চিলেকোঠার সেপাই – ২০

ঝুলন্ত ও মাটিতে-গাথা ঝুড়ির মাঝে মাঝে শুকনা পাতা, হলদে ঘাসে-ঢাকা জমির কোথাও কোথাও ছেটো বড়ো আকারের রোদ ও ছায়ার কারুকাজ। রোদ এখানে ঢোকার ফাক পেলো কোথায়? আনোয়ার তখন তাকায় ওপরদিকে। মাথার ওপর বটশাখার বীমের ওপর ঘন বটপাতার বিস্তৃত ছাদ। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদ ও ফিকে লাল গোল ফল। গুচ্ছ গুচ্ছ ফল ঘিরে কলরব!—ডালের সঙ্গে ঝুলছে, বাদুড়, ডালপালার ফাঁকে চলন্ত পাতার মতো চরে বেড়ায় শালিক। আর খুব ছোটো ছোটো হরিয়াল দফায় দফায় উড়ে অতিক্রম করছে স্বল্পতম দূরত্ব। একটু করে ঠোকর দিচ্ছে লাল ফলের পাতলা রোয়াওয়ালা চামড়ায়। ফের উঠে যাচ্ছে আরেকটি ফলগুচ্ছের দিকে। বটপ্রাসাদের ছাদে চলমান প্রাণীদের কোলাহলের সঙ্গে ঠাসবুলুনি পাতার স্পন্দন। পাখি ও পাতার মিলিত গতিবিধি অপরিচিত কোনো ভাষার মতো আনোয়ারের কানে অভিনব ঠেকে। বটছাদ তার কাছে অনেক দূরের কিছু বলে মনে হয়, সে মাথা নামিয়ে নেয় নিচের দিকে। নিচে রোদ ও ছায়ার আলপনার তলায় ল্যাজ ও মুণ্ডুদিব্যি মাটিতে ডুবিয়ে পিঠ উঁচু করে শুয়ে রয়েছে এক মাতাল অজগর। অজগর সাপটির বোধ হয় বোধশোধ লোপ পেয়েছে, আর এদিকে আনোয়ারের সামনে অজগরটি ছাড়া সব কিছু হাওয়া হয়ে যায়। হঠাৎ করে অজগর সাপ নিশ্বাস ফেললে বটতলার শুকনা পাতা ও ধুলোবালি উড়ে গিয়ে পড়ে দূরের ধান-কটা জমিতে, বুক দিয়ে জোয়াল ঠেলার চেষ্টা খান্ত দিয়ে করমালি সেখানে কোদাল কুপিয়ে চাষ করার উদ্যোগ নিচ্ছে। ধুলোবালি কি শুকন পাতার সঙ্গে আনোয়ারও সেখানে ছিটকে যেতে পারলে ভালো হতো। এ ছাড়া এখান থেকে বেরিয়ে যাবার কি কোনো উপায় নাই? এই অজগরের গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে কতোক্ষণ? না, উপায় পাওয়া যায়, কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে বটে, কিন্তু ‘আনোয়ার, তোমাকে আগেই বলছিলাম, মনে আছে? জালাল মাস্টারের প্রশ্নবোধক বাক্যে সে চমকে ওঠে। জালালউদ্দিন দাঁড়িয়ে রয়েছে বুক চিতিয়ে, তার ডান পায়ের নিচে অজগর সাপের ফুলে-ওঠা পিঠ। আনোয়ার নিজে নিজেই লজ্জা পায়, বটগাছের শিকড় শালা কি ভয়ানক ভয় দ্যাখাতেই পারে। গাছের শিকড় অজগরের দেহের বিভ্রম তৈরি করে কিভাবে? সে কি কেবল বয়সের জোরে? নাকি, একই বস্তু শিকড় ও অজগরের দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে সক্ষম? এসব কি এখানকার পুরনো বাসিন্দার কারসাজি?
আনোয়ার, জালাল মাস্টার ফের বলে, এই গাছের বয়স কম করা ধরলেও দুইশো তো হবেই। বেশিও হবার পারে!
প্রমাণ কি? জিগ্যেস করার আগেই জালাল মাস্টার বলে, দেখবা? ঝুড়ির ফাঁকে ফাঁকে তাদের হটতে হয়। সরু মোটা, কিলবিল করা ও পিঠ-উঁচু অনেক শিকড়, সেগুলো ডিঙিয়ে, নতুন পুরনো বেশ কয়েকটা কাণ্ডের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে জালাল মাস্টার ও আনোয়ার এসে দাঁড়ায় মোটামেটা ১টা কাণ্ডের সামনে মস্ত মোটা কাণ্ড, কিন্তু সবচেয়ে মোটা নয়। তবে চেহারায় এর বয়স ধরা পড়ে প্রকটভাবে। রোগশয্যায় শুয়ে ছাদের সিলিঙের দিকে ভোতা ভোতা চোখে তাকিয়ে-থাকা বুড়ো মানুষের ভাঙা গালের মতো কাগুটির শরীর মাঝে মাঝে তোবড়ানো, তার এখানে ওখানে গর্ত। এর একদিকে উইপোকার একটা টিবি। এই ঢিবির সংযোজনে শরীরের আয়তন বাড়েনি, মনে হয় এটা দিয়ে তার পড়ে পড়ে গতরটা ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে।
‘দ্যাখো। জালাল মাস্টারের তর্জনী অনুসরণ করে আনোয়ার মাটির দিকে দ্যাখে। ইঞ্চি দুয়েক উঁচু বাধানো একটি ইটের বেদি। চুনসুরকির খাবলা খাবলা প্লাস্টার এবং তার নিচে পাতলা চওড়া ইট। এটা দেখিয়ে জালাল মাস্টার বটগাছের বয়স বোঝায় কি করে?
জালাল মাস্টার গম্ভীর হয়ে বলে, বৈরাগীর ঘর। এইখানে বৈরাগী বসবাস করছে।
বৈরাগী কে? আনোয়ার জিজ্ঞেস করে, বৈরাগীর ভিটা তো সবাই বলে, কিন্তু বৈরাগীটা কে?
কে?
আনোয়ারের দিকে না তাকিয়েই জালাল মাস্টার বলে, বৈরাগীটা নয়। এককালের সম্মানিত ব্যক্তি। সর্বজনশ্রদ্ধেয় মহাপুরুষ!
ও, বৈরাগী তাহলে সত্যি সত্যি ছিলো? আমি ভেবেছি স্রেফ গল্প!
‘গল্প হবে কেন? ইতিহাসের কথা। ইতিহাসের কথা নিয়া মানুষ গল্প করে না? নাটক নভেল লেখে, বায়োস্কোপ করে। ইতিহাস কি তাই কেচ্ছা হয় যায়?
বৈরাগীর ব্যাপারে জালাল মাস্টারের উৎসাহের অন্ত নাই। অতিরিক্ত উৎসাহে প্রায় ১৫/২০ সেকেন্ড সে কথাই বলতে পারে না কেবল এদিক ওদিক দ্যাখে। তারপর বিড়বিড় করে, হু! দদুইশো ববছর তো হলোই।’
একটুখানি তোতলালেও কয়েকটি বাক্যের ঘষায় তার জিভ হাল্কা হয় এবং মুখ দিয়ে কথা বেরোতে শুরু করে প্রবল-তোড়ে-আসা বমির মতো। মনে হয় কিছুই সে রেখে দিতে পাচ্ছে না, ২শতাব্দী আগেকার সব ঘটনা ও দৃশ্য যেন তার নিজের চোখে দ্যাখ্যা, সেই সব উগড়ে ফেলার জন্যে একেবারে অস্থির!
দুশো বছর?
আনোয়ারের সংশয় দেখে জালাল মাস্টার চটে যায়, কেন, ইংরেজ শাসনের গোড়ার দিকে, কোম্পানি আমলের শুরুতে ফকির-সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহের কথা কি আনোয়ার জানে না? —সে তো জানেই। মজনু ফকির, মুসা শাহ, ভবানী পাঠক-এদের কথা কেন জানে? —যদি জানে তো এতো সন্দেহ করার কি আছে?
কিন্তু ঐ বিদ্রোহের সঙ্গে বটগাছের সম্পর্ক কি? এই বটতলা থেকে কি বিদ্রোহ পরিচালিত হয়েছিলো?
আনোয়ার ঠাট্টা করলে এবার জালাল মাস্টার আর রাগ করে না, বরং এতে তার উৎসাহ বাড়ে। বটগাছের গহীন ভেতরে এই ভাঙাচোরা পাকা জায়গার সঙ্গে বিদ্রোহের একজন নেতার স্মৃতি জড়িত। ইতিহাস বইয়ের ওপর কি সব সময় সম্পূর্ণ নির্ভর করা আনোয়ারের উচিত? ইতিহাস বই যারা লেখে তাদের চেয়েও অন্তরঙ্গ মানুষের কাছে এসব কথা শোনা, তাহলে অবিশ্বাস করে কি করে?
শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীরা গেলো কোথায়?
জালাল মাস্টার দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মনে হয় পরাজিত বিদ্রোহীদের পরিণতির সঙ্গে তার নিজের ভাগ্যও জড়িত। একটু থেমে নিজের দীর্ঘশ্বাসটি সে হজম করে। তারপর জানায় যে, ইংরেজদের হাতে তখন আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। এদেশী বড়োলোকেরা পরিণত হলো তাদের লাঠিয়ালে। মার খেয়ে সন্ন্যাসী-ফকিরের দল ছিটকে পড়ে এদিক ওদিক। যমুনা তখন ছোটো নদী, খাল বললেও চলে, তার পশ্চিম তীরে নওখিলা পরগণার এক প্রান্তে বনজঙ্গল। বনেজঙ্গলে লুকিয়ে তারা আরো বড়ো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। ভবানী পাঠক কিছুদিনের জন্য এদিকে আসেন। আনোয়ার বোধ হয় জানেন যে, শেষের দিকে ভবানী পাঠক ও মজনু শাহ একজোট হয়েছিলেন। তো এখানে এসে ভবানী পাঠক মিলিত হন ফকিরদের পলাতক কিছু কর্মীর সঙ্গে। বটগাছের তলায় এই বেদী ভবানী পাঠকের তৈরি। তার কি স্থায়ী ঠিকানা থাকতে পারে? ভবানী পাঠক তাই বিদ্রোহীদের সঙ্গে কখনো চলে যান মহাস্থান, বাঙালি নদী পেরিয়ে, করতোয়া পেরিয়ে মহাস্থান-ফকিরদের বড়ো ঘাটি। কখনো বা ঘোড়াঘাট। আবার গঙ্গা পার হয়ে বিহার। কিন্তু বিদ্ৰোহ আস্তে আস্তে নিভে যায়। বিদ্রোহ নির্বাপিত হওয়ার গল্প বলতে বলতে জালালউদিনের কণ্ঠও মিইয়ে আসে, খানদানীরা কেউ অগ্রসর হয়া ফকির-সন্ন্যাসীদের সহায়তা করলো না। তার সব নীরব হয়া থাকলো।
না নীরব ঠিক থাকেনি। আনোয়ার বলে, ইংরেজদের চাকর-বাকরে পরিণত হয়ে তার হামলে পড়লো দেশবাসীর ওপর।
‘দেশের মানুষ কি করে, কও? ফকির-সন্ন্যাসীরা কি করতে পারে? যতোই কও বাপু, শিক্ষিত মানুষ, বড়ো ঘরের মানুষ যদি নেতৃত্ব না দেয় তো কিছুই হয় না। জালাল মাস্টার হঠাৎ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে, দ্যাখো, মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আজম, জওহরলাল নেহরু, ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়াদি—এই সব বড়ে বড়ো ঘরের উচ্চ শিক্ষিত মানুষ অগ্রসর না হলে দেশে স্বাধীনতার সূর্য উদয় হয়?
উপমহাদেশের এতো সব নেতার নাম ও জালাল মাস্টারের অলঙ্কারসমৃদ্ধ বাক্য আনোয়ারকে মুগ্ধ করে না, সে বরং পাল্টা জিগ্যেস করে, কিন্তু আন্দোলন যদি ঐসব বড়ো বড়ো ঘরের বিরুদ্ধে হয়?
বিদেশীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, তার আবার বড়ো ঘর ছোটো ঘর কি? দেশের সকল অধিবাসীর সংগ্রাম।
কিন্তু বড়ো ঘরের মানুষদের যদি বিদেশী শাসকরা পোষে, তাহলে? এই দুইয়ের স্বার্থ যদি এক হয় তাহলে বড়ো ঘরের শিক্ষিত মানুষ বিদ্রোহীদের সঙ্গে আসবে কেন?
এসব কথা জালাল মাস্টারের মাথায় ঢুকতে চায় না। ঢোকাবার সখও নাই তার। সে তখন ব্যস্ত সন্ন্যাসীকে নিয়ে। বটতলার এই আস্তানা থেকে তার নিয়মিত অন্তর্ধানের কথা সে বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলে। কোথায় যুদ্ধে আহত হয়ে সন্ন্যাসী একবার ফিরে এসেছিলেন। একটু সুস্থ হলে মজনু শাহের কয়েকজন সাগরেদকে নিয়ে তিনি চলে যান পশ্চিমে। সেই যুবকদের কয়েকজন ফিরে আসে, কিন্তু সন্ন্যাসীকে আর দাখা যায়নি। বটগাছের নিচে মজনু শাহ কি মুসা শাহ-জালাল মাস্টার ঠিক বলতে পারে না,-এই ২জনের ১জনের প্রধান সাগরেদ সুলতান শাহ ১টি মক্তব খোলে। সুলতান শাহ চিরকুমার, তার মৃত্যুর পর তাই ভাইপোর ছেলে কুদ্দুস শাহ করলো পাঠশালা। আবদুল কুদুসের পাঠশালা, এই অঞ্চলে খুব নামকরা ইস্কুল। নদীতে গোসল করতে গিয়ে কুদ্দুস মৌলবি কুমিরের ভোগ হলো। তারপর কোথায় মক্তব? কোথায় পাঠশালা? বৈরাগীর ভিটা তখন থেকে খালি পড়ে থাকে। দুশো পৌনে দুশো বছর আগেকার কার্যকলাপ জালাল মাস্টার যেন চোখের সামনে দেখতে পায়। কুদ্দুস মৌলবির কথা আনোয়ার আগেও তার কাছে কয়েকবার শুনেছে, এই লোকটি জালাল মাস্টারের প্রপিতামহ। এখন তার সম্বন্ধে বলতে বলতে জালাল মাস্টার হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দীর্ঘশ্বাসের কারণ কি? না, এতো বড়ো মানুষের ভিটা, তার সবটা আর কি-না একটা গাছের কজায় চলে যাচ্ছে। আরে বাবা, আল্লাহর জায়গা-বসত করো, আবাদ করো, লাঙল দাও, ফসল হোক, খাও, সংসার বাড়ুক। তা না করলে? না করলে কি হতে পারে তা এই বটগাছ থেকেই বুঝতে পারো। দ্যাখো না শালার বটগাছ কি রকম ছড়িয়ে পড়ছে। এখানকার এক ছটাক জমিও কি হেলাফেলার বস্তু? এই সব জায়গা হাজার বছর ধরে সুপ্ত ছিলো নদীর জলধারার নিচে, তা নদী থেকে উঠে এসেছে, সেও কয়েক শো বছর তো হবেই। ফসল ফলাবার জন্যে তার প্রচণ্ড কামনা পানির নিচে চাপা পড়েছিলো, জেগে উঠে তাই শরীর বিছিয়ে সে তৈরি হয়ে রয়েছে। লাঙল ছোঁয়ালেই এখানে ফসল জমির কামুক শরীরে মানুষের গতর খাটালেই শস্য। অথচ দাখো, বটগাছ কিনা দিনের পর দিন মাটি দখল করে চলে। বটগাছ এদিকে বাড়ে, ওদিকে বাড়ে, ৩ বিঘা সাড়ে ৩ বিঘা জমি তো খেয়েই ফেলেছে, মাঠের ওপারে তালপোতার মানুষ ভয় পায়, একটা ডাল যদি কোনোরকমে ওদিকে যায় তো সেখান থেকে ঝুড়ি ঝুলে পড়বে, শিকড় বেরুবে, তারপর গ্রাম কি আর লোকালয় থাকবে?
আনোয়ার অবাক হয়, তাই কি হয়? যেখানে মানুষ বসবাস করছে, চাষবাস হচ্ছে, সেখানে গাছ বাড়ে কি করে?
না গো, তোমরা জানো না। এই গাছের লোভ বড়ো বেশি। মনে হয় ব্যামাক জমি না খালে এর খিদা মিটবে না। জালাল মাস্টার চোখ দিয়ে বটগাছ চাটে, আস্তে আস্তে হাঁটে, বলে, তৃতীয় রিপু শালার বড়ো উগ্ন। প্রথম রিপুর কথা আল্লাই জানো শেষ বাক্যটিকে রসিকতা বলে মনে করে সে নিজেই একচেট হেসে নেয়, হাসি থামলে বলে, কখন মাথা তুল্যা শালা মানুষের ঘরবাড়ির মধ্যে থাম্বা তোলে কেউ কবার পারে?
গাছের এরকম স্বেচ্ছাচারী সম্পপ্রসারণের কথা আনোয়ার বিশ্বাস করে না। কিন্তু সেই কথা সরাসরি বলাটাও বেয়াদবির পর্যায়ে পড়ে, সে জিগ্যেস করে, তা লোকে গাছ কাটে না কেন? গাছ কেটে ফেললেই তো হয়!
জালাল মাস্টার হঠৎ একেবারে চুপ করে। চুপচাপ সে হাঁটে, একটু পেছনে হাঁটে আনোয়ার। মাথার ওপর বটপ্রাসাদের শেষ অংশ। এদিকটায় রোদ বেশ উজ্জ্বল। পায়ের নিচে বটপাতার ছোটো ছোটো স্তুপ ক্রমেই আরো ছোটো হয়ে আসছে। মাঝে মাঝে বোটা থেকে কি পাখির ঠোঁট থেকে খসে পড়ে পাকা বটফল। এইসব পাতা ও ফল পায়ে মাড়িয়ে কি পাশ কাটিয়ে তারা হাঁটে। এই ২জন মানুষের নীরবতার সুযোগে গাছ ভর্তি শালিক ও হরিয়ালের ধ্বনি উচ্চকণ্ঠ হয়। আনোয়ার কথা বলতে শুরু করলে সেই আওয়াজ ফের পেছনে পড়ে যায়। এই যে জমির ওপর এই মোটা ডালটা এগিয়ে এসেছে, এর থেকেই তো ঝুড়ি নামবে। ঝুড়ি ঢুকে পড়বে মাটির ভেতর, এইভাবে মাটি মানুষের হাতছাড়া হচ্ছে। কালই করমালিকে বলে এই ডাল কেটে ফেলার বন্দোবস্ত করুক না জালাল মাস্টার!
বটগাছের সীমা পার হয়ে জমির আলে পা দিয়ে জালাল মাস্টার বলে, ‘পুরান গাছ প্রাচীন কালের বৃক্ষ, বহুদিনের সাক্ষী। তাজিম করা কথা কওয়া দরকার।
জি?
না, ধরে এতোদিনের সাক্ষী। এই গাছ হলো এই এলাকার মুরুব্বি। এ্যাঁর দেহে আঘাত দিলে মুরুৰ্ব্বিক অপমান করা হয় না?
আনোয়ার হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঠের ওপারে গ্রাম দেখতে দেখতে জালাল মাস্টার বলে, বুঝলা না? গাছের আত্মা থাকে না?
‘গাছের আত্মা? মানে?
‘হ্যাঁ হ্যাঁ আত্মা মানো? জালাল মাস্টার বিরক্ত হয়, গাছেরও আত্মা থাকে। বিজ্ঞানেই তো বলে। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কি আবিষ্কার করছে, কও তো বাবা?
‘সে তো প্রাণ। গাছের প্রাণ আছে।’
ঐ তো। জীবের বয়স হলে তারা আল্লার রহমত পায়। পুরান গাছেরও রুহু থাকে। গাছের দেহে ব্যথা দিলে আত্মা কষ্ট পায়।’
কি রকম?
এই গাছে আঘাত করলে তার ভালো হয় না। গাছ রুষ্ট হয়।
ভালো হয় না মানে?
অমঙ্গল ঘটে।
কিভাবে? কতোভাবে হবার পারে। জালালউদ্দিন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, তোমার বাপু আজকালকার শিক্ষিত চ্যাংড়াপ্যাংড়া সবই ন্যাংটা করা দেখবার চাও। মুরুব্বি মানো না! কিছুক্ষণ চুপচাপ ইটার পর সে বলে, কেউ এই গাছের ডাল কাটলে কি দেহের কোনো জায়গায় কোপ দিলে সেই মানুষের অকল্যাণ ঘটে। তার ক্ষতি একটা না একটা হবেই।’
‘সত্যি?
হ্যাঁ, তোমার সাথে মিথ্যা উক্তি করলে আমার লাভ কি? আনোয়ারের বিস্ময়কে স্বতঃস্ফূর্ত সশ্রদ্ধ ভয় বলে গণ্য করে জালালউদ্দিন উৎসাহিত হয়, তো কি? কুড়ালের কোপ দিলে সেই মানুষ রক্তবমি করতে করতে মরবে। না হলে মাথাত বায়ু চড়ে, তখন নিজেই গলাত দড়ি দিয়া মরে।’
বলেন কি? আনোয়ারের মনে পড়ে জিনের কথা, চেংটু বলছিলো এখানে নাকি জীন থাকে?
আরে ঐ ব্যাটার কথা থোও। জালাল মাস্টার চেংটুর ওপর বিরক্ত হয়েছে, জীন থাকলে আছে তো ঐ চেন্টুর কথা বাদ দাও। শালা হস্তিমূখ, শিক্ষা নাই, দীক্ষা নাই, মাথা গরম, জীন-পর নিয়া কথা কোস তুই কোন আক্কেলে?
আনোয়ার জিগ্যেস করে, এখানে কেউ মারা গেছে এভাবে?
অনেক! জালাল মাস্টার পেছনদিকে মুখ করলে আনোয়ারও সেদিকে তাকায়। শীতকালের রোদ নিদ্বিধায় শুয়ে থাকে সমস্ত মাঠ জুড়ে। মাঠের পর বটগাছকে এখান থেকে সুদূর ও নির্বিকার বনের মতো মনে হচ্ছে। ঐ বটবনের ভেতরকার অধিবাসী শালিক হরিয়ালের ঐকতান এখন বনের বাইরে আসতে না আসতে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মাঠের রোদের নিচু স্বরের সঙ্গীতের বিস্তৃত ধ্বনিতে। কানে বাজছে অন্য কোনো তৃতীয় ধ্বনি। জালাল মাস্টার তার স্বর হঠাৎ খাদে নামায়, ফিসফিস করে, গোটা ইউনিয়ন যদি হিসাব করো তো গড় ৩০/৪০ বছরে কম করা হলেও জনা দশেক মানুষের অপঘাতে মৃত্যু ঘটছে। অভাবে পড়লে চাষাভূষা মানুষের দিশা থাকে না, বিবেচনা বোধ লুপ্ত হয়, বাজারে নিয়া বেচার জন্য গাছের ডাল কাটে। কেউ কেউ কোপ মারার সাথে রক্তবমি করা মৃত্যুবরণ করছে, কেউ আবার বাড়িত যায়া গাছের সাথে দড়ি ঝুলায়া মরছে।’
‘সে তো দারিদ্রের জন্যেও হতে পারে। খেতে পায় না, ছেলেমেয়েদের খেতে দিতে পারে না- প্রতিবাদ করলেও আনোয়ারের গলাও এখন নিচু।
এইসব কথা বেশি না কওয়াই ভালো! জালাল মাস্টার বিষয়টির উপসংহার টানতে চাইলেও আনোয়ারের বুক শিরশির করে। রোদ কি ঠিক কি একটু দূরের গ্রাম, এমনকি গোটা বটবৃক্ষ ছাড়িয়ে অন্য ১টি ছায়া তার চোখে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে এই অনুমানে সে ওপরের দিকে তাকায়। না, সেখানে বিশাল শূন্যতায় কাপে কেবল সাদা। তবু, বটগাছের প্রাচীনতম বাসিন্দার উড়ালের ফলে ১টি শিক্ষা হিসহিস করে ওঠে যদি আনোয়ার জালাল মাস্টারের গা ঘেঁষে হাঁটে।

Share This