পকেটমার

পকেটমার

ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তু তে ॥

আহ্নিক শেষ করিয়া গৌরমোহন সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলেন। রহিলেন সে অবস্থায় বেশ খানিকক্ষণ। তখনও তাঁহার কম্পিত ঠোঁটে ও অস্ফুট গলায় কোনও প্রার্থনার ধ্বনি শোনা যাইতে লাগিল। প্রণাম সারিয়া যত্নপূর্বক দৈনন্দিন, চন্দনচর্চিত গীতা এবং চণ্ডী সালুর কাপড়ে জড়াইয়া তুলিয়া রাখিলেন ঠাকুরের আসনের এক প্রান্তে।

বসিয়াছিলেন সেই কোন ভোরে। অন্ধকার থাকিতে গঙ্গাস্নান করিয়া ফিরিবার পথে পাঁচমন্দিরের শিব প্রণাম করিয়া আসিয়াছেন। তার পর আহ্নিক। এখন বেলা প্রায় নটা।

ইতিমধ্যে মেজবউ বারকয়েক উঁকি দিয়া দিয়াছে এবং প্রতিবারেই ফিরিয়া গিয়াছে কিঞ্চিৎ ঠোঁট ফুলাইয়া মৃদু শব্দে আঁচলের ঝাপটা দিয়া। কিংবা অকারণে ঘরে ঢুকিয়া এটা সেটা নাড়িয়া আড়চোখে দেখিয়া গিয়াছে শ্বশুরমশায়ের কোনও ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় কি না। কেন না, বিশেষ কার্যোপলক্ষে তাড়াতাড়ির জন্য তাঁহাকে সন্ধ্যা আহ্নিক করিতেও দেখা গিয়াছে। কিন্তু আজ বৃথা।

গৌরমোহনের চোখ তখনও অর্ধনিমীলিত, ভাবে এবং ভক্তিতে শান্ত ও গম্ভীর সে চোখের দৃষ্টি। কপাল চন্দনচর্চিত। পরনে একখানি বহু রিপু-করা পাতলা গরদ। ধোয়া হইলেও পুরনো গরদের রং দেখিয়া মনে হয় যেন কত ময়লা। মাথার কাঁচা-পাকা চুল ছোট করিয়া কাটা, শিখাটি বেশ লম্বা এবং তাহাতে একখানি পুরো গোলঞ্চ ফুল বাঁধা রহিয়াছে।…তাঁহার দেবভক্তির তুলনা নাই। সারা ভাটপাড়ায় তাঁহার ভক্তিমান ও সৎ বলিয়া খুবই সুনাম। তিনিই বলেন, এ নিয়েই তো বেঁচে আছি, আর কিই বা আছে, কেই বা আছেন বলো?

সত্য, তাঁহার আর কী আছে! একসময় চটকলে কেরানির কাজ করিয়াছেন তাই ছেলেকে লেখাপড়া শিখাইয়া মানুষ করিয়াছেন। কিন্তু ভাগ্য কিছুটা অপ্রসন্ন ছিল। বড়ছেলেটি বিধবা বউ এবং একটি ছেলে রাখিয়া মারা গিয়াছে। মেজটি বছরখানেক পুর্বে বিবাহ করিয়া চাকরি উপলক্ষে বিদেশবাসী হইয়াছে বর্তমানে। বলিতে গেলে তাহার আয়েই এ সংসারের ভরণপোষণ চলিতেছে। ছোটছেলেটি এখনও ছোটই। এ বছরে স্কুলপাঠ শেষ করিয়া সে কলেজে ঢুকিবে। আর তাঁহার স্ত্রী আছেন, সুনয়নী। ওই যে ঘরের একপাশে তক্তপোশে শুইয়া রহিয়াছেন বাত-পঙ্গু, অনড় এবং বাকশক্তিহীনা। কয়েক বছর ধরিয়া বোধ করি দিনেকের জন্যও শয্যা ত্যাগ করা সম্ভব হয় নাই। শুধু তাঁহার বড় বড় চোখ দুটিতে এখনও প্রাণ আছে, মনটা আসিয়া ঠেকিয়াছে সেইখানেই। চোখের ইশারাতেই তিনি ডাকেন, কথা বলেন। হাত দুটি নাড়িতে পারেন খুব আস্তে আস্তে।

এ বাড়ি এবং মানুষগুলির দিকে চাহিলেই বোঝা যায়, সুনয়নীর মৃত্যুর জন্য সবাই প্রতীক্ষা করিতেছে, কিন্তু তিনি সবাইকে নিরাশ করিতেছেন দিনের পর দিন। সারাদিনের মধ্যে তাঁহার প্রতি নজর কারও বড় একটা পড়ে না, খাওয়াইবার সময়টুকু ছাড়া। বলিতে গেলে, এখন তিনি না মরিয়াও মরিয়া রহিয়াছেন।

আহ্নিকের শেষ ঘণ্টাধ্বনি শুনিয়াই মেজবউ মালতী ছুটিয়া আসিল। বালিকামাত্র। বয়স বছর ষোলো সতেরো হইবে বা। চেহারার বিশেষত্ব কিছু না থাকিলেও সব মিলিয়া প্রায় সুন্দরী হইয়া উঠিবার উপক্রম করিয়াছে। আবদারে এবং কর্তৃত্বের ভারসাম্যে বয়সানুযায়ী তার চরিত্রটি বড় মিষ্টি। আদুরি বউ ও কর্মঠ গিন্নি, এ উভয়ধারার সংমিশ্রণে সে মানানসই।

সে আসিয়াই ভ্রূ তুলিয়া অভিমানের সুরে বলিল, আপনার কিন্তু, বাবা, আহ্নিক বেড়ে গেছে।

গৌরমোহন একটি নিশ্বাস ফেলিয়া নীরবে সস্নেহে হাসিলেন। এত বড় কথা একমাত্র মালতীই বলিতে পারে। আর কেহ বলিতে পারে নাই বা পারিবেও না। বিশেষ তাঁহার পূজা-আহ্নিক সম্পর্কে সকলেরই একটা শ্রদ্ধা রহিয়াছে।

আসন ছাড়িয়া উঠিবার মুহূর্তে রেকাবির চিনি প্রসাদের এক চিমটি লইয়া জিভে ও মাথায় ঠেকাইলেন গৌরমোহন। তার পর ছোট জলচৌকিখানিতে আসিয়া বসিলেন।

মালতী তখনও দাঁড়াইয়া আঁচল পাকাইতেছিল। খসা ঘোমটা টানিয়া দিয়া সে আবার বলিল, আজকে কিন্তু বাবা আর না বলতে পারবেন না, আগেই বলে রাখছি।

গৌরমোহনের মুখে হাসি লাগিয়াই আছে। বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হইলেও তিনি তা চকিতে গোপন করেন। বলেন, হ্যাঁ গো বেটি, তাই হবে। এখন তুমি–

আর বলিতে হয় না। খুশিতে চড়াই পাখির মতো ফুৎকারে উড়িয়া গেল মালতী রান্নাঘরের দিকে। আবার তেমনই চকিতে ফিরিয়া আসিল একটি ছোট বাটি ও চামচ লইয়া।

গৌরমোহনের স্নেহহাসি মুগ্ধ হইয়া উঠিল। বলিলেন, এ আবার কী?

মালতী লজ্জায় আনন্দে বাটির দিকে চাহিয়া বলিল, ছোলা আর লঙ্কা ভাজা নুন দিয়ে বেটে দিয়েছি। চায়ের সঙ্গে খুব ভাল লাগবে, খেয়ে দেখুন।

পাগলি কোথাকার! খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠিল গৌরমোহনের মুখ। আজকাল এক কাপ চা ছাড়া সকালে আর কিছু পাওয়া যায় না। এটা মালতীর বিশেষ আয়োজন।

ফিরিবার পথে মালতী আপনমনে হাসিয়া আবার দাঁড়াইল। চোখ বড় করিয়া বলিল, জানেন বাবা, অনুদের বাড়ির বউয়ের চুড়িগুলো আমি আজ দেখে এসেছি। কী সুন্দর ফ্যাশানের চুড়ি। আজকাল ওই ফ্যাশানটাই সকলে ভালবাসে।

বলিয়া রুষ্ট মুখে নিজের হাত দুখানি সামনে বাড়াইয়া বলিল, আর এ কী বিচ্ছিরি প্যাটার্ন, একেবারে সেকেলে। আমার বাবার যেমন বুদ্ধি, সোনা একটু দিল তো তার কোনও ছিরিছাঁদ নেই। আপনি আজই এগুলো আকুল স্যাকরার কাছে নিয়ে যান।

ছোলার মশলার ছাতু আটকায় গৌরমোহনের গলায়। হাসির একটু হুঁ হুঁ শব্দ করিতে গিয়া শুকনো ছাতু গলা দিয়া নাসারন্ধ্রে পৌঁছয় প্রায়। না, তাঁহার মন বুঝিয়া এমন অবারিতভাবে আর কেহ এ বাড়িতে আজও কথা বলিতে পারে না। পারে কেবল মেজবউ মালতী।

কিন্তু মালতী গেল না। ফিরিয়া একেবারে শ্বশুরের পায়ের সামনে বসিয়া বড় বড় চোখে ফিসফিস করিয়া বলিল, আমার বাবা তো এই দু আড়াই ভরি সোনাও দিতে চায়নি, জানেন বাবা? বলেছিল আমার ধর্মিষ্টি বেয়াই, হাতে পায়ে ধরে আমি এমনিই মেয়ে দিয়ে আসব।

বলিয়া এক মহাগিন্নির মতো ঘোমটা টানিয়া ভ্রূ কুঁচকাইয়া বলিল, আমিই বেঁকে বসলুম। বললুম, পাঠাচ্ছ তো এক গরিবের ঘরে, তবুও খালি হাতে? বড়দিকে পাঁচ ভরি সোনা দিতে পারলে, আর আমার বেলাতেই যত অভাব। শেষটায় তো–

শুনিতে শুনিতে এবার বিরক্ত হইয়া ওঠেন গৌরমোহন। কিন্তু হাসিটি একেবারে দূর হয় না। বলেন, হ্যাঁ গো পাগলি, খুব বুঝেছি, এবার একটু চা দাও।

ওমা, ভুলেই গেছি। বলিয়াই পড়ি মরি করিয়া ছুটিল মালতী।

আশ্চর্য! আপন বাপও এমন পর হইয়া যায় মেয়েদের কাছে। আর সে গল্পও কি না একেবারে শ্বশুরের কাছে। গৌরমোহনের ক্ষুব্ধ মুখ হইতে হাসিটুকু সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে।

মালতী আসিয়া চায়ের কাপটা রাখিতেই বাড়ির বাহির হইতে মোটা গলার ডাক ভাসিয়া আসিল, ঠাকুরমশাই, বাড়ি আছেন নাকি?

চায়ে চুমুক দিতে গিয়া চুম্বোনোন্মুখ ঠোঁট গৌরমোহনের আড়ষ্ট হইয়া গেল। বড় অসহায় ও করুণ দৃষ্টিতে তিনি চাহিলেন মালতীর দিকে। বউমা!

মাত্র এক বছর বিবাহ এবং বালিকা হইলেও মালতী এ চাহনির অর্থ বিলক্ষণ জানে। সে একমুহূর্ত অপেক্ষা করিয়া উঠানে আসিয়া জোর গলায় বলিল, দ্যাখো তো ঠাকুরপো, বাবাকে কে ডাকে। বলে দাও, বাড়ি নেই।

কল্পিত ঠাকুরপোকে কথাটি বলিয়াই সে সদর-দরজার কাছে ছুটিয়া গিয়া ফুটো দিয়া দেখে লোকটা কী বলে। দেখিল, লোকটা সংশয়ান্বিতভাবে দরজার দিকে চাহিয়া কী যেন বিড়বিড় করিতে করিতে চলিয়া যাইতেছে। সে হাসিতে হাসিতে আসিয়া সে কথা শ্বশুরকে বলিল।

সে হাসিতে যোগ দেওয়া বা হাসিটুকু চাহিয়া দেখাও যে গৌরমোহনের পক্ষে কত কঠিন, মালতী তাহা জানে না। তাই সে পাওনাদার বলরামের প্রবঞ্চিত মুখ স্মরণ করিয়া হাসিয়া আকুল হইল।

গৌরমোহনের কপালে রেখাগুলি জংশনস্টেশনের লাইনের মতো বাঁকিয়া চুরিয়া উঠিল। ক্ষোভে, বেদনায় আফসোসে ও অপমানে কালো হইয়া উঠিল গৌরবর্ণ মুখ।…অথচ, একদিন তাঁর সততার ঢাক বাজাইয়াছে লোকে। তাঁর চটকলের সহকর্মীরা শুধুমাত্র ঘুষের পয়সায় অর্থ সঞ্চয় করিয়া সকলেই অল্পবিস্তর ঐশ্বর্য করিয়াছে। কিন্তু তিনি পারেন নাই। সে সততার ঢাক আজ শুধু ঢস্কাইয়া যায় নাই, যেন উপহাসের খেউড় গানের তাল হইয়া উঠিয়াছে। কী লাভ হইয়াছে সেদিনের সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলিয়া? আজও তাঁহাকে কয়েকটি দোকানের হিসাব লিখিয়া এ ঝুঁকির মড়া সংসারে ঠোকা জোড়া দিতে হয়। সুদূর কানপুরে মেজছেলেটি প্রকৃতপক্ষে নির্বাসিত থাকিয়া মাসিক কিছু টাকা পাঠায়। অথচ এত বড় সংসার। ফলে দেনার শেষ নাই এবং দেনা করিয়া তার শোধ দিতে পারেন না। মিথ্যার আশ্রয় লইয়া লুকাইয়া বেড়াইতে হয়।…ছোটছেলেটি লেখাপড়া শিখিতেছে বটে, কিন্তু পাঠ্যের চেয়ে অপাঠ্য পুস্তক বেশি পাঠ করিয়া বিগড়াইয়া যাইতেছে। অবশ্য ধর্মবিরুদ্ধ কথা আজকাল সব ছেলেপুলেরাই বলিয়া থাকে কিন্তু ছেলেটি তাঁর রাষ্ট্রবিরুদ্ধ সর্বনাশের পথ ধরিয়াছে। সর্বনাশ বই কী। এ হতভাগ্য দেশের দরিদ্র সন্তানেরা রাষ্ট্রবিরোধী হইলে তাহার জন্য লাঞ্ছনা ও মৃত্যু প্রতিমুহূর্তে ওত পাতিয়া থাকে। কিন্তু এত মেধা লইয়া ছেলের মরা চলিতে পারে না। তাহা হইলে এ সংসারের ভার কে লইবে? তাহাকে সব সহিয়া শুধুমাত্র উপার্জনক্ষম হইতে হবে।

জীবনের এ নানান দুর্যোগে বিচলিত হইয়া গৌরমোহন অভিমানক্ষুব্ধ মুখে তাকান ঘরের ইষ্টদেবতার দিকে, ঠাকুর! অনেকদূর তো এনে ফেলেছ, আর কতদূর?

তার পর এক নিশ্বাসের শব্দে চমকাইয়া সুনয়নীর দিকে তাকান। হ্যাঁ, মনে থাকে না যে, এ ঘরে আর একটি মানুষ আছে, সে সবই শুনিতেছে। এবং বিচিত্র অপলক একজোড়া চোখ লইয়া সবই দেখিতেছে। দেখিলেন, স্ত্রীর চোখজোড়া তাঁর দিকেই নিবদ্ধ। তাড়াতাড়ি একবার ভাবিয়া লইলেন, আজ অমাবস্যা বা পূর্ণিমা কি না। কারণ, ওইসব দিনগুলিতে সুনয়নীর এ ভোগান্তের উপরেও যন্ত্রণা বাড়ে। বলিলেন, কিছু বলছ?

সুনয়নীর মাথা একটু নড়িল বা। চোখের তারা দুইটি একবার ঘুরিয়া গেল এ-পাশে ও-পাশে। অর্থাৎ কিছু বলিবেন না।

কিন্তু সুনয়নীর মনের এবং হৃদয়ের সমস্ত ভাব ও কথা তাঁহার স্থির চোখে জমা হইয়া এমন বিচিত্র দৃষ্টি হইয়াছে যে সে চোখের দিকে একটু বেশি সময় তাকাইয়া থাকা এক দুরূহ ব্যাপার। চোখের উপর সমস্ত চেতনা আসিয়া পড়ায় তাহা বড় হইয়া উঠিয়াছে। এবং সাপের মতো অপলক বলিয়া সবাক না হইয়াও সে অবাক চোখে কত না ভাব। বেশিক্ষণ তাকাইয়া থাকিলে মনটার মধ্যে কেমন করে, ভয়ও হয়।

মালতী ছিল না, কোথায় গিয়াছিল। আবার ঢুকিল ঝড়ের মতো শাড়ির আঁচল উড়াইয়া। আসিয়াও থমকিয়া দাঁড়াইল দরজার কাছে। ছুটিয়া আসিতে হাঁপাইয়া পড়িয়াছে সে। তার নাকের পাটা কাঁপিতেছে, দুলিয়া দুলিয়া উঠিতেছে ষোড়শী বুক এবং কীসের গোপন লজ্জায় যেন আড়চোখে শশুরের দিকে তাকাইতেছে। টেপা ঠোঁটের কোণে সলজ্জ হাসি চমকাইতেছে। হাতে একখানি কীসের বই উঁকি মারিতেছে তার আঁচল ঢাকা হইতে।

নতুন কোনও আব্দারের আশঙ্কায় গৌরমোহন হাসিলেন। বলিলেন, হাতে আবার ওটা কী বউমা।

এ কথার জন্যই বোধ হয় মালতী অপেক্ষা করিতেছিল। তাড়াতাড়ি বইটার একটা পাতা খুলিয়া সে গৌরমোহনের পায়ের কাছে বসিয়া পড়িল। অলঙ্কারের নমুনা চিত্রের একটি বই। তাহার ভিতর হইতে তাহার পছন্দসই নমুনাটি বাহির করিয়া দেখাইয়া বলিল, এই যে বাবা, এই নমুনাটা, এরকম তৈরি করতে হবে। অনুদের বই এটা, চেয়ে নিয়ে নিলাম। আপনি এ বইটাও নিয়ে যান, নইলে স্যাকরা কী করতে কী করে বসবে।

গৌরমোহনের হাসিমুখ বিরক্তি ও কারুণ্যে বিচিত্র হইয়া উঠিল। একটা অদ্ভুত শব্দ বাহির হইল তাঁর নাকের ভিতর দিয়া। তিনি বারকয়েক হুঁ হুঁ করিয়া সব বুঝিয়া মানিয়া লইলেন।

কিন্তু ব্যাপারটা মালতীর মনঃপূত হইল না। সে এক মুহূর্ত আঙুল কামড়াইয়া কী ভাবিল, পরমুহূর্তেই উজ্জ্বল চোখে ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। আবার ফিরিয়া আসিল একটি পেন্সিল লইয়া এবং তাহার নমুনার পাশে একটি ঢ্যাড়া কাটিয়া বলিল, দেখুন বাবা, এই দাগ রইল, আবার ভুল করে বসবেন না যেন। দেখেছেন দাগটা?

যেন যুদ্ধের পূর্বে সেনাপতিকে রাজা রাজ্যের ম্যাপ দেখাইতেছেন। বিরক্তি হইলেও গৌরমোহন যেন বিরক্ত হন নাই বরং আর বুঝাইতে হইবে না গোছের করিয়া বলিলেন, দেখেছি গো দেখেছি। তুমি আমাকে এবার একটু তামাক খাওয়াও তো।

ওমা, ভুলেই গেছি। বলিয়া সে তাড়াতাড়ি তাঁর প্রাত্যহিক কলকে, সজ্জা করিয়া আগুনের জন্য রান্নাঘরে গেল।

সেখানে বিধবা বড়বউ তার দামাল ছেলেটিকে লইয়া রান্নার কাজে বড় ঝামেলার মধ্যে পড়িয়াছিল। সে অনেকক্ষণ হইতেই মালতীর ব্যাপারটা লক্ষ করিতেছিল, কিন্তু বলিতেছিল না কিছুই। কেবল থাকিয়া থাকিয়া বিদ্রূপের হাসিতে তাহার ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়া উঠিতেছিল।

মালতীকে দেখিয়া ছেলেটি আসিয়া তাহাকে জাপটাইয়া ধরিল এবং তাহার মায়ের ডাকের অনুসরণ করিয়া বলিয়া উঠিল, মালতি, অই মালতি, আমাল খিদে পেছে। মা দেয় না।

মালতী ব্যস্ত গিন্নির মতো শিশুকে তাড়াতাড়ি আলতো চুম্বনে ভুলাইয়া বলিল, লক্ষ্মী বাবা, আমি কাজটা সেরে নিই, তার পর সব দেখছি।

জায়ের দিকে ফিরিয়া বলিল, ওকে কিছু খেতে দাও না, বড়দি।

বড়দি তখন শিলনোড়া লইয়া পড়িয়াছে। মুখ না ফিরাইয়া বলিল, কী আছে যে দেব। এ হতভাগা সংসারে কি সকালে দু পয়সার মুড়িও আসবে যে দেব। একেবারে ভাত হলেই খাবে।

তবুও উৎসাহের আতিশয্যে মালতীর মনে হইল না যে, ছোলার ছাতু তার অভুক্ত ভাসুরপোকে দেওয়া হয় নাই। সে আবার কাজটা সেরে নিই বলিয়া চলিয়া গেল।

রান্নাঘরে বড়বউ একলা ঠোঁট উলটাইয়া হাতের একটা বিচিত্র ভঙ্গি করিয়া যেন শিলনোড়াকেই বলিল, হায় রে কাজ! হতভাগী, কী নিয়ে তোর মাতামাতি দুদিন বাদে তো সবই ঘুচবে।

নিজেকে দেখাইয়া বলিল, এ গায়ে কি কম সোনা ছিল। তা সবই গেছে এ সংসারের পেটে। যা হাঁড়ল গর্ত হাঁ বাবা এ সংসারের।…

মালতী তখন শ্বশুরকে তামাক দিয়া বাক্স হইতে তার জমানো যে টাকা ছিল, তাহা বাহির করিল। একখানি ফরসা রুমালে হাতের ছ গাছা চুড়ি ও সেই টাকা বাঁধিয়া শ্বশুরকে দিয়া বলিল, সোনা দেড় ভরি আছে বাবা, সামনে থেকে ওজন করিয়ে নেবেন। ব্রোঞ্জ আর কিনতে হবে না, ওর উপরেই কাজ হবে। বানি খরচার টাকাও ওর মধ্যেই রইল।

এক মুহূর্ত চিন্তা করিয়া আবার বলিল, যদি দেখেন বানি খরচা কুলোচ্ছে না, তা হলে আনাটাক সোনা বেচে দেবেন, কেমন?

হ্যাঁ সবই বুঝিয়াছেন গৌরমোহন, কিন্তু তিনি একটা দুর্ভাবনায় বিচলিত হইয়া উঠিয়াছেন। এ সংসারে অভাব চিরকালের। তাই সুনয়নী হইতে শুরু করিয়া বড়বউ, সকলেরই গা হইতে বিন্দু সোনাও চিমটি কাটিয়া লইয়া এ সংসার বাঁচাইতে ব্যয় হইয়াছে। সকলেরই মনে দুঃখ হইয়াছে সোনা দিতে। শরীর হইতে অলঙ্কার খুলিয়া দিতে কোন্ মেয়েই বা খুশি হয়। কিন্তু অলঙ্কার সোহাগী তাঁর এ বউটির কাছ হইতে কেমন করিয়া তিনি তাহা লইবেন? গহনার শোকে যে মরিয়া যাইবে তাহার বউমা। এমন যাহার সোনা-অস্ত প্রাণ তাহার প্রাণটুকুও সোনা দিয়া মোড়া হইলে বোধ হয় ভাল হইত। হায় কপাল, সোনা কি শুধুমাত্র অলঙ্কারের জন্যই? তাহা দিয়া জগৎ চলিতেছে। কিন্তু বউমা তাহার কিছুই বুঝিবে না। জামা পরিয়া, চুড়ি ও পয়সার পুঁটলি পকেটে লইয়া নমুনার খাতাটি বগলে গৌরমোহন বাহির হইলেন।

অনেক দিন বলিয়া বলিয়া আজ মালতীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইতে যাইতেছে, সেই খুশিতে সে আপন মনে হাসিতেছিল। বোধ করি ভাবিতেছিল, সেই চুড়ি পরিয়া কেমনভাবে সে অনুদের বাড়িতে গিয়া দেখাইবে এবং এই হাতে কেমন মানাইবে বা সবাই না জানি কত প্রশংসাই করিবে। ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ হাতের দিকে নজর পড়িতে অভ্যাসের ভুলে চুড়ি না দেখিয়া বুকটা তাহার ছাত করিয়া উঠিল। পরমুহূর্তেই হাসিয়া উঠিল এবং ছুটিয়া দরজার কাছে প্রায় গৌরমোহনের গায়ের উপর হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া বলিল, বাবা, খুব সাবধান, পকেটমারের দৌরাত্ম্য আজকাল।

গৌরমোহন নিরুত্তরে বাহির হইতেছিলেন ঘাড় নাড়িয়া। কিন্তু মালতী আবার খুব বিবেচনা করিয়া বলিল, নীচের পকেটের চেয়ে ওটা আপনি বুক পকেটে রাখুন বাবা। ও সব্বোনেশেরা কখন কী করে বসে তার ঠিক কি?

গৌরমোহন রাগে ও বিরক্তিতে এবার বেশ সশব্দেই হাসিয়া উঠিলেন এবং মুখ ফিরাইয়া বুক-পকেটেই রুমালখানি রাখিয়া বাহির হইয়া গেলেন। 

ঘরের মধ্যে সুনয়নীর চোখের তারা দুইটি ঘরের বিগ্রহের দিকে বিব্ধ। ঠোঁট সামান্য নড়িতেছিল তাঁহার। তিনি বলিতেছিলেন, দুগা দুর্গা!

মালতী ফিরিয়া আসিয়া জায়ের ছেলেটিকে আদর করিতে লাগিল এবং বার বার নিজের খালি হাত দুইটির দিকে চাহিয়া যেন প্রিয় আগমনের উল্লাসে চোখ হাসিয়া উঠিতে লাগিল।

গৌরমোহন পাঁচমন্দির পার হইয়া যে রাস্তাটা আঁকিয়া বাঁকিয়া বড় রাস্তায় গিয়াছে সে পথ ধরিলেন। তাঁহাকে প্রথমে যাইতে হইবে হাজরার দোকানে, তার পর সাধুখাঁর তেল-ঘিয়ের খুচরা বিক্রির ঘরে। ও-বেলা আবার সেই কাঁকিনাড়ায় যাইতে হইবে কয়েকটি দোকানে হিসাব লিখিতে। কোন্ ফাঁকে যে একটু সময় করিয়া আকুল স্যাকরার ঘরে যাইবেন, তাহাই ভাবিতেছেন।

বড় রাস্তার মোড়ে আসিতেই হঠাৎ চায়ের দোকান হইতে প্রায় গোপন হত্যাকারী সর্বনেশে শনিঠাকুরের মতো পাওনাদার বলরাম সা গৌরমোহনের মুখের সামনে আসিয়া দাঁড়াইল এবং প্রণাম ভুলিয়া দাঁত খিঁচাইয়া জোর-গলায় বলিয়া উঠিল, তবে যে বড় বাড়ির মেয়েমানুষকে দিয়ে বলিয়ে দিলেন, বাড়ি নেই আপনি, অ্যাাঁ? বামুন হয়ে এমন মিছে কথা?

যেন প্রচণ্ড বজ্রাঘাতে গৌরমোহনের সর্বাঙ্গ পুড়িয়া গেল। রক্ত নাই তাঁহার মুখে। তিনি বলিতে চাহিলেন, বলরাম, একটু আস্তে। কিন্তু তাঁহার ঠোঁট নড়িল, শব্দ বাহির হইল না।

বলরাম গলা চড়াইয়া বলিল, কী রকম কথা, মশাই। এত সুনাম আপনার, আর তলে তলে এত ছ্যাঁচড়ামো। ছি ছি ছি, তখন বলে কত কথা। ছেলের এগজামিনের ফি দিতে হবে, পরিবারের চিকিচ্ছের জন্য কবরেজকে টাকা দিতে হবে। আর এখন দেখা করা তো দূরের কথা, মেয়েমানুষকে দিয়ে মিছে কথা বলে দেয়। আমি ঠিক বুঝেছি–

এবং বলরামের আস্ফালনে দুই-একজন লোক জমিতেছিল। গৌরমোহনের দরদর করিয়া ঘাম ঝরিতেছে, কপালের চন্দন পড়িতেছে গলিয়া গলিয়া আর পৃথিবী দুলিয়া উঠিলেও দ্বিধা হইতেছে না। তিনি হঠাৎ মরিয়া হইয়া বলিয়া উঠিলেন, পরশু, পরশু তোমার টাকা নিশ্চয় পাবে, বলরাম। হাজরার দোকানে তুমি এসো, আমি থাকব।

বলরাম চিৎকার করিয়া সমবেত কয়েকজনকে গৌরমোহনের প্রতিজ্ঞার কথা শুনাইয়া দিল।

একটু অগ্রসর হইয়া গৌরমোহন দেখিলেন, ঘটনা দেখিয়া অদূরেই তাঁহার ছোটছেলেটি চোখাচোখি হইবার আশঙ্কায় অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া মাথা নিচু করিয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে।

গৌরমোহনের চোখে হঠাৎ পথ ও মানুষ সব ঝাপসা হইয়া গেল, একটা নোনাজলের স্বাদ তাঁহার মুখ ভরিয়া তুলিল, গাল বহিয়া আসিয়া। মনে হইল, তাঁহার কানের কাছে যেন কাহারা কোলাহল করিতেছে, এগজামিন, চিকিচ্ছে, দুধ, কয়লা…

বাড়ি ফিরিয়া গৌরমোহন ভাবিতেছিলেন, ছেলে সব কথাই বলিয়া দিয়াছে। কিন্তু হাওয়া দেখিয়া বুঝিলেন, বলে নাই।

মালতী আসিয়া জানিয়া তৃপ্ত হইল যে চুড়ি ও টাকা স্যাকরার ঘরে পৌঁছিয়াছে, বানি খরচা আর লাগিবে না এবং চারদিনের মধ্যেই পাওয়া যাইবে। বলিল, দেখুন বাবা আমার হাতটা কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া দেখাচ্ছে। মেয়েমানুষের গায়ে সোনা না থাকলে কী বিচ্ছিরি দেখায়।

তার পর চোখ বড় বড় করিয়া বলিল, সোনা পরলে নাকি শরীর ভাল থাকে বাবা, অ্যাঁ? গৌরমোহন হাসিতে চেষ্টা করিয়া অন্যমনস্কভাবে সায় দিলেন।

তৃতীয় দিনে মালতী বায়না ধরিয়া বসিল, নতুন চুড়ি পরে আমি দুদিন বাপের বাড়ি ঘুরে আসব, বাবা! যেতে দেবেন তো?

গৌরমোহন যেন চুড়ির কথা ভুলিয়া গিয়াছিলেন। কয়েক মুহূর্ত মালতীর মুখের দিকে তাকাইয়া থাকিয়া হঠাৎ বলিলেন, ও! আচ্ছা গো আচ্ছা, যেয়ো।

পর দিন সন্ধ্যার পরে গৌরমোহন মাতালের মতো টলিতে টলিতে বাড়ি ঢুকিলেন এবং হাতের ছড়িটি উঠানে ফেলিয়া দিয়া একটা শ্বাসরোধী শব্দ করিতে করিতে বসিয়া পড়িলেন মাথায় হাত দিয়া। তাঁহার সর্বাঙ্গে ঘাম পড়িতেছে, ভিজিয়া গিয়াছে জামা।

মালতী এবং বড়বউ রান্নাঘর হইতে ছুটিয়া আসিল। বড়বউ বলিল, কী হয়েছে বাবা অমন করছেন কেন? ভয় পাইয়া সে চিৎকার করিয়া উঠিল, ঠাকুরপো। শিগগির এশ, কী সর্বনাশ, কী হবে। বাবা, উথূন, ঘরে চলুন।

মালতী দুই হাতে গৌরমোহনকে টানিয়া তুলিতে চেষ্টা করিল এবং বার বার বলিতে লাগিল, কেন এমন হল, কী হল?

ছোটছেলেটি বাড়িতে না থাকাতে বড়বউ ও মালতীর চেষ্টাতেই গৌরমোহন ঘরে আসিয়া দেওয়ালে হেলান দিয়া বসিয়া পড়িলেন।

মালতী অকস্মাৎ দারুণ চিন্তায় চমকাইয়া শিহরিয়া উঠিয়া গৌরমোহনের প্রায় কোলের কাছে আসিয়া বলিল, বাবা, আমার চুড়ি এনেছেন তো?

গৌরমোহন যেন কান্না চাপিয়া এক হাতে মুখ ঢাকিয়া আর এক হাতে তাঁহার একটি প্রায়-অর্ধেক কাটা নীচের পকেট দেখাইয়া দিলেন এবং ধপাস করিয়া মাটিতে মুখ খুঁজিয়া পড়িলেন।

অ্যাঁ, পকেট কেটে নিয়েছে? বলিয়া ড়ুকরাইয়া উঠিয়া মালতীও আছড়াইয়া পড়িল মেঝের উপর এবং বালিকার মতোই কাঁদিতে লাগিল, আমার চুড়ি নেই, আমার চুড়ি নেই। বাবা দিতে চায়নি, মুখ ফুটে চেয়ে এনেছি গো!…

বড়বউ শ্বশুর ও ছোটজা উভয়কে লইয়া পড়িল ও নানান সান্ত্বনার কথায় চেষ্টা করিতে লাগিল প্রবোধ দিতে। তাহার ছেলেটি বার বার মায়ের থুতনি ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, মা, মালতি কাঁদে কেন?

কান্নার মধ্যেই মালতী জিজ্ঞাসা করিল, বাবা, নতুন প্যাটার্ন গড়া হয়ে গেছল?

গৌরমোহন গোঁজা মাথা নাড়িয়া জানাইলেন, হাঁ।

মালতীর কান্না আরও উদ্বেল হইয়া উঠিল, দেখতেও পেলুম না, দেখতেও পেলুম না।..

এমনি অনেকক্ষণ কাঁদিয়া আলুথালু বেশে উঠিয়া মালতী দরজার কাছে দাঁড়াইয়া আপনমনেই ভাঙা গলায় বলিল, বলরাম সা-র দেনাটাও যদি শোধ হত।

বলিতে বলিতে তার ঠোঁট কাঁপিয়া উঠিল থরথর করিয়া এবং কান্নার অশান্ত বেগ লইয়া সে বাহির হইয়া গেল।

কী বললে, বলিয়া হঠাৎ চমকাইয়া গৌরমোহন অপলক চোখে দরজার দিকে চাহিলেন। কিন্তু মালতী তখন চলিয়া গিয়াছে।

রাত্রে আর কারওর খাওয়া হইল না। বড়বউয়ের অনুনয়েও গৌরমোহন কিছু খাইলেন না। সুনয়নী খাইলেন না ওষুধ। তখন বড়বউ শ্বশুরকে শুইতে অনুরোধ করিয়া মালতীকে লইয়া তাহাদের শোয়ার ঘরে দরজা বন্ধ করিয়া দিল।

ছোটছেলেটি তখনও বাড়ি ফিরিয়া আসে নাই।

গৌরমোহনের চোখ হঠাৎ সুনয়নীর দিকে পড়িতেই তিনি চমকাইয়া উঠিলেন। তাঁর প্রতি অপলক স্থিরনিবদ্ধ সেই চোখে কী দারুণ ভর্তসনা ও তীব্র অভিযোগপূর্ণ বেদনা। মনে হইল, তাঁহার বুকের চামড়া ছিড়িয়া কেহ সমস্ত হৃদয়টাকে খুলিয়া ধরিয়াছে এবং সেই খোলা হৃদয় ঢাকিতে তিনি যেন কোন অগ্নিগর্ভে তলাইয়া যাইতেছেন।

এক মুহূর্ত থমকাইয়া তিনি হঠাৎ সুনয়নীর রুগ্ন-গন্ধ বিছানাটার ধারে গিয়া, দুই হাতে তাঁর বাতপঙ্গু হাত দুইখানি নিজের হাতে লইয়া সিক্ত গলায় ফিসফিস করিয়া কহিলেন, নয়ন, নিজের পকেট কেটে আমি দেনা শোধ করেছি; বউমার কান্নায় এ বুকের কিছু নেই, কিন্তু তুমি যদি অমন করে চাও..

বাকশক্তিহীনা সুনয়নী কোনও রকমে হাত দিয়া গৌরমোহনের মুখখানি তাঁহার মরিয়াও-না-মরা বুকে টানিয়া লইলেন এবং রোগবশত মাথার উপর হাত দুটি কাঁপতে লাগিল। জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল তাঁর স্থির অপলক সাপের মতো চোখজোড়া হইতে। কিছু বলিতে চাহিলেন, পারিলেন না। কেবল ঠোঁট দুইটি নড়িতে লাগিল।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *