রিষ্ট ওয়াচের দিকে চেয়ে লাইলী চমকে উঠল। তারপর বই খাতা নিয়ে ইতিহাসের ক্লাস করার জন্য পা বাড়াল। সে লাইব্রেরীতে বসে একটা নোট লিখছিল। তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে এসে সিঁড়িতে উঠার সময় সেলিমের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তার হাত থেকে বই-খাতাগুলো নিচে পড়ল।

ইয়া আল্লাহ একি হল বলে লাইলী কি করবে ভেবে ঠিক করতে না পেরে সেলিমের দীর্ঘ বলিষ্ঠ স্বাস্থ্য ও পৌরষদীপ্ত চেহারার দিকে লজ্জামিশ্ৰিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সব কিছু ভুলে গেল।

আর সেলিমও তার দিকে চেয়ে খুব অবাক হল। এতরূপ যে কোনো মেয়ের থাকতে পারে, সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। লাইলীর টকটকে ফর্সা গোলগাল মুখটা শুধু দেখা যাচ্ছে। কারণ সে বোরখা পরে রয়েছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর লাইলী নিজেকে সামলে নিয়ে বই-খাতা কুড়াতে লাগল।

এতক্ষণে সেলিমের খেয়াল হল, তারও তো অন্যায় হয়েছে। সে তখন তাড়াতাড়ি করে দু-একটা বই তুলে তার হাতে দিতে গেলে আবার চোখা-চোখ হয়ে গেল, আর দু’জনের অজান্তে হাতে হাত ঠেকে গেল।

লাইলী চমকে উঠে ‘হায় আল্লাহ’ বলে বইসহ নিজের হাতটা টেনে নিল।

সেলিম মৃদুকণ্ঠে বলল, অনিচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য মাফ চাইছি।

লাইলী তার দিকে কয়েক সেকেণ্ড চেয়ে থেকে সিঁড়িতে উঠতে আরম্ভ করল।

সেলিম বলল, শুনুন।

লাইলী যেতে যেতে ঘুরে শুধু একবার তাকিয়ে দ্রুত চলে গেল।

সেলিম তার চলে যাওয়া দেখল। তারপর চিন্তিত মনে লাইব্রেরীতে ঢুকে চেয়ারে সে এতদিন ভার্সিটিতে পড়ছে, কই এই মেয়েটিকে তো এর আগে বলে মনে হচ্ছে না? অবশ্য সে বোরখাপরা মেয়েদের মোটেই পছন্দ করে না। সেইজন্য হয়তো ওকে দেখেনি। ওদের সোসাইটিতে কত সুন্দরী আছে। তাদের সঙ্গে এই মেয়ের কোনো তুলনা হয় না। এত নিখুঁত সুন্দরী এই প্রথম সে দেখল। সেলিমের মনে হল, মেয়েটি যেন একটা ফুটন্ত গোলাপ। লম্বা পটলচেরা চোখের উপর মিশমিশে কালো ভ্রূ-দু’টো ঠিক একজোড়া ভ্রমর, কম্পিত পাপড়িগুলো তাদের ডানা। ওর মায়াবী চোখের কথা মনে করে সেলিম র হারিয়ে ফেলল। কতক্ষণ কেটে গেছে তার খেয়াল নেই। বন্ধু যখন বলল, কিরে একটা বই আনতে এত দেরি হয় বুঝি? তারপর ভালো করে তাকিয়ে আবার বলল, তুই বসে বসে এত গভীরভাবে কি ভাবছিস বলতো।

সেলিম নিজেকে ফিরে পেয়ে বলল, একটা এ্যাকসিডেন্ট করে ফেলেছি।

এ্যাকসিডেন্ট করেছিস? কই দেখি কোথায় লেগেছে? কি করে করলি?

ইচ্ছা করে করিনি, হঠাৎ হয়ে গেছে। তবে শরীরের কোনো জায়গায় ব্যথা পাইনি, পেয়েছি এখানে বলে নিজের বুকে হাত রাখল।

রেজাউল কিছু বুঝতে না পেরে বলল, হেঁয়ালি রেখে আসল কথা বল।

বলব দোস্ত বলব, তবে এখন নয়। আগে ব্যথাটা সামলাতে দে, তারপর বুঝলি?

ঠিক আছে তাই বলিস। এখন যে বইটার জন্য এসেছিলি সেটা নিয়ে চল, ওরা সবাই অপেক্ষা করছে।

সেলিম আলমারী থেকে স্ট্যাটিসটিকস এর একটা বই নিয়ে দু’জনে ক্লাসে রওয়ানা দিল। সেদিন লেকচারার এ্যাবসেন্ট থাকায় ওরা কয়েকজন ক্লাসে বসে গল্প করছিল। কবির নামে সেলিমের আর এক বন্ধু কাছে এসে বলল, এই অঙ্কের উত্তরটা মিলছে না কেন বলতে পারিস?

তার প্রশ্ন শুনে আরও কয়েকজন ছেলে এসে অঙ্কটা দেখে বলল, আমরাও পারিনি।

সেলিম ততক্ষণে অঙ্কটা কষতে আরম্ভ করে দিয়েছে। অল্পক্ষণের মধ্যে অঙ্কটা শেষ করে উত্তর মিলিয়ে দিল।

সকলে দেখে বলল, তুই গোঁজামিল দিয়ে করেছিস। ঐ ফরমূলা আমরা কোথাও পাইনি।

সেলিম বলল, অমুক বইতে ফরমুলাটা আছে। দাঁড়া, বইটা লাইব্রেরী থেকে নিয়ে আসি। বইটা তাড়াতাড়ি করে আনার জন্য তিনতলা থেকে নামার সময় নিচের তলার সিঁড়ির শেষ ধাপে লাইলীর সঙ্গে ধাক্কা লাগে। রেজাউলের সঙ্গে বইটা নিয়ে এসে ক্লাসের সবাইকে ফরমুলাটা দেখল।

সেলিম স্ট্যাটিসটিকস-এ অনার্স পড়ে। এটা তার ফাইন্যাল ইয়ার। ক্লাসের মধ্যে সেরা ছাত্র। বিরাট বড়লোকের ছেলে। গুলশানে নিজেদের বাড়ি। তাদের কয়েকটা বীজনেস। তারা দুই ভাই এক বোন। সেলিমই বড়। দুবছরের ছোট আরিফ। বোন রুবীনা সকলের ছোট। সে ক্লাস টেনে পড়ে। ওদের ফ্যামিলী খুব আল্টমডার্ণ। শুধু নামে মুসলমান। ধর্মের আইন-কানুন মেনে চলা তো দূরের কথা, ধর্ম কি জিনিষ তাই হয়তো জানে না। পিতা হাসেম সাহেব গত বছর থাম্বোসীসে মারা গেছেন। তিনি বীজনেস মেনেজমেন্টে বিদেশ থেকে ডিগ্ৰী নিয়ে এসে প্রথমে একটা কটন মিলের ম্যানেজার ছিলেন। হাসেম সাহেব একজন সুদৰ্শন পুরুষ। কর্মদক্ষতায় মালিকের প্ৰিয়পাত্র হয়ে তার একমাত্র কনাকে বিয়ে করে ভাগ্যের পরিবর্তন করেন। পরে নিজের চেষ্টায় আরও দু-তিন রকমের ব্যবসা করে উন্নতির চরম শিখরে উঠেন। বন্ধু বান্ধবদের তিনি বলতেন, ধর্ম মেনে চললে আর্থিক উন্নতি করা যায় না। জীবনে আর্থিক উন্নতি করতে হলে ধর্ম ও মৃত্যু চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়। অর্থাৎ ভুলে যেতে হবে। আর আল্লাহকে পেতে হলে মৃত্যুকে সামনে রেখে ধর্মের আইন মেনে চলতে হবে। তিনি আরও বলতেন, যৌবনে উপার্জন কর এবং ভোগ কর। তারপর বার্ধক্যে ধর্মের কাজ কর। তার এই মতবাদ যে ভুল, তিনি নিজেই তার প্ৰমাণ। প্রথমটায় কৃতকাৰ্য হলেও অকালে মৃত্যু হওয়ায় দ্বিতীয়টায় ফেল করেন।

সেলিমের যখন ইন্টারমিডিয়েটের সেকেণ্ড ইয়ার তখন আরিফ ম্যাট্রিকে সব বিষয়ে লেটার পেয়ে পাশ করল। পরীক্ষার পর কিছুদিন তবলীগ জামাতের সঙ্গে ঘুরে নিয়মিত নামায পড়তে লাগল। এইসব দেখে পিতা হাসেম সাহেব মাঝে মাঝে রাগারাগী করতেন।

কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হওয়ার পর যখন সে জানাল, মাদ্রাসায় ভর্তি হবে তখন তিনি রাগে ফেটে পড়লেন। ভীষণ বকাবিকি করার পর বললেন, ঐ ফকিরি বিদ্যা পড়ে ভবিষ্যতে পেটে ভাত জুটবে না। সব সময় পরের দয়ার উপর নির্ভর করে থাকতে হবে। ওসব খেয়াল ছেড়ে দাও, আর এখন তোমাকে নামাযসব বুড়ো বয়সের ব্যাপার। মা সোহানা বেগমও অনেক করে বোঝালেন। কিন্তু কারুর কথায় কিছু হল না। একদিন সকালে আরিফকে দেখতে না পেয়ে সবাই অবাক হল। কারণ সে প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে নামায পড়ে। আজ যখন বেলা আটটা বেজে যেতেও নাস্তার টেবিলে এল না। তখন সোহানা বেগম বললেন, দেখতো রুবীনা, তোর ছোটদা উঠেছে কিনা।

রুবীনা আরিফের ঘরে ঢুকে তাকে দেখতে পেল না। পড়ার টেবিলের উপর পেপার ওয়েট চাপা দেওয়া একটা কাগজের উপর দৃষ্টি পড়তে তাড়াতাড়ি করে কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে লাগল—

মা ও বাবা, তোমাদের দু’জনের পবিত্ৰ কদমে রইল হাজার হাজার সালাম। আমার মন আল্লাহ, রাসূল ও ধর্ম সম্বন্ধে জানার জন্য বড় অস্থির হয়ে পড়েছে। তোমরা আমাদেরকে সেই অমৃতের সন্ধান দাওনি। আল্লাহ পাকের রহমতে আমি সেই পথের সন্ধান পেয়েছি। তাই তোমাদের অজান্তে সেই অমৃত পাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। তোমাদের কথামত চলার অনেক চেষ্টা করলাম; কিন্তু মনকে কিছুতেই দমিয়ে রাখতে না পেরে চলে যেতে বাধ্য হলাম। তোমরা দোয়া কর-আল্লাহপাক যেন আমার মনের বাসনা পূরণ করেন। তোমরা আমার খোঁজ করবে না। কারণ তাতে কোনো ফল পাবে না।
ইতি
তোমাদের অবাধ্য সন্তান
আরিফ

পড়া শেষ করে রুবীনা ছুটে এসে কাগজটা বাবার হাতে দিয়ে বলল, ছোটদা চলে গেছে।

হাসেম সাহেব পড়ে রাগে কথা বলতে পারলেন না। কাগজটা স্ত্রীর হাতে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ-চাপ বসে থেকে উঠে ফোনের কাছে গিয়ে কয়েক জায়গায় ফোন করলেন। পরপর কয়েকদিন কাগজে আরিফের ফটো ছাপিয়ে সহৃদয় ব্যক্তিদের অনুসন্ধান জানাবার অনুরোধ করে বিজ্ঞাপন দিলেন। তারপর বেশ কিছুদিন খোঁজাখুঁজি করলেন। শেষে কোনো সংবাদ না পেয়ে হাল ছেড়ে দেন। এই ঘটনার দুবছর পর হাসেম সাহেব মারা গেলেন।

স্ত্রী সোহানা বেগম ব্যবসার সব কিছু বাড়িতে বসে দেখাশুনা করতে লাগলেন। তিনি গ্র্যাজুয়েট। সাতজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিয়ে একটা বোর্ড গঠন করে তাদের দ্বারা ব্যবসা চালাতে লাগলেন। প্রত্যেক দিন ম্যানেজার বাড়িতে এসে খাতা-পত্ৰ দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে যান। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি সেলিমকে সবকিছু দেখাশোনা করতে বলেছিলেন। সে রাজি হয় নি। ভীষণ জেদী ছেলে। বাপের মত এক রেখা। বলল, আগে পড়াশুনা শেষ করি, তারপর।

সেলিম একজন খুব ভালো ফুটবল খেলোয়াড়। জুডো, কারাত ও বক্সিং-এ পারদর্শি। নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে। তাদের দু’টো গাড়ি। অন্যটির জন্য একজন শিক্ষিত ডাইভার আছে। বন্ধু-বান্ধবী অনেক। আমীয়, অনামীয় ও ভার্সিটির কত মেয়ে তার পেছনে জোকের মত লেগে থাকে। সে সকলের সঙ্গে প্ৰায় সমান ব্যবহার করে। ফলে তারা সকলেই মনে করে, সেলিম তাকেই ভালবাসে। আসলে তাদের কাউকেই সে পছন্দ করে না। মনে কষ্ট পাবে বলে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে অনেকে গায়ে পড়ে ভাব করতে আসে। তারা তার চেয়ে তার ঐশ্বৰ্য্যকে বেশি ভালবাসে। তাই তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেও মনে মনে সবাইকে ঘৃণা করে। তাদের মধ্যে তার মামাত বোন রেহানা একটু অন্য টাইপের মেয়ে। দেখতে বেশ সুন্দরী আর খুব আল্টামডার্ণ। এ বছর বাংলায় অনার্স নিয়ে ভাসিটিতে ভর্তি হয়েছে। নিজেদের গাড়িতে করে প্রায় সেলিমদের বাড়িতে এসে তার  সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলে। সেলিমকে হারাতে না পারলেও সেও বেশ ভালই খেলে। তাকে অন্য সব মেয়েরা হিংসা করে।

সোহানা বেগমের ইচ্ছা ভাইঝিকে পুত্রবধূ করার। তুই একদিন খাবার টেবিলে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলেন, হ্যারে, তোর বান্ধবীদের মধ্যে কাউকে পছন্দ হয় নাকি?

সেলিম খাওয়া বন্ধ করে কয়েক সেকেণ্ড মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, হঠাৎ এরকম প্রশ্ন করছি কেন সে আশায় গুড়ে বালি, আমি এখন পাঁচ বছর বিয়ে করবে না।

সোহনা বেগম বললেন, তা না হয় নাই করলি, আমি বলছিলাম, রেহানাকে তার কি রকম মনে হয়?

সেলিম বলল, ভালোকে তো আর খারাপ বলতে পারব না, তবে ও খুব অহংকারী। মেয়েদের অহংকার থাকা ভালো না। এ বিষয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করো না, তা না হলে ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করব।

ছেলের কথা শুনে সোহানা বেগম আর কিছু বলতে সাহস করলেন না। কারণ তিনি জানেন, একবার বিগড়ে গেলে সত্যি সত্যিই ঘর ছেড়ে চলে যাবে। এরপর থেকে তিনি আর ছেলেকে বিয়ের ব্যাপারে কোনো কথা বলেন নি।

এদিকে আরিফ ঘর থেকে আসার সময় নিজের হাত খরচের জমান হাজার নিয়ে বেরিয়েছিল। আগেই সে একজন আলেমের কাছে শুনেছিল, বাংলাদেশ ও পাক-ভারত উপমহাদেশের মধ্যে উত্তর ভারতে দেউবন্দ ইসলামী শিক্ষার শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান। তাই সে মনে করল, যেমন করে হোক সেখানেই যাবে। সেখানে কিভাবে যাবে, তার খোঁজ খবর আগেই জেনে নিয়েছিল। ঘর থেকে আসার সময় একটা চিঠি লিখে রেখে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র একটা ব্যাগে নিয়ে কোচে করে খুলনায় এসে হোটেলে উঠল। হোটেলের একজন খাদেমকে বিনা পাসপোর্টে ভারতে যাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করতে সে দালাল ঠিক করে দিল। যশোরে ও খুলনায় এরকম অনেক লোক আছে, যারা বিনা পাসপোর্টধারীকে টাকার বদলে গোপনে বর্ডার পার করে দেয়। এইভাবে তারা বেশ টাকা রোজগার করে। আরিফ ধর্মশিক্ষা করিতে যাবে শুনে সে টাকা না নিয়েই তাকে বর্ডার পার করে দিল। আরিফ টাকা দিতে গেলে লোকটা বলল, বাবা, সারাজীবন এই অন্যায় কাজ করে অনেক রোজগার করেছি। আজ একজন ধর্মশিক্ষাত্রীর কাছ থেকে টাকা নিতে পারব না, নিলে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবে না।

আরিফ ঐদিন কলিকাতায় পৌঁছে রাত্রের ট্রেনে চেপে বসল। সকাল সাতটায় মোগলসরাই ষ্টেশনে গাড়ি অনেকক্ষণ লেট করল যাত্রীদের ব্রেকফাষ্ট করার জন্য। গাড়ি ছাড়ার কয়েক সেকেন্ড আগে একজন মৌলবী ধরণের লোক উঠলেন। খুব ভীড়। অনেক লোক ঠাসাঠাসি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঐ লোকটা হাতের ব্যাগটা কোনো রকমে ব্যাংকারের উপর রেখে অনেক কষ্টের সঙ্গে দাঁড়ালেন। আরিফ সামনেই বসেছিল। তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে তাকে বসার জন্য অনুরোধ করল।

লোকটি বলল, না-না, আপনিই বসুন। শেষে আরিফের জেদাজেদিতে বসলেন। তারপর কিছুক্ষণ আরিফকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় থেকে আসছেন? কোথায় যাবেন?

আরিফ বলল, দেখুন, আমি আপনার ছেলের বয়সি, আমাকে আপনি করে না বলে তুমি করে বলুন। তারপর বলল, আমি বাংলাদেশ থেকে দেওবন্দের মাদ্রাসায় দ্বীনি এলেম হাসিল করার জন্য যাচ্ছি।

লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এই প্রথম যাচ্ছ না কি?

জ্বি।

তুমি এতদিন কি পড়াশোনা করেছ?

এ বছর ম্যাট্রিক পাস করেছি।

তুমি তো দেশে থেকে মাদ্রাসায় পড়তে পারতে? এতদূরে আসার কি দরকার ছিল?

শুনেছি দেওবন্দ দ্বিনী শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ।

ঠিকই শুনেছ। বাবা, কিন্তু আজকাল সে সব আদর্শবান শিক্ষক নেই। আর সেরকম ছাত্র সংখ্যাও খুব কম। তবে দেশের অন্যান্য জায়গার চেয়ে এখনও ওখানে সব থেকে ভালো শিক্ষা দেওয়া হয়। ওখানে অনেক ধরণের মাদ্রাসা আছে। আমার বাড়ি ওখানে। আমি এক মাদ্রাসার শিক্ষক। ছুটিতে বড় মেয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আগামীকাল মাদ্রাসা খুলবে। তাই বাড়ি ফিরছি। আমার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালই হল। তোমাকে আর নতুন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। তুমি কি উর্দু একদম জান না? বলাবাহুল্য উভয়ে এতক্ষণ ইংরেজীতে কথা বলছিল।

না, আমি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছি, উর্দু জানি না।

তুমি যে এত দূর থেকে চলে এলে, তোমার মা-বাবা কিছু বললেন না?

তারা অন্য সমাজের মানুষ, ধর্মের কথা পছন্দ করে না। তাই একটা চিঠি লিখে সবকিছু জানিয়ে গোপনে চলে এসেছি।

তা হলে তো ওঁরা খুব চিন্তায় আছেন। এক কাজ করো, মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর ওঁদেরকে চিঠি দিও। আর তুমিও কোনো চিন্তা করো না, আল্লাহপাকের যা মর্জি তাই। আমি যতটা পারি সব দিক থেকে তোমাকে সাহায্য করব।

লোকটির নাম মৌলবী আজহার উদ্দিন। উনি ঐ এলাকার খুব নামী লোক। অবস্থাও খুব ভাল। নিজেদের একটা মাদ্রাসা আছে। এখানে ছেলেরা প্রথমে শুধু হাফেজী পড়ে। তারপর বড় মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। সেখান থেকে পাশ করলে আরবীতে এম, এম এবং ইংরেজীতে বি. এ. সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। তিনি আরিফকে নিজের বাড়িতে সঙ্গে করে যখন পৌঁছালেন তখন দুপুর বারটা।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর যোহরের নামায পড়ে আরিফ বিশ্রাম নিচ্ছিল। এমন সময় মৌলবী সাহেব ছোট দুটি ছেলে-মেয়ে সঙ্গে করে এনে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদেরকে বললেন, ইনি তোমাদের মাষ্টার। আজ থেকে তোমরা ইনার কাছে পড়বে। তারপর আরিফকে বললেন, তোমার যদি আপত্তি না থাকে, তবে তুমি এখানে ছেলের মতো থেকে পড়াশোনা করতে পার। আমি তোমার পড়াশোনার সব ব্যবস্থা করে দেব।

আরিফ এতটা আশা করেনি। সে বিদেশে কোথায় কিভাবে থাকবে, কি পড়বে এতক্ষণ সেইসব চিন্তা করছিল। এত তাড়াতাড়ি তার ব্যবস্থা হয়ে গেল দেখৈ মনে মনে আল্লাহপাকের দরবারে শোেকরগুজারী করল। বলল, দেখুন চাচাজান, আপনার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আপনি আমার জন্য যা করছেন, তা আমি ভাবতেও পারছি না। দোয়া করুন, আল্লাহপাক যেন আমার মনের বাসনা পুরণ করেন।

কি যে বল বাবা, আমি আর কতটুকু তোমার জন্য করেছি। নিজের জন্মভূমি ছেড়ে বিদেশে ধর্মের জ্ঞানলাভ করতে এসেছি। তুমি অতি ভাগ্যবান। যারা এই রাস্তায় ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে, আল্লাহপাক তাদের সহায় হন। আর আমি তার একজন নগণ্য বান্দা হয়ে যদি তোমাকে সাহায্য না করি, তবে তিনি নারাজ হবেন। প্রত্যেক লোকের মানষিক উদ্দেশ্য থাকা উচিত, আল্লাহপাক কিসে সন্তুষ্ট হন। আমি ঘরের ছেলের মতো থেকে পড়াশোনা কর। আর এদেরকে নিজের ভাইবোন মনে করবে। কোনো কিছু অসুবিধা হলে জানাবে। আমি যথাসাধ্য দূর করার চেষ্টা করব।

সেই থেকে আরিফ ওখানে থেকে পড়াশুনা করতে লাগল। সে জানাল, প্রথমে হাফেজী পড়বে। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য বড় মাদ্রাসায় ভর্তি হবে। মৌলবী সাহেব তাকে সেইমত ব্যবস্থা করে দিলেন। এখানে এসে আরিফ যেন তার চিরআকাঙ্খিত ধন খুঁজে পেল। এখানকার ছেলে-মেয়েদের ও লোকজনের আচার-ব্যবহার, পোশাকপরিচ্ছদ সব ইসলামী ছাঁচে। এখানে যেন বিধর্মী ইহুদী, খৃষ্টানদের সভ্যতা প্রবেশ করেনি। সে খুব মন দিয়ে লেখাপড়া করতে লাগল। নিয়মিত নামায পড়ে আল্লাহ পাকের দরবারে মোনাজাত করতে লাগল—

‘হে রাব্বুল আল-আমিন, তুমি সমগ্র মাখলুকাতের সৃষ্টিকর্তা। তুমি আলেমুল গায়েব। তোমার অগোচর কিছুই নেই। তুমি সর্বশক্তিমান। তোমার প্রশংসা করা আমার মত ক্ষুদ্ৰ জীবের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আমি শ্ৰেষ্ঠ সৃষ্টির একজন নগণ্য বান্দা। তোমার দরবারে কোটি কোটি শুকরিয়া আদায় করে এই নিবেদন করছি, তমি আমার সমস্ত অপরাধ মাফ করে দাও । আমাকে ইসলামের একজন খাদেম তৈরি করে ধন্য করো। আমি সব কাজ যেন তোমাকে খুশি করার জন্য করি। তোমার প্রিয় বান্দারা যে রাস্তায় গমন করেছেন, আমাকেও সেই পথে চালিত কর। আর আমি বাবা-মার মনে যে কষ্ট দিয়ে এসেছি, তাদের সেই কষ্ট দূর করার তওফিক আমাকে দান কর। আমার দিকে তোমার রহমতের দৃষ্টি দান করা। তোমার প্রিয় হাবিব ও রাসূল (দঃ) যে পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, সেপথে আমাকে দৃঢ় সেই হাবিবের (দঃ) উপর হাজার হাজার দরূদ ও সালাম। তোমার রাসূলে পাক (দঃ)এর অসিলায় আমার দোয়া কবুল করো। আমিন।

প্রতিদিন তাহাজ্জুদ নামাযের পরও আরিফ কেঁদে কেঁদে উক্ত দোওয়া লাগল। সে জেনেছিল, বান্দা যদি চোখের পানি ফেলে আল্লাহ পাকের দরবারে ফরিয়াদ করে, তবে তা তিনি কবুল না করে থাকতে পারেন না। রাসূল হাদিসে বলিয়াছেন—‘আল্লাহ পাকের নিকট সর্বোৎকৃষ্ট ও অতি প্রিয় জিনিস মোমেন বান্দার চোখের পানি। সেই পানি গাল বেয়ে পড়ার আগেই তার দোয়া করে নেন। মোমেন বান্দার চোখের পানি আল্লাহ পাকের আরাশকে কাঁপিয়ে তাই তিনি বান্দার দোয়া কবুল করেন।’

Share This