শেষ ঘণ্টা বেজে গেল

শেষ ঘণ্টা বেজে গেল

যিনি বলেছিলেন লাবণ্য না থাকলে সৌন্দর্য পূর্ণতা পায় না, তিনি একটু কম জানতেন। কুন্তী সুন্দরী একথা ওঁর কুকুর মদনও জানে। কুন্তী যে লাবণ্যবতী তা আয়নাগুলো সোচ্চারে জানিয়ে দেয়। আর এরকম সুন্দরী লাবণ্যবতী এই শহরে অন্তত আট হাজার একুশজন আছেন অথবা থাকতে পারেন। তবে কিনা ওইসব রূপসীদের অধিকাংশই বোকা-বোকা অথবা স্বার্থপর। আর সেই স্বার্থপরতা আড়াল করার কোনও কায়দাও তাঁদের জানা নেই। কুন্তী এই ভিড় থেকে অনেক দূরের। তাঁর সৌন্দর্য আছে, লাবণ্য তো আছেই, সেইসঙ্গে জড়িয়ে আছে অহঙ্কারের হালকা। প্রলেপ। আর এটাই তাঁকে একদম আলাদা করে রেখেছে মিছিল থেকে।

অহংকার মানেই সবজান্তাপনা নয়, নাক তোলা কিন্তু আকাশে রেখে দেওয়া নয়। ওঁর অহংকার একটা হালকা পারফিউমের মতো, শরীরে জড়িয়ে থাকে কিন্তু ঠিক কোনখানে তার উৎস সেটা টের পাওয়া যায় না। সেই রসজ্ঞের দুর্ভাগ্য যিনি কুন্তীকে দ্যাখেননি।

এখন কুন্তী পঁয়তাল্লিশ। ফিল্মস্টাররা যে-বয়সটায় পৌঁছলে আর আড়াল খোঁজার চেষ্টা করেন না, সেই বয়স। যে বয়সের মহিলাকে এককালে বৃদ্ধা বলা হত, দু-দশক আগে প্রৌঢ়া বলে চিহ্নিত করা হত সেই বয়সে পৌঁছনো কুন্তীকে দেখে শ্বাস ভারী হয়, এই যা। চট করে যুবতী বলতে নিশ্চয়ই বাধবে কিন্তু প্রৌঢ়া কিংবা বৃদ্ধা নয়, বাংলার এর কোনও সঠিক শব্দ না থাকার জন্যে আপশোস হবে। কুন্তী নিজের পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি শরীরটাকে যত্নে রেখেছেন।

একটুও ধুলো নয়, আগাছা জন্মাতে দেওয়ার সুযোগই নেই, সার এবং জলের সঙ্গে যত্ন সর্বত্র ছড়ানো। আর এই কারণেই সমবয়স্কাদের সঙ্গ কুন্তী এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন।

খামোকা কোনও নারীকে ঈর্ষান্বিত করে কষ্ট দিয়ে কোনও লাভ নেই। পৃথিবীতে যেযার মতো থাকুক।

কুন্তীর ভোর হয় ভোর হওয়ার অনেক আগে। তখনও তাঁর এই আটতলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়ালে কলকাতাকে ভুতুড়ে দেখায়। সারারাত জ্বলে থাকা আলোগুলো নিভে যাওয়ার জন্যে ছটফটিয়ে মরে। সেই আলো না মরা ভোরেই কুন্তী হাঁটতে বের হন। শার্ট প্যান্ট জুতো পরে লিফট চালিয়ে নিচে নামতেই দারোয়ান সেলাম করে গেট খুলে দেয়। গুরুসদয় রোড ধরে বালিগঞ্জ সার্কুলারে পড়ে চক্কর দিয়ে ফিরে আসাটা এখন অঙ্কের মতো হয়ে গেছে। প্রথম-প্রথম সময় কমানোর চেষ্টা করতেন রোজ। এখন করেন না। দু-একবার হঠাৎ উৎসাহী কোনও পুরুষ তাঁকে বিরক্ত করলেও বৃষ্টি না হলে এইভাবে হেঁটে যাওয়া থেকে তিনি বিরত হননি।

মাটিতে রোদ নামার আগেই ফ্ল্যাটে ফিরে আসা, একটু বিশ্রাম। তারপর মিনিট পনেরো আসন। প্রতিদিন আসন করার সময় শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো জানিয়ে দেয়, আমরা ঠিক আছি, ঠিক। আছি। আর সেটা জানতে পারলেই মন ভালো হয়ে যায়। তারপর স্নান, বেশ সময় নিয়ে আরাম করে। বিন্তি লেবু-চা আর সেঁকা পাঁউরুটি এনে দেয় খবরের কাগজের সঙ্গে। সকাল আটটা পর্যন্ত কুন্তী টেলিফোন ধরেন না।

এই ফ্ল্যাটটিতে কুন্তীর সারা সময়ের সঙ্গী বিন্তি। মাত্র সতেরো বছর বয়সে বিন্তির ইউটেরাসে টিউমার হওয়ার জন্যে ওটাকে বাদ দিতে হয়েছিল। এ জীবনে আর মা হতে পারবে না বলে ও বিয়ে করেনি। সঠিকভাবে বলতে গেলে কেউ বিয়ে করতে চায়নি। এ ব্যাপারে বিন্তিরও রাখঢাক নেই। চেহারাপত্তর ভালো বলে যেসব পুরুষ বিন্তির দিকে এগোয় তাদের সে সাফ বলে দেয় তার অঙ্গহানির কথা। বিন্তির এখনও ধারণা পুরুষরা মেয়েদের কামনা করে শুধু সন্তানের বাবা হবে। বলে।

কুন্তীর কাছ থেকে এই ব্যাপারটাকে ঘেন্না করতে শিখে গিয়েছে সে। তার শিক্ষায় এমন অনেক কিছু ব্যাপার ঢুকে গিয়েছে যে যার ফলে অন্য কারও বাড়িতে কাজ করা সম্ভব নয়।

খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে এ-বাড়িতে কাজের লোক কখনই বঞ্চিত হয় না। কিন্তু কী খাওয়া দাওয়া?কুন্তী লাঞ্চ করেন অফিসে। বাড়ি থেকে ব্রেকফাস্ট খেয়ে ঠিক নটায় বেরিয়ে যান। সেই ব্রেকফাস্টে থাকে একটা ডিমের পোচ আর দুটো ফল। লাঞ্চে একটা চিকেন স্টু-ই তাঁর কাছে। আসে। ছুটির দিনে একরাশ স্যালাড, চার চামচ ভাত, দু-টুকরো মাছ অথবা মাংস এবং ফল। রাত্রে ফলটা বাদ যায়, বদলে আসে সেঁকা মাংস। এই খেয়ে-খেয়ে বিন্তিরও অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছে। কুন্তীর কাছে সে জেনেছে বাঙালিরা অপ্রয়োজনে বেশি খায়।

শরীরে যা প্রয়োজন তার বহুগুণ জিভের আরামের জন্যে ভেতরে ঠেসে দেওয়া হয়।

বিন্তি সেটা এখন ভালো করে বুঝে গেছে। এই ফ্ল্যাট বাড়ির অন্য যে-কোনও কাজের লোকের চেয়ে তার ফিগার ঢের-ঢের ভালো। কুন্তী বাড়িতে যখন থাকেন না তখন তার সময় চমৎকার কাটে টিভির সামনে বসে। কেবলে সিনেমা তো আছেই, বিবিসি, স্টার টিভির খুঁটিনাটি এখন তার মুখস্থ। আর এসব কারণেই ডায়মন্ডহারবারের গ্রামের বাড়িতে যেতে হলে দিনে-দিনে ফিরে আসে সে।

এই হল কুন্তীর সংসার। সারাদিন একরকম, সন্ধের পর একটু আলাদা। অন্তত বিন্তির চোখে তো তাই। বাড়ি ফিরে স্নান সেরে এক কাপ লেবু-চা আর চিকেন স্যান্ডুইচ খেয়ে কুন্তী কোনওদিন। টিভির সামনে বসলেন অথবা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটালেন। বন্ধুরা কেউ এলে টেবিল সাজানো হয়। সেই রাতে শুয়ে পড়ে বিন্তি। দিদিমণির আড্ডা ভাঙতে কখনও বারোটা অথবা কাছাকাছি। কেউ না এলে ঠিক দু-গ্লাস মদ্যপান করেন কুন্তী। বিন্তির প্রথম-প্রথম পছন্দ হত না, এখন আর কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। এক দুপুরে একলা বাড়িতে সে জিভে ঠেকিয়ে অবাক হয়েছিল। এমন বিশ্রী গন্ধওয়ালা জিনিস মানুষ কী করে আনন্দের সঙ্গে খায়।

আজ সকাল থেকেই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। দিনটা ছুটির বলেই মনে আলস্য এল। ব্যালকনির বেতের চেয়ারে বসে খবরের কাগজ নামিয়ে রেখে চোখ থেকে চশমা সরালেন কুন্তী। প্লাস ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ! সামনের আকাশে ময়লাটে মেঘের ভিড়। হঠাৎই নিজেকে নিঃসঙ্গ বলে মনে হতে লাগল তাঁর।

পৃথিবীতে একটা কাছের মানুষ নেই যাকে বলা যায়, দ্যাখো তো আমার পিঠে কী হয়েছে?

বিন্তি আছে অবশ্য। কিন্তু এই একাকিত্ব বিন্তিকে দিয়ে পূর্ণ হবে না কোনওদিন।

একজন পূর্ণ পুরুষের জন্যে প্রচণ্ড টান অনুভব করলেন তিনি।

বাইশ বছর বয়সে মৃণালের সঙ্গে ভালবাসা এবং বিয়ে। ভাবপ্রবণতার বেলুনে সমস্ত পৃথিবী তখন আড়ালে। মা-বাবা বাধা দেননি। বস্তুত ওঁরা কখনই কুন্তীর কোনও কাজে বাধা দেননি। কিন্তু। তিনবছর যেতে-না-যেতেই মৃণালের চরিত্রের অনেক অসংগতি তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। ওর কোনও সমস্যা নিয়ে জানতে চাইলে বিরক্ত হয়ে বলত, এসব তুমি বুঝবে না। মুখে না বললেও বুঝিয়ে দিত মহিলাদের সম্পর্কে তার ধারণা কী! তখন চাকরি করতেন না কুন্তী। আর না চাইলে টাকা দিত না মৃণাল। টাকার জন্যে হাত পাততে পারতেন না কুন্তী! মৃণালের কিছু বন্ধুবান্ধব এমন বোকা-বোকা কথা বলত যে প্রকাশ্যেই তাদের সমালোচনা করতেন তিনি।

এইসব ব্যবধান বাড়তে-বাড়তে একসময় বাক্যালাপ বন্ধ হল। তারপর আলাদা হয়ে যাওয়া। শেষপর্যন্ত ডিভোর্স। এখন এতদিন বাদে মৃণাল সম্পর্কে তাঁর কোনও স্পষ্ট ভাবনা নেই। কিন্তু তাঁর জীবনের প্রথম পুরুষ। শরীরের আনন্দ নিয়ে কথা উঠলেই তার মৃণালের কথা মনে পড়ে। তিরিশে পৌঁছে রঙ্গন এল। এতদিনে জীবন পালটে গিয়েছে অনেক। ছেলেবন্ধু ছিল কয়েকজন কিন্তু রঙ্গন এসে সবাইকে আড়াল করে দিল। রঙ্গন কম কথা বলে এবং মেয়েদের স্বাধীনতায়। হাত দেয় না। সে ব্যবসায়ী। বিদেশ থেকে মুদ্রা আসায় সরকারের প্রিয় পাত্র। সকালে ইচ্ছে হলে দুপুরেই দিল্লি হয়ে সিমলা চলে যেতে পারে।

একটু আনপ্রেডিকটেবল, কিন্তু রঙ্গনকে স্বামী হিসেবে পেয়ে ভালো লেগেছিল কুন্তীর।

মদ্যপানের অভ্যেসটা রঙ্গনের কাছ থেকে পাওয়া। ফাইভ স্টারের মেনুকার্ড যার মুখস্থ সে এক রবিবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল বনগাঁর দিকে। ঝাঁ-ঝাঁ রোদে গ্রামের একটা মেঠো দোকানে ভাত ডাল তরকারি খেলোশালপাতায়, কুন্তীকেও খেতে হয়েছিল বলা ঠিক হবে না, কুন্তী নিজেই খেয়েছিল। রঙ্গন বলেছিল, ইচ্ছে না হলে খেয়ো না, গাড়িতে পার্কস্ট্রিটের খাবার আছে। রঙ্গনকে রোমান্টিক বলা যায় যদি কেউ তার সঙ্গে জীবন-যাপন করে। কিন্তু ক্লাবে, পার্টিতে সে গম্ভীর, উদাসী। বাড়িতে গেস্ট এলে কিছুক্ষণ বাদে হাই তুলে ঘুমোতে চলে যায়। আবার সকালে উঠেই পাশপোর্ট নিয়ে ভিসা করতে ছুটে যায় নায়াগ্রার রামধনু দেখবে বলে। রঙ্গন তাঁকে অনেক। দিয়েছে। এই বিত্ত, কর্তৃত্ব বিশাল ব্যাবসা এবং জয় তাঁকে। তেরো বছরের জয়তী শান্তিনিকেতনে পড়ছে। মায়ের চেহারা আর বাপের স্বভাব পেয়েছে।

জয়তীর যখন চার আর কুন্তীর ছত্রিশ তখন আটত্রিশ বছরের রঙ্গন এক সকালবেলায় ঘুরে আসছি। বলে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং আর ফেরেনি। যাওয়ার সময় ও পার্সটাও নিয়ে যায়নি। সাত লক্ষ টাকা যে আয়কর দেয় তার পরনে ছিল পাজামা এবং পাঞ্জাবি। যত রকমের খোঁজখবর সম্ভব সব বিফলে গিয়েছে, পুলিশ শেষপর্যন্ত হার মেনেছে, মানুষটা উধাও তো উধাও। কেন রঙ্গন এভাবে জানিয়ে চলে গেল তার উত্তর আজও পাননি কুন্তী।

সত্যি কথাটা হল, রঙ্গনের অভাব তাঁকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করে না এখন। ব্যাপারটা মনে এলে জ্বালা আসে। কতখানি স্বার্থপর হলে মানুষ এইভাবে চলে যেতে পারে। তাঁকে তো বটেই, মেয়েকেও এক ফোঁটা গুরুত্ব দিতে চায়নি রঙ্গন। টেবিল, চেয়ার, খাট, ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স, শেয়ার, ইউনিট ট্রাস্ট অথবা ব্যাবসার মতো তাঁদেরও ফেলে যেতে পেরেছিল অনায়াসে। সবচেয়ে আপশোস হয় যখন মনে পড়ে চলে যাওয়ার ঠিক আগের রাত্রে চূড়ান্ত মদ্যপান করে শরীরের। আনন্দ খুঁজতে চেয়েছিল রঙ্গন। ও-ব্যাপারে সে কখনই দক্ষ ছিল না, সেই রাত্রেও আলাদা কিছু হয়নি। আর পরদিন সকালে চা খেয়ে কাগজ পড়ে লোকটা চলে গেল। কেউ-কেউ সন্দেহ। করেছিল এর পেছনে কোনও অপরাধচক্র আছে, কিন্তু সেটা প্রমাণিত হয়নি, কেউ বলেছে রঙ্গন সন্ন্যাসী হয়ে গেছে, সেটাও এক ধরনের সান্ত্বনা।

কিন্তু রঙ্গনের কথা মনে এলে অপমানবোধ আসে। কুন্তী এটা এড়াতে পারেন না। নটা বছর দেখতে-দেখতে কেটে গেল। মাঝে-মাঝে একাকিত্ব প্রবল হলে বাঁধ ভাঙার বাসনা হয়। রঙ্গনের উধাও হওয়ার পরবর্তী পর্যায় নিয়ে আইনজ্ঞরা তাঁকে সুপরামর্শ দিয়েছেন। সেগুলো ঠিকঠাক মানতে গিয়ে তাঁকে সংযত থাকতেই হয়েছে।

কুন্তী উঠলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল দিন গড়ালে মেঘের দুপুর এলে যন্ত্রণা তীব্রতর হবে।

এই সময় কেউ যদি তাঁকে সঙ্গ দিত। কাকে বলা যায়। চোখের সামনে পরিচিত পুরুষদের মুখ ভাসল। এদের বেশিরভাগই বিবাহিত।

বিবাহিত অথচ কুন্তী সম্পর্কে আগ্রহী। এদের কেউ-কেউ বিদ্বান, স্মার্ট, অর্থবান অথচ কুন্তীর সামনে এলেই মদনের মতো লেজ নাড়তে থাকে। বোকা-বোকা স্বভাবের পুরুষদের তিনি দু চক্ষে দেখতে পারেন না। আবার কেউ-কেউ অতিরিক্ত স্মার্ট। মেয়েদের সঙ্গ পাওয়ার জন্যে শরীরে মেদ জমতে দেন না। এই ওপরচালাক লোকগুলো কাছে এলেই তাঁর অ্যালার্জি হয়। ওদের ভেতরের ফাঁপা বেলুনটাতে পিন ফুটিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। তৃতীয় দলের পুরুষরা আসেন গম্ভীর মুখে। হু-হাঁ ছাড়া শব্দ বাড়ান না। যেন এই পৃথিবীর সবকিছু তাঁরা জেনে বসে আছেন। এদের দেখলেই কেষ্ট বলে মনে হয়। আর নয় বছর ধরে এইসব থকথকে কাদার মধ্যে পাঁকাল মাছ হয়ে বেঁচে থেকে তিনি যে বর্ম বানিয়ে ফেলেছেন তা হুট করে আজ খুলে ফেলবেন কী করে?

টেলিফোনটা বাজল। বিন্তি গিয়ে রিসিভার তুলল। কথাবার্তা বলে এসে জানাল, নাম বলল অণিমা, তোমার বন্ধু ছিল নাকি!

অণিমা! কে অণিমা?হঠাৎ এক তরুণীর মুখ মনে এল। ফরসা ঝকঝকে, চোখে চশমা।

ওঁদের ক্লাসের প্রথম হওয়া মেয়ে। অণিমা সেন। সেনই তো। সে এতদিন পর হঠাৎ?

কুন্তী আবিষ্কার করলেন তাঁর খুব ভালো লাগছে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলে বললেন, কুন্তী বলছি। আমি ঠিক ইচ্ছে করেই থামলেন তিনি। ওপাশের কণ্ঠস্বর পরিষ্কার, কুন্তী, আমি অণিমা, আমরা একসঙ্গে পড়তাম প্রেসিডেন্সিতে। অনেককাল হয়ে গেল অবশ্য, চিনতে পারা যাচ্ছে কি?

ও বাব্বা! তুমি? কুন্তী এবার বোঝালেন তিনি চিনেছেন, কী খবর বলো? হঠাৎ?

তেমন কিছু নয়। চৈতিকে মনে আছে? আমাদের সঙ্গে পড়ত, ইন্টার কলেজ ড্রামায় বেস্ট অ্যাকট্রেস হয়েছিল, হ্যাঁ, চৈতি বলেছিল তুমি নাকি এখন বিশাল ব্যাবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের কর্তী। ক্ষমতায় থাকলে চাও বা না চাও লোকে তোমার নাম জানবেই। আমার এক দেওর সাংবাদিক। তাকে বলতে সে তোমার অফিস আর বাড়ির ফোন নম্বর এনে দিল।

ভদ্রলোকের নাম?

সর্বজিত সেন?

কুন্তীর মনে পড়ল। খুব ঝকঝকে চেহারার মধ্য তিরিশের এক সাংবাদিক। অর্থনীতি নিয়ে ভালো কাজ করছেন। কয়েকবার লোকটাকে দেখেছে সে। দেখা অবধি! সাংবাদিকদের নিয়ে তাঁর কোনওকালে বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। সেই লোকটা অণিমার দেওর!

তোমার দেওর দেখছি দারুণ করিৎকর্মা।

তা বলতে পারো। ওয়াশিংটনে একটা বড় কাজের অফার পেয়েছে অথচ বলছে যাবে না। যাহোক তুমি বিরক্ত হচ্ছ না তো?

বিন্দুমাত্র না। কী করছ এখন?

যা কপালে ছিল। ছাত্রী পড়াই আর সংসার চালাই। তোমার স্বামীর…।

ওটা এখন ইতিহাস। ঝটপট থামিয়ে দিলেন কুন্তী।

ও! আসলে আমি একটা মেয়েকে নিয়ে সমস্যায় পড়েছি।

মেয়ে?

হ্যাঁ। বছর তিরিশ বয়স হবে। বেশি পড়াশুনাও নেই। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য ওর চাকরি দরকার। এখনই। কলেজে পড়ালে চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। তোমাকে যদি অনুরোধ করি তাহলে কি অন্যায় হবে?

সঙ্গে-সঙ্গে শিথিল হয়ে গেলেন কুন্তী।

প্রয়োজন ছাড়া যে এই টেলিফোন নয় জানার সঙ্গে-সঙ্গে উত্তেজনা শেষ হয়ে গেল। তিনি নিচু গলায় বললেন, আমার না বলা উচিত। চাকরি করার যোগ্যতা মেয়েটির আছে কিনা তাও যাচাই করার প্রয়োজন এই মুহূর্তে আমার নেই। কিন্তু তুমি বলেই সেটা বলতে বাধছে।

অনেক ধন্যবাদ ভাই। ওকে কবে পাঠাব?

ঝুলিয়ে রেখে লাভ নেই। আজকের এই অলস দিনটার কিছু সময় না হয় অতীতের দায় মেটাতেই কাটুক। কুন্তী বললেন, আজই দুপুরে। বলে রিসিভার রেখে দিলেন। তাঁর মনমেজাজ আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।

দশটা নাগাদ দ্বিতীয় টেলিফোন এল, কেমন আছ?

কুন্তী কথা না বলে রিসিভার কানে ঠেকিয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলেন। ওপাশে কিছুক্ষণ অপেক্ষা, তারপর দ্বিতীয় প্রশ্ন, কথা বলতে ইচ্ছে না করলে রিসিভার নামিয়ে রাখতে পারো!

আমি ভাবতে চেষ্টা করছিলাম অজস্র কণ্ঠস্বরের থেকে তোমারটা কত আলাদা! হ্যাঁ, বলো।

ভালো নেই। একদম ভালো নেই।

কেন?

উত্তরটা বোকার মতো শোনাবে। তোমার বউ কোথায়?

পাশের ঘরে।

ওকে নিয়ে চলে এসো এখানে। রিসিভার নামিয়ে রাখলেন কুন্তী। এবং তারপরেই আবার ডায়াল করলেন। বেছে-বেছে আরও তিনজন পুরুষকে আমন্ত্রণ জানালেন সস্ত্রীক তার ফ্ল্যাটে আসতে। শেষপর্যন্ত আয়নার সামনে বসে বিন্তিকে ডাকলেন, আজ একটু বেহিসাবি হব। তুমি বাজারে যাও। ইলিশ মাছ নিয়ে এসো।

ইলিশ বিন্তির চোখ বড় হল। এতদিনে সে জেনেছ ইলিশ শরীরের কিছুই উপকার করে না, তুমি ইলিশ খাবে?

হ্যাঁ! একদিন না হয় খেলাম। অনেকটা আনবে। আরও আটজন খাবে। মাথাপিছু চার-পাঁচ পিস। পেটি দেখে নেবে। আর খিচুড়ি বানাবে।

খিচুড়ি? হাঁ হয়ে গেল বিন্তি এবং পরক্ষণেই বলল, আমি খাব না।

কেন?

এমনি।

টাকা দেওয়াই থাকে। বিন্তি চলে গেলে নিজেকে সাজালেন কুন্তী। সাজতে বসলে তাঁর মন ভালো হয়ে যায়, আজও হল। বিন্তির কথা ভেবে তিনি হেসে ফেললেন। তাঁর এই বেহিসাবি খাওয়া মেয়েটা মানতে পারছে না।

একদিন তো!

সাজ শেষ হয়ে গেলে সেলারে গেলেন তিনি।

প্রচুর বিদেশি মদ থরেথরে সাজানো। ভদকাও আছে। দুপুরে ভদকা এবং বিয়ার।

বিয়ারের বোতল আরও কয়েকটা আনানো উচিত। টাকা বের করে বাইরের ঘরে গিয়ে। আবদুলকে হুকুমটা দিয়ে দিলেন। আবদুল রঙ্গনের আমলের কুক কাম বেয়ারা। এখন বৃদ্ধ কিন্তু মোগলাই রান্নার মাস্টার। কিন্তু এ-বাড়িতে আজকাল ওকে রাঁধতে হয় না।

বারোটা নাগাদ অতিথিরা এসে গেল।

জোড়ায়-জোড়ায়। দুপুর বলেই সবাই হালকা পোশাকে এসেছে। মহিলারা ফ্ল্যাটে ঢুকেই কুন্তীর প্রশংসায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সুন্দর, সুন্দর, সুন্দর। কুন্তী যেন দু-হাতে ফুল কুড়িয়ে নিচ্ছিলেন। অথচ মুখে নির্লিপ্তর হাসি ওঁদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছিল। ট্রলিতে ভদকা, বরফ জল এবং বোতলে বিয়ার। আবদুল পরিবেশন করে যাচ্ছে। বিন্তি ফিরে এসেছে দু-জোড়া ইলিশ নিয়ে। বাইরে টিপটিপিয়ে বৃষ্টি চলছে। এই সময় অমিত জানতে চাইল, এই হঠাৎ আমন্ত্রণের কারণ জানা যাক!

সোফায় বসা কুন্তীর দু-হাতে গ্লাস, মুখ ওপরে তোলা, ঠোঁটে ঈষৎ কুঞ্চন, এখন নয়, আরও পরে। তোমাদের ফিরে যাওয়ার আগে।

এসব আড্ডা জমে গেলে হোস্ট এবং গেস্টের আলাদা কোনও ভূমিকা থাকে না। কিছুক্ষণ পরেই কুন্তী আলাদা হয়ে যেতে পারলেন।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তিনি অতিথিদের দেখছিলেন। এই চারজন পুরুষই মোটামুটি সুন্দরী স্ত্রীর স্বামী। কিন্তু এঁরা এমন অনেক ইঙ্গিত দিয়েছেন যাতে স্পষ্ট তাঁর সম্পর্কে আগ্রহ অসীম। সঙ্গে স্ত্রী নিয়ে এসে এরা পোষমানা শেয়ালের মতো আচরণ করছে। অমিতকে তিনি স্বচ্ছন্দে বলে দিতে পারতেন, আজ সকাল থেকে নিজেকে খুব একা লাগছিল। পেনফুল একাকিত্ব। মনে হচ্ছিল একজন পুরুষমানুষকে সঙ্গী হিসেবে দরকার।

তোমাদের যে-কোনও একজনকে একা ডাকলেই সেটা পেয়ে যেতাম। কিন্তু সেই পাওয়ায় চুরি চুরি অনুভূতি। তোমরা মদ্যপান করো।

নেশা হোক। তারপর তোমাদের স্ত্রীদের সামনে যদি উত্তরটা ছুঁড়ে দিই তখন দেখতে হবে কী আচরণ করো। ওই দেখার জন্যেই এই আমন্ত্রণ।

দুপুর যখন মাঝপথে, বিয়ার এবং ভদকা যখন অনেকটাই পেটে তখন আবদুল এসে জানাল একটি মেয়ে দেখা করতে এসেছে। আবদুলের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে কুন্তী তাতে অণিমার নাম পড়লেন। তাড়িয়ে দিতে গিয়েও পারলেন না। অতিথিদের কাছ থেকে কয়েক মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে তিনি ড্রইংরুমে চলে গেলেন।

একটি কালো রোগা মেয়ে ছাপা শাড়িতে শরীর জড়িয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মেয়েটার মুখে একটা মিষ্টি ছাপ ছাড়া হাতে নিঃসঙ্গ শাঁখা দেখতে পাওয়া গেল। কুন্তীকে দেখা মানে যে দেবীদর্শনের কাছাকাছি তা ওর চাহনিতে বোঝা যাচ্ছিল। কুন্তী বললেন, ইয়েস!

দিদি টেলিফোনে–!

হুঁ কতদূর পড়েছ?

স্কুল ফাইনাল।

কী চাকরি করবে? যে-কোনও চাকরি করতে গেলে যে যোগ্যতা দরকার তা তোমার আছে?

মেয়েটি মাথা নিচু করল।

টাইপ জানো? শর্টহ্যান্ড? তাহলে কী জানো?

মেয়েটি চোখ তুলল, লিখতে পারি!

লিখতে পারো? কী লেখা?

গল্প।

মাই গড! তুমি গল্প লেখোনাকি? কুন্তী বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

হ্যাঁ।

কাগজে ছাপা হয়?

মাথা নাড়ল মেয়েটি, না, ওরা ফেরত দেয়।

কেন?

জানি না। কেউ বলে না তো কী হয়েছে। অবশ্য দিদি বলেছেন।

কী বলেছেন?

আমি নাকি পুরোনো দিনের মতো গল্প লিখি। আসলে আমার বাবার দোকানে যেসব বই ছিল তাই পড়ে শিখেছি তো। তবে এখন নতুন দিনের মতো লিখব।

তোমার বাবার কীসের দোকান? বই-এর?

না, মুদির। ছোট দোকান।

কোথায়?

বনগাঁয়।

আচ্ছা! তোমার শ্বশুরবাড়ি কোথায়?

মাথা নিচু করল মেয়েটি, সোনারপুরে।

সেখানেই থাকো?

না, বনগাঁয়।

কেন?

চুপ করে রইল মেয়েটি!

কুন্তী বিরক্ত হল, দ্যাখো, তোমাকে দেওয়ার মতো কোনও চাকরি হাতে নেই। তুমি তোমার দিদিকে একথা বলবে।

আমি জানতাম। বিড়বিড় করল মেয়েটি।

তুমি জানতে একথা বলব?

হ্যাঁ, বড়লোকদের চরিত্র এমন হয়। গল্পে পড়েছি। লিখেছিও। কিন্তু বড়মহিলারা কীরকম হন তা জানতাম না। আপনি রাগ করবেন না, আমি আসি।

দাঁড়াও। তোমার তো সাহস কম নয়। অণিমার সঙ্গে কি করে আলাপ?

আমাদের গ্রামের এক মাসি ওঁর বাড়িতে কাজ করে। আমাদের গ্রামের সবাই জানে যে আমি লিখি। মাসি গিয়ে দিদিকে আমার কথা বলেছিল–

মেয়েটির গলার স্বরে চমৎকার দৃঢ়তা লক্ষ করলেন কুন্তী। জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি বনগাঁ থেকে এখানে আসছ আজ?

হ্যাঁ। দিদির বাড়িতে গিয়েছিলাম স্টেশনে নেমে।

কখন বেরিয়েছ বাড়ি থেকে?

ভোর পাঁচটায়।

কিছু খাওয়া হয়েছে?

না।

বসো। হুকুম করলেন কুন্তী। মেয়েটি সঙ্কোচ নিয়ে বসল।

পছন্দ করে বিয়ে করেছিলে?

অ্যাঁ? না, না। পছন্দ করার মতো কোনও ছেলে আমাদের গ্রামে ছিল না। বাবা সম্বন্ধ ঠিক করতেন, কিন্তু মেয়েটি থামল, আমি আমাকে নিয়েও একটা গল্প লিখেছি, জানেন?

সেটা কি ছাপা হয়েছে?

না। আমার হাতের লেখা ভালো। আপনি পড়বেন? না, আপনার সময়ই হবে না।

তোমার কাছে গল্পটা আছে?

মেয়েটি ব্যাগ খুলে ভাঁজকরা কাগজগুলি দিল। প্রথম পাতায় লেখা, শবরীর প্রতিক্ষা, লেখিকা–নমিতা দেবী।

কুন্তী বিন্তিকে ডাকলেন। মেয়েটিকে কিছু খাবার দিতে বললেন। কিন্তু মেয়েটি মাথা নাড়ল, না দিদি, আমার হাতে সময় নেই। এমনিতেই বৃষ্টি পড়ছে, কখন বাড়ি পৌঁছতে পারব জানি না। আপনি এই ডাকটিকিট লাগানো খামটা রাখুন। পড়া হয়ে গেলে এই খামে লেখাটা ঢুকিয়ে পোস্টবক্সে ফেলে দেবেন, হ্যাঁ?

কুন্তী কিছু বলতে পারলেন না। মেয়েটি একটা স্ট্যাম্প লাগানো খাম টেবিলে রেখে তাঁকে নমস্কার করে যাওয়ার সময় বলল, দিদি, একটা কথা বলব?

বলো!

আপনি না খুব সুন্দর। সিনেমার মতো সুন্দর। সিনেমায় নামেননি কেন?

নামলে উঠতে পারতাম না, তাই।

মানে?

তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে বললে না?

মেয়েটি বুঝল। বুঝে চলে গেল।

হয়তো ওই লেখা, ওই কয়েকপাতার গল্প পড়তেন না কুন্তী, কিন্তু গোল বাধাল অমিত। ঘরে ফেরা মাত্র বলে বসল, কী ব্যাপার ভাই? আমাদের ঘরে বসিয়ে বাইরে কাকে সময় দিচ্ছিলে? মূল্যবান মানুষটি কে?

কুন্তী না বললে সেটাই তাঁর চরিত্রের সঙ্গে মানাত। কিন্তু বললেন, তিনি এক লেখিকা।

লেখিকা?কী নাম? অমিতের স্ত্রী জয়ী জিজ্ঞাসা করল।

নমিতা দেবী।

ইন্দ্রজিৎ অবাক, নমিতা দেবী?নাম শুনিনি তো! আমি অবশ্য বাংলা সাহিত্যের খবর ঠিক রাখি না। তবে আশাপূর্ণা দেবী, মহাশ্বেতা দেবীর নাম শুনেছি।

শোভন বলল, ছেলেবেলায় মায়ের কাছে পত্রিকা দেখতাম। তখন দেবীদের লেখা ছাপা হত। এই নমিতা দেবীর নাম তখন দেখেছি বলে মনে হচ্ছে ইন্দ্রজিৎ। কোথায় তিনি? চলে গেছেন। যাওয়ার আগে এই গল্প দিয়ে গেছেন। কুন্তী বললেন।

সঙ্গে-সঙ্গে হইচই পড়ে গেল। হয়তো ভদকা কিংবা বিয়ারের প্রভাব অথবা আলোচনার নতুন কোনও বিষয় না থাকায় সবাই গল্প শুনতে চাইল। আর কুন্তীকেই সেটা পড়তে হবে।

এও এক মজা। কুন্তীর মনে হল স্কুলের স্পোর্টসে গো অ্যাজ ইউ লাইকের মতন ব্যাপারটা। সারাজীবন যা করব না তা একদিন টুক করে করে ফেলা।

সস্তায় কেনা কাগজ। লাইন টানা। হাতের লেখা গোটা-গোটা। বোঝাই যায় যত্ন করে লেখা হয়েছে। আটটি মানুষ কুন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে। কুন্তী পড়া শুরু করলেন।

আমার নাম শকুন্তলা। যে যুগের নয়, এ-যুগের। এরকম নাম কেন যে আমার রাখা হয়েছিল তা বাবা-মাকে প্রশ্ন করেও জানতে পারিনি।

এক মিনিট। ইন্দ্রজিৎ বাধা দিল।

ভদ্রমহিলার নাম নমিতা না?

জয়ী বিরক্ত হল, আঃ, লেখিকা কি নিজের নামে নায়িকার নাম লিখবে? দ্যাখো, পড়ার সময় কেউ কথা বলবে না।

কুন্তী এগিয়ে দিলেন কাগজগুলো, জয়ী তুমিই পড়ো।

জয়ী খুশি হল। কুন্তী যেন রক্ষা পেলেন।

আমরা খুব গরিব। আমার বাবা একটা সাধারণ দোকান চালান গ্রামে। দিনে কীরকম বিক্রি হয়। তা জানি না। আমি কোনওমতে থার্ড ডিভিশনে স্কুল ফাইনাল পাশ করে বাড়িতে বসে ছিলাম। তবে ঠিক বসে থাকা বললে যা বোঝায় তা নয়। আমি রোজ চারপাতা লিখি। এটা আমার অনেকদিনের অভ্যেস।

আমি যে গল্প লিখি তা অনেকেই জানে। এমনকী আমাদের সবচেয়ে বুড়ি মানদাঠাকুমাও সেদিন বলেছিল তার গল্প আমাকে লিখতে হবে কিন্তু তার আগে বুড়ি মরে গেল। আমি দেখতে ভালো নই। রোগা, কালো, স্বাস্থ্যটাস্থ নেই তবে হাইট আছে। পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি।

আমি দেওয়ালে দাগ দিয়ে রেখেছি। সংসারের কাজ পারি, তবে করতে ইচ্ছে করে না। বাবার দোকানে মাসিক পত্রিকাও বিক্রি হয়। কোনও মাসে সেটা না বিকোলে আমি নিয়ে আসি। গোগ্রাসে পড়ি আর তার ঠিকানায় লেখা পাঠাই। এসব করতেও পয়সা লাগে। বাবা দিতে চায় না বেশিরভাগ সময়।

অমিত হাই তুলল, একটু বোরিং মনে হচ্ছে।

জয়ী বলল, শাট-আপ! কেমন সরল-সরল কথাবার্তা–চুপ করে থাকো।

আমার বোঝা বাবা নামাতে চাইল। পাত্রপক্ষ আসে। জিজ্ঞাসা করে এটা পারি, ওটা পারি কি না! আমি গান জানি না, সেলাই জানি না। রান্না একটু-আধটু জানি আর জানি লিখতে।

অনুরূপা দেবী না নিরূপমা দেবীর মতো শকুন্তলা দেবীরও একদিন নাম হবে বলে আমার বিশ্বাস। আর লিখতে জানি শুনলেই পাত্রপক্ষের মুখ কেমন হয়ে যেত। তাঁরা অদ্ভুত চোখে তাকাতেন। ফিরে গিয়ে আর সাড়া দিতেন না। শেষপর্যন্ত বাবা আমাকে শাসালেন, কাউকে বলা চলবে না আমি লিখি। যেন লিখতে পারাটা পাপ। বাঙালি মেয়ের যেমন অনেক কিছু করা পাপ। তেমনি লেখাও। আর এই করতে-করতে সোনারপুরের হরিপদ বিশ্বাসের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল। ছেলের বউদি এসেছিল দেখতে। বিধবা বউদি। বয়স পঁয়তাল্লিশ হবে শুনে মা বিশ্বাস। করতে চায়নি। লম্বাচওড়া, শরীর একটুও টসকায়নি। আমার মা ওঁর চেয়ে বয়সে ছোট, কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছিল না। ওঁর স্বামী মারা গেছে পনেরো বছর বয়সে। যোলোতে শাশুড়ির ছেলে হয়।

এক বছরের ছেলেকে বিধবা বউমার কাছে রেখে তাঁরা গঙ্গাসাগর করতে গিয়েছিলেন আর ফেরেননি। নৌকাডুবি হয়েছিল। সেই থেকে ইনি এক বছরের দেওরকে মানুষ করেছেন। বিয়ে থা করেননি। দেওরই ধ্যানজ্ঞান। বিষয়-সম্পত্তি আছে। দেওরকে একটা স্টেশনারি দোকান করে দিয়েছেন।

আমাকে খুঁটিয়ে দেখলেন। সংসারের কাজ পারি কি না জিজ্ঞাসা করলেন। গান জানি না সেলাই, নাচ জানি না আঁকা, এসব প্রশ্ন না করে ফস করে জিজ্ঞাসা করলেন আমার ভেতরের জামার সাইজ কি! ভয়ে-ভয়ে বত্রিশ বলতে তিনি মাকে বললেন, আপনার মেয়েকে আমার ভারি পছন্দ হয়েছে। ওকে জা করে নিয়ে যাব।

বাবা যা পারলেন দিলেন। বর এল বিয়ে করতে। স্বাস্থ্যবান যুবক। গায়ের রং কালো হলেও স্বভাব লাজুক। বাসরঘরে একটিও কথা বলল না। সবাই যখন বিশ্রাম নিতে গেল তখন সাহস করে জিজ্ঞাসা করলাম, একটা কথা বলব?

তিনি বললেন, ইচ্ছে হলে বলো।

আমি না লিখি। মানে গল্প-টল্প। বিয়ের পর লিখলে আপত্তি আছে?

তিনি অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, সারাদিন-রাত বসে থাকতে হবে। ঘরে বসে যা ইচ্ছে করতে পারো। তবে মাসে দশ টাকার বেশি হাতখরচ পাবে না এইটা মনে রেখো।

সেই রাত্রে ওই অবধি। কিন্তু আমার চেয়ে সুখী বোধহয় পৃথিবীতে কোনও মেয়ে ছিল না। দশটাকায় যত কাগজ পাওয়া যাবে তা তো সারা মাসে লিখে ফুরোবে না।

শ্বশুড়বাড়িতে এলাম। শ্বশুর-শাশুড়ি নেই, বউদিই সব। ফুলশয্যার রাত্রে তিনি আমাকে বললেন, তোমাকে একটা কথা বলছি। হরিপদর শরীর ভালো নেই, ওকে বিরক্ত করবে না।

মেয়ে হয়ে মানে বুঝতে পারব না তা কি করে হয়। রাত্রে তিনি যখন শুতে এলেন তখন জিজ্ঞাসা করলাম, শরীরে কি হয়েছে?

কি হবে আবার? কিস্যু হয়নি। ঘুমাও।

সকালে উঠেই তিনি বেরিয়ে যেতেন দোকানে। দুপুরে খেতে এলে বউদি যত্ন করে তাঁকে খাওয়াতেন। খেয়েদেয়েই আবার দোকানে ছোটা। ফিরতে-ফিরতে রাত দশটা। তখন স্নান শেষ করে রাত্রের খাওয়া খেয়ে নিয়ে সিগারেট খেতে বাইরে যেতেন। ফিরতেন কখন টের পেতাম না। এত ঘুম পেত যে জেগে থাকতে পারতাম না।

বিয়ে হল, শ্বশুরবাড়িতে এলাম কিন্তু যেসব ঘটনা এই সময় ঘটে তার কিছুই আমার ক্ষেত্রে ঘটল না। দ্বিরাগমনে গ্রামে ফিরে গেলে বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করলে কি জবাব দেব? এখন আমি সকালে উঠি। ঘর গোছাই। বউদির নির্দেশে রান্না করি। তারপর সারাদুপুর লিখি আর লিখি। দুপুরের পর বউদি সেজেগুঁজে বেরিয়ে যান, তখন একা। আর এই সময় পাশের বাড়ির বউটা আসে আমার কাছে। আমি লিখেছি দেখে চোখ কপালে তোলে। আমার বিরক্ত লাগলেও কিছু বলি না। বউটা নানান কথা জানতে চায়। স্বামী আমাকে কীরকম আদর করে তাও! ওসব ঘটনা ঘটেনি বলে দিয়েছিলাম। শুনে মুখ গম্ভীর করে বলেছিল, জানতাম।

এসব চরিত্রের কথা আমি জানি। ঘর ভাঙতে এদের জুড়ি নেই। বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্রও এঁদের বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সেই রাত্রে মনে হল স্বামীকে জিজ্ঞাসা করা দরকার। তাঁর সত্যি হয়তো অসুখ আছে। অসুখটা কি? অসুখ থাকলে কেউ অত পরিশ্রম করতে পারে! তাহলে বউটাও বা বলবে কেন, জানতাম।

রাত্রে স্বামী এলেন। খাওয়া-দাওয়া হল। বউদি তাঁকে জানিয়ে দিলেন নিয়ম মানতে আগামীকাল আমাকে নিয়ে বনগাঁয়ে যেতে হবে দ্বিরাগমনে। তবে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলেই হবে। রাত কাটাতে হবে না। স্বামী কিছু বললেন না।

স্বামী সিগারেট খেতে বাইরে গিয়েছেন। আমি আজ কিছুতেই ঘুমাব না। আধঘণ্টা এক ঘণ্টা চলে গেল। রাত বাড়ছে। সব চুপচাপ। এখনও তিনি ফিরছেন না কেন? শেষপর্যন্ত ওঁকে খুঁজতে বাইরে বের হলাম। লম্বা বারান্দা। পরিষ্কার উঠোন। উঠোনে চাঁদের আলো। তিনি নেই কোথাও। উঠোন পেরিয়ে দরজায় গেলাম। রাস্তা দেখা যাচ্ছে ছবির মতো। এরকম বর্ণনা আমার একটা গল্পে আছে। তাঁকে দেখতে পেলাম না। হঠাৎ আমার ভয় করতে লাগল। কিছু হয়নি তো তাঁর! মনে। হল বউদিকে ব্যাপারটা জানাই। কিছু হলে তিনিই আমাকে দুষবেন না জানানোর জন্যে। বউদির ঘরটা ওপাশে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝলাম ওটা ভেতর থেকে বন্ধ নয়। ঠেলতেই পাল্লাদুটো খুলে গেল। আর আমি যেন অন্ধ হয়ে গেলাম। এক ছুটে ফিরে এলাম নিজের ঘরে। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলাম। তারপর একটু সামলে উঠে নিঃসাড় হয়ে পড়ে রইলাম। চোখের পাতায় দৃশ্যটা যেন এঁটে আছে। জানলা দিয়ে চাঁদের আলো পড়ছিল খাটে। বউদি এবং আমার স্বামী পরস্পরকে সাপের মতো জড়িয়ে অদ্ভুত চাপা শব্দ করে যাচ্ছিলেন। মানুষ খুব যন্ত্রণা পেলে মুক্তির জন্যে এমন শব্দ করতে পারে! কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল ওই শব্দগুলো আমার বুকটাকে টুকরো-টুকরো করে দিয়েছে। চোখ থেকে ঘুম উধাও। শরীর থেকে শক্তি। ওইভাবে পড়ে থাকতে-থাকতে একসময় টের পেলাম পাশের বিছানায় স্বামী এসে শুয়ে পড়লেন।

তারপর ভোর হল। সারারাত আমার ঘুম নেই। স্বামী জাগলেন এবং রোজকার মতো বেরিয়ে গেলেন। আমি ঘর থেকে বের হচ্ছিলাম না, এমনকী কলতলাতেও নয়, বউদি এলেন, তৈরি হয়ে নাও।

আমি মাথা নিচু করলাম।

তিনি কিছু ভাবলেন। তারপর এগিয়ে এসে খাটের পাশে দাঁড়ালেন, আমার ঘরে শব্দ না করে ঢুকে তুমি অন্যায় করেছ।

আমি কথা বললাম না।

তোমাকে একটা কথা বলি। অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার পর অনেক প্রলোভন এসেছিল। শরীর আমার এমনিতেই পুরুষের মাথা ঘোরায়। কিন্তু আমি সংযত ছিলাম। কেউ আমার নামে কোনও দুর্নাম দিতে পারবে না। শরীরে ভরা যৌবন অথচ ব্যবহার করতে পারছি না, এ যে কী যন্ত্রণা তা আমিই জানি। তোমার স্বামী তখন ছোট। তাকে মানুষ করছি দরদ দিয়ে। আমি খাওয়ালে। খাওয়া, শোওয়ালে শোওয়া। আস্তে-আস্তে সে বড় হচ্ছিল। কিন্তু আমাকে ছেড়ে শুতে চাইত না। আমারও ভালো লাগত। সেইভাবে কাটিয়ে কখন একদিন আমার সংযমের বাঁধ ভেঙে গেল আমি নিজেই জানি না। তার কাছে আমিই সব। মা বলো তো মা, সঙ্গিনী বলো তো সঙ্গিনী। আমার কাছে ও যা পেয়েছে তা পৃথিবীর কোনও মেয়ে ওকে দিতে পারবে না।

তাহলে ওঁকে বিয়ে দিলেন কেন?

না দিয়ে পারিনি। সত্যি বলতে কি, আমি দিতে চাইনি। কিন্তু পাড়ার লোকজন যে আমাদের সম্পর্ককে সন্দেহ করছে তা টের পেলাম। আমার বয়সের সঙ্গে মানিয়ে যদি শরীর ভাঙত, চুল। পাকত, তাহলে কেউ সন্দেহ করত না। তাই ঠিক করলাম ওর বিয়ে দেব। বিয়ে দেব এমন। মেয়ের সঙ্গে যার শরীরে আকর্ষণ নেই। যার কোনও গুণ নেই। অনেক খোঁজ করে তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। এমনিতেই তোমার বিয়ে হত না। এখন এখানে এসে ভালোই তো আছ। এইভাবেই সারাজীবন থাকতে পারবে যদি ইচ্ছে করো। আর কাল যা দেখেছ তা যদি কাউকে জানাও তাহলে নিজের পায়ে নিজে কুড়োল মারবে।

উনি যখন এই কথাগুলো বলছিলেন তখন আমি কেঁদে ভাসাচ্ছিলাম। কান্না ছাড়া তখন আমার কিছুই করার ছিল না। উনি আমার পাশে বসলেন, এত কান্নাকাটির কি হয়েছে? ষোলো থেকে তিরিশ আমি বঞ্চিত ছিলাম, সেটা জানো? আর মেয়েদের ব্যাপারটা মেয়ে বলেই আমি জানি। সব মেয়ে এসবের জন্য কষ্ট পায় না। তোমার মতো রোগা ছেলেছেলে মেয়ের তো কষ্ট হওয়ার কথাই নয়। তুমি এখানে থাকো, খাওয়া-দাওয়া সাজগোজ সব করো, আমি আপত্তি করব না। তবে হ্যাঁ, তুমি নাকি কীসব লেখালখি করো, এইসব কথা লেখা চলবে না বলে দিলাম।

হুকুম হয়ে গেল। একটা লেখায় পড়েছিলাম রাজা ইচ্ছে হলে লেখকের লেখা বন্ধ করে দিতে পারতেন। লেখকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতেন। পরে সরকার সেই কাজ করেছেন, কিন্তু লেখকরা লেখা থামাননি। মনে-মনে স্থির করলাম আমিও হার মানব না। আমার স্বামী আমাকে বনগাঁতে পৌঁছাতে এলেন। সারাপথে একটা কথা নয়। রওনা হতে দেরি হওয়ায় আমরা পৌঁছেছিলাম প্রায় বিকেল-বিকেল। বাবা-মা জোর করে তাঁকে ফিরতে দিলেন না তখনই। বললেন রাত কাটিয়ে যেতে হবে।

নিজেদের বাড়িতে এতকাল আমার আলাদা শোওয়ার ঘর ছিল না। আজ রাত্রে সেই ব্যবস্থা হল। রাত্রে তাঁর পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি করব?

তিনি ঘুমোবার চেষ্টা করছিলেন, আমাকে জিজ্ঞাসা করে লাভ কি?

আমাকে তোমার একটুও পছন্দ হয়নি, না?

তিনি উত্তর দিলেন না। না দেওয়াটাই বড় উত্তর। পরদিন সকালেই ফিরে গেলেন কাজের চাপ দেখিয়ে। আমি থেকে গেলাম বাপের বাড়িতে।

দিন গেল। মাসও। সোনারপুর থেকে কেউ আমাকে নিতে আসেনা। এমনকী একটা চিঠিও নয়। মা আমাকে কারণ জিজ্ঞাসা করে। আমি ভয় পেতাম সত্যি কথা বলতে। কিন্তু জানি না জানি না বলে আর কতদিন চাপা দিতে পারব! শেষপর্যন্ত বলতে হল। মা পাথর হয়ে গেল! একি সম্ভব? মায়ের বয়সি মহিলার সঙ্গে?যার কাছে একমাস থেকে বড় হয়েছে তার সঙ্গেই শারীরিক সম্পর্ক? কিন্তু সত্যি যা তা চিরকালই সত্যি।

অথচ তার মধ্যেই আড়াল। মা বাবাকে এসব জানালেন না। আমাকে সঙ্গে নিয়ে বনগাঁ থেকে চলে গেলেন সোনারপুরে। পাড়ার সবাই দেখল আমরা গেলাম এবং খানিক সময় বাদে ফিরে যাচ্ছিলাম। আমার চোখে জলও তারা দেখতে পেল। অতএব ওদের কৌতূহল হল। একজন। কারণ জিজ্ঞাসা করতেই মা তাদের বলল, মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু দ্বিরাগমনের সময় সেই যে মেয়েকে দিয়ে গেলে হরিপদ আর আনতে এল না। অনেক অপেক্ষার পর নিজে নিয়ে এসেছিলাম মেয়েকে। মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে বলে দিল, মেয়েকে নাকি তার পছন্দ। হয়নি। সঙ্গে-সঙ্গে জনতা গর্জে উঠল। আর আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে হরিপদ এবং তার বউদির কেচ্ছাকাহিনি শুনতে লাগলাম। প্রথম-প্রথম গ্রামের লোক ভাবত মাতৃস্নেহ। তারপর কেউ-না কেউ কিছু-না-কিছু দেখতে পেয়েছে। লোকের চোখ ঢাকার জন্যে যে হরিপদর বিয়ে দেওয়া হল সেকথা সবাই জানে। এমন অনাচার মেনে নেওয়া চলে না। বউ ফিরিয়ে নিতে হবে বলে পাড়ার লোক আমাদের সামনে রেখে চিৎকার করতে-করতে চলল। আমার খুব লজ্জা করছিল কিন্তু। তখন আর কোনও উপায় ছিল না। তাঁর বউদিও নাকি বাড়িতে নেই। দরজায় আঘাত করছিল সবাই। শেষপর্যন্ত তিনি দরজা খুলে চিৎকার করলেন, আপনারা করছেন কি? আমাদের বিয়ের ব্যাপারটায় নাক গলাচ্ছেন কেন? মানুষ তখন খেপে গিয়েছে। তাকে দেখতে পেয়েই কিলচড় শুরু হয়ে গেল। আমি আর পারলাম না। আমার ভয় হচ্ছিল সবাই মিলে মারলে তিনি মরে যাবেন। আমি আমার রোগা শরীর নিয়ে ছুটে গেলাম তাঁকে আড়াল করতে। একটা লোক তাঁকে মারতে যাচ্ছে দেখে একটু ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলাম, দেখলাম সে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে। গেল। স্বামী ভেতরে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে দিলেন। শুনলাম লোকটার নাকি মৃগীরোগ। আছে। সবাই মিলে ধরাধরি করে হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হল। আমি এবং মাও ওদের সঙ্গে গেলাম। লোকটাকে সুস্থ হতে দেখে ফিরে আসছি যখন, তখন একজন সেপাই এসে বলল থানার বড়বাবু আমাদের ডাকছে। আমাকে আর আমার মাকে। গেলাম। দারোগাবাবু জানালেন আমার স্বামী এসে ডায়েরি করে গেছেন যে আমি এবং আমার মাদলবল নিয়ে তাঁকে মারতে গিয়েছিলাম, তাঁকে ধাক্কা দিতে গিয়ে আর একজনকে এমন আঘাত করেছি যে লোকটাকে হেলথ সেন্টারে নিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর আরও অভিযোগ স্ত্রী হিসেবে আমার অক্ষমতা জানার পরই। নাকি আমি বাপের বাড়ি চলে যাই। তা ছাড়া ওঁর কাছে আমার লেখা বেশকিছু কাগজ আছে যাতে প্রমাণ করা যেতে পারে যে আমার চরিত্র ভালো নয়।

দারোগাবাবু হাসলেন। বললেন, সবই বুঝলাম কিন্তু কাগজে কি লিখেছেন?

গল্প!

অ্যাঁ? আপনি গল্প লেখেন?

হ্যাঁ।

আরেব্বাস, ভাবা যায় না! দারোগা নাক চুলকে ফেললেন, ঠিক আছে, কোর্ট থেকে সমন গেলে হাজির হবেন।

ব্যাস, হয়ে গেল।

এরপর থেকে আমি বনগাঁয়ে, আমার বাপের বাড়িতে। সংসারে কাজ করে দিই, তিনটে ছাত্রী পড়াই আর দুপুরে গল্প লিখি। বাবার কাছে হাত পাততে হয় না। মুশকিল হল আমার গল্পগুলো ঠিক কোন কারণে ছাপা হচ্ছে না তা বুঝতে পারছি না। হলে সোনারপুরে গিয়ে পত্রিকাটা দিয়ে। আসতাম। আমার এখন ভালো লাগে না। সাতদিন যে মানুষটার পাশে শুয়েছিলাম তিনি আমাকে খুব টানেন। মাঝে-মাঝে নিজেকে বোঝাই তিনি তখন খুব ছোট ছিলেন, কিছু বুঝতেন না। বউদির সঙ্গে ঘটনা ঘটে গিয়েছিল হঠাই। যেমনভাবে দুর্ঘটনা হয়। তারপর সেইটে অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। মন মানতে চায়, কিন্তু তাতে আমার কি লাভ হচ্ছে!

আমার এখন সোনারপুরে যেতে ইচ্ছে করে। ভাইরা বড় হচ্ছে। ওরা বুঝতে শিখেছে আমি এ বাড়িতে বাহুল্য। আমার এখানে থাকার কথা নয়। হঠাৎ আমার এক বান্ধবী আমাকে একটা। সত্যি কথা বলল। ভগবান মানুষকে তৈরি করেছেন কতকগুলা নিয়ম মেনে। শৈশব, বাল্যকাল, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়কাল এবং বার্ধক্য।

কোনওটাতেই কেউ চিরদিন আটকে থাকতে পারে না। তাকে এগিয়ে যেতেই হয়। আমার স্বামীর বয়স এখন তিরিশ, তিনি ছেচল্লিশ। আর কতদিন? বড়জোর বছর চারেক। তারপর তাঁর শরীর। থেকে যৌবন উধাও হয়ে যাবেই। আর বাইরের যৌবন যদি বা থাকে ভেতরের যৌবন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তখন তাঁর কোনও আকর্ষণ থাকবে না আমার স্বামীর কাছে। গন্ধ নেই মধু নেই ফুলের দিকে মানুষ কতবার তাকায়! পাঁচ বছর পরে আমার মাত্র তিরিশ বছর হবে। কী-ই বা এমন। তখন তিনি আমাকে নিশ্চয়ই গ্রহণ করবেন।

আমি তাই মাসে একবার সোনারপুরে যাই। দূর থেকে বউদিকে দেখে আসি। লোক বলে এই বয়সে অসুখ-বিসুখ হলেও মানুষের শরীর নষ্ট হয়ে যায়। এখনও পর্যন্ত তেমন লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। তবু এটাই আমার একমাত্র আশা। আমি অপেক্ষা করব।

জয়ী পড়া শেষ করল। তারপর বলল, ইম্পসিবল!

অমিত জিজ্ঞাসা করল, তার মানে?

এই জন্যেই বাঙালি মেয়েরা এক্সপ্লয়েটেড হয়ে চলেছে। স্বামী আর একজনের সঙ্গে ফুর্তি করছে। দিনের-পর-দিন। আমি অপেক্ষা করব কখন তিনি মুখ ফেরাবেন সেই আশা নিয়ে? জয়ীর গলায় জ্বালা স্পষ্ট হল।

শোভন বলল, কিন্তু গল্পটা দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু যৌবন দিয়ে অনন্তকাল কেউ কোনও সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। এই উপলব্ধিটা গল্পটার চমক।

ওরা খিচুড়ি এবং ইলিশ খেলো। বিকেল নামতেই যেযার বাড়ি ফিরে গেল ধন্যবাদ জানিয়ে। দেখা যাচ্ছিল গল্পটা কিছুই নয়, খুবই সাধারণ ইত্যাদি বলা সত্বেও খেতে বসেও এ নিয়ে কথা বলা বন্ধ করছে না। এক মাসের শিশুকে মাতৃস্নেহে বড় করে কোনও মহিলা শেষপর্যন্ত ওই সম্পর্কে যেতে পারেন কিনা তাও তর্কের বিষয়। কুন্তী কোনও কথা বলছিলেন না। একজন ঠাট্টা করে বলল, আহা বেচারা! লিজ টেলার যদি স্বামীর বউদি হত তাহলে ওকে পনেরো বছর অপেক্ষা করতে হত কম করেও। তদ্দিনে মেয়েটা বুড়ি হয়ে যেত!

বাড়িটা এখন ফাঁকা। ব্যালকনিতে চুপচাপ বসেছিলেন কুন্তী। ঘোলাটে মেঘগুলো ব্লটিং-এর মতো সমস্ত আলো দ্রুত শুষে নিচ্ছে। সন্ধে হয়ে এল বলে। ওপাশের একটা ঘরে টিভি চলছে। দর্শক। বিন্তি এবং আবদুল। শব্দ বাইরে বেরুচ্ছে না। কি একটা সিনেমা চলছে সেখানে।

গল্পটাকে কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না কুন্তী। বাঙালি মেয়েদের যে বয়সে ওই পর্বটিকে ছেড়ে আসতে হয়, তাঁর ক্ষেত্রে একটু আগেই যেন এসে গিয়েছে। ডক্টর দত্ত বলেছেন, এটা জীবনের খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। একটুও মাথা ঘামাবেন না। শরীর নিয়ে চিন্তা করা। বোকামি। আসলে মন তাজা রাখাই প্রয়োজন। শুনতে খারাপ লাগে না এইসব উপদেশ। শুনলে স্বস্তি হয় বলেই খারাপ লাগে না।

কিন্তু ওই যে মেয়েটি লিখেছে, গন্ধ নেই মধু নেই এমন ফুলের কথা! এখনও এই সময়ে তিনি যখনই একাকী তখনই এমন কোনও পুরুষের সঙ্গ কামনা করেন যে বোকাবোকা নয়, যে স্মার্ট সাজার চেষ্টা করে না অথবা যোদ্ধা হওয়ার ভান করে না। এই যে কামনা তা তাঁর বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে। তাঁর শরীরের সবকিছু মন্থন করে নিশ্বাসের মতো আন্তরিক হয়ে ওঠে। রঙ্গন চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুকাল থিতিয়ে ছিল এইসব ভাবনা। এখন একটু-একটু করে প্রবল। হচ্ছে। শেষ ঘণ্টা বেজে যাওয়ার পর লোকে যেমন হুড়মুড়িয়ে ট্রেনের কামরায় উঠে পড়ে, ঠিক তেমন। শেষ ঘণ্টা? তাঁর শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে? ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন কুন্তী। অসম্ভব। এই তো, ভরদুপুরে বাড়ি এসে ভদকা খাওয়ার আগেই মানুষগুলো তাঁর রূপের কত প্রশংসা করে। গেল! অফিসে যখন ঢোকেন তখন কর্মচারীদের মুখে যে স্তাবক দৃষ্টি থাকে তা তাঁর অদেখা নয়। ম্যাডাম শব্দটা উচ্চারণ করার সময় তারা এক-একজন চকোলেট হয়ে যায়।

সেদিন রবীন্দ্রসদনে গিয়েছিলেন বিশেষ আমন্ত্রণ পেয়ে। একটি বছর পঁচিশের ছেলে এগিয়ে এসেছিল, আপনার সঙ্গে আলাপ করতে পারি? কুন্তীর কপালে ভাঁজ পড়েছিল।

কেন?

আপনার মতো কাউকে কখনও দেখিনি।

সরি। আমার বাজে কথা বলার মতো সময় নেই। কুন্তী পাশ কাটিয়েছিলেন অবহেলায় কিন্তু তাঁর ভালো লেগেছিল।

আর এসব শেষ ঘণ্টা বেজে গেলে কারও জীবনে ঘটে? পৃথিবীতে এমন মেয়ে অনেক আছে যাকে কখনও কোনও পুরুষ প্রস্তাব দেয়নি। যেমন ওই মেয়েটি। কী নাম যেন, হ্যাঁ, নমিতা। চেহারার মতো সাদাসাপটা নাম।

কুন্তী কলকাতার দিকে তাকালেন।  ঝাঁপসা জলের মধ্যে আলোর বিন্দু ফুটে উঠেছে। কলকাতায় সন্ধে নেমেছে বর্ষা জড়িয়ে। দিন শেষ হল। একটা গোটা দিন। কুন্তী ধীরে-ধীরে শোওয়ার ঘরে চলে এলেন।

দেওয়ালজোড়া আয়নায় এখন তিনি। মিষ্টি, অহঙ্কারী। দূর! কে কী বলল তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী লাভ! বরং স্নান করা যাক। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে অবিরত ভিজে চলেছেন তিনি। আজকের দিনটা অবহেলায় কাটল। শরীরটার দৈনন্দিন পরিচর্যা হল না।

একটু আলস্যঘন দিন। আগে মন্দ লাগত না, এখন অস্বস্তি হয়। এই বুঝি ফাঁক গলে শনি ঢুকে পড়ল। ছেলেবেলায় একটা গল্প পড়েছিলেন তিনি। কোনও এক রাজা নাকি অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁকে কিছুতেই বাগ মানাতে পারছিলেন না শনিদেব। কোথাও তাঁর বিচ্যুতি নেই। কিন্তু একদিন বাইরে থেকে ঘুরে এসে রাজা যখন তাঁর পা ধুচ্ছিলেন তখন গোঁড়ালির কাছে জল। পৌঁছায়নি অন্যমনস্কতার কারণে। ব্যাস, সঙ্গে-সঙ্গে শনিদেব সেইখান দিয়ে রাজার শরীরে প্রবেশ করে ধ্বংস ডেকে আনলেন। এমন যেন না হয়, এমনটা হতে দেবেন না কুন্তী।

স্নান সেরে বড় তোয়ালেতে শরীর মুছতে-মুছতে আয়নায় নিজেকে দেখলেন। না, কপালে ভাঁজ পড়েনি, চোখের তলায় একটু ঢেউ নেই। হাসলে গালে কুঞ্চন ওঠে না। চামড়া কি টানটান। গলায় একটু, নাঃ, এ তাঁর চোখের ভুল। গতকাল যখন ছিল না আজ কোত্থেকে আসছে! মুখ উঁচু করতেই সন্দেহটা মিলিয়ে গেল। কাঁধ থেকে কনুইদুটো এখনও সতেজ। এবং নিজের বক্ষদেশ দেখতে গেলেই মৃণালের ওপর তাঁর খুব রাগ হয়। প্রথম যৌবনে মৃণাল যথেচ্ছাচার যদি না করত তাহলে এখনও ঈশ্বরী ঈর্ষিতা হতেন। সেই সময় তিনি বোঝেননি, মেয়েরা ভালোবাসলে যেমন কিছুই বুঝতে পারে না অথবা চায় না। সঙ্গে-সঙ্গে গল্পটার কথা মনে এল। নমিতা অথবা শকুন্তলার স্বামীর বউদি, মেয়ে দেখতে গিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন ভেতরে জামার মাপ কত? বেচারা, কী অপমানকর প্রশ্ন!

হঠাৎ ভদ্রমহিলাকে দেখতে ইচ্ছে করল কুন্তীর। পঞ্চাশের কাছে পৌঁছেও যিনি তিরিশকে শাসনে রেখেছেন। সেই মহিলা নিশ্চয়ই তার মতো এমন বিত্তে নেই, হাত বাড়ালেই সমস্ত পৃথিবীকে পান না! তাঁর কৌশল কী?

সারা শরীর ঢাকা আলখাল্লা পরে শোওয়ার ঘরে পৌঁছাতেই টেলিফোন বেজে উঠল। কুন্তী রিসিভার তুললেন না। বাজনা থামতেই বুঝলেন বিন্তি ধরছে ও-ঘরে। একটু বাদেই সে এল, অণিমাদেবী, কী বলব?

মাথা নেড়ে ধরবেন বললেন কুন্তী।

রিসিভারটা তুললেন, হ্যালো!

বিরক্ত করছি। খুব ব্যস্ত?

নাঃ। বলো।

তোমাকে যে মেয়েটির কথা বলেছিলাম সে কি দেখা করেছে আজ?

এসেছিল।

কখন?

দুপুরে।

তারপর? মানে কখন গেল?

কেন বলো তো?

আর বোলো না। ওর খোঁজে বনগাঁ, মানে যেখানে ও থাকে, সেখান থেকে ওর বাবা এসেছেন আমার কাছে। মেয়েকে নিয়ে এখনই সোনারপুরে যাবেন। অথচ কথা ছিল ও তোমার ওখান থেকে আমার কাছে ফিরে আসবে।

তাহলে বনগাঁয় ফিরে গেছে।

মনে হচ্ছে। এখন এরা যে কী করবে?

অণিমা যেন সত্যিই বিব্রত।

কুন্তীর খেয়াল হল, সোনারপুরে যাবে কেন? ওর লেখা একটা গল্প দিয়ে গেছে আমায়। সেটা পড়ে তো মনে হয় না যাওয়া উচিত। আর শোনো, এই মেয়েকে দেওয়ার মতো কোনও চাকরি আমার হাতে নেই। তুমি কিছু মনে কোরো না।

ও, ব্যাড লাক! তোমাকে বিরক্ত করেছি বলে খারাপ লাগছে। মেয়েটার কপালটাই মন্দ। ওর বাবা এসেছেন স্বামীর শেষকৃত্যে নিয়ে যেতে।

হোয়াট? চিৎকার করে উঠলেন কুন্তী।

আজ দুপুরেই ওঁরা খবর পেয়েছেন লোকটা নাকি ভোরে আত্মহত্যা করেছে। গলায় দড়ি দিয়ে। শেষকৃত্যে না গেলে সম্পত্তির ভাগ থেকে হয়তো বঞ্চিত হতে পারে।

কিন্তু লোকটা আত্মহত্যা করতে গেল কেন?

আমি জানি না। আচ্ছা রাখছি।

রিসিভার রেখে ধুপ করে বিছানায় বসে পড়লেন কুন্তী। তাঁর ভিজে চুল এখন তোয়ালেতে জড়ানো। হঠাৎই সেই তোয়ালের হিম তাঁর সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। মেয়েটা এখন কার জন্যে কীসের জন্যে অপেক্ষা করবে?যার সময় গেলে সে জিতে যাবে বলে ভেবেছিল তার তো আজ ভোরেই সময় চলে গেল কিন্তু ওর তো জেতা হল না! এখন সেই মহিলা, যাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল একটু আগে, হঠাৎই যেন অনেক অন্ধকারে চলে গেলেন। আশ্চর্য, এদের কাউকেই তো তিনি চেনেন না।

কুন্তী উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎই সমস্ত শরীর যেন নির্জল বলে মনে হচ্ছিল তাঁর। জিভ, গলা, পেট সর্বাঙ্গ। জল মানে চলাচল, জল মানে সরস। অনেক দূরের মহাকাশে যেসব গ্রহ জলহীন হয়ে ঘুরে বেড়ায় তারা হিংসুটে চোখে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে। তৃষ্ণায়বুক জ্বলে-জ্বলে খাক!

কুন্তী প্রচণ্ড শক্তিতে বোতামে চাপ দিলেন।

বিশাল ফ্ল্যাট কাঁপিয়ে বেল বাজছে। বিন্তি ছুটে এল দরজায়।

কুন্তী বলতে পারলেন, জল দাও!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *