সমুদ্র

সমুদ্র

ছেলেবেলায় আমরা ছিলুম গরিব। কিন্তু একদম ছোটোদের ঐশ্বর্য সম্পর্কে ধারণাটা বড়োদের মতো নয় বোধহয়। তাই আমার ভাইবোনেরা, অন্তত আমি আর বিনু। জানতুম না যে, আমরা গরিব। বাবা গলা ছেড়ে হা হা করে হাসতেন। মা ছিলেন সন্ধ্যাপ্রদীপের শিখার মতো। আর, আমাদের বাড়ির যে অংশটা আমাদের ভাগে পড়েছিল সেখানে মাঠের মতো দালানের এক অংশ।

আর বিরাট উঁচু সিলিং-এর তিনখানা ঘর, আর জালিঘেরা ব্যাডমিন্টন খেলা যায় এমন বারান্দা—এরকমটা আমাদের কোনো বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে আমরা দেখিনি। আসবাব ছিল কতকগুলো—আড়ে দিঘে মহাকায় এক আলমারি, ভীষণ ভারী একটা দেরাজ, পেতলের টপওয়ালা টেবিল আর পাঁচ-ছখানা অদ্ভুত আকারের চেয়ার। পায়াগুলো তাদের গড়িয়ে-আসা ঘন গুড়ের মতো। কালচে লাল, মেহগনি পালিশ। সবার ওপরে, আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ছিল দালানে আমার চেয়েও বড়ো মাপের একটা সাদা পাথরের পরির মূর্তি। সে ডানা গুটিয়ে মুখ একটু নীচু করে নামছে। একটা পা মাটিতে, আর এক পা এখনও শূন্যে-তোলা পায়ের আধখানা ভাঙা। একটা পা অমন ভাঙা বলেই যেন পরিটা ছিল আমাদের খুব কাছের মানুষের মতো, যার জন্যে মন খারাপ হতে পারে।

কতদিনকার জিনিস সব, হিসেব জানি না, কখনও এসবে পালিশ চড়েনি, ঘরদোর কখনও রং হতে দেখিনি, কিন্তু সব কিছু ঝকঝক তকতক করত। বাবা মা আর দিদি মিলে ঝেড়ে ঝুড়ে সব কিছু এমনি রাখতেন। বাইরের থেকে বাড়িটাকে দেখিয়ে যদি বন্ধুদের বলতুম, এই আমাদের বাড়ি, তাহলে তারা মূৰ্ছা যাবার জোগাড় হত—তোরা এই বাঘ-বাড়িতে থাকিস? তোদের বাবা রাজা নাকি রে? একথা বাবা-মার সামনে বলার জো ছিল না। বললেই বাবার হাসিমুখ আঁধার হয়ে যেত, মায়ের মুখের চেনা আলোর শিখাটা দপ করে নিবে যেত আর পরে কোনো সময়ে দিদি কোনো একটা হাতের কাজ সারতে সারতে আনমনে ধমক লাগাত, বলার আর কথা পাস না, না রে টুনি? হুঁ, রাজা? রানি! রাজকন্যে হবার খুব শখ, না রে? ভগবান জানেন, রাজকন্যে হবার শখ আমার মোটেই ছিল না। রাজকন্যেদের রাজ্যে দৈত্য এসে সব পাথর করে দিয়ে যায়। রাজকন্যেকে উঁচু জলটুঙ্গি ঘরে জন্মের মতো ঘুম পাড়িয়ে রেখে দেয় সোনার কাঠি রুপোর কাঠি মাথায় পায়ে রেখে, জাগায় শুধু নিজের আকাট-বিকট মুখখানা দেখবার জন্যে। রাজকন্যে কি হতে আছে? আমার ভাই বিনুকে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করতুম—হ্যাঁ রে বিনু, দিদি আমাকে বল কেন রে! বাবাকে রাজা বললে বাবা কেন রাগ করে রে? বিনু আমার থেকে বয়সে ছোটো হলে কী হবে, বুদ্ধিতে ছিল অনেক পাকা, বলত, তুই জানিস না টুনি! আমাদের ঠাকুরদার ঠাকুরদা এই এত বড়ো বাড়ি, বাগান, ঠাকুরদালান সব করে গেছিলেন। ঠাকুরদার ঠাকুরদাকে সবাই রাজা বলত।

তো কি? ভালো তো!

দূর বোকা, ভালো কোথায়! মদ খেত তো ঠাকুর্দাদের সবাই। কেউ কোনো কাজ করত না। খালি পায়রা ওড়াত আর বেড়ালের বিয়ে দিত আর সায়েবদের পা চাটত। তাই তো আমাদের আজকে এই দুরবস্তা।

বিনুটা সে সময়ে বাংলায় ভীষণ ভালো হবার চেষ্টা করছে। দুরবস্তা তো কোন ছার অকুতভোয়, অদূরদর্শিতা ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেও ঘন ঘন স্কুলের মাস্টারমশাইদের মূৰ্ছার কারণ হচ্ছে। যাই হোক, বিনুর কথাবার্তা থেকে আমি বোকা মেয়ে খালি এইটুকু উদ্ধার করতে পারতুম, রাজা হওয়াটা খুব খারাপ, রাজারা খুব খারাপ লোক হয়, বোধহয় আমাদের পাড়ার হাতকাটা তেঁতুলদার চেয়েও খারাপ।

একমাত্র দুটো সময়ে আবছাভাবে বুঝতে পারতুম—আমরা গরিব, আমাদের যথেষ্ট পয়সা কড়ি নেই। পুজোর সময়ে আর বেড়াতে যাবার মরশুমে। পুজোর সময়ে আমাদের ঠাকুরদালানে ডাকের সাজ পরা দুর্গাপ্রতিমা পুজো হত, সারা কলকাতার লোক ভেঙে পড়ত ঠাকুর দেখতে, কিন্তু আমাদের দুটোর বেশি তিনটে জামা হত না। মা সারা ভাদ্র-আশ্বিন, সেই পঞ্চমীর দিন পর্যন্ত হাত মেশিনে সেলাই করত। বাড়ির সবার সায়া, পাঞ্জাবি, ব্লাউজ, ফতুয়া, ফ্রক, জাঙিয়া, শার্ট, প্যান্ট। শুধু নিজেদের নয়, সেই রায়বাড়ির বাসিন্দা নানান রকমের কাকা জ্যাঠাদের পরিবারের। এই ডাঁই জামা-কাপড়ের মধ্যে থেকে একটা অপূর্ব থাক থাক দেওয়া সোনালি রঙের খড়মড়ে ফ্রক বার করে হয়তো আমাকে ডেকে বলত, টুনি দ্যাখ দিকি নি পছন্দ হয় কিনা! আমি দৌড়ে আসতুম, অমন জামা পছন্দ না হয়ে পারে? বলতুম, মা এটা অষ্টুমির দিন পরব তো? ষষ্ঠী, সপ্তমী, নবুমি, এগুলো? মা আবার সেই ডাঁইয়ের মধ্যে হাত চালিয়ে একটা সাধারণ ছিটের সাদা সিধে ফ্রক বার করে বলত—এইটা ষষ্ঠীর দিন পরবি।

আর?

আবার কী? দেখছিস না কতজনের কত ফরমাশ, এই সব সেরে আর কখনও করতে পারি? নড়া ব্যথা হয়ে গেল যে রে!

এমনিতে খুব মাতৃভক্ত হলেও, আমি নড়া-ব্যথার কথায় ভুলতুম না। কেঁদেকেটে একশা করতুম। কারণ আমার চোখের সামনে তখন ভাসছে খুড়তুতো দুই বোন পুতুল-বীথির পাঁচ দুগুণে দশটা করে ফ্রক, কোনটা ফ্রিল দেওয়া, কোনোটার কুকুরের কানের মতো কলার, কোনোটাতে সিল্কের ওপর মিকি মাউস, এক একটায় একেকরকম চমক। তাদের পাশাপাশি আমি ওই সোনালি অর্গ্যান্ডির ফ্রক পরে রোজ!

কেন তুমি এত জনের এত জামা করবে? কেন খালি আমার বিনুর আর দিদির আর তোমার আর বাবার করবে না! কেন? কেন? কেন? আমার সেই নেই আঁকড়া কান্নার মধ্যে মা সেলাইকলের ওপর গালে হাত দিয়ে চুপটি করে গম্ভীর মুখে বসে থাকত। দিদি জোর করে আমাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করত, আর ঠিক এমনই সময়টা বাবা এসে দাঁড়াতেন, কী হল? টুনি এত কাঁদছে কেন? ও কি, বুলা, টুনিকে ওমনি করে এক পা ধরে টানছিস কেন?

দ্যাখো না বাবা, টুনি মাকে কাজ করতে দিচ্ছে না, পুজোর আর ঠিক পনেরো দিন বাকি! এ সবই তো আমাদের শেষ করতে হবে, না কি।

দিদি মাকে সাহায্য করত। বোতাম বসানো, বোম-ঘর করা, হেম-সেলাই করে দেওয়া, সিল্কের জিনিস তৈরি করার সময়ে টানটান করে ধরে বসে থাকা, সব। বাবা সমস্ত শুনে গম্ভীর হয়ে যেতেন। পরদিন দুপুরবেলা গলদঘর্ম হয়ে কোথা থেকে ফিরে এসে ডাকতেন, টুনি-ই, টুনটুনি-ই, টুন-টুনটুনি-ই  আমি ছুটে যেতে হাতে একটা বাক্স ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, দ্যাখো তো টুনি, পছন্দ হয় কি না ক বাক্সের ভেতর থেকে বেরোত সাদা-ধবধবে সুইস-সিল্কের লেস-দেওয়া স্বর্গীয় ফ্রক, তার জায়গায় জায়গায় ছোট্ট ছোট্ট এমব্রয়ডারির ফুলের গোছা।

ফ্রকটা তুলে নিয়ে তার ভেতরে নাক ডুবিয়ে আমি শুধু সেই গন্ধটুকু নিতুম প্রাণ ভরে, হারিয়ে যেতুম গন্ধটার ভেতর। আমি তখন একটা খুশির পুতুল, ডুবে যাচ্ছি সুখের সাগরে। আর ঠিক সেই সময়ে মা এসে দাঁড়াত, এ কী গো? এ ফ্রক কোত্থেকে আনলে? এ যে অনেক দাম! কোত্থেকে?

নিউ মার্কেট।

ইসসস! কত নিল?

সুন্দর তো বটেই! দামটা কত সুন্দর সেটাও আমার জানা দরকার!

পঁয়তাল্লিশ টাকা।

কী বললে? পয়তাল্লিশ টাকা? এতে যে ওর তিনখানা ফ্রক হয়ে যেত গো! কোথা থেকে…

আঃ, চুপ করো না এখন।

এর পরেও আছে জুতো, মোজা, রিবন, পুজোর কদিনের নানা বায়না…, মা কথা শেষ না করে চলে যেত।

রাত্তিরে দিদি গায়ে হাত বুলোত বুলোতে বলত, টুনি, বাবার না একটা খুব দরকারি জিনিস কেনার ছিল, সেটা বাদ দিয়ে তোর অত দামি ফ্রকটা কিনে এনেছে। তুই কাল বাবাকে বলবি ফ্রকটা ফেরত দিতে, বলবি ওটা তোর পছন্দ নয়, হ্যাঁ?

কী করে মিছে কথা বলব? আমার যে জামাটা খুব পছন্দ দিদি? বাবা দরকারি জিনিসটা অন্য টাকা দিয়ে কিনুক না!

দিদি বলত, বলবি সাদা জামা আমার পছন্দ না, তুই আর জামা নিবি না!

আমি তখন কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলতুম, তোমরা সবাই বিচ্ছিরি। আমার জামাটা এত পছন্দ, তবু ওটা অপছন্দ বলতে বলছ। পুতুল, বীথি, পরি, দীপু, মঞ্জু সবাই একেক দিন একেকটা জামা পরবে। সববাই। খালি আমি…। কথা শেষ করতে পারতুম না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকতুম। কান্নার আওয়াজে মা ঘরে ঢুকে বলত, বুলা। টুনি কাঁদছে কেন রে? বকেছিস?

দ্যাখো না মা আমি নাকেকান্না চড়াবার আগেই দিদির হাত কঠোরভাবে আমার মুখ বন্ধ করে দিত, মা একটুখানি দাঁড়িয়ে থেকে বলত, বুলা, ওকে বকিস না। ছেলেমানুষ…

পুজোর কদিন ভারি মজা। বুড়ির মাথার পাকা চুল, হাওয়া মেঠাই, পাঙ্খ বরফ, লম্বা বেলুনের চ্যাঁ চোঁ, গ্যাস বেলুন। ঠাকুরদালানে ঝাড়বাতির নীচে ডাকের সাজ পরে ঠাকুর ঝলমল করছে। কোনো একজন কাকিমা ডেকে বলছে, টুনি এই সিল্কের জামা তোকে কে দিল রে?

কে আবার দেবে? আমার বাবা। বাবার গর্বে ঝকমকে মুখ আমি দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছি বন্ধুদের ভিড়ে আমার ডাকের সাজে। সাদা ধবধবে সিল্ক, তাতে সরু লেসের পাড়, চকচকে সুন্দর লজেন্স-লজেন্স গন্ধঅলা এমব্রয়ডারির নানান রঙের ফুলের গোছা। টুনি—টুনি-ই, বীথি ডাকছে বুঝি। কী সুন্দর তোর এই জুতোটা! আইরিন এর নাম। বাটার নতুন জুতো, বাবা কিনে দিয়েছে। আমার বাবা! সগর্বে বলতে বলতে আমি দৌড়ে নামব, ঠাকুরদালানে চামড়ার জুতো পরে ওঠা বারণ। তার সামনের চত্বরে হাজার মুখের মেলা, তারই মধ্যে কোনো কোনো চোখ আমার ওপর, আমার ফ্রকের ওপর আটকে যাবে, কেউ হয়তো বলে উঠবে, ফ্রকটা কী সুন্দর, দেখেছ? মিনুকে এই রকম একটা…

নতুন কস্তাপেড়ে শাড়ির আঁচল মাথায় দিয়ে, পায়ে-আলতা মা চলে যাচ্ছে ঠাকুরদালানের দিকে। হাতে পেতলের ভারী থালায় কত কী রহস্যময় পুজোর জিনিস। বাবা কোরা কাপড়ের খুঁট গায়ে জড়িয়ে ঠাকুরমশাইয়ের পেছনটিতে বসে, বিনুর হাত থেকে ফিরোজা রঙের গ্যাস বেলুনটা হুউশশশ! ধনেখালির হলুদ ডুরে শাড়ি পরে দিদি এসে দাঁড়াচ্ছে। আমার দিদি, আরও অনেক দিদি। খুড়তুতো, জাঠতুতো, পাড়াতুতো। কেউ সিল্ক, কেই অর্গ্যাণ্ডি, কেউ বেনারসিই। মহা সমারোহে সন্ধিপুজো শুরু হয়ে গেল। সেই ধুমধামের সন্ধিপুজোর ধুনো-গুগগুলের চোখ-আঁধার করা আবছা পর্দার মধ্যে থেকে ঘোমটার ভেতর মায়ের ভক্তিন, অনিন্দ্য মুখখানা মাঝে মাঝে দেখা দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে। কে যেন বলছে, বুলার শাড়িটা বড্ড খেলো। পুজোর কাজে নষ্ট হয়ে যাবে বলে পরেছে না কি রে? কে যেন তার জবাব দিচ্ছে, দূর, কোথা থেকে দামি শাড়ি পাবে! …কথাগুলো তাদের পুরো অর্থ নিয়ে আমার ছোট্ট মাথায় ঢুকছে না, কিন্তু শরীরে কেমন একটা আসোয়াস্তি, রাগে দুঃখে আস্তে আস্তে কান গরম, মাথা ফাঁকা! আমার দিদির শাড়িটা খেলো! মানে বাজে? কেন? কত সুন্দর দেখাচ্ছে যে দিদিকে! শাঁখে ফু পাড়ছে দিদি সমানে, গালগুলো গোল টোপর হয়ে ফুলে উঠছে, কপাল, নাক, থুতনি সব দুগগা ঠাকুরের মতো লাল! কোথায় চললি টুনি? কে যেন পেছন থেকে বলছে চেঁচিয়ে। ঢাক বাজছে ঢোল বাজছে তুমুল হুল্লোড়ে, কাঁসর বাজছে কাঁই না না কাঁই না না। আমি গরিব, আমরা গরিব, দিদির শাড়িটা খেলো, বিনুর হাফপ্যান্ট ঝলঝলে, বাবার খালি গায়ে কোঁচার খুঁট, এই পুজো, এই হই-চই এসব পুতুল বীথিদের জন্যে, মঞ্জু-দীপুদের জন্যে, মাধুদি, নীলমাসি, নতুন কাকিমা, গীতালিদিদের জন্যে। আমি চলে যাচ্ছি সাদা সিল্কের ফ্রকের ঠাট্টা শুনতে শুনতে আমাদের উঁচু ঘরের অসীম নিঃশব্দ পরিসরের মধ্যে আমার কান্না লুকিয়ে ফেলতে।

পুজো ফুরিয়ে গেলে আবার সব ভুলে যাই। তখন দিদির অনেক যত্নে তুলে রাখা মলাট দেওয়া বই স্কুলব্যাগ, টিফিনকৌটোয় ঘুগনি, বাবার কাছে অঙ্ক ইংরিজি, বিকেলবেলায় মণিমেলা, দিনগুলো সব একে অপরকে হারাবার জন্যে দুদ্দাড় ছুটত, আমিও তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতুম। আর সারাদিন ছোটার ক্লান্তিতে, আনন্দে রাতের কোলে, মায়ের কোলে দিদির কোলে ঢলে পড়তুম অবাধ সুন্দর শীতল-বিস্মরণের অথই দিঘিতে।

কিন্তু গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি, বড়দিনের ছুটির সময়ে গরিব-বিছেটা আবার আমায় কটাস কটাস করে কামড়াত। পুজোর সময়ে না হয় সব শরিকে মিলে মল্লিকবাড়িতে বিখ্যাত একশো বছুরে পুরোনো পুজো, কোথাও যাওয়া যাবে না। গরমের ছুটিতে না হয় বাবার আপিস, বড়োসায়েব কিছুতেই ছুটি দিতে চায় না, কিন্তু বড়োদিন? তখন যে কলকাতায় ঝুড়ি-ঝুড়ি কমলালেবু, থইথই করছে আকাশনীল। এখানে সেখানে চড়ইভাতি! স্কুলের বন্ধু মিতালি বলত, তনিমা, তোরা শীতে কোথাও যাবি না? আমরা এবার গিরিডি যাচ্ছি। উশ্রী জলপ্রপাত আছে, খু-উ-ব সুন্দর জায়গা! কেয়া বলত, আমরা যাচ্ছি হাজারিবাগ, জঙ্গল দেখব, বাগানে লুকোচুরি খেলব আর রোজ মুরগি, রোজ …। শিপ্রা বলত, দূর, হাজারিবাগ, গিরিডি ওসব তো হাতের কাছে, ট্রেনে চড়লি নেমে পড়লি। কোনো মজাই নেই। আমরা যাব, দু-রাত্তিরের পথ, দিল্লি! লালকেল্লা দেখব, কুতুবমিনার দেখব, তাজমহল দেখব চাঁদের আলোয়, বাবা বলেছে।

আমি অবাক হয়ে ভাবতুম কুতুবমিনার! কুতুবুদ্দিন আইবক তৈরি করেছিলেন, ইলতুতমিস শেষ করেন সেই কুতুবমিনার! লালকেল্লা! যার ভেতরে ময়ূর সিংহাসন, দেওয়ান-ই-খাস, দেওয়ান-ই-আম! ওসব তো পুরোনো-হয়ে যাওয়া ইতিহাস বইটার পাতায় থাকে! দেখা যায়! ওদের দেখা যায়! আর তাজমহল? কালের কপোল তলে শুভ্র সমুজ্জ্বল সেই তাজমহল? সেইটা দেখবে শিপ্রা? যে রোজ ইস্কুলে আমার পাশে গা ঘেঁষে বসে থাকে, আমার ঘুগনি খায়, আমাকে গোলাপজাম খাওয়ায়, সেই শিপ্রা?

বাবা! বাবা! এবার বড়োদিনের ছুটিতে আমরা কোথায় যাবো? বাবা অবাক হয়ে চেয়ে বলতেন—অ বুলা। দেখ তো ছোট্ট টুনটুনি পাখিটা কী যেন কিচিরমিচির করছে।

না বাবা, সত্যি বলো না, শিপ্রারা যাচ্ছে, মিতালিরা যাচ্ছে। সবাই যাচ্ছে যে!

সবাই চলে যাচ্ছে? তাহলে তো সারা কলকাতাটাই গড়ের মাঠের মতন ফাঁকা হয়ে যাবে রে! সুষ্ঠু আমরা কজন? বেড়াব, খালি বেড়াব।

উ-ঠাট্টা নয়, বলো না!

দিদি হঠাৎ তার বাটনা-বাটা হলুদ হাত ছোটো লাল গামছায় মুছতে মুছতে এসে দাঁড়িয়েছে।

বাবাকে বিরক্ত করছিস কেন রে টুনি। দেখছিস না হিসেবের কাজ করছে!

বাবাকে, মাকে ভয় পেতুম না, কিন্তু দিদিকে বিলক্ষণ।

ও দিদি, বাবাকে বলো না বড়োদিনের ছুটিতে আমাদের দিল্লি নিয়ে যাবে! লালকেল্লা দেখব, তাজমহল … বলো না!

দিদি গম্ভীরভাবে বলত, তোর কোন বন্ধু যাচ্ছে?

শিপ্রা তো! শিপ্রা যাচ্ছে!

তাই ওমনি তোকেও যেতে হবে। লোকে যা যা করবে তোকেও ঠিক তাই তাই করতে হবে? বাঃ। লোককে নকল করে যারা তাদের কী বলে জানিস?

ভয়ংকর কিছু বলে নিশ্চয়ই। আমি আর কথা বাড়াতে সাহস পাই না। কিন্তু কান্না গিলে নিতে নিতে ভাবতে থাকি—দিল্লি যাওয়াটা তো খারাপ কাজ নয়। কোনোমতেই নয়। তাহলে? রাত্তিরে ঘুমের ঘোরে মায়ের গলা শুনি,সত্যি, কাছাকাছি, খুব কাছাকাছি থেকেও যদি… দিদির গলা—

তুমি চুপ করো তো মা! এই করতেই বাবার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে … ছোটোরা তো ওরকম অবুঝপনা করবেই …! আবার ঘুমিয়ে পড়ি। ছোট্ট একটা বিছে বুকের ভেতরে নিয়ে। বিছেটা কুটুস কুটুস কামড়াবে, গর্তের মধ্যে সেঁধোবে, আর ঘুমের মধ্যে কে যেন বলতে থাকবে তোদের টাকা পয়সা নেই, তোরা কী করে … তোর বাবার টাকাপয়সা নেই, তোরা কী করে …। ট্রেনের চাকার ঘ্যানঘেনে আওয়াজের মতোই সারা রাত সেই শব্দগুচ্ছ আমার আধ-ঘুমন্ত অভিমানী মাথার মধ্যে গুমগুম করে বাজবে। আমি যাচ্ছি, আমি ট্রেনে চড়েছি ঠিকই। কিন্তু সে ট্রেন দিল্লি যায় না, হাজারিবাগ যায় না, উশ্রী যায় না, এক নিদারুণ দুঃখের দেশে, নেই-নেই গরিবের দেশে নিয়ে যায়। সেখানে বাবাদের টাকা থাকে না, দিদিদের শাড়ি খেলো হয়, খাটো শাড়ি শেমিজ পরে রাতুল-চরণে-আলতা মায়েরা অবিশ্রান্ত ঘুরে বেড়ায় কাজের পাকে।

সেবার কিন্তু বাড়িতে ভারি একটা আনন্দের ব্যাপার ঘটল। বিদেশি টিকিট মারা নীলচে নীলচে চিঠি আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝেই আসত। একদিন ওই রকম একটা চিঠি নিয়ে বাবা ঝলমলে মুখে দালানের শেষে রান্নাঘরের মুখে এসে দাঁড়ালেন, ওগো শুনছ। ফুটকুন আসছে যে!

মা তোলা উনুনে দুধ বসিয়েছিলেন, উঠে দাঁড়িয়ে আরও ঝলমলে মুখে বলল, ফুটকুন ঠাকুরপো? সত্যি!হ্যাঁ গো! সবাই। ফুটকুন। স্টেলা, ছেলেমেয়ে। মা ব্যস্ত হয়ে বলল, আমাদের এখানে? সে কি গো? মেমসায়েব … তার সাহেব মেম ছেলেমেয়ে … কোথায় থাকবে? কী খেতে দেব!

বাবা হাসিমুখে বললেন, তবে শোনো ফুটকুন কী লিখেছে

প্রিয় মেজদা, এবার দেশের এবং আমাদের বাড়ির সাবেকি পুজো দেখাতে ফ্যামিলি নিয়ে দেশে যাচ্ছি। তোমার কাছেই থাকব। অন্য কোথাও তো আমাদের জায়গা হবে না! আমাদের থাকা নিয়ে একদম উদ্বিগ্ন হবে না। আমি লাউশাকের চচ্চড়ি খাব মটর ডালের বড়া দিয়ে, লাউচিংড়ি, পটোল ভাজা, মৌরলামাছের বাটি চচ্চড়ি … যদি সম্ভব হয়, আর এরা খায়। আলুসেদ্ধ, বিন আধসেদ্ধ, কাঁচা টম্যাটো, কাঁচা গাজর। শুধু জলটা একটু ফোঁটানোর ব্যবস্থা করবে। পুজোটা কাটিয়ে আমরা একটু বাইরে বেরোব। তারপর ফিরে আসব। তিন সপ্তাহের ছুটি। মেজবউদির চরণে আমার প্রণাম দিও। বুলা কত বড়ো হল? তোমার ফুটকড়াই দুটোকে তো আমি দেখিইনি। ইতি তোমাদের ফুটকুন।

দিদিও ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। হাসিমুখে বলল, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি বাবা, তুমি ভেবো না। সাহেবকাকা আর স্টেলাকাকিমা থাকবে আমাদের ঘরে, তোমাদের ঘরে থাকবে লীলা আর সুভাষ, বৈঠকখানার তক্তপোশে বিনু আর তুমি, মেঝেতে বিছানা করে আমি মা আর টুনি।

বাবা বললেন, দেখলে তো, হয়ে গেল! বুলা না হলে কিছু হয়? বলে বাবা মধুক্ষরা দৃষ্টিতে দিদির দিকে চাইলেন।

জন্মে থেকে, বোধহয় আঁতুড়ঘর থেকে শুনছি—সাহেবকাকা, সাহেবকাকা, ফুটকুন ফুটকুন! এ বাড়ির এক ছেলে, আমাদের জ্যাঠতুতো, না খুড়তুতো, না কী কাকা, ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে নাকি আর ফেরেননি, ওখানেই মেম বিয়ে করে রয়ে গেছেন। তাঁর সাহেব ছেলে, মেম মেয়ে। তাঁর বাবা রেগেমেগে তাঁকে ত্যাজ্য করে দিয়েছেন। নিজের লোকেদের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, খালি মেজদা-মেজবউদি বলতে সাহেবকাকা অজ্ঞান। নিয়মিত চিঠি লিখে খোঁজখবর নেন, সে বোধহয় আজ সতেরো আঠারো বছর হয়ে গেল। সেই সাহেবকাকা, মেমকাকি আসছেন।

আমার আর বিনুর তো বুক গুড়গুড় করতে লেগে গেল। বাবা কোথা থেকে টাকাকড়ি জোগাড় করে বাথরুমে একটা কমোড আর একটা ছোট্ট বেসিন বসালেন। আমি আর বিনু চুপিচুপি হেসে গড়াগড়ি খাই। সাহেব মেমরা উবু হয়ে ড্যাশ বসতে পারে না। চেয়ার চাই। তাকে বলে কমোড। হিহি! হিহি! আমাদের হাসি আর ফুরোতেই চায় না। তবে হাসির মধ্যে একটু ভাবনাতেও পড়ে গেছি। সাহেব দাদা-দিদিদের সঙ্গে কথা বলব কী করে? দু ভাইবোনে মুখস্থ করতে থাকি —হোয়াট ইজ ইয়োর নেম? মাই নেম ইজ মিস টানিমা মল্লিক, মাই নেম ইজ মাস্টার বিনায়ক মল্লিক। হোয়্যার ডু ইউ লিভ? আই লিভ অ্যাট জোড়াবাগান ইন ক্যালকাটা। তারপর বাসস্থানের প্রশ্নোত্তরটা দরকার লাগবে না বুঝে দুজনে আবার হাসতে থাকি। হুইচ ক্লাস ডু ইউ রীড ইন? আই রীড ইন ক্লাস ফোর, আই রীড ইন ক্লাস থ্রি। বলতে বলতে বিনুটার ধৈর্য শেষ হয়ে যায়, সে হাত পা ছুড়ে বলে ওঠে হ্যাট, ম্যাট, ক্যাট, কুট, শুট, দ্যাট, র‍্যাট, ফাই, হাই, নাই, হাউ, কাউ, হাঁউ, মাউ, খাঁউ বলতে বলতে দুপাটি দাঁত বার করে, বগলে রবারের বল নিয়ে দে ছুট। বাবা একদিন শুনে ফেলে হেসে বাঁচেন না, বললেন, তোদের অত ইংরেজি বলতে হবে না, তোরা বাংলাতেই কথা বলবি, হড়বড় না করে একটু স্পষ্ট করে, ধীরে ধীরে বলবি, তাহলেই বুঝতে পারবে। সাহেব নাম হয়ে গেলে কী হবে! ফুটকুন কোনো দিন সাহেব ছিল না। হবেও না।

চিকচিকে সিল্কের শাড়ি পরা, ঘাড়ের কাছে নুটু-টু খোঁপা বাঁধা স্টেলাকাকিমা চারদিকে তাকিয়ে বললেন, এত উঁচু গর, একর্ম আর্কিটেকচার, বিউটিফুল স্ট্যাচুজ, এ তো ক্যাসল-এ থাকে। তুমরা এ বাড়ি পাবলিক শো-এর জন্য ওপন করে ডাও না কেনো? আমাদের ওখানে কোতো একম বাড়ি ডিউক, ব্যারনরা পাবলিকের জন্যে ওপন করে দিচ্ছেন, তাইতে মেইনটেন্সের খরচা উঠে আসে।

ফুটকুনকাকা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, স্টেলা তুমি আর এখানে তোমার ইংরিজি পাটোয়ারি বুদ্ধি নাই খেলালে। ইতিহাসের পাতা এখানে জীবন্ত হয়ে রয়েছে ডারলিং, মিউজিয়ম হয়ে নেই।

স্টেলাকাকিমা বলেন, পাটুয়ারি কী বললে? কুনও গালি নোয় তো!

বাবার দিকে তাকিয়ে একচোখ টিপে ফুটকনুকাকা বললেন, কী যে বলো! তোমাকে বাংলা গ্রামারটা এখনও শেখাতে পারলুম না। বারোয়ারি পুজো বলছিলুম না। আমাদেরটা যদিও মল্লিকবাড়ির পুজো, এখন বারোয়ারিই হয়ে গেছে। কতজন শরিক এখন মেজদা?

কথা ঘোরাতে পেরে ফুটকুনকাকা খুব খুশি। বাবা বললেন, সাঁইত্রিশ জন।

লীলাদি বলল, টুনি! হাউ কিউট . শী ইজ এ লিটল রেড রাউডিং হুড?

ওরা কেউ কিছুতেই সেদ্ধ খাবে না। সুভাষদা তার বাবার কথা শুনে বলল, ড্যাড বোরাববার একটু সেলফিশ থাকছে। আমরা সোব কাবো৷ স্টেলাকাকিমা বললেন, মেডডি, কালি জাল ডিয়ো না।

এইভাবেই বিশাল বাড়ির অলিগলি আনাচ-কানাচ লম্বা-চওড়া দালান, জমাদারের ঘোরানো সিঁড়ি, তিন চারটে ফুটবল খেলার মাঠের মতো ছাদ আর এ কোণে ও কোণে বিস্ময়বালক-বিস্ময়বালিকা এঞ্জেলের মূর্তি, দেওয়ালগিরি, প্রাচীন পট, ফোটোগ্রাফ এবং সর্বোপরি দুর্গাপুজো দেখতে দেখতে আমাদের ফুটকুন কাকাদের পরিবারের সঙ্গে ভীষণ আলাপ হয়ে গেল। আমার দিদি বুলা লীলাদির ভীষণ বন্ধু, সুভাষদার সঙ্গে বিনুর গলায় গলায় ভাব, দুজনে খালি ছাতে উঠে ঘুড়ি ওড়ায়, আর বেড়ায়। উত্তর কলকাতার সব প্রাচীন সরু গলিঘুজি, সুভাষদার দেখা চাই। আর আমি স্টেলাকাকিমার আদুরে। তিনি খালি বলেন মেডডি তুমার এই টুনি ডল আমি নিয়ে যাবো।

মা বলে, যাও না নিয়ে। যা কিচিরমিচির করে!

সত্যি কিন্তু। তোখোন আর নো করতে পারছে না।

মা হাসত। আমি ভাবতুম ভালোই তো। ফুটকুনকাকাদের কী সুন্দর বাগানঅলা বাড়ি। বাকিংহাম প্যালেস, টেমস নদী, টিউব ট্রেন। আমি যাব, লীলাদির মতো টুকটুকে ফর্সা হয়ে যাব, মেমসাহেব একেবারে, কত জামাকাপড়, কত বেড়ানো ….. ভালোই হবে বেশ।

ফুটকুনকাকা বললেন, পুজোর পর টিকিট কাটছি গোপালপুর অন সি। তোমরা স স্কুলে আমাদের সঙ্গে চলো। বাবা হাঁ হাঁ করে উঠলেন—একাদশীর দিন থেকেই অফিস ফুটকুন, কোনো উপায় নেই। মা হেসে বলল, তবেই বোঝ, তোমার দাদাকে দেখাশোনা করবার একটা লোক চাই তো! তুমি বরং বুলা, টুন্টি বিনুকে নিয়ে যাও!

লীলাদি বলল, বুলা, ব্যু মাস্ট টেক আ হলিডে।

দিদি হেসে বলল, পরের বার লীলা, পরের বার, ডোন্ট মাইন্ড! আমি জানি দিদি যাবে না। দিদি ভীষণ ঘরকুনো। অবশেষে অনেক আলোচনার পর ঠিক হল আমি আর বিনু যায়। মহানন্দে আমাদের বাক্স গুছোনো হল। আমার আর বছরের সাদা সুইস ফ্রক তো, এখনও তেমনি সুন্দর আছে। সোনালি অর্গান্ডির ফ্রকটাও। তারপর স্টেলাকাকিমা আমাদের জন্য কত রকমের জামা এনেছেন, তাদের বলে ড্রেস। বিনুকে আর চেনা যাচ্ছে না। আমিও যখন লম্বা স্ন্যাক্স পেন্টুল আর নকশা করা টপ পরে ছোটো চুলে পনিটেল বেঁধে ফিটফাট হয়ে গেলুম, দিদি আদর করে বলল, দ্যাখ তো টুনি, এবার তোকে কেমন ছবির বইয়ের খুকুর মতো দেখাচ্ছে! আমি আর বিনু মহা গর্বে উৎফুল্ল হয়ে দু পকেটে হাত গুঁজে ট্যাকসিতে উঠে পড়লুম। ভীষণ তাড়া। ওদিক থেকে মিতালি ছুটতে ছুটতে আসে, তনিমা, তনিমা কোথায় যাচ্ছিস রে?

সমুদ্র দেখতে সমুদ্র। গোপালপুর অন সি। আলো-আলো মুখে বলতে থাকি।

ট্রেন চলেছে সুইশশ করে, শব্দ নেই। মোটা গদির মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। কী সুন্দর ঠান্ডা। দু হাত জড়ো করে বুকের কাছে ধরেছি। লীলাদি অমনি গোলাপি রঙের তিনকোনা শাল আমার গায়ে জড়িয়ে দিল। তার কোনো ওজন নেই, অথচ কী সুন্দর গরম। কাচের বাইরে কিছু দেখা যায় না। খালি আমাদেরই ছবি। কামরার। মধ্যে আলো, স্টেলাকাকিমার লালচে সাদা মুখ, লীলাদির লাল ব্লাউজ, কালো স্কার্ট, সুভাষদার সোনালি চশমা, বিনুর ছটফটানি। কামরা জুড়ে ওদের অবিশ্রান্ত উত্তেজিত ইংরেজি, যার একবর্ণ বুঝতে পারছি না। বাস্কেট থেকে নাম-না-জানা সুগন্ধের খাবার, স্পেনসেস নামের হোটেলের নাম লেখা বাক্স, তারপর একটা পুরো বাক্স জুড়ে দুলতে দুলতে ভুলতে ভুলতে ঘুম। ঢুলতে ঢুলতে কখন জাগি, কখন আবার ঘুমের মধ্যে গুলিয়ে যাই, নিজেই জানি না। এমন ঘুম কখনও ঘুমোইনি। এমন দোলা কখনও দুলিনি। এমন জাগাও কখনও জাগিনি। সিঁদুরের গোলার মতো সূর্য। মাঠের পরে মাঠ, ডোবা, খাল, বিল, নদী, নালা ঢকাটক ঢাকাঢ়ক, পুল, সূর্য পানকৌড়ি, সাদা বক, কালো ফিঙে, সূর্য, মাঠগুলো দূরে সরে যায়, আবার কাছে চলে আসে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্য।

বিনু চলেছে, টুনি চলেছে, টুনি চলেছে, বিনু চলেছে। লীলাদি কোলে বইয়ের পাতায়, বিনুর হাতে লঞ্জেসছানা, মেমকাকিমা সাহেবকাকা, সুভাষদাদা, খবর পড়ে, লাফিয়ে নামে লাফিয়ে ওঠে, টুনি চলেছে অনেক দূরে, বিনু চলেছে অনেক দূর, পুরনো শহর পুরনো বাড়ি, নোংরা গলি, ধ্যাত্তেরিকা, ঘ্যাঁঙর চরকা ঘ্যাঙর,। ইদুজ্জোহা ইদ-উল-ফিতর, টুনি-বিনুর পেরথম টুর, দেখতে দেখতে বেরহামপোর।

হোটেলের গাড়ি এসেছে টুনিদের নিয়ে যেতে। মস্ত বড়ো ভ্যান গাড়ি যেতে যেতে অবশেষে তার চাকা বসে যায় বালিতে। টুনিতে বিনুতে চুপিচুপি বলাবলি করে—ঠিক যেমন ট্রেনের গদিতে ওরা ঢুকে যাচ্ছিল, তেমনি গাড়িটা বালির গদিতে ডুবে যাচ্ছে। বলতে বলতে ওরা হেসে ওঠে। ফুটকুনকাকু বলেন, হাসলি কেন রে টুনটুনিটা? কাকিমা বলেন, ছুটোরা শুদুশুদু হাসে, কোনও কেনো নাই। তারপর হঠাৎ দিগবলয়ে এক অবাক দৃশ্য, অবাক শব্দ। টুনি-বিনু বিস্ময়ে চুপ, একদম চুপ। সুভাষদা লাফিয়ে নামছে। হু হু করে ছুটে যাচ্ছে ক্যামেরা নিয়ে। কাকিমা দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ওহ ইটস ওয়ান্ডারফুল। লীলাদি বলে, ইটস বেটার দ্যান ব্রাইটন। ফুটকুনকাকা টুনি-বিনুর দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলেন, দেখতে হবে তো, কাদের দেশের সমুদ্দুর!

সেই হোটেলটাও অবাক। অবাক তার ঘরদোর, বাথরুম, বিছানা, জানলা, বারান্দা, তার লাউঞ্জঘর, খানাপিনা, পামগাছের সারি। কিন্তু সবার থেকে আশ্চর্য ওই সমুদ্দুর। তার সামনেটা যেন গঙ্গাজলের সঙ্গে সাবানের ফেনা মেশানো, আরেকটু দূরে অদ্ভুত সবুজ, যেন তার তলায় আলো জ্বলছে, তার তারপর নীল, নীল চিকচিকে ময়ূরকণ্ঠী নীল। বালির পাড়ে কত বালিয়াড়ি। মাথায় বসে সবুজ নীল, নীল সবুজ ডিঙি ভেসে যায়। ভেসে ফিরে আসে। দূরে ট্রলার। এখানে চান করো না, পাথর আছে। বিনু শুনছে না, সুভাষদার সঙ্গে কালো পাথরের ওপর বসে বসে হাসতে হাসতে ঢেউ খাচ্ছে। টুনির অত সাহস নেই। সে কাকুর ছোটো প্যান্টের কিনারা ধরে জলে নামে। হুশ করে মাথার ওপর দিয়ে ঢেউ চলে যায়, উঠতে না উঠতে আবার ঢেউ। সারাদিন, সারা বিকেল। সেই বিশাল পারাবারের তীরে টুনিরা করে খেলা। অদ্ভুত ভোলা পোশাক পরে, সাদা-হাত সাদা-পা, লীলাদি, মেম-কাকিমা, বালির ওপর রোদ পোয়ায়, জলে নেমে যায়, ভালুকের মতো রোঁয়াওলা নরম তোয়ালে জড়িয়ে উঠে আসে, মাথায় কেমন চুল-ঢাকা টুপি।

খেলতে খেলতে কাছাকাছি হলে বিনু কুলকুল করে হাসে, দ্যাখ টুনি আমরা কেমন বিলেতে এসেছি। টুনি যদি বলে, ভ্যাট! বিনু তখন আঙুল তুলে দ্যাখায়, ওই দেখ কত্ত মেম, কত্ত সায়েব। সত্যি। বালুবেলায় স্টেলাকাকিমা লীলাদির মতোই আধশোয়া হয়ে থাকে কত মেম, চোখে সানগ্লাস, ঢেউয়ের মাথায় লাল-নীল ছোটো প্যান্ট পরে নাগরদোলা খায় কত সাহেব! টুনিরা কাঁটা চামচে খায়, কোলে ন্যাপকিন পেতে। ঠিক কেয়াফুলের মতো ন্যাপকিন গেলাসে থাকে। গাল না ফুলিয়ে, শব্দ না করে খেতে শিখিয়েছে লীলাদি। বেয়ারারা সেলাম করে। তাদের মাথায় পেখমঅলা টুপি। কিন্তু যখন খুব বেশি বিলেত বিলেত লাগে তখন টুনি হাঁ করে ফুটকুনকাকার আর বিনুর তামাটে মুখের দিকে চেয়ে থাকে। রাত্তিরবেলায় লীলাদির পাশের খাটে শুয়ে সমুদ্রের গর্জন শোনে। কেমন অচেনা, অজানা, বিলেত-বিলেত। টুনি কি সত্যি-সত্যি তবে নিজের দেশ, নিজের শহর কলকাতা ছেড়ে বহুদুরে বিলেতে চলে এসেছে? ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে যায়, জানলা দিয়ে থইথই জল দেখা যায়। হুশশশ করে বালির ওপরটা ফেনায় সাদা করে দিয়ে ফিরে যাচ্ছে। ব্যালকনিতে বসে লীলাদিদের হ্যাটম্যাটক্যাটের মধ্যে বসে বসে ব্রেকফাস্ট। কিছুকিছু এখন বুঝতে পারা যায়।

ফুটকুনকাকা-কী স্টেলা, লীলা, এখন কেমন লাগছে?

কাকিমা-খুব ভালো। ফীলিং অ্যাট হোম।

কাকা—তাহলে বলো জোড়াবাগান তোমাদের ভালো লাগেনি।

কাকিমা—ডোরাবাগান ইজ অল রাইট। কিন্তু এখানে এসে শাড়ি খুলে ফেলতে পেরে, আর অত লোকের কিউরিয়সিটির বাইরে এসে আমার স্বস্তি হচ্ছে।

লীলাদি-আসলে ড্যাড, ভালো লেগেছে, কিন্তু বিদেশে অ্যাডভেঞ্চারের মতো। ফুটকুনকাকা—তাহলে বুঝে দ্যাখো, তোমাদের জন্যে সারা জীবন বিদেশে পড়ে থাকতে আমার কেমন লাগে! আর এই এক সপ্তাহের কলকাতা-মল্লিকবাড়িই বা আমার কেমন

লেগেছে!

কাকিমা—আয়্যাম রিয়ালি সরি ফর য়ু।

সুভাষদা—আমি ঠিক করেছি গ্রাজুয়েশনের পর ইন্ডিয়া টুর করব, ইয়োরোপ। নয়। ওই সব সরু সরু গলি আর বড়ো বড়ো ছাদ আমাকে দারুণ ফ্যাসিনেট করেছে। মানুষরাও। আঙ্কল, আন্টির মতো মানুষ আমি দেখিনি। সাধারণ মানুষেরাও অদ্ভুত। কিছু কিছু লোক আছে জাস্ট একটা ল্যাকির মতো, কেউ কেউ আবার দেখবে যেন গড, কুকুর-বেড়াল কিংবা ইন্যানিমেট অবজেক্টের মতো মানুষও দেখেছি।

ফুটকুনকাকা—তোমরা বিনু-টুনির সঙ্গেও কথা বলো। ওরা লেফট-আউট ফীল করবে।

লীলাদি-ওঃ, তাও তো বটে। টুনি, এখানে তুমার কেমন লাগছে?

টুনি—ভীষণ ভালো।

-বিনু তুমার?

বিনু—আমি বড়ো হয়ে বিলেত যাব। বিলেতটা তো এখানকার মতো?

সুভাষদা—সোবটা আছে না বিনু। কিছু কিছু আছে।

ফুটকুনকাকা (হেসে)—ভালো, সুভাষ আসছে ইন্ডিয়ায়, বিনু যাচ্ছে ইংল্যান্ডে। বেশ একটা ইয়ুথ একসচেঞ্জ প্রোগ্রাম করা যায়। টুনি, লীলা, তোমরা কী করবে, বলো? ওহ লীলা তো আবার…

এবার ওরা চারজনেই কোন লুকোনো কারণে ভীষণ হাসতে থাকছে। বিনু কিছু বুঝে হাসতে হাসতে ব্যালকনির রেলিং-এর দিকে ছুটে গেছে। টুনির হাতে মিলক শেক, গোঁফে ফেনা লেগে গেছে, ন্যাপকিন দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছে লীলাদি। গোপালপুরের এই বিলেত অবশেষে তার কাজুবাগান, বালিয়াড়ি, আরামের হোটেলবাড়ি এই সব নিয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। দূরে সরে যাচ্ছে নীল সমুদ্দুরের ওপর কালো কালো কাস্তের মতো ডজনে ডজনে নৌকা, রাত্তিরে কালো জলের ওপর বাতিঘরের ঘুরে ঘুরে টর্চ ফেলা, ট্রলারের আলো, ঢেউয়ের মাথায় ফসফরাসের নাচ। পড়ে থাকছে অনেক পেছনে গোপালপোর অন সি, বেরহামপোর নীল সমুদ্দুর, সবুজ সমুদ্দুর, টুনির চোখ গলছে চুপিচুপি। ফিরে চলেছে, ফিরে যেতেই হয়, নজরমিনার থেকে হাওয়া-বেলুন ওড়ানো দেখা আর হবে না, আর হবে না ঢেউয়ের চূড়ায় পৃথিবীর রানি হওয়া, জলকন্যে হওয়া, বিশাল সমুদ্দুর চলে যাচ্ছে, কাছে চলে আসছে পুরোনো শহর, পুরোনো বাড়ি, পুরোনো জীবন। ছেড়া মলাট, ফাটা বেঞ্চি, কালির দাগ। খ্যাংরা ঝাঁটা ঝুরো গোঁফ, টাকমাথা, টিউবয়েলের ঘটাং ঘটাং, হ্যাঁচচো হাঁচি, ফিচকে হাসি। মোড়-জটলা, বস্তি-ঝগড়া, সরু গলি।

টুনি-বিনুকে নিয়ে বাঘবাড়ির চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন ফুটকুনকাকা। ধরা গলায় বলছেন বাবার হাত ধরে, আসছি মেজদা, আবার কবে দেখা হবে জানি না।

লীলাদি বললে, থ্যাংস ফর দা ওয়ান্ডারফুল এক্সপিরিয়েন্স জেঠিমা, বুলা আইল মিস ইউ।

কাকিমা বললেন, মেডডি, আমাদের কানে চোলে আসুন একবার।

সুভাষদা বলল, বিনু-টুনি উই মাস্ট মীট সুন।

নেমে যাচ্ছে সবাই। এবার ট্যাক্সি। তারপর এয়ারপোর্ট হোটেল। তারপর প্লেন।

এখানে এখন জালি-ঘেরা বারান্দায় নতুন শীতের উসুম-কুসুম সকাল। এখানে এখন মোটা মোটা কত কালের পুরোনো কড়িবরগার নীচে নতুন টুনি নতুন বিনু। আর পুরোনো মা, পুরোনো দিদি, পুরনো বাবা। বিনুর হাতে ঝিনুক থলি, টুনির মাথায় বেতের টুপি। বাবার কাঁধে কোঁচার খুঁট, মা হাসছে, দিদি হাসছে চিকন হাসি, বাবা ডাকল, বিনু! বিনু। হাতের থলি খলবলাচ্ছে বিনায়ক। বাবা ডাকছে, টুনি-ই, টুনটুনিই-ই। বাবার ছড়ানো দুই হাতের মাঝখান দিয়ে ঝপপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে টুনি। বাবার খোলা বুকের সঙ্গে সেঁটে গেছে টুনির মাথা, টুনির কান। কান পেতে শুনছে পুরোনো বুকের মধ্যে গুমগুম গাগুম গুম। অবিকল সেই গভীর ডাক। নীল সমুদ্র। সবুজ সমুদ্র। ভেতরের এক অপরূপ অন্ধ আলোড়ন ঢেউ হয়ে ছুটে আসছে। ভেঙে পড়ছে। টুনির গালের বেলাভূমি তাই ফেনায় ফেনা।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *