স্বপ্নের রথে রপ্তানি

স্বপ্নের রথে রপ্তানি

ব্যাপারটা কীরকম? যে সন্ধেয় একটু পানভোজন হয় সেই রাত্রেই সুশোভন স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। কোথায় যেন পড়েছিলেন, যে মানুষ স্বপ্ন দেখে না তার বেঁচে থাকাই অর্থহীন। প্রথম যৌবনে এক-আধবার একে ওকে স্বপ্নে দেখেছেন। পরিচিতা বা অপরিচিতা সেইসব সুন্দরীরা খুব দ্রুত স্বপ্ন থেকে সরে গিয়েছিল। তারপর আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামাননি। বোধহয় বিয়ের পর থেকেই স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাশে কেউ শুয়ে থাকলে, বিশেষ করে তার হাত বা ঠ্যাং গায়ের ওপর পড়লে স্বপ্নেরা আসতে চায় না। ব্যাপারটা আবিষ্কার করে সুশোভন তার স্ত্রী শ্রীজাতাকে বলেছিলেন। শ্রীজাতা সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, ভালোই হয়েছে। পেট গরম হলে লোকে স্বপ্ন দেখে। আর স্বপ্ন দেখলে নিশ্চয়ই ঘুম ভালো হয় না। ফলে সকালে শরীর ম্যাজম্যাজ করবে। তুমি বেঁচে গেছ।

হয়তো। তবে তখন এ নিয়ে আর মাথা ঘামাননি সুশোভন। তারপর ছেলেমেয়ে বড় হল। সুশোভনের শোওয়ার ঘর আলাদা হল, কারণ শ্রীজাতা মেয়ের সঙ্গে শোবেন। ছেলেও দশ বছরের পর অন্য ঘরে চলে গেল। এখন তার পাশে কেউ শোয় না কিন্তু সেই চলে যাওয়া স্বপ্নরা আর ফিরে এল না। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে সুশোভন প্রথম মদ্যপান করেন, সেটা একটা পিকনিকে। বন্ধুবান্ধবরা সস্ত্রীক গিয়েছিলেন সেই পিকনিকে। শ্রীজাতাও সঙ্গে ছিলেন। ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়নি বলে শ্রীজাতাকে সেদিন বেশ ফুর্তিতে আছেন বলে মনে হচ্ছিল। এক বন্ধু ডাবের জলে ভদকা মিশিয়ে এগিয়ে দিলেন গ্লাস, নিন, দু-পাত্র খেলে খিদে বাড়বে।

সুশোভন মদ খান না বলে মৃদু আপত্তি জানাতে সবাই হইহই করে উঠেছিল। এমনকী শ্রীজাতাও ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছিলেন, একদিন খেলে কী হয়। সেই শুরু। ভদকার স্বাদ বেশ ভালো লেগেছিল। তারপর সেটা গিয়ে দাঁড়াল সাপ্তাহিক ব্যাপারে। প্রতি শুক্রবার বন্ধুদের সঙ্গে এই ক্লাবে বা ওই ক্লাবে। বেশি নয়, তিনটে পেগ। তারপর স্বচ্ছন্দে বাড়ি ফিরে ডিনার খেয়ে শুয়ে পড়া। শ্রীজাতা অবশ্য নির্দেশ দিয়েছেন, শুক্রবারে বাড়ি ফিরে তুমি কারও সঙ্গে কথা বলবে না। সোজা খেয়ে শুয়ে পড়বে।

সুশোভন জানতে চেয়েছিলেন, কেন?

তখন তোমাকে অন্যরকম দেখায়।

তৃতীয় শুক্রবারের রাত্রে সুশোভনের স্বপ্ন দেখা শুরু হল। গভীর জঙ্গলে একটি পোবন। তিনি এক বালতি জল দিঘি থেকে তুলে নিয়ে আসছেন। এমন সময় গুরুদেব বজ্রকণ্ঠে ডাকলেন, সু, এদিকে এসো।

গুরুদেবের শরীর শীর্ণ, দাড়ি পাকা, কৃচ্ছসাধনা করে তিনি শরীরে এক গ্রাম মেদ জমাতে দেননি, জলের বালতি সরিয়ে রেখে সুশোভন নতজানু হয়ে বললেন, আদেশ করুন গুরুদেব। গুরুদেব। বললেন, এই যে জল তুমি আনছ এ কার সৃষ্টি?

ঈশ্বরের।

ঈশ্বরের ঠিকানা কি?

স্বর্গে।

স্বর্গ কোথায়?

এই এ ব্যাপারে আমি অন্ধ, গুরুদেব। আপনি আলোকপাত করুন।

স্বর্গ মানুষের মনে। অথচ মানুষ তার খবর জানে না। তাই তারা ঈশ্বরের সন্ধান পায় না। তুমি তার সন্ধান শুরু করো বৎস।

ব্যস। স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল কিন্তু ঘুম ভাঙল না। পরদিন সকালে ঠিকঠাক মনে পড়ে গেল স্বপ্নটা। সুশোভন একটু বিহুল হলেন। এসব চিন্তা তাঁর মাথায় কখনও আসেনি, তাহলে এমন স্বপ্ন দেখলেন কেন?

বন্ধুদের মধ্যে একজনের এ বিষয়ে পড়াশুনো আছে। সব শুনে তিনি কয়েকটি প্রশ্ন করলেন, আপনি কি ঈশ্বরচিন্তা করে থাকেন? করেন না। বেশ, দেবস্থানে যান? যেমন দক্ষিণেশ্বরের মন্দির, কালীঘাট অথবা বেলুড়ে? তাও না। আপনার পিতা পিতামহ কি ধার্মিক ছিলেন?

এবার মাথা নাড়লেন সুশোভন। আমি তাঁদের দেখিনি। আমার জন্মের আগেই বাবা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। আমি মামার বাড়িতে মানুষ। তাঁরা কেউ তেমন ধার্মিক ছিলেন না।

বই পড়েন?

হ্যাঁ।

কী ধরনের বই?

বাছবিচার নেই। যা পাই তাই পড়ি।

কথামৃত?

পড়েছি। পড়ে ভালো লেগেছে কিন্তু ঈশ্বরচিন্তায় মগ্ন হইনি।

আপনি তপোবনের স্বপ্ন দেখেছেন। মহাভারত পড়েছেন?

হ্যাঁ কিন্তু–।

বলুন, সঙ্কোচ করবেন না।

মহাভারত পড়েছি রোমান্সের মজা পেতে। মুনি বা দেবতারা কীরকম চটপট অপ্সরা বা। মানবীদের প্রেমে পড়তেন এবং শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যেত। কিন্তু পড়ার সময় অশ্লীল বলে মনে হত না আমার, তাই পড়তাম।

ভদ্রলোক হাসলেন, এতক্ষণে বুঝলাম। আপনি স্বপ্নে যে তপোবন দেখেছেন সেখানে আপনি আর গুরুদেব ছিলেন। তাঁর নাম?

নাম জানার সুযোগ হয়নি।

কোনও মহিলা কি ছিলেন সেখানে? কোনও গুরুপত্নী বা গুরুদেবের শিষ্যা?বৃহস্পতির

তপোবনে যেমন দেবযানী ছিলেন কচের সহপাঠী হিসেবে তেমন কেউ।

না। কাউকে দেখিনি।

কোনও অপ্সরা কি আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল?

না তো।

আমার বিশ্বাস এই স্বপ্ন অনেক-অনেক স্বপ্নের ভূমিকা। মহাভারত পড়ার রোমান্স আপনার মনে সুপ্ত ছিল এবং আছে। আপনি নিশ্চয়ই তপোবনে অপ্সরাদের দেখতে ইচ্ছুক। হয়তো দেখা পেয়েও যাবেন। ভদ্রলোক বললেন।

কিন্তু পরের রাত্রে গভীর ঘুমেও স্বপ্ন দেখা হল না। সকালে সেটা আবিষ্কার করে মন খারাপ হয়ে গেল। আহা, মানুষ যদি ইচ্ছে করলেই স্বপ্ন দেখতে পেত। বিজ্ঞান এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ব্যর্থ। কিন্তু স্বপ্ন দেখলেন পরের শুক্রবারের রাত্রে। সেদিনও তিন পেগ খেয়ে এসেছিলেন।

স্বপ্নে সেই তপোবন। গুরুদেব শুয়ে আছেন তৃণশয্যায়। বললেন, হে সু, সংসারে তুমি কীরকমভাবে থাকবে?

মাছের মতো। জলে থেকেও সিক্ত হব না।

চমৎকার। বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়াই যদি মানুষের একমাত্র কাম্য হয় তাহলে জন্মাবার পর কেন তাকে সংসার-বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়?

বন্ধন কী তা না জানলে তার থেকে মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায় না।

গুরুদেব উঠে বসলেন, বাঃ। এই তো চাই। এখন তোমার ওপর আশ্রমের দায়িত্ব অর্পণ করে কিছুদিনের জন্যে আমি অন্যলোকে যেতে পারি। তুমি যোগ্যতা অর্জন করেছ। তবে মনে রেখো, একমাত্র দুর্বাসা ছাড়া অন্য কাউকে তুমি আমার অবর্তমানে এখানে থাকতে দেবে না। কথাগুলো বলে গুরুদেব ধীরে-ধীরে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেলেন।

স্বপ্নটা যে সেখানেই থেমে গিয়েছিল তা পরের সকালে ঘুম ভাঙার পর বুঝতে পারলেন সুশোভন। নিজেকে কীরকম পবিত্র-পবিত্র বলে মনে হচ্ছিল। হোক স্বপ্ন তবু তো একজন মুনি তাঁকে যোগ্য বলে মনে করেছেন।

চায়ের কাপ নিয়ে এলেন শ্রীজাতা। বললেন, আজ যদি গ্যাস না দিয়ে যায় তাহলে খুব প্রবলেম হবে। কেরোসিন বেশি নেই যে স্টোভ জ্বালাব।

অন্যমনস্ক ছিলেন সুশোভন, বললেন, হুঁ।

তোমার কী হয়েছে?

কেন? কিছু হয়েছে ভাবছ কেন?

অন্যরকম লাগছে। কালোর মাকে পাঠাচ্ছি কেরোসিনের জন্যে। ব্ল্যাকে এনে দেবে।

ব্ল্যাকে? না-না। ছি:। তুমি ব্ল্যাকে কেরোসিন কিনবে কেন? এ তো অন্যায়। চরিত্রেরপতন। গ্যাস নাপেলে হোম সার্ভিসে ফোন করে খাবার আনিয়ে নাও।

ওমা। এই যে প্রতিবার এক সিলিন্ডার গ্যাসের জন্যে একস্ট্রা পনেরো টাকা দিচ্ছি সেটাও তাহলে অন্যায়? চরিত্রের পতন? এই যে প্রতি শুক্রবার তুমি মদ গিলে আসো সেটা কি চরিত্রের উত্থান?কথা শুনলে শরীর জ্বলে যায়।

পরিমিত মদ্যপান ডাক্তাররাই করতে বলেন। তা ছাড়া মুনিঋষিরা নিয়মিত সোমরস পান করতেন কিন্তু ব্ল্যাকে কোনও জিনিস কিনতেন না। সুশোভনের কথা শোনার পর শ্রীজাতা সেখানে দাঁড়াবার প্রয়োজন বোধ করলেন না।

অনেক ভাবলেন সুশোভন। সংসারে শান্তি নেই। অথচ স্বপ্নে ওই তপোবনে গেলেই মন স্নিগ্ধ হয়ে যায়। সমস্যা হল মদ্যপান না করলে তিনি স্বপ্ন দেখতে পান না। মদের সঙ্গে ওইরকম পবিত্র স্বপ্নের কী সম্পর্ক আছে তা তিনি বুঝতে পারেন না।

অতএব স্বপ্ন দেখার জন্যে তাঁকে সাপ্তাহিক মদ্যপানের রাতটির জন্যে অপেক্ষা করতে হয়। পরের শুক্রবার একটু বেশি পান করা হয়ে গিয়েছিল, বাড়িতে ফিরে খাব না বলে নিজের। ঘরেঢুকে পড়েছিলেন। জামা-প্যান্ট বদলে মুখে ঘাড়ে জল দিয়ে বালিশে মাথা রাখতেই ঘুম চলে এল। শ্রীজাতা বলেন, সুইচ অনের মতো ঘুম আসে। অথচ আমরা হাপিত্যেশ করে থাকি কখন ঘুম আসবে।

তপোবন। কোকিল ডাকছে। মধুর মলয় বাতাস বয়ে যাচ্ছে। ময়ূর পেখম মেলে ধরেছে যদিও আকাশে মেঘ নেই। এই সময় মেঘ ডাকার মতো গলার শব্দ শুনতে পাওয়া গেল, কী আশ্চর্য! আমি এসেছি অথচ কেউ দেখতে পাচ্ছে না?

সুশোভন চমকে ঘুরে দাঁড়ালেন। দেখলেন ক্ষয়টে চেহারার এক মুনি, মাথায় জটা, হাতে কমণ্ডলু, খড়ম পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সে সঙ্গে-সঙ্গে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল, গুরুদেব এখন তপোবনে নেই, আপনি আমাকে আদেশ করুন।

কে তুমি?

আমি সুশোভন, গুরুদেবের শিষ্য।

আমার প্রশ্নের জবাব দাও, ভক্ত বড় না ভগবান বড়?

ইনি কে বুঝতে পারছিলেন না সুশোভন। তবে কথা বলার ভঙ্গিতে সামান্য মিষ্টভাব নেই। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের গান মনে পড়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই মিথ্যে কথা লেখেননি। তিনি বললেন, ভক্ত না থাকলে ভগবানকে কে পুজো করবে। তাই তো কবি গেয়েছেন, আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেমে হত যে মিছে।

দশে দশ। মুনি মাথা নাড়লেন। যাকগে। তোমার শিক্ষায় আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। তপোবনে ভালো ঘি আছে?

হ্যাঁ, আছে। কিন্তু অপরাধ নেবেন না, আপনার পরিচয় আমার জানা নেই।

কি? এতবড় স্পর্ধা। ত্রিভুবন যাঁর জন্যে উদগ্রীব থাকে তুমি তার কাছে পরিচয় জানতে চাইছ? আমি তোমাকে ভস্ম করতে পারি তা জানো?

হাতজোড় করলেন সুশোভন, আমার গুরুদেবের আদেশ, একমাত্র মহারাজ দুর্বাসা ছাড়া আর কাউকে যেন তপোবনে না থাকতে দিই।

ও। একথা বলে গেছে ছোঁকরা? ভালো। হ্যাঁ, আমিই সে।

শোনামাত্র দুর্বাসার পদতলে লুটিয়ে পড়লেন সুশোভন। দুর্বাসা বললেন, এসব খুব বিরক্তিকর, তার বদলে আমি এখানে শুয়ে পড়ছি, তুমি আমার সারা শরীরে ঘি লেপন করো। কোনও সঙ্কোচ করে কর্মটি শেষ করবে।

স্বর্গে বিউটি পার্লার থাকতে পারে দেবী বা অপ্সরাদের জন্যে, সেলুন যে নেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন সুশোভন। এত লোমশ শরীর এবং তার গোড়ায় এত ময়লা লেগে আছে যেভক্তি মাথায় ওঠে। তবু ঠোঁট টিপে ঘি লেপন করলেন তিনি। করতে-করতে দেখলেন দুর্বাসা আরাম পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। পায়ের গোঁড়ালির কাছে এসে তিনি থমকে গেলেন। পায়ের তলা ফাটা। ময়লা জমে আছে। সুশোভন পায়ের তলায় আর ঘি লাগালেন না। সেটা অনর্থক বলে মনে হলতাঁর।

ঘণ্টা তিনেক বাদে ঘুম থেকে উঠে ঘি-এর গন্ধ পাওয়ায় প্রসন্ন হলেন দুর্বাসা। কিন্তু কয়েক পা হাঁটতেই তিনি টের পেলেন তাঁর পায়ের তলায় ঘি নেই। তিনি সঙ্গে-সঙ্গে কৈফিয়ত তলব করলেন।

সুশোভন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন দুর্বাসা তাঁকে অভিশাপ দিলেন, তোর এতবড় আস্পর্ধা, আমার আদেশ মান্য করিসনি বলে যা–ওই দিঘিতে মাছ হয়ে বাস কর।

সঙ্গে-সঙ্গে মুনির পায়ে পড়ে গেলেন সুশোভন। অনেক কাকুতিমিনতি করার পর মুনির মনে একটু দয়া এল, ঠিক আছে, যদি কোনও সুন্দরী নারী তোর শরীর তার পায়ের তলা দিয়ে স্পর্শ করে তাহলে আবার মানুষ হয়ে যাবি।

যেন টিভি সিরিয়ালের একটি পর্ব দেখছেন এমনভাবে স্বপ্নের শেষ হয়, ঘুম ভাঙে না। কিন্তু পরদিন সকালে সুশোভন ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন। তিনি জলে মাছ হয়ে সাঁতার কাটছেন না, নিজের বিছানায় বসে আছেন।

শ্রীজাতা ঘরে এলেন, তুমি আজকাল মাতাল হয়ে যাচ্ছ, ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে, তারা তোমাকে শ্রদ্ধা করতে পারবে?

স্বপ্নে শোনা গুরুদেবের কথা মনে এল। সুশোভন চমৎকার আবৃত্তি করলেন–

ন মে পার্থাস্তি কর্তব্যং ত্রিষু/ লোকে কিঞ্চন।/নানা বাপ্তমবাপ্তব্যং বর্ত এব চ কর্মণি।/

হতভম্ব শ্রীজাতা বললেন, মানে?

সুশোভন হাসলেন, হে পার্থ, ত্রিলোকে আমার কিছুই কর্তব্য নেই, অপ্রাপ্ত বা অপ্রাপ্তব্যও নেই, তথাপি আমি কর্মে নিযুক্ত আছি।

শ্রীজাতা চমকে উঠলেন, এ কি বলছ তুমি? এসব কথা তোশ্ৰীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন। তোমার কি হল গো?

মাছ, মাছ হয়ে গেছি।

বুঝতে পেরেছি। তুমি ঠাকুরের কথায় আশ্রয় নিতে চাইছ। সংসারে থাকবে মাছের মতো, জলে থেকেও শরীর ভেজাবে না। শোনো, তোমাকে মদ ছাড়তে হবে।

সুশোভন বললেন, অসম্ভব। স্বধর্মে নিধনও ভালো, কিন্তু পরধর্ম ভয়াবহ।

এসব সুযোগসন্ধানী কথাবার্তা, ঠাকুর বলেছেন পবিত্র মন নিয়ে, ধার্মিক ভক্তদের সদুপদেশ দিয়েছেন। তোমার মতো চালাক লোক সেই উপদেশকে অন্য অর্থে ব্যবহার করছ।

স্ত্রী-র দিকে তাকালেন সুশোভন, বিশ্বাস করো, স্বপ্ন দেখলেই আমার মনে পবিত্রভাব আসে। নিজেকে খুব ধার্মিক বলে মনে হয়।

বাপের জন্মে এমন কথা শুনিনি। শ্রীজাতা বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন।

এখন প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে সুশোভনের। তাঁর আত্মা মাছ হয়ে দিঘিতে সাঁতার কাটছে। কোনও জেলে এসে ধরে নিয়ে যেতেই পারে। যদিও তাঁর স্মরণে আসছিল না। তপোবনের আশপাশে কোনও জেলেকে দেখেছেন কিনা। এদিকে মুশকিলের ব্যাপার হল, পান না করলে স্বপ্ন দেখতে পারছেন না। তাঁর বন্ধুরা সারা সপ্তাহের কাজের শেষে শুক্রবার রাত্রে পানাহার করেন। স্বপ্ন দেখতে হলে সাত-সাতটা দিন অপেক্ষা করতে হয়। তর সইল না। সুশোভনের। পরের দিন অফিস ছুটির পর বন্ধুদের বললেন ক্লাবে যাওয়ার জন্যে। তাঁরা অবাক। যে সুশোভন এতদিন মদ ছোঁয়নি তার হঠাৎ এমন পরিবর্তন কি করে হল? অন্যেরা কাজের অছিলায় সরে গেলেও একজন সঙ্গী হলেন। একা-একা মদ খাওয়াতে অস্বস্তি আছে। ক্লাবে সবাই ছোট-ছোট দলে ভাগ করে মদ খায়। কেউ একা খাওয়া মানে কৌতূহল তৈরি হবে।

রাত্রে বেশ টলমল অবস্থায় বাড়ি ফিরেই শুয়ে পড়লেন সুশোভন। তাঁর পক্ষে ধৈর্য রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। শ্রীজাতার গম্ভীর মুখ তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না।

আহা। কী মোলায়েম এই দিঘির জল। তিনি সাঁতার কাটছেন মাছ হয়ে। বেশ বড় মাছ। হয়তো রুই নয়তো কাতলা। আশপাশে অনেক মাছ রয়েছে। তিনি তাদের দিকে এগিয়ে গেলেই তারা দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ তাঁকে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু ক্রমশ নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হতে লাগল। তিনি যেন মাছ হয়েও মাছ নন।

এইভাবে স্বপ্নেই কটা দিন কেটে যেতে সুশোভন চমকে উঠলেন। জলে কার যেন ছায়া পড়েছে। অপরূপা সুন্দরী এক রমণীর ছায়া। সেই রমণী এসেছেন দিঘিতে স্নান করতে। ক্রমশ জলে নেমে ঢেউ তুলতে লাগলেন তিনি। তারপর সাঁতার কেটে চললেন খানিকটা। সময় নষ্ট করলেন না। সুশোভন। দ্রুত পেছন থেকে ছুটে গিয়ে সুন্দরীর পায়ের তলায় চলে এলেন। সাঁতারের সময় পা। ছুঁড়তেই সুন্দরীর পায়ের তলা স্পর্শ করল তাঁর শরীর। সঙ্গে-সঙ্গে পরিবর্তন ঘটে গেল, তিনি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন কোমর-জলে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক গজ দূরে একজন পুরুষকে দেখে চিৎকার করতে গিয়েও সেটা গিলে ফেললেন সুন্দরী।

সুশোভন দ্রুত নিজের পরিচয় দেওয়ার জন্যে দুর্বাসার অভিশাপ বর্ণনা করলে সুন্দরী শান্ত হলেন। তিনি বললেন, আমার স্বামী সন্দিগ্ধমনা। আপনার সঙ্গে আমাকে এভাবে দেখলে ভাববেন আমরা জলবিহার করছি। আপনি দ্রুত ওপরে উঠে জঙ্গলের আড়ালে দাঁড়ান।

সুশোভন করজোড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার পরিচয়?

আমার নাম শাখা। চুম্বাসা শহরের রাজা আমার পিতা। এই তপোবনের মুনিকে আমি বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছি। তিনি আমার পিতার উপকার করায় পিতা তাঁর হাতে আমাকে তুলে দিয়েছেন। আপনি যখন তাঁর শিষ্য তখন আমাদের তো দেখা হবেই। শাখা বললেন।

দ্রুত দিঘি থেকে উঠে জঙ্গলের মধ্যে রোদে দাঁড়িয়ে পোশাক লুকিয়ে নিলেন সুশোভন। তারপর তপোবনের ভেতর প্রবেশ করে গুরুদেবের পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। ক্রুদ্ধ মুনি তাঁকে অনেক কুকথা বলার পর দুর্বাসার অভিশাপের কথা জানতে পেরে শান্ত হলেন। কী করে শাপমুক্ত হলেন, জিজ্ঞাসা করতে সুশোভন বললেন যে, স্নানের সময় গুরুপত্নী অজান্তে তাঁর মস্তকে পদাঘাত করায় তিনি মানুষের চেহারা ফিরে পেয়েছেন।

মুনি বললেন, বেশ, এখন থেকে তুমি কেবল তার পায়ের পাতায় নজর রাখবে, কখনই পাতার ওপর দৃষ্টি তুলবে না। যাও, সুমিষ্ট ফল সংগ্রহ করে নিয়ে এসো।

একঝুড়ি ফল সংগ্রহ করে আনার পর গুরুদেব খুশি হলেন। বৎস, তুমি স্থাণু হওয়ার চেষ্টা করো। নইলে তোমার সর্বনাশ হয়ে যাবে।

স্থাণু মানে কী গুরুদেব?

দৈত্যরাজ নিকুম্ভের পুত্র সুন্দ ও উপসুন্দকে নিধনের জন্যে বিশ্বকর্মা ত্রিভুবনের সব উত্তম জিনিস তিলতিল করে সংগ্রহ করে যে নারী সৃষ্টি করেন তার নাম তিলোত্তমা। সে যেদিকে যায় তাকে দেখবার জন্যেব্রহ্মার একটা করে মুখ বেরিয়ে আসায় তিনি চতুর্মুখ হতেন। তাকে দেখার জন্যে ইন্দ্রের সহস্রলোচন হল। কিন্তু শিব থেকে গেলেন স্থির হয়ে। তাই তাঁর নাম স্থাণু। তুমি। শিবের মতো স্থির হও। গুরুদেব বললেন।

গুরুদেব কেন তাকে শিবের মতো স্থির হতে বললেন তা সুশোভন অনুমান করলেন। তপোবনের সব কাজ তিনি নির্বিকার মুখে করে যেতে লাগলেন কিন্তু ভুলেও গুরুপত্নী শাখার দিকে তাকালেন না। কিন্তু দিঘিতে জল আনতে গিয়ে জলে গুরুপত্নীর প্রতিবিম্ব পড়লে না দেখে উপায় কি।

শাখা হাসলেন, আমার মুখের দিকে তাকানো কি পাপ?

কি করব। গুরুদেবের আদেশ। জলের দিকে তাকিয়ে বললেন সুশোভন।

আঃ, ওই তো তোমার গুরুদেব! শ্মশানের পোড়া কাঠের মতো চেহারা। অতিবৃদ্ধ। ওঁর সঙ্গে। কথা বলতেও ইচ্ছে করে না। তুমি যদি আমার সঙ্গে কথা না বলে তাহলে আমি এই দিঘিতে ডুব। দিয়ে মরব, বলে দিলাম। প্রতিবিম্ব সরে গেল।

মন খারাপ হয়ে গেল সুশোভনের। ফিরে গিয়ে দেখলেন গুরুদেব অন্যমনস্ক। কারণ জিজ্ঞাসা করতে জানালেন, বৎস, আমার সাধনার বিঘ্ন ঘটছে। কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছি না। ভাবছি তোমার গুরুপত্নীকে তার পিত্রালয়ে রেখে হিমালয়ে যাব সাধনা করতে। ততদিন তুমি আমার এই তপোবনের দায়িত্বে থাকবে।

সুশোভন বিচলিত হলেন, অপরাধ যদি না নেন তাহলে একটা কথা বলতে পারি।

কি কথা?

মনস্থির করা বা মন:সংযোগ বাড়াবার একটা পথ হল সোমরস পান করা। সোমরস মনে ভক্তিভাব বাড়িয়ে দেয়। সুশোভন নিবেদন করে।

সেকি।

হ্যাঁ। শরীরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটায়।

অ। তা এখানে সোমরস কোথায় পাব? এই জঙ্গলে?

আপনি আদেশ দিলে আমি সংগ্রহ করতে পারি।

বেশ, আনো দেখি।

সকালে স্বপ্নটাকে হুবহু মনে করে সুশোভন সোজা হয়ে বিছানায় বসলেন। কলকাতায় লক্ষ টন সোমরস বোতলবন্দি হয়ে আছে। রোজ একটা বোতল তিনি যদি স্বপ্নে নিয়ে গিয়ে গুরুদেবকে দিতে পারেন তাহলে নির্ঘাত প্রতিরাত্রে গুরুদেব চৈতন্য হারিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করবেন। সেই স্বপ্ন নিশ্চয়ই ঈশ্বরকে ঘিরে হবে। আর গুরুদেবের স্বপ্ন দেখার সময়ে শাখার সঙ্গে একটু রসালাপ করতে কী এমন ক্ষতি। সেটাও তো আর এক ধরনের আধ্যাত্মিক ব্যাপার। আত্মিকও বলা যেতে পারে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *