৬.৩.১ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : উই

শিরা-পক্ষ পতঙ্গ
(Neuroptera)
উই

তোমরা সকলেই উই দেখিয়াছ। ইহারা শুক্‌নো জায়গায় বাস করিতে ভালবাসে। বাঁশ কাঠ শুক্‌নো লতা-পাতা ইহাদের খাদ্য। কিন্তু যেখানে উই বেশি থাকে, সেখানে খাতা-পত্র মোজা-কাপড় এমন কি জুতা পর্য্যন্ত তাহাদের গ্রাস হইতে রক্ষা করা যায় না। শুক্‌নো কাঠ বা বাঁশ মাটিতে পোঁতা থাকিলে, সেগুলির ভিতরে উইয়ে বাসা করে। যদি একখানা উই-ধরা বাঁশ পরীক্ষা করিবার সুবিধা পাও, তবে দেখিবে, বাঁশের ভিতরে উইরা মাটি দিয়া সরু পথ ও সুড়ঙ্গ তৈয়ার করিয়াছে।

যেখানে বাঁশ বা কাঠ নাই, সেখানে উই পোকারা মাটির তলায় ঘর প্রস্তুত করে। তোমরা মাঠে নিশ্চয়ই উইদের ঢিবি দেখিয়াছ। এ-সকল ঢিবির নীচে মাটির মধ্যে উহাদের ঘরবাড়ী থাকে। বৃষ্টির জল বা রৌদ্রের তাপ যাহাতে বাসায় না লাগে, তাহারি জন্য উহারা বাসার উপরে চিবি করিয়া রাখে। আমাদের দেশে সাধারণ উইয়ের ঢিবি এক হাত বা দেড় হাতের বেশি উঁচু হয় না, কিন্তু আাফ্রিকায় এক জাতি উইকে বারো চৌদ্দ হাত উঁচু ঢিবি বানাইয়া তাহার নীচে নিশ্চিন্ত হইয়া বাস করিতে দেখা যায়।

উই পতঙ্গজাতীয় প্রাণী, কিন্তু বোল্‌তা বা পিঁপ্‌ড়ের জাতীয় নয়। সাধারণ পতঙ্গদেরই মত ইহাদের ছয়খানা পা আছে এবং খাদ্য কাটিয়া খাইবার জন্য এবং ঘরের মাল-মসলা জোগাড় করিবার জন্য সাঁড়াশির মত দুইটা দাঁতও আছে। তা’ ছাড়া এক জোড়া শুঁয়ো আছে। উইয়ের শুঁয়ো খুব লম্বা হয় না। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় উহাদের চোখ নাই। ইহারা অন্ধ প্রাণী। যে-সব পোকা-মাকড়ের চোখ নাই, তাহারা আলোতে থাকিতে চায় না। উই-পোকাও আলো ভালবাসে না। যখন দেওয়াল বা মাটির উপর দিয়া যাওয়া-আসার দরকার হয়, তখন উহারা মাটি দিয়া সুড়ঙ্গ বনায় এবং সুড়ঙ্গের পথে যাওয়া-আসা করে। সুড়ঙ্গের জন্য যে মাটির দরকার হয়, তাহা উহারা দাঁত দিয়া কাটিয়া আনে এবং তাহার সহিত মুখের লালা মিশাইয়া কাদা তৈয়ারি করে। ইহা দিয়াই উইদের সুড়ঙ্গ ও বাসা তৈয়ারি হয়।

স্ত্রী, পুরুষ ও কর্ম্মী-উই

পিঁপ্‌ড়ে ও মৌমাছিদের দলে যেমন স্ত্রী, পুরুষ ও কর্ম্মী আছে, উইদের মধ্যেও ঠিক তাহাই দেখা যায়। যদি কখনো উইয়ের ঢিবি পরীক্ষা করিবার সুযোগ পাও, তবে তোমরা সেখানে ছোট ও বড় দুই রকম উই দেখিতে পাইবে। ইহারা সকলেই কর্ম্মী। ছোট উইগুলিরই সংখ্যা বেশি। ইহারা ঘর-দুয়ার তৈয়ারি প্রভৃতি পরিশ্রমের কাজ করে। বড় উইগুলি সৈনিক ও পাহারা-ওয়ালা। দেহের তুলনায় ইহাদের মাথা যেন একটু বড় এবং সম্মুখের দাঁতগুলি লম্বা। ছোট কর্ম্মী-উইদের মধ্যে পাহারা দেওয়াই ইহাদের কাজ। বাহির হইতে কোনো শত্রু আসিয়া পড়িলে, ছোট কর্ম্মীর দল নিরাপদ জায়গায় লুকাইয়া পড়ে। তখন কেবল সৈনিকেরাই তাহাদের সেই ধারালো দাঁত দিয়া শত্রুকে তাড়া করে। ইহাদেরও চোখ নাই। কোথায় শত্রু আছে, তাহা বোধ হয় শুঁয়ো দিয়াই উহারা জানিতে পারে। কে শত্রু এবং কে মিত্র, তাহা বুঝিয়া লইতে ইহারা কখনই ভুল করে না।

স্ত্রী ও পুরুষ-উই বোধ হয় তোমরা দেখ নাই। একএকটি ঢিবিতে কেবল একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী-উই থাকে। ইহাদিগকে উইদের রাজা ও রাণী বলা যাইতে পারে। মাটির ভিতরকার বাসার সকলের নীচের ঘরে রাজা ও রাণী বাস করে। রাণী-উইকে দেখিতে অতি বিশ্রী। সাধারণ উই কত বড় তাহা তোমরা দেখিয়াছ। রাণীর আকার তাহারি ত্রিশ হাজার গুণ বড়। দেহে পা শুঁয়ো প্রভৃতি সকল অঙ্গই থাকে। কিন্তু সেগুলি দেহের তুলনায় এত ছোট যে দেখাই যায় না। এক-একটা প্রকাণ্ড উদর লইয়াই ইহাদের দেহ। এই পেটে অসংখ্য ডিম থাকে এবং প্রতি মিনিটে ইহারা ষাট্ বা সত্তরটা ডিম পাড়ে।

রাজা অর্থাৎ পুরুষ-উইদের শরীর রাণীর মত বড় না হইলেও, সাধারণ উইয়ের চেয়ে অনেক বড়। এখানে রাজা, রাণী ও কর্ম্মী উইদের ছবি দিলাম। সাধারণ উইয়ের চেয়ে রাজা ও রাণী কত বড়, তাহা ছবিটি দেখিলেই তোমরা বুঝিতে পারিবে। আকারে বড় হইলেও, রাজা ও রাণীর মত অক্ষম প্রাণী পৃথিবীতে দেখা যায় না। তাহাদিগকে একই ঘরে মড়ার মত যাবজ্জীবন পড়িয়া থাকিতে হয়। মোটা দেহ লইয়া তাহারা একটুও নড়াচড়া করিতে পারে না। এজন্য অনেক কর্ম্মী ও সৈনিক উই দিবারাত্রি রাজা-রাণীকে যত্ন করে এবং ডিম পাড়া হইলে সেগুলিকে মুখে করিয়া অন্য ঘরে লইয়া যায়। ক্ষুধার সময়ে কর্ম্মীরাই রাজারাণীর মুখে খাবার তুলিয়া দেয়।

পাছে রাজা বা রাণী পলাইয়া যায়, এই ভয়ে কর্ম্মী উইরা রাজার ঘরের দরজা কাদা দিয়া এমন ছোট করিয়া তৈয়ারি করে যে, রাজারাণী ইচ্ছা করিলে কখনই ঘরের বাহিরে আসিতে পারে না। পাখী, ব্যাঙ্, টিক্‌টিকি ও ইঁদুর উইয়ের পরম শত্রু। ইহাদের অত্যাচারে প্রতিদিনই হাজার হাজার উই মারা যায়। উইদের রাণী ক্রমাগত ডিম পাড়িয়া এই ক্ষয়ের পূরণ করে। এই জন্যই বাসার সকল উই রাজারাণীকে খুব যত্নে রাখে এবং কোনোখানে পলাইতে দেয় না।

উইয়ের ঘরকন্না

বোল্‌তা, মৌমাছি ও পিঁপ্‌ড়েরা কেমন দল বাঁধিয়া বাস করে এবং বাসার কাজকর্ম্ম কেমন ভাগ করিয়া চালায়, তাহা তোমরা আগেই শুনিয়াছ। উইদের মধ্যে ঠিক সেই রকম কর্ম্ম-বিভাগ আছে। বাসার সমস্ত উই দলে দলে বিভক্ত হইয়া, কেহ খাবার আনিতে যায়, কেহ ঘর প্রস্তুত করে এবং কেহ ডিম ও বাচ্চাদের যত্ন লয়। কর্ম্মীরা সঙীন্‌ওয়ালা সিপাহীর মত বাসার ভিতরে এবং বাহিরে পাহারা দেয়। ইহারা পাহারার কাজে এমন মজবুত যে, বাহির হইতে কোনো শত্রু ভিতরে আসিয়া হঠাৎ কোনো ক্ষতি করিতে পারে না। পিঁপ্‌ড়ে বা অন্য পোকামাকড় বাসার কাছে আসিলেই, সৈনিকদের সহিত তাহাদের লড়াই বাধিয়া যায়। ইহাতে উইয়েরাই জয়লাভ করে।

উইয়ের বাসা

উইয়েরা মাটির তলায় যে বাসা তৈয়ারি করে, তোমরা যদি সুবিধা পাও তবে তাহা পরীক্ষা করিয়ো। পিঁপ্‌ড়েদের বাসার মত ইহা কেবল মাটি দিয়া প্রস্তুত নয়। নরম বা পচা কাঠ দাঁতে কুরিয়া এবং তাহার সহিত মুখের লালা ও মাটি মিশাইয়া ইহারা এক রকম কাদার মত জিনিস প্রস্তুত করে। ইহাই উইদের বাসা প্রস্তুতের মসলা। পিঁপ্‌ড়ের বাসা মাটি খুঁড়িয়া পরীক্ষা করিতে গেলে, তাহা ভাঙিয়া-চুরিয়া নষ্ট হয়। উইয়ের বাসার মাল-মসলা শক্ত বলিয়া, তাহা ঐ রকমে সহজে ভাঙে না। স্পঞ্জের গায়ে কত ছোট ছিদ্র থাকে, তাহা তোমরা দেখিয়াছ। উইয়ের বাসা কতকটা স্পঞ্জের মত ছিদ্রযুক্ত, কিন্তু ছিদ্রগুলি কিছু বড়। এইগুলিই উইদের ঘর ও বাসায় যাইবার পথ।

উইয়ের বাসাগুলি এক একটা নগরের মত,—তাহাতে যে কত বড় বড় রাস্তা আঁকিয়া বাঁকিয়া চলিয়াছে, তাহার হিসাবই হয় না। ঘরের সংখ্যাও অনেক। কোনো ঘরে ডিম বোঝাই থাকে, কোনো ঘরে বাচ্চাদের লালন-পালন করা হয়। আবার কতকগুলি ঘরের দেওয়ালে ও সুড়ঙ্গের গায়ে চাষ-আবাদের কাজ চলে। এক রকম ছোট ব্যাঙের ছাতা উইয়েরা খাইতে বড় ভালবাসে। আমরা যেমন জমিতে সার দিয়া ধান, গম, ছোলা, মটর প্রভৃতি আবাদ করি, উহারা সেই রকমে ঘরের ও সুড়ঙ্গের দেওয়ালে ব্যাঙের ছাতার বীজ বুনিয়া চাষ করে। উইয়ের বাসা খুঁড়িয়া বাহির করিলে, সেখানে ঐ-রকম ব্যাঙের ছাতা অনেক দেখা যায়। যে ছোট প্রাণী মানুষের মত চাষ-আবাদ করিতেও জানে, তাহারা কত বুদ্ধিমান্ একবার ভাবিয়া দেখ।

রাজা-রাণীর জন্ম

উইয়েরা সাধারণত আকারে খুবই ছোট, কিন্তু তাহাদের রাজা ও রাণী কিপ্রকারে হঠাৎ বড় আকার লইয়া জন্মে, এখন তোমাদিগকে তাহারি কথা বলিব। রাণী সমস্ত জীবন ধরিয়া যে গাদা গাদা ডিম পাড়ে, তাহার সকলগুলি হইতে ছোট কর্ম্মী উই জন্মে না। কতক ডিম হইতে পুরুষ এবং স্ত্রী বাচ্চাও বাহির হয়। কর্ম্মীরা নির্দ্দিষ্ট আকারের বেশি বড় হয় ন। কিন্তু পুরুষ ও স্ত্রীর দল শীঘ্র শীঘ্র পুত্তলি-অবস্থা হইতে সম্পূর্ণ উই হইয়া দাঁড়াইলে, তাহাদের প্রত্যেকের দুইটি করিয়া চোখ এবং চারিখানা ডানা গজাইয়া উঠে। ডানা বাহির হইলে পুরুষ ও স্ত্রী উইয়েরা আর ঘরে থাকিতে চায় না। তখন তাহারা দল বাঁধিয়া বাসার বাহিরে আসে এবং উড়িতে আরম্ভ করে। কোনো কোনো দিন বৃষ্টির পরে যে বাদল-পোকা আকাশে উড়িতে দেখা যায়, তাহারাই সেই ডানাওয়ালা স্ত্রী ও পুরুষ উই।

দেহে চারিখানা করিয়া ডানা থাকিলেও, ভারি শরীর লইয়া পুরুষ ও স্ত্রী উইয়েরা বেশিক্ষণ আকাশে উড়িতে পারে না। কাজেই তাহাদিগকে মাটিতে নামিতে হয় এবং নামিলেই ডানা ছিঁড়িয়া যায়। পাখী, পিঁপ্‌ড়ে, টিক্‌টিকি ও ব্যাঙেরা এই সকল উইয়ের পরম শত্রু। মাটিতে পড়িবামাত্র তাহাদের অনেকে ঐ-সকল শত্রুর হাতে মারা যায়; আবার কতক আগুনে পুড়িয়া বা জলে ডুবিয়া মারা পড়ে। এই রকমে ডানাওয়ালা স্ত্রী ও পুরুষ-উইদের অনেকেরই জীবন শেষ হইয়া যায়। কেবল যেগুলি দৈবাৎ কর্ম্মী উইদের সম্মুখে পড়ে, তাহাদের মধ্যে দুই চারিটি বাঁচিয়া থাকে। কর্ম্মীরা একটি পুরুষ এবং একটি স্ত্রী-উইকে মুখে করিয়া মাটির তলার বাসায় লইয়া যায় এবং শেষে সেই দুটির একটিকে রাণী এবং অপরটিকে রাজা বলিয়া মানিয়া, তাহাদিগকে পৃথক্ ঘরে আট্‌কাইয়া রাখে। এই রাণীই পরে বড় হইয়া রাশি রাশি ডিম পাড়ে।

তোমরা উইয়ের ডানা পরীক্ষা করিয়া দেখিয়ো। গাছের পাতার শিরা-উপশিরার মত ইহাদের ডানাতে শিরা দেখিতে পাইবে। এই জন্য উইকে শিরা-পক্ষ পতঙ্গ বলা হয়।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *