বাংলাদেশ: সিক্স ডিকেডস

প্রামাণ্য বাংলাদেশ
সোহরাব হাসান

বাংলাদেশ: সিক্স ডিকেডস—সম্পাদনা: আনিসুজ্জামান, মুহাম্মদ জমির, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম \ এপ্রিল ২০১০ নিমফিয়া পাবলিকেশন \ প্রচ্ছদচিত্র: শিশির ভট্টাচার্য্য \ দাম: ২০০০ টাকা

১৯৪৭ থেকে ২০০৭—দীর্ঘ ছয় দশকে বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে বহু আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে দুই বার পতাকা বদল হয়েছে। ১৯৪৭ সালে বিদেশি শাসকেরা চলে যাওয়ার সময় এ দেশের মানুষ পাকিস্তানের মধ্যে যে মুক্তি খুঁজেছিল, তা তিরোহিত হতে সময় লাগেনি। ১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকায় এসে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার অস্বীকার করলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, পরবর্তীকালে শিক্ষা আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুথানের মাধ্যমেই পাকিস্তানি শাসকদের চরম জবাব দেয় বাঙালি জনগোষ্ঠী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি নেতৃত্ব নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গড়িমসি করে সামরিক জান্তা। যার পরিণতি ২৫ মার্চের গণহত্যা। এরপর দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা লাভ করে, যা কেবল একটি পতাকা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতায় সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল সব ধরনের অন্যায়-অবিচার, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি। গণতন্ত্র ও সাম্যই ছিল স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। কিন্তু আমরা কি সেই স্বাধীনতা পেয়েছি? পেলে কতটুকু পেয়েছি, না পেলে কেন পাইনি, কাদের কারণে পাইনি—সেসব আজ ইতিহাসের বিষয়।
ছয় দশকে সাতটি প্রতিপাদ্য বিষয় বাছাই করা হয়েছে এই গ্রন্থে। এর মধ্যে ‘টারবুলেন্ট ফার্স্ট ইয়ারস, ১৯৪৭-৫২’: অধ্যাপক-শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান, ‘কোয়েস্ট ফর রিজিওনাল অটোনমি’: দিলারা চৌধুরী, ‘আন্ডার মিলিটারি রুল, ১৯৫৪-৭০’: আবুল মাল আবদুল মুহিত, ‘দ্য ওয়ার অব লিবারেশন ১৯৭১’: মোহাম্মদ জমির, ‘দি মুজিব এরা: ১৯৭২-৭৫’: মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ‘আন্ডার জিয়া অ্যান্ড এরশাদ’: মেঘনা গুহঠাকুরতা, ‘টু ওয়ার্ল্ড ডেমোক্রেটিক পলিসি: ১৯৯১-২০০৬’: আতাউস সামাদ।
একটি বইয়ের কয়েকটি অধ্যায়ে বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের বিশাল ক্যানভাস ধারণা সহজ নয়। আর এ ধরনের লেখায় বিশ্লেষণের সুযোগও কম। তার পরও আনিসুজ্জামানের ভাষাভঙ্গিটি বেশ সরস, এবং ধারাবর্ণনার মধ্যেও আছে নিখুত বিশ্লেষণ। অন্যান্য লেখকও অনেক পরিশ্রম করে তথ্য-উপাত্তের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন, যাতে পাঠক চোখ বোলালে সব ঘটনার সারাংশ জানতে পারেন।
তবে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আলোকচিত্র। দীর্ঘ ৬০ বছরের চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ঘটনার সচিত্র স্মারক হয়ে উঠেছে এটি। এতে দেশ বিভাগের সময়ের সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের ছবি যেমন আছে, তেমনি আছে দাঙ্গাকবলিত জনপদের। আছে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল, আছে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ছবি। আছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সাতটি শাসনামলের দুর্লভ কিছু আলোকচিত্রও।
সেদিক দিয়ে বলা যায়, এই বই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ রকম একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ সম্পাদনের দায়ভার যাঁরা নিজেদের কাঁধে নিয়েছেন তাঁরা হলেন আনিসুজ্জামান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ জমির; এঁরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ঔজ্বল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মার্চ ১১, ২০১১

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *