চোখ

চোখ

হিজিবিজি আবোল তাবোল নয়।

ওপরে যা দেখা যাচ্ছে ওই আঁকড়ি বিকড়ি ধাঁধাটিই কষ্ট করে খাড়া করেছিলাম সকলে মিলে মাথা খাটিয়ে।

খামের ভিতর ভরতে ভরতে ভেবেছিলাম আচমকা এই বিদঘুটে প্যাঁচেই ঘনাদাকে কাবু করা যাবে।

কিন্তু আমাদের এমন সাজানো ফন্দিটা ঘনাদা এক মোক্ষম চালে ভেস্তে দেবেন ভাবতে পারিনি।

শিবু ভগ্নদূতের মতো এসে সেই চাঞ্চল্যকর সংবাদটি দিলে। না, পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রথমটা আমরা সবাই সামান্য একটু বিমূঢ় হলেও উদাসীন! কী পাওয়া যাচ্ছে না? জিজ্ঞাসা করলে শিশির।

পাওয়া যাচ্ছে না কাকে? ঘনাদাকে? গৌরের প্রশ্নে একটু কৌতুকের আভাস।

না, ঘনাদা বহাল তবিয়তেই আছেন তাঁর টঙের ঘরে, কিন্তু শিবু একটু থেমে, আমাদের বেশ কয়েক মুহূর্ত উদ্বিগ্ন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলিয়ে রেখে তারপর বললে, পাওয়া যাচ্ছে না তাঁর চশমা!

অ্যাঁ! আমাদের সবাইকার কণ্ঠেই এক আর্তনাদ।

চশমা পাওয়া যাচ্ছে না কী রকম! আমি সন্দিগ্ধ বিস্ময়ে বললাম তারপর, চিঠিটা দিয়ে আসবার সময়ই তো চোখে চশমা দেখলাম।

চোখে তো চশমা দেখেছ, কিন্তু চোখে চশমা দিয়ে করছিলেন কী! গৌরের জেরা—তোমার দেওয়া চিঠিটা পড়েছেন তোমার সামনে?

না। আমায় স্বীকার করতে হল চিন্তিত ভাবে, তখন শনিবারের বাজারের ফর্দটা দেখছিলেন। আমায় চি

খে দিয়ে যেতে বললেন। তারপর থেকেই চশমা উধাও! শিবু করুণ স্বরে জানাল, আমি সেই অবিশ্বাস্য কাহিনীই শুনে আসছি।

কিন্তু চশমা যাবে কোথায়? আমি উত্তেজিত হয়ে উঠলাম, ঘনাদা তো ঘর থেকে বাইরে আসেননি। চশমা ঘরেই আছে নিশ্চয়। ঘনাদা খুঁজেছেন?

তন্ন তন্ন করে। শিবু মুখের একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে জানাল, অন্তত ঘনাদার উক্তি তা-ই।

বেশ, আমরা গিয়ে খুঁজছি চলল। গৌর উৎসাহভরে উঠে দাঁড়াল।

তিষ্ঠ বন্ধু। শিবু বাধা দিলে, কোনও লাভ নেই। আমি কি ঘনাদাকে ওইটুকু সাহায্যও করতে চাইনি মনে করেছ! কিন্তু ঘনাদা তাতে নারাজ। যা গেছে তার জন্যে ঘরদোর তছনছ করা উনি পছন্দ করেন না।

পছন্দ করেন না! শিশিরের মুখে অবিশ্বাসের বিস্ময়, ওঁর ঘরে আছে কী যে তছনছ হবে! দুটো তোবড়ানো চটাওঠা টিনের তোরঙ্গ, একটা আলনা আর শেলফের তাকে টিকে তামাক ছাড়া ক-টা আমাদেরই দেওয়া টুকিটাকি! এ-ছাড়া তো শুধু তক্তপোশের বিছানা, কটা টুল আর গড়গড়াটা। তছনছ হবেটা কী?

জানি না! শিবু দীর্ঘনিশ্বাস ফেললে, কিন্তু খুঁজে দেখবার নাম করতেই প্রায় খাপ্পা হয়ে উঠলেন। বললেন, খুঁজবেটা কী? আমার চশমা আমি নিজে খুঁজতে কিছু বাকি রেখেছি! কী ও পাবার নয়।

তার মানে ও-চশমা এখন আর ঘনাদা খুঁজে পাবেন না! গৌর হতাশ স্বরে বললে, চশমা না পেলে আর ও-চিঠি পড়া হবে না। আর যদি চিঠি না পড়া হয় তা হলে…

তা হলে এত তোড়জোড় ফন্দিফিকির খাটুনি হয়রানি সবই মাটি! শিশির গৌরের অসমাপ্ত আক্ষেপটা পূরণ করে দিলে।

কিন্তু চশমা হারালে খুঁজে না হয় না-ই পাওয়া গেল, নতুন চশমা কি আর হতে পারে না? অন্ধকারে আমি একটু আশার আলো দেখাবার চেষ্টা করলাম।

হ্যাঁ, আমরা নতুন চশমা কিনে দেব ঘনাদাকে! শিশির উৎসাহ প্রকাশ করলে আমার প্রস্তাবে।

আজই নিয়ে যাচ্ছি চশমার দোকানে! গৌরের মধ্যেও উৎসাহটা সংক্রামিত। তাতেও ভরসা কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না। শিবুই মাথা নাড়লে, চশমা যাঁর এমন সময় বুঝে হারায় তাঁকে নতুন চশমা গছানো কি যাবে?

তবু হাল ছাড়ব কেন! গৌর হার মানতে প্রস্তুত নয় দেখা গেল। শিশির ও আমি তারই দলে।

কিন্তু যাবার ছুতো তো একটা চাই। শিবু আবার বাগড়া দিলে, গিয়েই চশমার কথা তুললে পত্রপাঠ বিদায়।

তা হলে…তা হলে…ওই শনিবারের বাজারের ফর্দ! গৌরই সমস্যাটার সমাধান করে ফেললে, আমরা যেন ফর্দটা সংশোধন করাতেই যাচ্ছি।

ঘনাদার তেতলার ঘরে এ-বিবরণটা টেনে তোলবার আগে ঘনাদার চশমা হারানোতে কেন আমরা এতখানি বিচলিত একটু বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

এবারে ঘনাদাকে তাতাবার যে-ফন্দিটি সবাই মিলে বার করেছিলাম তা প্রায় নিখুঁত। সেই ফন্দিরই প্রথম ধাপ স্বরূপ একটি চিঠি সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই ঘনাদার টঙের ঘর থেকে গড়গড়ার আওয়াজ পাওয়া মাত্রই দিয়ে এসেছি।

চিঠিটি তৈরি করতে বেশ কিছু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

খামে বন্ধ চিঠি। ওপরে ইংরেজিতে পরিষ্কার ভাবে টাইপ করা নাম-ঠিকানা—মি. ঘনশ্যাম দাস, ৭২ নং বনমালি নস্কর লেন, কলিকাতা। কিন্তু খামটা ছিঁড়ে ভেতরের চিঠিটা বার করে খুললেই চক্ষুস্থির যাতে হয় তারই ব্যবস্থা। চিঠিটার নমুনা একেবারে প্রথমেই দেওয়া আছে।

এ চিঠির মশলা সংগ্রহ করতে গৌর আর আমাকে তিন দিন ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে ঘণ্টা তিনেক করে ভারী ভারী সব কেতাব ঘাঁটতেও হয়েছে। তারপর রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর আমার ঘরের দরজা বন্ধ করে শিবু ও শিশিরকে নিয়ে চারজনে মিলে চাইনিজ ইঙ্ক দিয়ে বাজার চষে কিনে আনা পাতলা লম্বা পার্চমেন্ট কাগজে মুনশিয়ানা করেছি। মুনশিয়ানা অদ্ভুত আজগুবি সব হরফ নিয়ে। কিছু হরফ প্রাচীন মিশরীয় লিপি থেকে নেওয়া, কিছু প্রাচীন হাবসি, কিছু আমাদের ভারতবর্ষেরই ব্রাহ্মী ও খবরাষ্ঠি থেকে। এরই মধ্যে অন্য অজানা হরফও বাদ যায়নি। এই হরেক রকম অক্ষর এলোপাথাড়ি মিলিয়ে যে-খিচুড়িটি তারপর কাগজে তোলা হয়েছে তা যে-কোনও প্রাচীন লিপিবিশারদ পণ্ডিতচূড়ামণির মাথা ঘুরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।

চিঠিটা ডাকে নয়, যেন হাতেই কেউ দিয়ে গেছে বিকেলে জবাব নিয়ে যাবার জন্য। ঘনাদাকে সরলভাবে কিছুই যেন না জেনে চিঠিটা দিয়ে এসেছি ওই কথা বলে।

তারপর ঘনাদা কখন কৌতূহলভরে চিঠিটা খোলেন তারই অপেক্ষায় তাঁর ওপর নজর রাখা চলছে। আধঘণ্টা অন্তর অন্তর কেউ না কেউ কোনও-না-কোনও ছুতোয়

একবার ওপরে গিয়ে নাটকটা শুরু হল কি না দেখে আসছে।

প্রথমে গেছে গৌর যেন গতকালের খবরের কাগজটা ঘনাদার ঘরেই আছে কিনা খোঁজ করতে। একটা কর্মখালির বিজ্ঞাপন নাকি তার না দেখলেই নয়।

তখনও পর্যন্ত যাকে বলে অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। সব ঠাণ্ডা চুপচাপ। ঘনাদা কলকেতে টিকে সাজাচ্ছেন তন্ময় হয়ে।

গৌরকে দেখে একটু ভুরু কুঁচকেছেন অবশ্য। এমন অসময়ে গৌরের আবির্ভাবটা তো ঠিক স্বাভাবিক নয়।

গৌরকে তাড়াতাড়ি তাই কৈফিয়তটা দাখিল করতে হয়েছে, কালকের কাগজটা আপনার ঘরে নাকি? কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।

আমার ঘরটা কি লস্ট প্রপার্টি স্টোর? কোথাও যা খুঁজে পাওয়া যায় না এখানেই পাওয়া যাবে? ঘনাদা একটু যেন বাঁকা মন্তব্য করেছেন। কিন্তু সেটা এমন কিছু গ্রাহ্য করবার মতো মনে হয়নি গৌরের।

না, না, একটা বিজ্ঞাপন দেখবার ছিল কর্মখালির। বলে অজুহাত দেখিয়ে একটু যেন লজ্জিত হয়ে চলে এসেছে গৌর।

তারপর গেছে শিশির ঘণ্টাখানেক বাদে। তাকে অবশ্য একটু ঘুস নিয়েই যেতে হয়েছে। একেবারে নতুন একটা সিগারেটের টিন। দুষ্প্রাপ্য বিদেশি ব্র্যান্ড।

এই ব্র্যান্ডটা হঠাৎ পেয়ে গেলাম ঘনাদা! শিশির যেন খুশিতে ডগমগ হয়ে বলেছে, প্রসাদ না করে তো খেতে পারি না। আপনার সামনেই তাই খুলতে নিয়ে এলাম।

ঘনাদার মুখের উজ্জ্বলতাটা আশানুরূপ দেখা যায়নি। কয়েক ওয়াট যেন কম। সেটা অবশ্য এমন কিছু ধর্তব্য নয়।

শিশির ঢাকনির পাক দিয়ে এয়ারটাইট টিনের পর্দাটা কাটতে কাটতে আড়চোখে ঘনাদার দিকে লক্ষ রেখেছে। না, ভাবান্তর বিশেষ নেই। চিঠির প্রতিক্রিয়া কিছু বোঝা যায়নি। এখনও সেটা খামেই বন্দী আছে বোধহয়। সিগারেট একটা মুখে ও বাকি কয়েকটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে, দেবার মতো কোনও সংবাদ না নিয়েই শিশিরকে ফিরতে হয়েছে।

আমরা তখনও উতলা কিন্তু হইনি। মেওয়া ফলাতে গেলে সবুর করতে হয় এ আর কে না জানে! একটু শুধু ধৈর্য চাই।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে যে যার কাজকর্মে বেরিয়েছি। ফিরে এসে আমাদের আড্ডাঘরে জমায়েত হয়েছি এই বিকেলে। এইবার একটা কিছু যে হবে এ-বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নেই তখন। ঘনাদার ঘরে যা ছেড়ে দিয়ে আসা হয়েছে তা একেবারে ব্রহ্মাস্ত্র। ও আর বিফল হবার নয়। বাদলার দিন, তাই সলতেটা ধরতে একটু বোধহয় দেরি হচ্ছে। কিন্তু একবার ধরলে আর দেখতে হবে না। এক সঙ্গে তুবড়ি পটকা ফাটবে।

সলতেটা ধরতে দেরি হওয়ার কারণটা মনে মনে এঁচে নিয়েছি। ঘনাদার তিন কুলে কোথাও কেউ আছে বলে তো এত দিন জানতে পারিনি। সত্যিকার চিঠিপত্র তাঁর নামে আর আসে কবে? দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর মৌজ করে গড়গড়ায় টান দিতে দিতে রসিয়ে রসিয়ে পড়বার জন্যই বোধহয় চিঠিটা তিনি মজুদ রেখেছেন ধরে নিয়েছি।

বিকেলে এসে জমায়েত হবার পরই তাই শিবু গেছে সরেজমিনে তদারক করে একেবারে হালের অবস্থা জেনে আসতে, যাতে আমরা গিয়ে নাটকটা জমিয়ে তুলতে পারি।

কে কোন ভূমিকা নেবে তা-ও ঠিক করা হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে নিজের নিজের সংলাপ।

যেমন শিশির গিয়ে বিরক্তির সঙ্গে বলবে, জ্বালাতন করে যত আজেবাজে লোক। নীচে কে একটা চিনেম্যান গোছের চেহারার লোক এসে দাস সাহেবকে চাই বলে ঝামেলা লাগিয়েছিল। দিয়েছি দুর করে তাড়িয়ে!

আমরা তার আগেই জমায়েত হয়ে বসব ঘনাদার তক্তপোশে, মেস সংক্রান্ত একটা গুরুতর বিষয়ে যেন পরামর্শ নেওয়ার জন্যে।

আমি হাঁ হাঁ করে উঠব শিশিরের কথায়, আরে করেছ কী? না জেনে শুনে তাড়িয়ে দিলে কী বলে?

না, তাড়াব না! শিশির আমার উপরই খাপ্পা হবে, ঘনাদা এখানে নিরিবিলিতে অজ্ঞাতবাসে আছেন। যাকে তাকে ওঁর ঠিকানা জানতে দিলে আর রক্ষে আছে। দিনরাত ওঁকে অতিষ্ঠ করে ছাড়বে না? আজ চিনেম্যান, কাল জাপানি, পরশু ভিয়েতনামি, তার পর দিন মাওরি, তারপর পেরুভিয়ান…

শিশির গোটা প্রশান্ত মহাসাগরটাই পার হয়ে যাচ্ছে দেখে তাকে থামিয়ে আমায়। বলতে হবে, আরে থামো, থামো। তোমায় আর ভূগোলের বিদ্যে জাহির করতে হবে না। কিন্তু যাকে তাড়ালে সে যে ঘনাদার জানা লোক। দরকারি কী ব্যাপারে সকালে চিঠি দিয়ে গেছে বিকেলে উত্তর নিতে আসবে বলে। আমিই তো চিঠিটা ঘনাদাকে দিয়ে গেছি সকালে।

তা এত কথা শিশির জানবে কী করে? গৌর এবার শিশিরের পক্ষ নেবে, আমাদের কাউকে কিছু বলেছ তুমি ঘুণাক্ষরে?

এবার আমায় ক্ষুণ্ণ হতে হবে, জানাব আবার কী? শিশিরের অতটা মাতব্বরি করবার তো দরকার ছিল না। লোকটাকে দাঁড় করিয়ে ওপরে এসে খবর নিয়ে গেলেই তো পারত। উনি একেবারে ঘনাদার এতবড় পাহারাদার হয়ে উঠতে গেলেন কেন? এখন কী কেলেঙ্কারি হল দেখো দিকি!

কেলেঙ্কারি বলে কেলেঙ্কারি! শিবু আমার কথাতেই সায় দেবে, জরুরি কোনও চিঠি নিশ্চয়! চিনেম্যানের মতো চেহারা বলছে শিশির। সত্যিই ভিয়েটনাম কি ভিয়েটক-এর কেউ প্রাণের দায়ে ঘনাদার পরামর্শ নিতে এসেছিল কিনা কে জানে!

শিশির এবার কাঁচুমাচু মুখ করে ঘনাদাকে জিজ্ঞাসা করবে, সত্যি জরুরি নাকি, ঘনাদা?

আমরাও উদ্বিগ্ন হয়ে চাইব ঘনাদার দিকে।

কী চিঠি, ঘনাদা! কার চিঠি! কই চিঠিটা গেল কোথায়? ইত্যাদি ব্যাকুল প্রশ্ন বর্ষিত হবে ঘনাদার উদ্দেশে।

ঘনাদা সে সব প্রশ্নবাণ কী অস্ত্রে কাটাবেন, চিঠিটা বেমালুম উড়িয়ে দেবেন না তার সৃষ্টিছাড়া ব্যাখ্যা খাড়া করবেন তা-ই দেখবার জন্যই এত কাঠখড় পোড়ানো।

আর ঘনাদা কিনা এক চশমা হারাবার প্যাঁচেই আমাদের সব চাল ভণ্ডুল করে দিচ্ছেন।

না, সেটি হতে দেওয়া চলবে না। গাঁটের পয়সা গচ্চা দিয়ে ঘনাদার চশমা কিনে দিতে হয় যদি তাতেও রাজি, কিন্তু ঘনাদাকে ওই প্যাঁচে বাজিমাত করতে দেওয়া হবে না।

সিড়ি থেকেই ঝগড়াটা তুমুল করে নিয়ে ছাদে উঠলাম।

লাঠালাঠিটা শিশির আর গৌরের মধ্যে জমে ভাল। তারা দুজনেই তাই এবারের মহড়া নিয়েছে।

কেন! এ শনিবার নয় কেন! সিঁড়ি থেকেই ঘনাদার কানে পৌঁছোবার মতো গৌরের চড়া গলা শোনা গেল, তোমার ইস্টবেঙ্গল লিগ পায়নি বলে আমাদের সবাইকে কি হবিষ্যি করতে হবে।

হবিষ্যি করবে কেন! শিশিরও হেঁড়ে গলা ছাড়ল, না-খেলা পয়েন্ট নিয়ে লিগ পেয়ে মোচ্ছব করো। কিন্তু এ-শনিবারে আর ওই পায়রার মাংস নয়। বুনো বাপি দত্ত হাঁসে অরুচি ধরিয়েছিল, এবার আকাশে পায়রা উড়তে দেখলেও গা বমি করিয়ে ছাড়বে তোমরা।

গলাবাজিটা ছাদে তুলে একেবারে ঘনাদার ঘরের ভেতর পৌছে দিলে দুজনে।

বলুন তো, ঘনাদা! গৌরই প্রথম ঘনাদাকে সালিসি মানলে, পায়রার মাংস কিছু খারাপ জিনিস! বলে কিনা এ-শনিবারে অন্য কিছু করো। আরে, অন্য কিছু পাচ্ছি। কোথায়? বাজারে তেল নেই, মাছ নেই, দুধ নেই, সন্দেশ পর্যন্ত বাতিল, তা নতুন কিছু জোটাব কোথা থেকে!

যাঁর উদ্দেশে এই অভিনয় সেই ঘনাদা তখন ইহজগতে নেই। মুখে তাঁর শিশিরের সকালে দেওয়া একটি সিগারেট জ্বলছে, মনটা যেন তারই ধোঁয়ার সঙ্গে উর্ধ্ব আকাশে গেছে ছড়িয়ে।

কিন্তু এমন নির্লিপ্ত নির্বিকার তাঁকে থাকতে দিলে তো চলবে না। শিশির শনিবারের বাজারের ফর্দটা তাঁর নাকের সামনে বাড়িয়ে ধরে বললে, তা বলে ভদ্রলোকের-এককথার মতো মেনুর যেন আর নড়চড় নেই। আর শনিবারে যা এবারেও তাই। ফর্দটা একবার দেখুন না।

নাকের কাছে ওরকম একটা লম্বা কাগজ ঝুলিয়ে রাখলে যোগী ঋষিরও ধ্যান ভঙ্গ হয়। ঘনাদাকে তুরীয়লোক থেকে একটু নামতে হল। কাগজটা বাঁ হাতে একটু সরিয়ে উদাসীনভাবে বললেন, ফর্দ আমি দেখেছি।

আপনার দেখা তো! শিশির ঘনাদার কথাটায় কোনও গুরুত্বই না দিয়ে যা একখানি ছাড়ল আমরা তাতে হাসি চাপতে কেশে অস্থির।

বললে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আপনি তো বিবাগী মানুষ। চোখ বুলিয়েই মঞ্জুর করে দিয়েছেন। এখন একবার ভাল করে দেখুন দেখি। এর নাম শনিবারের খ্যাঁট?

আমাদের সংক্রামক কাশির হিড়িকেই বোধহয় ভুরু কুঁচকে ঘনাদাকে ফর্দটা আবার নাকের কাছ থেকে সরিয়ে বলতে হল, ও ফর্দ আমায় দেখানো মিছে।

কেন? কেন? গৌর শিশির এবং আমি একসঙ্গে উৎকণ্ঠিত। কেন আর! শিবুই ঘনাদার হয়ে কৈফিয়ত দিলে, যেন আমাদের ওপর বিরক্ত হয়ে, ঘনাদার চশমা হারিয়ে গেছে।

চশমা হারিয়ে গেছে! আমরা সহানুভূতিতে কাতর হয়ে উঠলাম। কখন, কোথায় হারাল?

হারিয়েছে এই ঘরেই। শিবুই যেন ঘনাদার মুখপাত্র, কিন্তু সে আর পাবার নয়।

বললেই হল পাবার নয়! আমরা বিরক্ত শিবুর ওপর, আমরা এখুনি খুঁজে বার করছি।

উঁহু! শিবুই রুখে দাঁড়াল যেন, খোঁজাখুঁজির ঘনাদা কি কিছু বাকি রেখেছেন। মিছিমিছি ঘরদোর হাঁটকে আর জ্বালিও না!

তা হলে? শিবুর নিষেধ চট করে শিরোধার্য করে নিলাম আমরা, ঘনাদার চশমার ব্যবস্থা তো করতে হয় এখুনি।

আই-ক্লিনিকে চলুন, ঘনাদা! শিশিরের অনুবোধ।

আই-ক্লিনিকে কেন? গৌরের প্রতিবাদ, এখানেই চোখের ডাক্তার ডাকছি।

গৌর বেরিয়ে যায় যেন তখুনি।

দাঁড়াও। ঘনাদাই থামালেন তাকে, চোখের ডাক্তার ডাকিয়ে লাভ নেই।

কেন? আমরা বিমূঢ়, চোখের ডাক্তার একটা চশমার ব্যবস্থা করতে পারবে না আপনার! আপনার তো রিডিং গ্লাস, যাকে বলে পড়ার চশমা দরকার!

না। ঘনাদা গম্ভীরভাবে জানালেন।

তা হলে বাইফোক্যাল? শিবুর জিজ্ঞাসা। না। ঘনাদার সংক্ষিপ্ত জবাব।

তা হলে অ্যাসটিগম্যাটিক লেনস? চক্ষুবিদ্যা সম্বন্ধে চূড়ান্ত জ্ঞান জাহির করলাম।

না। ঘনাদা তা-ও নাকচ করে দিয়ে বললেন, প্রেসবাইওপিয়ার সঙ্গে আমার চোখ ডাইক্রোম্যাটিকা ফোটেরিস নয়, স্কোটেরিস।

অ্যাঁ! ঘনাদার চোখের দিকে তাকিয়ে আমাদের সকলের চোখই তখন ছানাবড়া।

কিন্তু দেখলে অমন ভয়ংকর তত মনে হয় না! শিবু যেন ভয়ে ভয়ে বললে।

একটু শুধু বাঁকাবাঁকা লাগে! শিশির বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করলে।

হ্যাঁ, দেখে অতটা বিদঘুটে বলে বোঝা যায় না, গৌরের যেন ঘনাদাকে সান্ত্বনা।

দেখে তোমরা কী বুঝবে! ঘনাদার গলায় ঝাঁজ, লন্ডন প্যারিস বের্লিন ভিয়েনাই হার মেনেছে নিদান দিতে। শেষে টাইওয়ানের এক হাতুড়ে ডাক্তার চিং সুন রোগ ধরে ওই আজব চশমা নিজেই বানিয়ে দেন।

সেই চশমা আপনি হারালেন! আমাদের সম্মিলিত হাহাকার।

হ্যাঁ, হারিয়েছি। তবে আগেই হারানো উচিত ছিল। ঘনাদা যেন অনুশোচনায় দগ্ধ।

আমরা সবাই এবার হাঁ। তক্তপোশের ওপর ভাল জায়গাটা আগেই দখল করে শিবুই কোনও রকমে ঢোঁক গিলে বলে ফেললে, কেন, চশমাটা অপয়া বুঝি?

অপয়া! ঘনাদাকে যেন অনেকদূর পর্যন্ত অতীত দৃষ্টি চালাতে হল, তা অপয়াও লতে পারো। ও-চশমা আগে হারালে, একশো বছরের ওপর যা লুপ্ত বলেই জানা ছিল, দুনিয়ার সবচেয়ে দামি সেই একটা বিরল প্রাণীর জাতকে প্রথম খুঁজে বার করে তার ধ্বংসের সহায় স্নার মনস্তাপে নিজেকে ধিক্কার দিতে হত না।

তক্তপোশের ওপরেই বসে থাকলেও আমাদের সকলের মাথাই তখন ঘুরতে শুরু করেছে।

দাঁড়ান। দাঁড়ান। শিশির প্রথম নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আবেদন জানালে, ব্যাপারটা একটু গুছিয়ে নিই মাথায়। একশো বছরের ওপর লুপ্ত বলে জানা? তার মানে অন্তত একশো বছর সে প্রাণীর খোঁজ কেউ কোথাও পায়নি?

হ্যাঁ, শেষ সে-প্রাণী দেখা ১৮৩০-এ। ঘনাদা ব্যাখ্যা করলেন, তারপর পৃথিবী থেকে যেন একেবারে লোপাট!

সে-বিরল প্রাণী আবার পৃথিবীর সবচেয়ে দামি! গৌর চক্ষু বিস্ফারিত করে আমাদের মনে করিয়ে দিলে।

দামি কী রকম শুনবে? ঘনাদা অনুকম্পাভরে বোঝালেন, সেই প্রায় দেড়শো বছর আগেই সে প্রাণীর একটি ফ্যর অর্থাৎ লোমওয়ালা চামড়ার দাম ছিল নিদেন পক্ষে আট থেকে ন-হাজার টাকা!

বলেন কী? শিবু হাঁ হয়ে বললে, উত্তর মেরুর রুপোলি খেকশিয়াল কি রাশিয়ার দুধে আরমিন মানে ভাম নাকি।

বোধহয় কারাকুল ভেড়া! গৌর ঘনাদার কাছে শোনা গল্প থেকেই বিদ্যে জাহির করলে।

না, ভ্যল্পেস ইয়াগোপস অর্থাৎ মেরুর শেয়াল কি ম্যসটেলা আরমেনিকা মানে রুশ খটাশ নয়। ওভিস স্টিয়াটোপিনা মানে যাকে কারাকুল ভেড়া বলে তা-ও না। ঘনাদা আমাদের কুপোকাত করে বললেন, এ সব প্রাণী তো লুপ্ত বলে মনে করার কারণ হয়নি কখনও, তা ছাড়া ওদের ফ্যর-এর দামও অত নয়।

তা হলে প্রাণীটা কী? ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করতে হল এবার।

ল্যাট্যাক্স লট্রিস! ঘনাদা মোলায়েম গলায় বললেন, মানে সমদ্রের ভোঁদড!

সমুদ্রের ভোঁদড়! কয়েকটা ঢোঁক গিলে জিজ্ঞেস করতে হল, তার অত দাম? এ-ভোঁদড় আবার লুপ্তও হয়ে গিয়েছিল?

হ্যাঁ। ঘনাদা আমাদের দিকে করুণাভরে চেয়ে বললেন, সমুদ্রের এই ভোঁদড়ের লোমওয়ালা চামড়ার লোভে মানুষ নির্মম পিশাচের মতো তা শিকার করেছে একদিন। হাজার হাজার পেন্ট মানে ওই নোমওয়ালা চামড়া শুধু চিনদেশেই চালান গেছে সেখানকার মান্দারিনদের জন্য। রাশিয়া সেদিন আলাস্কা আর ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরে যে উপনিবেশ বসিয়েছে এই সামুদ্রিক ভোঁদড়ের প্রলোভনই তার জন্য অনেকটা দায়ী। স্পেনের নাবিকরাও ওই অঞ্চলটা চষে বেড়িয়েছে তাদের পালতোলা সুলুপে এই ভোঁদড়ের খোঁজে। এ-ভোঁদড়ের পেল্ট-এর মতো এমন উজ্জ্বল ঘন আর টেকসই এ-জাতের জিনিস আর হয় না। তার সবচেয়ে কদর ছিল চিন সাম্রাজ্যের মান্দারিনদের কাছে। মানুষ তাই এমন লুব্ধ নৃশংসভাবে এ-প্রাণীটি শিকার করেছে যে তার অস্তিত্বই মুছে গেছে পৃথিবী থেকে। অন্তত ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের পর এ-প্রাণীর সন্ধান আর কেউ পায়নি।

এই ভোঁদড় আপনি খুঁজে বার করেছেন আবার?

খুঁজে বার করেছেন বলে আপনার আফশোস?

তখন চশমা হারালে এ-ভোঁদড় আর খুঁজে পেতেন না?

আমাদের প্রশ্নবাণ শেষ হবার পর ঘনাদার কিন্তু আর সাড়াশব্দ নেই। হাতের সিগারেটের শেষটুকু দরজা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার যেন তিনি উদাস হয়ে গেলেন কোনও শূন্যতার ধ্যানে।

গলতিটা ধরে ফেলে শিশিরই তা শোধরালে চটপট।

সকালের খোলা টিনটা পুরোই ঘনাদার সামনে ধরে দিয়ে বললে, আর একটা খেয়ে দেখবেন নাকি?

বলছ? ঘনাদা অতিকষ্টে যেন নিজেকে মর্ত্যভূমিতে নামালেন।

শিশির ততক্ষণে একটা সিগারেট তাঁর আঙুলে ধরিয়ে দিয়ে লাইটারও বার করে ফেলেছে। ঘনাদার সিগারেট ধরানো পর্ব শেষ হবার পরও খানিক অপেক্ষা করতে হল আমাদের। পর পর তিনটি সুখটান দিয়ে আমাদের দিকে একটু যেন প্রসন্নভাবে চেয়ে তিনি বললেন, হ্যাঁ, কী যেন বলছিলাম! ও, ডক্টর চিং সুনের কথা।

না, বলছিলেন ওই চশমা আর ভোঁদড়ের কথা। আমাদের সবিনয়ে একটু শোধরাবার চেষ্টা করতে হল।

ও সবই এক। চিং সুন আর চশমা আর ভোঁদড় সব একসঙ্গে জড়ানো। ঘনাদা শিশিরের রাখা সিগারেটের টিনটা একেবারে কোলের কাছে টেনে নিয়ে শুরু করলেন, এখন টাইওয়ান বলেই সকলে যা জানে, তখন আমাদের মতো বাইরের লোকের কাছে তার নাম ছিল ফরমোজা দ্বীপ। ফরমোজা তখন জাপানের দখলে। তারা দ্বীপটির চিনে নাম টাইওয়ান সরকারিভাবে নিলেও চালু করতে পারেনি। এই ফরমোজা দ্বীপের এখনকার টাইপে, তখনকার টাইহোকু, শহরেই চিং সুনের সঙ্গে তামার আলাপ। চিনের লিপির কিছু অতি প্রাচীন নিদর্শন পেয়ে ওই টাইহোকুতেই তখন ও-হরফের আদি উৎপত্তি নিয়ে কাজ করবার চেষ্টা করছি।

ঘনাদা একটু থেমে চকিতে আমাদের ওপর যে-রকমভাবে চোখ বুলিয়ে নিলেন, তাতে কেমন একটা অস্বস্তিতেই বোধ হয় চাপা হাসিটা খুকখুকে কাশি হয়ে আর বেরুতে পারল না। ঘনাদা আবার ধরলেন, ওসব নিদর্শন হাড়ের ওপর খোদাই করা এক অতি প্রাচীন অজানা লিপি। ১৯০৩ সালে চিনের উত্তরের এক জায়গা খুঁড়ে ওই সব খোদাই করা হাড়ের টুকরো কিছু পাওয়া যায়। তাতে প্রায় দু হাজার পাঁচশো রকমের হরফ দেখা গেছল। কিন্তু পণ্ডিতেরা ছশোর বেশি অক্ষর তখনও চিনে উঠতে পারেননি। এইটুকু শুধু জানা গেছে যে খ্রিস্টপূর্ব ১৭৬৬ থেকে ১১২২ পর্যন্ত চিনের শাং বা য়িন বংশের রাজত্বকালেই সেগুলো খোদাই হয়। হাড়ের লেখাগুলো সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তখনকার গণকদের মাথা-গুলোনো জবাব বলেই একদল পণ্ডিতের ধারণা। এই অদ্ভুত হরফগুলো নিয়ে মতভেদ থাকলেও সেগুলো চিনের যে চুয়ান লিপি পরে প্রবর্তিত হয় তার চেয়ে পুরোনো বলেই সকলে তখন মেনে নিয়েছেন।

লি পপা বলে আমার এক পণ্ডিত বন্ধুর বাড়িতে তখন আমি থাকি। বাড়িটা টাইপে শহরের এক প্রান্তে কিলাং নদীর ধারে। বাড়ির বাগানটা কিলাং নদীর পাড় পর্যন্ত নেমে গেছে। সেদিন সকালে সেই বাগানে একটা ক্যামফর লরেল মানে কপূর গাছের তলায় বসে একটা আতস কাঁচ নিয়ে ওই খোদাই করা হাড় পরীক্ষা করছি, এমন সময় ফোন্ডিং টেবিলটার ওপর একটা ছায়া পড়তে দেখে একটু অবাক হলাম। ফিরে তাকিয়ে প্রথম যেন পাথুরে প্রকাণ্ড একটা টিবিই দেখলাম মনে হল। তারপর বুঝলাম পাথুরে ঢিবি নয়, মানুষ।

আমায় পিছু ফিরতে দেখে মানুষটা একটু হেসে সামনে এগিয়ে এসে চিনে ধরনে কুর্নিশ করেও পরিষ্কার ইংরেজিতে বললে, মাপ করবেন মি. দাস। একটু বেয়াদবি করেই আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম।

আমি তখন লোকটার দিকে বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। এক উত্তর অঞ্চলের বাসিন্দা ছাড়া সাধারণত চিনেরা খুব লম্বা চওড়া হয় না। উত্তরের মাঞ্চুরিয়ার লোকদের হিসাবেও এ-মানুষটা কিন্তু অদ্ভুত ব্যতিক্রম। চিনে রং চেহারা নিয়ে এ যেন এক কাঠি দৈত্যবিশেষ।

তার চেহারাটা আমি লক্ষ করছি বুঝে লোকটি আবার হেসে বললে, আমার চেহারাটা দেখে ভুল বিচার করবেন না। প্রকৃতির খেয়ালে আমার এই চেহারাটাই আমার অভিশাপ দেখতে গুণ্ডা বদমাশ হলেও আমি নেহাত সামান্য চোখের ডাক্তার। তবে নিজের বেয়াড়া খেয়ালে পল্লবগ্রাহীর মতো বিজ্ঞানের এটা-সেটা নিয়ে একটু-আধটু চৰ্চা করি। নাম আমার চিং সুন।

ডক্টর চিং সুন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলছিলেন। তাঁকে বসতে দেবার মতো অন্য আসন সেখানে নেই। থাকলেও বিশেষ চেয়ার ছাড়া তাঁর ভার সইতে পারত কিনা সন্দেহ। ডক্টর চিং সুনের পরিচয় পেয়ে এবার আমিও দাঁড়িয়ে উঠে ভদ্রতা করে বললাম, আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুশি হলাম। কিন্তু আমার এ-সৌভাগ্যের কারণটা জানতে পারি?

নিশ্চয়! নিশ্চয়! চিং সুন তাঁর ঢোলা জোব্বা ধরনের চিনে জামার ভেতর থেকে একটা জুতোর বাকস গোছের জিনিস আমার টেবিলের ওপর রেখে বললেন, আপনি চিনেয় আদি লিপি নিয়ে খোঁজখবর করছেন শুনে তখনকার ক-টা খোদাই করা হাড় আপনাকে দেখাতে নিয়ে এলাম। এগুলো আমাদের পরিবারেরই জিনিস। আমি পেপিং থেকে টাইওয়ানে চলে আসবার সময় এরকম কিছু পুরোনো জিনিস সঙ্গে নিয়ে আসি।

চিং সুন এবার পিচবোর্ডের বাকসটা খুলে যা বার করলেন তা আমি যা নিয়ে কাজ করছি সেই পুরোনো খোদাই করা ক-টা হাড়।

আগ্রহভরে হাড়গুলো একটু ওপর ওপর পরীক্ষা করে বললাম, এগুলো আশা করি আপনি দু-একদিনের জন্য রেখে যেতে পারবেন?

তা না হলে এনেছি কেন? চিং সুন সবিনয়ে বললেন, আমি দিন পাঁচেক বাদে এগুলোতে কী পেলেন জানতে আসব। ওই হাড়গুলোর তলায় একটা ব্ৰঞ্জের পাতও পাবেন। সেটা হাড়গুলোর চেয়েও প্রাচীন বলে জানি। তার হরফগুলো যদি পড়ে দিতে পারেন তাহলে চিরকাল আপনার কেনা হয়ে থাকব। না, শুধু তাই কেন, আপনার চোখের দোষ সারিয়ে দেব কৃতজ্ঞতায়।

এবার একটু না হেসে পারলাম না। বললাম, আমার চোখের দোষ সারাবেন? শুধু লন্ডন বেৰ্লিন নয়, ভিয়েনা পর্যন্ত হার মেনেছে, জানেন কি?

জানলাম। চিং সুনও হেসে বললেন, তবু ওস্তাদরা যেখানে হার মানে সেখানে হাতুড়েও কখনও কখনও বাজিমাত তো করে! আমায় সেইরকম হাতুড়ে মনে করুন না!

তা-ই করব।আমায় হাসি চেপেই বলতে হল, কিন্তু আমার চোখের দোষ আছে। বুঝলেন কী করে? এই আতস কাঁচ ব্যবহার করছি দেখে?

না, চোখের দিকে চেয়েই বোঝবার ক্ষমতা আমার আছে। আচ্ছা, আজকের মতো চলি। বলে ডক্টর চিং সুন চলে গেলেন।

আবার এলেন ঠিক পাঁচ দিন বাদেই অমনই সকালবেলা।

আমি ইতিমধ্যে বন্ধু লি পোর কাছে চিং সুন সম্বন্ধে যা জানবার জেনেছি। মানুষটা সত্যিই নাকি বেশ অদ্ভুত অসাধারণ। উত্তর চিনের বেশ বড় বংশের ছেলে। পুরুষানুক্রমে চিন সাম্রাজ্যে তাঁদের বংশের লোকেরা মান্দারিন অর্থাৎ রাজদরবারের বড় বড় কর্মচারীর কাজ করেছেন। চিনে কুয়োমিনটাং-এর আধিপত্যের পরই চিং সুন দেশ থেকে পালিয়ে জাপানের অধীন এই টাইওয়ানে আশ্রয় নেন। চোখের ডাক্তার হিসেবে তাঁর নাম আছে, কিন্তু চোখের ডাক্তারির বাইরে আরও অনেক কিছু তিনি করেন যা নাকি বেশ রহস্যময়। চিং সুনের ডাক্তারি ছাড়া আরও অনেক বিদ্যায় দখল আছে। যৌবনে ইউরোপে তিনি অনেক কাল নানা জায়গায় এই বিদ্যাচর্চায় কাটিয়েছেন। ধরন-ধারণ চালচলন একটু সন্দেহজনক হলেও চিং সুনের নানা বিষয়ে পাণ্ডিত্যের খ্যাতি টাইওয়ানের বাইরেও পৌঁছেছে। তাঁর সম্বন্ধে আরও কয়েকটা মজার গল্পও টাইওয়ানের অনেকে জানে।

পাণ্ডিত্য যে তাঁর আছে চিং সুনের রেখে যাওয়া খোদাই-করা হাড়গুলো আর ব্রোঞ্জের পাতটা দেখেই বুঝেছিলাম।

দেখা করতে আসার পর চি সুনকে সেই কথাই বললাম।

সেদিন সকালেও ওই বাইরের বাগানেই টেবিল পেতে বসে ছিলাম। বন্ধু লি পোকে রেখেছিলাম সঙ্গে। চিং সুনের বসবার উপযুক্ত একটা বাড়তি মজবুত আসন শুধু পাতিয়ে রেখেছিলাম আগে থাকতে।

চিং সুন এসে যথারীতি চিনে কায়দায় অভিবাদন জানিয়ে সে-আসনে বসবার আগেই জিজ্ঞাসা করলেন, কী বুঝলেন আমার জিনিসগুলো দেখে, মি. দাস!

কাগজের বাকস থেকে বার করে হাড়গুলো আর ব্রোঞ্জের পাতটা সামনের টেবিলের ওপরই সাজিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। চিং সুন বসবার পর তারই একটা খোদাই করা হাড় তুলে নিয়ে গম্ভীর মুখে বললাম, বুঝলাম, আপনি সত্যি পণ্ডিত লোক।

তার মানে? বড় চালকুমড়োর মতো চিং সুনের গোল ভাবলেশহীন মুখেও যেন একটু বিদ্রুপের ঝিলিক খেলে গেল, প্রায় চার হাজার বছর আগেকার খোদাই করা হাড় আর ব্রোঞ্জের পাতে আমার পাণ্ডিত্যের কী প্রমাণ পেলেন! আমি ওগুলো তো

সংগ্রহ করেছি মাত্র।

না, ডক্টর চিং সুন, তাঁর হাঁড়ি-মুখের দিকে সোজা তাকিয়ে বললাম, ওগুলো আপনি জাল করেছেন। তবে সত্যিকার পাণ্ডিত্য না থাকলে যার-তার পক্ষে এরকম জাল করা সম্ভব নয়।

আমি জাল করেছি ওগুলো! চিং সুন যেন এখুনি ফেটে পড়বেন মনে হল, আপনাকে আমি…

আহাম্মক গাড়োল ভেবেছিলেন! চিং সুনকে থামিয়ে দিয়ে মাখনের মতো গলায় বললাম, শুনলাম, একবার এক জার্মান না পোলিশ নৃতত্ত্ববিদ এই টাইওয়ানের জংলি আদিবাসী চিন হোয়েনদের সম্বন্ধে গবেষণা করতে এলে তাঁকে বাঁদর নাচ নাচিয়েছিলেন এমনই বোকা বানিয়ে! আমাকেও তাই নাচাতে চেয়েছিলেন। আপনাকে সেই আনন্দটুকু দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। তবে আপনার জ্ঞান-বিদ্যার সত্যিই তারিফ করছি। হাড় খোদাইগুলো জাল করা এমন কিছু অবশ্য শক্ত নয়, কিন্তু ব্রোঞ্জের পাতে যা খোদাই করেছেন তাতে সত্যিই বাহাদুরি আছে! ব্রোঞ্জের পাতে খোদাই করা শব্দ হল তিনটে আর তার অক্ষর হল আঠারোটা। আঠারোটা হরফের তিনটে নিয়েছেন মিশরের প্রাচীন লিপি থেকে, ব্রাহ্মী থেকেও নিয়েছেন তিনটে, খরোষ্ঠী থেকে নিয়েছেন চারটে, প্রাচীন সিন্দজিরলি, ইথিওপিয় আর টেমা থেকে দুটো করে—আর একটা করে ফিনিশীয় আর সেবিয়ান থেকে। আপনার খোদাই করা অক্ষরগুলো এবার পর পর সাজিয়ে দেখা যাক। সব হরফগুলো এক একটা ইংরেজি অক্ষরের প্রতিরূপ। প্রাচীন লিপির প্রতিরূপের বদলে ইংরেজি অক্ষর বসিয়ে সাজালে সবসুদ্ধ লেখাটা দাঁড়ায় GHANASHAM DAS HOAXED. এ-লেখার প্রথম শব্দ ঘনশ্যামের জিটা নিয়েছেন মিশরি থেকে, এটা ব্রাহ্মী, এটা খরোষ্ঠী, এনটা মিশরি, এবার এটা সিন্দজিরলি, এসটা টেমা, এবার এচটা প্রাচীন ইথিওপিয়ান, এটা ব্রাহ্মী, এমটা মিশরি। দ্বিতীয় শব্দ দাস-এর ডিটা টেমা, এটা ফিনিশীয়, এসটা খরোষ্ঠী। তৃতীয় শব্দ হোসড়-এর এটা খরোষ্ঠী, ওটাও তা-ই। এটা প্রাচীন ইথিওপিয়ান, এটা ব্রাহ্মী, ইটা সিন্দজিরলি আর ডিটা সেবিয়ান। তা এত কষ্টই যদি করলেন ঘনশ্যামের ওয়াইটা বাদ দিলেন কেন? এ সব লিপিতে না থাকলেও সিরিলিক-এই ওয়াই পেতেন।

আমার কথা শুনতে শুনতে চিং সুনের মুখখানা আষাঢ়ের মেঘের মতো থমথমে হয়ে এসেছিল। ঝড় উঠে বাজের কড়াকড় শুরু হয় বুঝি। কিন্তু তার বদলে সেই চালকুমড়ো মুখে সে হঠাৎ গলা ছেড়ে হেসে উঠল।

ঘনাদা থেমে এতক্ষণের ছাই-জমা সিগারেটে একটা রামটান দিলেন।

আমরা কিন্তু টাইওয়ানের চিং সুনের মতো গলা ছেড়ে হাসতে পারলাম না। ঘনাদা প্রাচীন লিপির খিচুড়ির ব্যাখ্যান আরম্ভ করার পরই আমরা জিভ কেটে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছি কয়েকবার। এখন কেউ লাল কেউ বেগনি হয়ে সবাই আমরা অধোবদন। আমাদের অত ফন্দি খাটিয়ে লেখা চিঠির জারিজুরি সব অমন করে ভাঙবে যদি জানতাম!

ধরা পড়ার লজ্জাটা আর একটু রগড়ে বুঝিয়ে দিলেন ঘনাদা। রামটানের ধোঁয়ায় ঘরের হাওয়া ঘোলাটে করে বলতে শুরু করলেন, হাসি শেষ করে ডক্টর চিং সুন একেবারে যেন লজ্জায় মরে গিয়ে বললেন, আমার এখন নাক খত দেওয়াই উচিত, মি. দাস!

দোহাই ও-চেষ্টা আর করবেন না, আমার হয়ে বন্ধু লি পো-ই তাঁকে ঠাট্টা করলেন, একে আমাদের খাঁদা চিনে নাক। মাটিতে ঘসলে ওর আর চিহ্ন থাকবে না।

চিং সুন এ-ঠাট্টায় আর একবার দাঁত বার করে হেসে বললেন, তাহলে প্রায়শ্চিত্তটা অন্যভাবেই করি। করি, আপনার চোখের দোষ সারাবার এক জোড়া চশমা বানিয়ে দিয়ে।

সে-চশমায় চোখের দোষ যদি না সারে? চিং সুনের মিথ্যে বড়াই থামাবার জন্যই বললাম।

চিং সুন কিন্তু ভড়কালেন না। একটু যেন ভেবে নিয়ে বললেন, না যদি সারে তাহলে দু-দুটো সাগর-ভোঁদড়ের লোমওয়ালা চামড়া জরিমানা দেব। আপনার বন্ধু লি পো আমার সে-চামড়া দেখেছে। সে-দুটো লি পোর কাছে আজই জামিন রেখে যাচ্ছি।

সাগর-ভোঁদড়ের চামড়া!মুখে কিছু বুঝতে না দিলেও মনে মনে তখন রীতিমতো অবাক হয়েছি। তবু বাইরে তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বললাম, চামড়া আসল না নকল?

আসল কি নকল ও-জিনিসের জহুরি হলেই বুঝবেন। চিং সুন চটপট জবাব দিলেন, আজই তো সে দুটো এনে জামিন রাখছি।

সেদিন বিকেলে সত্যিই চিং সুন যে দুটি সাগর ভোঁদড়ের ফ্যর নিয়ে এলেন তা দেখে চোখের পলক আর যেন পড়তে চায় না। আসল সাগর-ভোঁদড়ের লোমওয়ালা চামড়া—মখমল আর সাটিন তার কাছে কোমলতা আর উজ্জ্বলতায় লজ্জা পায়।

এ ফ্যর আপনি পেলেন কোথায়? না জিজ্ঞেস করে পারলাম না।

এ আমাদের পরিবারেরই পুরোনো সম্পদ। বললেন চিং সুন, চোদ্দ পুরুষ ধরে আমরা চিনের মান্দারিন ছিলাম। মান্দারিনদের নেশা আর বড়াই ছিল এই সাগর-ভোঁদড়ের ফ্যর সংগ্রহ করা। দুনিয়ার সবচেয়ে চড়া দাম তাঁরাই দিতেন এ-জিনিসের। আমাদের পরিবারের এ-জিনিস আরও অনেক ছিল। আমি শুধু দুটি মাত্র নিয়ে আসতে পেরেছি। এখন বলুন এই জামিন যথেষ্ট কি?

হ্যাঁ যথেষ্ট নয়, আশাতীত। এবার হেসে বলতেই হল, কিন্তু নেহাত নিঃস্বার্থভাবে আমার চশমা তৈরির এতখানি ঝুঁকি নিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না!

না, স্বার্থ একটু আছে বই কী! চিং সুন স্বীকার করলেন হেসে, আমার চশমায় যদি আপনার চোখের দোষ সত্যি সারে তাহলে আপনাকেও একটা কথা রাখতে হবে আমার।

কী কথা? সন্দিগ্ধ হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম। এমন কিছু নয়, আমাকে জ্যান্ত সাগর-ভোঁদড় দেখাতে হবে আপনাকে।

জ্যান্ত সাগর-ভোঁদড় দেখাব আমি! চোখ কপালে তুলে বললাম, এরকম আজগুবি আবদারের কোনও মানে হয়? আঠারোশো ত্রিশ সালের পর জ্যান্ত সাগর-ভোঁদড় পৃথিবীর কেউ দেখেনি।

কেউ দেখেনি বলেই তো আপনার কাছে এসেছি! চিং সুন খোলাখুলিভাবে বলে ফেললেন, ধাপ্পা দেবার ছলে আপনার সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ করেছি কি মিছিমিছি? আপনার অনেক খবরই জেনেছি, মি. দাস। আর বছরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান পাবলো উপসাগরে আপনি মাঝারি তিমি শিকারের নামে ছোট একটা সুলুপ নিয়ে কয়েক মাস ঘুরেছেন, অথচ একটাও তিমি ধরেননি। সমুদ্রের ও অঞ্চলে আপনি শখ করে হাওয়া খেতে গেছলেন বলে তো মনে হয় না!

হাওয়া খেতে যাইনি বলেই সাগর-ভোঁদড়ের সন্ধান পেয়েছি এ কথা প্রমাণ হয় কি? বিদ্রুপের সুরেই বললাম, আমি ওখানে রত্নদীপের মূল চেহারা দেখতে গেছলাম।

রত্নদীপের মূল চেহারা। চিং সুন একটু ভ্যাবাচাকা, সে আবার কী? ওখানে রত্নদীপ আবার কোথায়?

সত্যিকারের নয়, কল্পনার রত্নদীপা চিং সুনকে এবার বোঝালাম, আপনি তো ডাক্তারি ছাড়া অনেক কিছু নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন মনে হচ্ছে। আর. এল. স্টিভেনসনের নাম শুনেছেন আশা করি?

হ্যাঁ, শুনেছি। চিং সুন তখনও বেশ ধাঁধার মধ্যে, সেই বিখ্যাত লেখক তো যিনি ট্রেজার আইল্যান্ড লিখেছিলেন?

তাঁর সেই ট্রেজার আইল্যান্ড মানে কল্পনার রত্নদ্বীপের কথাই বলছি। চিং সুনকে গম্ভীর হয়ে বললাম, স্টিভেনসন আঠারোশো ঊনআশি খ্রিস্টাব্দে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে একটি জায়গায় কিছুদিন কাটান। স্পেনের নাবিকরা সে উপকূলের নাম দিয়েছিলেন প্যন্টা দে লস লোবোস ম্যারিনোজ অর্থাৎ সাগর-নেকড়ের স্থল-বিন্দু। ট্রেজার আইল্যান্ডে যে দ্বীপের বর্ণনা তিনি করেছেন, তার আদল ওইখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য থেকেই নেওয়া। আমি সেই জায়গাই দেখতে গেছলাম। কিন্তু সেখানে তো দু-জাতের সিল শুধু পাওয়া যায়, স্প্যানিয়ার্ডরা যার নাম দিয়েছিল সাগরনেকড়ে।

কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, মি. দাস এবার চিং সুন সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার শর্তে চশমা নিতে রাজি কিনা তাই শুধু বলুন? চশমা ঠিক হলে সাগর-ভোঁদড় আমায় দেখাবেন কি না?

চশমা ঠিক না হলে সাগর-ভোঁদড় তো দেখতেই পাব না। এবার হেসে বললাম, আর দেখতে যদি পাই তাহলে আপনাকেই বা সে-দৃশ্যে বঞ্চিত করব কেন? কিন্তু একটা কথা বলে রাখছি। সাগর-ভোঁদড়ের সন্ধান যদি পাই তো শুধু চোখেই দেখবেন, ধরবার নামও করবেন না। এই বিরল প্রাণীর শেষ যে কটি প্রতিনিধি এখনও মানুষের চোখের আড়ালে লুকিয়ে টিকে আছে, তাদের মানুষের লোভর কাছে বলি দেওয়ার পাপের ভাগী আমি হব না কিছুতেই।

আমিই কি তা হতে চাই! চিং সুন প্রায় শিউরে উঠে বললেন, আমার শুধু একবার চোখে দেখার সাধ। ছেলেবেলা থেকে এই প্রাণীটি দেখবার জন্য আমি লালায়িত। আপনার কাছে এবার তাহলে স্বীকার করি সত্য কথাটা। এই সাগর-ভোঁদড় খোঁজবার জন্য আমি নিজে একটা সুলুপ পর্যন্ত কিনে ফেলেছি। সেই সুলুপ নিয়ে গত কয়েক বছর চষে বেড়িয়েছি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আলাস্কা পর্যন্ত ওই উপকূলের সমুদ্র। লাভ কিছু অবশ্য হয়নি, তবে আপনার খোঁজ খবরাখবর ওই সুলুপ নিয়ে ঘোরাঘুরির সময়েই পাই। আপনাকে কথা দিচ্ছি, সাগর-ভোঁদড় যদি দেখান তো ক্যামেরায় ছাড়া আর কিছুতে ধরব না।

চিং সুন যে কত বড় কপট শয়তান তা যখন ধরতে পারলাম তখন আমি নিরুপায়ভাবে তারই হাতের মুঠোয়। তার আগে হাতুড়ে হোক বা না-হোক, তা দেওয়া চশমায় সত্যি আমি টাইওয়ানেই নতুন চোখ পেয়েছি। নিজের কড়ার রাখতে তারই সঙ্গে তারপর এসেছি সানফ্রানসিসকোয়। সেখানে তার সুলুপে উঠে ভোঁদড়ের খোঁজে রওনা হবার সময়েই মনে অবশ্য একটু খটকা লেগেছিল। সুলুপের মাঝি-মাল্লা সব চিনে। চেহারাগুলো কেমন দুশমনের মতো। সে খটকাকে তব আমল দিইনি। মাঝি-মাল্লার চেহারা নিরীহ ভালমানুষের মতো হবে কেন এই কথাই নিজেকে বুঝিয়েছি। চিং সুনও অবশ্য তাঁর অমায়িক ব্যবহারে সব ভুলিয়ে দিয়েছেন। আমি যেন তাঁর গুরুঠাকুর এমনই তদবির করেছেন আমার। ক-দিন উত্তরমুখো পাড়ি দিয়ে তারপর এক জায়গায় এসে সুলুপের নোঙর ফেলতে নির্দেশ দিয়েছি সন্ধ্যাবেলা। সেটা মস্টেরয় উপদ্বীপের কূল। সেখানেই ক-দিন কাছাকাছি সুলুপ নিয়ে ঘোরাঘুরির পর একদিন সকালে সাগর-ভোঁদড়ের দেখা পেলাম। সেদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে চশমাটা প্রথমে খুঁজে পাইনি। সত্যিই চশমাটা তখন হারালে সাগর-ভোঁদড়ও খুঁজে পেতাম না, আর চিরকাল মনের মধ্যে এতবড় একটা আফশোসও পুষে রাখতে হত না।

ঘনাদা যেন সেই পুরোনো আফশোসেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করলেন।

সাগর-ভোঁদড়ের দেখা পেয়েও আফশোস কেন ঘনাদা? আমাদের একটু উসকে দিতে হল, চিং সুন বেইমানি করলে বুঝি?

বেইমানি শুধু নয়, শয়তানি! ঘনাদা সেকথা স্মরণ করেই যেন উত্তেজিত, চশমা খানিক বাদে বাকসের তলাতেই খুঁজে পেলাম। সে-চশমা পরে ডেকে গিয়ে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই আশাতীত দৃশ্য দেখতে পেলাম। গোটা কুড়ি সাগর-ভোঁদড়ের ছোট একটা পাল। তীর থেকে কয়েকশো গজ দূরে সমুদ্রের জলের ওপর একটা ড়ুবো পাহাড় খানিকটা মাথা তুলে জেগে আছে, তার চারধারে কেল্প মানে বাদামি রঙের বড় বড় সামুদ্রিক আগাছার আধডোবা জঙ্গলে ভোঁদড়ের পাল রঙে রং মিলিয়ে প্রায় অদৃশ্য হয়েই চরে বেড়াচ্ছে।

আনন্দে উত্তেজনায় প্রায় চিৎকার করেই ডাকলাম, চিং সুন!

চিং সুন কাছেই ছিলেন। ছুটে এসে অস্থির ভাবে বললেন, কী! কোথায়?

দেখতে পাচ্ছেন না? নিজেকে সামলে শান্ত গলাতেই বললাম।

কী দেখতে পাব! সাগর-ভোঁদড়? কোথায়? চিং সুনের গলায় সন্দেহ ও বিরক্তি। চিং সুনকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। সমুদ্রের নোনা জলের ঢেউয়ে শ্যাওলা ধরা পাহাড়ের গা আর বাদামি কেল্পের জঙ্গলের মধ্যে মিশে-থাকা সাগর-ভোঁদড় চিনে নেওয়া অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও বহু সাধনায় তৈরি করা পাকা চোখ না হলে অসম্ভব। চশমাটা না থাকলে পাকা চোখ নিয়েও আমি পারতাম না।

ধৈর্য ধরে চিং সুনকে এবার জায়গাটার আরও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে

সাগর-ভোঁদড়গুলোকে দেখিয়ে দিলাম।

চিং সুনের নাচানাচি তখন দেখবার মতো। তাঁর সে ছেলেমানুষি সত্যিই ভালই লাগল।

ক্যামেরা। ক্যামেরা! বলে তিনি তখন হাঁকাহাঁকি করছেন।

হেসে বললাম, আপনি ক্যামেরা নিয়ে যত খুশি ছবি তুলুন আজ, কিন্তু মনে রাখবেন কাল আমাদের ফিরতেই হবে। আপনার সারা জীবনের সাধ যখন মিটেছে। তখন আর দেরি করবার কারণও নেই।

নিশ্চয়, নিশ্চয়! চিং সুন হাসিমুখে আশ্বাস দেবার পর নিজের মুভি ক্যামেরাটাও আনতে কেবিনে গেলাম। ক্যামেরাটা বার করতে যাচ্ছি বাকস থেকে, হঠাৎ ঘরটা একটু অন্ধকার হওয়ায় চমকে তাকিয়ে দেখি সুলুপের দুশমন চেহারার চিনে মাল্লাদের একজন কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে।

কেমন একটু সন্দেহ হওয়ায় উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে তাতে চাবি লাগাবার শব্দও পেলাম।

ব্যাপারটা বুঝতে আর দেরি হল না। চিং সুনের এ-রকম শয়তানির সম্ভাবনা যে একেবারে মাথায় আসেনি তার জন্য নিজেকে তখন ধিক্কার দিয়ে আর লাভ কী!

ব্যাকুলভাবে কেবিন ট্রাঙ্কটা হাতড়ে পিস্তলটা খুঁজলাম। পিস্তল সেখানে নেই। তা যে পাব না আগেই বোঝা উচিত ছিল। চিং সুন আটঘাঁট না বেঁধে তার এ শয়তানি ফন্দি আঁটেনি। খাঁচায় বন্দী বাঘের মতো নিষ্ফল আক্রোশে গজরানো ছাড়া আর কিছু করবার নেই। তবু ট্রাঙ্কটা হাতড়ে একটা কাজের জিনিস যে পেলাম এই ভাগ্য।

দুপুর পর্যন্ত সেইভাবেই কাটল। বাইরে থেকে সুলুপের ওপরকার যে সব আওয়াজ কানে আসছিল তার মানে বুঝে শরীরের রক্ত তখন ফুটছে। স্বয়ং চিং সুন-ই এসে বেলা বারোটা নাগাদ আমার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। সঙ্গে অবশ্য চকচকে ছুরি হাতে একজন চিনে মাল্লা।

চিং সুনের হাঁড়ি মুখের দু-পাটি দাঁতই তখন অমায়িক হাসিতে আকর্ণবিস্তৃত হয়ে বেরিয়ে আছে।

যেন লজ্জায় সংকোচে এতটুকু হয়ে তিনি বললেন, ছি! ছি! কী অন্যায় বলুন তো! কে হতভাগা এক মাল্লা আমার হুকুম না বুঝে আপনাকে এতক্ষণ কেবিনে বন্ধ করে রেখেছে। আমি কোথায় ক্যামেরার কাজ দেখাতে আপনাকে ডেকে আনতে বললাম, আর গাড়োলটা কিনা আপনার দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেল!

তাতে আর কী হয়েছে। আমিও তাঁর বিনয়ে যেন গলে গিয়ে বললাম, কেবিনে খানিকক্ষণ তবু নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করা গেল। আপনার ক্যামেরার কাজ নির্বিয়ে সারা হয়েছে নিশ্চয়?

তা কতকটা হয়েছে আপনার আশীর্বাদে! চিং সুন সকৃতজ্ঞভাবে হেসে বললেন, আপনাকে তাই দেখাবার জন্যেই তো ডাকতে এসেছি। আসুন, আসুন।

সামনে চিং সুন আর পেছনে ছুরি হাতে সেই মাল্লার মাঝখানে ডেক পর্যন্ত যেতে হল।

ডেকে গিয়ে পৌঁছোবার পরই রক্তটা মাথায় উঠে গেল এক মুহূর্তে। গোটা আষ্টেক সাগর-ভোঁদড় সেখানে ডেকের পাটাতনের ওপর পড়ে আছে। প্রায় সব কটাই মরা। একটা দুটোর উজ্জ্বল মোলায়েম গা শুধু তখনও মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে। সুলুপের ধারে আমায় যেখানে দাঁড় করিয়েছে তার পেছনেই বিরাট জালটা জল থেকে তোলা হলেও তখনও ফ্রেমে টাঙানো।

চোখে যে তখন চারিদিক লাল দেখছি তা বুঝতে না দিয়ে মুখে হাসি টেনে গদগদ হয়ে বললাম, বাঃ! চমৎকার ক্যামেরার কাজ তো! চিনে ভাষাটা কিছু জানি বলে অহংকার ছিল। এখন দেখছি অনেক কিছুই আমার শিখতে বাকি। আপনার চিনে ভাষায় অন্তত ক্যামেরা মানে ভোঁদড় ধরা জাল, কেমন?

ঠিক ধরেছেন! চিং সুন আমার বাহাদুরিতে যেন অবাক।

আর কৃতজ্ঞতা মানে বেইমানি, সামনে হাত বাড়িয়ে বন্ধুত্ব মানে পিঠে চোরাগোপ্তা, আর মানুষের চেহারা মানে শয়তানের মুখোশ!

চিং সুনের চালকুমড়ো মুখের টেরা চোখদুটো তখন তার মাল্লার হাতের ছুরির মতোই চকচক করছে।

মুখে কিন্তু মোলায়েম হাসিটি বজায় রেখে তিনি বললেন, আমাদের ভাষাটা এত তাড়াতাড়ি রপ্ত করেছেন দেখে আপনার মাথাটাই যে বাঁধিয়ে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু হাতে আমার সময় বড় কম। সাগর-ভোঁদড়ের খবর জানাজানি হয়ে যাবার আগেই এ তল্লাটের যতদূর সম্ভব সব ভোঁদড় সাবাড় করে দেশে ফিরে যেতে হবে। তাই অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লোহার শেকলে হাত-পা বেঁধে আপনাকে এইখানেই সমুদ্রের জলে ফেলে দিয়ে যেতে হচ্ছে। একটা ভরসা আপনাকে দিচ্ছি। এখানে হাঙর-টাঙরদের উৎপাত নেই বললেই হয়। সুতরাং সমুদ্রের তলায় শুধু মাছেরাই আপনার হাড়মাস খুবলে খাবে!

ভরসাটুকুর জন্য ধন্যবাদ, চিং সুন! যেন কৃতার্থ হয়ে বললাম, কিন্তু এখানকার সাগর-ভোঁদড় সাবাড় করে নিয়ে যাওয়া বোধ হয় আপনার ভাগ্যে নেই। আপনার শয়তানিটা আঁচ করতে পারিনি সত্যি, কিন্তু সাগর-ভোঁদড় যে এখনও টিকে আছে আর এতদিন মানুষের চোখ এড়িয়ে থাকার দরুন কিছু বংশ বৃদ্ধি যে করতে পেরেছে এ খবর আর বেশিদিন চাপা থাকবে না বুঝে সানফ্রানসিসকোতে নেমেই আমার বন্ধু সামুদ্রিক প্রাণিতত্ত্ববিদ ডক্টর ক্যামেরনের সঙ্গে দেখা করে এসেছি। কী তাঁকে করতে হবে তা-ও বলে এসেছি সব। এখান থেকে কিছু দূরে বিবি ক্রিকের মুখে তিনি তাঁর লোকজন নিয়ে তখন থেকেই পাহারায় আছেন। ইতিমধ্যে সাগর-ভোঁদড়ের একটা-দুটো পাল দেখেও ফেলেছেন বলে বিশ্বাস করি। এ-পাল দেখবার পরেই ক্যালিফোর্নিয়া ও আমেরিকার ফেডারেল সরকারকে জানিয়ে এ-প্রাণীটিকে রক্ষা করবার ব্যবস্থা যা করবার তিনি হয়তো করেই ফেলেছেন ইতিমধ্যে। সুতরাং আপনার শয়তানি মতলব সিদ্ধ হবার কোনও আশাই তো দেখছি না।

চিং সুনের মাংসের পাহাড় আমার এই কথার মধ্যেই প্রায় আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠল। মুখ থেকে যেন আগুনের হলকা বার করে চিং সুন বললেন, হতভাগা কেলে আরশোলা! তুই লুকিয়ে লুকিয়ে এই চালাকি করেছিস! তোকে আমি নিজের হাতেই আরশোলার মতো আজ টিপে মারব।

আমার ওপর ধস নামা পাহাড়ের চুড়োর মতে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিং সুন আমার গলাটা টিপে ধরলেন।

ছুরি হাতে মাল্লাটা আচমকা সেই দশমনি লাশের ভার সইতে পারবে কেন? চিং সুন সচাপ্টে তার ওপর গিয়ে পড়বার পর দুজনে জড়াজড়ি করে ডেকের ওপর পড়ল লুটিয়ে। ছোরাটা তখন ঝনঝনিয়ে ছিটকে চলে গেছে ডেকের রেলিং-এর ধারে।

সেটা কুড়িয়ে নিয়ে লাফ দিয়ে, টাঙানো জালটার ফ্রেমের মাথাতেই উঠতে হল। ছোরাটা জালের মধ্যে গলিয়ে তারই বাঁট ধরে ঝুলে পড়লাম এবার। ধারালো ছোরায় জালটা ফর্দা ফাঁই করে কেটে একেবারে সমুদ্রের জলেই গিয়ে পড়লাম ঝাঁপিয়ে। সেখান থেকে ড়ুবসাঁতারে সুলুপের হালের কাছে।

ওপরে ভ্যাবাচাকা খাওয়া মাঝি-মাল্লারা তখন সামলে উঠে হইচই শুরু করেছে। সুলুপের দুধারের রেলিং থেকে ঝুঁকে চেষ্টাও করছে আমায় খোঁজবার।

ছোরাটা সত্যি যেমন ধারালো তেমনই মজবুত। কখনও ভ্রু ড্রাইভার, কখনও বাটালির মতো সেটা কাজে লাগিয়ে কয়েকটা ইসকুপ নাট বল্ট খুলে হালটাকে অকেজো করে দিতে বেশিক্ষণ লাগল না। এবার অন্য কাজটাও সারলাম। আবার ড়ুবসাঁতার দিয়ে তারপর সাগর-ভোঁদড়ের আস্তানা সেই ড়ুবো পাহাড়ের জাগা চুডোর ধারেই গিয়ে উঠলাম। তার একটা খাঁজের আড়াল থেকে সুলুপটার ওপর নজর রাখা সোজা।

খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। আমায় খুঁজতে সুলুপ ঘোরাতে যেতেই হালের অবস্থাটা ধরা পড়ল। তা নিয়ে চেঁচামেচি হাঁকাহাঁকি খানিক হতে-না-হতেই সুসুপের ওপরে একেবারে হুলুস্থুল কাণ্ড। সুলুপের গ্যাফটপ পালে আগুন লেগে গেছে। তার সব ঝুলোনো দড়িদড়া থেকে ধোঁয়ার রাশ উঠেছে কুণ্ডলী পাকিয়ে।

হাল বিকল করবার পর তাই বেয়ে একটু উঠে এই কাজই সেরেছিলাম। পালের ঝোলানো কটা দড়িদড়ায় লাইটার থেকে একটু করে পেট্রল লাগিয়ে ধরিয়ে দিয়েছিলাম আগুন। কেবিনে বন্দী অবস্থায় পিস্তলটা না পেলেও এই লাইটারটিই কেবিন ট্রাঙ্কের মধ্যে পাই। বিশেষ কিছু না ভেবেই সেটা পকেটে রেখেছিলাম। সেটা যে এমন কাজে লাগবে তখন ভাবতে পারিনি।

চিং সুন আর তার দুশমন মাঝি-মাল্লারা তাদের বেহাল জ্বলন্ত সুলুপ নিয়ে কী তারপর করেছে ঠিক জানি না। যা-ই করুক, তাদের ভোঁদড় শিকারের আশায় যে চিরকালের মতো ছাই পড়েছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমার তখন আসল জরুরি খবরের জন্যই বেশি আগ্রহ। সুলুপের ওই অবস্থা দেখেই আমি তাই সাঁতরে তীরে গিয়ে উঠি। সেখান থেকে সোজা সানফ্রানসিসকোতে ডক্টর ক্যামেরনের কাছে।

ডক্টর ক্যামেরনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই অবশ্য সেদিনের খবরের কাগজে বড় বড় হরফে সংবাদটা পেলাম। একেবারে প্রথম পাতাতেই দুকলম শিরোনাম দিয়ে খবরটা ছাপানোএকশো বছর বাদে বিলুপ্ত সাগর-ভোঁদড়ের খোঁজ। বি: প্রাণীটির বংশরক্ষায় সরকারি সংরক্ষণ আইন প্রয়োগ।

নিজের অজান্তে যে অন্যায়ের সহায় হয়েছি তার জন্যে মনে মনে আফশোস থাকলেও ওইটুকু সান্ত্বনা মনের মধ্যে নিয়ে ফিরেছি যে পৃথিবীর এই একটি অমূল্য প্রাণী অন্তত মানুষের নির্মমতায় আর লোপ পাবে না।

ঘনাদা চুপ করলেন। মুখে যেটা ফোটাবার চেষ্টা করলেন সেটা নিঃস্বার্থ কর্মবীরের অনাসক্তিই বোধ হয়। শিশিরের সিগারেটের টিনটা কিন্তু তখন তাঁর কোলের কাছ থেকে ফতুয়ার পকেটে ঢুকেছে।

সেই পকেট থেকেই যেন হঠাৎ হাতে ঠেকায় আমাদের সেই খামটি বার করে তিনি খানিকক্ষণ সেটা উলটে পালটে দেখে বেশ অবাক।

এই বোধহয় তোমাদের সেই চিঠি। ঘনাদা বেশ মনমরা ভাবেই বললেন সেটা শিশিরের হাতেই এগিয়ে দিয়ে, চশমা ছাড়া তো আর পড়তে পারব না। ওটা নিয়েই যাও তোমরা।

চিঠি নিয়ে আর আমাদের মাথা তোলবার অবস্থা নেই। সুড়সুড় করে বিনা বাক্যব্যয়ে সবাই নীচে নেমে এলাম।

নেমে এসেই আমাদের আহাম্মকির প্রমাণস্বরূপ চিঠিটা যখন কুচি কুচি করে ছিড়ছি তখন গৌরকে ডিকশনারি পেড়ে নিয়ে বসতে দেখে আমরা অবাক।

কী, ব্যাপার কী? জিজ্ঞাসা করলাম, লিপিতত্ত্বে হার মেনে আবার শব্দতত্ত্ব কেন?

এই যে বলছি! গৌর অভিধানের পাতা উলটে বললে, ঘনাদার চোখের রোগগুলো মনে আছে? প্রেসবাইওপিয়া আর ডাইক্রোম্যাটিক ভিশন। ওগুলোর মানে শুনবে? প্রেসবাইওপিয়া হল চালশে আর ডাইক্রোম্যাটিক দৃষ্টি বলে রংকানদের।

আমাদের হাঁ-করা মুখের ওপর গৌর ডিকশনারিটা বন্ধ করল।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *