০১. টুকি এবং ঝা দুজনকে মিলিয়ে

নিবেদন

আমার মাঝে মাঝেই সায়েন্স ফিকশান নিয়ে কৌতুক করে কিছু একটা লেখার ইচ্ছে করে, টুকি এবং ঝায়ের (প্রায়) দুঃসাহসিক অভিযান বইটি সেরকম একটা ইচ্ছে থেকে লেখা। যারা গোড়া সায়েন্স ফিকশান ভক্ত তারা আমার এরকম লেখা দেখে খুব বিরক্ত হন। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। অনুপম প্রকাশনী থেকে এই বইটি নূতন করে প্রকাশ করা উপলক্ষে অনেকদিন পর আবার পড়ার সুযোগ হলো–এরকম কাহিনী যে আরো অনেকবার লিখতে হবে সেই ব্যাপারটি আবারো নিশ্চিত হলো।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল
১০/৮/০৪

———–

পূর্ব কথা

টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। সেই বৃষ্টিতে দুজন মানুষ অন্ধকারে উবু হয়ে বসে আছে। একজনের নাম টুকি। অন্যজনের নাম ঝা। তাদের সামনে আবছা অন্ধকারে উঁচু মতন কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। উপরে হঠাৎ একটা আলো জ্বলে উঠে নিভে যেতেই দুজনেই চমকে উঠল। টুকির মনে হল ঘটনাটা আগে ঘটেছে, কিন্তু কবে ঘটেছে কোথায় ঘটেছে কিছুতেই সে মনে করতে পারল না। ভয় পাওয়া গলায় বলল, ওটা কী?

———–

০১.

টুকি এবং ঝা দুজনকে মিলিয়ে মোটামুটিভাবে একজন পুরো মানুষ তৈরি করা যায়। টুকি শুকনো কাঠির মতন, তার শরীরে মেদ বা চর্বি দূরে থাকুক প্রয়োজনীয় মাংসটুকুও নেই, যেটুকু থাকা প্রয়োজন ছিল সেটা জমা হয়েছে ঝায়ের শরীরে—সে দেখতে একটা ছোটখাট পাহাড়ের মতন। টুকির নাকের নিচে বিশাল গোফ সেটাও খুব সহজে ঝায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়া যেতো। বুদ্ধি শুদ্ধির ব্যাপারগুলোও দুজনের মাঝে ঠিক করে ভাগাভাগি করা হয় নি, ঝায়ের ভাগে বেশ কম পড়েছে এবং সেটুকু মনে হয় টুকি পুষিয়ে নিয়েছে। কোন একটা কিছু বুঝতে যখন ঝায়ের অনেক সময় লেগে যায় সেটা টুকি চোখের পলকে বুঝে নেয়। শুধু তাই নয়, যেটুকু না বুঝলেও ক্ষতি নেই কিংবা যেটুকু বোঝা উচিত নয় সেটাও সে বুঝে ফেলে পুরো জিনিসটাতেই একটা বিদঘুটে ঘোট পাকিয়ে ফেলে। চরিত্রের অন্যান্য দিকগুলোতেও তাই—টুকি হাসি তামাশার মাঝে নেই, কোন একটি হাসির দৃশ্য দেখেও সে এর মাঝে হাসার কোন কিছু খুঁজে পায় না। রসিকতার পুরো ব্যাপারটি পেয়েছে ঝা, অত্যন্ত কাঠখোট্টা একটা দৃশ্য দেখেও ঝা তার সমস্ত শরীর দুলিয়ে হা হা করে হাসতে শুরু করে। টুকি সন্দেহপ্রবণ মানুষ কোন কিছুকেই সে বিশ্বাস করে না, ঝা সাদাসিধে সহজ সরল, তাকে দশবার বিক্রি করে দিলেও সেটা নিয়ে কোন রকম আপত্তি করবে না। টুকি বদরাগী—চট করে ক্ষেপে গিয়ে হঠাৎ হঠাৎ একটা কাণ্ড করে বসে, ঝা মোটামুটি মাটির মানুষ, প্রয়োজনের সময়েও সে রেগে উঠতে পারে না।

চেহারা ছবি চালচলন বা চরিত্রের কোন দিক দিয়ে তাদের কোন মিল না থাকলেও একটা ব্যাপারে দুজনের মিল রয়েছে, তারা দুজনেই চোর। ছোটখাট ছিচকে চোর নয় রীতিমতো চোরের বিশেষ কলেজ থেকে পাস করা ডিপ্লোমাধারী পেশাদার চোর। ইন্টার গ্যালাক্টিক বুলেটিন বোর্ডে তাদের নাম পরিচয় প্রায়ই ছাপা হয়। পুলিশ সব সময়েই হন্যে হয়ে তাদের খোঁজাখুঁজি করছে এবং তারা দুজনেই সব সময় পুলিশ থেকে এক ধাপ এগিয়ে থেকে নিজেদের রক্ষা করে চলেছে। শৈশবে টুকি এবং ঝা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের প্রটোনিয়াম বা প্রতিরক্ষা দফতরের সফটওয়ার চুরি করে হাত পাকিয়েছে। যৌবনে আন্তঃগ্যালাক্টিক সন্ত্রাসী দলের জন্যে পারমাণবিক বোমা চুরি করেছে। এখন দুজনেরই মধ্যবয়স, উত্তেজক জিনিসপত্রে উৎসাহ নেই, ইদানীং মূল্যবান রত্নের দিকে ঝুকে পড়েছে। সত্যি কথা বলতে কী বড় একটা দাও মেরে চুরি-চামারী ছেড়ে দিয়ে নিরিবিলি কোন একটা গ্রহে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবার জন্যে আজকাল মাঝে মাঝেই দুজনের মন উসখুস করে।

সেই অর্থে আজকের চুরির প্রজেক্টটা টুকি এবং ঝা দুজনের জন্যেই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেন্ট্রাল ব্যাংকের ভল্টে দুইশ চব্বিশ ক্যারটের হীরা এসেছে খবরটা সোলার-নেটে দেখার পর থেকে দুজনেই সেটা গাপ করে দেবার তালে ছিল। খোঁজ-খবর নিয়ে টুকি আর ঝা বসে বসে নিখুঁত পরিকল্পনা করেছে। জেট চালিত জুতো পরে দেওয়াল বেয়ে উঠে গেছে, মাইক্রো-এক্সপ্লোসিভ দিয়ে দেওয়াল ফুটো করেছে, এক্স-রে লেজার দিয়ে ভল্ট কেটেছে, রিকিভ সিস্টেমে লেখা কম্পিউটার ভাইরাস দিয়ে সিকিউরিটি সিস্টেম নষ্ট করেছে, তারপর দুইশ চব্বিশ ক্যারটের বিশাল হীরাগুলো নিয়ে সরে এসেছে। পুরো ব্যাপারটা একেবারে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করছিল কিন্তু একেবারে শেষ। মুহূর্তে একটা ঝামেলা হয়ে গেল। দুশো চুরানব্বই তালা দালানের একশ বিরাশি তালায় এসে ঝায়ের বাথরুম পেয়ে গেল। সেখানে বাথরুম খুঁজে বের করে কাজ সেরে নিচে নেমে আসতে আসতে দেখে ততক্ষণে সিকিউরিটি সিস্টেম খবর। পেয়ে গেছে। সেন্ট্রাল ব্যাংকটা ঘিরে প্রায় এক ডজন পুলিশের গাড়ি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

টুকি এবং ঝা তখন জেট চালিত জুতা ব্যবহার করে লাফিয়ে গাড়িতে উঠে বসে পালানোর চেষ্টা করেছে। পুলিশকে ধোকা দেওয়ার তাদের আধ ডজন। প্রোগ্রাম রেডী করা থাকে। দেখতে নিরীহ দর্শন গাড়িটি আসলে একটা ভাসমান। গাড়ি, নিচু হয়ে উড়তে পারে। সেটায় চড়ে তারা তাদের আধডজন প্রোগ্রাম ব্যবহার করেও পুলিশকে কোনভাবে খসাতে পারল না। তখন আর কোন উপায় না দেখে তাদের শেষ অস্ত্রটা ব্যবহার করতে হল, তাদের ভাসমান গাড়িটিকে একসিডেন্টের ভান করে ধ্বংস করে দেওয়া হল। আগে থেকেই সেখানে তাদের জামা কাপড় পরানো সত্যিকার টিস্যু দিয়ে তৈরি তাদের চেহারার এক জোড়া রবোট বসানো আছে, পুলিশ এই মুহূর্তে সেগুলোকে ধরে নানাভাবে জেরা করছে আর সেই ফাকে তারা সরে এসেছে।

লুকিয়ে লুকিয়ে টুকি এবং ঝা যে জায়গায় এসে হাজির হয়েছে সেটি জংলা এবং নির্জন। বুকে ভর দিয়ে নিজেদের হাচড় পাচড় করে টেনে টেনে তারা প্রায়। কয়েক কিলোমিটার চলে এসেছে। কনুইয়ের ছাল উঠে গেছে, ঝোপঝাড়ের খোঁচা খেয়ে খেয়ে মুখের জায়গায় জায়গায় কেটে গেছে, বিছুটি জাতীয় একটা গাছ ভুল করে ছুয়ে ফেলায় টুকির সারা শরীর চুলকাচ্ছে, কাদা পানিতে দুজনেই মাখামাখি এবং খুব সঙ্গত কারণেই টুকির মেজাজ বাড়াবাড়ি রকম খারাপ হয়ে আছে। সে প্রায় একশ বাহান্নবারের মত ঝাকে গালি দিয়ে বলল, রবোটের বাচ্চা রবোট কোথাকার, সাত মাত্রার অপারেশনে কেউ বাথরুমে যায়?

ঝা ছোটখাট ঝোপঝাড়কে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে নিজেকে ছেড়ে ছেচড়ে সামনে নিতে নিতে বলল, আমি কী করব? তুমি জান সিনথেটিক গলদা চিংড়ি আমার পেটে সয় না।

পেটে সয় না তো এতগুলো খেলে কেন?

মনোসোডিয়াম গ্লুকোমেট দিয়ে ঝাল করে বেঁধেছে। জিবের স্বাদ বেড়ে গেল হঠাৎ—

টুকি রেগেমেগে আরেকটা কী বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। প্যাচপ্যাচে কাদায় আধডোবা হয়ে থেকে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, একেই বলে কপাল। এখন এর মাঝে বৃষ্টি শুরু হল।

ঝা হাসি হাসি মুখে বলল, মৌসুমী বৃষ্টি। একেবারে সময়মত এসেছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিউশান একেবারে ধুয়ে নিয়ে যাবে।

টুকি রেগেমেগে বলল, তোমার বৃষ্টির চৌদ্দগুষ্ঠির লিভারে ক্যান্সার হোক।

ঝা মুখের হাসিকে আরো বিস্তৃত করে বলল, এত রেগে যাচ্ছ কেন? কী চমৎকার বৃষ্টি, দেখ না একবার। তিন চার ঘণ্টার মাঝে থেমে যাবে।

তিন চার ঘণ্টা! টুকি মুখ খিচিয়ে বলল, ততক্ষণ আমরা কী করব?

ভিজব। মঙ্গল গ্রহে বৃষ্টিতে ভেজার একটা ট্যুর আছে। সাড়ে সাতশ ইউনিট দিলে দশ মিনিট ভিজতে দেয়। সিনথেটিক বৃষ্টি। আর এইটা হল একেবারে খাঁটি প্রাকৃতিক বৃষ্টি।

টুকি রেগেমেগে আবার কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। সামনে আবছা অন্ধকারে উঁচু মতন কিছু একটা দেখা যাচ্ছে উপরে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠে আবার নিভে গেল। টুকি ভয় পাওয়া গলায় বলল, ওটা কী?

ঝা পকেট থেকে বাইনোকুলার বের করে চোখে লাগিয়ে খানিকক্ষণ দেখে বলল, একটা দালান।

এই জংলা জায়গায় দালান তৈরি করেছে কোন আহাম্মক? আর এইটা যদি দালানই হবে তাহলে দরজা জানালা কই?

মানুষের খেয়াল! ঝা উদাস গলায় বলল, মনে নাই নাইন্টি-নাইনে একটা বাড়িতে চুরি করলাম, পুরো বাসাটা একটা থালার মতো, ছাদ নেই।

টুকি কোন কথা না বলে উবু হয়ে বসে বলল, এটা যদি সত্যি দালান হয় তাহলে এই বৃষ্টির মাঝে আমি আর কোথাও যাচ্ছি না। আমি এই দালানে বসে বিশ্রাম নেব।

যদি কেউ থাকে? টুকি মেঘস্বরে বলল, থাকলে ঘাড় ধরে বের করে দেব।

ঝা ভয়ে ভয়ে বলল, এত কষ্ট করে এত বড় একটা দাও মারলাম আর এখন যদি ছোট খাট বৃষ্টির জন্যে ধরা পড়ে যাই

সেটা নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। টুকি পাখির খাঁচার মত তার টিংটিংয়ে বুকে সজোরে একটা থাবা দিয়ে বলল, এই বান্দা কোনো কাঁচা কাজ করে না। ব্রেন ট্রান্সপ্ল্যান্ট আইনসিদ্ধ হলে আমার ব্রেন এতদিনে লাখ দুই লাখ ইউনিটে বিক্রি হতো।

দালানটা দেখতে নিরীহ মনে হলেও ভিতরে ঢোকা খুব সহজ হল না। দালানটা ঘিরে প্রথমে কাটাতারের বেড়া, তারপর গোপন ইলেক্ট্রিক লাইন, সবশেষে উঁচু দেওয়াল। তারা ঘাঘু চোর না হলে প্রথমেই ধরা পড়ে যেতো সে। ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সাবধানে উঁচু দালানটার কাছে এসে তারা কোন দরজা খুঁজে পেল না। তখন মৌসুমী বৃষ্টি আরো চেপে এসেছে, অধৈর্য হয়ে এক্সরে লেজার দিয়ে কেটে একটা দরজা প্রায় বের করে ফেলছিল ঠিক তখন ঝা। দরজা খোলার গোপন ফুটোটা আবিষ্কার করে ফেলল। টুকি তার মাস্টার কী ভিতরে ঢুকিয়ে চাপ দিতেই খুট করে দরজা খুলে গেল।

ভিতরে আবছা অন্ধকার। সাধারণ ঘরবাড়ি দেখতে যেরকম হয় দালানটির ভিতরে মোটেও সেরকম নয়—এটি যন্ত্রপাতিতে বোঝাই। টুকি এবং ঝা অনেক খুঁজেও ওপরে ওঠার এলিভেটরটি খুঁজে পেল না। তখন বাধ্য হয়ে পায়ে সাকশান জুতো লাগিয়ে তারা পাইপ বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। খানিকদূর উঠেই অবশ্য তারা একটা সিড়ি আবিষ্কার করে, সেই সিড়ি ধরে মোটামুটিভাবে দালানটার একেবারে উপরে উঠে এল। নানা স্তরে নানা রকম ঘর পার হয়ে এলেও তারা আরাম করে বসার মত কোন জায়গা খুঁজে পেল না। যখন তারা প্রায় আশা ছেড়ে দিচ্ছিল ঠিক তখন হঠাৎ করে দুজন মানুষের কথোপকথন শুনে টুকি এবং ঝা পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল মাঝারী আকারের একটা ঘরে ভারী আরামদায়ক দুটি চেয়ারে প্রায় গা ড়ুবিয়ে দুজন বুড়োমানুষ খোশগল্প করছে। মানুষ দুজন টুকি এবং ঝাকে দেখে প্রায় ভূত দেখার মত চমকে উঠে বলল, তোমরা কে?

টুকি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই বুড়োমতন একজন ধমক দেয়ার মত করে বলল, তোমরা এখানে কী করছ?

টুকি এবং ঝা পেশাদার চোর, তাদের সব কাজকর্ম হয় মানুষের অগোচরে। এরা সাধারণত মানুষের দেখা পায় না এবং হঠাৎ করে কোন মানুষ ধমকে। উঠলে খুব স্বাভাবিক কারণেই তারা ভয় পেয়ে যায়। এবারও দুজনেই ভিতরে ভিতরে একটু ভয় পেয়ে গেল, টুকি ভয়টা গোপন করে তার ব্যাগ থেকে মাঝারী আকারের একটা অস্ত্র বের করে গলার স্বর মোটা করে বলল, একটা কথা বললে ঘিলু বের করে দেব।

ঝা অস্ত্রটার দিকে এক নজর তাকিয়ে চাপা গলায় বলল, এটা তো ট্রাংকুলাইজার গান। এটা দিয়ে কী ঘিলু বের হবে?

টুকি এবারে ঝায়ের দিকে তাকিয়ে একটা বাজখাই ধমক দিয়ে বলল, চুপ কর তুমি।

বুড়ো মানুষদের একজন বলল, কিন্তু–

টুকির ধমক খেয়ে ঝায়ের মেজাজটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল এবারে সে মনের ঝাল মেটালো মানুষগুলোর উপরে, চিৎকার করে বলল, কোন কথা নয়। এক দাবড়া দিয়ে মাথা ভেঙ্গে দেব।

মানুষটা তখনো কিছু একটা বলার চেষ্টা করল। বলল, কিন্তু—

ঝা তখন অঙ্গভঙ্গী করে মাথা ভেঙ্গে ফেলে দেবার ভাণ করে দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে যায় এবং সেটা দেখে টুকি পর্যন্ত একটু ঘাবড়ে গিয়ে কী করবে বুঝতে না পেরে গুলি করে বসল। ট্রাংকুয়ালাইজার গানের গুলি খেয়ে মানুষ দুজন ফোঁস জাতীয় একটা শব্দ করে সাথে সাথে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল। ঘুম যে গাঢ় সেটি প্রমাণ করার জন্যেই সম্ভবত সাথে সাথে তাদের নাক ডাকতে শুরু করে।

ঝা তার মুখে ভয়ংকর অঙ্গভঙ্গীটি ধরে রেখে বলল, কী হল, মরে গেল নাকী?

মরবে কেন? টুকি বিরক্ত হয়ে বলল, ট্রাঙ্কুলাইজার গানের গুলি খেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। দেখছ না নাক ডাকছে।

ঝা ঠিক বুঝতে পারল না মুখে ভয়ংকর ভঙ্গীটি ধরে রাখবে কী না, দ্বিধান্বিত হয়ে খানিকটা প্রশ্নের ভঙ্গীতে টুকির দিকে তাকাল। টুকি তার অস্ত্রটি ব্যাগে ঢুকাতে ঢুকাতে বলল, যাও, এদের বাইরে রেখে এস।

ঝা অবাক হয়ে বলল, কেন?

শুনতে পাচ্ছ না জেট ইঞ্জিনের মত নাক ডাকছে? কেউ কানের কাছে এভাবে নাক ডাকলে বিশ্রাম নেওয়া যায়?।

ঝা ইতস্তত করে বলল, কিন্তু আমার একটু বাথরুমে যাওয়ার দরকার ছিল। সিনথেটিক গলদা চিংড়িগুলো পেটের মাঝে–

যেতে তোমাকে না করছে কে? মানুষগুলোকে বাইরে রেখে বাথরুমে কেন। ইচ্ছে হলে নরকে চলে যাও।

ঝা খুব বিরক্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকা বুড়ো মানুষ দুটির সার্টের কলার ধরে টেনে টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল। টুকি নরম চেয়ারে গা ড়ুবিয়ে বসে সামনে রাখা বিশাল ভিডিও স্ক্রীনের টেলিভিষণটি চালু করার চেষ্টা করতে থাকে। এরকম সময়ে পাবলিক চ্যানেলগুলোতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হয়। বড় ধরনের কিছু একটা চুরি করে এসে সে সব সময় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনে তার স্নায়ুকে শীতল করে। থাকে। এখন সে চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত দূরে থাকুক কোন ধরনের। অনুষ্ঠানই শুনতে পেল না, সব চ্যানেলেই নানা ধরনের দুর্বোধ্য যান্ত্রিক ছবি। টুকি বিরক্ত হয়ে টেলিভিষণ বন্ধ করে দেয়।

মানুষ দুটিকে বাইরে রেখে ফিরে আসতে ঝায়ের খুব বেশি সময় লাগার। কথা নয় কিন্তু দেখা গেল তার কোন দেখা নেই। অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে কী করবে বুঝতে না পেরে টুকি তার নরম চেয়ার থেকে উঠে ঘরটাতে পায়চারী শুরু করে এবং ঠিক তখন সে আবিষ্কার করল ঘরের এক কোনায় একটি রবোট চুপ করে দাঁড়িয়ে তার দিকে সবুজ ফটোসেলের চোখে তাকিয়ে আছে। টুকি প্রথমে চমকে উঠল তারপর সাহসে ভর করে কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, এই রবোট–

রবোটটি কোন কথা না বলে কয়েকবার চোখ পিট পিট করল। টুকি আবার বলল, এই রবোট—কথা বলছ না কেন?

রবোটটি এবারেও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চোখ দুটি আরও কয়েকবার পিট পিট করল। টুকি যখন তৃতীয়বার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে কী না চিন্তা করছে ঠিক তখন ঝা ঘরে এসে ঢুকল। সে ভিজে জবজবে হয়ে আছে। টুকি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, সে কী! তুমি ভিজলে কেমন করে?

বাইরে যা বৃষ্টি! ভিজব না?

টুকি চোখ কপালে তুলে বলল, এই বৃষ্টিতে তুমি বাইরে গেলে কেন?

তুমি না বললে মানুষগুলিকে বাইরে রেখে আসতে!

আরে রবোটের বাচ্চা—আমি বলেছিলাম ঘরের বাইরে!

ঝা খানিকক্ষণ হা করে থেকে অপ্রস্তুতের মত বলল, আমি ভেবেছি তুমি বলেছ বিল্ডিংয়ের বাইরে—

ঠিক এই সময়ে সমস্ত বিল্ডিংটা মৃদু মৃদু কাঁপতে শুরু করে এবং কোথায়। জানি একটা মৃদু গুঞ্জন শোনা যায়। সামনের বড় ভিডিও স্ক্রিনগুলোতে বিচিত্র সব নকশা খেলা করতে থাকে। ঝা মাথা নেড়ে বলল, এই বিল্ডিংয়ের সবকিছু। আজব। কেমন শব্দ করছে দেখছ?

টুকি মাথা নাড়ল। ঝা বলল, সারা বিল্ডিংয়ে কোন বাথরুম নেই। বাথরুম নেই?

না! একটা আছে সেটা উল্টো।

টুকি অবাক হয়ে বলল, উল্টো?

হ্যাঁ! ছাদ থেকে ঝুলছে। এটা কী ধরনের ফাজলেমো? আমরা কী উড়ে উড়ে গিয়ে বাথরুম করব?

টুকি খানিকক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঝায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ভয়ানক চমকে উঠে বলল, সর্বনাশ!

ঝা ভয় পেয়ে বলল, কী হয়েছে?

পালাও! এখান থেকে পালাও।

কেন? কী হয়েছে?

বুঝতে পারছ না? এইটা একটা মহাকাশযান।

মহাকাশযান?

হ্যাঁ! মহাকাশযান। মহাকাশযানে কোন সোজা উল্টো নেই। সেখানে মহাকর্ষ নেই বলে সবকিছু ভাসতে থাকে। এটাও নিশ্চয়ই মহাকাশে যাবে। শুনতে পাচ্ছ না ইঞ্জিন চালু হয়েছে?

ঝা কান পেতে শুনল সত্যি সত্যি গুম গুম করে ইঞ্জিন শব্দ করছে। সে ফ্যাকাশে মুখে বলল, যে দুজনকে বাইরে রেখে এসেছি তারা মহাকাশচারী?

হ্যাঁ!

সর্বনাশ।

নিচে চল, বের হতে হবে এখান থেকে।

টুকি বিদ্যুবেগে নিচে ছুটতে থাকে, পিছনে পিছনে ঝ। ছুটতে ছুটতে তারা শুনতে পায় ইঞ্জিনের শব্দটা বাড়ছে, দেয়াল মেঝে ছাদ সবকিছু কাঁপতে শুরু করেছে। কোন রকমে নিচে এসে দরজা খোলার জন্যে হ্যান্ডেলে হাত রাখতেই হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ শোনা গেল এবং হঠাৎ করে তারা বুঝতে পারল মহাকাশযানটি উপরে উঠতে শুরু করেছে। টুকি এবং ঝা হুঁমড়ি খেয়ে পড়ল এবং তাদের মনে হতে লাগল অদৃশ্য একটা শক্তি তাদেরকে মেঝের সাথে চেপে ধরে রেখেছে। ঝা কোনমতে বলল, নড়তে পারছি না।

পারবে না! দশ জি এক্সেলেরেশান।

ঝা টুকির দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে! সর্বনাশ মুখের চামড়া নিচে ঝুলে যাচ্ছে।

টুকি রেগে বলল, বয়স নয় রবোটের বাচ্চা কোথাকার–এক্সেলেরেশানে চামড়া ঝুলে যাচ্ছে।

কী অদ্ভুত লাগছে তোমাকে!

তোমাকেও খুব সুন্দর দেখাচ্ছে না। টুকি চেষ্টা করে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, সব দোষ তোমার। তুমি যদি একশ বিরাশি তালার বাথরুমে না যেতে–

দোষ আমার? তুমি যদি এই বিল্ডিংয়ে না আসতে–

ঝায়ের কথা তার মুখে আটকে গেল। মহাকাশযানটি এখন প্রচণ্ড বেগে উপরে উঠছে তার ভয়ংকর ভূরণে দুজনের চোখের সামনে একটা লাল পর্দা ঝুলতে থাকে। সেই লাল পর্দা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে একসময় অন্ধকার হয়ে আসে। জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্তে শুনল রিনরিনে গলায় কে যেন বলল, এম, সেভেন্টি ওয়ানে মানুষের তৃতীয় কলোনীতে আপনাদের ভ্রমণ আনন্দময় হোক।

টুকি অনেক কষ্টে চোখ খুলে তাকাল। উপরে নিশ্চল হয়ে দাঁড়ানো রবোটটি কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে বলল, আপনারা আপনাদের জন্যে নির্দিষ্ট চেয়ারে না বসে মেঝেতে চ্যাপটা হয়ে কেন শুয়ে আছেন আমি জানি না।

টুকি চাপা গলায় বলল, চুপ কর হতভাগা।

আপনারা যদি আপনাদের জন্যে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে থাকতেন তাহলে আপনাদের বর্তমান শারীরিক যন্ত্রণা উপশম করার জন্যে মস্তিষ্কে বিশেষ তরঙ্গ পাঠানো যেত। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। আপনাদের উপরে তুলে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।

ঝা চিঁ চিঁ করে বলল, কেন?

আপনার স্বাভাবিক ওজনই একশ পঞ্চাশ কেজির কাছাকাছি। এখন আপনার ওজন দাঁড়িয়েছে দেড় হাজার কে জ্বি।

কতক্ষণ এরকম থাকবে?

বেশ অনেক্ষণ।

কষ্ট কী আরো বাড়বে।

কষ্ট এখনো শুরু হয়নি। কিছুক্ষণের মাঝে শুরু হবে।

ঝা কাতর গলায় বলল, কিছু কী করা যায় না?

একটা উপায় আছে। আপনাদের মাথায় আঘাত দিয়ে অচেতন করে দেওয়া। তাহলে কিছু টের পাবেন না।

টুকি এবং ঝা প্রবল বেগে মাথা নেড়ে নিষেধ করার চেষ্টা করল কিন্তু অদৃশ্য কোন একটা শক্তি এত জোরে তাদেরকে মেঝের সাথে চেপে ধরে রেখেছে যে শরীরের একটা মাংসপেশীও এতটুকু নাড়াতে পারল না। টুকি এবং ঝা অনেক কষ্টে চোখ খুলে আতংকে নীল হয়ে দেখল রবোর্টটি বড় সাইজের একটা গদা নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

ভয়ে, গদার আঘাতে নাকী মহাকাশযানের প্রচণ্ড গতিবেগের ত্বরণের কারণে তারা জ্ঞান হারিয়েছে সেটা টুকি কিংবা ঝা কারো মনে নেই।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *