কথিত আছে, গল্পের সেই রাজা বিক্ৰমাদিত্যের নাকি মণিমাণিক্যখচিত একটি বহু মূল্যবান রত্ন-সিংহাসন ছিল, এবং সেই সিংহাসনটির নির্মাণ-কৌশলও ছিল অদ্ভুত। বত্রিশটি পুতুল চারদিক থেকে সিংহাসনটিকে বেষ্টন করে থাকত।

মহারাজ বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর বহুকাল পরে, ভোজরাজ মৃত্তিকাতল থেকে সেই সিংহাসনটি উদ্ধার করেন। কিন্তু ভােজরাজ বিক্ৰমাদিত্যের সমগুণসম্পন্ন ছিলেন না বলে তাঁর আর সে সিংহাসনে বসা হল না কোন দিনই।

সিংহাসনটি উদ্ধার করবার পর প্রথম যেদিন ভোজরাজ সিংহাসনের ওপরে উপবেশন করতে গেলেন সিংহাসনের প্রথম পুতুলটি তাকে নিষেধ করল; বললে, মহারাজ! এই সিংহাসনে উপবেশনের পূর্বে আমার কিছু বলবার আছে, শ্রবণ করুন।

পুতুলটি বিক্রমাদিত্যের অশেষ গুণরাশির একটি কাহিনী বললে, এবং গল্পটি শেষ হলে বললে, মহারাজ, আপনাকে বিক্রমাদিত্যের সম্পর্কে যে গল্পটি বললাম, আপনার যদি সেরকম কোন গুণ থাকে। তবে সিংহাসনে উপবেশন করুন।

সেদিন আর ভোজরাজের সে সিংহাসনে উপবেশন করা হল না।

পরের দিনও অনুরূপভাবে দ্বিতীয় পুতুলটি ভোজরাজকে সিংহাসনে উপবেশনে বাধা দিয়ে আর একটা গল্প শোনাল বিক্ৰমাদিত্য সম্পর্কে।

এইভাবে বত্ৰিশটা পুতুল একের পর এক—দিনের পর দিন সিংহাসনে বসতে ভোজরাজকে বাধা দিতে লাগল এবং ফলে ভোজরাজের আর কোনদিনও সেই সিংহাসনে বসাই হল না।

গল্পের ভোজরাজের মত শ্ৰীনগর রাজবাড়ির গৃহদেবতাদেরও তাঁরই জন্যই প্রস্তুত সুবর্ণনির্মিত কারুকার্যমণ্ডিত পান্নাচুনিহীরাখচিত বত্রিশ সিংহাসনটিতে বসাই হল না কোনদিন।

শ্ৰীনগর কোথায়, ভারতবর্ষের কোন জায়গায়—পূর্বে, পশ্চিমে, দক্ষিণে না উত্তরে সেটা আমাদের বর্তমান কাহিনীর প্রতিপাদ্য বিষয় নয়।

ধরে নেওয়া যাক বাংলাদেশেরই আশেপাশে কোথাও সেই শ্ৰীনগর, কলকাতা থেকে মাত্র একদিনের পথ।

পূর্ব কাহিনী যার সঙ্গে আমাদের বর্তমান কাহিনীর যোগসূত্র আছে, তা এই? শ্ৰীনগরের বর্তমান তরুণ রাজা ত্ৰিদীপনাথ রায়ের পুরুষানুক্রমে পাওয়া সম্পত্তির মধ্যে সর্বাপেক্ষা মূল্যবান যে সম্পত্তিটি ছিল সেটি হচ্ছে ছোট একটি স্বর্ণ-নির্মিত রত্নখচিত সিংহাসন। সিংহাসনটিকে বত্রিশটি স্বর্ণনির্মিত পুতুল তাদের চৌষট্টি হাতে ধারণ করে আছে।

প্রায় সাত-আট পুরুষ আগে রাজবংশের সর্বেশ্বর রায় ঐ সিংহাসনটি নির্মাণ করে সোনার গোপাল প্রতিষ্ঠা করেন। সেই হতেই সিংহাসনটিকে বত্রিশ সিংহাসন নামে অভিহিত করা হত। সোনার গোপাল প্রতিষ্ঠা করবার কিছুকাল পরে হঠাৎ অদ্ভুত উপায়ে কোন অদৃশ্য লুণ্ঠনকারী রাজবাড়ির অন্দরমহলে অবস্থিত ঠাকুরঘর থেকে গৃহদেবতা সোনার গোপালটি লুণ্ঠন করে নিয়ে যায়।

সমগ্র রাজবাড়িতে বিষাদের কালো ছায়া ঘনিয়ে এল অবশ্যম্ভাবী এক অমঙ্গলের দুশ্চিন্তয়! চারিদিকে অনুসন্ধান শুরু হল, কিন্তু বৃথা।

এখান সময় রাজমাতা কাত্যায়নী দেবী স্বপ্নে অপহৃত গৃহদেবতা সোনার গোপালের প্রত্যাদেশ পেলেন ঃ ভয়ের কিছু নেই। অপহৃত হয়েছি আমি, আবার তোদের গৃহে সময় হলেই আসব। যতদিন না তোদের ঘরে আবার আমি প্রত্যাবর্তন করি, ততদিন শূন্য সিংহাসন সিন্দুকে তালা বন্ধ করে রাখিস। ঐ বত্রিশ সিংহাসন যতদিন তোদের ঘরে থাকবে, কোন অমঙ্গলই তোদের স্পর্শ করতে পারবে না।

সেই থেকে এতদিন রত্নমণ্ডিত স্বর্ণনির্মিত বত্রিশ সিংহাসনটি রাজবাড়ির লোহার সিন্দুকেই তালাবন্ধ ছিল। গৃহদেবতাও আর প্রত্যাবর্তন করেননি, বত্রিশ সিংহাসনও আর কোন কাজে লাগেনি। রাজবাড়ির কোথাও কোন অমঙ্গলের চিহ্নও দেখা দেয়নি।

সেই সিংহাসনটিই অকস্মাৎ কেমন করে অভাবনীয়রূপে রাজবাড়ির অন্দরমহলে অবস্থিত লৌহ-সিন্দুক থেকে লুষ্ঠিত হয়েছে।

সিন্দুক থেকে সোনার বত্রিশ সিংহাসনটি বের করে আবার নতুন সোনার গোপাল নির্মাণ করে দেবতার প্রতিষ্ঠা করবেন।

স্বর্ণকারকে ডেকে মূর্তি গড়াবার আদেশও দেওয়া হয়েছিল এবং সোনার গোপালের নির্মাণকাৰ্যও প্রায় সুসম্পন্ন হয়ে এসেছে।

আসন্ন উৎসবের আয়োজন চলেছে। আত্মীয়স্বজনে রাজবাড়ি গমগম করছে, এমন সময় এই আকস্মিক বিভ্ৰাট। রাজা ত্ৰিদীপনাথ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। লোহার সিন্দুক থেকে বত্রিশ সিংহাসন চুরি গেছে। নির্মেঘ নীলকাশ থেকে যেন সহসা বজাপাত হয়েছে।

মাত্র কয়েক দিন হল কিরীটী এম. এস.সি.র শেষ পরীক্ষণ দিয়েছে। এখন অখণ্ড অবসর। কিরীটী শিয়ালদহের এক খ্যাতনামা অন্ধকার গলির মধ্যে অবস্থিত বাণীভবন মেসে থাকে।

শরৎ ঋতুর অবসানে শীতের প্রথম আবির্ভাবের রং লেগেছে। প্রকৃতির অঞ্চলে। ঝরা পাতার উৎসব দিকে দিকে শেষ হল; শুষ্ক ডালে সবুজের ইশারা।

মেসের তেতলার ঘরে একটা লোহার চেয়ারে বসে কিরীটী সেইদিনকার দৈনিকখানা আনমনে ওল্টাচ্ছে। হঠাৎ এক জায়গায় দৃষ্টি পড়তেই কিরীটী সচকিত হয়ে ওঠে। একটা বিজ্ঞাপন–

এতদ্বারা সর্বসাধারণকে জ্ঞাত করা হইতেছে যে শ্ৰীনগরের রাজবাটির অন্দরমহলে অবস্থিত লৌহসিন্দুক হইতে রাজাদের পুরুষানুক্রমে রক্ষিত ইতিহাস-বিখ্যাত বহুমূল্য রত্নখচিত সুবর্ণনির্মিত বত্রিশ সিংহাসনটি কে বা কাহারা অত্যাশ্চর্য উপায়ে লুণ্ঠন করিয়াছে। যদি কোথাও এমন কেহ থাকেন, যিনি সেই সিংহাসনটি উদ্ধার করিয়া দিতে পারেন, তাহা হইলে তঁহাকে নগদ পাঁচ হাজার টাকা পুরুস্কার দেওয়া হইবে; অনুসন্ধানেচ্ছ অবিলম্বে নিজ ব্যয়ে শ্ৰীনগরের রাজবাটিতে আসিয়া শ্ৰীনগরের রাজা ত্ৰিদীপনাথ রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন। রাজবাটী ঃ শ্ৰীনগর।

অদ্ভুত বিজ্ঞাপন।

পাঁচ হাজার টাকাটা কিরীটীর কাছে এমন কিছু একটা মূল্যবান সংবাদ নয়। কিন্তু তার মধ্যে যে রহস্যটি ঘনীভূত হয়ে আছে কিরীটী তাতেই চঞ্চল হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত সময়ের এমন চমৎকার সদ্ব্যবহার আর কিছুতেই হতে পারে না।

প্রিয় রাজা বাহাদুর,
…………তারিখের দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত আপনার বিজ্ঞাপনটি পড়লাম। আমার পরিচয় আপনি জানেন না। কারণ আমি সরকারী বা বেসরকারী গোয়েন্দা নাই, সাধারণ একজন ছাত্র মাত্র, বর্তমানে বেকার। হাতে কোন কাজকর্ম নেই। আপনি আপনার বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে যে রহস্যের অনুসন্ধান দিয়েছেন সেটা আমার রহস্যপ্রিয় মনকে একান্তভাবে আকর্ষণ করেছে। পারিশ্রমিকের কথা ছেড়ে দিন, অর্থের আমার অভাব নেই, তাই হয়তো লালসাও নেই। আমার একান্ত ইচ্ছা আপনার অপহৃত বত্রিশ সিংহাসনটির অনুসন্ধান একটিবার আমি করে দেখি। তবে আমার একটা শর্ত আছে ঃ আমি অনুসন্ধানভার গ্রহণ করলে কাউকেই আপনি সে কথা ঘৃণাক্ষরেও বলতে পারবেন না; বিশেষভাবে আমার ও আপনার মধ্যে গোপন থাকবে। আপনি যদি আমার প্রস্তাবে রাজী থাকেন, আমি নিজ ব্যয়ে গিয়ে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারি। আর একটা কথা মানুষের পক্ষে যদি সম্ভব হয় তবে আপনার অপহৃত বত্ৰিশ সিংহাসনটি নিশ্চয়ই আমি উদ্ধার করে দিতে পারব। মনে করবেন না এটা আমার আত্মম্ভরিতা, এটা আমার সংস্কার বলতে পারেন, কারণ অনুসন্ধানের ব্যাপারটা আমি মনে করি সম্পূর্ণ অঙ্কশাস্ত্রের মতই একটা জটিল সমস্যা মাত্র। বুদ্ধি থাকলেই যে কোন কঠিন সমস্যার সমাধান করা যায়; অবিশ্যি সে সমস্যা যদি উদ্ভাবিত হয়ে থাকে। আমাদের মত কোন এক মানুষের দ্বারা। অধিক বলবার কিছু নেই, সাক্ষাতেই বিশদ আলোচনা হতে পারবে। নমস্কার জানবেন।

ভবদীয়—কিরীটী রায়

নাম ঠিকানা খামে লিখে তখুনি কিরীটী চিঠিখনি ডাকবাক্সে ফেলে দেওয়ার জন্য মেসের ভৃত্যকে ডেকে পাঠিয়ে দিল।

দিন তিনেক বাদেই অপ্রত্যাশিত ভাবে জবাব এল :

আপনার চিঠিখানা পেলাম। আপনি এলে আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিশ্চয়ই আনন্দ পাব আশা করছি, সাক্ষাতে সব কথাবার্তা হবে।

শিয়ালদহ থেকে রাত্রি আটটায় একটা ট্রেন ছাড়ে, সেটা এখানে পরের দিন সকালবেলা সাতটায় এসে পৌঁছয়। স্টেশন থেকে আমাদের বাড়ি ঘণ্টাখানেকের পথ। আগে সংবাদ পেলে টমটম পাঠাব। নমস্কার রইল।

নিবেদক—ত্ৰিদীপনাথ রায়

চিঠিখানি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার মধ্যেই অপরিচিত ত্ৰিদীপনাথ রায়ের সুস্পষ্ট একটা ছবি যেন ফুটে উঠেছে। বার দুই আদ্যোপােন্ত পড়ে কিরীটীর মনে হয়—লোকটি স্বল্পভাষী। কোন কােজই বেশ চিন্তা না করে করেন না। পূর্বপুরুষের বত্রিশ সিংহাসনটি চুরি যাওয়ায় ভদ্রলোক নিশ্চয়ই বিশেষ রকম বিচলিত হয়ে উঠেছেন। এবং বিচলিত হয়েই ক্ষান্ত হননি, সেটি পুনরুদ্ধার করবার জন্যও দৃঢ়প্ৰতিজ্ঞ। সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন ও সংক্ষিপ্ত চিঠির মধ্যে দিয়ে সেটা যেন সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হচ্ছে কিরীটীর কাছে! আর দেরি করা নয়, শুভস্য শীঘ্রম।

কিরীটী জামাটা গায়ে দিয়ে শিয়ালদহের দিকে বেরিয়ে পড়ল। সেখানে খোঁজ করে পরের দিনের গাড়িতে একটা সেকেণ্ড ক্লাস বার্থ রিজার্ভ করে, কিরীটী ডাকঘরে গিয়ে ত্ৰিদীপনাথকে তার করে দিল।

শীত এখনও ভাল করে মোটেই পড়েনি, সামান্য একটু শীতের আমেজ দেখা দিয়েছে মাত্র। স্টেশনে এসে কিরীটী দেখল, ছোট একটা সেকেণ্ড ক্লাস কুপেতে লোয়ার বার্থ সে পেয়েছে। উপরের বার্থে যিনি যাচ্ছেন তাঁর নাম বিনায়ক সান্যাল, বার অ্যাট-ল। কিরীটী গাড়িতে উঠে হোন্ড-অলটা খুলে বার্থের ওপরে বিছানাটা বিছিয়ে নিল। সঙ্গে করে কয়েকটা রহস্যোপন্যাস এনেছে, রাত্রের খোরাক। রাত্রের ট্রেনে সে কোনদিনই ঘুমোতে পারে না। ট্রেনের ঝাকুনি ও চাকার শব্দে ঘুম আসে না।

কিরীটী ব্লিপিং গাউনটা গায়ে চাপিয়ে বালিশের ওপরে আড় হয়ে শুয়ে একটা বই খুলে বসল। ট্রেন ছাড়তে বোধ করি আর মিনিট দু-তিন দেরী আছে।

সাহেবী পোশাক পরা একজন নধরদেহ পুরুষ, হাতে একটা অ্যাটাচি কেস, বগলে প্রকাণ্ড একটা খাপে ভর্তি বীণা জাতীয় তারের বাদ্যযন্ত্র ও কুলীর মাথায় বেডিং ও একটা মাঝারি গোছের সুটকেশ চাপিয়ে কামরার মধ্যে এসে প্রবেশ করলেন।

কিরীটী একবার বই থেকে চোখ তুলে আগন্তুকের দিকে তাকাল।

আগস্তুকের বয়স তিরিশের উর্ধের্ব। মাথার ঘন চুল ব্যাক-ব্রাশ করা। নাকটা ভোঁতা। ফ্রেঞ্চকটি দাড়ি, বাটারফ্লাই গোঁফ। চোখে রিমালেস চশমা। চশমার লেন্সের অন্তরালে গোল গোল চোখের তীক্ষ অনুসন্ধানী দৃষ্টি। পরিধানে নেভি ব্ল কালারের দামী সার্জের সুট। জিনিসপত্র গোছগাছ করে বিছানাটা বার্থে পেতে আগন্তুক কুলীকে তার প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়ে, কিরীটীর বার্থের পাশে বসবার যে বেতের চেয়ারটা আছে, তাতে বসে পড়ে পকেট থেকে দামী টোবাকো পাইপ ও পাউচ বের করে ধূমপানের যোগাড় করতে লাগলেন। পাইপে টোবাকো ভরে লাইটার দিয়ে অগ্নিসংযোগ করে তীব্র এক টান দিয়ে একগাল পীতাভ ধোঁয়া ছেড়ে কিরীটীর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।

ট্রেন ছাড়বার ঘণ্টা পড়ে গেছে; ট্রেন প্ল্যাটফরম ছেড়ে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে।

কতদূর যাবেন? ব্যারিস্টার সাহেব কিরীটীকে প্রশ্ন করলেন।

বেশী দূর নয়, শ্ৰীনগর। আপনি?

আমি শ্ৰীনগর না হলেও কাছাকাছি—শ্ৰীনগরের আগের স্টেশনে।

টাইম-টেবিলে কিরীটী দেখেছিল, শ্ৰীনগরের আগের স্টেশনটি একটি বড় জংশন স্টেশন। একটি নামকরা ডিস্ট্রিক টাউন।

কোন মকদ্দমার ব্যাপারে বোধ হয়?

হ্যাঁ। তা না হলে আর কেন বলুন? ভদ্রলোক পাইপটা দাঁতে চেপে মৃদু একটু হাসলেন।

ট্রেন দমদম জংশনে এসে থামল।

যাত্রীদের গোলমাল, ওঠামানা। ঘণ্টা বাজল, ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

সান্যাল আবার প্রশ্ন করেন, হঠাৎ শ্ৰীনগরে চলেছেন যে?

এমনিই বেড়াতে যাচ্ছি। দেশ ভ্ৰমণ করাটা আমার একটা নেশা। শুনেছি জায়গাটা নাকি বেশ। পুরনো দিনের অনেক কিছু স্মৃতিচিহ্ন নাকি এখনও সেখানে অবশিষ্ট আছে।

হ্যাঁ, আমিও দু-একবার সেখানে গেছি। শ্ৰীনগরের রাজবাড়িই তো ইতিহাস প্রসিদ্ধ জিনিস একটা। পাল রাজত্বের সময়কার তৈরী সে প্রাসাদ। শুনেছি, সে নাকি এক রহস্যের খাসমহল।

আপনি দেখেছেন সে প্রাসাদ?

বাইরে থেকে যতটা সম্ভব, মানে বহিমহলটা সব ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম। একবার। প্রাসাদের অভ্যন্তরে তো রাজারা কাউকে প্রবেশ করতে দেন না। রাজাদের একটা গেস্ট হাউস আছে, রাজবাড়ি থেকে কিছু দূরে। সেখানে অনেকেই গিয়ে অনেক সময় থাকেন। তা ছাড়া পাল রাজাদের সময়ে কৈবর্ত সর্দার ভীমের উপদ্রবে। রাজার কনিষ্ঠ ভ্রাতা রামপাল কিছুদিন নাকি ওখানে গিয়ে এক বাড়িতে ছিলেন, সেটাকে রামপালের দুর্গ বলে। হৃতসর্বস্ব রামপাল নাকি সেই বাড়িতে প্রায় দেড় বৎসর লুকিয়ে ছিলেন। ছোটখাটো একটা দুর্গের মত সে বাড়িটা। দুর্গের চারপাশে পরিখা, পরিখার চারপাশে প্রায় দেড় মানুষ সমান উঁচু পাথরের প্রাচীর।

রামপাল নিজেই নাকি সে দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন নিজের লোকজনদের দিয়ে এবং শোনা যায়, সেই দুর্গে বসেই তিনি সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন পরাক্রান্ত কৈবর্ত সর্দার ভীমের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবার জন্য।

কৈবর্ত সর্দার সে কথা জানতে পেরে একদল দুর্ধর্ষ সৈন্য প্রেরণ করে রামপালকে বিধ্বস্ত করবার জন্য। দীর্ঘ আটচল্লিশ ঘণ্টা সেই দুর্গের মধ্যে আত্মগোপন করে রামপাল ভীমের প্রেরিত সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ চালান। শেষটাই কিছুতেই যখন আর দুৰ্গ রক্ষা করা সম্ভব হল না, তখন গোপনে পালিয়ে যান বর্তমান শ্ৰীনগরে যে রাজপ্রাসাদ তারই মধ্যে। আকারে ও চাকচিক্যে তখনকার সে প্রাসাদ বর্তমানের থেকে অনেক ছোটই ছিল, এবং মালিক ছিলেন সৰ্বেশ্বর রায়, সামান্য বিত্তশালী একজন ঐ সময়কার জমিদার মাত্র।

রামপাল সৰ্বেশ্বরের গৃহে পনেরো দিন আত্মগোপন করে থাকেন। পরে সৰ্বেশ্বরের ঢালীরা রাতের অন্ধকারে পালকিতে করে রামপালকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়ে আসে।

কিরীটী তন্ময় হয়ে মিঃ সান্যালের বর্ণিত কাহিনী শুনছিল। রূপকথার চমকপ্রদ, রহস্যঘন রোমাঞ্চকর।

মিঃ সান্যাল একজন শক্তিশালী কথক বটে। ভাষা ও বলবার টেকনিকও তার অপূর্ব।

অন্ধকারের নির্জন প্রকৃতির বুকখানাকে শব্দমুখর করে মেল ট্রেনখানা একটানা ছুটে চলেছে। থামবে গিয়ে একেবারে সেই রাণাঘাট জংশনে।

মাঝে মাঝে ট্রেনের তীব্র গতিবেগের দু পাশে ছোট ছোট স্টেশনের আলোগুলো চমক দিয়ে যায়, মসীকৃষ্ণ রাতের বুকে হঠাৎ জেগেই মিলিয়ে যাওয়া বিদ্যুৎচমকের মত। রেল, লাইনের দু পাশে অন্ধকারে আবছা আগাছার ঝোপ-ঝাড়গুলো জোনাকির ফুলঝুরি জ্বলিয়ে যেন অভিসারে বের হয়েছে।

তারপর? কিরীটী প্রশ্ন করে।

তারপর ঐ ঘটনার অনেক দিন পরে রামপাল যখন হৃতরাজ্য পুনরায় ফিরে পেলেন, সৰ্বেশ্বরের কাজের জন্য তাকে ইনাম দিলেন রাজা উপাধি ও অনেক নিষ্কর জমিজমা। সৰ্বেশ্বর তখন রামপালের সনদের জোরে রাজা উপাধি নিয়ে ঐ জায়গার নাম বদল করে শ্ৰীনগর’ নতুন নামকরণ করলেন। সর্বেশ্বরের ভাগ্যলক্ষ্মী তখন সুপ্ৰসন্ন, দিনে দিনে দেবতার আশীর্বাদে তার যশ, মান, প্রতিপ্রাত্তি ও অর্থ বাড়তে লাগল। বর্তমানের প্রকাণ্ড রাজপ্রাসাদ তৈরী হল অতীতের ক্ষুদ্র জমিদার ভবনের ভিতের উপরে। বর্তমান শ্ৰীনগর ও সেই সঙ্গে শ্ৰীনগরের রাজাদের উৎপত্তির এই হল মোটামুটি ইতিহাস।

গল্প বলতে বলতে পাইপটা নিভে গিয়েছিল। মিঃ সান্যাল পাইপটায় আবার অগ্নিসংযোগ করে একটা টান দিয়ে পীতাভ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, প্রায় বছর পাঁচেক আগে একবার শ্ৰীনগরে বেড়াতে গিয়ে ওখানকার এক বৃদ্ধের মুখে শ্ৰীনগরের এই ইতিহাস আমি শুনি।

উপন্যাসের মতই চমকপ্রদ এ কাহিনী। অতীত বাংলার যে কত শত কাহিনী আজও এমনি করে সুপ্ত রয়ে গেছে, কেই বা তার খোঁজ রাখে। পরদেশী ভাষায় পরের দেশের ইতিহাস মুখস্থ করে আমরা ডিগ্রীর নম্বর বজায় রাখি এবং সেই ডিগ্রীই হয় আমাদের শিক্ষার শীল-মোহর। অথচ ঘরের খবর আমরা রাখি না—কিরীটী মৃদুস্বরে খেদোক্তি করলে।

সত্যি যা বলেছেন! বাংলার ইতিহাসকারেরা যেন চোখ বুজেই ইতিহাস রচনা করেছেন।

নানা ধরনের কথাবাতাঁর মধ্য দিয়ে দুজনের ভিতর ক্রমশঃ বেশ গভীর আলাপ জমে ওঠে। কিরীটিার বেশ লাগে ক্ষণপরিচিত মিঃ সান্যালকে।

মিঃ সান্যালের ব্যারিষ্টারি ব্যবসা হলেও তার বেশী ঝোক ইতিহাস পড়ায়। কাজকর্মের বাইরে যতটুকু সময় তিনি পান, নানা ধরনের ইতিহাস পড়েই তিনি কাটান বেশির ভাগ সময়। এ ছাড়াও তার আর একটি নেশা আছে, সেটা হচ্ছে। যন্ত্র-সঙ্গীতের সাধনা। কাজেই যেখানেই তিনি যান, একটি সুটকেস-ভর্তি বই ও বীণা যন্ত্রখানি তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ফেরে।

শেষরাত্রের দিকে কিরীটীর চোখে কেমন একটু তন্দ্রার মত এসেছিল! ঘুম যখন ভাঙলি, চলমান গাড়ির কাচের শার্সির ফাঁকে প্রথম ভোরের ধূসর আলো ওর চোখে পড়ে। চেয়ে দেখল। সহযাত্রী মিঃ সান্যাল গাড়িতে নেই, বোধ হয় নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে গেছেন।

কিরীটী কঁচের শাসিটা নামিয়ে দিল; বিরবির প্রভাতী হাওয়া এসে রাত্রি-জাগরণ ক্লান্ত চোখেমুখে সুস্নিগ্ধ শীতল পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায়।

নির্দিষ্ট সময়ের আধা ঘণ্টারও বেশি পরে গাড়ি শ্ৰীনগরের রেলওয়ে স্টেশনে এসে থামল।

স্টেশনটি ছোট্ট অখ্যাতনামা, ততোধিক অখ্যাতনামা স্টেশনের নামটি। আগে এখানে মেল ট্রেন থামত না। স্টেশন থেকে শ্ৰীনগর প্রায় মাইল আষ্টেক দূরের পথ।

স্টেশন থেকে রাজবংশেরই তৈরী প্রশস্ত কাঁচা সড়ক বরাবর শ্ৰীনগর পর্যন্ত চলে গেছে। মাত্র মাস আষ্টেক হল বর্তমান রাজা ত্ৰিদীপনাথের অনেক চেষ্টার ফলে আজকাল মেল ট্রেনটা এই স্টেশনে থামছে—তাও মাত্র আধ মিনিটের জন্য। আগে আগে রাজবাড়ির লোকেরা বড় জংশন স্টেশনটিতে নেমে সেখান থেকে ব্ৰহ্মপুত্র নদের একটা ছোট শাখানদী বেয়ে ভাউলিয়া করে শ্ৰীনগর যেত, তাতে বর্ষাকাল ও তার পরবর্তী কয়েক মাস নদীপথে যাতায়াত করা চলত। শীতকালে নদীর জল এত বেশি শুকিয়ে যেত যে, নদীপথে কোন বড় বা মাঝারি নৌকেই যাতায়াত করত না। তাই শীতকালটা পরের ছোট স্টেশনে নেমে, হাঁটাপথে গোরুর গাড়িতে চেপে শ্ৰীনগরে যাওয়া ভিন্ন আর অন্য উপায় থাকত না।

উঁচু বাঁধানো প্লাটফরমের ওপরে একতলা ছোট একটি বাড়ি-স্টেশন-ঘর ও গুদাম অফিস।

***

স্টেশন-ইনচার্জ রামসদায়বাবু। প্রায় চল্লিশের উৰ্ব্বে বয়স। মাথায় বাঁকড়া ঝাকড়া চুল। ইতিমধ্যে অর্ধেকের বেশী চুলে বয়সের নোটিশ জারি হয়েছে। চোখে পুরু লেন্সের নিকেল ফ্রেমের চশমা। কিরীটী গাড়ি থেকে নেমে ইতস্তত দৃষ্টিপাত করতে থাকে।

কে একজন এই দিকেই এগিয়ে আসছে। বয়স ত্রিশ-পয়ত্ৰিশের বেশী নয়। রোগী লম্বাটে গড়ন। অত্যন্ত সুশ্ৰী চেহারা। দীর্ঘ উন্নত নাসা। একজোড়া চোখে বুদ্ধির প্রখর দীপ্তি। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। পরিধানে সাদা ধুতি ও সাদা ভায়লার গরম পাঞ্জাবি, তার ওপরে সাদা শাল জড়ানো! পায়ে সাদা নাগরাই। সঙ্গে সঙ্গে স্টেশনমাস্টার রামসদায়বাবুও এগিয়ে আসেন, টিকেট?

কিরীটী টিকেটটা পকেট থেকে বের করে দেয়।

কোথায় যাবেন? রামসদয় আবার প্রশ্ন করেন।

রাজবাড়ি।

আপনি কি মিঃ রায়? সুশ্ৰী যুবকটি প্রশ্ন করেন?

হ্যাঁ। আপনি?

আজ্ঞে, ইনি আমাদের রাজাবাহাদুর, রামসদয়বাবু বলে ওঠেন, মহাশয় ব্যক্তি প্রাতঃস্মরণীয়।

ওঃ! কিরীটী হাত তুলে নমস্কার জানায়।

প্রতিনমস্কার জানিয়ে ত্ৰিদীপনাথ সাদর আহ্বান জানান, বাইরে টমটম দাঁড়িয়ে আছে।

দুজনে স্টেশনের বাইরে এসে দাঁড়ান। অপ্রশস্ত কঁচামাটির সড়ক। ছোট একটি টমটম, গাড়ি। একটা তেজী সাদা ঘোড়া। কোন সহিস বা কোচম্যান নেই।

উঠুন।

কিরীটী গাড়ির পদানিতে পা দিয়ে উঠে বসে! দুলকি চালে ঘোড়াটা ছুটে চলে। দু পাশের ক্ষেতে সরিষার অজস্র হলুদ ফুল, ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় যেন খুশির ঢেউ জাগিয়েছে। চারিদিকে একটা শুচিস্নিগ্ধ আবহাওয়া।

কিরীটী বেশ একটু আশ্চর্যই হয়েছিল, রাজাবাহাদুর নিজেই তাকে নিতে এসেছেন। এতটা সে আশা করেনি। বিশেষ করে তার মত একজন সামান্য অপরিচিত ব্যক্তি!

রাজাবাহাদুরই প্রথমে কথা বললেন, মিঃ রায়, আপনার চিঠি পড়ে আমি যতটা না আশান্বিত হয়েছিলাম, তার চাইতে বেশী আনন্দিত হয়েছি আপনাকে দেখে এবং আশা করছি পরিচয় হলে আরো সুখী হব।

কিরীটী মৃদু হেসে বলে, হতাশও তো হতে পারেন!

বোধ হয় না, কারণ মানুষ চেনবার একটা অসাধারণ ‘ন্যাক’ আমার আছে। রাজাবাহাদুরের ওষ্ঠ্যপ্রান্তে হাসির রেখা দেখা দেয়।

আপনি বোধ হয় একটু আশ্চর্যই হচ্ছেন, রাজাবাহাদুর বলতে লাগলেন, এভাবে একা আমার শুমাপনাকে এগিয়ে অভ্যর্থনা করে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে; কিন্তু শ্ৰীনগরের রাজবাড়ির এইটাই চিরন্তন নীতি। অতিথি নারায়ণ, তাকে স্বয়ং গিয়ে অভ্যর্থনা না জানালে অতিথির প্রতি অসম্মান দেখানো হয়, তা ছাড়া…

রাজাবাহাদুর থামলেন। কিরীটী সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে রাজাবাহাদুরের মুখের দিকে তাকায়।

তা ছাড়া আপনার চিঠি পড়ে আমি এতখানি বিস্মিত হয়েছিলাম যে আপনাকে চোখে দেখবার একটা দুৰ্দমনীয় লিন্সা মনে আমার জেগেছিল। এই দেখুন আমি সঙ্গে করে টাকা ঃ এনেছিলাম। রাজাবাহাদুর ডান হাতে ঘোড়ার লাগমটা ধরে বা হাত দিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে গোটা পাঁচেক নোট বের করে দেখালেন। তার পর বললেন, আপনার কথাবার্তা ও চেহারায় আমাকে না। যদি ইমপ্রেস করতে পারতেন, তবে স্টেশন থেকেই ধূলোপায়ে আপনাকে বিদায় করে ফিরে আসতাম।

কিরীটী আবার একটু হ্যাঁসলে, কোন জবাবই দিলে না বা একটি প্রশ্নও করলে না।

আপনাকে তো বলেছিই, আপনাকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমার আশা হচ্ছে এখন, আপনি হয়তো আমার হারানো সম্পত্তির একটা কিনারা করলেও করতে পারবেন। সরকারী বে-সরকারী অনেক গোয়েন্দার কাছ থেকেই আমি চিঠি পেয়েছি। সকলের চিঠির মধ্যেই যেন ফুটে উঠেছে একটা জঘন্য লালসার ছবি পাঁচ হাজার টাকার প্রতি।

এতক্ষণ পরে প্রথম কিরীটী সহসা একটা প্রশ্ন করল, রাজাসাহেব, আপনার বহুমূল্য রত্নসিংহাসনটি যে অপহৃত হয়েছে, এ সংবাদ কে কে জানে?

এখনও বাড়ির কেউই জানে না বলতে গেলে; কারণ এ সংবাদটা আমি সকলের কাছেই গোপন রেখেছি; এমন কি আমার স্ত্রী পর্যন্ত জানেন না এবং একটি ইংরাজী দৈনিক ছাড়া অন্য কোথাও আমি বিজ্ঞাপন দিইনি। ইংরাজী দৈনিকে ইংরাজীতে বিজ্ঞাপন দেওয়ারও দুটো কারণ আমার আছে। এক কারণ, চোরকে আমি জানিয়ে দিতে চাই যে ব্যাপারটা আমি টের পেয়েও বিচলিত হইনি এবং ফিরে পাবার আশা রাখি। দ্বিতীয় কারণ, ব্যাপারটা বাড়িতে ঢাকঢোল না পিটিয়ে যথাসাধ্য গোপন করে অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়েছি।

আশ্চর্য! আচ্ছা আপনার কাউকে কি সন্দেহ হয়। এই চুরির ব্যাপারে?

কাউকে বলতে আপনি ঠিক কি mean করছেন?

মানে বাড়ির মধ্যে কোন বিশেষ লোককে বা বাইরে জানাশোনার মধ্যে কাউকে।

বাড়ির মধ্যে কাউকেই আমি সন্দেহ করতে পারছি না; কারণ আয়রন সেফটা আমার নিজের শয়নকক্ষে ছিল। তা ছাড়া তার চাবি সর্বদাই আমার নিজের শয়নকক্ষের ড্রয়ারে থাকে।

আপনার শয়নকক্ষ তো পুরাকালে নবাবী আমলের বেগমদের মহল নয় যে কারও পক্ষেই সেখানে প্রবেশ দুঃসাধ্য।

তা নয় বটে, তবে সে কক্ষে দু-চারজন ছাড়া অপরের যাওয়া নিষেধ আছে।

যেমন?

আমার স্ত্রী, আমার বৃদ্ধা মা ও বাড়ির বহুদিনের পুরাতন ভৃত্য ভজু। এরা ছাড়া সে ঘরে কেউই আর বড় একটা ঢোকে না বলেই আমি জানি! তবে যদি বলেন এ কাজ আমার স্ত্রী বা বিশ্বাসী বৃদ্ধ ভূত্য ভজুর তা হলে আমি নাচার।

কিরীটী হো হো করে হেসে ওঠে।

হাসছেন যে?

কতদিন আপনি বিয়ে করেছেন?

বছর সাতেক।

আপনার সন্তান?

এখনও পর্যন্ত হয়নি।

আপনার স্ত্রী? মাপ করবেন, অবশ্য যদি কিছু না মনে করেন।

না, না, অসঙ্কোচে আপনি যা জানতে চান বলুন! রাজবাড়ির অন্দরমহলে আপনাকে আমি নিয়ে চলেছি। রাজবাড়ির রীতিবিরুদ্ধ কাজ। আজ পর্যন্ত খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছাড়া রাজঅন্তঃপুরে বড় একটা কেউই প্রবেশ করতে পারেনি। অথচ পাল রাজত্বের সময় থেকে ইতিহাসবিখ্যাত বলে অনেকবার অনেক পর্যটক রাজবাড়ির অন্দরমহল দেখবার জন্য অনেক ইচ্ছা ও অনুরোধ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু নিয়ম নেই বলে কাউকেই আজ পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বলতে গেলে আপনিই সর্বপ্রথম সেখানে প্রবেশ করতে চলেছেন, এক্ষেত্রেই..

বলছিলাম আপনি কি রকম ঘরে বিয়ে করেছেন?

এককালে তারা যথেষ্টই ধনী ছিলেন, কিছুদিন হল অবস্থার একটু হেরফের হয়েছে, তবে পুরাতন বনেদী বংশ।

সহসা কিরীটীর বিস্মিত দৃষ্টির সামনে রাজবাড়ি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। রাজবাড়িই বটে।

আরও বিস্মিত হল সে, যখন গাড়ি এসে রাজবাড়ির ফটকের মধ্যে ঢুকল। বন্ধুকধারী নেপালী দারোয়ান কুর্নিশ করে লাহার বিরাট গেট খুলে দিল। পাথরের নুড়িঢালা চওড়া পথ।

বর্হিমহলে এসে টমটম দাঁড়াতেই বৃদ্ধ নায়ব থাকহরিবাবু নত হয়ে নমস্কার জানিয়ে অভ্যর্থনার জন্য এগিয়ে এলেন। সহিস এসে ঘোড়ার রাশ ধরল। রাজাবাহাদুরের সঙ্গে সঙ্গে কিরীটীও টমটম থেকে নেমে তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল।

কিরীটী বিস্মিত মুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল রাজবাড়ির ইতিহাসপ্রসিদ্ধ কারুকার্য দেখে। বড় বড় পাথরের খিলান, মোটা মোটা থাম। একদা যে এখানে ঐশ্চর্য ও গরিমার প্রাচুর্য ছিল, এখনও যে তার অনেকখানিই অবশিষ্ট আছে তা প্রথম দৃষ্টিতেই বোঝা যায়।

ত্ৰিদীপনাথ শৌখিন ও আধুনিক কেতা-দূরস্ত লোক। পুরাতনের সঙ্গে বহু জায়গায় আধুনিকের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন!

আসুন মিঃ রায়। রাজাবাহাদুর বলেন কিরীটীকে! সেই আহ্বানে কিরীটী এগিয়ে চলে।

বহির্মহলের অনেকগুলো ঘর পেরিয়ে দুজনে এসে একটা নাতিপ্রশস্ত ঘরে প্রবেশ করেন। আসবাবের বিশেষ কোন বাহুল্য নেই। তবু যা সামান্য আসবাবপত্র আছে, সে সব মূল্যবান। সুন্দর একটি মেহগনি পালঙ্কের ওপরে শুভ্ৰ শয্যা বিছানো, মাথার ধারে শ্বেতপাথরের একটি গোল টেবিল, সাদা পাথরের গ্লাসে বোধ হয় পানীয় জল ঢাকা দেওয়া আছে। পুরনো আমলের দুটি আরামকেদারা। একটি আলমারি বই ভর্তি। জামা কাপড় রাখবার জন্য একটি আলনা। এ ঘরটাই আপনার জন্য ঠিক করে রেখেছি, কোন কষ্ট হবে না তো?

বরং বলুন এত বেশী প্রাচুর্য যে অসুবিধাই ভোগ করতে হবে প্রাচুর্যে।

রাজাবাহাদুর হাসলেন প্রত্যুত্তরে।

আপনি বিশ্রাম করুন, আহারাদির পর আবার সাক্ষাৎ হবে।

রাজাবাহাদুর নমস্কার জানিয়ে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।

Share This