পরিবর্তিত পরিস্থিতি

পরিবর্তিত পরিস্থিতি

রিকশায় বাড়ি ফিরছিলেন অবনীমোহন। তাঁর বাঁ-দিকে বাসব বসে আছে। বাসবের শরীর ইদানীং এত ভারী হয়েছে যে এক রিকশায় সহজভাবে বসা যাচ্ছে না। পার্টি অফিস থেকে বেরুবার সময় বাসব বলেছিল, দাদা, আপনি এখনও রিকশায় যাওয়া-আসা করছেন কেন! গাড়ি তো আছেই।

অবনীমোহন মাথা নেড়েছিলেন, নাহে চল্লিশ সাল থেকে এই শহরে হেঁটে বেড়িয়েছি, শক্তি কমে এসেছে বলে রিকশায় চড়ি কিন্তু গাড়িতে উঠলে হুস করে পৌঁছে যাব। শহরটা দেখতেই পাব না।

বাসব আর কথা বাড়ায়নি। তাঁর পাশে উঠে বসেছিল। একটু চেপে বসে জায়গা করে দিতে হয়েছে ওকে। বাসব তাঁর হাতে গড়া ছেলে। জেলার এম. পি.। গত নির্বাচনে প্রচুর ব্যবধানে জিতেছে সে। ছেলেটি ভালো।

এখন সকাল। অবনীমোহন দেখলেন যেতে-যেতে বাসব হাত তুলে একে-ওকে স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে সমানে। একসময় রাস্তা ফাঁকা হলে বাসব বলল, দাদা, আপনি এখনও এসব ছেঁদো কেস নিয়ে কেন মাথা ঘামান?

ছেঁদো কেস!

ওই যে সুলতানা কী নাম মেয়েটার?

এটা ছেঁদো কেস নয় বাসব। শহরটাকে তো জানো। মানুষ এমন একটা ইস্যু পেলে সমালোচনা করতে ছাড়বে না। হয়তো এই একটা ঘটনাই অনেককে বিরূপ করে তুলবে।

সোমনাথরা তো ব্যাপারটাকে ম্যানেজ করতে চাইছে। কেউ জানতেও পারবে না।

অবনীমোহনের চোয়াল শক্ত হল, কেসটা কে নিয়ে এসেছে? কল্যাণ–তাই না? সে আমাদের ছেলে। কল্যাণ মনে করছে সুলতার ওপর অবিচার করা হয়েছে। আর সেটা যে করা হয়েছে তাতে তো কোনও প্রশ্ন নেই।

বাসব হাঁটুর ওপর ডানহাত রেখেছিল। সেটা তুলে রাস্তায় দাঁড়ানো এক ভদ্রলোককে নেড়ে হাসল। রিকশা বেরিয়ে গেলে বাসব হাত নামিয়ে বলল, কিন্তু আমরা সতীদিকে বিপদে ফেলতে পারি না। গত পাঁচ বছরে ভদ্রমহিলা দলের জন্য যা করেছেন তার কোনও তুলনা নেই।

তুমি আমাকে আপোশ করতে বলছ বাসব?

দেখুন, এখন কিছুই করা যাবে না। মেয়েটি ইতিমধ্যে পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট। ওর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরছিল। সতীদির ভাই কলেজে পড়ে। ওকে আমরা বাধ্য করতে পারি না একটা মেইড সার্ভেন্টকে বিয়ে করতে। দুটো লোক, একটা ফ্যামিলির জীবন তাতে নষ্ট হয়ে যাবে।

কিন্তু একটা ছেলে অতবড় অন্যায় করে শাস্তি পাবে না?

আপনি বুঝতে পারছেন না। শাস্তি দিতে গেলে পুলিশ কেস করতে হয়। সঙ্গে-সঙ্গে খবরের কাগজগুলো ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমাদের দলের একজন নেত্রীর ভাই এইকরেছে। এখন এমন। প্রচার আমরা করতে দিতে পারি না। সোমনাথ বলছে সতীদি আগে যা বলেছেন বা করেছেন তা ভুলে গিয়ে সুলতার পুনর্বাসনের জন্যে হাজার টাকা দিতে রাজি হয়েছেন। সুলতাও এতে রাজি হয়েছে। কল্যাণের সঙ্গে সোমনাথরা কথা বলবে। আপনি আর এ নিয়ে ভাববেন না। কথা শেষ করে বাসব আবার একজনকে হাত নাড়ল। রিকশাওয়ালা খুব যত্ন নিয়ে চালাচ্ছিল। সে জানে এই জেলার সবচেয়ে দামি দুটি মানুষ এখন তার সওয়ার। অবনীমোহনের বাড়ির সামনে পৌঁছে সে সসম্ভ্রমে নেমে দাঁড়াল। অবনীমোহন পকেট থেকে টাকা বের করছিলেন, রিকশাওয়ালা জোরে মাথা দোলাতে লাগল, না স্যার, দিতে হবে না। আমি নিতে পারব না।

স্যার! তুই আমাকে স্যার বলছিস? ওহে বাসব, এ কি বলছে শোনো।

স্যার কথাটা আজকাল সবাই শিখে গেছে দাদা।

নাহে। আজ তুমি সঙ্গে আছ বলে ওর মুখে স্যার বেরিয়েছে। টাকাটা ধর, আমি বিনি পয়সায় কাউকে খাটাই না। ধর বলছি। শেষ শব্দদুটোয় এতটা জোর ছিল যে রিকশাওয়ালা আর আপত্তি করতে পারল না।

গেট খুলে বাড়ির দিকে যেতে-যেতে বাসব বলল, দাদা, এই জন্যে আমি আপনাকে চিরদিন শ্রদ্ধা করি। তবে আপনাদের মতো মানুষ খুব দ্রুত কমে যাছে।

অবনীমোহন কিছু বললেন না। বাড়ির বাঁ-দিকের ঘরটি তাঁর। বসা পড়া এবং শোওয়ার। বাড়িটি পৈতৃক, বাকি অংশে তাঁর ভাইয়েরা থাকেন। অকৃতদার অবনীমোহনের একটি ঘরই যথেষ্ট। বেতের চেয়ারে বসতে দিয়ে তিনি বাসবকে জিজ্ঞাসা করলেন, একটু চা খাবে?

বাসব রুমালে মুখ মুছল, আবার ওদের খাটাবেন?

বউমা এটাকে খাটনি বলে মনে করেন না। তা ছাড়া, এখন তো বাড়িতে অনেক মেয়ে। ভাইপোর বউ, তাদের মেয়ে এবার ক্লাস টেনে উঠল। দাঁড়াও, বলে দিই ওদের।

অবনীমোহন ভেতরে চলে গেলেন। বাসব চারপাশে তাকাল। এই ঘরে সে গত কুড়ি বছর ধরে আসছে। একটুও পরিবর্তন হয়নি কোথাও। তক্তাপোশ, বেতের চেয়ার, আলনা, কুঁজো গ্লাস এবং বই-এর তাক একইরকম রয়ে গেছে। সারাজীবন মাস্টারি করেছেন অবনীমোহন। জেলে। গিয়েছেন অনেকবার। এখন তিনি সরকারিভাবে এই জেলার পার্টির সভাপতি। তিনি থাকায় দলের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে সম্রম এসেছে। অথচ অবনীমোহনের জীবনে কোনও পরিবর্তন আসেনি। আজ যাঁরা মন্ত্রী তাঁদের অনেকেই ওঁর পরে দলে এসেছেন। প্রবীণ যাঁরা তাঁরা মনে করেন অবনীমোহন ইচ্ছে করেই জেলার বাইরে যেতে চাননি।

বাসব বইগুলোর দিকে তাকাল। অবনীমোহন এদের বন্ধু বলেন। একসময় সে এখান থেকে। অনেক বই নিয়ে গিয়েছে পড়ার জন্যে। কিন্তু বই-এর তত্ব এবং জীবনের সত্য যখন মুখোমুখি। হল তখন তাকে জীবনকেই বেছে নিতে হয়েছে। অবনীমোহন এখনও তত্বে বিশ্বাস করেন। বলা যায় তাঁর বাস এখনও ওই বই-এর লাইনে-লাইনে। ফলে অবনীমোহন দলের মূলস্রোতের সঙ্গে ঠিকঠাক গা ভাসাতে পারছেন না। সোমনাথরা এই কথাই তাকে বলছিল। জেলা থেকে নির্বাচিত এম. পি. বলে তার নিজস্ব কিছু ক্ষমতা আছেই। কিন্তু দলের প্রশাসনিক ব্যাপারে সে মাথা ঘামায় না। আজ যখন অবনীমোহন বলেন তার সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত কথা বলতে চান তখন বাসব। আপত্তি করেনি। মনে হয়েছিল এই সুযোগে গুরুকে একটু বাস্তবমুখী করা যেতে পারে। সুলতা কেসটা নিয়ে উনি খুবই অখুশি। সতী দত্ত অধ্যাপিকা। কল্যাণই তাঁকে দলে এনেছিল। তারপর ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছেন ভদ্রমহিলা। এখন দলের মহিলা শাখার নেতৃত্ব ওঁর হাতে। সেই সতী দত্তের বাড়িতে সুলতা চাকরি করত। কল্যাণের অভিযোগ অসহায় মেয়েটিকে সতী দত্তের ভাই এর কারণে গর্ভবতী হতে হয়েছে। ব্যাপারটা জানতে পেরে সতী দত্ত সুলতাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। মেয়েটির কোনও আত্মীয়স্বজন দায়িত্ব নিতে চায়নি। মা-বাবা নেই। কিন্তু সুলতা কী করে কল্যাণের কাছে পৌঁছাল সেটাই বিস্ময়ের। আর তারপর থেকে কল্যাণ ওকে সাহায্য করার জন্য চাপ দিচ্ছে। তবু কল্যাণ দলের ছেলে। যদি বিপক্ষের কেউ খবরটা জানত তাহলে বিপাকে পড়তে হত। স তাঁকে দলের জন্যেই দরকার। অবনীমোহন যেটা চাইছেন সেটা ন্যায়সঙ্গত। এই ন্যায়বোধের কথা বই-এর পাতায় লেখা থাকে। জীবন আরও ব্যাপক। সেখানে যে সত্যিটা জন্ম নেয় তা প্রয়োজনের মাপকাঠিতে। তাই সতীর দেওয়া হাজার টাকা সুলতাকে অখুশি করেনি। সে চলে গিয়েছে শহরের বাইরে।

অবনীমোহন এলেন। পাঞ্জাবি খুলে ফেলেছেন। তক্তাপোশে বসে হাসলেন, তোমাকে যে কারণে নিয়ে এলাম বাসব, আমি এবার বিশ্রাম চাই।

বিশ্রাম?মানে? বাসব চমকে উঠল।

আমার বয়স ঢের হল। শরীরও ঠিক নেই। আগের মতো খাটাখাটনি করতে পারি না। তার ওপর যেটা সত্যি তা হল, এখনকার রাজনৈতিক চিন্তাধারার সঙ্গে আমি নিজেকে মেলাতে পারছি না। নিজের সঙ্গে প্রায়ই যুদ্ধ করতে হয়। তুমি আমাকে দাদা বলে মনে করেছ চিরকাল, আমার ব্যাপারটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে। অবনীমোহন শান্ত গলায় বললেন।

দ্রুত মাথা নাড়ল বাসব, অসম্ভব। এখন আপনাকে ছাড়া যাবে না।

কেন?যা কিছু সিদ্ধান্ত তোমরাই নিচ্ছ।

এটা আপনার অভিমানের কথা। আপনাকে বাদ দিয়ে আমরা কিছুই করিনি।

আমি সম্মতি দিয়েছি। না দিলে কাজ আটকে যেত, তাই।

দাদা, আপনি যেভাবে বলছেন তাতে যে কেউ মনে করবে আপনাকে আমরা ঠুটো জগন্নাথ করে রেখেছি। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। সুলতার কেসটা নিয়ে আপনি একটু বেশি ভাবছেন।

সুলতা একা নয় বাসব। হাসপাতালে আন্দোলনের নামে যা করা হয়েছিল আমি তার বিরোধী ছিলাম। চা-বাগান অঞ্চলে দলের ছেলেদের পার্টির চাঁদার রসিদবই বিলিয়ে দিয়ে কোনও হিসেবও না চাওয়া আমি মানতে পারিনি। বাসব, আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, নিজেকে কি বোঝাব? অবনীমোহন মাথা নাড়লেন, আমরা ক্রমশ বুর্জোয়া ড্রেসিংরুমের শিকার হয়ে যাচ্ছি।

বাসব হাসল, আপনি সোনার পাথরবাটি চাইছেন। এই সংবিধান মানবার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি। নির্বাচনে আর কোনও গরিবদের দল জিততে পারে না। কোটি-কোটি টাকা খরচ করতে হয়। বিশাল মেশিনারি লাগে। বুর্জোয়াদের লালনে যে দল লড়ছে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে সমপর্যায়ে নিজেদের নিয়ে যেতে হয়, অন্তত অর্থবল এবং লোকবলে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে আমরা আমাদের পথে অবশ্যই চলব। কিন্তু কিছু ফাঁক তো থেকেই যায়। দাদা, আমরা যতদিন বিরোধী দল হিসেবে কাজ করেছি ততদিন আপনার ওই বইগুলোর তত্ব আমাদের কাজে লেগেছে। মাঝে-মাঝে মনে হয় সরকার-বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমরা সঠিক পথে চলতে পেরেছিলাম। কিন্তু সরকার চালাতে গিয়ে অনেক সময় আমাদের হয়তো আদর্শচ্যুত হতে হচ্ছে। তবে এখানেও প্রশ্ন, আদর্শ কোনটা? সেটা শালগ্রাম শিলা হতে পারে না। এক পয়সা ট্রামবাসে। ভাড়া যখন বাড়ানো হয়েছিল তখন আমরা আন্দোলনে জনসাধারণকে সঙ্গে পেয়েছিলাম। কিন্তু তিরিশ বছর পরে সরকার চালাতে গিয়ে খরচের বহরে যখন নাভিশ্বাস উঠছে তখন নিজেরাই। ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছি। প্রতিপক্ষ যে আন্দোলন শুরু করেছে তাকে অগণতান্ত্রিক বলতে বাধ্য। হচ্ছি। এ ছাড়া কোনও উপায় নেই। আর এই সব করেই আমাদের সাধারণ মানুষের জন্যে কাজ করতে হবে। এই অবস্থায় আপনি সরে দাঁড়ালে জনসাধারণ আমাদের সন্দেহ করবে। শাসন যার হাতে তাকে তো সাধারণ মানুষ বন্ধু বলে মনে করে না। আমরা যতই বলি জনসাধারণের বন্ধু আমরা, তবু তারা দূরত্ব রাখবেই। এ অবস্থায় আপনার চলে যাওয়া মানে ওদের ভাবনাকে আরও মজবুত করা। বাসব কথা শেষ করা মাত্র একটি কিশোরী দু-কাপ চা নিয়ে এল। বাসব তার দিকে তাকিয়ে বলল, আরে নন্দিনী, কত বড় হয়ে গেছিস?

নন্দিনী চায়ের কাপ দিয়ে বলল, আজকাল তো আপনি আসেনই না।

হ্যাঁরে, সময় পাই না। দিল্লি আর কলকাতা করতে-করতে নিশ্বাস ফেলতে পারি না। চায়ে চুমুক দিল বাসব। নন্দিনী দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।

কোন ক্লাশ এবার?

টেন। আসছি। নন্দিনী চলে গেল।

চা খেয়ে বাসব বলল, দাদা আপনি নেক্সট ইলেকশন পর্যন্ত চুপ করে থাকুন। এমনিতেই হঠাৎ হাওয়াটা একটু গরম হয়ে উঠেছে। এসব কথা নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করবেন না।

না, আমার মনে হয়েছিল তুমি শিক্ষিত ছেলে, পড়াশুনা করেছ, তুমি বুঝবে।

বাসব উঠে দাঁড়াল, আপনি তো জনসাধারণকে চেনেন। কোনও-কোনও নেতার একটু বেহিসাবি কথায় তারা খেপে উঠেছে। কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষ এত বিশৃঙ্খল যে তাদের শান্ত করতে বেশি সময় লাগবে না। সেক্সপিয়ার সাহেব তো জনতার চরিত্র বলেই গিয়েছেন।

অবনীমোহন দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন বাসবকে, ওইটেই বোধহয় ভুল হচ্ছে বাসব। ঢেউ-এর ধাক্কায় কণা-কণা বালি কখন যে নিজেরাই জড়ো হয়ে একটা বিরাট চর হয়ে যায় তা আগে ঠাওর করা যায় না। বিরোধ যখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তখন নেতৃত্ব আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যায়। আমরা এটাই বুঝতে পারছি না। ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করব।

বাসব মাথা নাড়ল। রাস্তায় পা দিয়ে সে পেছন ফিরে তাকাল। অবনীমোহন তখনও দরজায়। দাঁড়িয়ে আছেন। মানুষটি সত্যি ভালো। তার আজকের যা কিছু উন্নতি সব ওই একটি লোকের জন্য। না, অবনীমোহনকে এখন কিছুতেই ছাড়া যেতে পারে না। কিছুদিন আগে সুধাময় চৌধুরী কলকাতার পার্টি অফিসে বসে বলেছিলেন, বাসব, অবনীর মতো একজন আমাদের দলে আছে। এটা ভাবতে আমার খুব ভালো লাগে। ও জেলা থেকে বেরিয়ে এলে দেশের অনেক বেশি উপকার হত। পুরোনোদিনের লোক যাঁরা তাঁদেরই এমনই ধারণা ওঁর সম্পর্কে। চারপাশে

তাকিয়ে বাসব একটিমাত্র রিকশাওয়ালাকে দেখতে পেল। তাকে দাঁড়াতে দেখেই সে রিকশা। নিয়ে এগিয়ে আসছে, চলুন স্যার। সঙ্গে-সঙ্গে বাসবের মনে পড়ল এই লোকটাই তাদের নিয়ে এসেছিল। সে হেসে বলল, তুমি এখনও এখানে? এর মধ্যে ভাড়া পাওনি?

পেয়েছি স্যার। নিইনি। আপনি তো ফিরে যাবেন।

রিকশায় উঠে বসে বাসব। তার ভালো লাগল। একেবারে, যাকে বলে রুট লেভেলে সে চলে। গিয়েছে। একজন রিকশাওয়ালা পর্যন্ত তাকে খাতির করছে। কিন্তু ও কী চায়? এখন জেলায় এলেই যারা ভিড় করে তারা কিছু-না-কিছু চায়। লোকগুলো যখন বোঝে বিধানসভা বা কলকাতার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই, লোকসভা বা দিল্লিতেই তার কাজকর্ম, তখন খুব হতাশ হয় সবাই। একমাত্র বড় ব্যাবসায়ী ছাড়া কেউ তাই বিব্রত করতে পারে না তাকে। এম. পি.হয়ে খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছে সে। মুখ ফিরিয়ে সে শেষবার তাকাল, অবনীমোহন দাঁড়িয়ে আছেন।

অবনীমোহন শূন্য রাজপথের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বাসব যা বলে গেল তার সবটাই ওর দিক থেকে সত্যি। বিরুদ্ধ ভাবনাটা তাঁর মনে আজই প্রথম এল না, দল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ধীরে-ধীরে এমন দানা বাঁধছিল। নিজেকে বুঝিয়েছিলেন মতে মিলছে না বলে সরে দাঁড়ালে। কাজের কাজ তো কিছুই হবে না, ক্ষমতাহীন অবস্থায় ঘরে বসে অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই তিনি করতে পারবেন না। তবু জেলার সর্বোচ্চ পদে থেকে তিনি কিছুটা কাজ নিজের মতো করে করতে পারছেন। ভেবেছিলেন বাসব তাঁর কথা বুঝতে পারবে, এখন মনে হচ্ছে। বুঝেও বাসব তাকে মানিয়ে চলার নীতি নিতে বলছে। কিন্তু একটা মানুষ কতখানি মেনে নিতে পারে? গ্রামের প্রায় সবগুলো পঞ্চায়েত এখন তাঁদের দখলে। যদিও পঞ্চায়েতের সদস্যরা কিছু চামচে নিয়ে গ্রাম থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করছে। এখন নির্বাচনে জিততে জনসাধারণের দেওয়া ব্যালটের ওপর নির্ভর করতে হয় না, তাই পরবর্তী নির্বাচনেও ওরা জিতবে। কিন্তু আগুন একদিন জ্বলবেই। পার্টি ফান্ডে হাজার টাকা চাঁদা না দিতে পারার অপরাধে এক সম্পন্ন কৃষিজীবী পরিবারের চাষবাস বন্ধ করে দেওয়া হল। কেউ তার জমিতে চাষ করতে যেতে পারবে না। যারা চাষ করত তাদের দিয়ে বেশি মজুরি দাবি করানো হল। পরিবারটি এক বছর চাষ বন্ধ। রাখল। কিন্তু শেষপর্যন্ত অভাবের তাড়নায় বাধ্য হল হাজার টাকা চাঁদা দিতে। এই বাধ্য হওয়া মানুষগুলোর বুকে আগুন জ্বলছে ধিকধিক করে। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন কখনই ও গ্রামের শাখাকে নির্দেশ দেওয়া হয়নি অত টাকা চাঁদা আদায় করতে। অথচ তারা করছে। এসব খবর জানা সত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। থানা তো এখন অতিরিক্ত রকমের তাঁবেদার। এই আধা ফ্যাসিস্ত ক্রিয়াকলাপ বেশিদিন চলতে পারে না। কিন্তু একথাও ঠিক, পদত্যাগ করলে তিনি কোনও সুরাহা করার সুযোগই পাবেন না।

অবনীমোহন দেখলেন, শূন্য রাজপথে একটি রিকশা আসছে। রিকশার সওয়ারি এই শেষ সকালেই মাথায় ছাউনি ফেলেছে। রিকশাটি অবনীমোহনের বাড়ির সামনে এসে থামল। রিকশাওয়ালা সওয়ারিকে বাড়িটা দেখিয়ে কিছু বলতেই লোকটা ভাড়া মেটাল, তারপর একটা কাঁধে ঝোলানো বড় ব্যাগ নিয়ে নেমে দাঁড়াল।

দরজায় দাঁড়িয়ে অবনীমোহন লোকটাকে দেখলেন। বছর তিরিশেক বয়স। ভাঙা গাল। কাঁধ অবধি চুল। চেক শার্ট আর বিবর্ণ জিনসের প্যান্ট পরে কাঁধে ব্যাগ ফেলে এগিয়ে আসছে। প্রায় মুখোমুখি হতেই লোকটা জিজ্ঞাসা করল, অবনীমোহনবাবু আছেন?

আমিই অবনীমোহন।

অ। ভেতরে চলুন, কথা আছে।

আপনি কোত্থেকে আসছেন?

কলকাতা থেকে। চলুন ভেতরে বসে কথা বলব।

লোকটার বলার ভঙ্গিতে যে ঔদ্ধত্য রয়েছে সেটা অবনীমোহনকে বিরক্ত করল। অশিক্ষা থেকেই মানুষ এই ভঙ্গিতে কথা বলতে পারে। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, আপনার কি দরকার তা এখানে দাঁড়িয়ে বলতে অসুবিধে হচ্ছে কেন?

লোকটা চারপাশে তাকাল, পাবলিক শুনুক আমি চাই না। হোলনাইট জার্নি করে এসেছি। হেভি টায়ার্ড। বসেই কথা বলতে চাই।

অতএব অবনীমোহন ওকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। নিজে তক্তাপোশে বসে লোকটাকে চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করলেন। লোকটা তাঁর ঘরের চেহারা দেখছিল। হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, আপনি তো জেলা কমিটির চেয়ারম্যান?

হ্যাঁ, কেন বলুন তো?

কতদিন হয়েছেন?

আগাগোড়া।

যাঃ শালা!

মানে?

অ্যাদ্দিনেও বাড়িঘরের চেহারা পালটাতে পারেননি?

কি চান আপনি? চোয়াল শক্ত হল অবনীমোহনের।

বুকপকেটে রাখা একটা ভাঁজকরা খাম বের করে অবনীমোহনের দিকে বাড়িয়ে ধরল লোকটা। খামটা নিয়ে মুখ ছিঁড়ে চিঠি বের করলেন তিনি। সত্যর চিঠি। অত্যন্ত ক্ষমতাবান মন্ত্রী। বছর কুড়ি হল পার্টিতে এসেছে। কয়েকবার জেলায় এসেছে। তাঁকে খুব দাদা-দাদা করে। সম্ভবত প্রবীণ নেতাদের মুখে তাঁর কথা শুনেছে। সেই সত্য চিঠি লিখেছে।

শ্রদ্ধাস্পদেষু, পত্রবাহক শ্রীমান বলাই গুপ্ত আমাদের অত্যন্ত কাছের মানুষ। সে দলের সদস্য না হলেও সক্রিয় কর্মী। আজ যখন বিরুদ্ধপক্ষের মদত দিতে কিছু বুর্জোয়া কাগজ আমাদের পেছনে লেগেছে তখন আমাদের সংগ্রামে নামতেই হচ্ছে। যাহোকশ্রীমান বলাই-এর নামে কয়েকটি মিথ্যে এফ. আই. আর. করা হয়েছে। মিথ্যে বলেই পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল। কিন্তু খবরের। কাগজগুলো প্রতিদিন এমন চাপ দিচ্ছে যে পুলিশকে আর নিষ্ক্রিয় রাখা যাচ্ছে না। তাই ওকে আমি আপনার কাছে পাঠালাম। অন্তত মাসখানেক আপনি ওর নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিন। আপনার কাছে ওকে পাঠিয়ে আমি নিশ্চিন্ত। দলের জন্যে আপনার অবদানের কথা আমরা সবাই জানি। শ্রীমানকে আশ্রয় দেওয়া দলের প্রতি কর্তব্য বলে মনে করলে বাধিত হব। ওর। সমর্থনে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করার কথা চিন্তা করছি। নমস্কার সহ আপনার সত্য দত্ত!

অবনীমোহন চিঠিটি শেষ করে বলাই গুপ্তের দিকে তাকালেন। গলা পরিষ্কার করে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কলকাতা থেকে কীসে এলেন?

রকেটে। কৃষ্ণনগর থেকে উঠেছি।

কেন?

সত্যদা বললেন, বুলু চান্স নিয়ো না। এসপ্ল্যানেডে গেলে পাবলিক চিনে ফেলতে পারে! তাই প্রাইভেট কারে কৃষ্ণনগরে পাঠালেন। ওখানে রকেট এসে থামতেই উঠে পড়লাম।

অবনীমোহনের মনে হল এই লোকটিকে নিছকই মস্তান বলা যায়।

পেশিশক্তির প্রয়োজন আপনা থেকেই হচ্ছে। অথবা পেশিশক্তি যাদের আছে তারা নিজেদের প্রয়োজনেই রাজনৈতিক দলের। ছায়ায় আসছে। এখন এই অর্থে তত্বসর্বস্ব রাজনৈতিক দল প্রায় সোনার পাথরবাটির মতো ব্যাপার। অবনীমোহনকে মানতে হয়েছে। আটচল্লিশ সালের অবনীমোহনের সঙ্গে সাতষট্টির অবনীমোহনের যেমন অনেক অমিল ছিল, নব্বইতে এসে তিনি প্রচুর পালটেছেন। এসব সত্যি, কিন্তু এই শহরে তথাকথিত পেশিশক্তি নিয়ে যারা ঘোরাফেরা করে তাদেরও একটা পারিবারিক দিক আছে। শেকড়ছাড়া কেউ নয়। আর তারা অবনীমোহনের সামনে এসে নিচু করে কথা বলে।

অবশ্য সামনে আসার অস্বস্তি থেকে দূরে থাকতেই তারা পছন্দ করে।

অবনীমোহন বললেন, আপনি একটু বসুন। আমার কিছু জানার আছে।

বলাই হাত নাড়ল, আমি তো মাসখানেক এখানে থাকব। পরে জানলে ক্ষতি আছে? আমার এখনই ল্যাট্রিনে যাওয়া দরকার। হোল নাইট জার্নি করেছি।

অবনীমোহন উঠলেন। তাঁর ঘরের লাগোয়া একটি স্নানঘর এবং পায়খানা আছে। ব্যবস্থাটা অনেকদিনের। বাড়ির লোকজনকে বিব্রত না করতেই তিনি এই ব্যবস্থা করেছিলেন। একসময়। তাঁর ঘরেই প্রচুর সভা হয়েছে। অনেক মানুষ ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা বসে থাকত। সে সময় ওই ব্যবস্থা করা। বলাইকে ইশারায় তিনি ভেতরে নিয়ে এলেন। এক চিলতে উঠোন। উঠোনের পরেই মূল বাড়ি। সেদিকে না গিয়ে তিনি বলাইকে নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে দিলেন।

বলাই বলল, আমার ব্যাগ বাইরে পড়ে রইল কিন্তু!

এখানে কোনও চুরি-চামারির ভয় নেই।

ওর ভেতরে মাল আছে। একটু নজর রাখবেন। বলাই ঢুকে গেল। অবনীমোহন ফিরে এলেন বাইরের ঘরে। তক্তাপোশে বসে সত্যর চিঠিটা আবার পড়লেন।

সব কেমন গোলমেলে হয়ে যাচ্ছিল অবনীমোহনের। জীবনে তাঁকে দু-বার আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হয়েছিল। পার্টিকে যখন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল আর জরুরি ব্যবস্থা জারি হওয়ার সময়। সেটা ছিল পুলিশের নজর থেকে দূরে সরে থাকা। সাধারণ মানুষের সাহায্য পেয়েছিলেন অনেক। একটা সততাবোধ সেই সময় তাঁদের অনুপ্রাণিত করত।

পায়ের শব্দে অবনীমোহন চোখ খুললেন। নন্দিনী এসে পাশে দাঁড়িয়েছে, কে এসেছে দাদু?

কলকাতা থেকে একজনকে পাঠানো হয়েছে।

কেন?

ও এখানে কিছুদিন থাকবে। তুমি ভেতরে যাও।

মা জিজ্ঞাসা করল তোমার জলখাবার এখন দেবে কিনা?

মাথা নাড়লেন অবনীমোহন, না, এখন খাব না। তুমি বরং ভেতরে যাও।

কেন?

অবনীমোহন কী জবাব দেবেন বুঝতে পারলেন না। বলাই-এর সামনে নন্দিনী থাকুক তিনি পছন্দ করছেন না, এ-কথাটা কীভাবে বলবেন, নাতনির হাত ধরে তিনি বললেন, আমরা এখন কিছু জরুরি কথা বলব তো, তাই তোমাকে ভেতরে যেতে বলছি।

ও, তাই বলো। লোকটার নাম কী দাদু?

বলাই।

নন্দিনী হেসে উঠল, ওর চুলগুলো দেখেছ? অমিতাভ বচ্চনের নকল করা!

তুমি কী করে দেখলে?

বাঃ, আমি তো ভেতরের দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম।

বুঝলাম। এবার যাও।

নন্দিনী যখন চলে যাচ্ছে সেই সময় বলাই ঢুকল। জামাপ্যান্ট পালটানোর চেষ্টা করেনি কিন্তু একটু পরিচ্ছন্ন হয়েছে। চলে যাওয়া নন্দিনীর দিকে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। অবনীমোহনের এটা পছন্দ হল না।

চেয়ারে বসে বলাই বলল, আঃ, এবার আরাম লাগছে। কিষাণগঞ্জের কাছে রাস্তা যা খারাপ ছিল, কি বলব আপনাকে!

আপনার ব্যাগে কী আছে? অবনীমোহন জিজ্ঞাসা করলেন।

কি আছে মানে?

বাথরুমে ঢোকার সময় বলছিলেন।

অ। রিভলভার।

আপনি রিভলভার নিয়ে ঘুরছেন? লাইসেন্স আছে?

এবার শব্দ করে হাসল বলাই, আপনি কোন জগতে বাস করেন বলুন তো? এই শহরে যারা অ্যাকশান করে তারা কি লাইসেন্স নিয়ে রিভলভার চালায়?

এখানে ওসবের প্রয়োজন হয় না।

তাই নাকি? প্রথম শুনলাম। আমি কোন ঘরে থাকব?

কোন ঘর মানে?

বাঃ, সত্যদা বলেছেন আপনি থাকার ব্যবস্থা করবেন!

অবনীমোহন উঠে দাঁড়ালেন। মনে-মনে বললেন, অসম্ভব। এ বাড়িতে কিছুতেই নয়। এই মুহূর্তে ওকে তাড়িয়ে দিতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু সত্যর অনুরোধ তিনি ঠেলতেও পারছেন না। লোকটাকে অনেক দূরে কোথাও পাঠানো দরকার যেখানে গিয়ে ওকে একদম একা থাকতে হবে। হঠাৎই তাঁর মনে পড়ল সেই ফরেস্ট বাংলোটার কথা। প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে গভীর জঙ্গলে বাংলোটা রয়েছে। সেখানে কোনও ট্যুরিস্ট যায় না। ডি.এফ.ও.-র সঙ্গে কথা বলা দরকার এবং তার আগে থানাতে যেতে হবে। এই একমাস বলাইকে যেন কেউ বিরক্ত না করে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

অবনীমোহন বললেন, দেরি করে লাভ নেই। চলুন আমার সঙ্গে।

কোথায়?

আপনার একটা নিরাপদ আশ্রয় দরকার। আমার এখানে সেটা সম্ভব নয়। সারাদিন প্রচুর লোক আসেন। একটা ফরেস্ট বাংলোয় ব্যবস্থা করছি। ওখানে চৌকিদার আছে, সেই রান্না করে দেবে। মাসখানেক জঙ্গলের বাইরে আসবেন না।

বাঃ, ওরকম জায়গায় একা থাকলে পুলিশ সবচেয়ে আগে টের পাবে!

টের যাতে না পায় তার ব্যবস্থা করছি–চলুন।

অর্ধেকের চেয়ে কম বয়সের লোকটাকে অবনীমোহনের তুমি বলতে ইচ্ছে করছিল না। আর মজার ব্যাপার বলাই তাঁকে একবারও অনুরোধ করেনি তুমি বলতে। এতে স্বস্তি পাচ্ছেন তিনি।

নিতান্ত অনিচ্ছায় তাঁর পাশে রিকশায় বসে বলাই জিজ্ঞাসা করল, কতদূরে?

বাসে ঘণ্টা দুয়েক লাগে।

আমার কাছে বেশি মালকড়ি নেই।

ঠিক আছে। বলতেই মাল শব্দটা থেকেই রিভলভারের কথা মনে হল। অবনীমোহন বললেন, আমরা প্রথমে থানায় যাব।

থানা? থানা কেন? চমকে উঠল বলাই।

আপনার নিরাপত্তার জন্যে।

আপনার মতলবটা কি বলুন তো?

সত্য আপনাকে পাঠিয়েছে, তাই ওর অনুরোধ রাখছি। একটা কথা, আপনার রিভলভারটা আমাকে দিন। পুলিশের চরিত্র আমি বুঝি না। ওরা কিছু করবে না, তবু থানার ভেতরে আপনার কাছে রিভলভার না রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

পুলিশের নজর এড়াতে এতদুরে এলাম আবার আমাকেই কেন থানায় নিয়ে যাচ্ছেন বুঝতে পারছি না। দু-নম্বরী কিছু করতে চাইলে সত্যদা কিন্তু আপনাকে ছেড়ে দেবে না মনে রাখবেন। প্রায় শাসানোর ভঙ্গিতে কথাগুলো বললেও ব্যাগ খুলে হাতের আড়াল রেখে রিভলভারটা বের করে অবনীমোহনকে দিল বলাই। অবনীমোহন জীবনে প্রথমবার রিভলভার ধরলেন। কাঁপা। হাতে পকেটে রেখে দিলেন তিনি। বলাই বলল, সাবধানে রাখবেন। লোড করা আছে।

থানার গেট পেরিয়ে রিকশাটা থামতেই ভাড়া মিটিয়ে দিলেন অবনীমোহন। তাঁকে দেখতে য়েই দারোগাবাবু হাতজোড় করে বেরিয়ে এলেন, আসুন-আসুন, কী সৌভাগ্য! আমাকেই তো ডেকে পাঠাতে পারতেন। আসুন।

দারোগার ঘরে বসে অবনীমোহন দেখলেন বলাই খুব শক্ত হয়ে বসে আছে। খুব ভয় পাওয়া একটা মানুষের চেহারা এরকম হয়। অবনীমোহন হাসলেন, আমাকে একটু টেলিফোনে ডি.এফ.ও.-কে ধরিয়ে দেবেন?

দারোগা বললেন, নিশ্চয়ই। একটু আগে ডি.এফ.ও. বাংলোয় ফিরে গেলেন। দাঁড়ান দেখছি। রিসিভার তুলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যোগাযোগ করিয়ে দিলেন তিনি।

অবনীমোহন বললেন, কেমন আছেন ডি.।

একটা অনুরোধ আছে আপনার কাছে।এফ.ও. সাহেব?

আর বলবেন না, বয়স হচ্ছে এবার টের পাচ্ছি

মিনিটখানেক লাগল না, ডি.এফ.ও. খুশি হয়ে অনুমতি দিলেন। তিনি এখনই ওই ফরেস্ট এলাকার অধস্তন কর্মচারীদের জানিয়ে দিচ্ছেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন।…টেলিফোন রেখে অবনীমোহন বললেন, এই ভদ্রলোকের খুব খিদে পেয়েছে, কিছু আনানো যাবে?

দারোগা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, নিশ্চয়ই। কি আনাব?কচুরি তরকারি ছাড়া তো কিছুই পাওয়া যাবে এখন। তাই আনাই? আপনি খাবেন তো স্যার? খাবেন না? চা? অ্যাই, কে আছ? গোটাছয়েক কচুরি আর তিনকাপ চা নিয়ে এসো জলদি।

একজন পুলিশ আদেশ পালন করতে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। দারোগা এবার হাত কচলালো, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কোনও অন্যায় হয়ে যায়নি তো–মানে নিজে এখানে এলেন!

না-না। আমি এসেছি এর জন্যে। আচ্ছা, একে কি আপনি চিনতে পারছেন?

দারোগা বলাই-এর দিকে তাকালেন। অবনীমোহন দেখলেন, বলাই খুব সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। দারোগা কিছুক্ষণ তাকিয়ে মাথা নেড়ে না বললেন। অবনীমোহন হাসলেন, একটু আগে যে। ফরেস্ট বাংলোটার কথা ডি.এফ.ও.-কে বললাম, সেখানে ইনি মাসখানেক থাকবেন। আমাদের কলকাতার একজন বড় নেতা চাইছেন এই সময়টা ওঁকে কেউ যেন বিরক্ত না করে।

ওটা তো আমার এলাকা নয় স্যার।

ওই এলাকার যিনি দারোগা তাঁকে তো আপনি চেনেন।

চিনি। তা আপনি কি ওখানে সেপাই পোস্ট করতে বলছেন?

না, ঠিক উলটো। নেতা চাইছেন কেউ যেন ওঁর খোঁজ না করে।

ও বুঝলাম। ঠিক আছে স্যার, হবে। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

এত দ্রুত খাবার এসে যাবে কল্পনা করেননি অবনীমোহন। বলাই চেটেপুটে খেল। খেয়ে বলল, কচুরিতে যেন কেমন গন্ধ!

দারোগা হাসল, মফস্বলের কচুরি তো, কলকাতার স্বাদ পাবেন কোথায়!

চা খাওয়া হলে অবনীমোহন উঠছিলেন, দারোগা তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল, স্যার, এবার মন্ত্রী এলে আমার কথাটা মনে রাখবেন।

মনে করিয়ে দেবেন। অবনীমোহন বেরিয়ে এলেন থানা থেকে। তাঁর পেছন-পেছন বলাই। তার গলায় হাসি ছিল, বাপস। খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। দিন, এবার মালটা দিন।

ওটা আপনাকে এই জেলা থেকে চলে যাওয়ার দিন দেব।

সে কি! ওটা ছাড়া আমি থাকতে পারি না।

কান দিলেন না অবনীমোহন। বললেন, আপনাকে আমি বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দিচ্ছি। বাস ওই ফরেস্টের পাশ দিয়ে যায়। কিছুটা হাঁটতে হবে। ততক্ষণে ডি. এফ. ও. সাহেবের হুকুম পৌঁছে যাবে। আপনি চলে যান।

অ্যাঁ! আমি একা যাব? বলাই পাশে এসে দাঁড়াল, অসম্ভব। সত্যদা বলেছেন আপনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন। নিজে যেতে না পারেন কাউকে সঙ্গে দিন।

কাউকে সঙ্গে দিলে জানতে পারবে আপনার কথা। মাথা নাড়লেন অবনীমোহন। তাঁকে খুব বিষণ্ণ লাগছিল। এই লোকটিকে কেন তাঁকে বহন করতে হচ্ছে? কেন তিনি একে ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না? সত্য দত্তর মুখ মনে পড়ল। বলাই অ্যাকশন করত। কীরকম কাজ সেটা তো তিনি এখনও জানেন না। এফ. আই. আর. আছে যখন, তখন–! না, তিনি একে প্রশ্রয় দিচ্ছেন তা দলের কাউকে জানানো চলবে না।

সামান্য হাঁটতেই বাসের দেখা পেলেন অবনীমোহন। হাত দেখাতেই সেটা থামল। কন্ডাক্টর অবনীমোহনকে চিনতে পেরে উদ্যোগ নিয়ে জায়গা করে দিল। পাশাপাশি দুটো সিট। অবনীমোহন জানলার ধারে বসেই টিকিট কাটলেন। কন্ডাক্টর নিতে চাইছিল না টাকা, তিনি বাধ্য করলেন। শহর ছাড়িয়ে বাস বাইরে বেরুলে অবনীমোহন জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নামে এফ. আই. আর. করা হয়েছে কেন?

ওই যে, তখন বললাম। অ্যাকশান করেছিলাম। নিচু গলায় বলল বলাই।

কীরকম অ্যাকশান?

অনেকগুলো।

যেমন?

ইলেকশনের সময় বুথ জ্যাম করতে বলা হয়েছিল। দলের লোকজন পারছিল না। তখন বোম নিয়ে রিভলভার নিয়ে নামলাম। সব ভোটার হাওয়া হয়ে গেল। বুথে ঢুকে কাজ শেষ করে চলে এলাম। কোনও ঝামেলা হয়নি।

এছাড়া? চোয়াল আবার শক্ত হল অবনীমোহনের।

মাসখানেক আগে আমাদের পাশের পাড়ার কয়েকজন খুব গোলমাল পাকাচ্ছিল। কাটা পাঁচুর নাম শুনেছেন? শোনেননি? সত্যদা পাত্তা দেয়নি বলে এমনি হয়ে গিয়েছিল। পুরো বস্তিটাকেই অ্যান্টি করে তুলেছিল। চোলাই, মেয়েছেলে সবরকম ব্যবস্থা করত। একদিন অ্যাকশন করলাম। কাটা পাঁচুর প্রেমিকাকে ধরে রেপ করলাম। ব্যস, সব ঠান্ডা। পুরো বস্তি এখন আমাদের দলে। কাটা পাঁচু ভোগে।

ভোগে মানে?

লাইনে পড়ে আধাআধি টুকরো হয়ে গিয়েছে।

আপনি রেপ করেছেন? হতভম্ব অবনীমোহন।

ওসব তো করতেই হয়। মেয়েছেলেটা আমার নাম পুলিশকে বলে দিয়েছে। ওকে ঠান্ডা করার টাইম পাইনি। ফিরে গিয়ে হিসেব নেব।

সত্য জানে আপনি এসব করেছেন?

গুরুর পারমিশন ছাড়া কোনও কাজ করি না দাদা।

অবনীমোহনের বমি পাচ্ছিল। বলাই-এর পাশে বসতে তাঁর ঘেন্না হচ্ছিল। সত্য কাকে পাঠিয়েছে তাঁর কাছে? একি তাঁদের ক্যাডার? সত্যর ক্যাডার? ক্যাডার মানে শিক্ষিত সৎ রাজনৈতিক কর্মী। তাহলে?

হঠাৎ অবনীমোহনের সমস্ত শরীরে জ্বলুনি ধরল। তিনি স্থির করলেন এই সামাজিক অপরাধীটিকে কোনওরকম সাহায্য করবেন না। একে অবিলম্বে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। তারপরেই মনে হয় পুলিশকে তিনি অন্যরকম অনুরোধ করে এসেছেন। বাড়িতে বসে এসব শুনলে কখনই সেটা করতেন না। এখন নতুন করে কিছু বলতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। তাহলে? অবনীমোহন ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন। বাসবরা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে বলে। বাসব হলে কি করত? তিনি সরে বসলেন। কোনওরকম রাস্তা তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

ফরেস্টের গেটের মুখে ওঁরা বাস থেকে নামলেন। বলাই বলল, যাঃ শালা! এখানে তো মানুষের মুখই দেখা যাবে না, সময় কাটবে কী করে?

মানুষের মুখ দেখার মতো মুখ তো আপনি করেননি। চাপা গলায় বললেন তিনি।

মানে? কি উলটোপালটা বলছেন?

ঠিকই বলছি। আমার বয়স হয়েছে। আর হাঁটতে পারব না। সোজা ওই কাঁচা রাস্তা ধরে চলে যান। বাংলো পাবেন। একমাসের মধ্যে এখান থেকে বের হবেন না।

আমি একা যাব?

এতদিন যা করেছেন তা কি একা করেননি?

না। সঙ্গী ছিল।

আমার কাজ আমি করেছি, যান।

মাল দিন। টাকা আর রিভলভার।

বাস চলে গেছে। কয়েক মাইলের মধ্যে মানুষের বসতি নেই। গাছে পাখি ডাকছে। হঠাৎ সচেতন হলেন অবনীমোহন। জীবনে কখনও রিভলভার চালাননি তিনি, একটা পিঁপড়েকেও কখনও মারেননি। রিভলভার তাঁর পকেটে আছে। তাতে গুলি আছে বলেছিল বলাই। তিনি যদি এখন ওটা বের করে বলাই-এর বুক লক্ষ্য করে ছোড়েন তাহলে কেউ টের পাবে না। আর এইটেই তাঁর কর্তব্য। একজন মানুষ হিসেবে, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বলাই-এর মতো পিশাচকে সরিয়ে দেওয়া কর্তব্য। তিনি রিভলভার বের করলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল। বলাই এগিয়ে এসে রিভলভার নিয়ে নিল। তাঁর আঙুলগুলো যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিল সেই মুহূর্তে। বলাই ওটাকে পকেটে রেখে বলল, টাকাটা?

পকেটে একশোটা টাকা ছিল, এটাই আপাতত রাখুন। বিড়বিড় করলেন তিনি।

এতে আর কদিন চলবে? পাঠিয়ে দেবেন, নইলে আমাকে আবার আপনার বাড়িতে যেতে হবে। সত্যদাকে খবরটা দিয়ে দেবেন, দিতে বলেছে। বলাই হেলতে দুলতে জঙ্গলের পথ ধরল। অবনীমোহনের মনে হল একটি জন্তুও ওর চেয়ে অনেক স্বাভাবিক পায়ে হাঁটে।

শহরে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। অস্নাত অভুক্ত অবনীমোহন বাড়িতে ঢুকে শুনলেন প্রচুর লোক। তাঁর খোঁজে এসেছিল। সোমনাথরা যেতে বলেছে। তিনি দরজা বন্ধ করে তক্তপোশে শুয়ে পড়লেন। মাথা ঘুরছে, বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে। নন্দিনী একটু আগে ভেতরে চলে গেছে। তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতে চাননি। হঠাৎ মনে পড়ল সকালে বলাই নন্দিনীর দিকে তাকিয়েছিল। যে বলাই প্রকাশ্যে রেপ করতে পারে, যে বলাই রেপের গল্প গর্বের সঙ্গে করতে পারে তাকে তিনি আশ্রয় দিয়ে এলেন। নন্দিনীর মুখ মনে পড়তেই শিউরে উঠলেন।

অনেকক্ষণ পরে অবনীমোহন উঠলেন। আলো জ্বাললেন। তারপর চিঠি লেখার কাগজ নিয়ে বসলেন। একটু ভেবে তিনি শুরু করলেন–শ্রীযুক্ত সত্য দত্ত প্রীতিভাজনেষু,

তোমার চিঠি নিয়ে বলাই আমার কাছে এসেছিল। প্রথমে থানায় নিয়ে গিয়ে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি। তারপর ডি.এফ.ও.-র অনুমতি নিয়ে একটি ফরেস্ট বাংলোয় রেখে এসেছি। সেখানে যাওয়ার আগে আমি তার ক্রিয়াকলাপ জানতাম না।

আমি দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে এদেশে বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। অনেক সংগ্রাম করে আজ আমরা একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি। কিন্তু এই পৌঁছানোটা মূল লক্ষ্যের সিকিভাগও নয়। আমরা চিরকাল জেনে এসেছি জনসাধারণের পাশে বন্ধু হিসেবে দাঁড়ানোটাই আমাদের পবিত্র কর্তব্য। ঠিক যে কারণে আমাদের দেশের ধনতান্ত্রিক দলগুলো বিচ্ছিন্ন হয়েছে, যে কারণে উগ্রপন্থী বিপ্লবীরা হেরে গিয়েছে, সেই কারণটা আমাদের যেন ধ্বংস না করে। ক্ষমতায় আসার পর আমাদের আরও সুযোগ এসে গিয়েছে জনসাধারণের পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি কয়েক কোটি মানুষকে তাঁবে আনতে আমরা কিছু পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করছি। আজ যাকে তুমি আমার কাছে পাঠিয়েছ সে জনগণের শত্রু। অথচ তার ওপর তোমাকে নির্ভর করতে হচ্ছে। যতদিন তোমার হাতে ক্ষমতা থাকবে ততদিন সে কথা শুনবে। যেদিন প্রতিপক্ষের হাতে ক্ষমতা যাবে সেদিন সে দলবদল করে তোমার আমার স্ত্রী-কন্যাদের ধর্ষণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।

এই সত্যটা আমাদের বোঝা উচিত। জনসাধারণের জন্যে কাজ করতে এসে তাদের শত্রু করে তোলার পথ থেকে এখনই আমাদের সরে আসা উচিত। এখন আমরা সমালোচনা সহ্য করতে পারি না। কেউ সমালোচনা করলেই তাকে শত্রু মনে করি। কিন্তু আমি মনে করি, আমার মতো যারা বামপন্থী আন্দোলনকে মনে-প্রাণে সমর্থন করেন তাঁরাও একমত হবেন, বর্তমান অবস্থায় আমরা সঠিক পথে চলছি না। আমাদের আত্মশুদ্ধি হওয়া দরকার। ঔদ্ধত্য ত্যাগ করা উচিত। আর এই সমাজবিরোধীদের উৎখাত করে সামাজিক তরুণদের ওপর আস্থা রাখা প্রয়োজন।

আজ সকালে বাসবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। সে আমাকে বর্তমানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বলেছিল। আমিও তোমাদের জীবনের সঙ্গে পা মেলাতে অনুরোধ করছি। তোমার কাছে। অনুরোধ, তুমি বলাইকে পুলিশের হাতে তুলে দাও। এই শহরের দারোগা জানে সে কোথায় আছে। একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরো–যাতে মানুষ জানবে আমরা অপরাধীর রক্তাক্ত হাতের সঙ্গে হাত মেলাইনি।

একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এইটুকু আমার আবেদন। অবনীমোহন।

চিঠিটা ভাঁজ করলেন তিনি। খামে ঢোকালেন। তারপর ধীরে-ধীরে ভেতরের দরজা খুলে অন্ধকারেই বাথরুমে ঢুকলেন। তাঁর ইচ্ছে হচ্ছিল স্নান করার। জলের ধারায় নিজেকে ধুয়ে নিতে। কিন্তু কল পর্যন্ত তাঁর যাওয়া হল না। মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন তিনি। শব্দ শুনে বাড়ির সবাই ছুটে এল। চিৎকার চেঁচামেচি। অ্যাম্বুলেন্স এল হাসপাতালে নিয়ে যেতে। সারা শহরে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন অবনীমোহন। তাঁর মাথার পাশে বসে নন্দিনী আকুল গলায় জিজ্ঞাসা করল, কি বলছ দাদু?

অবনীমোহন জড়ানো গলায় বললেন, চিঠি—টে-বিলে–!

তুমি চিঠি লিখেছ, কাকে পাঠাব?

অবনীমোহন চেষ্টা করলেন, কথা বেরুল না ঠোঁট থেকে। এক হাত অসাড়, অন্য হাতে তিনি যেন এক দিগন্ত থেকে আর এক দিগন্তের ঠিকানা আঁকলেন।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *