সুদূরতমা : আনিসুল হক

মনের গহনে গভীর আঁচড়-কাটা বই
আখতার হুসেন

সুদূরতমা: আনিসুল হক \ প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন\ প্রকাশকাল: ২০১০ \ প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কাইয়ুম চৌধুরী \ মূল্য: ১২০ টাকা

সব উপন্যাস বা গল্পের কাহিনিই প্রাণের সঙ্গে মেশে না, একান্ত আমার বা আমাদের হয়ে যায় না। এ খুবই বিরল ব্যাপার। আঙুলে-গোনা অল্প কিছু কাহিনিই হয়ে ওঠে একান্ত নিজের বা নিজেদের। সেসবই সেই গভীর কাহিনি, যার আশ্রয় আর আবর্তন নিখাদ জীবনকে ঘিরে। আর তারই পাঠে প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, বিবৃত বা চিত্রিত কাহিনির এইখানে আমি আছি, আমরা আছি। সে আছে, তারা আছে, আমাদের পরিচিত পরিপার্শ্ব আছে, আমার বা আমাদের দিনানুদৈনিকাচার আছে। আছে আমাদের উদ্বেগ আর উল্লাস, হাসি আর কৌতুক। আছে আমার বা আমাদের চাপা দীর্ঘশ্বাস আর রুদ্ধ কান্না। আছে আমার বা আমাদের গহন গোপনীয়তা। আছে এ সবকিছু প্রকাশের অশেষ অধীরতা।
আনিসুল হক যখন তাঁর সুদূরতমা উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়েই রানুর জবানিতে বলেন, ‘তোমারও তো হাতে মেহেদির আলপনা আঁকা হয়েছিল, শানু আপু। তোমার পায়েও তো আলতা পরানো হয়েছিল, শানু আপু। তোমার বিয়ের আলতা। শুধু তোমার বিয়ের শাড়িটা পরানো হয়নি। তার বদলে, আশ্বিনের ওই দুপুরে নেমে এসেছিল সাদা কুয়াশা, জগৎটাকে কে যেন ঢেকে দিয়েছিল সাদা কাপড়ে’, তখন আমরা সঙ্গে সঙ্গে লেখকের গল্প শুরু করার এক আর্দ্র ও আন্তরিক কথনভঙ্গিতে মুগ্ধাবেশে আপ্লুত হই। এবং আরেকটু এগোলেই শানুর ‘বিয়ের শাড়ি পরতে না পারা’র নেপথ্য-কাহিনি জানার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠি।
এই উপন্যাসের গল্প খুবই ছোট। কিন্তু সেই ছোট আয়তনের গল্পটিকেই তার পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে আনিসুল হক পাঠককে রানুর মনের ও বাইরের চোখ দিয়ে দেখা পরিপার্শ্ব এবং তাদেরকে ঘিরে ঘটে চলা ঘটনা পরম্পরাকে এমন জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর নিজস্ব ভাষিক বয়ানে, যা এক অর্থে অতুলনীয়। শানুকে লক্ষ্য বা উপলক্ষ করেই এই বইয়ের সূচনা এবং সমাপ্তি। রানু ও শানু দুই বোন। দুজনের মধ্যে বয়সের বিস্তর ব্যবধান। ভয়ানক ব্যস্ত মহিলা কমিশনার মা এবং হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার বাবার অনুপস্থিতিতে বড় বোন শানুই ছোট বোন রানুর দেখভাল করে থাকে। বলতে গেলে তার পরম পরিচর্যায়ই সে বেড়ে উঠতে থাকে। দুই বোনের এ সময়কার দৈনন্দিন ঘরোয়া জীবনাচারের ছোটখাটো ঘটনার ছবি যেভাবে এঁকেছেন আনিসুল হক, যত নিবিড়ভাবে, মনে হয়, এ তো আমাদেরই চেনাজানা জগতের সবকিছু।
এ রকম চলমান ঘটনার একপর্যায়ে বড় বোন শানুর বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু এ বইয়ের অন্যতম চরিত্র পপ গায়ক শামীম আঙ্কেলের শানুর সঙ্গে তোলা একটি ছবি সেই বিয়ে ভেঙে দিতে পালন করে অনুঘটকের ভূমিকা। সেই দুঃখে শানু আত্মহত্যা করে। ছোট বোন রানু, যার বয়ানে এই উপন্যাসের শুরু, অর্থাৎ প্রথম পুরুষে যে এ বইয়ের ঘটনা বলে যায়, তারও বিয়ে ঠিক হয় একদিন। তবে তার ভালোবাসার পুরুষটির সঙ্গে নয়, খায়রুল আনাম নামের এমন একজনের সঙ্গে, তিন বছর আগে যে মানুষটি বিয়ে করেছে, যার বিরুদ্ধে আদালতে আছে নারী নির্যাতনের মামলা। রানু ঘটনার এই পর্যায়ে এসে হয়ে ওঠে আত্মহননকারী বড় বোন শানুরই সমরূপগত সত্তা। সেও কি তাহলে আত্মহত্যা করবে? কিন্তু রানু সেটা করে না। সে তার ভালোবাসার পাত্র স্বপন ভাইয়ের কাছে ফিরে যায়। নিজেকে সমর্পণ করে তার কাছে। আর বলে, স্বগতোক্তির মতো করে, ‘আপু, তুমি কি আমাকে আকাশ থেকে দেখছ—নীলের ওপার থেকে, মেঘের ওপার থেকে, সুদূরতম কোনো নক্ষত্র থেকে?’ এই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দুচোখ আপনা-আপনি আর্দ্র হয়ে ওঠে।
মনের গহনে গভীর আঁচড়-কাটা বই আনিসুল হকের সুদূরতমা।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ০৫, ২০১১

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *