বিপুলা পৃথিবী – আনিসুজ্জামান

কাছে-দূরে

২১·

এরশাদের পতনের পর সারাদেশে মানুষের মনে যে-উল্লাস ও আশাবাদ দেখা দেয়, তার একমাত্র তুলনা হতে পারে স্বাধীনতালাভের অব্যবহিত পরে দেশবাসীর আনন্দ ও প্রত্যাশার সঙ্গে। ১৯৯০ সালের বিজয় দিবস সংখ্যা সংবাদ-এ ‘এবারে’ নামে আমি একটা ছোটো লেখায় এই আশাবাদের কথা উল্লেখ করে বলেছিলাম, এবারে তোকে কোনোক্রমে মিথ্যে প্রতিপন্ন হতে দেওয়া চলবে না। হায়, ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া কত কঠিন!
৩১ ডিসেম্বর কমরেড মণি সিংহের সংগ্রামময় জীবনের অবসান হলো। পুষ্পার্ঘ দিয়ে আমরা শেষবারের মতো তাঁকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলাম।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা যাঁরা হলেন, তাঁদের অধিকাংশই আমাদের চেনাজানা মানুষ, আপনজনই বলা যেতে পারে। তাঁদের সততা ও যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ ছিল না। একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন যে অনুষ্ঠিত হবে, সবার মনে সেই প্রত্যয় দেখা দিলো।
এরশাদকে প্রথমে আটক রাখা হয় স্বগৃহে। বিবিসিকে দেওয়া তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বেশ উত্তেজনার সৃষ্টি হলে দুর্নীতির দায়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুলিস্তানের একটি বাড়িকে সাব-জেল ঘোষণা করে সেখানে তাঁকে সপরিবারে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। বেশ পরে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। তাঁর দলের অনেকে গ্রেপ্তার হন বটে, কিন্তু জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হয়।
দেশের সরকারপদ্ধতি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলতে থাকে। আওয়ামী লীগ এবং বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলই সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে মতপ্রকাশ করে। বিএনপির স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায় না। শেষকালে অবশ্য তারাও সংসদীয় পদ্ধতির আনুকূল্য করে।
নির্বাচনী প্রচারণা প্রায় প্রথম থেকেই শুরু হয়ে যায়। আট দলের শরিকদের মধ্যে আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে মতৈক্য না হওয়ায় প্রত্যেক দল স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র পেশ করে। পরে মনোনয়ন-সমন্বয়ের প্রয়াস নেওয়া হয়। তারপরও মনোমালিন্য রয়ে যায়।
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারিতে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, ভোটার তালিকায় বেবীর নাম আছে, আনন্দের নাম আছে, আমার নাম নেই। দিনশেষে সংবাদ-সম্মেলনে ভোটার-তালিকার অসম্পূর্ণতার দৃষ্টান্ত হিসাবে শেখ হাসিনা এই বিষয়টির উল্লেখ করে। কয়েকটি পত্রিকা থেকে ফোন করে আমার কাছে প্রকৃত অবস্থা জানতে চাওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের সচিব আইয়ুবুর রহমানও আমাকে ফোন করে তাঁর অফিসে যেতে বলেন এবং প্রতিকারের প্রতিশ্রুতি দেন।
পরদিন জানা যায়, বিএনপি ১৪০টি এবং আওয়ামী লীগ ৮৪টি আসনে জয়লাভ করেছে।
৩৫টি আসন পেয়ে জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি নিয়েছে তৃতীয় স্থান। সেদিন নাকি সংবাদ-সম্মেলন করে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হয়নি বলে বিএনপির অভিযোগ করার কথা ছিল। এখন পট বদলে গেল। শেখ হাসিনাই বললো, নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড· কামাল হোসেন বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। নির্বাচনে তিনি অবশ্য পরাজিত হন-অনেকে সে-পরাজয়ের কারণ মনে করেন আওয়ামী লীগের অন্তর্কলহ। তবে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা সম্পর্কে কামালের এই মন্তব্য তাঁর দলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এরই জের ধরে কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর গাড়ি আক্রান্ত হয়, তিনিও কটুকাটব্যের শিকার হন।
খালেদা জিয়া ও এরশাদ পাঁচ-পাঁচটি আসনেই নির্বাচিত হলেন। তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শেখ হাসিনা জিতলো একটিতে।
নির্বাচনের আগে বেতারে-টেলিভিশনে শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে যে-ভাষণ দিয়েছিল, সেটি তার অনুকূলে যায়নি বলে অনেকেই মনে করেন।
পরে দলীয় ব্যর্থতার দায়স্বীকার করে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ত্যাগ করে। আরো পরে দলীয় নেতা ও কর্মীদের অনুরোধে পদত্যাগপত্রটি সে প্রত্যাহার করে নেয়।
দুই প্রধান দলের সংসদ-সদস্যরাই এরশাদ-আমলের স্পিকারের কাছে শপথগ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ শপথবাক্য পাঠ করান।
নতুন মন্ত্রিসভা গঠন নিয়েও কিছু টানাপোড়েন হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ একবার বলেন যে, কোন দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, সে-সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কাউকে মন্ত্রিসভা গঠন করতে আমন্ত্রণ জানাবেন না। এতে বিএনপি শঙ্কিত হয়ে প্রতিবাদ করে। আওয়ামী লীগ বলে, সাংবিধানিক বিষয়টির আগে নিষ্পত্তি হোক, পরে মন্ত্রিসভা-গঠনের আমন্ত্রণ। বিএনপির প্রতি জামায়াতে ইসলামী সমর্থন জানালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এক পর্যায়ে খালেদা জিয়াকে মন্ত্রিসভা গঠন করতে আমন্ত্রণ জানান। আওয়ামী লীগ তাতে সন্তুষ্ট হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে রাষ্ট্রপতি নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। (চলবে)

সূত্রঃ প্রথম আলো, জানুয়ারী ১৮, ২০০৮।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *