অকপটে

কইতে কথা বাধে লেখার ভাবনা মাথায় এলে আমার এক সুহৃদ বলেছিলেন, লিখো না, বিপদে পড়বে।

আমি বলেছিলাম, কাউকে আহত করার বিন্দুমাত্র বাসনা আমার নেই। কারও ব্যক্তিজীবন নিয়ে কুৎসা গাওয়ার কথা ভাবছি না। যেমনটি দেখেছি তেমনটি লিখতে চাই।

সুহৃদ জানতে চেয়েছিলেন, লেখো তো গল্প-উপন্যাস। হঠাৎ এসব কেন?

বললাম, সেই কবে থেকে দেখে আসছি, সমসাময়িক লেখকদের সম্পর্কে কোনো লেখক কিছু লিখতে চান না। এমনকি প্রকাশ্যে বলতেও শুনি না। অথচ নিভৃত আলাপে মন্তব্য করতে দ্বিধা করেন না অনেকেই। তাই।

সুহৃদ বললেন, কিন্তু লেখার পর যদি দ্যাখো যাদের কথা লিখছ, তারা অস্বীকার করছে! বলছে, বলেনি! তাহলে?

আমি হেসে উড়িয়ে দিযেছিলাম। তা আবার হয় নাকি!

সুহৃদ বলেছেন, শোনো, তোমার অল্প বয়সে যাঁরা চমক দিয়ে শুরু করেছেন, একটু-আধটু আলোচিত হয়েছিলেন এবং তারপর আর কিছু দেওয়ার ক্ষমতা না থাকা সত্বেও সেই সুবাদে এখনও মঞ্চে জায়গা পেয়ে যান, তাদের কারও কারও বুকে ঈর্ষা ছাড়া কোনও বস্তু নেই। আর ঈর্ষা মানুষকে মিথ্যেবাদী করে।

দেশে শেষ কিস্তি বেরুলো যখন, তখন দেখলাম, সম্পাদক মশাই অতি সতর্ক হয়েছেন। এর আগের সংখ্যাগুলোকে তিনি গুরুত্ব দেননি, সম্ভবত তসলিমার জন্যেই ওই সতর্কতা। অতি উৎসাহে তিনি আমার লেখার মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। তার মন্তব্যগুলো শোভন কি অশোভন তা পাঠকরা বিচার করবেন। সম্পাদক বলেছেন, এটি নাকি আমেরিকান-সম্পাদনার নিদর্শন। জানি না। তবে মনে হচ্ছে তসলিমা বাঁচাও কমিটি তৈরি হলে তার সভাপতি এই কাণ্ডটি করতেন।

কবি শামসুর রহমান প্রচুর পান করে গাড়িতে বসেছিলেন বলে লিখেছিলাম। সম্পাদক মশাই ব্রাকেটে লিখেছেন, উনি অস্বীকার করেছেন। কেন করেছেন? আমি মিথ্যে লিখেছিলাম? না, মাঝরাতে পানে জ্ঞান হারালে কী ঘটছে চারপাশে তা পরের দিন জেগে ওঠার পর মনে থাকে না। তাই অস্বীকার। বাঃ। বুদ্ধদেব গুহ অস্বীকার করেছেন তসলিমার টেলিফোন করার ব্যাপারটা। সম্পাদক সেটাই লিখেছেন ব্রাকেটে। বুদ্ধদেবদা সেটা পড়ে বলেছেন তসলিমার ফোন তিনি পেয়েছিলেন এবং কখনোই অস্বীকার করেননি। তবে তার বিশ্বাস সাক্ষাতে আমাকে বলেছেন ঘটনাটা, ঢাকায় ফোন করে নয়।

আলতাফ হোসেনের সন্ধান পাওয়া যায়নি মানে চরিত্রটি আমার কল্পিত। কিন্তু ভদ্রলোক রোজ ঢাকার বাংলা বাজারে যান। ওঁর ডাক নাম মেনু। সবাই মেনুভাই বলে জানে। বিশাল দোকান তাঁর, পার্ল পাবলিকেশন। সম্পাদক অবশ্য আমাকে একটু অক্সিজেন দিয়েছেন এই বলে, কবির ভাই-এর বাড়িতে নিজের পায়ে না-দাঁড়ানো তসলিমাকে দেখেছেন এমন কিছু সাক্ষীর সন্ধান তিনি পেয়েছেন। অর্থাৎ কোনো লেখক কিছু লিখলে সম্পাদক তা ডিটেকটিভ এজেন্সির কাছে পাঠাবেন। তাদের মন্তব্য ব্রাকেটে ছাপবেন। যেন চোরকে খোঁচা দিচ্ছেন। যদি সম্পাদক মনে করেন লেখক মিথ্যে লিখছেন, তাহলে জেনেশুনে সেই লেখা তিনি ছাপছেন কেন? লেখার শেষে সম্পাদকীয় মন্তব্য থাকতে পারত। পরবর্তী সংখ্যায় চিঠিপত্রে গালাগাল দেওয়া যেতে পারত।

প্ৰায় দু’মাস গবেষণা করার পর সম্পাদক যে শেষ পর্যন্ত লেখাটা ছেপেছেন, এতে আমি কৃতার্থ। কিন্তু বিস্ময় আরও অপেক্ষা করছিল আমার জন্যে।

ষাটের দশকে সুনীলদারা যখন হৈ হৈ করে লেখা শুরু করলেন, তখন একজন লেখক তার নিজস্ব গদ্যের জন্যে কিছু স্তাবক তৈরি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাদের বেশিদিন ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল না। সুনীলদারা অনেক এগিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তিনি পারছেন না বলে এমন ঈর্ষায় আক্রান্ত হলেন যে তার লেখায় অশ্লীলতার বন্যা বইতে লাগল। শ্রদ্ধেয় সন্তোষ কুমার ঘোষকে বেনামে চিঠি লিখতেন গালাগাল দিয়ে। তার ভাষা বেশ জোরালো ছিল। কিন্তু নির্বাচিত অশ্লীল শব্দ থেকে পচা গন্ধ বের হত। ইনি বড় কাগজগুলোয় লেখার আমন্ত্রণ পেতেন না। প্রথম দিকে তরুণ লেখকদের সঙ্গে শিং ভেঙে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, পরে প্রাক্তন বন্ধুদের সঙ্গ চেয়েছেন যাতে একটু ভদ্রলোক হওয়া যায়। ষাট বহুদিন পেরিয়ে আসা মানুষটিকে আমি লক্ষ্য করেছি দীর্ঘকাল। আমার সঙ্গে কখনোই কথা হত না। কিন্তু ইদানীং বইমেলায় গেলে মুখোমুখি হলে দু-একটা কথা বলেছি, উনিও শান্তির জল-খাওয়া-মুখ করে কথা বলেছেন আমার সঙ্গে। সেই সময় ওঁর মুখ থেকে সুনীলদার অতীতকালের একটি প্রতিজ্ঞা এবং প্ৰতিজ্ঞা ভঙ্গের ব্যাখ্যা শুনেছিলাম। বেশ রসিয়ে তিনি বলেছিলেন। শ্রোতা ছিলেন আরও দু-জন। গতকাল শুনলাম, তিনি অস্বীকার করেছেন। বলেছেন আমার সঙ্গে এসব কথা হয়নি। উনি জানেন না, কথাটা শোনার পরের সকালে টেলিফোনে সুনীলদর সঙ্গে এই ব্যাপারে আমার আলোচনা হয় এবং সুনীলদার বক্তব্য আমি জানতে পারি।

তাহলে এই ভদ্রলোকের মিথ্যাচারণের কারণ কী? অবশ্যই সুনীলদার বিপক্ষে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছেন না। লুকিয়ে যা বলা যায়, প্রকাশ্যে তা স্বীকার করলে যদি আখের নষ্ট হয়! হায়, অন্তর্জলি যাত্রার সেই বৃদ্ধের সঙ্গে তফাৎ করা যাচ্ছে না। এখনও লালা গড়াচ্ছে!

দশচক্ৰে ভগবানও ভূত হয়। বামুনের কাঁধের ছাগলকে বলতে বলতে কুকুর বানানো যায়। সজ্জনেরা এমন চাল চেলেছেন যে মনেই হবে কইতে কথা বানানো। উপন্যাসের গোড়ায় যেমন কেউ কেউ লেখেন, সব চরিত্র কাল্পনিক, তেমনই। কিন্তু সময় বড় কঠিন দাওয়াই। ভূতকে পালাতে হবে, কুকুর ছাগল হবেই। এইটেই এরা বোঝেন না।

সুহৃদ উপদেশ দিয়েছিলেন, লিখো না। বিদ্বজ্জনরা চোখ পাকিয়েছেন, কিন্তু সাধারণ পাঠকরা যেসব চিঠি লিখছেন তা আমাকে আশ্বস্ত করেছে এই কারণে, সমসাময়িকদের নিয়ে লেখালেখি করাটা দরকার ছিল। আর কতকাল জঙ্গলে মুখ ঢুকিয়ে সারা শরীরটাকে শিকারীর সামনে তুলে ধরব?

সমরেশ মজুমদার

Share This