বনস্পতি

বনস্পতি

এত বড় বটগাছ সচরাচর দেখা যায় না। পীরপুরের হাটকে যদি চিনিতে হয়, তবে যেকোনো অশীতিপর ক্ষীণদৃষ্টি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলেও ইহার উত্তর মিলিবে। দূরে, সে যত দূরেই হোক না কেন, যেন আকাশেরও প্রায় অর্ধেক ছাইয়া আছে, এমন একটা দৈত্যের মতো প্রকান্ড গোলাকার গাছের দিকে দারুণ তৎপরতায় শীর্ণ হাতটি উঠাইয়া সে বলিবে, আরে তুমি কি কানা? ওই দৈত্যিটার বারাবর চলে যেতে পারো না? যাহাকে বলা হইবে, সে যেন কোনো ব্যবসায়ী, ওই হাটের দিকেই যাইতেছে, আর কোনো উদ্দেশ্য তাহার নাই! পীরপুর গ্রামটি গ্রামের মতো নয়, সেখানে কেউ ঘর বাঁধিয়া বাস করিতে পারে একথা কেউ ভুলেও কল্পনা করিতে পারে না। কেবল একটি হাট লইয়াই যেন সারাটি গ্রাম। কেবল সারি-সারি টিনে ছাওয়া ছোটো ছোটো ঘর, মাঝখানে সরু ক্ষতবিক্ষত পথ, বটগাছের আশ্রয়ে চারিদিক চমৎকার ছায়াচ্ছন্ন, হাটবার আসিলে রাত থাকিতেই নৌকার পর নৌকার ভিড়, তারপর সারাদিন আর সারারাত কেবল জনসমুদ্রের কলোচ্ছাস। সেই কলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে কিছুমাত্র পরিচয় যাহাদের নাই, অথবা যেকোনো উপায়ে হোক সেই জনসমুদ্রের কিছুমাত্র আভাস যাহারা পায় নাই, তাহাদের পক্ষে তেমন দৃশ্যের কল্পনা করা সুকঠিন।

আশেপাশে দশ-বারোটা গ্রাম হইতে পীরপুরের এই হাট চোখে পড়ে। সেই গ্রামগুলি আর এই হাটের মাঝখানে প্রায় দুইমহলব্যাপী একখানা নদী আর সারি সারি অনেকগুলি বিল। বর্ষাকালে এই বিলগুলি আর নদীতে মিলিয়া, যে অবস্থা হয়, সেকথা মনে করিতে হইলে, কেবল কোনো সমুদ্রের সঙ্গেই তুলনা করা চলে। ওপারকে মনে হয় কোনো রহস্যময়, কুয়াশাচ্ছন্ন পৃথিবী, বিপুল রহস্যের ফেনা সারা গায়ে মাখিয়া এপারের পৃথিবীর সন্তানদের চোখে ধাঁধাঁ লাগাইতেছে। ইহাও মনে হয়, আকাশের সীমারেখায় তাহা কোনো ধূসর বর্ণের পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের রাশি —অন্যান্য মেঘের মতো যাযাবর নয়। সেই দুই পারের মাঝখানে বিস্তীর্ণ জলরাশি আরও দুর্বোধ্য। সারাক্ষণ কেবল দুই পারের মানুষকে ভীষণ শাসাইতেছে। তারপর বাতাস বহিতে থাকে, বিশাল জলরাশিতে এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত নৌকাগুলি সাদা এবং আরও নানারকমের রঙিন পাল মেলিয়া যেন পাখায় ভর দিয়া উড়িয়া আসিতে থাকে, বটগাছের শত শত ডালের ভিতর রক্তের জোয়ার আসে, কোটি কোটি পাতা মৃদু কাঁপিতে থাকে। তারপর কোনো এক সময় হয়তো শীতের আবির্ভাব, মাথার উপরে কাঠফাটা রৌদ্র, সমুদ্রের বুক দেখা যায়, আর বটগাছের নীচে অজস্র শুকনো পাতার রাশি। একটা মুসলমান বুড়ি মাঝে মাঝে সেই পাতাগুলি ঝাঁট দিয়া নেয়।

প্রায় দুই-শ বছর আগে চলিয়া যাইতে হয়। তখন ১৭৫০ সাল। তখনও সমগ্র ভারতবর্ষের কেন, কেবলমাত্র বাংলাদেশের শাসনভারও জনকতক হিন্দু শ্ৰেষ্ঠীর চেষ্টায় ইংরেজ বণিকের হাতে চলিয়া আসে নাই, তাহাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তখনও প্রকৃত শাসনপ্রতিষ্ঠান হইয়া উঠিতে পারে নাই, এমন দিনে এক রাত্রে পীরপুরের বৃদ্ধ জমিদার নবকিশোর চৌধুরী তাঁহার শয্যা-সঙ্গিনী তৃতীয়পক্ষের সুন্দরী যুবতী স্ত্রীকে লইয়া বড়ো বিব্রত বোধ করিলেন। একটা ভয়ানক উত্তাপে এক মুহূর্তে কী জানি কেন সমস্ত শরীরটা তাঁহার দারুণ অবশ হইয়া, আসিল, কেমন একটা অবসাদে ভরিয়া গেল, তিনি বড়ো অসহায় বোধ করিলেন, ইচ্ছা হইল দুই হাত দিয়া নিজের চুল ছিড়িতে থাকেন। অবশেষে গুটি শুটি মারিয়া তিনি পড়িয়া রহিলেন।

রাত তখন দুইটা। চারিদিক গভীর নিস্তব্ধ, কোথাও টুঁ শব্দ শোনা যায় না। সামনের জানালা দিয়া বাগান হইতে তীব্র ফুলের গন্ধ আসিতেছে। বিছানায় বালিশের পাশেও নানারকম ফুল, কিন্তু নবকিশোরের কাছে তাহা এখন বিষের মতো মনে হইল, তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো, অথবা ছুঁচের মতো তাঁহাকে বিধিতেছে। পাশেই অরুন্ধতী তাহার প্রখর যৌবন আর চেহারার দীপ্তি লইয়া মুখ ফিরাইয়া শুইয়া আছে। নবকিশোরের ইচ্ছা হইল ডাক ছাড়িয়া কাঁদেন। তাঁহার মাথা ঘুরিতে লাগিল, তিনি ঘামিতে লাগিলেন। আস্তে আস্তে তিনটা বাজিয়া গেল, হয়তো রাতকে দিন ভাবিয়া কয়েকটা কাক বাইরে কা-কা করিতেছে, কাঁটার বিছানায় শুইয়াও নবকিশোর একসময় ঘুমাইয়া পড়িলেন। ঘুমাইয়া স্বপ্ন দেখিলেন, তাঁহার আশে-পাশে একদল নগ্ন নরনারী, চমৎকার তাহাদের চেহারা, যেন শ্বেতপাথরে খোদা মূর্তি, চমৎকার চোখ-মুখের ভঙ্গি, যেন অজস্র মানিক ঝরিতেছে, নবকিশোর দেখিলেন, খিলখিল করিয়া হাসিয়া তাহারা একজন আর একজনের সঙ্গে কথা বলিতেছে, অজস্র চুমা খাইতেছে, কেহ হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া কোন মেয়ের হাঁটুতে মুখ রাখিয়া কী সব বলিতেছে, কেউ বুকের উপর মুখ গুঁজিয়া পড়িয়া রহিয়াছে আর সেই একদল হাস্যমুখর, সৌন্দর্যদীপ্ত মানুষের মধ্যে তিনি যেন একটি ভেড়া! এমন সময় নবকিশোর হঠাৎ জাগিয়া উঠিলেন, অসহায়তার তুলনা তো নাই, শরীরটাকে আরও অবসাদগ্রস্ত বোধ করিলেন। ঘরের এককোণে বাতি জ্বলিতেছে, মিটমিট করিয়া চাহিয়া তিনি দেখিলেন, আশ্চর্য, বিছানা খালি, পাশে তাঁহার সুন্দরী স্ত্রী অরুন্ধতী নাই, ঘরের দরজা শাশা খোলা, হু হু করিয়া শেষরাত্রির ঠাণ্ডা বাতাস আসিতেছে। ব্যাপার দেখিয়া তাঁহার চোখের পাতা আর জ কুঁচকাইয়া আসিল, তিনি খাট হইতে নামিয়া দরজার কাছে আসিলেন, আস্তে ডাকিলেন— বউ?

কিন্তু কোনো উত্তর নাই। শুধু তাঁহার গলাটাকেই এই নিস্তব্ধতায় ভীষণ বিকৃত শুনাইল। আবার আরও জোরে ডাকিলেন বউ বউ?

তবু কোনো উত্তর নাই। নবকিশোরের প্রশস্ত কপাল আরও কুঁচকাইয়া আসিল, ঘর হইতে বার হইয়া তিনি এখানে-সেখানে অরুন্ধতীকে খুঁজিতে লাগিলেন, বাগানেও অনেক খুঁজিলেন, পুকুরের ঘাটের কাছে গিয়া ডাকিলেন, বউ? ও বউ?—কিন্তু অন্ধকারে কেবল প্রতিধ্বনিই ফিরিয়া আসিল। নবকিশোর ভাবনায় পড়িলেন। হঠাৎ চোখে পড়িল, ছেলে সুরেন্দ্রকিশোরের ঘরে আলো জ্বলিতেছে, আর সেখানে কোনো মেয়েলি স্বরে কথাবার্তার আওয়াজও শোনা যায়। ধীরে ধীরে তিনি অগ্রসর হইলেন, বুক তাঁহার দুরুদুরু কাঁপিতেছে। ঘরের ভিতর কথাবার্তার শব্দ আরও স্পষ্ট হইয়া উঠিল, আর কোনো সন্দেহ রহিল না, একবার উঁকি মারিয়া যা দেখিলেন, তাতে রাগে তাঁহার সর্বাঙ্গ জ্বলিতে লাগিল, হাত-পা কাঁপিতে লাগিল।

পীরপুরের চৌধুরী পরিবারের ভাগ্যে আজ এ কী অভিশাপ, হায়, আজ এ কী দুরপনেয় কলঙ্কের ইতিহাস তাহাকেই বিশেষ করিয়া দেখিতে হইল। তাহার তৃতীয়পক্ষের স্ত্রী সুন্দরী অরুন্ধতীর সঙ্গে এক বিছানায় শুইয়া তাহার বুকে মুখ রাখিয়া প্রেমালাপ করিতেছে তাঁহারই একমাত্র ছেলে সুরেন্দ্রকিশোর!

পরদিন অরুন্ধতী বা সুরেন্দ্র আর কাহাকেও ত্রিসীমানায় দেখা গেল না এবং পরেও আর কোনদিন দেখা যায় নাই। কেন এমন হইল, কিছুটা অনুমান করা যায় বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ জানা যায় না। তবে জনশ্রুতি এই যে, নবকিশোর নাকি অরুন্ধতীকে রূপকথার রাজাদের মতো একেবারে মাটি চাপা না দিলেও এমন কিছু একটা করিয়াছেন যাতে সেই দুর্ভাগ্য মেয়ের মৃত্যু ঘটিয়াছে। মৃত্যুটা কল্পনা করিতে পারি এইরূপ : মস্ত বড় দালানের যেদিকটা বেশ একটু নির্জন, আর গাছপালার ছায়ায় বেশ গম্ভীর, সেখানে একটা সুন্দর ঘর আছে। ঘরটি চমৎকার সাজানো। মেঝেতে দামি ফরাস আর বালিশের ছড়াছড়ি, বাতাসে সুগন্ধ। চারিদিকে কেমন একটা নির্জন ভয়াবহতা, মাটিতে উঁচটি পড়িলে শোনা যায়।

এই ঘরের এক বিপুল ইতিহাস আছে। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে হইতে সেই ইতিহাসের শুরু। নবকিশোর তাঁহার সারা রাজ্য জুড়িয়া একটি জাল তৈরি করিয়াছিলেন, সেই জালে যে মেয়েগুলি ধরা পড়িত, তাহাদের ধরিয়া আনা হইত এই ঘরে—সকলের চোখেই পাগলের মতো দৃষ্টি, নয়তো নিতান্ত ছেলেমানুষ হইলে সারামুখ চোখের জলে ভেজা, মাথার চুল আর পরনের কাপড় এলোমেলো, আত্মসমর্পণের ইচ্ছা মোটেই না থাকিলেও আত্মরক্ষায় নিশ্চেষ্ট। নবকিশোর তাহাদের কোনো কুলই রক্ষা করিতেন না, কেবল পথে বসাইতেন। সেই মেয়েগুলি তখন পথে পথে ঘুরিয়া বেড়াইত, না হয় গ্রামের হাটে-হাটে কোন বিশেষ পল্লিতে আশ্রয় লইয়া বাঁচিত। এভাবে অনেক মেয়ের কুমারী অথবা বধূজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়াছে। কিন্তু তাহাদের মৃত্যু দেখিয়া নবকিশোর বিন্দুমাত্র বিব্রত হন নাই, তাহাদের অভিশাপ আর বেদনার রক্ত গায়ে মাখিয়া তিনি এতটুকু বিচলিত হন নাই, বরং তাহাদের দেহ লইয়া বারবার ছিনিমিনি খেলিয়াছেন, একদিকে সর্বনাশ করিয়া অন্যদিকে লাথি মারিয়া ছাড়িয়া দিয়াছেন। নবকিশোরের সুদীর্ঘ জীবন, আর সেই জীবনের সঙ্গে জড়িত এই ঘরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এই। এখন সেই ঘর তত ব্যবহৃত হয় না, মেঝেতে ধূলি পড়ে। তার মূলে একমাত্র কারণ হয়তো বার্ধক্যের অক্ষমতা এবং সেই কারণে আগের মতো প্রচুর উৎসাহের অভাব। কিন্তু সেদিন যে কান্ড ঘটিল তাকে সত্যই অদ্ভুত বলা চলে। ঘটনাটি গতানুগতিক পথ ধরিয়া ঘটে নাই। নবকিশোর সেই ঘরের কথা মনে করিয়াই স্ত্রীর জন্য উপযুক্ত শাস্তি খুঁজিয়া পাইলেন। অরুন্ধতী পরম গাম্ভীর্যে ঘরে ঢুকিল, নবকিশোর বাহির হইতে দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন এবং অনেকদিন পর্যন্ত আর খুলিলেন না। অরুন্ধতী প্রথমে অনেক ধাক্কা দিয়াছিল, তারপর কাঁদিয়াছিল। বাগানের সেই নির্জন অংশ তাহার উচ্ছ্বসিত কান্নায় থমথম করিতে লাগিল। কিন্তু কাঁদিতে কাঁদিতেও ক্লান্তি আসে, তাহার গলার স্বর একদিন আর শোনা গেল না।

এবং ইহার কয়েকদিন পরেই দেখা গেল নদীর পারে একটা চমৎকার খোলা জায়গা বাছিয়া সেখানে নবকিশোর দুটি বট অশ্বথের চারা একসঙ্গে পুঁতিয়া দিলেন,

তারপর সেই গাছে অনেক সিঁদুর মাখাইয়া নূতন কাপড় পরাইয়া বিরাট সমারোহে পূজা করিলেন, আশেপাশের বিভিন্ন গাঁ হইতে হাজার হাজার প্রজা আসিয়া তাঁহার সেই পূজা দেখিল, অজ্ঞাত নিরুদ্দেশ দেবতার উদ্দেশে ভক্তিভরে প্রণাম করিল। ধূপের ধোঁয়ায় আর মানুষের কোলাহলে কত ছাগশিশুর চীৎকার আর কান্না শুনিয়াও শোনা গেল না, ধুসর মাটি রক্তে ভাসিয়া গেল, নবকিশোর মাটিতে গড়াগড়ি দিয়া মা মা করিয়া অনেক ডাকিলেন… বটগাছের জন্মের ইতিবৃত্ত মোটামুটি এই। কিন্তু এটুকু জানিবার চেষ্টাও জনসাধারণের নাই, গাছের মধ্যে দেবতার অংশ আছে, ইহা জানিতে পারিয়াই তাহারা খালাস।…

তারপর বিখ্যাত ১৭৫৭ সাল। পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলা অথবা ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ ভাগ্য নিরূপিত হইয়া গেল। বাংলার ধনীরা ইংরেজের জয়লাভের আনন্দে আত্মহারা হইয়া গেলেন।

অথচ পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে কত নিরীহ দরিদ্রের রক্তে ভাসিয়া গেল। পীরপুরের একটি ছেলেও যে হতভাগ্য সিরাজের পক্ষে প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়াছিল অশেষ বীরত্ব দেখাইয়াছিল, ইহা ইতিহাসের পাতায় লেখা না তাকিলেও পীরপুরের ছেলে-বুড়ো কে না জানে?

তাহার নাম অজুন।

সেবার কোথা হইতে এক বাঘ আসিয়া সারাটা গ্রামে ভয়ানক উৎপাত শুরু করিয়া দিল, আজ এ বাড়ির ছাগলটা, কাল ও বাড়ির বাছুরটা প্রায়ই পাওয়া যাইতে লাগিল না। বৃদ্ধ এবং শিশুরা ভয়ে ভয়ে আর সন্ধার পর বাহির হইত না। গভীর রাত্রে কোনো গভীর সমস্যায় পড়িলেও কেহ ভুলেও দরজাটা একটু ফাঁক করিত না। হয়তো কখনো একটা বাছুর ভীষণ আর্তনাদ করিয়া উঠিত। গরুগুলি প্রত্যুত্তরে মা মা করিয়া চীৎকার করিতে থাকিত, তারপরেই সব শেষ, এমন দৃশ্যের অভাব রহিল না। গ্রামের ভিতর একটা আতঙ্কের ছায়া নামিয়া আসিল। যে পথে বাঘের পায়ের ছাপের মতো কিছু চোখে পড়িত, সে-পথ আর কেউ মাড়াইত না। কিন্তু এই দুঃসময়েও অর্জুনের সাহস দেখিয়া সকলে অবাক হইয়াছিল বাস্তবিক এমন অসীম সাহসের পরিচয় খুব কমই পাওয়া যায়। সে একদিন সেই দুর্ধর্ষ বাঘটাকে সকলের পায়ের সামনে আনিয়া হাজির করিল। ব্যাপার দেখিয়া বৃদ্ধরা ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন এবং এমন ভবিষ্যৎবাণীও করিলেন যে, সে কালে একটা কিছু হইবে।

মেয়েরা আড়ালে থাকিয়া তাহার চেহারার দিকে চাহিয়া বিস্ময়ে হতবাক হইল। আশে-পাশের দু-চারখানা গ্রামেও এমন বীরত্বের কাহিনি মুহূর্তের মধ্যে প্রচার হইতে বাকি রহিল না। এমন কি স্বয়ং জমিদার মহাশয়ও দারুণ খুশি হইয়া কিছু পুরস্কার দিলেন তাহাকে। কিন্তু সকলের প্রশংসাবৃষ্টির আড়ালে অর্জুনের জীবনে আর একটি ব্যাপার যা ঘটিল, তার তুলনা নাই। অর্থাৎ অর্জুন প্রেমে পড়িল। তাহার অথবা সেই মেয়েটির প্রেমের আসরে নামিবার প্রথম দৃশ্যটি এই — রাজকুমার মন্ডলের বাড়ির সামনেই একটা পোড়োবাড়ির উঠানে মরা বাঘটাকে ফেলিয়া রাখা হইয়াছিল। রোজই সেখানে কিছু না কিছু লোক জমিয়াই থাকিত। রাজকুমারের বড় মেয়ে চম্পক একদিন সেখানে গিয়া হাজির হইল, বাঘটার চারদিকে চরকির মতো কয়েকবার পাক খাইয়া, নাকে কাপড় দিয়া এখানে-সেখানে থু-থু ফেলিয়া অত্যন্ত ঘৃণাভরে বলিল, বারে, বাঘের গায়ে অমন গন্ধ কেন?

কাছেই ছিল অর্জুন। ব্যাপার দেখিয়া সে কিছুতেই হাসি চাপিয়া রাখিতে পারিল , ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল। হাসি থামিলে শেষে আবার দারুণ গম্ভীর হইয়া এমন একটা তুচ্ছ বিষয়ও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বুঝাইয়া দিল যে চম্পক তো অবাক ! এমন দরদভরা স্বরে কেউ অনেক কাল তাহার সঙ্গে কথা বলে নাই। সে আগেও তাহাকে দেখিয়াছে বটে কিন্তু ভালো করিয়া দেখে নাই, আজ নতুন করিয়া দেখিল, যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া বীর আসিয়াছে, তাহার চুল এলোমেলো মুখভরা হাসি, হাতে খোলা তরবারি আর ঢাল, এখন শুধু বরণ করিতেই বাকি। বীর যুবককে বরণ করিবার লোক এখন কেথায়? চম্পক হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল, কোনো হরিণশিশুর মতো তাহার চোখের দৃষ্টি।

তারপর প্রেমের দ্বিতীয় দৃশ্যের কথাও বলিতে হয়। রাজকুমারের বাড়িতে একদিন কীর্তনের আয়োজন করা হইয়াছে, গ্রামের অনেকেই আসিয়া কীর্তনে যোগ দিয়াছে। অর্জুন আসিয়াছে। চম্পক আর স্থির থাকিতে পারিল না, চুপিচুপি কখন কীর্তন আসরের কাছে গিয়া হাত নাড়িয়া ইঙ্গিতে অর্জুনকে ডাকিল, অর্জুন আসিল—কিন্তু কাছে আসিলে পর চম্পক আর কিছু বলিতে পারে না, মাটির দিকে চাহিয়া নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া থাকে। এখানে বলিয়া রাখা ভালো চম্পকের মাথায় কিছু ছিট আছে, সে হ্যাঁ বলিলে মাঝে-মাঝে তাহার অর্থ হয় না। না বলিলে অর্থ হয় হ্যাঁ। অনেকসময় ভুলেও সে চুল বাঁধিত না, আবার একসময় যখন-তখন চুল বাঁধিত। বছর চারেক আগে স্বামী তাহার জলে ডুবিয়া মারা গিয়াছে। স্বামী জলে ডুবিয়া মরিলে স্ত্রীকে কপালে সিঁদুর মাখিয়া বারো বছর অপেক্ষা করিতে হয়, চম্পকও অপেক্ষা করিতেছিল। এখন বয়স তাহার সতেরো। স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ পাইয়া সে পাগলামি করিয়া এখানে-সেখানে আছাড় খাইয়া অনেক কাঁদিয়াছিল কিন্তু অর্জুনের ছায়ার আশ্রয়ে এই পাগলামি এখন অনেক কমিয়াছে। সে যেন নতুন পৃথিবীতে পা ফেলিল, জলের আয়নায় নিজের চেহারা দেখিয়া নিজেরই এখন আর বিশ্বাস হয় না, চোখের দৃষ্টি আচ্ছন্ন হইয়া আসে, গাছের নীচে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি সে প্রাণ ভরিয়া শোনে।

খুব দ্রুত পদক্ষেপের মতো অনেকগুলি দিন কাটিয়া গেল। কিন্তু একসময় বিদায়ের পালা আসে। একদিন চমৎকার সাজিয়া এক বিদেশগামী নৌকায় অর্জুন চড়িয়া বসিল। দূর হইতে দারুণ চোখের জলে ভিজিয়া চম্পক দেখিল, বীরকুমার আবার যুদ্ধে যাইতেছে, এবারও সে জয়লাভ করিবে নিশ্চয়।

নদীর মাঠ হইতে কিছুদূরেই সেই বটগাছ। এখন কিছুটা বড়ো হইয়াছে। পাতাগুলি কচি, চমৎকার, চকচক করে। রোদ খুব তীব্র হইয়া উঠিলে ভাঙা ভাঙা ছায়া মাটিতে পড়ে। দু-একটি ডালের ভিতর দিয়া সুতার মতো সরু শিকড় বাহির হইয়া গিয়াছে। গাছের গোড়ার দিকটা সিঁদুরে লাল, আর সেই গোড়ার মাটিও প্রচুর দুধ আর তেল খাইয়া কালো রঙ ধরিয়াছে। মাঝে মাঝে দেখা যায়, এই গাছের নীচে একটি মেয়ে আসিয়া দাঁড়ায়, তাহার চুল এলোমেলো-চোখ দুটি কাহার প্রতীক্ষায় আকুল। সে চম্পক। চম্পক মাটিতে কপাল ঠেকাইয়া সেই দেবাংশী গাছের উদ্দেশে অনেক প্রার্থনা জানায়, বিড়বিড় করিয়া বলে, জয়ের মালা পরিয়া তাহার অর্জুন যেন শীগগিরই ফিরিয়া আসে, সে আবার তাহাকে বরণ করিয়া লইবে, তাহার বুকের ছায়ায় সেই বীরকে আশ্রয় দিবে। চম্পকের বুকের ভিতরটা হঠাৎ কেমন করিয়া উঠিল, স্তনের ভিতরও কেমন একটা যন্ত্রণা, দুই হাতে সে তাহার স্তন চাপিয়া ধরিল।

চম্পক নদীর পারে আসিয়া দাঁড়ায়, চোখ ছোটো করিয়া বহুদূর পর্যন্ত চাহিয়া থাকে, চোখের দৃষ্টি কখনো ভাঙিয়া আসিলেও সে নিজে কখনও ভাঙে না, বর্ষায় ক্ষিপ্ত নদীর ঢেউ পায়ের উপর আসিয়া আছাড় খায়, বর্ষা যায় শীত আসে, শীত যায় আবার বর্ষা আসে,তবু অর্জুন আসে না, বছরের পর বছর ঘুরিয়া গেল, বটগাছ আরও বাড়িয়া ডাল-পালা মেলিয়া মাটিতে দীর্ঘতর ছায়া বিস্তার করিল, গ্রামের কোথাও দারুণ জঙ্গলে ভরিয়া গেল, কোথাও মানুষের পদক্ষেপে পরিষ্কার হইল, গ্রামে আবার বাঘ দেখা দিল, অনেক ছাগল-বাছুর খাইল তবুও অর্জুন আসে না। পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে স্বাধীনতার লড়াই করিয়া সে প্রাণ দিয়াছে।

নদীর পারে দাঁড়াইয়া থাকিতে থাকিতে চম্পকের শরীরও একদিন ভাঙিয়া আসে, সে আর দাঁড়াইয়া থাকিতে পারে না। একদিন দেখা দিল, রাজকুমার মন্ডলের মেয়ে চম্পক নদীর বিক্ষুব্ধ জলে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে, প্রাণপণে সে সাঁতরাইতেছে। নদীর ঢেউ-এর আঘাতে খোঁপা তাহার খুলিয়া গেল, জলের তালে তালে নাচিতে লাগিল, চম্পক সেই যে জলে নামিয়াছিল, আর ফিরিয়া আসে নাই।

তারপর ১৭৬৯ সাল। সেবার বাংলার আকাশে এক গভীর দুঃস্বপ্ন দেখা দিয়াছিল। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কথা আজও লোকে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে স্মরণ করে। এই সভ্যতার দিনে এক যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো উপায়ে এমন প্রাণহানি ঘটিয়াছে কি না সন্দেহ। না খাইতে পাইয়া সেবার বাংলার এক-তৃতীয়ংশ লোক মরিয়া গেল। শুধু মরিয়া গেল বলিলে মৃত্যুটা বড়ো সহজই শোনায়। সেই মৃত্যুর দৃশ্যগুলি এত করুণ আর এত ভয়াবহ যে শুনিলে শরীরে কাঁটা দিয়া ওঠে। তবু অত্যাচারের সীমা নাই। তখন রাজত্ব আদায়ের যাহারা মালিক, তাহারা আরও দ্বিগুণ উৎসাহে এবং পরিমাণে রাজস্ব আদায় করিতে লাগিল। তাহাদের অত্যাচারে লোকে ঘর ছাড়িয়া পালাইল, স্ত্রী-কন্যা বেচিয়া খাইল, অথবা আত্মহত্যা করিয়া বাঁচিল। সাধারণ কুকুরও সেদিন ক্ষুধায় কাতর হইয়া মানুষকে তাড়া করিতেছে। এমন দিনে পীরপুরের লোকগুলির অবস্থাও কম ভয়ানক নয়। সারা গাঁয়ে দিনের বেলায়ও টুশব্দটি শোনা যায় না। কারোর মুখে কোনো কথা নাই, সকলেই কেবল একে অন্যের দিকে হাঁ করিয়া তাকাইয়া থাকে, তাহারা আজ কাঁদিতেও ভয় পায়। মাঝে-মাঝে কেবল কুকুরের কাতর ডাক শোনা যায়। কুকুরের ডাক আজ মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। সেখানকার বৃদ্ধরা তখন কেবল তাহাদের দীর্ঘ, শীর্ণ আঙুল দিয়া মাটিতে আঁক করিতেছে, প্রৌঢ়রা আর কোনো উপায় না দেখিয়া স্ত্রীর মাংসপিন্ডকেই জীবনের সার বলিয়া জানিল, যুবকেরা মাঠে মাঠে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। মেয়েদের বেণী রচনায় আর সাধ নাই, কপালে টিপ দিতে আর পায়ে আলতা পরিতেও ইচ্ছা জাগে না।

একদিন এই দুর্ভিক্ষপীড়িতের দল সেই বটগাছের নীচে আসিয়া সমবেত হইল, বড়ো বড়ো উস্কখুস্ক চুলেভরা অনেকগুলি মাথার সেই ভোলা জায়গাটি ভরিয়া গেল, সেই মাথাগুলি কোনো গভীর প্রার্থনায় নতমুখী। দেবাংশী গাছের দিকে চাহিয়া তাহারা অনেক প্রার্থনা করিতে লাগিল।

তারপর আরও অনেকগুলি বছর কাটিয়ে গিয়াছে, প্রায় একশ বছরের কাছাকাছি, এতদিনে পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে, পীরপুরেরও। আগে যাহারা ছিল, এখন তাহারা নাই। এখন যাহারা আছে তাহারা আর একদল লোক! কিন্তু তাহাদের রক্তে একই মানুষের রক্তের প্রবাহ বহিতেছে। সেই বট গাছকেও আর চিনিবার জো নাই। একদিন যা ছিল নিতান্ত শিশু, সে এখন বড়ো হইয়া প্রকান্ড ছায়া বিস্তার করিতেছে। পাতাগুলি এত ঘন যে আকাশও অনেকসময় দেখা যায় না। এখানে-সেখানে মোটা-মোটা শিকড়, মাটির রস পান করিতে অতৃপ্তি নাই। গাছের ছায়া এত নিবিড় যে গ্রামের ছেলেরা ইহার নীচে বসিয়া আড্ডা মারে, শীতকালে এখানে বসিয়াই আগুন পোহায়, ধোঁয়ায় তাদের মুখ ধূসর হইয়া আসে। এ ছাড়া গাছের নীচে দু-একটি ঘর উঠিয়াছে। তার মধ্যে একটি মুদি-দোকান।

এত দিন পীরপুরের এই বটগাছকে ঘিরিয়া কত ঘটনা ঘটিয়া গেল, আরও কত ঘটিবে কে জানে! এতকাল এই গাছ গ্রামের দুইপুরুষ দেখিয়াছে, আরও দেখিবে।

১৮৫৭ সালে কানপুরে সিপাহিবিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠিল, ধীরেধীরে তাহা সারা ভারতবর্ষে ছড়াইয়া পড়িল, বাংলায়ও সে ঢেউ আসিয়াছিল। সেই বিপ্লবের আগুন এত তীব্র হইয়াছিল যে শাসনযন্ত্রের চাকাও নড়িয়া উঠিয়াছিল। ঐতিহাসিকগণ এমন কথাও বলেন, সেই বিপ্লবের যাঁরা পরিচালক ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে আর যা কিছুরই অভাব থাকুক আর নাই থাকুক শৃঙ্খলার অভাব যথেষ্টই ছিল; তাই আজও আমরা ইংরেজের আমল দেখিতেছি। সেই বিদ্রোহের ইতিহাসকে আজও লোকে কালা-গোরার যুদ্ধ বলিয়া স্মরণ করে। বিদ্রোহ দমনের দৃশ্য তাহারা অনেক দেখিয়াছে বটে কিন্তু মুখ ফুটিয়া বলিতে সাহস করে না। তখন সিপাহিদের কুকুরের মতো তাড়া করা হইত। অনেক ভারতবাসী তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছে।

একদিন একটা সিপাহি পীরপুরের বটগাছে আসিয়া আশ্রয় লইল। সে যেন কোনো পলায়নপর সিংহ, পলাইতেছে বটে, কিন্তু তবু তাহার চোখদুটি জ্বলজ্বল করে। মুখের রঙ গৌর, পেশিবহুল শরীর, হাত-পায়ে অপরিষ্কার কাদামাটির দাগ, পোষাক ক্ষতবিক্ষত, লোকটা একটা দিন সেই গাছের উপর লুকাইয়া রহিল। দুই একজন যাহারা তাহাকে দেখিয়াছে, অনেককাল তাহাকে ভুলিতে পারে নাই, সে ওইভাবে পলাইয়াও অত্যাচারীর হাত হইতে রেহাই পাইয়াছিল কি না জানা যায় নাই।

তারপর আরও কয়েকটা বছর কাটিয়াছে। চিরকাল একই রকম যায় না। গ্রামে একবার ভয়ানক বসন্ত দেখা দিল। এমন একটি ঘর রহিল না যেখানে অন্তত একটিও বসন্তের রোগী নাই। প্রায় কোনো রাত্রিশেষে বা সন্ধ্যার অন্ধকারে ঘন-ঘন হরিধ্বনি শোনা যাইতে লাগিল। হঠাৎ শুনিলে গায়ে কাঁটা দিয়া ওঠে। নদীর পারের জল আর আকাশ শ্মশানের অগ্নিশিখায় লাল হইয়া গেল।

এমন চরম অসহায়তার দিনে গ্রামের অধিষ্ঠিত দেবতার কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। গ্রামের সকলে আবার হাঁটু গাড়িয়া বসিল গাছের নীচে, প্রাণপণে প্রার্থনা করিতে লাগিল। কী কারণে দেবতা রাগ করিয়াছেন কে জানে। সমস্ত গ্রামবাসী মিলিয়া দেবতার পায়ে ধরিয়া ক্ষমা চাহিয়া বলিল, হে দেবতা ক্ষমা করো। কোনোদিন না বুঝিয়া কী ভুল করিয়া ফেলিয়াছি, তুমি পিতা হইয়া তাহা ক্ষমা করো।

দেবতার পায়ের কাছে শত শত পাঁঠা বলি দেওয়া হইল, মাটিতে রক্তের নদী বহিয়া গেল। দেবতাকে একবার রাগাইলে আর উপায় নাই, অনেক মূল্য দিয় তবে সেই রাগ থামাইতে হয়। এমন অনেক বিপদ-আপদে যিনি পাশে আসিয়া দাঁড়ান তাঁহাকে মাঝেমাঝে খুশি না করিলে চলে না।

এদিকে দিনের পর দিন কাটিতে থাকে। আজ যা অতি আড়ম্বরে ঘটে, কাল তা মনেও থাকে না। কিছুই ধরিয়া রাখিবার উপায় নাই।

ধীরে ধীরে দেশে বণিকদের নিজেদেরই প্রয়োজনে রেলপথের বিস্তার হইতে লাগিল। তাতে সাধারণ লোকেরও কিছু উপকার হইলে বটে কিন্তু সেই কিঞ্চিৎ উপকারের বদলে যতখানি অপকারের অভিশাপ আসিয়া দেখা দিল, সেই কারণে শুধু মালিকদেরই দোষ দেওয়া চলে। একটা যন্ত্রের কাছে যখন একটা ভয়ানক সুখের আশা করা অন্যায় নয়, সেখানে এই অভিশাপের ইতিহাস বড়োই করুণ! দেখা গেল, প্রতি ঘরে ম্যালেরিয়া বিরাজ করিতেছে এবং তাহার প্রতাপে প্রত্যেক মানুষকে হাতের মুঠায় প্রাণ লইয়া ফিরিতে হয়। এমনকী ইহাতে শঙ্করও যে গ্রামের সকলকে ফাঁকি দিয়া চলিয়া যাইবে, ইহা অভাবনীয় হইলেও অস্বাভাবিক নয়।

সম্প্রতি চোরের মতো চুপি চুপি লক্ষ করিলে দেখা যায়, সাদা কাপড় পরণে কে একটি মেয়ে প্রায়ই কোনো নির্জন সন্ধ্যায় অথবা গভীর রাত্রে সেই বটগাছের নীচে

আসিয়া মাথা ঠুকিয়া কাঁদিতে থাকে। খোঁজ করিলে জানা যায়, সে শঙ্কর ভুই মালীর স্ত্রী সুকুমারী।

শঙ্কর তো এই সেদিনও সশরীরে বাঁচিয়া ছিল। তাহার মতো জোয়ান শরীর হাজারে একটা মেলে। সকলেই তাহাকে ভয় করিয়া চলিত। এ ছাড়া ঘর তৈয়ারি করিতে এমন ওস্তাদ এ অঞ্চলে আর দ্বিতীয় নাই। সেদিন সে গিয়াছিল মাধবদি-র হাটে, সন্ধ্যার কিছু পরে হাট হইতে ফিরিয়া আসিয়াই সে লম্বা হইয়া পড়িল, বলিল বউ, একটা কাঁথা দে, জ্বর আইল বুঝি।

সুকুমারী ব্যস্ত হইয়া ঘরে ঢুকিয়া বলিল, আবার কী সর্বনাশ আইছে কে জানে। তোলা একখানা কাঁথা বাহির করিয়া সে শঙ্করের উত্তপ্ত শরীরে তাড়াতাড়ি বিছাইয়া দিল। হাত দিয়া কপাল পরীক্ষা করিয়া বলিল, ওগো মাগো গাও যে পুইড়া গেল।

জ্বরের ঘোরেও শঙ্করের দুষ্টামি বুদ্ধি যায় না। তাহার হাতখানা সরাইয়া সে বলিল, এমনে জ্বর দেখে না।

কেমনে? সুকমারী তাহার কপালে নিজের গাল রাখিয়া বলিল, এমনে?

শঙ্কর তাহার গরম ঠোট দুটি সুকুমারীর ঠাণ্ডা গালে ঘষিয়া জড়িতস্বরে বলিল

সুকুমারী হাসিয়া ফেলিল, তাহার গালে মৃদু একটা চড় মারিয়া বলিল, এই বুঝি জ্বরের রুগীর মতন কথা?

তারপর জ্বর আরও বাড়িয়া চলিল। সেদিনের রাত্রিটা মোটামুটি ভালোই গিয়াছিল। সুকুমারীকে বেশি জাগিতে হয় নাই। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও ভালোই গেল। চারদিনের দিন বিছানা হইতে উঠিয়া শঙ্কর বলিল, বউ, তাড়াতাড়ি ভাত বসাইয়া দে, আমি আজই ভাত খামু। শঙ্কর সত্যই স্নান করিতে চলিল। ব্যাপার দেখিয়া সুকুমারীর দুই চক্ষু স্থির। সে তাহার হাত ধরিয়া বলিল, এমন করলে আমি গলায় দড়ি দিয়া মরুম। তাড়াতাড়ি যাও, শুইয়া থাক গিয়া, জ্বর অহনও ছাড়ে নাই।

শঙ্করের স্বভাবটা চিরকালই এমনি। কেবল সুকুমারীর আশ্রয়েই সে যেন মানুষের মতো চলিতে পারে, নইলে কোথায় ভাসিয়া যাইত কে জানে!

মারা যাওয়ার আগের দিন এক কান্ড ঘটিল। রাত্রি তখন অনেক। শঙ্কর হঠাৎ চোখ মেলিয়া ডাকিল, বউ?

সুকুমারী তাহার মুখের উপর ঝুকিয়া বলিল, কও?

শঙ্কর আবার ডাকিল, বউ?

সুকুমারী বলিল, কী? কও না গো?

শঙ্কর তাহার কোলে মুখ গুঁজিয়া বলিল, উঁ।

সুকুমারী তবু বুঝিতে পারে না, সস্নেহে তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিল, কী অইছে গো?

তবু তাহার কোলের ভিতর মুখ গুঁজিয়া শঙ্কর গোঁঙাইতে থাকে, বিড় বিড় করিয়া একমনে কী বলে।

কী একটা কথা মনে হওয়ায় সুকুমারী হঠাৎ ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল, তাহার মুখটি বুকের কাছে টানিয়া আনিয়া বলিল,-ছিঃ, এমুন পোলাপানের মতন করে না। তোমার যে জ্বর গো!

শঙ্কর বলিল, না, জ্বর না, আমার জ্বর না।

-তুমি একটা পাগল। গাও পুইড়া যায় জ্বরে, তবু,–

সুকুমারী কী করিবে ভাবিয়া পায় না, তাহাকে আরও জড়াইয়া ধরিয়া তাহার মুখের কাছে নিজের মুখটি লইয়া সে বলিল, এই লও, খালি চুমা দাও।

কিন্তু শঙ্কর তাহার মুখ ফিরাইয়া লইল, একেবারে পাশ ফিরিয়া শুইল। এবং পরদিনই সে মারা গেল।

সুকুমারী ইহার পর আর কী করিতে পারে? ঘরের এককোণে মুখ গুঁজিয়া সে পড়িয়া রহিল, কাঁদিতে কাঁদিতে চোখমুখ তাহার ফুলিয়া গেল, কেবলই মনে হইতে লাগিল, মৃত্যুর আগে শঙ্কর কী একটা জিনিস তাহার কাছে চাহিয়াছিল।

অথচ সে দেয় নাই, হায়, সে কেন রাজি হয় নাই? এমন কঠিন কিছু নয় তো যে কিছুতেই দেওয়া চলে না, হায়, কেন রাজি হয় নাই সে! কাঁদিতে কাঁদিতে সুকুমারীর যে দমবন্ধ হইয়া আসে, আর ভাবিতে পারে না সে।

ইহার পর হইতেই তাহাকে অনেক নির্জন সন্ধ্যায় অথবা গভীর রাত্রে সেই দেবাংশী বটগাছের নীচে মাথা কুটিয়া কাঁদিতে দেখিতে পায়। এমন সাদা কাপড় পরা একটা মূর্তিকে হঠাৎ দেখিলে মনে প্রথমে ভয়ই জাগে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সে ভুল ভাঙে। একটা চাপা কান্নার শব্দ কানে আসিতে থাকে এবং তখন মনে হয়, ওই সাদা কাপড়-পরা মেয়েটি শঙ্করের সদ্যবিধবা স্ত্রী সুকুমারী ছাড়া আর কেহ নয়।

তারপর আরও অনেকগুলি বছর কাটে। অনেক পরিবর্তন এবং তার দ্বিগুণ সম্ভাবনা লইয়া বিংশ শতাব্দী দেখা দিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে বাংলার রাজনৈতিক জীবনে চেতনা আসিল, সুরেন্দ্রনাথ দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত হইলেন, অনেক যুবক তাঁহার গাড়ি টানিয়া কৃতার্থ বোধ করিল। তারপর পৃথিবীতে মহাসমর বাধিতেও আর বাকি থাকে না। ভারতবর্ষে সেই যুদ্ধের যাহারা প্রতিবাদ করিল তাহারা জেলে গেল, আর যাহারা করিল না তাহারা এই বলিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিল যে যুদ্ধের পর কিছু পাওয়া যাইবে।

কিন্তু বাহিরে যাহাই ঘটুক, পীরপুরের তার ছোঁয়াচটুকুও লাগে না, সে তার বটগাছের মতোই নির্বিকার, নির্বিকল্প।

এমনসময় এক সুদর্শন সুবেশ ভদ্রলোককে পীরপুরের নদীর ঘাটে আসিয়া নৌকা হইতে নামিতে দেখা গেল। তিনি এ গাঁয়ের বিশিষ্ট জামাই; বছর বছর স্ত্রী বাপের বাড়ি আসিলে তিনিও বছর বছর আসিয়া দেখা দেন। তাঁহার হাতে কী একখানা কাগজ, অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিনি তাহা পড়িতেছিলেন, নৌকা পারে লাগিতেই আবার গুটাইয়া লইলেন এবং লাফ দিয়া পারে নামিয়া পড়িলেন। কিছু দূরেই বটগাছের নীচে পনেরো ষোল বছরের এক বালক গভীর মনোযোগে ইহা লক্ষ করিতেছিল। সে এ গাঁয়েরই ছেলে। ভদ্রলোক কাছে আসিতে সে তাঁহার দিকে চাহিয়া মুচকিয়া একটু হাসিল, ভদ্রলোকও হাসিলেন, তারপর সে তাঁহার পিছু লইল।

ভদ্রলোক ডান হাতে ছড়ি ঘুরাইতে ঘুরাইতে যে বাড়িতে গিয়া প্রথম ঢুকিলেন, সে বাড়ির অবস্থা মোটের উপর ভালোই। তাঁহাকে দেখিয়া কয়েকটি ছেলেমেয়ে জামাইবাবু, জামাইবাবু, বলিয়া কলরব করিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ পরে এক প্রৌঢ়া মহিলা ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। এবং আরও লক্ষ করিলে দেখা যাইত, বাখারির বেড়ার ফাঁক দিয়া আঠারো উনিশ বছরের একটি মেয়েও চুপি চুপি চাহিয়া কী দেখিতেছিল।

সেই ছেলেটি হঠাৎ ঘরে ঢুকিয়া বলিল, মৃণালদি জামাইবাবু এসেছেন। আমি বলেছিলাম আজ আসবেন? মৃণাল হাসিয়া বলিল, হ্যাঁ, সতু, বলেছিলি।

ওদিকে জামাই-বেচারীকে নানারকম আদর-যত্নে রীতিমতো ঘায়েল করা হইতেছে।

একসময় চুপি চুপি সেখানে গিয়া সতু কাগজখানা খুলিয়া বসিল। কাগজখানা একটি পত্রিকা। সতু প্রথমেই দেখিল, কোনো এক জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক জায়গায় এক ভীষণ হত্যাকান্ড হইয়াছে, বড়ো বড়ো অক্ষরে তারই বিশদ বিবরণ দেওয়া। কয়েক হাজার লোকের একটা মিটিং হইতেছিল, হঠাৎ দেখা গেল চারিদিকে সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্যে ভরিয়া গিয়াছে। তাহারা সেই বিপুল জনমন্ডলীর চারিদিকে ঘিরিয়া নির্মমভাবে গুলি চালাইল। চার-শ লোক সেখানেই মারা গেল, এ ছাড়া আরও কত লোক যে শুধুই আহত হইয়াছিল, তার ইয়ত্তা নাই।

ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। পড়িতে পড়িতে সতুর গা-জ্বালা করিল, কখনো মুষ্টি দৃঢ় হইল, এমনকি সে কাঁদিয়া ফেলিল।

এবং ইহার কয়েক বছর পরেই দেখা গেল, এক শুভ অপরাহ্নে গ্রামের একমাত্র এবং শ্রেষ্ঠ পত্রিকাপাঠক শ্রীযুক্ত মনোহর চক্রবর্তী সমস্ত গ্রামজুড়িয়া শুধু এই কথাই প্রচার করিয়া বেড়াইতেছেন যে তাঁহাদেরই পীরপুর গাঁয়ের রাজেন মিত্তিরের ছেলে সতীন মিত্র শহরের কোন এক সাহেবকে মারিতে গিয়া নাকি ধরা পড়িয়াছে।

ঘটনা সত্য সন্দেহ নাই।

—বটগাছের নীচে আশে-পাশে এমনি-আরও অনেক ঘটনা ঘটে। মানুষের মতো দুটি চোখ থাকিলে অনেক কিছু সে দেখিত। সে এখন বৃদ্ধ। তার গায়ে এখানে-ওখানে নানারকমের শিকড়, কোনো কোনো ডালে হয়তো পোকাও ধরিয়াছে। গাছের গুঁড়িটা এত মোটা যে কয়েকটি লোক মিলিয়াও নাগাল পাইবে না। গুঁড়ির কাছে চারিদিকে কে যেন বাঁধাইয়া দিয়াছে। গাছের নীচে প্রকান্ড বড়ো ছায়া এবং সেই ছায়াকে জড়াইয়া আরও বড়ো একটা হাট বসে। ছোটো ছোটো টিনের ঘরের সারি এত বেশি এবং ঘন যে হাঁটিবার পথও পাওয়া দুষ্কর।

এখন ১৯৩০ সাল। গান্ধীর আইন অমান্য আন্দোলন সারা ভারতবর্ষে আগুন ধরাইয়া দিয়াছে। সেই আগুনের ঢেউ পীরপুর গ্রামেও কিছুটা আসিয়া পৌঁছিল। একদিন কোথা হইতে একদল যুবক আসিয়া বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।

তাহাদের সঙ্গে ছোটো একটা হারমোনিয়ম। তাহারা স্বদেশি গান গাহিয়া বিলাতি বর্জনের কথা বলিয়া কিছু টাকা-পয়সা সংগ্রহ করিল। লোকগুলি সকলের কাছেই এক অদ্ভুত রহস্যময় জীব; মেয়েরা চুপি চুপি বিস্ময়ভরা চোখে এই সুদর্শন যুবকদের দেখিল।

বিকালে বটগাছের নীচে এক সভা। অনেক লোক আসিল। দেখা গেল, কয়েকটি স্ত্রীলোকও সন্তান-সন্ততি-সহ বক্তৃতা শুনিতে আসিয়াছে। তাহারা এক হাতে ঘোমটা টানিয়া স্বদেশি বক্তৃতা শুনিল। সভায় সভাপতিত্ব করিলেন শ্রেষ্ঠ পত্রিকাপাঠক মনোহর চক্রবর্তী মহাশয়। তিনি গান্ধীর ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে যেসব অদ্ভুত গল্প শুনিয়াছেন তাহা সমবেত সকল লোককে শুনাইলেন। একজন শুধু বন্দেমাতরম শব্দেরই ব্যাখ্যা করিলেন। তিনি বলিলেন, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের এই অপূর্ব মন্ত্র আজ প্রত্যেক ভারতবাসীর মুখে মুখে ফিরিতেছে বটে কিন্তু ইহার অর্থ অনেকেই জানে না। ইহার অর্থ হইল হে মাতা, তোমাকে বন্দনা করি।

এ ছাড়া সেই যুবকদের মধ্যেও দুই একজন বক্তৃতা দিল।

তারপর একেবারে ১৯৩৯ সাল। বটগাছের মৃত্যু আরম্ভ হইয়াছে, এতদিন চোখে পড়ে নাই, কিন্তু আজ দেখিতে বড়ো ভয়ানক। কতকগুলি ডাল এখন একেবারে জীর্ণ, পত্রহীন, ছোটো-ছোটো ডাল আর শুকনো পাতা সর্বদা ঝরিয়া পড়ে, এক মুসলমান বুড়ি তা কুড়াইয়া লয়। গাছের গুঁড়ির দিকে একটা মস্তবড় গর্তের মতো, একটা লোক বেশ লুকাইয়া থাকিতে পারে। হাটবারে চারদিকে বাঁধানো জায়গাটিতে অনেকে দোকান সাজাইয়া বসে, অনেকে বেশ আড্ডা মারে, কেহ কাঁঠাল ভাঙিয়াও খায়। মাঝে মাঝে দুই একজন সাধুও বসে। সেদিন হাটবার, সেদিনের অবস্থা দেখিলে এতকালের ইতিহাসকে ভুলেও মনে করা যায় না, দেখিয়া আশ্চর্য হইতে হয়, একটা ভীষণ কোলাহল চাঁদোয়ার মতো সেই প্রকান্ড বটগাছের নীচে গুম-গুম করিতে থাকে।

সেদিনও হাটবার। রাত থাকিতেই নানারকমের নৌকা আসিতেছে। একটার পর একটা করিয়া প্রায় আধমাইলখানেক নদী সেই নৌকায় ভরিয়া গেল। বেলা বারোটার পর হাট বেশ জমিয়া ওঠে। চারিদিক লোকে গিজ গিজ করে। বাহির হইতে যাহারা আসে তাহাদের চেহারা দেখিলেই বোঝা যায়। তাহাদের গায়ে নানারকমের জামা তাকে। ভিড় কোথাও পাতলা বলিয়া মনে হয় না। সব জায়গাতেই সমান। পীরপুর অথবা অন্যান্য গ্রাম হইতে যাহারাই হাট করিতে আসিতেছে তাহাদের প্রত্যেকেরই কাঁধে গামছা, আর একটি ঝাঁকা। সকলে আসিয়াই একেবারে হাট করিতে বসিয়া যায় এমন নয়, অনেকক্ষণ এখানে সেখানে গল্প করিয়া সকলের শেষে তবে হাট করে। এইদিনে কত পরিচিত লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। ফুলুরি, বেগুনি, জিলিপি—এসব যাহারা ভাজে, তাহাদের কথা বলিবারও অবসর নাই, কারণ সকলেই একটি পয়সার অন্তত কিনিয়া খায়।

হাটের মধ্যে কেমন একটা গন্ধ, যা অন্যদিন পাওয়া যায় না।

ছোটো ছোটো রাখালছেলেরা সস্তা সিগারেট কিনিয়া নির্ভয়ে খাইয়া বেড়াইতেছে। নতুন বিবাহ করিয়াছে যাহারা, অথবা যাহাদের কাছে তাহাদের স্ত্রীর গায়ের স্বাদ আজও পুরোনো হয় নাই, তাহারা বেশিরভাগই যেখানে গোলাপী রঙের সাবান, চিরুণী ইত্যাদি বিক্রি হয় সেখানে ভিড় করিয়া আছে। গ্রামের একমাত্র খলিফা রহমান তাহার বহু পুরানো সেলাই-এর কলখানা একেবারে হাটের মাঝখানে লইয়া বসিয়াছে। কত লোক তাহাদের লুঙ্গি সেলাই করাইয়া লইল, কেহ কেবল জামার ছেঁড়াটুকু তালি দিয়া লইল।

দেখিতে দেখিতে বেলা একটা বাজিয়া গিয়াছে। এমন সময় এক কান্ড ঘটিল। সকলে দেখিল বটগাছের নীচে বাঁধানো জায়গাটিতে দাঁড়াইয়া একটা লোক বক্তৃতা করিতেছে। লোকটা সেই সতীন মিত্র ছাড়া আর কেহ নয়। আজ নয় বছর পরে কী কারণে হঠাৎ মুক্তি পাইয়া কয়েকমাস হইল সে গ্রামে আসিয়াছে। আসিয়াই সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে দারুণ মিশিতে লাগিল তাহাদের লইয়া কী জটলা করিতে লাগিল। আর আজ হঠাৎ দেখা গেল, ওই বটগাছের নীচে দাঁড়াইয়া সে বক্তৃতা করিতেছে। তাহার পাশে আর নীচে অনেকগুলি কৃষক। আস্তে আস্তে অন্যান্য কৃষকরাও একটা কৌতূহলবশে সেখানে গিয়া ভিড়িল, একটা বিপুল জনতার সৃষ্টি হইল।

সতীন বলিতেছিল– আমার চাষি-ভাইরা চেয়ে দেখুন, সব জিনিসেরই দর বেড়েছে কিন্তু যা বিক্রি করে আমরা দুটি খেয়ে বাঁচাব, সেসব জিনিসের দর বাড়েনি! কেন এমন হল?

সকলে তন্ময় হইয়া শুনিতে লাগিল। হায়দরের ছেলে বসির সতীনের পাশেই দাঁড়াইয়া আছে।

সতীন আবার বলিতেছে, ভাইসব, সমাজের যারা পরগাছা-যারা আমাদের গায়ের রক্ত শুষে শুধু বসে খায় তাদের উপড়ে ফেলবার দিন এসেছে আজ। ভাইসব আমাদের জিনিস দিয়েই ওরা মোটর হাঁকায়। ব্যাঙ্কে লাখ লাখ টাকা জমা রাখে, কিন্তু আমরা না-খেয়ে মরি। এ অত্যাচার কেন আমরা না-খেয়ে সহ্য করব? কেন সহ্য করব? এমনসময় আর এক কান্ড ঘটিল। হঠাৎ একটা হুড়াহুড়ি পড়িয়া গেল। লাঠি হাতে মস্ত জোয়ান একদল লোক বাঁধানো জায়গাটিতে উঠিয়া অনবরত লাঠি চালাইতে লাগিল।

দুই-এক ঘা খাইয়াও সতীন চীৎকার করিয়া বলিল, ভাইসব এদের চিনে রাখুন, এরা সেই জমিদারদেরই ভাড়াটে গুন্ডা, লাঠি চালিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করতে এসেছে!

সতীন আর বলিতে পারিল না, আরও কয়েকটা লাঠির ঘা খাইয়া বসিয়া পড়িল, রক্তে তাহার শরীর ভাসিয়া গেল, যে মাটি একদিন সিঁদুর আর শত শত পাঁঠার রক্তে লাল হইয়াছে, তা আজ মানুষের রক্তে লাল হইয়া গেল।

এক মুহূর্তে যা ঘটিয়া গেল, তা কল্পনাও করা যায় না। ব্যাপার দেখিয়া যে যার মতো পলাইল। আর যাহারা সেই প্রকান্ড, বৃদ্ধ এবং জীর্ণ বটগাছের অত বড়ো হাটের মাঝখানে মুখ থুবড়িয়া পড়িয়া রহিল, তাহাদের দেখিবার কেহ নাই।

ইহার কয়েকদিন পরেই এক ভীষণ ঝড় আসিল, এমন ঝড় এ-অঞ্চলে ইদানীং আর হয় নাই। ঝড়ের ঝাপটা মৃতপ্রায় বটগাছের উপরেই লাগিয়াছিল বেশি। বটগাছ ভাঙিয়া পড়িল, যেন প্রকান্ড এক দৈত্য ধরাশায়ী হইল। আর যেটুকু বাকি ছিল, তাহাও কাটিয়া লওয়া হইল। দেবাংশী গাছের কাঠ ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা ব্যবহার করে না বটে কিন্তু স্থানীয় জমিদার উহা বেচিয়া বেশ দু-পয়সা লাভ করিলেন।

দীর্ঘ দুইশ বছর পরে বটগাছ অবশেষে মারা গেল। ইহার নীচে অনেক ইতিহাস রচিত হইয়াছে, কত দীর্ঘশ্বাস চাপাকান্নার শব্দ ইহার প্রতিটি পাতার নিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত; ইহার নীচে কত লোক চাপা পড়িয়াছে, তারপর এক রক্তের গঙ্গা বহিয়া গেল, এখনও কত রক্তের বীজ ছড়াইয়া আছে, সেই বীজ হইতে একদিন অঙ্কুর দেখা দিবে, তারপর অনেক নতুন বৃক্ষ জন্ম লইবে, ইহাও আশা করা যায়।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *