০১. মনোভাবের গুরুত্ব

মনোভাবের গুরুত্ব
ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা
অধ্যায় – ১

একজন লোক মেলায় লাল-নীল-হলুদ-সবুজ ইত্যাদি অনেক রংয়ের বেলূন বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। কখনও কখনও তার বিক্রি কমে গেলে, সে হিলিয়াম গ্যাসে ভর্তি একটি বেলুন আকাশে উড়িয়ে দিত। বিলুনটিকে আকাশে উঠে যেতে দেখলে উৎসাহী বাচ্চারা বেলুনওয়ালার কাছে ভিড় করে তার বিক্রি বাড়িয়ে দিত। সারাদিন এই পদ্ধতিতে বেলুনওয়ালা বেলুন বিক্রি করত। একদিন পিছন থেকে জামায় টান পড়াতে বেলুনওয়ালা মুখ ফিরিয়ে দেখল একটি বাচ্চা ছেলে। ছেলেটি জিজ্ঞাস করল, কালো রংয়ের বেলুনও কি আকাশে উড়বে? বালকটির অত্যধিক আগ্রহ লক্ষ্য করে লোকটি তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ভাই, রংয়ের জন্য বেলুন আকাশে ওড়ে না, ভেতরের গ্যাস বেলুনকে আকাশে ওড়ায়।

মানুষের জীবনেও এ কথা সত্য। আমাদের বিতরে কি আছে সেইটাই প্রধান। আমাদের ভিতরে যে জিনিসটি আমাদের উপরে সাহায্য করে তা হোল আমাদের মানসিকতা।

আপনারা কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন, কেন কোনও কোও ব্যক্তি, সংস্থা বা দেশ অন্যদের তুলনায় বেশি সফল?

এর মধ্যে কোনও গূঢ় রহস্য নেই। সফল ব্যক্তিরা একটি নির্দিষ্ট ও কাঙ্খিত ফললাভের জন্য চিন্তা ও কাজ করেন। তারা জানেন, ফললাভের লক্ষ্যে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মানুষ। তারা আরও জানে তাকে কিভাবে গড়ে তুলে কাজে লাগাতে হয়। আমার বিশ্বাস যে কর্মীর গুণমানের উপর যে কোনও ব্যক্তি, সংস্থা ও দেশের সাফল্য নির্ভর করে।

আমি বিশ্বের প্রধান সংস্থাগুলিতে নিযুক্ত উচ্চ আধিকারিকদের সঙ্গে কথাবর্তার সময় সবাইকে একটা প্রশ্ন করেছি: যদি আপনাকে একটি যাদুদন্ড দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে ব্যবসায়ে উৎপাদশীলতা ও লাভ বাড়াবার জন্য আপনি যে জিনিসটির পরিবর্তন চান, সেই জিনিসটি কী? উত্তরে তারা সবাই এক বাক্যে বলেছেন যে, সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিদের মনোভাব যদি উন্নততর হয়, তবে তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে; ফলে সংস্থায় অপচয় বন্ধ হবে, সংস্থার প্রতি আনুগত্য বাড়বে এবং সাধারণভাবে ঐ সংস্থা কর্মতৎপরতা দৃষ্টান্ত-স্থল হিসাবে পরিগণিত হবে।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলিয়াম জেমস্ বলেন,-আমাদের প্রজন্মের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হল এই যে মানুষ মনোভারে পরিবর্তন ঘটিয়ে তার জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

অভিজ্ঞতার নিরিখে আমরা জানি মানব সম্পদই সমস্ত রকমের উদ্যোগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মূল্যধন বা যন্ত্রপাতি ইত্যাদির থেকেও অনেক মূল্যবান। দুর্ভাগ্যক্রমে এই সম্পদের অপচয়ও অনেক বেশি। মানুষ আপনার মহত্তম সম্পদ কিংবা বৃহত্তম দায় হয়ে উঠতে পারে।

পূর্ণ গুণসম্পন্ন মানুষ:

আমি একটি বাণিজ্যিক সংস্থার বিভিন্ন বিভাগে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি, যেমন ক্রেতা সহায়তা, বিক্রয় দক্ষতা, বাণিজ্য-বৃদ্ধির কৌশল সংক্রান্ত পরিকল্পনা ইত্যাদি। নিঃসন্দেহে এই বিষয়গুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমার মনে হয় কোন প্রশিক্ষণই সফল হবে না যদি না শিক্ষার্থীদের মান যথোপযুক্ত হয়। উপযুক্ত গুণমান সম্পন্ন মানুষ তারাই যাদের চরিত্র আছে, সততা আছে, মূল্যবোধ আছে আর সর্বোপরি আছে ইতিবাচক মনোভাব।

আমার বক্তব্যের ভুল অর্থ করবেন না। নিঃসন্দেহে সমস্ত বিষয়ই প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু সমস্ত প্রশিক্ষণ-কার্যক্রমের সাফল্য নির্ভর করবে উপযুক্ত গুণসম্পন্ন শিক্ষার্থীর উপর। ক্রেতা পরিযেবার প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের বলা হয় প্রতিটি ক্রেতার সঙ্গে কথাবার্তায় অনুগ্রহ করে ধন্যবাদ ইত্যাদি কথাগুলি ব্যবহার করবে, মুখে থাকবে মোলায়েম হাসি এবং যথাসময়ে করমর্দন করবে। কিন্তু একজন মানুষ কতক্ষণ এইভাবে মৃদু হাসি হাসতে পারবে যদি তার মধ্যে ক্রেতাকে সাহায্য করার প্রকৃত সদিচ্ছা না থাকে? তাছাড়া ক্রেতারাও শুকনো হাসির অন্তঃসারশূন্যতাও বুঝতে পারবে। হাসি আন্তরিক না হলে তা অত্যন্ত বিরক্তিকর লাগে। আসল কথা হচ্ছে বাইরের অবযবের থেকে অন্তর্নিহিত বস্তু অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন। অনুগ্রহ করে কিংবা ধন্যবাদ ও মৃদু হাসি ইত্যাদি অবয়বের অঙ্গ হলেও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলি অনায়াসে ব্যবহারের সঙ্গে একা হয়ে যায় যদি মনে কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকে।

ফরাসী দার্শনিক ব্লেইজ পাস্কালকে একবার একজন বলেছিলেন, আপানার মতো আপনার মতো আমার মেধা থাকলে আমিও আপনার মতো একজন ভালো মানুষ হতে পারতাম। পাস্কাল জবাব দেন, আগে ভাল মানুষ হোন, তাহলে আপনি আমার মেধা পাবেন।

ক্যালগারী টাওয়ার নামে অট্টালিকাটির উচ্চতা ১৯০.৮মিটার, ওজন ১০,৮৮৪টন। পরে প্রায় শতকরা ৬০বাগ অর্থাৎ ৬,৩৪৯টন মাটির নীচে আছে। উচ্চতম বাড়িগুলোর ভিত্তিকে এইভাবে সুদৃঢ় করতে হয়েছে। সাফল্যকেও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। সাফল্যের ভিত্তি মনোভাব।

তোমার দৃষ্টিভঙ্গিই তোমার সাফল্যের অবদান :

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেকা গেছে যে শতকরা ৮৫টি ক্ষেত্রে প্রার্থরা চাকরি পায় তাদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গির জন্য, আর শতকরা ১৫টি ক্ষেত্রে পায় অনেক তথ্য ও সংখ্যাতত্ত্ব জানে এবং বেশ চালাক-চতুর বলে। শিক্ষাকাতে যে ব্যয় হয় তা বিপুল, এবং সেই শিক্ষা কেবল তত্ত্ব, তথ্য ও সংখ্যাতত্ত্ব মুখস্থ করায়। এই শিক্ষা জীবিকা অর্জনের সাফল্যের ক্ষেত্রে মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ দায়ী।

এই বইয়ের আলোচ্য বিষয় হল বাকি শতকরা ৮৫ভাগ সাফল্য। ইংরেজি ভাষায় attitude শব্দটি একটু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। ব্যক্তি জীবনে, জীবিকার ক্ষেত্রে, প্রকৃতপক্ষে জীবনের সবক্ষেত্রেই এই attitude বা মনোভাবের বিশেষ গুরুত্ব আছে। কোনও প্রশাসক কি ভালো প্রশাসক হতে পারেন যদি তার উপযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি না থাকে? ছাত্রসুলভ মনোভাব না থাকলে একজন ছাত্র কি ভালো ছাত্র হতে পারে? পিতামাতা, শিক্ষক, মালিক, কর্মচারী ইত্যাদি প্রত্যেকেরই স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের উপযোগী মনোভাব না থাকলে যথাযথভাবে তাদের কর্তব্য করতে পানেন না।

তাই যে জীবিকাই আপনি পছন্দ করুন না কেন, সাফল্যের ভিত্তি হচ্ছে আপনার মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি।

হীরে ছড়ানো ক্ষেত

আফ্রিকায় এক কৃষক সুখী ও পরিতৃপ্ত জীবন নির্বাহ করত। সে সুখী কারণ তার যা ছিল তাতেই ছিল সন্তষ্ট; আবার সে সন্তষ্ট ছিল বলেই সুখী ছিল। একদিন একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি তার কাছে হীরের মহিমা-কীর্তন করে হীরের ক্ষমতা সম্পর্কে অনেক কথা বলেলেন। তিনি জানালেন, তোমার যদি বুড়ো আঙ্গুলের আকারের একটি হীরে থাকে তবে তুমি একটা শহরের মালিক হতে পারবে, আর হাতের মুঠির আকারের একটি হীরে থাকে তবে সম্ভবত একটা দেশের মালিক হতে পারবে। এই বলে বিজ্ঞ ব্যক্তিটি চলে গেলেন কিন্তু সেই রাত্রে কৃষক আর ঘুমোতে পারল না। তার মনে সুখ ছিল না, কারণ হীরের অভাবে সে অতৃপ্তির বোধে পীড়িত। অতৃপ্ত বলেই সে অসুখী।

পরদিন থেকেই কৃষক তার খামারবাড়ি বিক্রি করার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দিল। শেষপর্যন্ত সমস্ত বিক্রি করে, তার পরিবারকে একটি নিরাপদ জায়গায় রেখে সে বেরিয়ে পড়ল হীরের কোজ করতে। সারা আফ্রিকা সন্ধান করে কোথাও হীরে পেলনা। সারা ইউরোপ খুঁজল, কিন্তু সেখানেও কিছু পেল না। যখন স্পেনে পৌঁছল তখন সে শারীরিক, মানসিক এমনকি অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্পূর্ন বিধ্বস্ত। চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে অবশেষে বার্সিলোনা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সে আত্মহত্যা করল।

এদিকে যে লোকটি খামারবাড়িটি কিনেছিল সে একদিন সকালে ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট নদীটিতে উটকে জল খাওয়াচ্ছিল। নদীর ওপারে একটি পাথরটুকরোর উপর সকালের রোদ পড়ে রামধনুর মতো বিচিত্র রংয়ে ঝক্‌ঝক্ করে উঠল। বসার গরের টেবিলের উপর পাথরটি দেখে জিজ্ঞেসা করলেন, হাফিজ কি ফিরে এসেছে? হাফিজ ছিল পুরোনো মালিকের নাম। খামারবাড়ির নতুন মালিক বললেন, না, কিন্তু একথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? বিজ্ঞ ব্যক্তিটি বললেন, ঐ পাথরটি একটি হীরে, আমি হীরে চিনি। মালিক কিন্তু মানতে চাইল না; সে বলল, না, এটি একটি পাথর, আমি নদীর ধারে কুড়িয়ে পেয়েছি। আমার সঙ্গে আসুন, দেখবেন সেখানে ঐ ধরনের পাথর আরও অনেক আছে। তারা দুজনে কিছু পাথর কুড়িয়ে পরীক্ষার জন্য জহুরির কাছে পাঠিয়ে দিল। পাথরগুলি হীরেই। দেখা গেল সমস্ত ক্ষেতটিতেই একরের পর একর জুরে অজস্র হীরে ছড়ানো আছে।

এ গল্পটি কী নীতিশিক্ষা দেয়?

এই গল্পটি থেকে পাঁচটি শিক্ষা আমরা পাই।

১) হাতের কাছের সুযোগটিকে যথার্থভাবে সব্যবহার করাই সঠিক মনোভাব। একরের পর একর বিস্তৃত হীরে ভরা ক্ষেতটি ছিল হাতের কাছের সুযোগ। সোনার হরিণের সন্ধানে না ছুটে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করাই উচিত।

২) নদীর অপরপারের ঘাসকে অনেক বেশি সবুজ মনে হয়। দুরবর্তী সম্ভাবনাকে মানুষ অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে করে।

৩) প্রাপ্ত সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে যারা সুদূর সম্ভবনার স্বপ্নে বিভোর থাকে তারা জানে না যে আরকেজন ঐ সুযোগটি পাওয়ার আশায় উম্মুখ হয়ে আছে। সে খুশি হবে ঐ সুযোগটি পেলে।

৪) সুযোগ-সম্ভাবনা বোঝার ক্ষমতা যাদের নেই, তারা সুযোগ এসে যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন আওয়াজ হচ্ছে বলে বিরক্ত হয়।

৫) একই সুযোগ দুবার আসে না। পরবর্তী সুযোগ হয়ত বেশি ভালো হবে কিংবা খুবই কষ্টসাধ্য হবে কিন্তু একইরকম হবে না।

ডেভিড ও গোলিয়াথ

ডেভিড-গোলিয়াথের গল্প অনেকের জানা আছে। গোলিয়াথ নামে দৈত্যটি গ্রামের ছেলেমেয়েদের ভয় দেখিয়ে সন্ত্রস্ত করে রাখত। একদিন, ডেভিড নামে একটি ১৭বৎসরের রাখাল চেলে গ্রামে তার ভাইদের কাছে বেড়াতে এস ওদের জিজ্ঞেসা করল, তোমরা, দৈত্যটার সঙ্গে লড়াই কর না কেন? ভাইয়েরা বয়ে ভয়ে বলল, দেখচ না, কী বিরাট চেহারা, ওকে আঘাত করাই মুস্কিল। ডেভিড বলল, তা হবে কেন? বিরাট চেহারা বলেই আঘাত করা সহজ, কোনও তাক ফস্কে য়াবে না। তার পরের কাহিনী সবাই জানে। ডেভিড গুলতির সাহয্যে দৈত্যটিকে হত্যা করে গ্রামের ছেলেমেয়েদের সন্ত্রাসমুক্ত করেছিল। একই দৈত্য সম্পর্কে দুরকমের দৃষ্টিভঙ্গি, সাহসীর একরকম, আবার ভীতুদের অন্যরকম।

জীবনের লক্ষ্যপথে প্রতিহত হলে আমরা সেই অবস্থাকে কিভাবে গ্রহণ করব তা আমাদের মানসিকতার উপরই নির্ভর করে। যারা সমস্ত বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা করেন তারা বাধা-বিপত্তিকে সাফল্যের সোপান হিসাবে গ্রহণ করেন; যারা নৈতিবাচক চিন্তা করেন তাদের কাছে যে কোনও বাধাই বিরাট প্রতিবন্ধক।

বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলির শ্রেষ্ঠত্বের পরিমান সেখানকার কর্মীদের বেতনহার দিয়ে বা কাজকর্মের পদ্ধতি দিয়ে হয় না। শ্রেষ্ঠত্বের বিচার হয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মীদের আবেগ ও অনুভুতি কতটা জড়িত, কাজের প্রতি তাদের মনোভাব এবং কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক দিয়ে। কোনও কর্মী যখন বলেন,এই কাজটা করতে পারব না, তখন তার কথার দুটি সম্ভাব্য অর্থ আছে। হয় তিনি বলতে চান যে কাজটি কিভাবে করতে হয় তা তিনি জানেন না, কিংবা তিনি কাজটি করতে চান না। যদি কাজের পদ্ধতি না জানা থাকে তবে তা প্রশিক্ষণের সমস্যা। আর যদি কাজটি করতে না চান তবে তা হবে মনোভাবের সমস্যা, অর্থাৎ কাজটি করতে তার আগ্রহ নেই, কিংবা মূল্যবোধের সমস্যা, অর্থাৎ তিনি মনে করেন কাজটি করা উচিত নয়।

একটি সুসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি:

আমি বিশ্বাস করি মানুষ সম্পর্কে একটি সুসম্পূর্ন দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া উচিত। মানুষ কেবল দুটো হাত বা দুটো পা নয়। সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মেধা হৃদয় মিলিয়ে যে মানুষ সেই কাজে যায়, আবার কাজ থেকে ঘরে ফিরে আসে। আমরা পারিবারিক সমস্যা কাজের জায়গায় নিয়ে যাই, আবার কাজের সমস্যা পরিবারের মধ্যে নিয়ে আসি। পারিবারিক সমস্যা মাথায় নিয়ে কাজের জায়গায় গেলে কী হয়? মানসিক চাপ বেড়ে যায়, ফলে উৎপাদনে ঘাতটি পড়ে। অন্যদিকে কাজের সমস্যা ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যায় বিব্রত থাকলে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ে।

যে উপাদাগুলি মনোভাব নির্ধারিত করে :

আমরা কি আমাদের মনোভাব নিয়ে জম্মাই, কিংবা জীবনে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলি? কী কী উপাদান আমাদের মানসিক গঠন করে?

পারিপার্শ্বিক অবস্থার ফলেই কি নেতিবাচক দৃস্টিভঙ্গি গঠিত হয় এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি কি পরিবর্তন করা যায়? জীবনের গঠনশীল বছরগুলিতেই আমাদের মানসিকতা নির্দিষ্ট আকার নিতে শুরু করে।

প্রধানত তিনটি উপাদান আমাদের মনোভাব গঠন করতে সাহায্য করে। সে তিনটি হোলঃ
১. পরিবেশ

২. অভিজ্ঞতা

৩. শিক্ষা

প্রত্যেকটিকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা যাক।

১. পরিবেশ
নিম্নলিখিত বিষয়গুলি নিয়ে পরিবেশ তৈরি হয়।
-পরিবার: ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুরকম প্রভাব সৃষ্টি করে।
-শিক্ষাক্ষেত্রে: সহপাঠীদের প্রভাব।
-কর্মক্ষেত্র: সহানুভূতিশীল ও সাহায্যকারী উপরওয়ালা, কিংবা অতিরিক্ত সমালোচনাকারী উপরওয়ালা।
-সংবাদমাধ্যম: টেলিভিশন, খবরের কাগজ, সাময়িকপত্র, বেতার, সিনেমা।
-সাংস্কৃতিক পশ্চাদপ্ট ও পরিমন্ডল।
-ধর্মীয় উওরাধিকার ও পরিমন্ডল।
-পরস্পরা ও সংস্কার।
-সামাজিক পরিবেশ।
-সামসাময়িক রাজনৈতিক আবর্ত।

এই সমস্ত মিলে একটি সাংস্কৃতিক বাতাবরণ সৃষ্টি করে। পরিবার, সংগঠন কিংবা স্বদেশ-প্রত্যকটিরই একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক বাতাবরণ আছে।

নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেচেন, কোনও কোও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিক্রেতা তত্ত্বাবধায়ক, ম্যানেজার, মালিক সকলেই বেশ ভদ্র। আবার কোন কোনও প্রতিষ্ঠানে দেকা যাবে প্রত্যেকেরই ব্যবহার বেশ রূঢ় ও অভদ্রজনোচিত। এককটি পরিবারে বাচ্চারা ও তাদের বাবা-মা ভদ্র, বিবেচক ও মার্জিত ব্যবহারে অভ্যস্ত; আবার অন্য পরিবারে একে অন্যের সঙ্গে বিশ্রীভাবে ঝগড়া করে।

যে সব দেশে রাজনৈতিক বাতাবরণ পরিচ্ছন্ন এবং সরকার সৎবাবে পরিচালিত হয়, সে সমস্ত দেশে সাধারণত জনসাধারণও সৎ, অপরকে সাহায্য করতে উৎসুক এবং আইন মেনে চলতে অভ্যস্ত। এর উল্টোটাও ঠিক। অর্থাৎ যেখানে সরকার ভ্রষ্টাচারী সেখানে একজন সৎ ব্যক্তি বিপদের সম্মুখিন হন। আবার যেখানে বাতাবরণ সৎ পরিচ্ছন্ন সেখানে একজন ভ্রষ্টাচারী অসুবিধার সম্মুখীন হন। যেখানে একটি ইতিবাচক কাজের আবহাওয়া আছে সেখানে একজন প্রান্তিক উৎপাদনকারী কর্মীরও উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যায়, আবার নেতিবাচক বাতাবরনে একজন সুদক্ষ কর্মীরও উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়।

যে কোন সংস্থার কর্মধারার আদর্শ উপর থেকে নীচে প্রবাহিত হয়, নীচে থেকে উরে নয়। মাঝে মাঝে সংস্থর কর্মকর্তাদের পিছন ফিরে তাকিয়ে বিচার করার প্রয়োজন যে তারা সহকর্মদের জন্য কী ধরনের কাজের আবহাওয়া সৃষ্টি করেছেন। একটি নেতিবাচক অবস্থার মধ্যে ইতিবাচক কর্মোদ্যম সৃষ্টি করা দৃঃসাধ্য। যেখানে আইন না মেনে চলাই নিয়ম হয়ে গেছে সেখানে সৎ নাগরিক যে ঠগ, জোচ্চোর ও চোর হয়ে উঠবে, তাতে আর আশ্চর্য্য কী? যে বাতাবরণের মধ্যে আমরা বাস করি বা যা আমরা অন্যদের জন্য তৈরি করেছি তারও মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তা আছে।

২. অভিজ্ঞতা :
জীবনে নানা ঘটনার অভিঘাতে এবং নানা মানুষের সঙ্গে সংশ্রবের অভিজ্ঞতায় আমাদের ব্যবহারেও পরিবর্তন ঘটে। যদি কোনও ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে আমাদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হয় তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও হবে ইতিবাচক, আবার অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হলে দৃষ্টিভঙ্গিও হবে নেতিবাক।

৩. শিক্ষাঃ
এখানে আমি প্রথানুযায়ী শিক্ষা এবং স্কুল-কলেজের বাইরে হাতে কলমে শিক্ষার কথা বলছি; কেবলমাত্র ডিগ্রির কথা নয়। জ্ঞানকে পরিকল্পনামাফিকও অভিজ্ঞতার নিরিখে প্রয়োগ করলে তা হয় বিজ্ঞতা। বিজ্ঞতা সাফল্য নিশ্চিত করে। আমি ব্যাপক অর্থে শিক্ষার কথা বলছি। এই শিক্ষায় শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। একজন প্রকৃত শিক্ষকের প্রভাব চিরন্তন। বৃহৎ তরঙ্গ থেকে অজস্র তরঙ্গভঙ্গের মতো, তার প্রবাব সদাবি¯তৃত এবং বস্তুতপক্ষে অপরিমেয়। আমরা তথ্যের ভারে আকষ্ঠ নিমজ্জিত, কিন্তু জ্ঞান ও বিজ্ঞতার অভাবে তৃষ্ণার্ত। শিক্ষা কেবল জীবিকা অর্জনের পত নির্দেশ করে না, কিভাবে জীবনযাপন করতে হয় তারও শিক্ষা দেয়।

ইতিবাচক মনোভাবের মানুষ কিভাবে চেনা যাবে?

একজন মানুষ অসুস্থ না হলেই যেমন তাকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বলা যাবে না, তেমনি নেতিবাচক মনোভাব না থাকলেও কাউকে ইতিবাচক মনোভাবস্পন্ন বলে চিহিৃত করা যাবে না। ইতবাচক মনোভাবসম্পন্ন মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য সহজে নজরে পড়ে। তারা দয়ালু, আতœবিশ্বাসী, ধৈয্যশীল এবং রিহস্কার। তারা নিজেদের সম্পর্কে এবং অন্যের সম্পর্কেও উচ্চ আশা পোষণ করেন এবং সব কাজেই ইতিবাচক ফল প্রত্যাশা করেন। যাদের মনোভাব ইতিবাচক তারা বারমাসি ফলের মতো, সব সময়েই সুস্বাদু ও তাই তারা সবসময় স্বাগত।

ইতিবাচক মনোভাবের সুবিধা:
এই মনোভাবের সুফল অনেক এবং সহজে তা নজরেও পড়ে। অবশ্য যা সহজে নজরে পড়ে তা সহজে নজর এড়িয়েও যেতে পারে। যাইহোক কয়েকটি সুবিধা উল্লেখ করা যায়।
-উৎপাদনশীলতা বাড়ায়
-সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে
-সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে
-কাজের উৎকর্ষ বাড়ায়
-সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহাওয়ায় সৃষ্টি করে
-আনুগত্যের মনোভাব তৈরি করে
-মুনাফা বাড়ায়
-কর্মচারী, মালিক ও ক্রেতাদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি করে
-মানসিক চাপ কমায়
-সমাজের সহায়ক সদস্য হতে সাহায্য করে
-একটি প্রসন্ন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিত হতে সাহায্য করে।

নেতিবাচক মনোভাবের ফলাফল:
জীবনে অনেক বাধাবিপত্তি অতক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়, এবঙ অনেক সময় আমাদের নেতিবাচক মনোভাবই সবচেয়ে বড় বাধার সৃষ্টি করে। এই মনোভাবের ফলে বন্ধুত্ব ও চাকরি রক্ষা করা, কিংবা সামাজিক ও দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা করাও কঠিন হয়ে ওঠে। এরূপ মনোভাবের ফলে,
-তিক্ততার সৃষ্টি হয়
-ক্ষোভের ও অসহিষ্ণুতার সৃষ্টি হয়
-জীবন উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে
-অসুস্থতার শিকার হতে হয়
-নিজেরও ঘনিষ্ঠদের উপর মানসিক চাপ বাড়ে, পরিবারের মধ্যে এবং কর্মস্থলে এমন একটি নেতিবাচক আবহাওয়া সৃষ্টি করে যা কারুর পক্ষে মঙ্গলদায়ক নয়। এরূপ মনোভাব ধীরে ধীরে মুধু ঘনিষ্ঠদের সংক্রামিক করে না, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।

এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সচেতন হয়েও পরিবর্তন করা যায় না কেন?

মানুষ স্ববাব পরিবর্তনের পরিপন্থী। পরিবর্তন অস্বস্তিকর। সদর্থক বা নঞর্থক-যেমনই ফলাফল হোক না কনে, পরিবর্তন সব সময়েই চাপ সৃষ্টি করে। কখনও কখনও নেতিবাচক মনোভাবের সঙ্গে এমন শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করি, যে পরিবর্তন ইতবাচক হলেও আমরা তা গ্রহণ করতে চাই না।

চার্লস ডিকেন্স এক বন্দীর কাহিনী লিখেছেন যে অনেকদিন মাটির নীচে অন্ধকার কুঠুরি থেকে মুক্ত পৃথিবীর উজ্জ্বল আলোয় নিতে আসা হোল তখন সে অবাক হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। কয়েক মুহূর্তপরে সে তার নতুন-পাওয়া স্বাধীনতায় এমন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল যে সে তার সেই অন্ধকার কুঠুরিতেই ফিরে যেতে চাইল। সেই কুঠুরি, শেকল, অন্ধকার এ সবের মধ্যেই সে নিশ্চিন্ত ও স্বস্তিবোধ করে, তাই স্বাধীনতা ও বিশাল পৃথিবীর কোনও আকর্ষণ তার কাচে ছিল না।

ইতিবাচক মনোভাব গঠনের পদ্ধতি:
বাল্যকালেই সারাজীবনের জন্য মানস-গঠন সম্পন্ন হয়ে যায়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি সেই বছরগুলিতে ইতবাচক মানসিকতা গড়ে ওঠে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ঘটনাচক্রে যদি বাল্যকালে নেতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে তবে তা সারাজীবন বহন করে চলতে হবে। এরূপ মনোভাবের পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু তা খুব সহজসাধ্য নয়। কিভাবে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হয়?

যে আদর্শগুলি ইতবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করে সে সম্পর্কে অবহিত হওয়া।
-ইতিবাচক মনোভাব অর্জন করার আকাঙক্ষা।
-আদর্শগুলি সার্মকভাবে অনুসরণের জন্য শৃঙ্খলাবোধ ও নিষ্ঠার অনুশীলন প্রয়োজন।

বয়স্ক ব্যক্তিরা নিজেরাই ইতিবাচক মনোভাব গঠন করতে পারেন। এ দায় নিজেদেরই নিতে হবে। অনেক সময় ব্যর্থতার জন্য আমরা অপরকে বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঘটনাকে দায়ী করি। কিন্তু এরূপ না করে একটি বিশ্লেষণধর্মী ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা দরকার। সব স্বপ্নকে সংহত করে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে। যেগুলি সৎ, সত্য এবং মহৎ, সেই সমস্ত ইতিবাক বিষয়গুলি সম্পর্কে চিন্তা করতে করতেই মনের ইতিবাচক দিকটি সমৃদ্ধ হবে। যদি আমরা এই ধরনের মানসিকতা গঠন করতে চাই এবং তা স্থায়ী করতে চাই তবে সচেতনভাবে নিুলিখিত পদ্ধতিগুলি অনুশীলন করা দরকারঃ

প্রথম পদ্ধতিঃ লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন করে ইতিবাচক গুণের খোঁজ কর (Change focus, look for the positive) জীবনের সমস্ত ইতিবাচক বিষয়ের প্রতিই নজর দেওয়া দরকার। কোনও ব্যক্তির জীবনের কিংবা কোনও বিশেষ অবস্থায় যে উপাদান ও গুণগুলি কল্যানকর সেগুলির প্রতিই নজর দেওয়া উচিত। নেতিবাচক মানসিকতা কেবলমাত্র ক্রটিগুলি দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়, ফলে দোষগুলিই দেখা হয়, কল্যানকর দিকটি নজরে আসে না।

দোষ দেখাই যাদের স্বভাব তারা স্বর্গেরও ক্রটি বার করতে পারেন। বেশিরভাগ মানুষই যা দেখতে ইচ্ছা করেন তাই বড় করে দেখেন। যদি তারা মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, আনন্দ এবং অন্যান্য ইতিবাচক গুণাবলীর খোঁজ করেন তবে তাই পাবেন; আর যদি তাদের মধ্যে বিসম্বাদ বা ঔদাসীন্য দেখতে চান তবে তাও পাবেন। মানুষের মধ্যে ভালোমন্দ দুই-ই আছে। তাই স্মরণ রাখা দরকার যে ইতিবাচক গুণগুলির খোঁজ করা বা প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ এই নয় যে ক্রটিগুলিকে অগ্রাহ্য করা।

সোনার খোঁজে (Looking for the gold)
অ্যান্ডু কার্নেগী নামে একজন স্কট বাল্যবয়সে আমেরিকায় আসে নানা ধরনের ধুচরো কাজ করতে শুরু করেন। তিনি জীবন শেষ করেন আমেরিকার একজন বৃহত্তম ইস্পাত প্রস্তুতকারী হিসেবে। একসময়ে ৪৩জন ক্রোড়পতি তার সংস্থায় কাজ করতেন। কয়েক দশক আগে এক কোটি ডলার বিপূল ঐশ্বর্ড হিসেবে বিবেচিত হোত, আজও তা কিছু সম ঐশ্বর্য নয়। জনৈক ব্যক্তি একদিন কার্নেগীকে জিজ্ঞেসা করলেন, তিনি কিভাবে মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করেন। অ্যান্ড্রু কার্নেগী জবাব দিলেন, মানুষ নিয়ে কারবার করা যেন সোনার জন্য মাটি খোঁড়ার মত। এক আউন্স সোনার জন্য টনের পর টন মাটি কাটতে ও সরাতে হয়। কিন্তু সোনাই খোঁজা হয়, মাটি নয়।

আসল কথা, আমাদের নজর কোনটার উপর। নজরটা সোনার উপর থাকুক মাটির উপর নয়। মানুষের মধ্যেও যদি দোষক্রটি খোঁজা হয়, তবে মাটির মতো, তা অনেক পাওয়া যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কী খুঁজছেন? অ্যান্ড্রু কার্নেগীর জবাবের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। সব অবস্থাতেই প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কিচু ইতিবাচক দিক আছে। অনেক সময় হয়ত গভীর অনুসন্ধান করে ইতিবাচক গুণাবলীর সন্ধান করতে হয়; কারণ তা সহজে নজরে আসে না। তাছাড়া, আমরা অন্য মানুষের ক্রটি দেখতে এত অভ্যস্ত যে ভালো দিকট সাধারণত আমাদের নজরে আসে না। সব মানুষেরই কিছু ইতিবাচক দিক আছে- এই কথার দৃষ্টান্ত হিসাবে একজন বলেছিলেন যে একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়িও দিনে দুবার সঠিক সময় দেখিয়ে থাকে। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, যখন আপনি সোনার খো৭জে করেন তখন এক আউন্স সোনার জন্য আপনাকে টন টন মাটি সরাতে হয়;কিন্তু আপনি খোঁজেন সোনাই, মাটি নয়।

নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুস সব সময়েই সমালোচনা করবে

কিছু লোক আছেন যারা পক্ষ-বিপক্ষ বিচার না করে সব সময়েই সমালোচনা করেন। সমালোচনাই তাদের জীবিকা। সমালোচনা তাদের জীবন। তারা প্রায় বিজয়ীর লক্ষ্য ও একাগ্রতা নিয়ে সমালোচনা করেন। প্রতিটি মানুষের মধ্যে, প্রত্যেক অবস্থায় তারা কিছু ক্রটি খুঁজে বার করবেনই, এবং বিশ্বসুদ্ধ সবাইকে ক্রটির জন্য দোষারোপ করবেন। এই ধরনের মানুষকে বলা যায় শক্তিশোষক- তারা সমস্ত শক্তি শোষণ করে নেন। এরা কাফেটোরিয়াতে গিয়ে ক্লান্তি অপসারণের নামে বিশ কাপ চা-কফি গলাধঃকরন করেন, মনের সুখে ধূমপান করেন এবং অজস্র নিন্দামন্দ করেন। তারা শুধু নিজেদের মধ্যেই নয়, আশেপাশে যারা থাকেন সবার মধ্যেই একটা চাপা উত্তেজনার সৃষ্টি করেন। প্রকৃতপক্ষে, ছোঁয়াচে রোগের ন্যায় তারা একটি নঞর্থক বাণী বহন করেন এবং এমন একটি পরিবেশের সৃষ্টি করেন যেখানে কেবল নেতিবাচক ফলই পাওয়া যায়।

রবার্ট ফুলটন বাষ্পীয় পোত আবিস্কার করেছিলেন। হাডসন নদীতে যখন তিনি তার নতুন আবিস্কার প্রদর্শনের আয়োজন করচিলেন তখন কিছু নিরাশাবাদী ও সংশয়ী ব্যক্তি জড়ো হয়ে বলাবলি করছিল যে জাহাজ কখনও চলবে না। দেখা গলে জাহাজ চলচে এবং সেটি নদী দিয়ে এগিয়ে গেল। তখন যারা জাহাজ চলবে না বলে মন্তব্য করেছিল তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, জাহাজ কখনও থামবে না। সবকিছুর নেতিবাচক দিক দেখার কী আশ্চর্য মানসিকতা!

কিছু লোক সব সময় নেতিবাক দিকটিই দেখে :
এক শিকারীর শিকার-করা পাখী খুঁজে নিতে আসার জন্য একটি শিক্ষিত কুকুর ছিল। কুকুরটি জলের উপর দিয়ে হাঁটতে পারত। শিকারী যখন কুকুরটির এই অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পেল তখন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। বন্ধুদের নিকট কুকুরের এই আশ্চর্যজনক ক্ষমতা দেখবার অভিপ্রায়ে সে একদিন তার বন্ধুকে হাঁস শিকারের আমন্ত্রণ জানাল। কয়েকটি হাঁস মারা পর সে কুকুরটিকে নির্দেশ দিল হাঁসগুলি জল থেকে তুলে আনতে। কুকুরটি জলের উপর দিয়ে দৌড়ে মৃত হাঁসগুলি নিয়ে এল। সারাদিন ধরে বেশ কয়েকবারই কুকুরটিকে জলের উপর দিয়ে দৌড়াতে হোল। শিকারী তার কুকুরের এই আশ্চর্য ক্ষমতার জন্য বন্ধুর কাছে মন্তব্য আশা করেছিল; কিন্তু বন্ধু ছিল চুপচাপ। শিকারী বাড়ি ফেরার পথে বন্ধুকে জিজ্ঞেসা করল, কুকুরটির কোনও অসাধারণত্ব লক্ষ্য করেছ কি? বন্ধু জবাব দিল, হ্যাঁ, তোমার কুকুরটি সাতার জানে না। কোনও কোনও ব্যক্তি সব সময়েই নঞর্থক দিকটিই দেখে।

হতাশাবাদী কাকে বলে?
-যারা নিজেদের হতাশার কথা বলতে না পারলে অসুখী হন।
-যারা নিজের প্রকৃত অবস্থা ভালো হলেও খারাপ বলে ভাবতে অভ্যস্থ।
-যারা জীবনের অনেকটা সময়ই অভিযোগ করে কাটিয়ে দেন।
-যারা আলো নিভিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করেন, অন্ধকার কতটা গভীর।
-যারা জীবনের আয়নায় সর্বদাই চিড়ের অনুসন্ধান করেন।
-যারা বিছানাতে বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যৃ হয়েছে শোনার পর, বিছানায় ঘুমোনো বন্ধ করে দিয়েছেন।
-যারা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ের ভয়ে স্বাস্থ্যের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন না।
-যারা সব সময়েই খারাপ অবস্থার আশঙ্কা করেন এবং সমস্ত ঘটনাকেই গুরুতর খারাপ করে তোলেন।
-যারা রসগোল্লার ছিদ্রগুলিই দেখেন অন্য কিছু দেখেন না।
-যারা মনে করেন সূর্য কেবল ছায়ার সৃষ্টি করে।
-যারা শুধুমাত্র দুঃখের হিসেব করেন, সুখের কথা ভুলে যান।
-যারা জানেন যে কঠিন শ্রম কারুর কোনও ক্ষতি করে না, কিন্তু বিশ্বাস করেন, কোনও ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়।

আশাবাদী কি? কয়েকটি কথায় আশাবাদীর পরিচয় দেওয়া যেতে পারে।
মানসিক দিক থেকে এতদূর হবেন যে মনের শান্তি কোনওভাবেই বিঘ্নিত হবে না। প্রত্যেকের স্বাস্থ্য, সুখ ও সমৃদ্ধির কথা বলবেন। কথাবার্তায় বন্ধুদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবেন যে তাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু শক্তি আছে। প্রত্যেক বিষয়ের উজ্জ্বল দিকটাই দেখার চেষ্ট করবেন। কেবল শ্রেষ্ঠদের বিষয়ে চিন্তা করবেন, শ্রেষ্ঠ সংস্থার জন্য কাজ করবেন এবং সবচেয়ে ভালো ফল প্রত্যাশা করবেন। নিজের সাফল্যে যেমন উৎসাহ পান, অপরের সাফল্যেও তেমনি উৎসাহ দেখাবেন। অতীতের বিচ্যুতি ভুলৈ গিয়ে ভবিষ্যতে সাফল্যে চেষ্টা করবেন। প্রত্যেকের জন্য থাকবে স্মিতহাসি। নিজেকে উন্নত করার জন্য এত সময় ব্যয় করবেন, যেন অপরের সমালোচনা করার জন্য সময় অবশিষ্ট না থাকে। এত বড় হবেন যেন উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কাবু করতে পারে, এত মহান হবেন যেন ক্রোধ না বশীভূত করতে পারে।

দ্বিতীয় পদ্ধতি: কাজ এখনই শেষ করার অভ্যাস আয়ত্ত করুন
জীবনে কোনও না কোনও সময়ে আমরা দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়েছি। এর ফলে পস্তাত হয়েছে। দীর্ঘসূত্রতা নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দেয়। প্রকৃতপক্ষে পরিশ্রম করে কাজটি শেষ করতে যত না ক্লান্তি আসে, দীর্ঘসূত্রতার অভ্যাস তার থেকে বেশি ক্লান্ত করে। একটি সুনিষ্পন্ন কাজ মনকে দেয় সম্পূর্ণতার তৃপ্তি এবং কর্মোদ্যম; আর অসমাপ্ত কাজ একটি ছিদ্রযুক্ত জলাধারের মতো-সমস্ত কর্মশক্তিকে নিঃশেষিত করে দেয়। একটি ইতিবাচক মানসিকতা গঠন করতেও বজায় রাখতে বর্তমানের মধ্যে বাঁচার এবং হাতের কাজগুলি এখনই করার অভ্যাস করতে হবে।

চাঁদের আলোয় মধুর আলস্যে সে দিয়েছে নিদ্রা,
সুর্যের উত্তাপ সে উপভোগ করেছে সমস্ত দেহ দিয়ে,
কিছু কাজ করতে হবে-এই ভেবে ভেবে সে বেঁচেছে সারাজীবন,
মৃত্যু যখন এসে দরজায় দাঁড়াল, তখনই কিছুই করা হয়ে ওঠেনি।
–জেম্‌স এ্যালবেরী

যখন আমি বড় হব
ছোট ছেলেটি বাল্যকালে ভাবে যে বড় হে আমি এই ভাবে কাজ করব এবং সুখী হব। যথন বড় হল, তখন ভাবল, কলেজের পাঠ শেষ করে এই এই কাজ করাব এবং সুখী হব। কলেজের পাঠ শেষ করে ভাবল এই বার একটা চাকুরি পাই, তারপর বেশ কিছু কাজ করাব। চাকরি যখন পেল তখন ভাবল এইবার বিয়ে করি, তারপর অন্য ভালো কাজে হাত দেব। কিন্তু বিয়ের পরও যখন কিছু করতে পারল না, তখন ভাবল বাচ্চাদের লেখাপড়া শেকা শেষ হোক, তারপর দেখা যাবে। শেষ পর্যন্ত অবসর নেওয়ার পর দেখল জীবন কখন তার চোখের সামনে দিয়ে বয়ে চলে গেছে। কাজ সে কিছুই করতে পারেনি।

খুব বড় বড় কথা বলে অনেকে দীর্ঘসূত্রতাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কাজ শেষ না হওয়ার অজুহাত হিসাবে বলেন,আমি বিশ্লেষণ করে দেখেছি। ছয়মাস পরেও দেখা যায় সেই বিশ্লেষণ চলছে, তখনও শেষ হয়নি। এটা এক ধরনের রোগ, যাকে বলা যায় বিশ্লেষণের পক্ষাঘাত। এরা কখনই কাজে সফল হবেন না।

আর একদল আছেন যারা বলেন, আমি তৈরি হচ্ছি। ছমমাস পরেও সেই একই উত্তর তৈরি হচ্ছি। এদের রোগকে বলা যায় অজুহাতম্বর। সব সময়েই কাজ না করার অজুহাত দেখিয়ে কাজ এড়িয়ে যান।

জীবনটা অভিনয়ের আগে ড্রেস রিহার্সেল নয়। যে জীবন দর্শনেই বিশ্বাস থাকুক না কেন, জীবনের খেলায় আমাদের হাতে মাত্র একটি গুলি আছে। এই খেলার বাজি অনেক বেশি-বাজি হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

কোথায় এবং কখন, এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় এখানেই এবং এখনই। বর্তমান সময়কে সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। সে প্রয়োজন অবশ্যই আছে। যদি বর্তমানকে যথাযথভাবে কাজে লাগান যায়, তবে, স্বাভাবিকভাবে, তাই হবে ভবিষ্যতের জন্য বীজ বপন করা।

তৃতীয় পদ্ধতি : কৃতজ্ঞ হওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়া দরকার-
জীবনে যা প্রসাদ লাব করেছেন তারই হিসেব করুন, কেবল দুঃখ কষ্টের নয়। সময়মত গোলাপের সুবাস গ্রহণ করুন। কেউ কেউ দুর্ঘটনায় বা অসুখে অন্ধ হয়ে গেলে দশ লক্ষ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও সুস্থ মানুষ কি দশ লক্ষ ডলার পাওয়ার লোভে অন্ধ হতে চাইবেন? অনেকেই চাইবেন না। আমাদের যা নেই তা নিয়ে আমাদের অভিযোগ এত সোচ্চার যে আমাদের যা আছে তার দিকে নজর দিতে পারি না। বস্তুবপক্ষে, আমরা যা পেয়েছি তার জন্যই আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

কিভাবে আপন আপন মানসিকতা অনুযায়ী বক্তব্যকে গ্রহণ করা হয় তার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একজন ডাক্তারকে অতিথি বক্তা হিসাবে একদল সুবাসক্ত মানুষের সভায় বক্ততা দিতে আহ্বান করা হয়েছিল। সুরাসক্তি মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে কতখানি ক্সতিকরা তা প্রমাণ করারজন্য তিনি একটি জোরালো পরীক্ষা করে কতখানি ক্ষতিকর তা প্রমাণ করার জন্য তিনি একটি জোরালো পরীীক্সা করে বক্তব্যটি সকলকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। দুটি পাত্রের একটিতে জল, অপরটিতে নির্ভেজাল মদ নিয়ে, প্রথমে জলের পাত্রে একটি কেঁচো ছেড়ে দিলেন। কেঁচোটি বেশ নড়ে চড়ে বেড়াতে লাগল। তারপর সেটি তুলে নিয়ে নির্ভেজাল মদের পাত্রে রাখলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কেঁচোটি টুকরো টুকরো হয়ে পাত্রের মদের সঙ্গে মিশে গেল। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন মদ পরীক্ষার দ্বরা কী প্রমাণ হোল। পেছন থেকে সুরাসুক্তদের একজন বললেন, মদ খেলে পাকস্থলীতে কেঁচো হবে না। অবশ্যই এটি ডাক্তারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল না। কিন্তু শ্রোতাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের নিজের নিজের মানসিক প্রবণতা অনুযায়ী অর্থ করে নিয়েছেন। এইভাবে অনেকে পূর্বনির্ধারিত চিন্তুর প্রবাবে প্রকৃত বক্তব্যকে গ্রহণ করতে পারেন না।

জীবনে অনেক প্রাপ্তি লুকানো সম্পদের মতো- তাদের প্রকৃত মূল্য আমরা জানি না। এইগুলিকেই বড় করে দেখা উচিত, দুঃখ কষ্টকে নয়।

চতুর্থ পদ্ধতি : ক্রমাগত শিক্ষাগ্রহণের মনোভাব তৈরি হোক –
শিক্ষা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার নিরসন দরকার। অনেকে মনে করেন আমরা স্কুল-কলেজে শিক্ষালাভ করে শিক্ষিত হই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সেমিনারে যোগ দিতে গিয়ে আমি শ্রোতাদের প্রায়ই জিজ্ঞাসা করি, আপনারা কি স্কুল-কলেজে প্রকৃত শিক্ষা লাভ করেছেন? এ বিষয়ে সবাই একমত যে কেউ কেউ প্রকৃত শিক্ষা লাভ করলেও, বেশিরভাগই সে শিক্ষা পায়নি। স্কুলখ-কলেজে তথ্যপূর্ণ অনেক শিক্ষা পাই; কিন্তু শিক্ষার অনেকটাই বাকি থাকে। শিক্ষায় তথ্য, ঘটনাবলী ইত্যাদি জানার খুবই প্রয়োজন; কিন্তু তাতেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। আমাদের শিক্ষার সত্য অর্থ জানা দরকার।

বুদ্ধিগত শিক্ষা আমাদের মস্তিষ্ককে উর্বর করে, এবং মূল্যবোধের শিক্ষা আমাদের হৃদয়বৃত্তিকে সমৃদ্ধ করে। বস্তুবপক্ষে যে শিক্ষা আমাদের হৃদয়কে সুশিক্ষিত করে না, সে শিক্ষা বিফল। আমাদের পরিবার, সমাজ ও কর্মস্থলের উপযোগী চরিত্র গঠনের জন্য নীতিবোধ ও নীতিশিক্ষার প্রয়োজন। যে শিক্ষা চরিত্রে সততা, সহমর্মিতা, সাহস, একগ্রতা ও দায়িত্ববোধের মতো মৌলিক গুণাবলী গঠন করে সেই শিক্ষারই একান্ত প্রয়োজন। আমরা কেবল ডিগ্রির মানদন্ডে মাপা শিক্ষা চাই না- আমরা চাই মূল্যবোধের শিক্ষা। জোরের সঙ্গে বলা যায়, যে ব্যক্তি নীতিবোধের শিক্ষায় শিক্ষিত, তার খুব উচ্চ ডিগ্রিধারী অথচ ণিিতবোধ বর্জিত ব্যক্তির থেকে জীবনে উন্নতি করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। চরিত্র গঠন এবং নীতি ও মূল্যবোধের শিক্ষা যে সময় বাচ্চারা বড় হয়ে উঠে সেই সময়েই দেওয়া ভালো, কারণ তখন বাচ্চাদের মনে কোনও পূর্বনিদিষ্ট ধারণা থাকে না।

মূল্যবোধহীন শিক্ষা
প্রকৃত শিক্ষায় বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃহয়বৃত্তি দুইই সমৃদ্ধ হয়। একজন অশিক্ষিতি চোর মালগাড়ি থেকে চুরি করে, কিন্তু একজন শিক্ষিত চোর পুরো রেলপথটাই চুরি করে নিতে পারে। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট স্টিবেন মুলার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অবীব দক্ষ বর্বর তৈরি করছে, কারন আমরা তরুনদের কোনও মূল্যবোধের শিক্ষা দিচ্ছি না, যদিও তারা ক্রমাগত সেই মূল্যবোদের অনুসন্ধান করে চলেছে।

গ্রেড পাওয়ার জন্য নয়, আমাদের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত জ্ঞান ও বৈদগ্ধ লাভের জন্য। জ্ঞানী তথ্য আহরণ করে আর বিদগ্ধ ব্যক্তি যে তথ্যগুলিকে সরলীকরণ করে তার তেকে প্রজ্ঞা লাব করে। বিশেষ কিছু হৃদয়ঙ্গম না করেও একজন ভালো গ্রেড বা ভালো ডিগ্রি পেতে পারেন। কিভাবে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয় সে বিষয়ে অবহিত হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন। অনেক বিষয় স্মরন রাখার ক্ষমতাকেই শিক্ষা বলে না। নীতিবোধ ছাড়া শিক্ষা সমাজের কাছে ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে।

শিক্ষা সবসময় শুভ বিচার-বুদ্ধিকে জাগ্রত করে না : একজন ব্যক্তি রাস্তার ধারে সন্তার খাবার হট্ডগ্ বিক্রি করত। সে ছিল অশিক্ষিত, তাই খবরের কাগজ পড়ত না; কানে কম শুনত, তাই রেডিও শুনত না; চোখের দৃস্টি কমজোর, তাই চেলিভিশন দেখত না। কিন্তু উঃসাহের সঙ্গে হট্ডগ্ বিক্রি করে বিক্রি ও লাভ অনেক বাড়িয়ে ফেলেছিল। ব্যবসা বেড়ে যাওয়ায় তার কলেজ থেকে পাশকরা গ্র্যাজুয়েট চেলে তার সঙ্গে যোগ দিল।

তারপরই সেই আশ্চর্য ঘটনা ঘটল, বাবা, তুমি কি জান দেমে এখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, যার ফলে আমাদের ব্যবসাও মার কাবে? বাবা বলল, আমি তো জানি না, ব্যাপারটা কি বলতো। ছেলে বলল, আন্তর্জাতিক অবস্থা গুরুতর; অভ্যন্তরিীণ অবস্থা আরও খারাপ। আগামী দিনের খারাপ সময়ের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। লেঅকটি ভাবল, চেলে কলেজে পড়েছে, খবরের কাগজ পড়ে, রেডিও শোনে; সুতরাং তার এই কমস্ত বিষয় জানার কথা। তার উপদেশ অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।  এই বেবে সে পরে দিন থেকে রুটি-মাংসের অর্ডার কমিয়ে দিল। দোকানের বোর্ড খুলে নিল। ব্যবসায়ে তার আগ্রহ গেল কমে। সঙ্গে সঙ্গে খদ্দেরদের মধ্যেও তার হট্ডগের চাহিদা কমে গেল। বাবা তখন ছেলেকে বলল, তুমি ঠিকই বলেছিলে, আমরা একন অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে পড়েছি। তুমি যতাসময়ে আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলে বলো আমি খুশি।

এই গল্পের নৈতিক উপদেশটি কী?
১. অনেক সময় আমরা মেধা এবং সুবিবেচনার মধ্যে ভেদাভেদ নির্ধারন করতে পারি না।
২.কেউ কেউ খুব মেধাবী, কিন্তু বিচার-বিবেচনা করার ক্ষমতার অভাব দেখা যায়।
৩. যত্নের সঙ্গে উপদেশ নির্বাচন করা উচিত, নিজের বিচার বুদ্ধি সবক্ষেত্রেই ব্যবহার করা উচিত।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও মানুষ সফল হতে পারে যদি তার মধ্যে নিুলিখিত গুনাবলী থাকে – চরিত্র,দায়বদ্ধতা,দৃঢ়বিশ্বাস,সৌজন্যবোধ,সাহস
৫. দূর্ভাগ্যের কথা : অনেকে জ্ঞানের দিক তেকে চলন্ত বিশ্বকোষ, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে চুড়ান্ত ব্যর্থ।
মেধা হচ্ছে দ্রুত শেখার ক্ষমতা, শিক্ষাকে দ্রুত কাজে লাগানোর দক্ষতাকে বলে সক্ষমতা। যে বিষয়ে শিক্ষা নেওয়া হয়েচে তাকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করার আকাঙক্ষা ও ক্ষমতা যদি থাকে, তবে তাকেই বলে যোগ্যতা। আকাঙক্ষা হচ্ছে এমন একটি মানসিক অবস্তা যার সাহায্যে দক্ষ মানুষ যোগ্য মানুষ হয়ে ওঠে। উইনষ্টন চার্চিল বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্তব্য হচ্ছে ছাত্রদের জ্ঞানার্জনের সহায়তা করা, ব্যবসা-বানিজ্য শিক্ষা দেওয়া নয়; চরিত্র গঠনের উৎসাহ দেওয়া কলাকৌশলগত শিক্ষায় নয়।

শিক্ষিত মানুষ:
তাহলে কাদের আমরা শিক্ষিত বলব?
প্রথমত, যারা জীবনে একর পর এক যে সমস্ত অবস্থার সম্মুখীন হন, সেই সমস্ত অবস্থার সম্যকভাবে মোকাবিলা করতে পারেন এবং যারা সমস্যাপূর্ণ মুহুর্তগুলিকে যতার্থরূপে বিচার করে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারেন।

তারপর, যারা বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক ব্যবহার করেন, অপরে ব্যবহার অপ্রিয় বা অপমানজনক হলেও তাদের সঙ্গে সহজভাবে ব্যবহার করেন, যারা সহকর্মীদের সঙ্গে সবসময়েই সাধ্যমত ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার করেন।

তাছাড়াও যারা নিজেদের আনন্দ-উল্লাসকে সব সময়েই নিয়ন্ত্রনে রাখেন এবং কখনও কখনও দুর্ভাগ্যের শিকার হলেও অশোভন ভাবে বিচলিত না হয়ে সেই দূর্ভাগ্যকে মানুষের স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গ্রহণ করেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যারা সাফল্যের আনন্দে পথভ্রষ্ট হয়ে মানুষের নিজস্ব সত্তাকে বিনষ্ট করেননি, বরং বিজ্ঞ ও স্থিতধীব্যক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থাকেন, যারা সহজাত বুদ্ধি ও স্বভাব নিয়ে যেমন উচ্ছ্বসিত হন না, তেমনি দৈবক্রমে যে সাফল্যের অধিকারী হয়েছে সে সম্পর্কে আনন্দে উচ্ছল হন না।

যারা চরিত্র উল্লিখিত গুণাবলীর যে কোনও একটির সঙ্গে নয়, সবগুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ন তাদেরই শিক্ষিত বলা যায়। তিনি বস্তুতপক্ষে সর্বগুণান্বিত। -সক্রেটিস (৪৭০-৩৯৯ খ্রীঃ পূঃ)-

বহুমুখী শিক্ষা কি?
বনের কতিপয় জন্তু একটি স্কুল খুলতে মনস্থ করল। স্কুলে ছাত্র হিসেবে এল একটি পাখি, একটি কাঠবেড়ালী, একটি কুকুর, একটি খরগোস এবং একটি মানসিক প্রতিবন্ধী, এবং সব ছাত্রকেই সব বিষয় নিতে হবে। শিক্ষাসূচীর মধ্যে ছিল আকাশে ওড়া, গাছে চড়া, সাঁতার কাটা, মাটি খোড়া ইত্যাদি। সব ছাত্রকেই সব বিষয় নিতে হবে।

পাখি ভালো উড়তে পারে বলে ওড়াতে সে প্রথম; কিন্তু মাটি খুঁড়তে গিয়ে তার ঠোঁট গেল ভেঙ্গে, ডানা গেল মুচড়ে। ফলে ওড়াতেও তার দক্ষতা কমে গেল। সব মিলিয়ে সে পেল তৃতীয় শ্রেণী। কাঠবেড়ালি গাছে চড়াতে সব সময়েই প্রথম, কিন্তু সাঁতারে ফেল, কুকুর স্কুলে ভর্তি হলো না, স্কুলের জন্য চাঁদাও দিল না। উল্টে ঘেউ ঘেউ করা কে পাঠ্যতালিকায় স্থান দেওয়ার দাবিতে পরিচালক মন্ডলীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করল। মাটি খোঁড়াতে খরগোস প্রথম, কিন্তু গাছে চড়া তার কাছে সমস্যা। কয়েকবার চড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়ার ফলে সে মাটি খোঁড়াও ভালো করে করতে পারছিল না। ফলে সব মিলে সে পেল তৃতীয় শ্রেনী। এদিকে মানসিক প্রতিবন্ধী সব বিষয়েই মাঝারি। ফলে সব বিষয় মিলিয়ে সেই হলো প্রথম! পরিচালক মন্ডলী খুশি কারণ একটি বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় প্রত্যেক ছাত্র ব্যাপকবিষয়ভিত্তিক শিক্ষা পেয়েছে। কিন্তু বহুমুখী শিক্ষার প্রকৃত অর্থ হোল ছাত্রদের যে যে বিষয়ে দক্ষতা আছে এবং স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করার প্রবণতা আছে তাকে ক্ষুন্ন না করে সেই বিষয়ের দক্ষতাকে আরও উন্নত করে জীবন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করা।

আমাদের সকলেরই কোনও না কোনও বিষয়ে দক্ষতা আছে :
হামিংবার্ড খুব ছোট্ট পাখি, এক আউন্সের দশভাগের একভাগ মাত্র ওজন। কিন্তু দেহ এত নমনীয় যে সে খুব জটিল ভাবে প্রতি সেকেন্ডে ৭৫বার পাখা সঞ্চালন করতে পারে। ফলে হামিংবার্ড ফুলের উপর উড়ে উড়ে মধু পান করতে পারে কিন্তু সোজা আকাশে উড়তে, বাতাসে ভেসে বেড়াতে কিংবা লাফিয়ে লাফিয়ে মাটির উপর বেড়াতে পারে না। ৩০০পাউন্ড ওজনের উটপাকি পাখিদের মধ্যে বৃহত্তম; কিন্তু উড়তে পারে না। কিন্তু এদের পা এত শক্ত যে ঘন্টায় ৫০ মাইল বেগে দৌড়াতে পারে; এক পদক্ষেপে ১২থেকে ১৫ফুট যায়।

অজ্ঞতা :
জ্ঞানের প্রতি মোহ থাকলেই তাকে শিক্ষিত বলা যায় না, বরং বলা যায় সে অজ্ঞ। মূঢ় লোকেদের এক বিশেষ ধরনের আত্নবিশ্বাস থাকে যা অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় বেনজামিন ফ্রান্কলিন এই প্রসঙ্গে বলেছিলে, কোনও কোনও বিষয়ে অজ্ঞ হওয়ার মধ্যে কোনও লজ্জা নেই, কিন্তু কোনও করনীয় কাজরে সঠিক পদ্ধতিটি আয়ত্ত করার অনিচ্ছা প্রকৃতই লজ্জাকর।

কোনও বিষয়ে না জানা দোষের নয়, কিন্তু এই অজ্ঞতাকে সম্বল করে জীবনে উন্নতি করা ইচ্ছাই মূঢ়তা। কিছু মানুষ অজ্ঞতাকে জমিয়ে জমিয়ে তাকেই শিক্ষা বলে চালাতে চায়। অজ্ঞতা মানুষকে সুখী করে না। অজ্ঞতার অর্থ দুঃখ, বিপদ, দারিদ্র্য ও অসুস্থতা। অজ্ঞতা যদি সুখদায়কই হোত তবে বেশিরভাগ মানুষ সুখী নয় কেন? অল্পবিদ্যা যদি ভয়ঙ্করী হয় তবে বেশি অজ্ঞতাই তাই; কারণ অজ্ঞতাও ক্ষুদ্রতা,ভয়,গোঁড়ামী আত্নম্ভরিতা ও কুসংস্কারের জন্ম দেয়। প্রজ্ঞা অজ্ঞতার অন্ধকার দুর করে।

আমরা যে যুগে বাস করি সে যুগে সংবাদের গুরুত্ব অনেক। হিসাব করে দেখা গেছে যে প্রত্যেক বৎসর আমাদের জ্ঞাতব্য বিষয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। তথ্য ও সংবাদ এত সহজে পাওয়া যায় বলে অজ্ঞতা দূর করাও সহজ। কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমাদের শিক্ষায় অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিই বাদ পড়ে যায়। আমরা পড়ি,লিখি,অঙ্ক শিখি,কিন্তু এই বুদ্ধির চর্চায় আমাদের কী লাভ হবে যদি আমাদের মানবিক মর্যাদাবোধ ও মানুষের প্রতি সহমর্মিতাবোধ সম্পর্কে কোনও ধারণা না থাকে? আমাদের স্কুলগুলি জ্ঞানের ঝরনা ধারার মতো- কিছু ছাত্র সেই ধারায় তৃষ্ণা নিবারণ করে, কেউ আবার একটু আধটু চুমুক দিয়ে দেখে, আবার কেউ কেউ মুখ ধুয়ে নেয়।

সাধারণ বুদ্ধি :
সাধারন বুদ্ধি ছাড়া শিক্ষা ও জ্ঞানের কোনও মূল্যই নেই। সাধারণ বুদ্ধির অর্থ বাস্তব অবস্থাকে যথাযথভাবে অনুধাবন করা,এবং সেই অনুসারে যে ভাবে কাজ করা উচিত সেইভাবে কাজ করা। আমরা সবাই পাঁচটি ইন্দ্রিয় নিয়ে জন্মেছি-স্পর্শ,স্বাদ,দৃষ্টি,ঘ্রান ও শ্রুতি। কিন্তু সকল মানুষদের আর একটি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে- সেটি হল সাধারণ বুদ্ধি। সাধারণ বুদ্ধি শিক্ষার ফলশ্রুতি নয়। শিক্ষা ব্যতিরেকেও লাভ করা যায়। সাধারণ বুদ্ধি ব্যতিরেকে শ্রেষ্ঠতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও বিশেষ ফলপ্রসূ হয় না। প্রখর সাধারন বুদ্ধির নামই প্রজ্ঞা।

কুঠারে শান দাও :
জন নামে এক কাঠুরে একটি সংস্থায় পাঁচ বছর কাজ করার পরও তার মাইনে বাড়েনি। সেই সংস্থা তখন বিল নামে এক কাঠুরেকে কাজে লাগাল এবং এক বছরের মধ্যে তার মাইনে বাড়িয়ে দিল। জন ক্ষুদ্ধ হয়ে তার উপরওয়ালার কাছে গিয়ে ব্যাপারটা জানতে চাইল। উপরওয়ালা বলল, পাচ বছর আগে তুমি যে পরিমান কাঠ কাটতে আজও তাই কাটছ। তুমি যদি তোমার কাঠ কাটার ক্ষমতা বাড়াও তাহলে আমরাও তোমার মাইনে বাড়িয়ে দেব। জন ফিরে গিয়ে কাজ আরম্ভ করল। কিন্তু অনেক বেশি সময় ব্যয় করে, এবং সর্বশক্তি দিয়ে আগাত করেও সে আগের থেকে বেশি গাছ কাটতে পারলো না। তখন সে উপরওয়ালার কাছে গিয়ে তার সমস্যার কথা বলল। উপরওয়ালা পরামর্শ দিল বিলের সঙ্গে কথা বলতে। বিলের হয়ত কিছু কায়দাকানুন জানা আছে- এই ভেবে জন বিলকে জিজ্ঞেসা করল সে এত বেশি কাঠ কাটে কি ভাবে? বিল উত্তর দিল, প্রত্যেকটি গাছ কাটার পর আমি দুমিনিটের বিরতি নিয়ে আমার কুড়ালটতে শান দিয়ে দিই। তুমি তোমার কুড়ালে শেষবার কখন শান দিয়েছ? এই প্রশ্নটিই জনের চোখ খুলে দিল এবং সে তার সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেল।

এই প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ। তুমি শেষবার কখন তোমার অস্ত্রে শান দিয়েছ? অতীত গৌরবগাথা কিংবা উচ্চশিক্ষার মর্যাদাপূর্ন তকমা দিয়ে হবে না। সফল হতে হলে সকলকেই সদা সর্বদা কুড়লে শান দিয়ে কাজ করতে হবে।

মনের খোরাক যোগাও:
আমাদের দেহের পুষ্টির জন্য যেমন ভালো খাদ্যবস্তুর প্রয়োজন, তেমনি মানসিক উন্নতির জন্য প্রত্যহ সৎ চিন্তার প্রয়োজন। ভালো খাদ্যের বদলে খারাপ খাদ্য খেলে যেমন শরীর অসুস্থ হবে, তেমনি সৎ চিন্তা না করলে মনও অসুস্থ হবে। সৎ ও ইতিবাচক চিন্তার দ্বারাই মনকে সঠিক পথে চালনা করতে হয়। বাস্কেট বল খেলায় যেমন, তেমনি ক্রমাগত অনুশীলন এবং অনেকের সঙ্গে সংস্পর্শের মধ্য দিয়েই সাফল্যের মূলমন্ত্রগুলি আয়ত্ত্ব করতে হয়।

জ্ঞানই শক্তি:
আমরা প্রায়ই শুনি জ্ঞানই শক্তি। ঠিক তা নয়। জ্ঞান শক্তির উৎস। জ্ঞান হচ্ছে তথ্যের সমাহার। এই জ্ঞানকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়,যখন তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়। যে মানুষ পড়তে জানে না আর যে পড়তে জেনেও পড়ে না তাদের মধ্যে বিশেষ কোনও তফাৎ নেই। জ্ঞান অর্জন খাদ্য গ্রহনের মতো কতটা খাওয়া হচ্ছে তার উপর স্বাস্থ্য নির্ভর করে না-কতটা হজম হচ্ছে তার উপর স্বাস্থ্য নির্ভর করে। জ্ঞান শক্তির উৎস,আর প্রজ্ঞা,যা হচ্ছে জ্ঞানের নির্যাস হচ্ছে প্রকৃত শক্তি।

শিক্ষা অনেকভাবেই গ্রহণ করা যায়। কেবল স্কুল-কলেজের ডিগ্রিবা গ্রেড ই শিক্ষার মান নির্ধারন করে না। শিক্ষার অর্থ –
-আত্নশক্তি বৃদ্ধি করা
-স্থিরভাবে শোনার ও বোঝার ক্ষমতা অর্জন করা
-আরও জানার ইচ্ছা অর্জন করা।

মাংসপেশীর সংকোচন ও প্রসারণ যেমন ব্যায়ামের উপর নির্ভর করে, সেই ভাবে আমাদের মনও কতটা সংকুচিত বা প্রসারিত হবে তা নির্ভর করে মানসিক ব্যায়ামের উপর।

ডেরেক বক বলেছেন,শিক্ষাকে যদি দুর্মূল্য মনে হয় তবে অজ্ঞতাই বাঞ্ছনীয়। শিক্ষা ইতিবাচক হলে চিন্তাধারাও ইতিবাচক হবে।

শিক্ষা যেন একটা ভান্ডার বিশেষ:
ইতিবাচক চিন্তাশীলরা অ্যাথ্লিটদের মতো,তারা অনুশীলনের দ্বারা তাদের পরিশ্রমের ক্ষমতা এত বাড়িয়ে নিতে পারে যে প্রতিযোগিতার সময় সেই ভান্ডার থেকে খরচ করতে পারে। অনুশীলন না করলে ভান্ডারে সঞ্চয়ও বাড়ে না এবং সেই সঞ্চয় থেকে ব্যয়ও করা যায় না।

এইভাবে চিন্তাশীলরা নিয়মিতভাবে পরিচ্ছন্ন, দৃঢ় ও ইতিবাচক চিন্তার দ্বারা তাদের মনের সমৃদ্ধি ঘটায়,এবং একটি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলেন। একথা তারা জানেন যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে নঞর্থক চিন্তার সঙ্গে প্রতিঘাত অবশ্যম্ভাবী এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি যদি দৃঢ়ভাবে ইতিবাচক চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত না হয় তবে নঞর্থক চিন্তাকে জয় করা সহজ হবে না। শেষ পর্যন্ত হয়ত নঞর্থক চিন্তাই প্রবল হয়ে উঠবে। যারা ইতিবাচক চিন্তা করেন তারা মূর্খ নন,এবং তারা চোখ বুজে পথ চলেন না। তারা বিজয়ীর দলে,এবং সেই জন্যই তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবহিত। তাই তারা সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তাদের ক্ষমতাকেই তুলে ধরার চেস্টা করেন। কিন্তু যারা পরাজিতের দলে তারা তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে একটি বাস্তব ধারণা পোষণ করেন;কিন্তু যা তুলে ধরেন তা আসলে তাদের দুর্বলতা।

পঞ্চম পদ্ধতিঃ
ইতিবাচক আত্নমর্যাদাবোধ গড়ে তুলূনঃ
আত্মমর্যাদাবোধ কি? নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে নিজের যা মূল্যায়ন তাই আত্মমর্যাদাবোধ। আমরা যখন অন্তরে একটা স্বাচ্ছন্দ্য ও তৃপ্তি বোধ করি তখন আমাদের কাজ কর্মের মানও উন্নত হয়,এবং বাড়িতে কিংবা কর্মস্থলে সবার সঙ্গে সম্পর্কও ভালো থাকে। সারা পৃথিবীই তখন সুন্দর মনে হয়। আমাদের অন্তরের অনুভূতি ও বাইরের কাজকর্মের মধ্যে একটা সরাসরি যোগসূত্র আছে।

কিভাবে ইতিবাচক আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলা যায় :
দ্রুত ইতিবাচক আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তুলতে হলে মানুষের জন্য এমন কিছু ভালো কাজ কারতে হবে যার প্রতিদান কেউ মূল্য বা জিনিসের মাধ্যমে দিতে পারবে না। কয়েক বছর জেলের বন্দীদের মধ্যে সুস্থ মনোভাব ও আত্মমর্যাদাবোধ শিক্ষা দেওয়ার ভার নিয়েছিলাম। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি যা শিখলাম তা আমি কয়েক বৎসরেও শিখতে পারিনি।

প্রায় দুসপ্তাহ ধরে আমার একটি কার্যক্রমে যোগ দেওয়ার পর একজন কয়েদী আমাকে জিজেঞস করল, শিব, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমি দুসপ্তাহরে মধ্যে জেল থেকে ছাড়া পাব। আমি জিজ্ঞেস করলাম,এই যে মনোভাব তৈরি করার কার্যক্রমে তুমি যোগ দিয়েছ,সেখানে তুমি কি শিখেছ? একটু ভেবে কয়েদীটি বলল,যে নিজের সম্পর্কে তার ধারণা ভালো হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম,ভালো মানে কী? আমাকে নির্দিষ্ট করে বল তোমার কোন ব্যবহার বদলে গিয়েছে? আমার বিশ্বাস যথার্থ শিক্ষা দিতে না পারলে ব্যবহারের পরিবর্তন ঘটে না। কয়েদীটি আমাকে বলল যে কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় থেকে সে বাইবেল পড়েছে। আমি প্রশ্ন করলাম,বাইবেল পড়ে তার কি লাভ হয়েছে। সে জবাব দিল যে এর ফলে সে নিজের এবং বাইরের জগতের সম্পর্কের মধ্যে শান্তি খুঁজে পেয়েছে। এটি আগে সে পায়নি। আমি বললাম,এটি খুব ভালো কথা; কিন্তু শেষ কথা হল তুমি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কী করবে? সে বলল যে,সে সমাজের একজন সক্রিয় সহায়ক সদস্য হওয়ার চেষ্টা করবে। আমি আবার একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম। সে একই জবাব দিল। তৃতীয়বারও তাকে জিজ্ঞেস করলাম,জেল থেকে মুক্তি পাবার পর সে কী করবে? আমি একটু অন্যরকম উত্তর আশা করেছিলাম, এবার সে রেগে জবাব দিল,সে সমাজের একজন সক্রিয় সহায়ক সদস্য হবে। তার প্রথম ও শেষ উত্তরের মধ্যে যে পার্থক্য আচে তা তাকে দেখিয়ে দিলাম। প্রথমে সে বলেছিল যে সক্রিয় সদস্য হওয়ার চেষ্টা করবে,শেষে অবশ্য সে বলল যে সক্রিয় সহায়ক সদস্য হবে। হতে চেষ্টা করা ও হওয়ার মধ্যে অনেক তফাৎ আছে চেষ্টা করার মধ্যে যে দোদুল্যমানতা আছে তা সবসময়েই ব্যর্থতার দরজা খোলা রাখতে সাহায়্য করে,এবং সেই সঙ্গে জেলে ফেরার দরজাও।

ঐ কয়েদখানার আরেকজন বাসিন্দা যে আমাদের কথাপোকথন শুনছিলেন জিজ্ঞাসা করলেন শিব,তোমার এই কাজের জন্য কি পাও? উত্তরে বললাম, আমি যা অনুভূতি লাভ করলাম তার মূল্য পৃথিবীর সব অর্থের চেয়ে বেশি। তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,আপনি কেন এখানে আসেন? বললাম,আমি এখানে আসি নিজের স্বার্থের জন্য এবং তা হল আমি এই পৃথিবীকে আর ভালো বাসযোগ্য করে তুলতে চাই। এই ধরনের স্বার্থপরতা স্বাস্থ্যকর। সংক্ষেপে বলতে গেলে তুমি যা দেবে তা সর্বদাই ফিরে পাবে। তাই বলে কিছু ফিরে পাওযার ইচ্ছা নিয়ে তুমি কিছু বিনিয়োগ করবে না।

আর একজন কয়েদী বলল,একজন মানুষ যা করে তা তার নিজের ব্যাপার। একজন মাদকাসক্ত যখন মদ খায় তখন তাতে কারুর কিছুই করার নেই,তুমি তার বিষয়ে মাথা ঘামাও কেন?উত্তরে বললাম,বন্ধু তোমার কথা কিন্তু সম্পূর্ন মেনে নেওয়া যায় না। যে কেউ মাদক দ্রব্য গ্রহণ করলে আমার মাথাব্যাথার কিছু নেই। তুমি কি নিশ্চিত করে বলতে পারবে যে ঐ মাদকাসক্ত ব্যক্তিটি গাড়ি চালিযে কেবল গাছের সঙ্গেই ধাক্কা লাগাবে,এবং তোমাকে,আমাকে কিংবা আমাদের ছেলেপুলেদের চাপা দিয়ে মারবে না?আর এই ব্যাপারে যদি নিশ্চিত আশ্বাস দিতে না পার তবে আমার কথা মেনে নাও যে মাদকাসক্তদের মাদক ছাড়ানো আমার কাজ। তাদের গাড়ি চালানো থেকেও বিরত রাখা উচিত।

জীবনটা আমার;আমার জীবন নিয়ে আমি যা ইচ্ছে তাই করব। এই ধারণাটা ক্ষতিকারক। সাধারণত লোকে এর গূঢ় অর্থটি অগ্রাহ্য করে সহজ অর্থটিই গ্রহণ করে। নিতান্ত আত্মকেন্দ্রিক অর্থটি এই বাক্যটির প্রকৃত অর্থ নয়। আত্মকেন্দ্রিক মানুষ ভুলে যায় যে আমরা বিচ্ছিন্নভাবে বাঁচতে পারি না। আমি যা করি তা যেমন আমার আশেপাশের লোককে এবং অন্যরা যা করে তা আমাকে প্রভাবিত করে। আমরা বিভিন্নভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযোজিত ও নির্ভরশীল। এ কথা অনুধাবন করা দরকার যে আমরা সবাই এই গ্রহের অংশীদার এবং আমাদের কাজকর্মও সেই অনুসারে দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।

পৃথিবীতে দুরকমের মানুষ আছে।
একরকম, যারা সব কিছু গ্রহণ করে,
দুই, যারা সব কিছু দিয়ে দিতে পারে।
যারা নিতে জানে তারা খায় ভালো;আর যারা দিতে জানে তারা ঘুমোয় ভালো।
যারা দিতে জানে,তাদের আছে প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ,একটি ইতিবাচক মনোভাব এবং তারা সমাজ সেবায় আগ্রহী। অবশ্য সমাজ সেবার অর্থ বর্তমানের নেতা তথা রাজনীতিকদের ছদ্ম সমাজ সেবা নয়। এরা প্রকৃতপক্ষে সমাজসেবার নামে নিজেদেরই সেবা করে থাকে।

প্রত্যেক মানুষেরই কিছু নেওয়ার প্রয়োজন হয়,এবং নিতেও হয়। কিন্তু একজন সুস্থ মানসিকতার প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি কেবলমাত্র গ্রহণ করেন না,দেওয়ারও চেষ্টা করেন।

এক ব্যক্তি সকালে যখন তার গাড়ি দোওয়া-মোছা করছিলেন, তখন প্রতিবেশী জিজ্ঞেস বরলেন গাড়িটি কখন কিনেছেন। তিনি বললেন,তার ভাই গাড়িটি দিয়েছেন। প্রতিবেশী আক্ষেপ করে বললেন,আমার যদি এই রকম একটা গাড়ি থাকত। গাড়ির মালিক মন্তব্য করলেন,আপনার যদি আমার ভাইয়ের মতো একটি ভাই থাকত! প্রতিবেশীর স্ত্রী এই বাক্যালাপ শুনছিলেন। তার মন্তব্য হোল,আহা,আমি যদি ভাই হতাম। প্রাপ্তির প্রত্যাশায় মানুষের চিন্তা কিরূপ তির্যক পথ নেয়।

পদ্ধতি ছয়: নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে থাকুন
আজকের দিনে অল্পবয়সীরা বয়স্কদের ব্যবহার থেকে এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলি থেকে অনেক কিছু শেখে। তারা তাদের সম-বয়স্কদের চাপেও পড়ে। কেবল অল্পবয়স্করা নয়,বয়স্করাও এই সহকর্মী ও সমগোত্রীয়দের চাপের শিকার হয়। আত্মমর্যাদার অভাবে এরা তাদের নেতিবাচক প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারে না। এই নঞর্থক বা নেতিবাচক প্রভাব কিরকম?

১. নেতিবাচক মানুষ
এক বনমুরগীর বাসাতে একটা ঈগলে ডিম রাখ হয়েছিল। বনমুরগী ডিমে তা দিয়ে যে বাচ্চা হোল, সে বনমুরগী বলেই পালিত হোল। ক্রমে ক্রমে সেই ঈগলের বাচ্চা দেখতে ঈগলের মতো হলেও, বনমুরগীর স্বভাবই পেল। সে খাবারের জন্য আস্তাকুঁড়ে আঁচড়াত, বনমুরগীর মত ডাক ছাড়ত, এবং ফয়েক ফুটের বেশি উড়ত না। বনমুরগী বেশি উড়তে পারে না। একদিন সে একটি ঈগলকে মহিমময়ভঙ্গিতে সাবলীলভাবে আকাশেউড়তে দেখল। সে তখন অন্য সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করল ঐ সুন্দর পাখিটি কি পাখি? বনমুরগীরা বলল ওটি ঈগল, একটি অসাধারন পাখি। কিন্তু তুমি ওর মত উড়তে পারবে না, কারণ তুমি এখন বনমুরগী হয়ে গেছ। বনমুরগীদের সঙ্গী ঈগল এরপর এই কথা সত্য মনে করে বনমুরগীদের একজন হয়েই জীবন যাপন করে একদিন বনমুরগী লীলা-সাঙ্গ করল। বেচারাজানলই না যে সে আসলে ঈগল। সে জন্মেছিল ঈগল হয়ে, কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে ঈগল হয়ে ওঠার সুযোগ দিল না। জন্মেছিল আকাশের উঁচুতে ওড়ার জন্য, কিন্তু ঘটনাচক্রে আস্তাকুঁড়ের পরিবেশকে এড়াতে পারল না।

অধিকাংশ মানুষ সম্পর্কেই এই কথা সত্য। জীবন সম্পর্কে দুর্ভাগ্যজনক সত্যটি অলিভার উইন্ডাল হোমসের ভাষায় প্রকাশ করা যায়, বেশিরভাগ মানুষই যখন জীবনরে অন্তিম লগ্নে পৌঁছায় তখনও তাদের মধ্যে কিছু করার ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে। আমরা সমস্তটুকুর সদ্ব্যবহার করতে পারি না, তার কারণ আমাদের দূরদৃষ্টির অভাব।

ঈগলের মতো উঁচুতে উঠতে হলে ঈগলে ক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে। সফল ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে সফল হওয়ার সম্ভাবনা, চিন্তাশীলদের সান্নিধ্যে ভাবুক হওয়ার সম্ভাবনা, দানী ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে দানী হওয়ার সম্ভাবনা, আবার ছিদ্রান্বেষীদের সান্নিধ্যে ছিদ্রান্বেষী হয়োর সম্ভাবনা থাকে।

জীবনে সফল হলে ক্ষুদ্রমনা ব্যক্তিরা বিদ্রুপ করার ও সাফল্যকে ছোট করে দেখানো চেষ্টা করে। তাদের সঙ্গে লড়াই না করলেই আপনি জয়ী হবেন। সামরিক কৌশলও সেই রকম- যদি কেই আপনাকে আঘাত করার জন্য লক্ষ্য করে, তবে আঘাত আটকাবার চেষ্টা না করে সরে দাঁড়াবেন। কারন আঘাত আটকাতে গেলেও শক্তির প্রয়োজন। শক্তির অপচয় না করে অন্য উৎপাদনশীল কাজে শক্তি প্রয়োগই শ্রেয়। ক্ষুদ্রমনা ব্যক্তিদের সঙ্গে লড়াতে গেলে তাদের স্তরে নেমে আসতে হয়। তারাও তাই চায়। এই সমস্ত লোকেরা টেনে সবাইকে তাদের স্তরে নামিয়ে আনুক এরকম হতে দেবেন না। স্মরণ রাখা উচিত, কী ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে শুধু তাই দিয়ে নয়, কাদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে তাই দিয়েও মানুষের চরিত্র বিচার হয়।

২. ধূমপান, মাদক ও মদ:
লেডি অ্যাষ্টর বলেছেন, আমার আনন্দময় সময়টি কখন তা জানার জন্যই মদ খাই না। মদ্যপান মানুষের সংযম নষ্ট করে, তার উৎকন্ঠা প্রদর্শন-প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।

বিভিন্ন দেশ সফরের সময় লক্ষ্য করেছি যে কয়েকটি দেশে মদ্যপান একটি জাতীয় অবসর-বিনোদনের উপায়ে পরিণত হয়েছে। যদি মদ্যপান না করেন তবে তারা সন্দেহ করবেন আপনার কোনও অসুখ-বিসুখ আছে। তাদের নীতি হোল, আপনার ইংরেজি কতটা খারাপ তাতে কিছু যায় আসে না, কিন্তু আপনার স্কচ্ হুইস্কিটি উৎকৃষ্ট হয়ো প্রয়োজন। স্কচ্ হুইস্কির বোতলকে তারা সম্পদের মধ্যে গন্য করে।

মদ্যপান ও ধূমপানকে আজাকাল নানাভাবে আকর্ষণীয় করা হয়েছে। নেশাসক্তদের যদি নেশা করার কারণ জিজ্ঞাসা করেন তবে অনেক রকম জবাব পাবেন- কোনও বিশেষ উপলক্ষে মজা করার জন্য, সমস্যা ভোলার জন্য, ক্লান্তি অপসারণের জন্য, কেবল পরীক্ষা করে দেখার জন্য, কাউকে বিশেষভাবে চমকে দেওয়ার জন্য, চলতি রীতি মেনে চলার জন্য, সমাজে মেলামেশা করার উদ্দেশ্যে, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইত্যাদি। কেউ কেউ আবার সঙ্গীদের চাপে মদ্যপান শুরু করে। সঙ্গীর উপর চাপ সৃষ্টি করতে তারা বলে,তুমি কি আমার বন্ধু নও, তাহলে খাবে না কেন? কিংবা আমার স্বাস্থ্যের জন্য এক পেগ নাও, কিংবা রাস্তার জন্য এক পেগ ইত্যাদিদ। একজন অনামা কবির একটি কবিতা এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক।

আমি শুঁড়িখানায় তোমার স্বাস্থ্যপান করেছি,
আমি আমার বাড়িতে তোমার স্বাস্থ্যপান করেছি,
আমি এতবার, চুলোয় যাক,
তোমার স্বাস্থ্য পান করেছি যে,
আমার নিজের স্বাস্থ্যকে!
প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছি।

মদ্যপানের পর মোটর চালাতে গিয়ে জীবন নষ্ট হয়। জেরী জনসন লিখেছেন, আমেরিকান হসপিটাল এ্যাসোসিয়েশন এর রিপোর্ট অনুসারে হাসপাতালের প্রায় অর্ধেক রোগী মাদক সম্পর্কিত সমস্যায় ভর্তি হয়। ন্যাশন্ল্ সেফটি কাউন্সিল এর ১৯৮৯সালের রিপোর্ট অনুসারে প্রতি ৬০ সেকেন্ডে মদ্যপান জনিত দুর্ঘটনায় একজন আহত হয়।

৩. অশ্লীল রচনা:
অশ্লীল সাহিত্য বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের অমানবিক স্তরে অবনয়ন ঘটায়। অশ্লীল রচনা ও ছবির ব্যবহারের ফলাফল নিম্নরূপ:
-মহিলাদের প্রতি এক অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে
-শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে
-বিবাহ নষ্ট হয়ে যায়
-যৌন হিংস্রতাকে প্রশ্রয় দেয়
-নীতি ও ন্যায়-অন্যায় বোধকে বিদ্রুপ করার প্রবণতা বাড়ে
-ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে নষ্ট করে

আমেরিকায় প্রতি ৪৬ সেকেন্ডে একজন মহিলা ধর্ষিত হন। ৮৬ শতাংশ ধর্ষনকারী স্বীকার করেছে যে তারা নিয়মিত অশ্লীল-রচনা, চিত্র ইত্যাদি ব্যবহার করে, এবং ৫৭ শতাংশ স্বীকার করেছে তারা ধর্ষনের বা অনুরূপ যৌন অপরাধের সময় অশ্লীল রচনা ও ছবির অনুকরণ করেছে।

খুবই দুঃখের বিষয় যে, অশ্লীল রচনা ও ছবির ব্যবসায়ীরা এই নীচ ব্যবসা করে পয়সা উপার্জন করে। কিন্তু যে অসুস্থ মানুষরা এইগুলি কেনেন তারা কঠোর ভাষায় নিন্দার যোগ্য।

৪. না-ধর্মী চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন কার্যক্রম:
আজকাল সিনেমা ও টেলিভিশন অল্পবয়সীদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেয়। আমেরিকায় একজন তরুণ হাইস্কুলের পাঠ শেষ করার আগেই অন্তত ২০ হাজার ঘন্টা টেলিভিশন দেখে এবং এক লক্ষ মদ্য ও মদ্যপান সংক্রান্ত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেখে। এই সমস্ত থেকে একটাই শিক্ষা হয় যে মদ্যপান একটা মজার বিষয়, ধূমপান আকর্ষণীয় ব্যাপার এবং ড্রাগ একটা সাধারণ চালু জিনিস। আশ্চর্য কী,এই অবস্থায় আপরাধ বাড়বে।

টেলিভিশনের অবাস্তবতার ফেনায়-ভরা নাটকগুলি বিবাহোত্তর বা বিবাহ বহির্ভূত যৌন মিলনকে স্বাভাবিক ভাবে দেখায়। ফলে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা কমে যায় এবং বিবাহ-বিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে যায়। টেলিভিশন ও সিনেমায় যা দেখে বা সংবাদ মাধ্যমে যা শোনে তার তেকে যে সব দর্শকরা সহজে প্রভাবিত হয় তারা তাদের নৈতিক মানদন্ড স্থির করে নেয়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রচার মাধ্যম কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের প্রবাবিত করে।

৫.অবজ্ঞাপূর্ণ ব্যবহার:
অবজ্ঞাপূর্ণ ব্যবহারের দ্বারা কেবল নিজের আত্নসংযমের ও শৃঙ্খলাবোধের প্রভাবই প্রমাণিত হয়।

৬.রক মিউজিক
অনেকগুলি গানের কথা অশ্লীল। আমরা অবচেতনভাবে এরূপ গান ও অঙ্গভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারি।

সপ্তম পদ্ধতি: যে কাজ করতে হবে সেই কাজকে ভালোবাসতে শেখা দরকার

আমরা পছন্দ করি বা না করি কতকগুলি কাজ আমাদের করতে হয়। যেমন বাচ্চাদের জন্য মায়ের যত্ন। এই কাজগুলি সবসময় মজার বিষয় নাও হতে পারে; কিন্তু এই কাজগুলিকে ভালোবেসে অন্তর দিয়ে করলে তবে তা সার্থক হবে। তখন অসম্ভব কাজ করাও সম্ভব হবে।

সেন্ট ফ্রান্সিস অফ্ আসিসি এই সম্পর্কে সার কথা বলেছেন, যা প্রয়োজনীয় তা করা শুরু কর, তারপর যা সম্ভবপর তা করা শুরু কর; অবশেষে দেখা যাবে যে অসম্ভব কাজও সম্ভব হচ্ছে।

অষ্টম পদ্ধতি : ইতিবাচক ভাবনা দিয়ে দিন শুরু করুন

সকালেই কিছু পড়া বা শোনা দরকার যা হবে ইতিবাচক। রাত্রে ভালো ঘুম হলে আমাদের ক্লান্তি দূর হয় এব আমাদের মন গ্রহণ করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।

এই ইতিবাচক চিন্তা সারাদিনের কাজের সুর বেঁধে দেয় এবং সারাদিন আমাদের মনকে সঠিক অবস্থানে রাকে। আমাদের কাজের প্রণালীতে পরিবর্তন আনতে হলে ইতিবাচক চিন্তা এবং ব্যবহারকে সচেতন প্রয়াসের দ্বারা জীবনের অংশ করে নিতে হবে। প্রতিদিনই এরুপ ব্যবহারের অনুশীলন করতে করতে তা অভ্যাসে পরিণত হবে। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলিয়ম জেমস বলেন, যদি নিজের জীবনকে বদলাবার মনস্থ করে থাকো, তাহলে শুরু করা দরকার এখনই এবং খুব সোচ্চার ও দর্শনীয়ভাবে।

বিজয়ী বনাম বিজেতা
— বিজয়ীরা সব সময় প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন, বিজিতরা প্রশ্নের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত।
— বিজয়ীদের একটি কার্যক্রম থাকে, বিজিতদের থাকে সর্ববিষয়েই অজুহাত।
— বিজয়ীরা বলেন, তোমার হয়ে কাজটা করে দিচ্ছি, বিজিতরা বলেন এটা আমার কাজ নয়।
— বিজয়ীরা প্রতি সমস্যার একটা সমাধান দেখতে পান, বিজিতরা প্রতি সমাধানে একটি সমস্যা দেখেন।
— বিজয়ীরা বলেন, কাজটি কঠিন, কিন্তু করা সম্ভাব, বিজিতরা বলেন, কাজটি করা গেলেও এটি খুবই কঠিন।
— বিজয়ীরা ভুল করলে স্বীকার করেন,ভুলটা আমারই, বিজিতরা ভুল করলে বলেন এটা আমার দোষ নয়।
— বিজয়ীরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন, বিজিতরা প্রতিশ্রতি দেন।
— বিজয়ীরা বলেন আমি অবশ্যই কিছু কবর, বিজিতরা বলেন, কিছু করা উচিত।
— বিজয়ী ব্যক্তি দলের একজন সদস্যরূপে কাজ করেন, বিজিত ব্যক্তি দলের তেকে পৃথক একজন হয়ে কাজ করেন।
— বিজয়ীরা প্রাপ্তির প্রতি নজর দেন, বিজিতরা ক্ষতির দিকে নজর দেন।
— বিজয়ীরা সম্ভাবনা বিচার করেন, বিজিতরা সমস্যা বিচার করেন।
— বিজয়ীরা জয়ে বিশ্বাস করেন, বিজিতরা ভাবেন জয়ী হলেও অন্য একজনের পরাজয় হবে।
— বিজয়ীরা ক্ষমতাও সম্ভবনা দেখেন, বিজিতরা দেখেন অতীত।
— বিজয়ীরা থার্মোষ্টাট যন্ত্রের ন্যায় উষ্ণতা নিয়ন্ত্রন করে, বিজিতরা থার্মোমিটারের ন্যায় উষ্ণতা মাপে।
— বিজয়ীরা বিবেচনা করে কথা বলে, বিজিতরা যা মনে করে তাই বলে।
— বিজয়ীরা কঠিন তর্কে মোলায়েম বাক্য ব্যবহার করে, বিজিতরা সহজ বিতর্কে কঠিন বাক্য ব্যবহার করে।
— বিজয়ীরা মূল্যবোধের ক্ষেত্রে দৃঢ়, কিন্তু সামান্য ব্যাপারে আপস করেন।
— বিজিতরা মূল্যবোধের ক্ষেত্রে আপস করেন, কিন্তু সামান্য বিষয়ে দৃঢ় হন।
— বিজয়ীরা সহমর্মিতার দর্শন অনুসরণ করেন, এবং বলেন, যা তুমি নিজের ক্ষেত্রে করা পছন্দ কর না, তা অপরের ক্ষেত্রেও করবে না বিজিতরা এই নীতি অনুসরণ করেন, তোমার প্রতি কঠোর আচরন করার আগেই তুমি অপরের প্রতি সেই আচরণ কর।
— বিজয়ীরা ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন, বিজিতরা ঘটনা ঘটতে দেন।
— বিজয়ীরা জয়ের পরিকল্পনা করে ও প্রস্তুতি নেয়, প্রস্তুতিই তাদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ।

বিজয়ী হওয়ার কার্যকর পদক্ষেপঃ
যে আটটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে সেগুলি সংক্ষেপে বিবৃত করে পরিচ্ছেদ শেষ করা যাক।
১. একজন ভালো সন্ধানকারী হোন।
২. কাজটি এখনই সম্পন্ন করার অভ্যাস তৈরি করুন।
৩. কৃতজ্ঞ হওয়ার মানসিকতা তৈরি করুন।
৪. নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষার কার্যক্রম গ্রহন করুন।
৫. ইতিবাচক আত্নমর্যাদাবোধ তৈরি করুন।
৬. নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে থাকুন।
৭. যে কাজ করতে হবে তার প্রতি ভালোবাসার মনোভাব তৈরি করুন।
৮. ইতিবাচক চিন্তা ও কাজের মধ্য দিয়ে দিনটা শুরু করুন।

কাজের পরিকল্পনা (Action plan)

১. কাজের পরিকল্পনা একটি কাগজে লিখে প্রতিদিন পড়ুন। এরূপ ২১ দিন পড়ার পর পরবর্তী ত্রিশ মিনিটে নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন।

২. প্রতিটি পদক্ষেপ আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন?

ক-বাড়িতে

খ-কর্মক্ষেত্রে

গ- সামাজিক ক্ষেত্রে।

৩. যে সব বিষয়ে নিজেকে বদলাতে চান তার একটি তালিকা তৈরি করুন।

৪. প্রত্যেক পরিবর্তনের যে সুফল তার তালিকা তৈরি করুন।

৫. অবশেষে, একটি সময় সূচী মাফিক পরিবর্তনগুলি কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর হোন।

One thought on “০১. মনোভাবের গুরুত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *