পুলিশের নাম বসন্ত

পুলিশের নাম বসন্ত

ট্রামবাস চলতে শুরু করে দেয় দুটো নাগাদ, ওই সময় আর কেউই রং ছোড়ে না। তবু অহনা ইতস্তত করেছিল, কালকের দিনটা ছেড়ে দাও।

স্বপ্নময় বলেছিল, ইমপসিবল। আগামীকাল বছরের সবচেয়ে বড় চাঁদ উঠবে আর একসঙ্গে দেখব না? তুমি এরকম ভাবতে পারছ?

অহনা স্বপ্নময়ের মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হল এত আর্তি সে আর কারও মুখে দেখেনি। তবু তার গলায় নরম সুর বাজল, আমার না ভীষণ ভয় করে। রং দেওয়া-নেওয়া আমি কোনওদিন করিনি। সারা সকাল-দুপুর দরজা বন্ধ করে গান শুনি।

সেটা দুপুর পর্যন্ত শুনে বিকেল-বিকেল বেরিয়ে এসো।

কিন্তু মা-বাবা কী ভাববে?

তার মানে? তুমি কচি খুকি নাকি? তা ছাড়া নটার মধ্যেই তো ফিরে যাচ্ছ!

তুমি বুঝতে পারছনা যে, আমি রঙের দিন ঘরের বাইরে বের হই না। সেই আমি বিকেলবেলায় বেরুচ্ছি, ওরা বিশ্বাসই করতে পারবে না।

বিশ্বাস করাও। মোটের ওপর কালকের চাঁদ আমরা একসঙ্গে দেখব।

অহনা ফিরে গিয়েছিল কিন্তু-কিন্তু মুখ নিয়ে। স্বপ্নময়ের বাড়িতেও দোল খেলার তেমন চল নেই। বাবা-মায়ের বন্ধুরা অবশ্য গাড়ি চালিয়ে আসে। একটু-আধটু আবির  ছুঁড়ে তাস খেলতে বসে যায়। সঙ্গে থাকে বিয়ার আর ভদকা। সুভদ্রার মা মাছভাজা সাপ্লাই দেয়। বাবার বন্ধুদের স্ত্রী-রা তো বটেই, এইদিন মায়ের হাতেও গ্লাস দেখেছে সে। এবছর বাবাই তাকে ডাকল, স্বপ্ন, এদিকে এসো।

বিছানায় শুয়ে বব ডিলানের ক্যাসেট শুনছিল সে। অহনা তাকে দিয়েছে। সুমনের গানের ধরনও কিছু কথাবার্তা যে বব ডিলান থেকে নেওয়া সেটা বুঝে উত্তেজিত হচ্ছিল সে। সুমন তার প্রিয়। গায়ক। হোক না নেওয়া, রবীন্দ্রনাথও তো নিয়েছেন। আসলে অন্যের জিনিস নিয়ে নিজের মতো পরিবেশন করতে হিম্মত লাগে।

বাইরের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল সে। এখন সকাল সাড়ে দশটা। কার্পেটে বাবু হয়ে বসে চেপে খেলা হচ্ছিল। তাকে দেখতে পেয়ে মা গ্লাস নামিয়ে রাখল। এদের প্রায় সবাইকে সে। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছে। যে দুজনকে দেখেনি তাদের একজন মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে ভাই? দেওর না ভাই?

মায়ের মুখ লাল হয়েই ছিল। বলল, ধ্যাৎ। আমার ছেলে। স্বপ্নময়।

বাবা ডাকলেন, স্বপ্নময় এসো। সবাইকে হ্যালো বলো। এই ব্যাপারটা সেই জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বাবা চালিয়ে আসছে। বাড়িতে কেউ এলেই তার ডাক পড়ে হ্যালো বলার জন্যে। আজ

সে বলল, আপনারা ভালো আছেন?

ডার্বিকাকা, ভদ্রলোকের নাম ডার্বি দাশগুপ্ত, বললেন, আছি হে। তা তুমি যে ঘরবন্দি হয়ে আছ। যাও, রং-টং খেলো। কলেজে পড়ছ তো?

পার্ট টু দেব।

তবে? এখনও দু-এক পিস গার্লফ্রেন্ড হয়নি?

সঙ্গে-সঙ্গে মায়ের আপত্তি শোনা গেল, ডার্বিদা, আমার ছেলের মাথাটা খাবেন না।

সবার হাসি থামলে বাবা একটা গ্লাসে ভদকার সঙ্গে লিমকা মিশিয়ে এগিয়ে ধরলেন, নাও। খাও। এককালে বাঙালি আজকের দিনে ভাঙ-এর শরবত খেত। টেস্ট করো।

আমার ঠিক ভালো লাগে না। ডার্বিকাকা বললেন, আরে না খেলে বুঝবে কী করে ওটা ভালো না মন্দ? তোমরা কীরকম লাকি বলো তো? বাবা নিজের হাতে ভদকার গ্লাস তুলে দিচ্ছে! আমাদের বাবারা দৃশ্যটা ভাবতেও পারতেন না।

বাবা বললেন, এটা তো খারাপ কিছু নয়। সিগারেট, মদ আজ বাদে কাল ও নিজেই খাবে। আমি শুধু বলব নেশার গলায় লাগাম না পরাতে পারলে কখনও নেশা কোরো না।

স্বপ্নময় বলল, আমি আসছি।

বাবা মাথা নাড়তেই সে বেরিয়ে গেল। ফ্ল্যাটটা বড়। কোণের ঘর স্বপ্নময়ের। একটা ছোট্ট ব্যালকনিও রয়েছে। সে ব্যালকনিতে গিয়ে নিচের দিকে তাকাল। রাস্তায় জোর হোলি খেলা চলছে। এরইমধ্যে কিছু মানুষ প্রায় ভূত সেজে হল্লা করছে। তাদের মুখে চকচকে রং, ভঙ্গি-সিনেমায় দেখা আফ্রিকার ক্যানিবালদেরও হার মানায়। কয়েকটি মেয়েকেও মাথায় পট্টি বেঁধে রঙিন হয়ে যেতে দেখল সে। এই যে রঙের জন্যে একবেলার উল্লাস, দূর থেকে দেখতেও ভালো লাগে না স্বপ্নময়ের। সে মুখ তুলল। পাশের ফ্ল্যাটের। ব্যালকনিতে মুন্নি দাঁড়িয়েছিল। চোখাচোখি হতে করুণ হাসল, ওদের কী মজা, না স্বপ্নদা?

তোমার রং খেলতে ইচ্ছে করছে?

খু-উ-ব। কিন্তু কার সঙ্গে খেলব? মা বলেছে নিচে নামা চলবে না?

মুন্নির বয়স বড়জোর আট। স্বপ্নময় হেসে বলল, বাবা-মায়ের সঙ্গে খ্যালো।

বাবা তো নেই। আজ হোলি বলে বন্ধুদের সঙ্গে দীঘায় চলে গিয়েছেন গতকাল। এই, তুমি আমার সঙ্গে রং খেলবে? মুন্নির মুখের চেহারা বদলে গেল।

আমার যে রং খেলতে ভালো লাগে না।

খ্যালো না। প্লিজ, আমার জন্যে খ্যালো। শুধু আবির। আর কিছু না।

আবির কোথায় পাব?

আছে। বাবা কিনেছিল দীঘায় নিয়ে যাবে বলে। আমি তা থেকে খানিকটা রেখে দিয়েছি। ও

স্বপ্নদা, এসো না, প্লিজ।

শুধু কপালে কিন্তু–।

ঠিক আছে বাবা। মা-মা, স্বপ্নদা আসছে রং খেলতে। মুন্নি ছুটে গেল ভেতরে। স্বপ্নময় আড়ষ্ট হল। তার যেটা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই সেটাই করতে হবে? বাচ্চা মেয়েটা ওইভাবে বলতে তার মুখ ফসকে যাকগে, একটা শিশু যদি আনন্দ পায়, পাক। সে বাইরের ঘরে আসতেই মা জিজ্ঞাসা করল, কি রে?

পাশের ফ্ল্যাটে যাচ্ছি। গম্ভীর গলায় বলল স্বপ্নময়।

কেন?

মুন্নি ডাকছে। দরজা খুলে বেরিয়ে এল সে। দরজা বন্ধ করতেই ওপাশের দরজা খুলে গেল। মুন্নি দাঁড়িয়ে আছে, কী মজা! এসো।

সিঁড়িতে কেউ নেই। ওদের ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে স্বপ্নময় জিজ্ঞাসা করল, কোথায়, আবির দাও।

এই সময় মুন্নির মা বেরিয়ে এলেন, কী ব্যাপার স্বপ্নময়? তুমি! ভদ্রমহিলার মুখে মিষ্টি হাসি। মহিলা সুন্দরী। এ পাড়ায় এত সুন্দর ফিগার কারও নেই। স্বপ্নময়ের না জানা কোনও কারণে মা ওঁকে পছন্দ করেন না। মুন্নির মাও অন্য কোনও ফ্ল্যাটে যাওয়া-আসা করেন না।

মুন্নি বলল, রং খেলার সঙ্গী পাচ্ছে না।

ও তাই বলো, ব্যালকনি থেকে বলেছে। আমাকে তো সকাল থেকে পঁচিশবার বলল। আচ্ছা, তুমিই বলো, আমি ওর সঙ্গে কি রং খেলব? প্রশ্ন শেষ হওয়ামাত্র হাসি বাজল।

ইতিমধ্যে মুন্নি আবিরের প্যাকেট নিয়ে এসেছে। তার মা চোখ পাকাল, নো। এখানে নয়। ঘর নোংরা হবে। ব্যালকনিতে যাও মুন্নি।

মুন্নি স্বপ্নময়কে ডাকল, এসো।

ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই নিচ থেকে চিৎকার ভেসে এল, হোলি হ্যায়।

এটা বেশ অদ্ভুত ব্যাপার। বাঙালি নিজের অজান্তেই হিন্দি বলে। হলি হ্যায়, দুর্গা মাঈকি জয়। হিন্দি না বললে আবেগ জোরদার হয় না।

হঠাৎ মুন্নির গলায় হোলি হ্যায় চিৎকার বাজল, এবং স্বপ্নময় মুখচোখে আবিরের আঘাত পেল। যথাসময়ে চোখের পাতা বন্ধ করতে পেরেছিল বলে রক্ষে। আর সেই সুযোগ নিয়ে মুন্নি মুঠো মুঠো আবির তার গায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্বপ্নময় অন্ধের মতো হাত বাড়াল, মুন্নি, আমার হাতে কোনও আবির নেই, আমায় দাও, নইলে তোমাকে মাখাব কী করে?

মুন্নি, এক চিমটি আবির স্বপ্নময়ের বাড়ানো হাতে দিতেই তার মা হেসে উঠলেন, ইস, কি কিপটে! আরও খানিকটা দে।

বেশি দিলে যে শেষ হয়ে যাবে।

হোক।

মুন্নি আর একটু পরিমাণ বাড়াতে স্বপ্নময় তাকে টেনে নিয়ে আলতো করে মুখে কপালে মাখিয়ে দিল। যখন সে রং মাখাচ্ছে তখন মুন্নি স্থির। চোখ বন্ধ, মুখে তৃপ্তির ছাপ, ঠোঁটে হাসি। তারপরই সে ঘুরে দাঁড়াল, মা, তুমি নিচু হও।

সঙ্গে-সঙ্গে মহিলা হরিণের মতো ছুটে গেলেন, না বাবা, আমি না। মুন্নি তাকে অনুসরণ করল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল স্বপ্নময়। পাশের ঘরে হুটোপুটি চলছে। তারপর মুন্নি বেরিয়ে এল, নেই, সব শেষ। কী হবে?

বেশ তো, খেলা হল। স্বপ্নময় ওর মাথায় হাত রাখল।

এইটুকুনি? জানো, বাবা না এত্তো-এত্তো রং নিয়ে গিয়েছে। কত খেলবে, তোমাদের বাড়িতে আবির নেই?

না। আচ্ছা, এখন আমি চলি।

বাইরের ঘরে পা বাড়াতেই মুন্নির মা এলেন, দ্যাখো তো কী কাণ্ড! ভদ্রমহিলাকে এখন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। ওঁর গায়ের চামড়ার সঙ্গে ছোপ-ছোপ আবির আলাদা ছবি তৈরি করেছে। ভদ্রমহিলা বললেন, তুমি চলে যাচ্ছ?

হ্যাঁ। আর তো আবির নেই।

আর নেই না! ওহো কিছু খাবে না? এইদিন রং খেললে কিছু খেতে হয়।

না, না। এখন কিছু খাব না। দরজা খুলে বেরিয়ে এল সে। এবং তখনই একটা হইচই আওয়াজ কানে এল। সে কিছু বোঝার আগেই কারা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপরে। দুজন তাকে জাপটে ধরেছে, দুজন মুখে-কপালে-গলায় রং বোলাচ্ছে। সে প্রতিবাদ করার সময় পেল না। ছেলেদের একজন খোলা দরজায় দাঁড়াল, বউদি, একটু রং?

মুন্নির মায়ের আপত্তি কানে এল, না ভাই। আমার ওসব…।

ওই তো মেখেছেন। স্বপ্নময় মাখাতে পারে আমরা না কেন? শুধু আবির।

ওহো! ঠিক আছে, শুধু কপালে কিন্তু–।

সঙ্গে-সঙ্গে উল্লাস বাজল। স্বপ্নময় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ খুলল। মুন্নির মাকে জড়িয়ে ধরে রং মাখাচ্ছে ছেলেটি। কপালে, গলার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে নিচে নেমে গেল হাত। ভদ্রমহিলা দু-হাতে মুখ ঢাকলেন। ছেলের দল নেমে গেল হইচই করতে-করতে। স্বপ্নময় হাত বাড়িয়ে দরজা টেনে দিয়ে আড়াল আনল। কোনও মহিলার বুকে রং মাখাবার নাম করে হাত দিলে তিনি চুপ করে থাকবেন কেন? সে নিজের ফ্ল্যাটের বেল টিপল।

মা দরজা খুলল, কে, কাকে চাই?

আমি। সরো। ভেতরে পা বাড়াল স্বপ্নময়।

এম্মা! তোর কী চেহারা হয়েছে। দ্যাখো-দ্যাখো তোমার পুত্রের কাণ্ড দ্যাখো। কোনওদিন যে রং খেলেনি সে এবার ভূত সেজে এল, আমি চিনতেই পারিনি।

ডার্বিকাকুর জড়ানো গলা বলল, মা জিজ্ঞাসা করছে ছেলেকে, কে? ভাবা যায়!

স্বপ্নময় ভেতরে চলে এল। এখানে দাঁড়িয়ে কিছু বললে সেটা মা-বাবার গায়ে লাগত। এরা দিনদুপুরে জুয়ো খেলতে-খেলতে মদ খেয়ে যা ইচ্ছে তাই বলার অধিকার পাবে বলে ধরে নিয়েছে।

বাবার সঙ্গে মায়ের চমৎকার বন্ধুত্ব। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ওদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হতে দেখেনি স্বপ্নময়। বাবার বন্ধুরা বলে, এমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং তারা কল্পনাও করে না। এরা যেন। ঠিকঠাক, মেড ফর ইচ আদার পেয়ার। অথচ ছুটির দিনে বা কোনও পার্টি হলে যাঁরা এ বাড়িতে আসেন, তাঁদের নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে যে গোলমাল তা মিটিয়ে দিতে মাকে সক্রিয় হতে দেখা যায়। বাবার চেয়ে বয়সে একটু ছোট, বড় কোম্পানির বড় অফিসার হিল্লোল বোস অনেকটা। মদ্যপানের পর গত মাসে চিৎকার করেছিল, ওকে বলে দিন, রুমাল পালটাবার মতো বয়ফ্রেন্ড যেন না পালটায়। এতে আমার খুব অসুবিধে হয়। আমি যেমন একজনের সঙ্গে স্টেডি আছি ও। তাই করুক, নো প্রবলেম। ডিভোর্স সেপারেশন চলবে না, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মেনে নেব। প্রমিস!

পাশের ঘরে বসেও কথাগুলো কানে এসেছিল স্বপ্নময়ের। সঙ্গে-সঙ্গে মায়ের গলা বেজেছিল, প্লিজ হিল্লোল। তুমি নিয়ম ভাঙছ। মদ খাবে কিন্তু মাতলামি করবে না, তোমরা সবাই স্থির করেছিলে। তাই না?

ইয়েস ম্যাডাম। আমি মাতাল নই।

তোমার গলা পাশের ঘরে আমার ছেলের কানেও পৌঁছে যাচ্ছে!

দেন, আই অ্যাম সরি। আমি চুপ করলাম।

আবার সব শান্ত হয়ে গেল।

বাবা-মা এবং তাদের বন্ধুদের জীবনযাপন এখন বঙ্গদেশের শিক্ষিত সমাজে ব্যতিক্রম নয়। স্বপ্নময়ের অনেক বন্ধুদের বাবা-মা এবং তাদের বন্ধুরা এই একই জীবনযাপন করে। সোম থেকে বৃহস্পতিবার অফিস অথবা ব্যাবসা। প্রচণ্ড সিরিয়াস লোক তখন সবাই। কিন্তু শুক্রবার এবং শনিবার সন্ধে থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত একসঙ্গে জড়ো হয়ে মদ্যপান এবং খাবার খাওয়া প্রায় নিয়মের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড়দের সমালোচনা করা তার কাজ নয়। তা ছাড়া মা-বাবা তার সঙ্গে কখনওই অন্যায় ব্যবহার করে না। বাবা তো বলেই দিয়েছে, তুমি এখন বড় হয়েছ। ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা হয়েছে। নিজে যা ভালো মনে করবে করো, আমার আপত্তি নেই।

বাথরুমের আয়নায় নিজেকে দেখে হেসে ফেলল স্বপ্নময়। এই মুখ যে তার তা ভাবাই যাচ্ছে না। মা যে প্রথমে চিনতে পারেনি তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অহনা যদি এই মুখ দেখতে পেত! মুখে রং লাগালে চরিত্র বদলে যায়। অদ্ভুত! কিন্তু সেই রং তুলতে গিয়ে যখন মুখের চামড়া। জ্বলতে লাগল, লাল হয়ে গেল তখন স্বপ্নময়ের মনে হল ওই ছেলেগুলো প্রতিবছর এত কষ্ট হবে জেনেও মুখে বাঁদর-রং মাখে কেন?

একসময় সবাই একান্নবর্তী ছিল। এখন যা হয়, তাই হলেও সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। পালাপার্বণে এ বাড়ি ও-বাড়িতে সবাই জড়ো হয়। আজ যেমন সকাল হতে-না-হতেই এসে হাজির। ছেলেরা ধুতি-পাঞ্জাবি, মেয়েরা বাসন্তী রঙের শাড়ি। এ-পাড়ায় আটটার আগে রাস্তায় রং খেলা হয় না। অহনার বাবার উৎসাহে যারা পেরেছে তার আগেই পৌঁছে গিয়েছে। গাড়িওয়ালা এসেছে একটু দেরি করে। অহনাদের বাড়িটা পুরোনো ধাঁচের। মাঝখানে অনেকটা বড় বাঁধানো চাতাল, চারপাশে উঁচু বারান্দা। ওই চাতালে শতরঞ্চি পেতে বসেছে সবাই। সঙ্গে হারমোনিয়াম, তবলা। বেগুনি আবির প্রত্যেকের কপালে। রবীন্দ্রনাথের বসন্তের গান গলায়-গলায়। দশটা নাগাদ যখন আসর জমজমাট তখন কারও খেয়াল হল, অহনা সেখানে নেই।

ও জেঠিমা, অহনা কোথায়? সে এল না কেন?

অহনার মা খোঁপায় ঘোমটা ঠিক রেখে বললেন, ভীতুর ডিম। ঘরের দরজা বন্ধ করে টেপ চালিয়ে গান শুনছে। রঙে তার ভীষণ ভয়।

দু-চারজন হইহই করে উঠল। এ কেমন কথা? আমরা সব ঝুঁকি নিয়ে এতদূরে এলাম আর বাড়ির মেয়ে ঘরের দরজা আটকে বসে থাকবে? ছুটল তারা। মেয়েরাই সংখ্যায় ভারী। মিনিট চারেকের মধ্যে টানতে-টানতে নিয়ে এল বিধ্বস্ত অহনাকে। তখন তার পরনে অবশ্য বাসন্তী রঙেরই শাড়ি। আসরের মধ্যিখানে বসিয়ে দেওয়া হল তাকে। কেউ একজন আবিরের টিপ পরিয়ে দিতে গেলে সে মুখ ঢাকল দু-হাতে।

অহনার বাবা বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুই বরং একটা গান গা মা।

অহনা আঙুলের আড়াল কিছুতেই সরায় না, গান গাইবে কী? তখন আশ্বাস দেওয়া হল, গান শোনালে মুক্তি পাবে। তবে যে-সে গান নয়, আজ সবার রঙে রং মিশাতে হবে।

শেষপর্যন্ত মুখ নিচু করে হারমোনিয়ামে হাত রাখল অহনা। প্রথম দিকে গলায় ঈষৎ কাঁপন, ক্রমশ সেটা স্থির। সকলে মুগ্ধ হয়ে শুনল। গান থামতেই এক আত্মীয় ওকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, কী গুণী মেয়ে রে তুই। যা গাইলি তা যদি বিশ্বাস নাই করিস তাহলে গানটা এমন সুন্দর হল কী করে? বলামাত্র আবির ঝরাল অহনার চুলে-মুখে-গলায়।

প্রায় কেঁদে ফেলেছিল অহনা। কিন্তু সামলে নিতে পারল। শুধু মুখে বলল, তোমরা কথা রাখোনি।

ওপাশ থেকে এক মামাতো দাদা বলে উঠল, কেউ কথা রাখে না।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কবিতাটা হয়ে যাক। আর একজন মন্তব্য করল।

দাদাটি উঁচিয়ে ছিল। তার আবৃত্তির গলা বেশ ভালো, ফাংশানে ডাক পড়ে। কিন্তু সে মাথা নাড়ল, উঁহু। অহনা আর একটা গান না শোনালে আমি কিছুই করব না।

গা, গা অহনা, প্লিজ।

মাথা ঝাঁকাল অহনা, আমার কিছুই মনে পড়ছে না।

দাদাটি বলল, বেশি গাইতে হবে না। দুজনের কানাকানি কথা—

এম্মা। ওইভাবে মাঝখান থেকে পাওয়া যায় নাকি? অহনা অবাক।

অহনার মা বললেন, এ আবার কীরকম গান?

যে গাইবে সে বুঝেছে।

অহনা মাথা নাড়ল, তা ছাড়া ওটা তো রাতেরবেলার গান।

অন্ধের কিবা দিন কিবা রাত। আজ রঙের নেশায় আমরা অন্ধ। দাদাটি বলল।

বাবা বললেন, এ তো ছোঁড়া দেখছি বেশ পর্ক হয়েছে। তাই গা–।

দুজনের কানাকানি কথা দুজনের মিলনবিহুলতা, জ্যোৎস্নাধারায় যায় ভেসে যায় দোলের পূর্ণিমাতে। অহনার চোখ বন্ধ। হঠাৎ সে চোখের সামনে স্বপ্নময়কে দেখতে পেল। স্বপ্নময় বলেছিল, আজ রাত্রে আমরা একসঙ্গে চাঁদ দেখব। সঙ্গে-সঙ্গে তার নিজের কাছেই নিজের গলা অচেনা মনে হল। তোমার অলস দ্বিপ্রহরে বলার সময় সে যেন স্বপ্নময়কে ছুঁতে পারল। অথচ এ গান ছোঁয়ার নয়। এ গান ছোঁয়ার বাসনা রেখে যাওয়ার। গান শেষ হতেই লক্ষ পায়রা ডানা মেলল। সবাই হাততালি দিচ্ছে। এমনকী বাবাও। হাত বাড়িয়ে তিনি অহনার চিবুক ধরলেন, তুই কী ভালো গাইলি। রাজেশ্বরী দত্তের কথা মনে পড়ে গেল। বাঃ। খুব ভালো।

মুখে রক্ত জমে গেল অহনার। ভাগ্যিস ছড়ানো ছিল আগেভাগে, নইলে ঠিক ধরা পড়ে যেত এদের কাছে।

কবিতা আর গানে দুপুর গড়াল। আজ খিচুড়ি আর চাররকমের ভাজা। সঙ্গে চাটনি। চেটেপুটে খেল সবাই। বাবা বলেলেন, যদ্দিন বাঁচি তদ্দিন এই আনন্দটুকু করে যাব। যারা সারা বছর ব্যস্ত থাকে, তারা যেন সময় করে সামনের বারও এসো।

তিনটেয় বাড়ি ফাঁকা। তখন রাস্তায় রঙিন বীরদের দৌরাত্ম শেষ। এখন সর্বত্র রঙের দাগ অথচ সেগুলোর কোনও মূল্য নেই।

অহনা নিজের ঘরে জানলার পাশে বসেছিল। এখনও বাইরে ভালো রোদ, আর কিছুক্ষণ বাদে তাকে বেরুতে হবে। কোনওদিন যা করেনি আজ করলে বাড়িতে কী প্রতিক্রিয়া হবে? স্বপ্নময়টা তাকে এমন বিপদে ফেলে দিল। নামটা মনে আসতেই কীরকম একটা ভালোলাগা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। আশ্চর্য, ওর কথা ভাবতেই তার গানের গলা এমন হয়ে গেল যে বাবার রাজেশ্বরী দত্তের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল?

গতকালই অহনা ভেবেছিল মাকে বলে রাখবে বেরুবার কথা। কিন্তু বলব-বলব করেও ঠিক সাহস হয়নি। সে আকাশের দিকে তাকাল। যেহেতু এ আকাশ বসন্তের তাই কীরকম মায়া মাখানো। সে উঠল। করিডোর পেরিয়ে বাবা-মায়ের ঘরে পৌঁছাল। মা বাঁধানো মাসিক বসুমতী নিয়ে শুয়ে। আছেন। এটা মায়ের হবি। কবে মাসিক বসুমতী বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু মায়ের তাতে কোনও আপত্তি নেই। এ বাড়িতে যত মাসিক আসত সবই বাঁধানো অবস্থায় এর ওর গায়ে হেলান দিয়ে রয়েছে। এমনকী প্রথম সংখ্যা দেশ পত্রিকা থেকেও একটিও বাদ নেই। মা দুপুরে বসুমতীর। গল্পগুলো পড়ে। বাবা শুয়ে আছে ওপাশে, মায়ের দিকে পেছন ফিরে। মাঝখানে একটা মোটা পাশবালিশ। ওকে ঢুকতে দেখে মা ধড়মড়িয়ে উঠে বসল, কি রে?

আজ বিকেলবেলায় আমি একটু বেরুব?

কোথায়?

আমাদের এক অধ্যাপকের বাড়িতে, গানটান হবে–।

এই রঙের দিনে বেরুবি? কতদূরে?

বেশি দূরে নয়।

পাশ-ফেরা বাবা ওই অবস্থায় বলল, অধ্যাপকের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর লিখে দিয়ে যাও। আজকের দিনে ছেলেমেয়েরা খুউব হারিয়ে যায়। তেমন হলে পুলিশকে তো বলতে পারব এই ঠিকানায় গিয়েছিল।

অহনা তীব্র আপত্তি করে উঠেছিল, বাবা, তুমি না? ঠিক আছে, আমি কোথাও যাব না।

মা বলল, দামি কিছু পরে যাস না! কে কোত্থেকে রং ছুড়বে। অধ্যাপকের বাড়ি যখন তখন যা। তবে খবর শুরু হওয়ার আগে ফিরে আসিস।

অহনা বাধ্য বালিকার মতো ঘাড় নেড়েছিল।

হলুদ শাড়ি, হলুদ জামা, চুড়ি, হলদে বাঁধন, কপালে হলুদ টিপ, অহনা যখন পথে নামল তখন কলকাতার রোদ্দুর পূর্ব দিগন্তে। একটা গম্ভীর ছায়া ছড়িয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। পাড়া থেকে বেরুবার আগে কেউ একজন মন্তব্য করল, কেস জন্ডিস!

গালে রক্ত জমল অহনার, হাঁটার গতি বেড়ে গেল। সে যে আজ হলুদে আছে দেখেই ওই মন্তব্য ছেলেগুলো দিনরাত রকে বসে থাকে কিন্তু বুদ্ধিসুদ্ধি ভালো। বড় রাস্তার বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াতেই সে দেখতে পেল সবাই সেজেগুঁজে বেরিয়ে পড়েছে। দোলের বিকেল বলে কেউ ভয় পাচ্ছে না। কিন্তু সবাই তাকে ঘুরে-ঘুরে দেখছে। এই দেখাটা বড় অস্বস্তিকর। না হয় সব হলুদ পড়েছে তাই বলে মাথা ঘুরিয়ে দেখার কী আছে!

ধর্মতলার মোড় ছাড়িয়ে রাজভবনের পাশ দিয়ে প্রাইভেট বাসটা যখন আউটরাম ঘাটের দিকে এগোচ্ছে তখনও আলো ছিল। এসব জায়গায় যতক্ষণ আলো থাকে ততক্ষণ স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু এই মরে যাওয়া আলো জানান দিচ্ছে অন্ধকারের। বুক ঢিপঢিপ করছিল অহনার। টার্মিনাসে বাস থামতেই সে শিরশিরে পায়ে নিচে নামতেই কোথাও স্বপ্নময়কে দেখতে পেল না। অথচ কথা ছিল স্বপ্নময় এইখানে এই সময়ে তার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাহলে? অহনা ঠিক। করল এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে। এই সময় সে নিজের নামটা শুনতে পেল। চমকে মুখ ফেরাতেই রাস্তার ওপাশে দাঁড়ানো স্বপ্নময়কে দেখতে পেল। পরপর গাড়ি ছুটে যাচ্ছে বলে এদিকে আসতে পারছে না। চিৎকার করে হাত নেড়ে ডাকছে। চিৎকারটা এমন যে সারা পৃথিবী অহনার নাম জেনে গেল।

অহনাকে এগোতে দেখে দাঁড়িয়ে গেল স্বপ্নময়। অহনাই রাস্তা পার হল। আর স্বপ্নময় বলল, কী সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে।

দেরি করলে কেন?

কোথায় দেরি? আমি দেখলাম তুমি বাস থেকে নামছ। আমাকে খুঁজছ। বেশ নার্ভাস হয়ে

পড়লে। রুমালে আঙুল জড়ালে, কী ঠিক কি না?

বা, তুমি দূর থেকে দেখছিলে?

দেখেই তোমার নাম ধরে ডেকে উঠলাম। অহনা সত্যি, তোমাকে খুউব…।

থাক। চলো, আমি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না।

তিন পা হেঁটেই স্বপ্নময় বলল, অ্যাই, কী ব্যাপার বলো তো?

কী?

তোমাকে খুব ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা বলে মনে হচ্ছে আজ।

সেটা খারাপ?

খারাপ নয়। তবে আজ দোলের দিনে একটু অসুবিধে হয়।

তুমি কী করলে সারা সকাল?

একটা বাচ্চা মেয়ে আবিরের বায়না ধরেছিল, তাকে শান্ত করতে গিয়ে অন্যেরা এসে বাঁদুরে-রং মাখিয়ে দিল। তা মুখ থেকে তুলতে প্রাণ বেরিয়ে গেছে।

কই দেখি?

চিবুক তুলল স্বপ্নময়। অহনা বলল, দূর, কিছু লেগে নেই।

তুমি বই পড়ে গান শুনে কাটালে?

নাঃ। সব্বাই এমন ধরল যে একটু আবির মাখতে হল।

ওরা গঙ্গার ধারে চলে এল। সন্ধে নামছে কিন্তু সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে না। ওরা বসার জায়গা খুঁজল। আশ্চর্য, সব জায়গা আগেভাগে দখল করে নিয়েছে পৃথিবীর সব প্রেমিক-প্রেমিকা। এমনকী তিনজোড়া অপরিচিত প্রেমিক-প্রেমিকা গাদাগাদি করে গাছের নিচে বসে কী করে নিজেদের কথা বলছে কে জানে!

অনেক হাঁটাহাঁটির পরও যখন জায়গা পাওয়া গেল না তখন একটি বৃদ্ধ মাঝি তাদের সামনে এসে দাঁড়াল, আসুন, একঘণ্টা, দু-ঘণ্টা, তিনঘণ্টা-আমার নৌকায় বসে চাঁদ দেখবেন। দোলপুর্ণিমার চাঁদ বলে কথা। এই চাঁদ জলের সঙ্গে সম্পর্ক করে। তাই জলে না বসলে বুঝতে পারবেন না। এখন ঘণ্টা পঞ্চাশ টাকা।

পঞ্চাশ টাকা। সর্বনাশ! অত টাকা আমার কাছে নেই।

দুজনের যা আছে মিলিয়ে দেখুন না। ছই আছে।

ছই-এর মধ্যে বসলে চাঁদ দেখব কী করে?

বৃদ্ধ হাসল, সে আপনাদের যা ইচ্ছে।দেখতে-দেখতেও তো বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে হয়।

অহনা এতক্ষণ শুনছিল। এবার মাথা নাড়ল, অসম্ভব! আমি জলে নামব না।

বৃদ্ধ বলল, আপনি জলে নামবেন কেন দিদি, আপনি নৌকায় থাকবেন।

নৌকোটা তো জলে ভাসবে। অহনা আপত্তি করল।

স্বপ্নময় বলল, খুব খ্রিল হত কিন্তু। দেখুন, পঞ্চাশ দিতে পারব না–।

ঠিক আছে, পরে বিচার-বিবেচনা করে যা হয় দেবেন। বৃদ্ধ হাসল।

সঙ্গে-সঙ্গে হাঁটা আরম্ভ করল অহনা। স্বপ্নময় তার পেছনে ছুটে এল, কী হল?

লোকটির হাসি খুব খারাপ। এখান থেকে চলো।

অনেকটা দূরে চলে আসার পর সিনেমার মতো চাঁদ উঠল। যদিও রাস্তার কিছু আলোতখনও জ্বলছে কিন্তু পৃথিবীটা অন্যরকম হয়ে গেল।

স্বপ্নময় বলল, আচ্ছা কীরকম হাসি খারাপ হয়?

জানি না। তবে ওই লোকটার হাসি খারাপ।

তাহলে আমরা এখন কি করব? কিছু খাবে?

কী খাব?

এই ধরো ফুচকা, চা, বাদাম–

তোমার খিদে পেয়েছে?

না। কিছু করতে হবে তো।

চলো, কোথাও গিয়ে বসি।

বসার জায়গা–। বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল। উদ্ভাসিত হল স্বপ্নময়, চলো, ওই মাঠটায় বসি। দারুণ ব্যাপার হবে।

ওরা রাস্তা পার হয়ে আইসক্রিমের গাড়ির পাশ দিয়ে আসবার সময় শুনতে পেল, সাব, প্লাস্টিক লাগে গা?

স্বপ্নময় জিজ্ঞাসা করল, প্লাস্টিক?

লোকটা তার স্টক থেকে একটা বড় প্লাস্টিক শিট বের করে দেখাল। স্বপ্নময় ঘাড় নাড়ল, না। লোকটা বলল, হ্যাঁ বললে সুবিধে হবে। কেউ আপনাদের বিরক্ত করবে না।

ওরা লোকটাকে পাত্তা না দিয়ে মাঠের মাঝখানে চলে এল। দূরে গঙ্গার ধারের দোকানগুলোতে আলো জ্বলছে। বিশাল মাঠের ওপর আকাশ উপচানো যে জ্যোৎস্নার ঢল নেমেছে তার কাছে সেই আলো একেবারেই ম্লান। গোল চাঁদ গম্ভীরভাবে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। স্বপ্নময় অহনার পাশে বসে বলল, ফ্যান্টাস্টিক।

অহনাও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল এতদিন কত চাঁদ কত পূর্ণিমায় আকাশে আলোর ঝড় তুলেছে কিন্তু আগকের মতো কখনও হয়নি। গত পূর্ণিমাতেও নিশ্চয়ই চাঁদ উঠেছিল কিন্তু তার মনেই নেই। আজকের রাতটা মনে থাকবে কারণ স্বপ্নময় পাশে রয়েছে। সে স্বপ্নময়ের দিকে তাকাল। কীরকম মুগ্ধ চোখে চাঁদ দেখছে, অ্যাই!

স্বপ্নময় মুখ ফেরাল না, বলো!

শুধু চাঁদ দেখতেই এসেছ?কথা বলবে না?

ধরো আজ যদি আমরা কথা না বলি, শুধু চাঁদ দেখে যাই।

আমার ভালো লাগবে না।

স্বপ্নময় হঠাৎ ফিরে তাকাল, তুমি আমাকে কতখানি ভালোবাসো অহনা?

অহনা মুখ সরাল, জানি না।

আমরা একসঙ্গে পড়ি। একসঙ্গে সারাজীবন থাকব?

নইলে আজ এখানে আসব কেন?

কোনও চাপে আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?

কখনও না।

যদি কখনও আমার ওপর বিরক্ত হও, যদি আমাকে অসহ্য লাগে?

আমি জানি না।

কেন?

ওই যে, বাল্যপ্রেমে অভিশাপ আছে। স্বপ্নময় বলল।

তুমি বালক? হেসে উঠল অহনা।

আহা তুমি আমার প্রথম প্রেম তো! তা ছাড়া পৃথিবীর সব প্রেম নাকি বিচ্ছেদেই মর্যাদা পেয়েছে। আই কান্ট ড্রিম দ্যাট। এই তোমার হাত দেখি।

কেন?

একটু ধরব। স্বপ্নময় হাত বাড়িয়ে অহনার আঙুল স্পর্শ করল। কী ঠান্ডা, ঠান্ডা এবং ভিজে ভিজে। সে গাঢ় গলায় বলল, এই একটা গান গাইবে? ধ্যাৎ, লোকে শুনলে কি বলবে?

কেউ কিছু বলবে না। গাও।

অহনা চোখ বন্ধ করল, নিবিড় অমা-তিমির হতে বাহির হল জোয়ার-স্রোতে/শুক্লারাতে চাঁদের তরুণী। লাইনটা দ্বিতীয়বার গাইতেই কয়েকজন পেছনে এসে দাঁড়াল।

উঠুন।

অহনা গান থামাল। ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করল স্বপ্নময়, মানে? কে আপনারা।

পুলিশ। উঠে পড়ুন। এখানে ভ্যান আছে।

আশ্চর্য! এখানে বসা কি অপরাধ?

সেটা থানায় গিয়ে জানতে পারবেন।

দেখুন, আমরা তো কোনও অন্যায় করিনি। শুধু এখানে বসেছিলাম।

আপনাদের সম্পর্ক?

আমরা, আমরা বন্ধু।

তাই আপনারা দুজনে আঙুলে-আঙুল জড়িয়ে ছিলেন! এই যে ম্যাডাম, উঠে পড়ুন।

স্বপ্নময়ের আপত্তি, অনুরোধে কান না দিয়ে একজন ওর হাত ধরে টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছিল ভ্যানের দিকে। বাকি দুজন গোরু তাড়ানোর ভঙ্গিতে অহনাকে হাঁটাচ্ছিল। অহনার আশা হচ্ছিল শেষ মুহূর্তে স্বপ্নময় একটা পথ বের করবে! কিন্তু লোকটার পাশে ওকে কী অসহায়, রুগ্ন দেখাচ্ছে। স্বপ্নময়কে ভ্যানে তোলা হলে ইউনিফর্ম পরা এক যুবক অফিসার এগিয়ে এল, সবকটাকে তুলেছ?

হ্যাঁ স্যার। যে লোকটা অহনার পেছনে ছিল সে তাড়া দিল, উঠুন, উঠুন।

অফিসার অহনার দিকে তাকাল। সঙ্গে-সঙ্গে মুখের চেহারা পালটে গেল তার, আরে! তুমি? তুমি এখানে কী করছ?

চিবুক বুকের ওপর নেমে যাচ্ছিল। অফিসার আবার জিজ্ঞাসা করল, তুমি তো অহনা?

অহনা মুখ তুলল, আমি কিছুই করিনি।

আঃ। এখানে সন্ধের পর মাঠে কেউ বসে! কত খারাপ কাজকর্ম হয় এখানে! কলগার্ল আর ভদ্রলোকের মেয়েদের আলাদা করা যায় না। তোমরা প্লাস্টিক শিট নিয়েছিলে?

সেপাইটি বলল, না স্যার।

ঠিক আছে। আপাতত ভ্যানে ওঠো।

উঠতে হল। অহনা দেখল ভ্যানে আরও কয়েকজন ছেলে-মেয়ে নারীপুরুষ রয়েছে। একটি মেয়ে বিড়ি খাচ্ছে। ভ্যান চলল, স্বপ্নময় চুপচাপ মুখে হাত দিয়ে বসে আছে।

কিছুটা যাওয়ার পর ভ্যান থামল। পেছনের দরজা খুলে অফিসার ডাকল, অহনা, নেমে এসো। তাড়াতাড়ি।

অহনা নামল। অফিসার বলল, এটা বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে সোজা বাড়ি ফিরে যাও। আমাকে তুমি চিনতে পারছ?

অহনা কথা বলল না। অফিসার বলল, আমার নাম বসন্ত। তোমাদের গলির মোড়েই থাকি। কথা দিচ্ছি এ ব্যাপারটা পাড়ার কেউ জানতে পারবে না। যাও।

ও! অহনার মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে এল।

কী নাম?

স্বপ্নময়।

বন্ধু, মানে ঘনিষ্ঠ বন্ধু?

অহনা জবাব দিল না।

তুমি বড় হয়েছ। এমন ইমম্যাচিওর ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা কি মানায়, যে তোমাকে খোলা মাঠে নিয়ে এসে বিপদে ফেলে দেবে? ভেবে দেখো। অফিসার ভ্যানের দিকে মুখ ফেরাল, স্বপ্নময় কে? নেমে এসো। কুইক।

স্বপ্নময় নামল। অফিসার তার দিকে তাকিয়ে, একটু হেসে, চলে গেল দরজা বন্ধ করে ড্রাইভারের পাশে। ভ্যানটা বেরিয়ে গেল।

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল অহনা। খানিকটা দুরে স্বপ্নময়। ইতস্তত করে সে কাছে এল, আই অ্যাম সরি। আসলে আমি জানতাম না এসব হবে।

অহনা নিরুত্তর। লোকটা তোমার পরিচিত বলে এ যাত্রা বেঁচে গেলাম। উঃ, থানায় নিয়ে গিয়ে বাড়িতে খবর দিলে কী হত ভাবলেই। তোমার সঙ্গে ভালো চেনা?

না। চিনি না। কোনওদিন দেখিনি।

তোমাকে হয়তো চেনে। স্বপ্নময় বলল, দেখো, এরপর তোমার সঙ্গে দেখা করবে।

তো?

তুমি দেখা কোরো না, প্লিজ।

লোকটা তো আজ আমাদের বাঁচিয়ে দিল।

হ্যাঁ। কিন্তু আমরা আর ওকে সে সুযোগ দেব না। আমরা কোনও নিরিবিলি জায়গায় কখনও যাব না। কফি হাউসের ভিড়ে বসব।

এই সময় বাস এসে গেল। এই বাস অহনার পাড়ায় যাবে। অহনা বলল, এলাম।

এখনই। রাত নটা বাজতে অনেক দেরি। এখনই যাবে?

ওই লোকটা তাই বলে গেল।

বাঃ, ওই লোকটার কথা তোমার কাছে বড় হল?

অন্তত আজকে তো নিশ্চয়ই– বাসে উঠে পড়ল অহনা।

খালি বাস। জানলার পাশে বসতেই তার চোখে পূর্ণিমার চাঁদ আটকে গেল। বাসটা ছুটছে, সঙ্গে চাঁদও। হঠাৎ খুব কান্না পেল অহনার। বুকের ভেতর থেকে কান্নাটা ছিটকে বেরিয়ে আসছে। প্রাণপণে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল। এবং সেটা করতে-করতে ও আবিষ্কার করল এইভাবে নিজেকে সামলে নেওয়ার নামই জীবনযাপন। এই রাতের কথা কখনও বলতে পারবে না। নিজেকেও নয়। একজন পুলিশের নাম বসন্ত, ভাবা যায়?

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *