন্তরঙ্গ ব্যাপার। এ নিয়ে ম্যাকফার্সন সাহেব ওপরতলায় কোনোদিন রিপোর্ট করেননি।

হ্যালো বড়বাবু! হে সাহেব হাসলেন, হেসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সরিৎশেখর করমর্দন করে সাহেবকে চেয়ারে বসালেন। হঠাৎ অনির ভবানী মাস্টারের কথা মনে পড়ে গেল। ইংরেজ সাহেবরা আমাদের দেশটাকে ছিড়ে শুষে নিয়ে চলে গেছে। সবাই তো যায়নি, এই হে সাহেব তো এখনও দাদুর সামনের চেয়ারে বসে হাসছেন। দাদু ওঁর সঙ্গে অমন ভালোভাবে কথা বলছে কেন? আজ তো আমরা নিজেরাই নিজেদের রাজা। বড় খারাপ লাগছিল অনির।

হে সাহেব বললেন, আমি খবর পেলাম তুমি নাকি ফেয়ারওয়েল নিতে রাজি হচ্ছ না! বাংলা বরেন সাহেব, ভাঙা-ভাঙা, তবে বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। কথাটা বলার সময় সাহেবের মুখ-চোখ খুব গম্ভীর দেখাল।

সরিৎশেখর হাসলেন, আমাকে তোমরা তাড়িয়ে দিতে চাইছ?

সাহেব বললেন, সে কী, একথা কেন বলছ? এই টি-এস্টেট তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। ফেয়ারওয়েল মানে কি তাড়িয়ে দেওয়া

সরিৎশেখর হাসলেন, দ্যাখো সাহেব, আমি জানি এই বাগানের সবাই আমাকে ভালোবাসে। আজ সবাই আমাকে ভালো কথা বলে উপহার দেবে এবং আমি সেগুলো নিয়ে চুপচাপ চলে যাব, ব্যাপারটা ভাবতে অস্বস্তি লাগছে।

সাহেব বললেন, কিন্তু এটাই তো প্র্যাকটিস।

খুব ধীরে ধীরে সরিৎশেখর বললেন, আজ আমাদের ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে। দুশো বছর পর তোমাদের হাত থেকে ক্ষমতা ফিরে পেয়েছি। এমন দিনে আমাকে ফেয়ারওয়েল দিও না, নিজেকে বড় অক্ষম মনে হবে। আমাকে তো বেঁচে থাকতে হবে!

হে সাহেব সরিৎশেখরের দিকে কিছুক্ষণ স্থিরচোখে তাকালেন, তারপর মাথা নিচু করলেন, আই আন্ডারস্ট্যাণ্ড। তবে আমরা তো কমন পিপল। ওয়েল, তোমার ফেয়ারওয়েলে যদি আমি না থাকি তা হলে তোমার আপত্তি আছে।

চট করে উঠে দাঁড়ালেন সরিৎশেখর, উঠে এসে হে সাহেবের হাত জড়িয়ে ধরলেন, কী বলছ সাহেব। আমি তোমাকে হেয় করতে চাইনি। তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কের মধ্যে আমি বিশ্বাস করি কোনো তিক্ততা নেই। তোমার পুর্বপুরুষ আমার পূর্বপুরুষের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল, তার জন্যে তুমি দায়ী হবে কেন? তুমি তো জান আমি অ্যাকটিভ পলিটিক্স কোনোকালে করিনি। আর আমি জানি এখন ভারতবর্ষের যাঁরা নেতা হবেন তাদের সঙ্গে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কোনো যোগাযোগ থাকবে না। তবু আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস-এটা একটা আলাদা ফিলিংস-আমার মনে হচ্ছে আমি যৌবনে ফিরে গিয়েছি-তুমি ফেয়ারওয়েল দিয়ে আমাকে বুড়ো করে দিও না।

হে সাহেব উঠে দাদুর একটা হাত ধরে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগরেন, পেছনে অনি। হে সাহেব বললেন, বাবু, এবার বোধহয় আমাকে দেশে ফিরে যেতে হবে। কোম্পানি ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট ইন্ডিয়ায় হয়তো বিজনেস করতে চাইবে না। সো, আমাদের হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না। বাট, আমি চিরকাল এই দিনগুলো মনে রাখব, আমি জানি তুমিও ভুলবে না।

দাদু কিছু বললেন না। সাহেব গাড়িতে উঠে অনির দিকে তাকালেন, তারপর হাত নেড়ে ললেন, কনগ্রাচুলেশন, আওয়ার ইয়ং হিরো!

গাড়িটা চলে যেতে অনি দাদুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দাদুর পাশে দাঁড়ালে ওর নিজেকে ভীষণ ছোট লাগে। সরিৎশেখর নাতির কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে লাগলেন হঠাৎ। পায়চারি করে বেড়াবার মতো ওঁরা আসাম রোডে এসে পড়লেন। অনি দেখছিল, দাদু কোনো কথা বলছেন না, মুখটা গভীর। বাড়ির সবাই ওকে খুব ভয় করে, কিন্তু অনির সঙ্গে উনি এরকম মুখ করে থাকেন না। অনেকক্ষণ থেকে সাহেব সম্পর্কে একগাদা জিজ্ঞাসা অনির মনে ছটফট করছিল। হাঁটতে হাঁটতে সে বলল, দাদু, সাহেবকে তুমি কিছু বললে না কেন?

সরিৎশেখর আনমনে বললেন, কেন, কী বলব?

অনি অবাক হল, কেন? ওরা আমাদের দেশটাকে ছিড়ে শুষে নষ্ট করে দেয়নি।

সরিৎশেখর চমকে নাতির দিকে তাকালেন, ও বাবা, তুমি এসব কথা কোথেকে শিখলে? নিশ্চয় ভবানী মাস্টার বলেছে?

ঘাড় নাড়ল অনি, হ্যাঁ, বলো না মিথ্যে কথা না সত্যি কথা?

দুদিকে মাথা দোলালেন সরিৎশেখর, মিথ্যে নয় আবার সবটা সত্যি নয়। শোননা ভাই, কেউ কাউকে নষ্ট করতে পারে না। সাহেবরা যখন এসেছিল আমরা ওদের হাতে দেশটাকে তুলে দিয়েছিলাম; ওরা নিজেদের স্বার্থে দেশটাকে ব্যবহার করবেই। কিন্তু হাতের পাঁচ আঙুল কি সমান? কেউ-কেউ তো অত্যাচারী–ও হতে পারে। যেমন ধরো এই হে সাহেব, ওরা যে আমাদের প্রভু, আমরা যে পরাধীন তা কোনোদিন ওঁর ব্যবহারে টের পাইনি। যেই আমরা স্বাধীন হলাম সব সাহেব খারাপ হয়ে গেল তা বলি কী করে?

দুপাশে বড় বড় দেওদার, শাল তাদের ডালপালা দিয়ে আকাশ ঢেকে রেখেছে, ছায়া-ছায়া পথটায় ওঁরা হাঁটছিলেন । হাঁটতে হাঁটতে সরিৎশেখর বললেন, আজ যদি তুমি কলকাতায় থাকতে তা হলে কত কী দেখতে পেতে। কত উৎসব হচ্ছে সেখানে আমরা তো এখানে কিছুই বুঝতে পারি না, আজ অবধি এই স্বৰ্গছেঁড়ায় একদিনও আন্দোলন হয়নি। এখানকার বাগানের কুলিকামিনরা স্বাধীনতা মানেই জানে না। বরং আজ যদি সাহেব চলে যায় ওরা কাঁদবে। কিন্তু কলকাতা হল এই দেশের প্রাণকেন্দ্র, আমাদের ফুসফুসের মতো। কত আন্দোলন হয়েছে সেখানে, কত মানুষ মরেছে পুলিশের গুলিতে।

কেন, মরেছে কেন? পুলিশ কেন গুলি করবে? অনি বলল।

হাসলেন সরিৎশেখর, তুমি যে-জামাটা পরে আছ, কেউ যদি সেটা চায় তুমি দিয়ে দেবে?

কেন দেব? আমার জামা আমি পরব।

কিন্তু ধরো জামাটা একদিন তার ছিল, তুমি পেয়ে গেছ বলে পরছ, তা হলে? তুমি ভাবছ এখন  এটা তোমার সম্পত্তি, কিন্তু সে ফিরিয়ে নেবে বলে ঝামেলা করছে, ব্যস, লেগে যাবে লড়াই।

অনি বলল, জামাটা যদি আমার না হয় তা হলে আমি ফিরিয়ে দেব।

মাথা নাড়লেন সরিৎশেখর, সেটাই উচিত, কিন্তু বড়রা এই কথাটা বোঝে না।

অনেকক্ষণ চুপচাপ হেঁটে যাওয়ার পর অনি বলল, আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবে দাদু

নাতির দিকে তাকালেন সরিৎশেখর, কলকাতায় তুমি একদিন যাবেই দাদু। তবে যেদিন যাবে নিজে যাবে, কারোর সঙ্গে যেও না।

অনি বলল, কেন?

সরিৎশেখর বললেন, এখন তো তুমি ছোট, আরও বড় হও তখন বুঝবে। শুধু মনে রেখো, কলকাতায় যখন তুমি যাবে তখন যোগ্যতা নিয়ে যাবে। তোমাকে তার জন্য সাধনা করতে হবে, মন দিয়ে পড়াশুনা করতে হবে। অনেক বড় নেতা হবে তুমি-স্বাধীন দেশের মাথা-উঁচু করা নেতা।

দাদুর কথাগুলো ঠিক ঠিক বুঝতে পারছিল না অনি। তবে ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত একটা শিহরন বোধ করছিল ও। আজ ভোরবেলায় ছুটে যেতে যেতে বন্দে মাতরম্ বলে চিৎকার করার সময় যে-ধরনের গায়ে-কাঁটা-ওঠা কাপুনি এসেছিল ওর হঠাৎ সেইরকম হল। এই নির্জন রাস্তায় দাদুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অনি মনেমনে চিৎকার করে যেতে লাগল, বন্দে মাতরম্।…

কখন যেন ভোর হয়ে গেল, ঝকমকে রোদ উঠল, কিন্তু স্বৰ্গছেঁড়া চা-বাগানের ফ্যাক্টরিতে আজ ভে বাজল না। কিন্তু একটি টি করে মদেসিয়া ওঁরাও মানুষের দল ঘর ছেড়ে বেরুতে লাগল। সরিৎশেখরের কোয়ার্টারের সামনে যে বিরাট মাঠটা চাপাগাছ বুকে নিয়ে রয়েছে তার এক কোণে এসে চুপচাপ বসে থাকল।

কখন যেন ভোর হয়ে গেল, : রিশেখর নিজেই টের পাননি। কদিন থেকেই রাতের বেলা এলে তার ঘুম চলে যায়। একা একা এই ঘরে জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে চোখ রেখে তিনি অদ্ভুত সব ছবি দেখতে পান। খোলা চোখ কখন দৃষ্টিহীন হয়ে মনের মতো করে কিছু চেহারা তৈরি করে দেখতে শুরু করে দেয়। যাবার সময় যত এগিয়ে আসছে তত এটা বাড়ছে, চোখ তত সাদা হয়ে থাকছে। চূড়ান্তা হয়ে গেল আজ রাতটায়। কাল যে খাওয়াদাওয়া চুকে গেলে শুয়েছেন বিছানায়, এই নোদওঠা সময় অবধি ঘুমই এল না।

কান্নাকাটির ধাত সরিৎশেখরের কোনোকালেই ছিল না। বরং খুব কঠোর বা নিষ্ঠুর বলে একটা কুখ্যাতি ছিল ওঁর সম্বন্ধে। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে স্বৰ্গছেড়ছেড়ে চলে যাবার সময় এরকম কে হচ্ছে। সারাটা জীবন এখানে কাটিয়ে নতুন জায়গায় যাহার অস্বস্তিতে নতুন জায়গায় যে তিনি নিজেই চেয়েছিলেন, কর্মহীন হয়ে এই স্বৰ্গছেঁড়ায় থাকতে কিছুতেই চান না তিনি। তা হলো কাল রাত্রে এটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন উনি। উঠোনের লিচুগাছটার মাথায় অন্ধকার জমে গিয়ে ঠিক বড়বউ এর পেছন ফিরে চুল খুলে দাঁড়াবার মূর্তি হয়ে গিয়েছে। চমকে গিয়েছিলেন তিনি। সে কত বছর আগের কথা। বড়বউ-এর মুখটা এখন আর মনে পড়ে না। চোখ ভাবতে গেলে চিবুকের ডোলাটা হারিয়ে যায়, নাকটা খুব টিকলো ছিল না মনে আছে, কিন্তু সব মিলিয়ে পুরো মুখটা যে কিছুতেই মনে পড়ে না। অনির মুখের দিকে তাকালে হঠাৎ-হঠাৎ বড়বউ-এর মুখটা চলকে ওঠে। মহীতোষ বড়বউ-এর ছেলে, কিন্তু মায়ের কোনো ছায়া ওর মধ্যে নেই। আবার মহীতোষের ছেলেকে দেখে সরিৎশেখরের কেন যে বড়বউ-এর কথা মনে আসে কে জানে! তা সেই অস্পষ্ট হয়ে-যা বড়বউকে কাল রাত্রে অন্ধকারমাখা লিচুগাছটা ঠিক আস্ত ফিরিয়ে এনে দিল। রাত্রে শোবার আগে হারিকেনের দিকে তাকিয়ে চুল আঁচড়াত বড়বউ। পিছন থেকে সরিৎশেখর তার মুখ দেখতে পেতেন না, চুঁইয়ে-আসা আলো খোলা চুলের ধারগুলোয় গুটিসুটি মেরে থাকত। ঠিক সেইরকম হয়েছিল কাল রাতে লিচুগাছটার।

কিন্তু বড়বউকে নিয়ে কিছু ভাবতে গেলেই যা হয় তা-ই হয়েছিল। হুড়মুড় করে ছোটবউ এসে যায়। ছোটবউ একদম স্পষ্ট। কুড়ি বছর আগের সেই ছটফটে চেহারা বড়বউ-এর ঠাণ্ডা এবং অস্পষ্ট চেহারাকে লহমায় মুছে দেয়। বড় বউ-এর সময় ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। স্বৰ্গছোড়ায় ফটোর দোকান ছিল না। ছোটবউ-এর সময় সরিৎশেখর নিজে বইপত্তর পড়ে ছবি তোলা এবং তার ওয়াশপ্রিন্টিং শিখে নিয়েছিলেন। এখন এই কোয়ার্টারের দেওয়ালে ছোটবউ-এর মুখ ফ্রেমে বাধানো হয়ে অন্তত তিন জায়গায় রয়েছে। ছোটবউ দপদপিয়ে চলাফেরা করত, তাই যখন সে চলে গেল সরিৎশেখর বুকের গভীরে দগদগে ঘা তৈরি হয়ে গেল। বড়বউ কখন এল কখন গেল, কোনো অনুভূতি তৈরি হল না। কিন্তু কাল সারারাত ধরে এই দুটি বিপরীত চরিত্রের মেয়ে বারবার নিজেদের স্বভাব নিয়ে সরিৎশেখরের কাছে ফিরে ফিরে এসেছে। স্বৰ্গছেঁড়ার এই বাড়ির চৌহদ্দিতে যাদের অস্তিত্ব সীমায়িত তারা সরিৎশেখরকে এই যাবার আগে রাতে শেষবারের জন্য ঘুমোতে দিল না।।

কখন যেন ভোর হয়ে গেল, বাতাবিলেবু গাছটায় বসে একটা দাঁড়কাক কেমন করুণ গলায় ডাক শুরু করে দিল, জানলার তার গলে বিছানায় সকালে রোদ আলোছায়ায় নকশা কাটা শুরু করে দিল অনি টের পায়নি। কাল রাত্রে মায়ের কাছে শুয়ে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছিল ও। আজ এই সকালে স্বপ্নটা যেন তাকে ছেড়ে যেতে চাইছে না। স্বপ্নটার কথা মনে হতেই ও আর-একবার ঝালিশে মুখ খুঁজে কেঁদে নিল। কাল রাতে মায়ের পাশে শুয়ে শুয়ে সেই মিষ্টি গন্ধটা পেতেই বুকটা কেমন করে উঠেছিল। আজ শেষ রাত, কাল থেকে আর মাকে এমন করে পাব না, এই বোধটা যত বাড়তে লাগল তত চোখ ভারী হয়ে উঠছিল। শেষে ছেলের কান্না শুনে মাধুরী ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কী হল? অনি অনেকক্ষণ কোনো জবাব দেয়নি। মাধুরী, অনেক বুঝিয়েছিলেন, কী হল? অনি অনেকক্ষণ কোনো জবাব দেয়নি। মাধুরী অনেক বুঝিয়েছিলেন। অনিকে অনেক বড় হতে হবে, লেখাপড়া শিখতে হবে। এখানে স্বৰ্গছেঁড়ায় তো ভালো স্কুল নেই। প্রত্যেক ছুটিতে অনি যখন এখানে আসবে তখন নুতন নতুন গল্প শুনবেন মাধুরী ওর কাছে। অনি যখন বলল, তোমাকে ছেড়ে আমি কী করে থাকব মা, তখন মাধুরীর গলাটা একদম পালটে গেল, আমি তো সবসময় তার সঙ্গে আছি রে বোকা! অনি হঠাৎ টের পেল ওর বুকের কান্নাটা মায়ের বুকের ভেতর চলে গেছে। আর একটু হলেই মা অনির মতো কেঁদে ফেলবে। খুব শক্ত হয়ে গেল অনির শরীর। টানটান করে সিটিয়ে শুয়ে রইল। মাকে কষ্ট দিলে মহাপাপ হয়, পিসিমা বলছে। তারপর সেইভাবে শুয়ে থেকে কখন যে ঘুম এসে গেল ও জানে না। কে যেন তার হাত ধরে হাঁটতে লাগল, তার মুখ সে দেখতে পাচ্ছে না। ক্রমশ তার শরীর বড় হয়ে যেতে লাগল। সে দেখল অনেকেই তার মতো হাঁটছে, অজস্র লোক। যে-লোকটার সঙ্গে ও যাচ্ছিল সে বলল আগে যেতে হবে, সবার আগে যেতে হবে। অনির মনে হল সবাই এক কথাই ভাবছে। অনি দৌড়াতে লাগল। অনেকে পড়ে যাচ্ছে, আবার উঠছে। হঠাৎ অনি দেখল ওর সামনে কেউ নেই, পেছনে হাজার হাজার লোক। কে যেন ফিসফিসিয়ে বলল, গলা খুলে চ্যাঁচাও। ও দেখল ভবনী মাস্টার ওর পেছনে। অনি সমস্ত শরীর নেড়ে ডাক দিল, বন্দে মাতরম্। কানের পর্দা ফেটে যাবার উপক্রম হল সেই ডাকের সাড়ায়। এইভাবে এগোতে এগোতে অনি থমকে দাঁড়াল। সামনেই একটা খাদ, তার তলা দেখা যাচ্ছে না। খাদের কাছে বুকে অনি বলল, বন্দে মাতরম্। সঙ্গে সঙ্গে নিচ থেকে একটা গমগমে গলা বলে উঠল, মানে কি অনি মানেটা খুঁজতে গিয়ে শুনল নিচ থেকে যে যেন বলছে, বোকা ছেলে, আমার কাছে আয়। অনি অবাক হয়ে দেখল অনেক নিচে মায়ের মুখ, ওর দিকে তাকিয়ে হাসছেন। অনির ঘুম ভেঙে গেল।

এখন এই সকালে ওর মনে পড়ে গেল ভবানী মাস্টার বলে দিয়েছিলেন বন্দে মাতরম্ শব্দের মানে কী। এখন এই মুহূর্তে দাদুর সঙ্গে শহরে যেতে ওর একদম ইচ্ছে করছে না। স্বৰ্গছেঁড়ার এই বাড়ি, মায়ের গন্ধ, সামনের মাঠের চাপাগাছ আর পেছনে ঝিরঝিরে নদীটা ছেড়ে না গেলে যদি বড় না হওয়া যায় তাতে ওর বিন্দুমাত্র এসে যায় না।

তিনটে লরিতে মালপত্র বোঝাই হচ্ছে। পিসিমা সমস্ত বাড়ি ঘুরে এসে ঠাকুরঘরে ঢুকেছেন। মহীতোষ দাড়িয়ে থেকে দেখছেন কুলিরা লরিতে মালপত্র ঠিকঠাক রাখছে কি না। প্রিয়তোষ দাঁড়িয়ে ছিল বারান্দায়, তাকে লরির ওপর উঠে তদারকি করতে বলে মহীতোষ ঘরে এলেন। সরিৎশেখরের খাওয়াদাওয়া হয়ে গিয়েছিল আগেই, এখন যাবার জন্য জামাকাপড় পরে একদম প্রস্তুত। সকাল থেকে অনেকবার তাগাদা দিয়েছেন সবাইকে, বিকেল হয়ে গেলে তিস্তা পেরুতে জোড়া নৌকো পাওয়া যাবে না। সেই সাতসকালে খেয়েদেয়ে বসে আছেন। ঘরভরতি এখন লোক। স্বৰ্গছেঁড়া চা-বাগানের বুরা তো আছেনই, আশেপাশের বাস্ক টিম্বার-মার্চেন্টরাও এসেছেন। ঘরে ঢোকার আগে মহীতোষ দেখে এসেছেন সামনের মাঠটা মানুষের মাথায় ভরে গেছে। চা-বাগানের সমস্ত মদেসিয়া-মুণ্ডা-ওঁরাও শ্রমিকরা একদৃষ্টে এই বাড়ির দিকে চেয়ে আছে। ফুটবল মাঠেও এত ভিড় হয় না।

সরিৎশেখর ছেলেকে দেখে বললেন, হয়ে গেছে সব?

মহীতোষ বললেন, একটু বাকি আছে।

সরিৎশেখর বললেন, কী যে কর তোমরা, বারোটা পঞ্চাশের পর যাওয়া যাবে না, বারবেলা পড়ে যাবে। তাড়াতাড়ি করতে বলো সবাইকে।

মহীতোষ ভেতরে এসে দেখলেন মাধুরী একটা ছোট সুটকেসে অনির জামাকাপড় ভরে সেটাকে দরজার পাশে রাখছেন। মহীতোষ বললেন, অনি কোথায়?

মাধুরী বললেন, এই তো এখানেই ছিল। মোটেই যেতে চাইছে না।

যাবার জন্য লাফাচ্ছিল এতদিন, এখন যেতে চাইছে না বললে হবে! মহীতোষ কেমন বিষণ্ণ গলায় বললেন।

দ্যাখো, যা ভালো বোঝ করো। বলে মাধুরী ভেতরে চলে গেলেন।

মহীতোষ বাড়ির ভেতরে ছেলেকে পেলেন না। বাগানের দিকে উকি মেরে দেখলেন সেখানে কেউ নেই। যাবার সময় হয়ে গেল অথচ ছেলেটা গেল কোথায়। গোয়ালঘরের পেছনে এসে মহীতোষ থমকে দাঁড়ালেন। অনিকে দেখা যাচ্ছে। মাটিতে উবু হয়ে বসে আছে। ডাকতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নাডেকে নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। এখান থেকে অনির মুখ দেখা যাচ্ছে না বটে কিন্তু ফোপানির শব্দটা শোনা যাচ্ছে। এইভাবে নির্জনে বসে ছেলেটাকে কাঁদতে দেখে মহীতোষ কেমন হয়ে গেলেন। সাধারণ ছেলেমেয়ের মতো ও চটপটে নয়, কিন্তু ঐ বয়সের ছেলের চেয়ে ওর বুদ্ধিটা অনেক বড়, বেশিরকম বড়। কথা যখন বলে তখন ওর বয়েসের ছেলের মতো বলে না। সরিৎশেখর ওকে বেশি স্নেহ করেন, বোধহয় পৃথিবীতে একমাত্র অনিই সরিৎশেখরের মন নরম করতে পারে। এখন ছেলেকে কাঁদতে দেখে মহীতোষের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। এই একান্নবর্তী পরিবারে ছেলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আলাদা করে নয়। বলতে গেলে ঝাড়ির সঙ্গে যতটুকু কথা হয় অনির সঙ্গে সেইটুকুই হয়। অনি শহরে চলে যাবে বাবার সঙ্গে, লেখাপড়া শিখবে-এরকম কথা ছিল। কিন্তু এইমাত্র মহীতোষের মনে হল তার ছেলে এখন থেকে তার সঙ্গে থাকছে না।

দুহাত বাড়িয়ে অনিকে কোলে তুলে নিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন মহীতোষ। উবু হয়ে বসে ফোপাতে ফোঁপাতে অনি মুঠোয় করে মাটি তুলছে। ওর সামনে একটা রুমাল পাতা। রুমালটার অনেকটা সেই মাটিতে ভরতি। ব্যাপারটা কী, ও রুমালে মাটি রাখছে কেন? শেষ পর্যন্ত অনি যখন রুমাল বাধতে শুরু করল মহীতোষ নিঃশব্দে পিছু ফিরলেন। ছেলের এই গোপন সংগ্রহ দেখে ফেলেছেন-এটা ওকে বুঝতে দেওয়া কোনোমতেই চলবে না। গোয়ালঘর পেরিয়ে এসে উকি মেরে দেখলেন অনি উঠে দাঁড়িয়েছে। এক হাতে চোখ মুছছে, অন্য হাতে রুমালের পুঁটলিটা ধরা। আড়াল থেকে মহীতোষ হাঁক দিলেন, অনি, অনি! ছেলের সাড়া না পেয়ে আবার ডাকলেন। এবার খুব আস্তে, ক্ষীণ গলায় অনি সাড়া দিতে মহীতোষ উঁচু গলায় বললেন, ওখানে কী করছ! দাদু যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়েছেন, তাড়াতাড়ি চলে এসো। খাটা বলে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না মহীতোষ।

ঘর থেকে সবাই বারান্দায় নেমে দাড়িয়েছে। বাড়ির সামনে দাঁড়ানো লরিগুলোর গা-ঘেঁষে মানুষের জটলা। মালপত্র বাধা শেষ, প্রিয়তোষ ঘরে ঢুকে সরিৎশেখরকে বলল, আর দেরি করবেন না, বেলা হল।

কথাটা শোনার জন্যই বসে ছিলেন সরিৎশেখর, তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে বললেন, চলি তা হলে।

ডাক্তার ঘোষাল বললেন, একদম ভুলে যাবেন না আমাদের।

সরিৎশেখর বললেন, সে কী! তোমাকে ভুলব কী করে হে, তুমি যে আমার-কথাটি বলতে গিয়ে থমকে গেলেন উনি।

এখন এই পরিবেশে ওঁদের সেই চিরকেলে ঠাটাটা একদম মানায় না। সরিৎশেখর থেমে গেলেও ডাজার ঘোষাল বাকিটুকু মনেমনে জুড়ে নিলেন, বউটাকে মেরেছ!

কথাটা তো নেহাত ইয়ার্কি করে বলা, সবাই জানে। ডাক্তার ঘোষালের হাত চট করে সরিৎশেখর জড়িয়ে ধরলেন, কিছু মনে কোরো না ডাক্তার। ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

এবার মহীতোষকে সরিৎশেখর বললেন, তোমার দিদি কোথায়?

মহীতোষ বললেন, সবাই রেডি।

সরিৎশেখর বললেন, নি!

গম্ভীর গলার ডাকটা ভেতরে যেতেই অনির বুকটা কেঁপে উঠল। ভিতরের ঘরে খাটের ওপর মা এবং পিসিমার মধ্যে অনি বসে ছিল। বাগানের অন্য বাবুদের স্ত্রী ও মেয়েরা ভিড় করেছে সেখানে। পিসিমা চলে যাচ্ছে বলে সবাই দেখতে এসেছে। খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিশু, বাপী। ওদের দিকে তাকাচ্ছে না অনি। ওর চোখ জলে অন্ধ। দ্বিতীয়বার ডাকটা আসতে মাধুরী আঁচল দিয়ে ছেলের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন, যা।

কাঁপতে কাঁপতে অনি বাইরের ঘরে এসে দাড়াতে সরিৎশেখর নাতিকে আপাদমস্তক দেখলেন, দেখে হাসলেন, কী হয়েছে তোমার?

ডাক্তার ঘোষাল বললেন, বোধহয় মন-খারাপ।

সরিৎশেখর কী ভাবরেন খানিক, তা হলে ও থাক।

কথাটা শুনেই অনির সমস্ত শরীরে হইচই পড়ে গেল। দাদুর দিকে তাকাতে গিয়ে বাবার গলা শুনল ও, না, এখন যাওয়াই ভালো। এখানে তো পড়ানা হবে না।

মুহূর্তে বেলুনটা ফুটো হয়ে সব হাওয়া হল করে বেরিয়ে গেল যেন। সরিৎশেখর ডাকলেন, হেম!

অনি অবাক হয়ে দেখল পিসিমা ঠাকুরের মূর্তিটা পুঁটলিতে নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালেন। পিসিমাকে এখন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মাথায় ঘোমটা, গরদের কাপড়ের ওপর সাদা চাদর। মহীতোষও দিদিকে দেখছিলেন। দিদির ভালো নাম যে হেমলতা তা যেন খেয়ালই ছিল না। সরিৎশেখর অনেকদিন পর দিদির নাম ধরে ডাকলেন। এই স্বৰ্গছেঁড়ায় সবার কাছে উনি দিদি বা বউদি। হেম বলে ডাকার লোক খুব বেশি নেই।

সরিৎশেখর বললেন, হেম, এই ছেলেটিকে আমরা নিয়ে যাচ্ছি, আজ থেকে এর সব ভার তোমার ওপর, যদ্দিন ও কলেজে না ওঠে। মনে থাকবে তো?

পিসিমাকে ঘোমটার মধ্যে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে দেখল অনি, আপনি যা বলবেন। . সরিৎশেখর এবার মাধুরীকে ডাকলেন। ঘরে আর কেউ কোনো কথা বলছে না। মাধুরী এসে হেমলতার পাশে দাড়াতে সরিৎশখর বললেন বউমা, আমি চললাম। এখানে আর আমার পিছুটান নেই। তোমাকে আমি পছন্দ করে আমাদের সংসারে এনেছিলাম, এই সংসারের ভার তোমার ওপর দিয়ে যাচ্ছি। আর মা, তোমার পুত্রটিকে আমার হাতে দিতে তোমার আপত্তি নেই তো?

মাধুরী ঘাড় নাড়লেন। সরিৎশেখর বললেন, ঠিক আছে, তুমি দেখো, এই কাঁচা সোনাকে কীভাবে পাকা সোনা করে ফিরিয়ে দিই। কথাটা বলে অনিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন সরিৎশেখর। অনি দেখল মা একহাতে ঘোমটা ঠিক করতে গিয়ে শাড়ির পাড় চোখের তলায় চেপে রাখল।

হে সাহেব চেয়েছিলেন যে, সরিৎশেখর প্রাইভেট কারে শহরে যান। কিন্তু সরিৎশেখর রাজি হননি। লরির সামনে.ড্রাইভারের পাশে তো অনেক জায়গা আছে, আলাদা করে গাড়ির দরকার নেই। মহীতোষ বারান্দায় এসে দেখলেন কুলি-সর্দাররা, সব সামনে দাঁড়িয়ে, পেছনে অনেক মুখ।

মহীতোষের পেছনে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে সরিৎশেখর এসে দাঁড়াতেই একটা গুঞ্জন উঠল। সরিৎশেখর কিছুটা বিব্রত হয়ে সামনে তাকালেন। একজন সর্দার এগিয়ে এল, এসে সরিৎশেখরের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে চিৎকার করে উঠল, কাহা যাতিস রে মো সব ছোড়কে?

সরিৎশেখর বললেন, কেন?

লোকটা তেমনি চিৎকার করে বলল, কিনোর এখানে থাক, আমাদের বাবা হয়ে থাক, তোকে আমরা যেতে দেব না। সঙ্গে সঙ্গে আর-একজন সর্দার চিৎকার করে উঠল, বাবা যাবেক নাই। আর সেই একটা গলার সঙ্গে সমস্ত মাঠ গলা মেলাল। সরিৎশেখর দেখলেন বহু সর্দার ওদের মধ্যে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আছে সেরাও। এদের প্রায় প্রত্যেককে কয়েকটা ছেলেছোকরা বাদে তিনি চেনেন। চিৎকার সমানে বাড়ছিল। মহীতোষ সরিৎশেখরকে বললেন, কী ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না, কী করবেন?

ডাক্তারবাবু বললেন, আমি দেখছি। তারপর সামনে এগিয়ে তিনি হাত উঁচু করে সবাইকে থামতে বললেন, চিক্কারটা কমে এল। ডাক্তারবাবু বললেন, তারা বাবাকে যেতে দিবি না বলছিস কিন্তু বাবার যে চাকরি নেই-তা জানিস?

একজন সর্দার বলল, এই চা-বাগান বাবা তৈরি করেছে, বাবা যতদিন জীবিত থাকবে তাকে চাকরি করতে দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তার সমর্থনে আওয়াজ উঠল।

এবার সরিৎশেখর বারান্দা থেকে নেমে সর্দারদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই তাঁকে ঘিরে ধরল । সরিৎশেখর সামনের কালো কালো বিচলিত মুখগুলোর দিকে তাকালেন, আমাকে তোরা যেতে দে। সারাজীবন তো চাকরি করলাম, একটু বিশ্রাম চাই রে।

একজন সর্দার বলল, আমাদের কে দেখবে? কার কাছে যাব?

সরিংশেখর বললেন, আরে বোকা, এখন তোরা স্বাধীন, এখন ভয় কী? তোদের চার-পাঁচজন মিলে একটা দল কর। সবাই সেই দলকে সুবিধে-অসুবিধে জানাবো ঐ দলই সাহেবের সঙ্গে কথা বলে দাবি আদায় করবে, ব্যস।

সর্দাররা সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। হঠাৎ বকু সর্দার এগিয়ে সরিৎশেখরের পায়ে ঝাপিয়ে পড়ল। কোনো কথা নয়, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে সেটা সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ল অন্য মুখগুলোতে। সরিৎশেখর এইসব সরল মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করলেন যে তার নিজের চোখের আগল কখন খুলে গেছে, বয়স্ক শুকনো গালের চামড়ার ওপর ফোঁটা ফোঁটা জলবিন্দু পড়ায় অদ্ভুত শান্তি লাগছে। অথচ কোনো শোক তকে কাঁদতে পারেনি এতদিন।

হয়তো কান্নার জন্যেই প্রতিবোধ নরম হয়ে সরে গেল। অনি দেখল পিসিমা মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। ঝাড়িকাকু এবং প্রিয়তোষ লরির ওপর উঠল। মহীতোষ প্রথমে লরির সামনে ড্রাইভারের পাশে অনিকে তুলে দিলে হেমলতা তার পাশে উঠে বসলেন। সরিৎশেখর ঐসব বোবা মুখের দিকে তাকিয়ে লরিতে উঠতে গিয়ে থমকে দাড়ালেন। ভিড় কাটিয়ে বিলাস ছুটে আসছে। সরিৎশেখরের হাতে একটা বিরাট মিষ্টির হাঁড়ি ধরিয়ে দিয়ে ভ্যা করে কেঁদে ফেলল সে। সরিৎশেখর । হাঁড়িটা অনির হাতে দিতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়ে গেল। দুজন সর্দার ফিসফিস করে কী বলে মাথার পাগড়ি সরিৎশেখরের পায়ের সামনে টানটান করে ধরে থাকল। আর কয়েকশো মানুষ এগিয়ে এসে একআনা, দুআনা, লাল পয়সা, ফুটো পয়সা ফেলতে লাগল তাতে। ডাক্তার ঘোষাল মালবাবু, মনোজ হালদার সব দাড়িয়ে এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখছে। ক্রমশ কাপড়টার মাঝখানে পয়সা উঁচু হচ্ছিল।

সরিৎশেখর অদ্ভুত গলায় বললেন, ডাক্তার, তোমরা ফেয়ারওয়ালের কথা বলেছিলে না, পৃথিবীতে কেউ এর চেয়ে বড় ফেয়ারওয়েল পেয়েছে?

মহীতোষ সঙ্গে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মাধুরী একা থাকবেন বলে সরিৎশেখর নিষেধ করেছেন। সঙ্গে তো প্রিয়তোষ যাচ্ছেই, কোনো অসুবিধে হবে না। তাছাড়া দুদিন আগে লোক পাঠিয়ে জলপাইগুড়ির বাড়ি ধুয়েমুছে পরিষ্কার করিয়ে নিয়েছেন। ঘড়ি দেখলেন তিনি, আর একদম সময় নেই। ড্রাইভার উঠে বসল, তার পাশে অনি। অনির পাশে হেমলতা, তার গায়ে দরজার ধারে সরিৎশেখর কোলে খুচরা পয়সার পুঁটলিটা নিয়ে বসে আছেন। ড্রাইভারকে স্টার্ট নেবার ইঙ্গিত করতে যেতেই সরিৎশেখর টের পেলেন গাড়িটা দুলছে। তারপর গাড়িটা একটু একটু করে চলতে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার উঠল, বাবা যায়-ধেউসি রে, আউড় ঘোড়া-দেউসি রে। ড্রাইভার অসহায়ের মতো বসে রইল স্টিয়ারিং ধরে, গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ও। দুজন সর্দার পাদানির ওপর লাফিয়ে উঠে অন্যান্যকে নির্দেশ দিতে লাগল ঠেলার জন্য। ক্রমশ মাঠ পেরিয়ে লরি আসাম রোডে পড়ল। পিছনের গাড়িটাকে কেউ ঠেলছে না, কিন্তু সেটাও স্পীড নিতে পারছে না এই লরির জন্য।

অনি দেখছিল সামনের কাচের ওপর একটা হনুমানের ছবি, এক হাতে পাহাড় বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, বুকে রাম-সীতার ছবি। কাচের ওপাশে আকাশ। আলো করে দেখার জন্য উঠে দাঁড়াতেই ওর নজরে পড়ল ওদের সরির সঙ্গে বাগানের কুলিরা হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা জুড়ে। সামনের দিক থেকে আসা গাড়িগুলো রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে গেছে পরপর। সবাই হন দিচ্ছে কিন্তু কেউ তাতে কান দিচ্ছে না। হঠাৎ অনির নজরে পড়লে রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেই বিরাট বটগাছের তলায় মুখ উঁচু করে রেতিয়া দাড়িয়ে আছে। কাছাকাছি হতে অনি চিৎকার করে উঠল, রেতিয়া! সঙ্গে সঙ্গে সরিৎশেখর আর হেমলতা ওর দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। কিন্তু অনির সেদিকে নজর নেই। ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রেতিয়ার অন্ধ চোখ দুটোর পাতা কেঁপে উঠল। ঠোঁট দুটো গোল হয়ে যেন কিছু বলল। কী বলল সেটা সম্মিলিত চিৎকারে শোনা গেল না। ক্রমশ সামনের কাচের মধ্যে থেকে রেতিয়ার মুখ মুছে গেলে অনির বুকের মধ্যে অনেকক্ষণের জমা কান্নাটা ছিটকে বেরিয়ে এল। হেমলতা এক হাতে ঠাকুরের পুঁটুলি সামলে অন্য হাতে অনিকে বুকে টেনে নিলেন।

সরিৎশেখর ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিলেন। এভাবে লরি ঠেলে ওরা কদুর যাবে? যেভাবে ওরা যাচ্ছে তাতে উৎসাহে ভাটা পড়ার কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। পাশে পাদানিতে দাঁড়ানো সর্দারকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কদুরে যাবি তোরা? খুব যেন উৎসাহ হচ্ছে এইরকম মেজাজে সে জবাব দিল, তোর ঘর তক্‌।

বলে কী। জলপাইগুড়ি অবধি পায়ে হেঁটে ওরা হয়তো যেতে পারে, কিন্তু তাতে তো মাঝরাত হয়ে যাবে! সরিৎশেখর ড্রাইভারকে স্টার্ট নিতে ইঙ্গিত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভটভট করে ইঞ্জিনটা হুঙ্কার ছাড়ল। সরিৎশেখর দেখরেন শব্দ শুনে সামনের লোকজন লাফ দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল। সেই সুযোগে ড্রাইভার স্পীড বাড়িয়ে দিল চটপট, মুহুর্তে জনতা চিষ্কার করে উঠল, কিন্তু ততক্ষণে ওঁরা অনেক দূরে চলে এসেছেন। পিছনের গাড়িটাও বোধহয় সেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, সরিৎশেখর দেখলেন সেটাও পিছন পিছন আসছে। ডুডুয়া নদীর পুলের কাছে এসে সরিৎশেখরের খেয়াল হল সর্দার দুজন এখনও পাদানিতে দাড়িয়ে আছে। আর আশ্চর্য এই যে, গাড়ি ছুটে যাচ্ছে ওদের নিয়ে-এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই যেন, হাসিহাসি মুখ করে ছুটন্ত হাড়িটা হাওয়া মুখচোখে মাখছে দুজন।

গাড়ি থামাতে বলরেন সরিৎশেখর। তারপর নিচে নেমে সর্দার দুটোকে ডাকলেন। ওরা মাথা নিচু করে কাছে আসতে বললেন, এবার তোরা যা, আর এই টাকাগুলো রাখ। লাইনের লোকজনকে আজ রাত্রে আচ্ছাসে ভোজ দিবি। পকেট থেকে কয়েকটা দশটাকার নোট বের করে ওদের হাতে খুঁজে দিলেন তিনি। সর্দার দুটো চকচকে নতুন নোট হাতে নিয়ে কী করবে বুঝতে পারছিল না। সরিৎশেখর আর সুযোগ দিলেন না ওদের, গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

তার সারাজীবনের স্মৃতি বুকে নিয়ে স্বৰ্গছেঁড়া ক্রমশ পেছনে চলে যেতে লাগল।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *