স্বপ্ন নম্বর একশো বাইশ

স্বপ্ন নম্বর একশো বাইশ

প্রায় আঠারো বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আজ শেষ রাত্রে সাফল্য অর্জন করলেন বিকাশকলি। ঘুমের মধ্যেই তিনি আনন্দে এমন লাফিয়ে উঠলেন যে খাটের বাজুতে গোঁড়ালি আছড়ে পড়ল। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে বসলেন তিনি। গোঁড়ালি চেপে ধরে কয়েক মিনিট স্থির হয়ে থাকার চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ বাদে নড়ার চেষ্টা করলেন খাট থেকে। গোঁড়ালি চিনচিন করে উঠল ‘যা বাবা, ভাঙেনি! ভাঙলে সোচ্চারে জানান দিত।’ কিন্তু হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। ঘরের দরজা খুলে একবার ভাবলেন স্ত্রী এবং ছেলেকে ডেকে তোলা যাক। বলা যাক আমি পায়ে খুব চোট পেয়েছি। তখনই জানতে চাইবে, কী করে চোট পেলে। স্বপ্নে একটা দারুণ কাণ্ড করে পা ছুঁড়েছিলাম, একথা বললে ছেলে হেসে ঘরে ফিরে যাবে। বউমা বলবেন, ‘তোমার বাবা একটি কচি খোকা।’ স্ত্রী বলবেন, ‘মরণ!’

অতএব কাউকে কিছু না বলে বাথরুমে আধবালতি জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মিনিট পাঁচেক। এই দাঁড়িয়ে থাকার সময় তিনি কিছু সারসত্যি উপলব্ধি করলেন। একটা বিশেষ বয়সে পৌঁছাবার পরে পুরুষ মানুষের কোনও বন্ধু থাকে না, ভাই-বোনের মধ্যে যে সম্পর্ক তার থেকেও দুরের সম্পর্ক হয়ে যায় স্ত্রীর সঙ্গে। স্বামী বুড়ো হলে স্ত্রীর মুখ খুললেই ঠেস-দেওয়া কথা, বিদ্রূপ। ইত্যাদি গলগল করে বেরিয়ে আসে। অথচ এই স্ত্রী বিয়ের পর থেকে দশ বছর কি মধুর ছিল। তারপরের দশ বছর ছিল চাটনির মতো। কখনও খুব টক, কখনও তিতকুটে। তারপর কখন। কেমন করে বুনো ওল হয়ে গেল কে জানে! ছেলেটার দিকে তাকালেই মেজাজটা গরম হয়ে যায়। একটা যুবক একইসঙ্গে মায়ের খোকা আর স্ত্রীর হাতা কী করে হতে পারে, ভেবে পান না বিকাশকলি। পড়াশুনায় ভালো তাই ব্যাঙ্কে ভালো চাকরি পেয়েছে। সেই সুবাদে দারুণ সুন্দরী বউ। সেখানেও লেঙ্গি খেয়েছেন বিকাশকলি। প্রেমে পড়ার কিছুদিন পরে ছেলে এসে তাঁকে বলল, ‘বাবা আমি, আমি, বুঝতেই পারছ।’

‘কিছুই পারছি না। তুমি কী করেছ?’ বিকাশকলি অবাক।।

‘একটা প্রমোশন হয়েছে। আর পয়া, মানে পয়াকে কথা দিয়েছি।’

‘পয়া? সে কে?কী কথা দিয়েছ?’

‘কি কথা দিয়েছি বুঝতে পারছ না। ওকে তোমার বউমা করব।’

‘অ। কে পয়া?

‘আমার কলিগ। তবে অন্য ব্রাঞ্চে কাজ করে।’

‘তোমার জননী জানেন!’

‘মা খুব খুশি। বলল, যেমন মা চেয়েছিল পয়া তেমনি। কিন্তু।’

‘এরপরে আবার কিন্তু আসছে কেন?’

‘পয়ার খুব আপত্তি। ও বলেছে তোমার বাবাকে প্যান্ট পরতে হবে।’

‘অ্যাঁ! আমি কী পরবো তা তোমার বউ ঠিক করবে?’

‘না না। যতক্ষণ ও বাড়িতে থাকবে ততক্ষণ তুমি প্যান্ট পরে থেকো, ও বেরিয়ে গেলেই আবার ধুতি।’ বুদ্ধি দিল ছেলে।

‘অসম্ভব, আমি কখনও প্যান্ট পরিনি। ধুতি বাঙালির প্রধান পোশাক। আজ বাঙালি তার বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। আমি চরিত্রভ্রষ্ট হতে পারব না।’

‘তার মানে তুমি পয়ার অনুরোধ রাখবে না।’

‘কোন প্রশ্নই ওঠে না।’

‘তার মানে তুমি চাও না এই বিয়ে হোক।’

‘আমি ধুতি না-খুললে যদি তোমার বিয়ে না-হয় তাহলে আমার কিছু করার নেই। এবার আমাকে শান্তিতে কাগজটা পড়তে দাও।’

তবু বিয়ে হয়েছিল। সেই রাত্রেই স্ত্রী ঘরে ঢুকেছিল, ‘তুমি খোকার বিয়ে ভেঙে দিতে চাইছ?কী করে ভাবলে এ-বাড়িতে তুমি যা চাইবে তাই হবে?’

‘আমি কিছুই ভাবিনি।

‘ভেবেছ।’

‘ভেবেছি?’

‘হ্যাঁ। খোকা পছন্দ করে বিয়ে করলে আমি মেনে নেব না তা তুমি ভেবেছ’ তাই আমার সঙ্গে জোট বাঁধতে চেয়েছ। কিন্তু তুমি ডালে ঘোরো আমি ঘুরি পাতায়, আমি খোকাকে অনুমতি দিয়েছি। দেখি তুমি কী করো!’ স্ত্রী চলে গিয়েছিল ঘর থেকে।

কিছুই করেননি। করার মতো ক্ষমতা তাঁর যে নেই একথা এ-বাড়ির সবাই জানে, ছেলের বউ বাড়িতে এল। সুন্দরী কিন্তু লবঙ্গলতিকা নয়। ধুতির মায়া ছাড়লেন না তিনি। কিন্তু তৃতীয় দিনের সকালেও বাড়ির ছাদে উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বউমা এলেন। ‘আপনার সঙ্গে কথা বলার সুযোগই পাই না।’

বউমা বললেন।

‘কেন? আমি তো আমার ঘরেই থাকি।’

‘জানি। আসলে যতক্ষণ এ-বাড়িতে থাকি ততক্ষণ আপনার ছেলে আর ওর মা এমনভাবে আটকে রাখে যে সময় বের করতে পারি না।’

‘ও।’

‘আপনাকে একটা কথা বলব। আমরা বাঙালিরা নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে কী উদাসীন হয়ে যাচ্ছি দিন-দিন, নিজেদের সংস্কৃতিও ভুলছি। এই যেমন ছেলেদের ধুতি পরা, এটা ছিল একান্ত আমাদেরই। অথচ এখন রাস্তায় গেলে এক হাজার লোকের মধ্যে একজনকে মাঝে-মাঝে ধুতি পরা অবস্থায় দেখা যায়। তাই এ-বাড়িতে এসে আপনাকে দেখে আমার মন ভরে গিয়েছে। আপনাকে আমার শ্রদ্ধা জানাতেই ছাদে চলে এলাম। বউমা বললেন।

চমকে উঠেছিলেন বিকাশকলি, ‘সে কি! এই যে শুনলাম তুমি ধুতি পছন্দ করো না।’

‘আমি? কে বলেছে আপনাকে?’

‘বিয়ের আগে তোমার পতিদেবতা বলেছে।’

‘উঃ। ও এত গুল মারে যে কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে বুঝতে পারি না, এগুলো বিয়ের পর ধরা পড়ছে।’ মাথা নাড়লেন বউমা।

‘এই যে শুনলাম বাড়িতে আমাকে ধুতি পরা অবস্থায় দেখলে তুমি বিয়ে করবে না?’

‘আমিও শুনেছি আপনার ছেলে আমাকে বিয়ে করুক আপনি চাননি!’

‘কে বলেছে তোমাকে?’

‘প্রথমে আপনার ছেলে, তারপর তার মা।’

‘উঃ। এই ভদ্রমহিলা, থাক।’

‘হ্যাঁ, আমিও তাই বলি, থাক। এখন থেকে আমার মুখে কিছু না শুনলে আপনি বিশ্বাস করবেন না। আপনার ছেলের মুখে শুনলে তো নয়ই।’

‘তুমিও, অন্তত স্বামীর মায়ের মুখে শুনলে তো নয়ই।’

হাসলেন বউমা, ‘আচ্ছা!’ বউমা নেমে গেলেন নিচে।

আজ রাত্রে ভেজা গোঁড়ালি তোয়ালেতে মুছতে-মুছতে বিকাশকলি ব্যথাকে উপেক্ষা করলেন। এরকম জব্বর আবিষ্কারের কথা কাউকে না জানিয়ে থাকা যায়? কাকে জাগাবে? ও ঘরে ছেলের মা কুম্ভকর্ণ হয়েছেন। নাসিকা প্রবলভাবে আলোড়ন তুলছে। এ-পাশের ঘরে কোনও শব্দ নেই। হ্যাঁ, বউমাকে জানানো যায়, খুবই রুচিশীলা মেয়ে। কিন্তু ছেলের ঘুম না ভাঙিয়ে বউমাকে কী। করে জাগাবেন? নাঃ ভোর না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করতেই হবে। শ্বাস ফেললেন বিকাশকলি।

আঠারো বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর গবেষণার বিষয় হল স্বপ্ন। কোনও কোনও মানুষ ঘুমিয়ে পড়ার পর স্বপ্ন দ্যাখে। আবার এমন মানুষ আছেন যিনি গোটা জীবনে। একটিও স্বপ্ন দ্যাখেননি। এঁদের জন্যে মায়া হয় বিকাশকলির।

অল্পবয়স থেকেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেই স্বপ্ন দেখতেন। অদ্ভুত সব স্বপ্ন যার কোনও মা-বাবা নেই। ঘুম ভাঙার পর তার অধিকাংশই স্মরণ করতে পারতেন না। স্বপ্নে যদি গোলাপ ফুল দেখে থাকেন তাহলে তার রং নিয়ে মাথা ঘামাননি। ঘুম ভাঙার পর ভেবে পেতেন না ফুলটার রং কী। ছিল। এভাবেই চলছিল। বিয়ের পর স্বপ্ন দেখা কমেছিল। স্বপ্ন দেখলেই তিনি নাকি কথা বলার চেষ্টা করতেন এবং তখন তাঁর মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ আওয়াজ বের হত। সেই আওয়াজে পাশে। শোওয়া স্ত্রীর ঘুম ভেঙে যেত, চেঁচামেচি করে জানিয়ে দিত তাঁকে। তারপর শুরু হত বকুনি। তোমায় এত বোবায় ধরে কেন? আর কারও তো এমন হয় না। এটা একটা রোগ। এই রোগ চেপে বিয়ে করতে লজ্জা করেনি?’

শেষে আলাদা শোওয়ার ঘর হল দুজনের। পরদিন স্ত্রী বললেন, ‘এত আরামে বিয়ের পর কখনও ঘুমাইনি।’

সেটা আঠারো বছর আগের কথা। একলা ঘুমানোর কারণে স্বপ্নগুলো টিভির ছবির মতো দ্রুত আসতে থাকল। এক রাত্রে স্বপ্ন দেখছিলেন, স্ত্রী ঝাঁটা কিনছেন, কোনওটাই পছন্দ হচ্ছে না। দেখতে-দেখতে বিকাশকলি মনে-মনে ঘুমের ঘোরেই বললেন, ‘দূর এই স্বপ্নটা দেখব না।’ সঙ্গে সঙ্গে রিমোটে চ্যানেল পালটানোর মতো স্বপ্ন পালটে গেল। একটা দারুণ স্বপ্নর বাগানে অপরূপা যুবতী ফুলের ঘ্রাণ নিচ্ছে। কিন্তু একি পোশাক? ওপরে খুব দামি কাঁচুলি আর নিচে রঙিন ঘাগরা। এরকম পোশাক তো মুনিদের আমলে মেয়েরা পরতেন। তাঁকে দেখতে পেয়ে অপরূপা বললেন, ‘বাঃ, কী সুন্দর পোশাক। ওটাকে কী বলে?’

‘আজ্ঞে ধুতি। শান্তিপুরের। আপনি?’

‘আমি তিলোত্তমা। স্বর্গ থেকে বেড়াতে এসেছি।’

‘এটা কোন যুগ?’ নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না বিকাশকলি।

‘কেন? সত্যযুগ। পৃথিবীতে আসার পর আপনিই প্রথম পুরুষ যাকে আমি দেখলাম। হে আর্যপুত্র, আপনি আমায় গ্রহণ করুন।’

‘গ্রহণ? আমি?’ নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছে না এবার।

‘হ্যাঁ ধীমান। শচীমাতা আদেশ দিয়েছেন, আমি এক শর্তে পৃথিবীতে যেতে পারি এবং শর্ত পূর্ণ না হলেই স্বর্গে ফিরে যেতে হবে আমাকে।’

‘কী শর্ত?’

‘প্রথম যে পুরুষকে আমি দেখব তাকেই পতি হিসেবে বরণ করতে হবে। খুব ভয়ে ছিলাম, যদি কুৎসিত অথবা বৃদ্ধ আমার সামনে এসে দাঁড়ায়! কিন্তু আমার মন এখন আনন্দে উজ্জ্বল। আপনার মতো সুপুরুষকে এখানে পাব ভাবতে পারিনি। আপনার পরনে, কী যেন বললেন, ধুতি, আচ্ছা কী সুন্দর। আসুন, এগিয়ে আসুন।’

‘কিন্তু, আমি যে বিবাহিত।‘

হাসল তিলোত্তমা, ‘তাতে কী হয়েছে?বীর্যবান পুরুষ তো একাধিক স্ত্রীর সাথি হতে পারেন, রাজা দশরথের তিন পত্নী, অর্জুনের তো কথাই নেই, আপনার স্ত্রী কি খুব সুন্দরী?

‘না, তা নয়। একদমই নয়। তুলনাই চলে না।’

‘তাহলে দ্বিধা কেন? আপনার নাম জানতে পারি?

‘বিকাশকলি?’

‘বাঃ, আপনি আমাকে তিলু বলে ডাকবেন। আর আমি ডাকব ‘বিকু’ বলে।

তিলোত্তমা দু-হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে-আসতে ডাকল, ‘এসো, বিকু।’

সঙ্গে-সঙ্গে দরজায় বিকট শব্দ। ঘুম ভেঙে গেল বিকাশকলির। কোনওরকমে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে? কে?’

তখন পুত্র আট-নয় বছরের। বাইরে থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘তোমাকে বোবায় ধরেছে, মা বলল পাশ ফিরে শুতে।’

যাচ্চলে। এত রাগ হচ্ছিল তাঁর। কিছুক্ষণ সময় নিলেন রাগ হজম করতে। তারপর পাশ ফিরে শুলেন। ঘুম এল। এক স্বপ্ন। এবার একটা সাপের ব্যাং ধরার দৃশ্য দেখলেন। কোথায় তিলোত্তমা!

কুড়ি বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন বিকাশকলি। এরমধ্যে কয়েক হাজার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। প্রতিটি স্বপ্নের ডিটেলস পরদিন খাতায় লিখে রেখেছেন। সারাদিন ধরে তিলোত্তমাকে ভেবেছেন যাতে রাত্রে স্বপ্নে দেখতে পায়। কোথায় কী! হ্যাঁ, প্রতিরাত্রেই স্বপ্ন দ্যাখেন তিনি। কখনও ফুলের, কখনও পাখির, মৃত আত্মীয়রাও বারবার আসেন স্বপ্নে, কিন্তু তিলোত্তমার দেখা নেই। স্বপ্নের খাতাটা বেশ মোটা হয়ে গেছে, প্রতিটি স্বপ্নের আলাদা নম্বর দিয়েছেন। তিলোত্তমার স্বপ্ন একশো বাইশ নম্বরে।

রোজ রাত্রে শোওয়ার সময় একশো বাইশনম্বরকে স্মরণ করেন বিকাশকলি। কিন্তু কোনওভাবেই স্বপ্নটা ফিরে আসে না। আজ রাত্রে হঠাৎ একটা সুন্দর ফুলের বাগান স্বপ্নে দেখতে পেলেন। দেখেই মন চঞ্চল হল, খানিকটা এগোতেই হাড় জিরজিরে এক সাধুকে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে থাকতে দেখলেন। ওরকম কুৎসিৎ, কঙ্কালপ্রায় সাধুকে দেখতে তাঁর একটুও ইচ্ছে করল না। মনে-মনে বললেন, বাগানের অন্য প্রান্তে চলে যাই। সঙ্গে-সঙ্গে তিনি যেখানে এলেন সেখানে একটা সরোবর চোখে পড়ল। মৎস্যকন্যারা খেলা করছিল, তাঁকে দেখামাত্র ওরা ডুব দিয়ে অদৃশ্য হল।

মন খারাপ হল না তাঁর। মনে-মনে একশো বাইশ-একশো বাইশ বলতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি দেখলে অপরূপা এক যুবতী তাঁর দিকে পেছন ফিরে ফুলের ঘ্রাণ নিচ্ছে। আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন তিনি, ‘তিলু তিলু, তোমাকে শেষপর্যন্ত দেখতে পেলাম।’ আর আনন্দটা এত উদ্দাম ছিল যে লাফিয়ে উঠেছিলেন ঘুমের ঘোরে। খাটের বা জ্বর ওপর পড়ল গোঁড়ালি, তীক্ষ্ণযন্ত্রণায় ঘুম ভেঙে গেল।

বাথরুম থেকে বেরিয়েও খোঁড়াতে হচ্ছিল। কিন্তু তাতে কোনওই দু:খ ছিল না বিকাশকলির। নিশ্চয়ই হাড় ভাঙেনি। ভাঙলে হাঁটতে পারতেন না। অতএব ব্যথার কথা ভুলে গিয়ে নিজের খাটে বসে তিনি হাঁটুর ওপর তবলা বাজালেন। শেষপর্যন্ত তিনি নিজের ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখতে পারছেন? পৃথিবীর কেউ পেরেছে?কয়েকদিন আগে হঠাৎ চৌরঙ্গির ফুটপাথে একটা বই দেখে কিনে ফেলেছিলেন বিকাশকলি, বইটার নাম ‘ড্রিম অ্যান্ড রিয়েলিটি’ লেখকের নাম ক্লিন গ্র্যান্ট। মানুষ কত রকমের স্বপ্ন দ্যাখে, কেন দ্যাখে, বাস্তবের সঙ্গে কী সম্পর্ক তার, এ-নিয়ে দারুণ লেখা। কিন্তু লেখক বারংবার বলেছেন, কেউ তার ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখতে পারে না। দেখলে সেটা রেকর্ড হবে।

গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। কিন্তু মুশকিল হল, তিনি যে ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখতে পারেন সেটা প্রমাণ করবেন কী করে? মিস্টার গ্রান্ট অবশ্য লিখেছেন, স্বপ্ন দেখার সময় মানুষ কী ধরনের। আবেগে আক্রান্ত হয় তার গ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে ধরা যায়। তাই যদি হয়, একই গ্রাফ কয়েকবার স্ক্রিনে পড়লে বোঝা যাবে ঘুমন্ত মানুষ একই স্বপ্ন দেখছেন। তাহলেই তো প্রমাণিত হয়ে যাবে। কাল সকালেই তিনি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড-এর কর্তাদের চিঠি লিখে দাবী জানাবেন।

সকালে দেখা গেল গোঁড়ালির কাছটায় একটু ফুলেছে। পেইন কিলার খেয়ে ব্যথাটা গেলেও খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে। কাজের মেয়ে গিন্নিকে খবরটা জানাল। গিন্নির গলা কানে এল, ‘হবে না যত বয়স হচ্ছে তত ভীমরতি বাড়ছে। নিশ্চয়ই ঘুমের ঘোরে কাউকে লাথি মেরেছে। বেশ হয়েছে। এরপর যদি স্বপ্ন দেখে বোবা চিৎকার বন্ধ হয় তাহলে বাঁচি।’

বউমার নরম গলা কানে এল, ‘একবার ডাক্তার দেখালে হত না?যদি ভেঙে গিয়ে থাকে।’

‘ভাঙবে না, ভাঙবে না। ওই হাড় ভাঙার নয়। খোকার যখন তিন বছর বয়স তখন আমার ধুম জ্বর এল ভর দুপুরে। উনি তখন অফিসে, জ্বরে অন্ধকার দেখছি আর ভাবছি বিকেলে অফিস থেকে এলে আমার অবস্থা দেখে নিশ্চয়ই ডাক্তার ডেকে আনবে, তিনি এলেন রাত দশটায়,

অফিস ক্লাবে তাস পিটিয়ে। এসেই বাথরুমে ঢুকে গেলেন। তারপর জ্বর হয়েছে শুনে বললেন, ‘বাড়িতে তো জ্বরের ওষুধ আছে, খাওনি? আজকাল এরকম জ্বর খুব হচ্ছে।’ বোঝো! কাকে নিয়ে এতদিন ঘর করছি।’ গিন্নির গলা।

দুপুরের পর থেকে ব্যথা কমে গেল। হাঁটাটাও অনেক স্বাভাবিক। পা-কে বিশ্রাম দিলেন বিকাশকলি।

রাতের খাওয়া শেষ করে দরজা বন্ধ করলেন তিনি। সন্ধের পর মনটা ভালো হয়েছিল। অফিস ফেরত বউমা এসেছিলেন ঘরের দরজায়। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এখন কেমন আছেন?

‘ঠিক আছি।’

‘ব্যথা নেই তো?’

‘না-না।’

বউমা চলে গিয়েছিলেন।

আজ ঘুমাবার আগে মনে-মনে একশো বাইশ নম্বর স্বপ্নটাকে দেখতে চাইলেন বিকাশকলি। পাশ ফিরে ঘুমোলে স্বপ্ন দেরিতে আসে বলে চিত হয়ে শুলেন। মিনিট দেড়েকের মধ্যে ঘুম এসে গেল। আর তারপরেই স্বপ্ন। আর, কী আনন্দ! সেই সুন্দর ফুলের বাগানটায় হাঁটছেন তিনি। তার মানে ইচ্ছে করলেই যা চাইবেন তাই দেখতে পাবেন স্বপ্নে। আরে মাটির কলসির ঘষা লেগে পুকুর। পাড়ের বাঁধানো চাতালে গর্ত হয়ে যায়, আঠারো বছরের চেষ্টায় কি এই ক্ষমতা অর্জন করতে পারবেন না।

বাঁক নিতেই দেখতে পেলেন তাকে, ফুলে ঘ্রাণ নিচ্ছে। পরনে কাঁচুলি আর ঘাগরা। কিন্তু মুখ মাথা ওড়নায় ঢাকা। আকাশি নীল ওড়না।

আর একটু এগিয়ে যেতেই ঘাড় ঘুরিয়ে আড়চোখে তাকাল তিলোত্তমা, কিন্তু সামনে ঘুরে দাঁড়াল না। মিহি গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন।’

আবছা মুখ দেখা যাচ্ছে। বিকাশকলি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি সেই প্রথম দেখা থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছ তিলু?’

‘কী করব! আর কারও দিকে তাকালেই স্বর্গে ফিরে যেতে হবে যে।’ তিলোত্তমা বলল, ‘বিকু আমাকে গন্ধর্ব মতে গ্রহণ করো।’

‘সেটা কীভাবে করব?’ হৃদয় শরীর রোমাঞ্চিত হল বিকাশকলির।‘

‘ফুল-পাখি-আকাশকে সাক্ষী রেখে। আমি ঘাসের শয্যা পেতে রেখেছি।‘

তিলোত্তমা এগিয়ে এল, ‘আর বিলম্ব সহ্য করতে পারছি না প্রিয়, ধীরে-ধীরে ওড়না সরিয়ে দৃষ্টিবাণ নিক্ষেপ করল তিলোত্তমা। কিন্তু ওড়না সরে যেতেই চমকে উঠেছিলেন বিকাশকলি। তিলোত্তমার মুখটা বউমার মুখ হয়ে গেছে কী করে?’ অবিকল বউমা। তিনি চিৎকার করলেন, ‘তুমি, তুমি কে?’

তিলোত্তমা বলল, ‘আঃ বিকু, আমি তিলোত্তমা।’

‘মা তুমি মা।’ তিন হাত পিছিয়ে গেলেন বিকাশকলি।

‘কি? আমাকে মা বলে ডাকলে! হায়, আমাকে ফিরে যেতে হবে স্বর্গে। যাওয়ার আগে তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি এ-জীবনে তুমি আর কখনও স্বপ্ন দেখতে পাবে না।’ লাফিয়ে উঠলেন বিকাশকলি। সঙ্গে-সঙ্গে প্রবল যন্ত্রণা, মাটিতে শুয়ে গোঙাতে-গোঙাতে বুঝলেন এবার সত্যি তাঁর হাঁটুর হাড় ভেঙে গেছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *