সে এবং জীবনানন্দ দাশ

সে এবং জীবনানন্দ দাশ

এখানে হাওয়ারা হাওয়াদের মতো বয়ে যায়। ভোর হব-হব রাতে তার শরীরে জড়িয়ে থাকে শিশিরের ঘ্রাণ, খানিক রোদ্দুর জমলে তাতে মেশে ঘাসের গন্ধ যার আস্বাদ বুক ভরে নেয় এক বিরহী ডাহুক। বিরহী, কারণ ওকে কখনও দোকা দ্যাখেনি এই প্রান্তর। বিরহী, কিন্তু আদৌ দুঃখিত দেখায় না ওকে যতক্ষণ না বিকেলের শেষ আলো নিভে আসা মোমের আলোর মতো দপদপ করে।

কাগজে জ্ঞাপিত হয়েছিল একটি মানুষ দরকার। শর্ত ছিল, সহজ লোকের মতো বলতে হবে, তাদের ভাষায় কইতে হবে। জলের, মাটির গন্ধ পেলে যার প্রাণ আহ্লাদে ভরে যাবে। পরে জেনেছিল দ্বিতীয় আবেদন না পৌঁছানোয় তাকেই ডাকতে বাধ্য হয়েছিলেন নির্বাচকরা। অবশ্য এক কঠিন মুখের বিচারকের সামনে তাকে বসতে হয়েছিল, যিনি একটি মাত্র প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বলুন তো ভাই, কেউ যদি বলেন, অনেক তো হল, এবার মরণের পাশে শুতে চাই, তাহলে কী দাঁড়াবে?’

হেসে গড়িয়ে পড়তে গিয়েও সামলে নিয়েছিল সে। তারপর সরল গলায় জবাব দিয়েছিল, ‘বীজ বুনলে ফসল হয়, মরণও গর্ভবতী হবে।’

‘অ্যা?’ চমকে উঠেছিল শিক্ষিত মুখ, ‘ব্রেশ! তা যে শিশু জন্মাবে সে কে, ভগবান না শয়তান?’

শরীরের স্বাদ যে বোঝেনি তখনও সে উত্তর দিয়েছিল, ‘না! জীবন।’

নিমেষে এক বিশাল অচেনা পৃথিবীর দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়ে গেল সে। তারপর ট্রেন, বাস, ভ্যানরিকশা আর নৌকোয় দুলতে-দুলতে চলে এসেছিল এখানে, চাকরির দায়িত্ব নিয়ে।

থাকার জায়গা বলতে একটা টঙের ওপর ঘর। পাশেই নদী তাই জলের প্রাচুর্য সবসময়। প্রতি পক্ষে নৌকো এসে তার প্রয়োজনীয় বস্তু পৌঁছে দিয়ে যাবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সিঁড়ি ভেঙে টঙের ওপর উঠে সে যখন প্রথম তার কর্মক্ষেত্র দেখল তখন চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল অস্বস্তিতে। এত সবুজ সে এর আগে কখনও দ্যাখেনি। সবুজ আর ন্যাড়া মাঠ। কার্তিকের ধান কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কিছু আগে। অপরাহ্নের রোদ সদ্য প্রসূতির মতো এলোমেলো। একদিকে সীমাহীন জল আর একদিকে ফসল আর গাছগাছালির ভুমি আর টঙের ওপরে তৈরি শক্তপোক্ত ঘরে সে, এর বাইরে আকাশ আর মাটি ছাড়া অন্য কোনও মানুষ নেই। সে দু-হাত মুখের পাশে এনে চেঁচিয়েছিল, ‘আ’ শব্দটা যেন তার শরীর থেকে বেরিয়ে আবার শরীরেই ঢুকে গেল।

রাত আসছে গুঁড়ি মেরে। দ্রুত খাওয়া শেষ করে নিল সে। কাল থেকে নিজের জন্য রাঁধতে হবে, আজ পথ থেকে আনা খাবারে রাত কাটানো। তারপর নদীর জলে মুখ ধুতে গিয়ে অবাক হল। ওটা কী! স্বচ্ছন্দ সাঁতরে চলে গেল খানিক গভীরে, তারপর এগিয়ে এল খানিকটা। লম্বা শরীর, চকচকে তেলানো গা, এমনভাবে মুখ তুলল যে মনে হল বলল, কে তুমি ভাই?

‘আমি কে তাই জানতেই তো আসা।’ সে বিড়বিড় করল। সঙ্গে-সঙ্গে মাছটা, যদি ও মাছ হয়, মিলিয়ে গেল নদীর গভীরে।

টঙের ঘরে উঠে বসল সে। নিরাপদে থাকার জন্যেই বোধহয় এই উঁচুতে ঘর। তার মানে এখানেও আপদ আছে। কোথায় নেই। বয়স পঁচিশ অথচ রোজগার নেই যার, তার তো চারপাশে আপদের ভিড়। এতদিন যত আবেদনপত্র পাঠিয়েছে তা জুড়লে নিজের জন্য মায়া হত। সেই আপদের কাছে এই আপদ নিতান্তই তরল। হঠাৎ সুইচ টিপে আলো নেভাবার মতো কেউ সূর্যটিকে নিভিয়ে দিল।

জীবনের এই প্রথম রাত, যে রাতটাকে তার মনে হল অসংখ্য নক্ষত্রের রাত। আর এমন গভীর হাওয়ার রাত যে পৃথিবীতে নামে তাও তার জানা ছিল না। ঘুম ছিল না যতক্ষণ না স্বাতী তারার কোল ঘেঁষে কোনও সাদা রাতপাখি উড়ে গিয়েছিল আর এক আশ্চর্য পৃথিবীতে। কিন্তু এই উঁচুতে, মাটি থেকে অনেক ওপরে সে যখন সন্ধে পেরিয়ে গেলে বিছানায় শরীর এলিয়েছিল তখন মনে হয়েছিল মশারি নিয়ে আসার কথা ওরা তাকে কেন বলেনি। মশারা এত ওপরে স্বচ্ছন্দে উড়ে আসে পেট ভরাতে? কিন্তু তারপর সারা আকাশ থেকে নেমে এল যখন হাওয়ারা, বিছানা থেকে। তাকে ছিঁড়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছিল নক্ষত্রের দিকে তখন ওই অন্ধকারের প্রাণীরা মুখ লুকিয়েছে মাটিতে অথবা আছড়ে পড়েছে চৌদিকে। নিজেকে সামলে নিতে হিমসিম খেয়ে গিয়েছিল সে। তারপর সেইসব হাওয়ারা ভিন-সাগরের বুকে মিশে গেলে ঝাউ-এর সরু-সরু কালো-কালো ডালপালা মুখে নিয়ে চাঁদ দেখা দিল। তাই দেখে মেঠো প্যাঁচা খুঁজে মরে সঙ্গীকে নাকি সঙ্গিনীকে তা সে জানে না। শুধু জানে কাল রাতে ঘুমে চোখ চায়নি জড়াতে। কিন্তু চাঁদ ডুবে যেতে-যেতে কিছু মরা জ্যোৎস্না নেতিয়ে পড়ল তার চোখের পাতায়, চোখের পাতাদুটো নেমে এল দুই চোখে, ঠিক কখন তার জানা নেই।

মাছির গানের মতো অলস শব্দে তার ঘুম ভাঙল। উঠে বসল সে। মাঠে-মাঠে ঝরে পড়ছে কাঁচা রোদ, রোদের নরম রং শিশুর গালের মতো লাল। মুহূর্তে শরীরের ভেতর অথবা ভেতর-শরীরের যাবতীয় অন্ধকার ফুস্কারে উড়ে গেল যেখানে যাওয়ার। আহ্লাদে ভরে ওঠে শরীর। এতদিনের জ্বালাযন্ত্রণা, প্রতিটি দিনের বেঁচে থাকতে চাওয়ার বেদনা ভুলে গিয়ে সে জানল মনের সব ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে, চোখ মেলে থাকলে।

শুরু হল কাজ। অন্তত দশ একর জমির ওপরে গাছগাছালি আর চাষের মাঠ। একপাশে বিশাল নদী। নদী জমি থেকে অনেক নিচে। নিচ থেকে সেটা উঠে গেছে উতরাই ভেঙে। তার কাজ সারাদিন ঘুরে গাছগুলো দ্যাখা। ফল পাকলে তাদের তুলে সঞ্চয় করা। প্রতি পক্ষে নৌকো যখন আসবে তখন সেই সঞ্চিত ফলগুলো নিয়ে যাবে মালিকের জন্যে। ওপাশে, টিলা ছাড়িয়ে জঙ্গলের গভীরে আছে কয়েকটা গ্রাম। কাজ দেওয়ার সময় তাকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল সেইসব পাড়াগাঁর মানুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছিল যেন ভুলেও ওদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি না করে।

ফসল তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মাঠ থেকে, সেখানে এখন ইঁদুরের উৎসব। কিন্তু গাছে ফলের বুকে রস ঘন হচ্ছে। কী নেই এখানে। আতা, পেয়ারা থেকে বেতের ফলও চোখে পড়ল। সেই ফল খাদ্য কি না তা তার জানা নেই।

দুপুর নামার আগে ফিরে এল সে। থাকার ব্যবস্থা আকাশেকিন্তু টঙের নিচের কুঁড়েঘরে রান্নার সরঞ্জাম। সেখানে ঢুকে দেখল যাবতীয় জিনিস ঠিকঠাক রয়েছে তার অপেক্ষায়। স্টোভ জ্বেলে চাল-ডাল সবজি একসঙ্গে ফুটিয়ে নিলেই পেটের প্রয়োজন মিটে যাবে। সেগুলো সাজিয়ে নিয়ে জল আনতে নদীর দিকে পা বাড়াতেই ছিপখানা দেখতে পেল। সুতো বঁড়শি ফাতনা মজবুত। রয়েছে তার। বেরিয়ে এসে গোটা পাঁচেক ফড়িং ধরে ছিপ আর বালতি নিয়ে চলে এল নদীর কাছে। এই নদীর অন্য পাড়  ঝাঁপসা। ঢেউ প্রবল। তবু একটা খাঁড়ির মধ্যে ঢুকে পড়া জল বেশ শান্ত। বড়শিতে ফড়িং ঢুকিয়ে জলে ফেলল সে। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। ফাতনাটা সোজা হয়ে আকাশ দেখছে। হঠাৎ প্রবল আলোড়ন শুরু হল জলে। ঠাওর করল সে, ওরা শুশুক। দু-তিনটে। নয়, ঠিক কত তা বুঝতে পারল না সে। শিস-এর শব্দ বাজছে জলে। ওটা কি শুশুকদের চিৎকার? ফাতনা বঁড়শি তুলে নিল সে। সঙ্গে-সঙ্গে শুশুকগুলো এক ছুটে চলে এল কিনারে, তারপর ডিগবাজি দিয়ে চলে গেল নদীর গভীরে।

শুশুকেরা এরকম আচরণ করল কেন? ওদের বড় শরীর নিশ্চয়ই এই বঁড়শির টোপের জন্য লালায়িত হবে না। ধরা পড়বার কোনও সম্ভাবনা ওদের নেই। তাহলে? ওরা কী ছোট মাছদের হয়ে প্রতিবাদ জানাল! বিষণ্ণ অথচ কিছুটা আশ্চর্যান্বিত হয়ে সে যখন ফেরার জন্য পা বাড়িয়েছে ঠিক তখন একটি শুশুক দ্রুত চলে এল পাড়ের কাছে। শব্দ শুনে মুখ ফিরিয়ে সে দেখল শুশুকের মুখে একটি পুরুষ্ট মাছ যা প্রাণীটি ছুঁড়ে দিল মাটির ওপরে। দিয়ে ফিরে গেল জলে। মাছটা। লাফাবার চেষ্টা করল বারকয়েক কিন্তু ততক্ষণে মধ্যাহ্নের রোদ তার শরীরে রুপো ঝরাতে শুরু করায় অবসাদ এসে গেল তার।

মাছটাকে তুলল সে। শ-পাঁচেক গ্রাম বয়স্ক মাছ। মাছ ধরতে না দিয়ে নিজেরাই তাকে দিয়ে গেল শুশুকরা? অদ্ভুত ব্যাপার তো। তার ভেতরে কম্পন শুরু হল। এরকম অভিজ্ঞতা পৃথিবীর কারও কী হয়েছে?

শরীর খাওয়ার চায়, পেয়ে গেলে কিছুটা সময় সে নির্লিপ্ত। মনের হাঁ-মুখ যে বন্ধ হয় না কখনও। রাবণের চিতা অবিরাম জ্বলে যায় সেখানে। টঙের ওপর তৃপ্ত শরীর নিয়ে উঠে এসে রোদে-জ্বলা সাম্রাজ্য দেখতে-দেখতে কত না নবীন কৌতূহল তিরতির করে তার মনে। অথচ এখানে চকিত হতে হবে না, ত্রস্ত হয়ে থাকার সময় এখন নয়। এখন এখানে কাজ এসে হাত জুড়ে নেই। সমস্ত পড়ন্ত রোদ চারদিকে ছুটি পেয়ে ভিড় জমিয়েছে গাছে-গাছে, ফসল কেটে নিয়ে যাওয়া প্রান্তরে। তাই চেয়ে-চেয়ে দ্যাখা। দেখে-দেখে দেখার আয়ু শেষ হয়। বাতাসের শীতলতা চুপি-চুপি বলে তাকে, ‘আয় ঘুম যায় ঘুম দত্তপাড়া দিয়ে।’

ধান কাটা হয়ে গেছে কবে যেন; খেতে মাঠে পড়ে আছে খড়। উজ্জ্বল আলোর দিন নিভে যাওয়ার আগে কিছু লোক ছুটে এল পাতা, কুটো, ভাঙা ডিম মাড়িয়ে। টঙের নিচে দাঁড়িয়ে তারা বিলাপ ছুঁড়ে দিচ্ছিল ওপরে। কাঁচা ঘুম চটকাতে-চটকাতে সে নেমে এল নিচে। ওরা এসেছে ওপাশে জঙ্গুলে গাঁ থেকে। ওরা জানে এই জমি, ফসলের বাগান, এই টং শহরের মানুষের সীমানা। এও জানে, যা তারা জানে না, তা শহরের মানুষের জানা। গ্রামবৃদ্ধ কাতর হন, তাঁর একমাত্র মেয়ের শরীরের তাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ওঝার শেকড়ের সাধ্য হচ্ছে না তার তাপ কমানোর। নিদান হেঁকে গিয়েছে সে। তাপ আরও বেড়ে গেলে শরীরের সব জল বাষ্প হয়ে মিলিয়ে গেলে কন্যাহারা হবে গ্রামবৃদ্ধ। শহুরে মানুষের কাছে কি জিয়নকাঠি আছে?

এখানে আসার সময় কিছু প্রাথমিক ওষুধ এনেছিল সে। হঠাৎ শরীর বিকল হলে যদি কাজে লাগে। অনুমানে বুঝে নিল কন্যা জ্বরে আক্রান্ত। কিন্তু সেটা কী ধরনের জ্বর তা আবিষ্কারের ক্ষমতা তার নেই। প্রাথমিক ওষুধ যা আছে তাই সম্বল করে পা মেলাল সে। বিকেলের কমলা। আলোয়, সাপের খোলস আর নিড়ানো খেত মাড়িয়ে, বুনো গাছেদের গন্ধ পেরিয়ে ওরা পৌঁছে। গেল জঙ্গুলে গাঁয়ে। উদ্বিগ্ন সারি-সারি মুখ, যাদের শাশ্বত মানবজাতির প্রতিনিধি ভাবা যায়, তাদের মুখ, কী উদাসীন!

গ্রামবৃদ্ধ তাকে নিয়ে এল যে নারীর পাশে তাকে দেখে তার মনে হল এই পৃথিবী বুঝি একবারই দেখা পায় তার। শরীর এলিয়ে আছে, হাঁ-মুখে মরুর বাতাস। প্রাণ আছে যায়নি বলেই। কপালে আঙুল ছোঁয়াতেই রক্তে ছ্যাঁকা লাগল তার। জ্বরের শহুরে নামগুলো মনে এল একের-পর এক। যার ওষুধ তার সঙ্গে থাকার কোনও কারণ নেই। প্রাথমিক ট্যাবলেট গুঁড়িয়ে মুখে ঢেলে একটু একটু করে জল ছড়িয়ে দিল সে ওখানে। কয়েক সেকেন্ড বাদে জিভ নড়ল, হয়তো অস্বস্তিতে। আবার ঈষৎ জল ঢালতেই ঢোঁক গিলল নারী। ওষুধ চলে গেল কণ্ঠনালীতে।

তারপর হলুদ পাতার ভিড়ে মুখ লুকোল রোদ্দুর। ইঁদুর পেঁচারা চাঁদহীন জ্যোৎস্নায় খেতে-খেতে খুঁজে এল গেল। চোখ বুজে কতবার ডান আর বাঁদিকে ঘুমিয়ে পড়ল কত-কেউ। সে জেগে রইল একা। দিঘির অতলে চাঁদ ডুবে আছে স্থির, কোনও ডুবুরির সাধ্য নেই তাকে টেনে তোলার, এই নারীর মুখ ফেলে সেই দৃশ্যও নীরক্ত মনে হয়। মাঝরাতে, যখন কুয়াশা ভাসছে চতুর্দিকে তখন আর একবার ওষুধ ঢেলেছিল সে, ওই মুখে। এবার জিভের সপ্রতিভতা বেড়ে গেল। এক ঢোঁক জল পান করে নারীর ঠোঁট জুড়ে গেল। তারপর অনেক লবণজল ঘেঁটে মাটির ঘ্রাণ পাওয়া সারেঙের মতো ভোরের স্পর্শ পাওয়ার মুখে সে, হাত রাখল নারীর কপালে। আঃ। স্বস্তির আস্বাদ পেয়ে উঠে দাঁড়াতেই গ্রামবদ্ধ জড়িয়ে ধরল দু-হাত। কৃতজ্ঞতা সরিয়ে রেখে ধীরে-ধীরে মাঠ খেত বনানী আর নিটোল রোদ্দুর শরীরে জড়িয়ে সে ফিরে গেল টঙে। প্রসবযন্ত্রণার শেষে পৃথিবীর সব গর্ভধারিণীর যে সুখ, এখন তাদের থেকে সে কম খুশি নয়।

দিন যায়। তবু রেখে যায় দিনগতসুখ। ভোর এলে আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে হৃদয়ের পদ্মপাতার জল। যেন অনেক জন্ম ধরে ছিল যে ব্যথা রাতের শিশির, এতদিনে তাই হয়ে গেছে পদ্মপাতায়। জল। এই পদ্মপাতায় সেই জল আটকে রাখতে চায় সে। আকাশনীল, পৃথিবী কী মিঠো রোদ। ভেসেছে, বুকের ভেতর ঢেঁকিতে পাড় পড়ছে। পদ্মপাতায় জল শুধু যে নড়ে। এ জল আটকে রাখা দায়।

তারপর একদিন, দুপুরের জনবিরল বাতাস দূর শূন্য চিলের পাটকিলে ডানার ভেতর অস্পষ্ট হয়ে গেলে, চুপিসারে বিকেল চলে এলে, সে এল। আতার ধূসর ক্ষীরে গড়া মূর্তি হয়ে বিকেলটাকে করে তুলল অসম্ভব বিষণ্ণ।

মনে হল জীবনের সব দেনা শোধ হয়ে গেছে এই মুহূর্তে। সে নেমে এল টঙের ওপর থেকে। গাঢ় গলায় শুধিয়েছিল, ‘ভালো আছ তো এখন?

মাথা নেড়েছিল নারী, না, ভালো নেই।

‘সে কী? কেন? কী করতে পারি তোমার ভালোর জন্যে?’ সে ব্যস্ত হল।

নারী তাকাল, ‘আপনি আমাকে জীবন দিয়েছেন, আপনার কাছে প্রার্থনা, এবার আমাকে প্রাণ দিন।’

যেন ঘুলঘুলাইয়ায় পাক খেল সে, ‘কীভাবে?’

‘যাকে ছাড়া আমি নিষ্প্রাণ তাকে গ্রহণ করছেন না পিতা। শুধু একমাত্র আপনার কথাই তিনি মানতে পারেন।’

এই কথা বলে নারী ফিরে গেল।

এখন তার চারপাশে চন্দনকাঠের চিতার গন্ধ, আগুনে-ঘিয়ের ঘ্রাণ।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *