আনিসুজ্জামান
কাছে-দূরে
পুনশ্চ

১৯৯৩ সালের নভেম্বরে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলাম, এ কথা বলেছি (২৫ এপ্রিল ২০০৮), তবে শ্রীলঙ্কায় সেবারে যে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তার কথা বলা হয়নি।
আমরা দল বেঁধে সৌজন্য-সাক্ষাৎকার করতে গিয়েছিলাম শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টের স্পিকারের সঙ্গে। তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তাঁর জামাতা তখন বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার হাই কমিশনার। আমরা বাংলাদেশ থেকে গেছি শুনে স্পিকার একটু বাড়তি সমাদর করলেন। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, শ্রীলঙ্কার জনগণকে প্রথাগতভাবে তিনভাগে ভাগ করা হয়-সিংহলা, তামিল ও মুসলমান। দুটি গোষ্ঠীর পরিচয় নৃতাত্ত্বিক, অপরটির ধর্মীয় কেন, তার সদুত্তর পেলাম না। দেশব্যাপী সিংহলা-তামিলের বিরোধের পটভূমিকায় সিহংলা মুসলমান ও তামিল মুসলমান একযোগে তৃতীয় একটি পক্ষ, তা আশ্চর্যের বিষয়। পরে জানলাম, এ-কারণে অনেকে, বিশেষ করে সিংহলারা, মুসলমানদের সুবিধাবাদী বলে গণ্য করে। তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তখন সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। এ-অবস্থায়ও সিংহলাদের কারো কারো মত এই যে, সলোমন বন্দরনায়েকের সরকার যদি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চাপের কাছে অতটা নতিস্বীকার না করতেন, অর্থাৎ বৌদ্ধধর্ম ও সিংহলি ভাষার অতটা পৃষ্ঠপোষকতা না করতেন, তাহলে হয়ত তামিলদের সঙ্গে সিংহলাদের দূরত্ব এই পর্যায়ে পৌঁছোতো না। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সমর্থন নিয়ে সলোমন বন্দরনায়েকে ক্ষমতায় এসেছিলেন বটে, তবে ভিক্ষুদের একদেশদর্শিতার সঙ্গে পেরে ওঠাও সম্ভবপর ছিল না তাঁর পক্ষে। পরিণামে তো বৌদ্ধ ভিক্ষুর হাতেই তাঁকে প্রাণ দিতে হলো কয়েক বছরের মধ্যে।
সলোমনের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন-পৃথিবীর প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরো এক দফা প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, কয়েক দফা বিরোদী দলীয় নেত্রী। কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রপতি-নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন প্রেমাদাসার কাছে। আপসোর সম্মেলনে আগত সকল প্রতিনিধিকে তিনি মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করবেন পার্লামেন্টের রেস্টুরেন্টে। আমরা যথাসময়ে সেখানে পৌঁছে গেছি, কিন্তু শ্রীমাভো আসতে পারেননি-তাঁর শরীর ভালো নেই। তাঁর হয়ে আমন্ত্রণকর্তার ভূমিকা পালন করলেন বিরোধী দলীয় উপনেতা। ভদ্রলোক বেশ হাসিখুশি ও লম্বা-চওড়া। বললেন, আমার নাম রানাতুঙ্গা। আমার ছেলে অজুêন ক্রিকেট খেলে-আপনারা অনেকে হয়তো তাকে চিনবেন। মিসেস বন্দরনায়েকের শরীর একটু খারাপ, তাই তিনি আসতে পারেননি। তিনি আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। খাওয়াদাওয়ার পরে আপনারা যদি তাঁর বাড়ি যেতে সম্মত হন, তাহলে তিনি আপনাদের সঙ্গে কফি খেতে পারেন।
বেশির ভাগ অতিথি এই কষ্ট স্বীকার করতে চাইলেন না। আমরা কয়েকজন মাত্র গেলাম।
শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের বাড়ি প্রাসাদোপম নয়, বরঞ্চ প্রত্যাশার তুলনায় ছোটোই বলা যেতে পারে। ড্রইং রুমটি সুসজ্জিত। তাতে শোভা পাচ্ছে সলোমন ও শ্রীমাভোর একটি ছবি এবং ইন্দিরা গান্ধির স্বাক্ষরযুক্ত একটি প্রতিকৃতি। আমরা ছবি দেখতে দেখতে শ্রীমাভো দেখা দিলেন। তাঁর বয়স তখন ৭৭/৭৮। রাজনীতিতে থাকলেও সক্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়েছে-কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজনৈতিক মঞ্চে স্থান করে নিয়েছেন।
কথায় কথায় শ্রীমাভো বললেন, সলোমন একবার কলকাতায় গিয়েছিল লুকিয়ে। বোধহয় ১৯৪৬ সালে। কলকাতায় ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের কোনো একটি সভায় সে উপস্থিত ছিল নেহরুর আমন্ত্রণে-নেহরুর সঙ্গে তার খুব সখ্য ছিল।
সেদিন তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রতি খুব ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বললেন, বিশ্বব্যাংক কৃষিতে ভর্তুকি দিতে নিষেধ করছে আমাদের। এর ফল কী হবে জানেন? শ্রীলঙ্কায় অন্তত অনেকে চাষবাস ছেড়ে ছোটোখাটো ব্যবসা ধরবে বা দোকান খুলবে। তাতে তারা টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু কৃষি-উৎপাদন অনেকখানি ব্যাহত হবে। বিশ্বব্যাংক এই নীতি প্রয়োগ করবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায়। সবাই মিলে যদি তা প্রতিরোধ না করা যায় তাহলে আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্বপ্ন মিলিয়ে যাবে।
ওই বয়সেও শ্রীমাভোর কথাবার্তা স্পষ্ট এবং সৌজন্যবোধ অসাধারণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সেটা যথেষ্ট প্রীতিকর না হওয়ার সম্ভাবনায় আর তুললাম না।
অন্য একটি প্রসঙ্গ। দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধি ন্যাশনাল সেন্টার ফর দি আর্টস-আয়োজিত সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধগুলো পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিলঃ Baidyanath Saraswati (ed), Interface of Cultural Identity and Development (New Delhi, 1996).

২৯·
বাংলাদেশের এক সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের নেতা হয়ে কলকাতায় গিয়েছিলাম ১৯৯৩ সালের মার্চে-সেকথাটাও বলা হয়নি। প্রতিনিধিদলে ছিল হুমায়ূন আহমেদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মনসুর মুসা, সেলিনা হোসেন, আরো অনেকে। ড· আশরাফ সিদ্দিকীও ছিলেন-প্রতিনিধিদলের নেতা হওয়া উচিত ছিল তাঁরই, কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় মনসুর মুসা আমার নাম প্রস্তাব করে ফেলায় আশরাফ সিদ্দিকী তা সমর্থন করে বসলেন। আমিও মজা পেলাম। তখন আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ঝুলছে। এক মন্ত্রণালয় মামলা করছে, আরেক মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি করে আমাকে বিদেশ পাঠাচ্ছে। সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগমের উদারতার কথা স্বীকার করতে হয়।
কলকাতায় নন্দনে একটা সভা হয়েছিল সাহিত্যিক ও সাহিত্যকর্মের আদানপ্রদান নিয়ে। সেখানে আনন্দ পাবলিশার্সের বাদল বসু বলেই বসলেন, বাংলাদেশের বই আমদানি করতে তাঁরা আগ্রহী নন, বরঞ্চ যেসব বই ওদেশে চলবে বলে মনে করবেন, তাঁরা তার ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশে আগ্রহী। পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের জাল সংস্করণ যে বাংলাদেশে প্রকাশিত হচ্ছে এবং আমরা কিছু করছি না-এ-বিষয়েও তাঁরা উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
আশরাফ সিদ্দিকী সেবারে পরিচয় করিয়ে দিলেন জগদীশ বসাকের সঙ্গে। ঢাকার সন্তান, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ বিল্ডিংয়ে তার বইয়ের দোকান, স্ত্রী ড· শীলা বসাক-লোকসংস্কৃতি-বিশেষজ্ঞ। পরে জগদীশ ঢাকায় আসায় তার সঙ্গে যোগাযোগটা ঝালিয়ে নেওয়া হয়। পরে এমনি হলো যে, তার বাড়িই হয়ে গেল আমার কলকাতার ঠিকানা।
ডিসেম্বরে আমি গেলাম হায়দরাবাদে-একটি মার্কিন সংগঠনের উদ্‌যোগে সাহিত্যের ইতিহাস-বিষয়ক এক সেমিনারে। সেমিনারের পরিচালক শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের ববরিনস্কয় অধ্যাপক শেলডন পোলক। শেলি আর আমি ছাড়া আর সকলেই ভারতীয়, তবে সংখ্যায় অল্প। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির সম্পাদক ইন্দ্রনাথ চৌধুরী। আমি হায়দরাবাদে পৌঁছে রাত জেগে প্রবন্ধ লিখেছিলাম, সেটা ভালো লেগেছিল শেলি ও ইন্দ্রনাথের এবং আরো কারো কারো।
হায়দরাবাদে সালার জঙ্গ জাদুঘর দেখবার মতো। নবাবের প্রাসাদের এক কোণে আলোছায়ায় ইতিহাস-বর্ণনাও খুব উপভোগ্য।
হায়দরাবাদ যাওয়ার পথে বেবী, শুচি ও আনন্দকে কলকাতায় জগদীশের বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। স্ত্রী শীলা ও মেয়ে মিলিকে সঙ্গে নিয়ে জগদীশ বেবীদের পুরী বেড়াতে নিয়ে গেল। তারাও পুরী-ভ্রমণ খুব উপভোগ করেছিল।

৩০·
ভারত সরকারের উদ্‌যোগে ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনসটিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর পরিচালক নিযুক্ত হন ড· বরুণ দে। ইনসটিটিউট-প্রতিষ্ঠার এবং বরুণ দের নিয়োগের পেছনে প্রবল সমর্থন ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল অধ্যাপক সৈয়দ নূরুল হাসানের। ইনসটিটিউটের দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে বরুণ নিয়ে আসেন রণবীর সমাদ্দারকে। রণবীর দুর্দান্ত ছাত্র ছিল, অত্যন্ত ভালো বক্তা, নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে কারাবাসও করে দীর্ঘকাল। কয়েকজন তরুণ গবেষক দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া নিয়ে সেখানে গবেষণাকর্মেও নিযুক্ত হয়।

১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে আমি যখন এশিয়াটিক সোসাইটিতে বক্তৃতা দিতে কলকাতায় যাই, তখনি বরুণ দে প্রস্তাব করেন, আমি যেন দু মাসের জন্যে তাঁদের ইনসটিটিউটে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে যোগ দিই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি এক বছরের সাবাটিকাল লিভ নিই এবং ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ওই ইনসটিটিউটের প্রথম ভিজিটিং ফেলোর দায়িত্বপালন করি। আমার থাকার ব্যবস্থা হয় গোল পার্কে রামকৃষ্ণ মিশনের ইনসটিটিউট অফ কালচারের অতিথি-ভবনে এবং বসার ব্যবস্থা হয় বেহালায় মওলানা আজাদ ইনসটিটিউটের দপ্তরে। আমাদের রাজনীতিবিদ অজয় রায়ের কন্যা পর্ণা তখন ওই অতিথি-ভবনে থেকে লেখাপড়া করছিল। তার সুবাদে আমি একদল তরুণ ছেলেমেয়ের কাকা হয়ে মহানন্দে থাকছিলাম। অতিথি-ভবনে খাওয়ার সময়ে আমার সঙ্গীর অভাব হতো না। একটি চমকপ্রদ ঘটনাও ঘটলো একদিন। অতিথি-ভবনের এক কর্মচারী আমাকে বললেন, ‘আমাদের ল্যাংগুয়েজ প্রোগ্রামের হেড সরকার সাহেব আপনার খোঁজ করছিলেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করার সময় কি আপনার হবে?’ ‘সরকার সাহেব কে?’ ‘আজ্ঞে, বি এন সরকার।’ চিনতে পারলাম না, তবু গেলাম। গিয়ে দেখি, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল বি এন সরকার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন-প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। তাঁকে বললাম, ‘আপনি যে জেনারেল সরকার, তা ওরা একবারও বললো না, সুতরাং আমি বুঝতেই পারিনি।’ তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘সে তো গতজীবনের কথা।’ সামান্যত যা বললেন, তাতে বোঝা গেল, ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর ওপর দিয়ে বড়োরকম ঝড়ঝক[&ৗ২৬৭০;]া বয়ে গেছে। সেই দুঃখশোক নিয়ে একরকম বৈরাগ্য গ্রহণ করেছিলেন, তারপর আবার মূলধারায় ফিরে এসে স্বেচ্ছাসেবা দিচ্ছেন এখানে বিদেশি ভাষাশিক্ষার কর্মসূচি দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিয়ে। ১৯৭১ সালে তিনি যাঁদের চিনতেন, তাঁদের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। সুতরাং মাত্র দু-একজনের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিবিষয়ে কি সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো কিছুই জানতে চাইলেন না।

মওলানা আজাদ ইনসটিটিউট থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে চারটি লিখিত বক্তৃতা দিতে বলা হয়েছিল আমাকে। কিছু মালমশলা আমি সঙ্গে নিয়ে যাই-তার বেশ খানিকটা সংগ্রহ করতে আমাকে সাহায্য করেছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের গোলাম মুস্তাফা। বাকিটা সংগ্রহ করি মওলানা আজাদ ইনসটিটিউট, রামকৃষ্ণ মিশন ইনসটিটিউট এবং কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনের গ্রন্থাগার থেকে। শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারিক ছিলেন বেবীর সহপাঠী নূরুননাহার-তিনি যথাসাধ্য সহযোগিতা করেন। তাঁর স্বামী নজীবর রহমান ছিলেন সরকারি কলেজের অধ্যাপক এবং তারও আগে আমার প্রথম জীবনের ছাত্র। নজীবর রহমান তখন অবসর নিয়ে কলকাতায় থাকেন-তাঁদের বাড়িতেও একদিন যাওয়া হয়।

ফেব্রুয়ারি মাসের ১৮, ১৯, ২২ ও ২৩ তারিখে মওলানা আজাদ ইনসটিটিউটে লিখিত বক্তৃতা দিই। যেদিন আমার দ্বিতীয় বক্তৃতা সেদিন সকালেই বেবী ফোন করে জানালো, আমাদের বন্ধু চৌধুরী মহীউদ্দীনের একমাত্র পুত্র বাবু ঢাকায় বাড়ির আঙ্গিনায় গাড়ি-দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মারা গেছে। মহীউদ্দীন তখন মেদিনীপুরে পীরের উরসে। এ-মর্মান্তিক খবরে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম।

বক্তৃতাগুলোর শিরোনাম ছিলঃ A Question of Identity, Religion and Politics, Looking Back at 1971 এবং Looking Forward to What? বক্তৃতার সারাংশ শ্রোতাদের মধ্যে বিলি করা হয়। প্রশ্নোত্তর-পর্বের আলোকে বক্তৃতাগুলি সামান্য পুনর্লিখন করি। রণবীরের পরামর্শও কাজে লাগাই। ইনসটিটিউটের হয়ে পর বছর তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে নয়া উদ্যোগ-Identity, Religion and Recent History নামে। বইটির উৎসর্গপত্র ছিল এরকমঃ To those friends in India/who, in 1971, had shared/our dream of Bangladesh/and our drive for its realization. তারপর স্বপ্ন সম্পর্কে হ্যাজলিটের একটা উক্তি উদ্‌ধৃত করেছিলামঃ “We often forget our dreams so speedily : if we cannot catch them as they are passing at the door, we never set eyes on them again.” বাংলাদেশ সম্পর্কে আমরা যে-স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার সম্পর্কে, আমার বিশ্বাস, কথাটা খুব প্রযোজ্য।

মার্চ মাসে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ এলো। সেখানকার স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ ডিভিশনের ড· সুখরঞ্জন চক্রবর্তী বাংলাদেশ সম্পর্কে দুদিনব্যাপী সেমিনার আয়োজন করেছেন। তিনি যখন জয়পুরে রাজস্থান ইউনিভার্সিটিতে ছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। এখন তিনি আমাকে চান তাঁর সেমিনারে। মওলানা আজাদ ইনসটিটিউটে দেওয়া একটি বক্তৃতা খানিক অদল-বদল করে পড়ে দিয়ে এলাম Religion and Politics in Bangladesh নামে। এই সেমিনারে বাংলাদেশের অনেকে ছিলেনঃ অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমেদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, রঙ্গলাল সেন, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ইমতিয়াজ আহমদ ও আবদুর রব খান। মওলানা আজাদ ইনসটিটিউট থেকে রণবীর সমাদ্দার ও মোহাম্মদ তাজউদ্দীন গিয়েছিল, মনে হচ্ছে বরুণ দেও। তার বাইরে মুচকুন্দ দুবের মতো কূটনীতিক ছিলেন, কলিম বাহাদুর, অনিরুধ গুপ্ত, কান্তি বাজপেয়ী, ইন্দ্রনাথ মুখার্জী, ন্যান্সি জেটলি ও শ্যামলী ঘোষসহ আরো অনেক বিদ্বজ্জন যোগ দিয়েছিলেন। সেমিনারের প্রবন্ধগুলো S. R. Chakravarty (ed.) Society, Polity and Economy of Bangladesh I Foreign Policy of Bangladesh নামে দু খণ্ডে নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত হয় (১৯৯৪)।

(চলবে)

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো।

Share This