ঘর-পোড়া লোক - ৩য় বা শেষ অংশ

ঘর-পোড়া লোক  (শেষ অংশ) (দারোগার হয় ৭৬ম সংখ্যা)
 (অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত।)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে শ্রী বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
Al Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। শ্রাবণ
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.

ঘর-পোড়া লোক।
(শেষ অংশ)
প্রথম পরিচ্ছেদ।

আসামীদ্বয় থানায় উপস্থিত হইলে পর, সেই সময় থানায় যে কর্ম্মচারী উপস্থিত ছিলেন, তিনি আসামীদ্বয়কে হাজত গৃহে বন্ধ করিয়া রাখিলেন।

থানায় হাজত-গৃহ কিরূপ, তাহা পাঠকগণ অবগত আছেন কি? থানার ভিতর থানার কর্ম্মচারীগণ যে স্থানে বসিয়া সৰ্ব্বদা কাষ-কৰ্ম্ম বা লেখা-পড়া করিয়া থাকেন, তাহার দুই পার্শ্বে বা তাহার সন্নিকটে ছোট ছোট দুইটী গৃহ প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায়; উহাই থানার হাজত-গৃহ। উহার একটা পুরুষ-কয়েদী এবং অপরটা স্ত্রী-কয়েদীর নিমিত্ত প্রায়ই ব্যবহৃত হইয়া থাকে। সেই সকল গৃহে কেবল একটামাত্র দরজা ভিন্ন অপর জানালা দরজা প্রায়ই থাকে না। চোর বলুন, মাতাল বলুন, হত্যাকারী বলুন, বা যে কোন অপরাধের আসামী বলুন, সমস্ত দিনরাত্রির মধ্যে যাহারা ধৃত হইয়া থানায় আইসে, তাহাদিগের সকলকেই একত্র সেই গৃহের ভিতর থাকিতে হয়। বিছানার নিমিত্ত উহার মধ্যে একখানি কম্বল থাকে মাত্র।

গোফুর খাঁ ও ওসমান সেইরূপ একটী হাজত-গৃহের ভিতর আবদ্ধ হইলেন। সেই সময় হোসেন আঁহাদিগের সহিত কথাবার্তা কহিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে, তাহার সমভিব্যাহারী সেই প্রহরী কহিল, যে পর্যন্ত আসামী থানার ভিতর থাকিবে, সেই পৰ্য্যন্ত আসামী সম্বন্ধে কোন কথা বলা আমাদিগের ক্ষমতার অতীত। এখন যদি আপনি আসামীদ্বয়কে কিছু বলিতে চাহেন, বা উঁহারা আপনাকে কিছু বলিতে চাহেন, তাহা হইলে এখন এই থানায় কে কর্ম্মচারী উপস্থিত আছেন, ভাহার আদেশ লইবার প্রয়োজন। কারণ, যে পর্যন্ত আসামী দ্বয় থানার ভিতর থাকিবেন, সেই পৰ্যন্ত সেই আসামীদ্বয়ের সহিত আমাদিগের কোনরূপ সংস্রক নাই। এখন সেই আসামীদ্বয় সম্বন্ধে যাহা কিছু জবাবদিহি, তাহা এই থানার উপস্থিত কর্ম্মচারীকে করিতে হইবে।

প্রহরীর নিকট হইতে এই কথা শুনিয়া হোসেন ভাবি লেন, এ বড় মন্দ কথা নহে। আসামীদ্বয়ের সহিত কথা কহিবার নিমিত্ত আমি একবার উঁহাদিগকে অর্থ প্রদান করিয়াছি; কিন্তু এখন দেখিতেছি, আমি সেই অর্থ বৃথা নষ্ট করিয়াছি। ইহাদিগের সহিত যদি আবার কথা কহিবার ইচ্ছা প্রকাশ করি, তাহা হইলে এই থানায় এখন যে কর্ম্মচারী উপস্থিত আছেন, তিনি যে আবার কত অর্থ প্রার্থনা করিবেন, তাহাই বা এখন কে বলিতে পারে? এরূপ ভাবে নিরর্থক কতবার অর্থ নষ্ট করা যাইতে পারে? ইহাদিগের সহিত এখন আর কোন কথাই কহিব না।

কল্য প্রাতঃকালে প্রহরীগণ যখন উঁহাদিগকে থানা ইতে ঘর-পোড়া লোক।

বাহির করিয়া লইয়া যাইবে, সেই সময় সুযোগমত পথের মধ্যে উঁহাদিগের সহিত কথা কহিলেই হইতে পারিবে।

মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া হোসেন আপনার ভৃত্যদ্বয়ের সহিত সেই থানার ভিতর এক স্থানে শয়ন করিলেন।

সেই সময় থানায় যে কর্ম্মচারী উপস্থিত ছিলেন, তাহার হাতের কার্য সম্পন্ন করিয়া, একবার তিনি তাহার আফিস হইতে বাহির হইয়া আসামীদ্বয়কে দেখিবার নিমিত্ত সেই হাজত-গৃহের নিকট গমন করিলেন। সেই হাজত-গৃহের চাবি যে প্রহরীর নিকট ছিল, কর্ম্মচারীর আদেশমত সে সেই হাজত-গৃহ খুলিয়া দিল। কর্ম্মচারী হাজত-গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলেন। আসামীদ্বয়ের একটু শুভদৃষ্ট বলিতে হইবে যে, সেই দিবস সেই হাজত-গৃহের ভিতর সেই দুইটী আসামী ভিন্ন আর কোন আসামী ছিল না।

কর্ম্মচারী হাজত-গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নাম কি?

গোফুর। আমার নাম গোফুর খাঁ।

কর্ম্মচারী। তোমার কত দিবসের নিমিত্ত কারাদণ্ডের হুকুম হইয়াছে?

গোফুর। আমার কারাদণ্ডের আদেশ হয় নাই, জীবন দণ্ডের আদেশ হইয়াছে।

কর্ম্মচারী। (ওসমানের প্রতি) আর তোমার?

ওসমান। আমারও তাহাই।

কর্ম্মচারী। তোমরা কি করিয়াছিলে, হত্যা করিয়াছিলে কি?

ওসমান। হত্যা না করিলে আর আমাদের জীবনদণ্ডের আদেশ হইবে কেন?

কর্ম্মচারী। তোমাদিগকে এই স্থানে রাত্রিযাপন করিতে হইবে। ওই কম্বল লইয়া তোমরা অনায়াসে তাহার উপর শয়ন করিতে পার।

এই বলিয়া কর্ম্মচারী সেই হাজত-গৃহ হইতে বাহির হইলেন। প্রহরী সেই গৃহ পুনরায় তালাবদ্ধ করিয়া দিল।

বাহিরে আসিয়াই কর্ম্মচারী দেখিতে পাইলেন, একটু দুরে তিনজন লোক শয়ন করিয়া আছে। উঁহাদিগকে দেখিয়া তিনি তাহাদিগের নিকট গমন করিলেন ও কহিলেন, তোমরা কে এখানে শয়ন করিয়া আছ?

হোসেন। আমরা।

কর্ম্মচারী। আমরা কে?

হোসেন। আমি ও আমার দুইজন পরিচারক।

কর্ম্মচারী। তুমি কে?

হোসেন। আমার নাম হোসেন।

কৰ্ম্মচারী। তোমরা কোথায় থাক?

হোসেন। আমাদিগের বাসস্থান এখানে নহে।

কর্ম্মচারী। তবে তোমরা এখানে কি নিমিত্ত আসিয়াছ?

হোসেন। আমরা ওই আসামীদিগের সহিত আসিয়াছি।

কর্ম্মচারী। কোন্ আসামী?

হোসেন। যাঁহারা হাজতে আছেন।

কর্ম্মচারী। তাই বল না কেন, তোমরা প্রহরী; সেই আসামীদ্বয়কে এখানে আনিয়াছ।

হোসেন। না মহাশয়! আমরা প্রহরী নহি। প্রহরীগণ। আসামীদ্বয়কে লইয়া আসিয়াছে, আমরা তাহাদিগের সঙ্গে আসিয়াছি মাত্র।

কর্ম্মচারী। তোমাদিগের সঙ্গে আসিবার প্রয়োজন?

হোসেন। সঙ্গে আসিবার প্রয়োজন আছে বলিয়াই আসিয়াছি। উঁহারা আমাদিগের মনিব।

কর্ম্মচারী। কি! আসামীদ্বয় তোমাদিগের মনিব?

হোসেন। হাঁ মহাশয়!

কর্ম্মচারী। তোমার মনিবদ্বয় চরমদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছে, এরূপ অবস্থায় তাহাদিগের সহিত তোমাদিগকে একত্র গমন করিতে কে আদেশ প্রদান করিয়াছে? কাহার হুকুমে তোমরা তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছ?

হোসেন। কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেবের আদেশমত আমরা ইহাদিগের সহিত গমন করিতেছি।

কর্ম্মচারী। কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেব আসামীদ্বয়ের সমভি ব্যাহারে তোমাদিগকে গমন করিতে যে আদেশ করিয়াছেন, তাহা আসামীদ্বয়ের সমভিব্যাহারী প্রহরীগণ অবগত আছে কি?

হোসেন। তাঁহারা অবগত আছে। তদ্ব্যতীত ইহাদিগকে লইয়া যাইবার নিমিত্ত যে কোন অর্থের প্রয়োজন হইতেছে, তাহা আমাকে প্রদান করিতে বলিয়া দিয়াছেন, আমিও তাহা দিয়া আসিতেছি।

কর্ম্মচারী। কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেব আসামীদ্বয়ের সহিত গমন করিবার আদেশ দিয়াছেন সত্য; কিন্তু থানার ভিতর রাত্রিকালে শুইয়া থাকিবার নিমিত্ত আদেশ দিয়াছেন কি?

হোসেন। এরূপ কথা কিছু বিশেষ করিয়া বলেন নাই।

কর্ম্মচারী। এরূপ অবস্থায় আমি আপনাদিগকে এই স্থানে শয়ন করিয়া থাকিবার নিমিত্ত কোন প্রকারেই আদেশ

প্রদান করিতে পারি না।

হোসেন। আমাদিগের অপরাধ?

কর্ম্মচারী। তোমাদিগের অপরাধ না থাকিলেও তোমরা যখন খুনী আসামীর সঙ্গের লোক, তখন তোমরা এক রূপ অপরাধী।

হোসেন। স্বীকার করিলাম আমরা অপরাধী। তাহাতেই বা ক্ষতি কি?

কর্ম্মচারী। তোমাদিগের মনে কি আছে, তাহা তোমরাই বলিতে পার। রাত্রিকালে সকলে শয়ন করিলে যদি কোনরূপে তোমর আসামীদ্বয়কে পলাইবার উপায় করিয়া দেও, তাহা হইলে কি হইবে বল দেখি?

হোসেন। না মহাশয়! আমরা সেরূপ চেষ্টা কখনই করিব না। এরূপ কথা আমাদিগের মনে এ পর্যন্ত উদয় হয় নাই। আর যদি এখন আমাদিগের সেইরূপ ইচ্ছাই হয়, তাহা হইলে আমাদিগের সে ক্ষমতা কোথায়?

কর্ম্মচারী। সে যাহা হউক, রাত্রিকালে তোমাদিগকে আমি কোনরূপেই থানার ভিতর থাকিতে দিব না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

হোসেনের সহিত থানার সেই উপস্থিত কর্ম্মচারীর এইরূপ কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময়ে থানার দারোগা, যিনি অপর কাৰ্য্য উপলক্ষে স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলেন, তিনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও কর্ম্মচারীকে কহিলেন, কি হে। কিসের গোলযোগ?

কর্ম্মচারী। গোলযোগ অপর কিছুই নহে। খুনী মোক দমায় প্রাণদণ্ডের আদেশ হইয়াছে, এইরূপ দুইটী আসামী এখানে আসিয়াছে। আমি তাহাদিগকে হাজত-গৃহে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছি। আসামীদ্বয়ের সমভিব্যাহারে প্রহরীগণ ব্যতীত অপর আরও তিনজন লোক আসিয়াছে। তাঁহারা কে, এবং কি চরিত্রের লোক, তাহা আমরা অবগত নহি। কিন্তু তাহার এই থানার ভিতর রাত্রিবাস করিতে চাহে। তাই আমি তাহাদিগকে এখান হইতে তাড়াইয়া দিতেছি। অপর গোলযোগ আর কিছুই নহে।

দারোগা। অপর যে সকল লোক আসিয়াছে, তাঁহারা কোথায়?

কর্ম্মচারী। তাঁহারা এই শয়ন করিয়া আছে।

দারোগা। উঁহাদিগকে আমার নিকট ডাক দেখি।

দারোগা সাহেবের এই কথা শুনিবামাত্র হোসেন এবং তাহার সমভিব্যাহারী দুই ব্যক্তি আসিয়া দারোগা সাহেবের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল। তাহাদিগকে দেখিয়াই দারোগা সাহেব কহিলেন, আপনি হোসেন মিঞা মহেন?

হোসেন। আজ্ঞা, আমি হোসেন।

দারোগা। আপনি এখানে কেন?

হোসেন। মনিবদিগের সঙ্গে।

দারোগা। মনিবদিগের সঙ্গে? আপনার মনিব ত একজন ছিলেন, আপনি গোফুর খাঁর নিকট কৰ্ম্ম করিতেন না?

হোসেন। আজ্ঞা হাঁ, এখনও আমি তাহার কর্ম্ম করিতেছি।

দারোগা। তবে মনিবগণ পাইলেন কোথায়?

হোসেন। গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্র।

দারোগা। তাহার কোথায়?

হোসেন। তাঁহারা আপনার হাজতেই আছেন।

দারোগা। তাঁহারা একটী মোকদ্দমায় পড়িয়াছেন, এ কথা আমি পূর্বেই শুনিয়াছিলাম। তাহাদিগের সেই মোক দ্দমার বিচার কি শেষ হইয়া গিয়াছে?

হোসেন। আজ্ঞা হাঁ, জজসাহেবের বিচার শেষ হইয়া গিয়াছে।

দারোগা। বিচারে কি হইয়াছে?

হোসেন। তা আমাদিগের সর্বনাশ হইয়াছে। বিচারে জজসাহেব উভয়কেই চরমদণ্ডে দণ্ডিত হইবার আদেশ প্রদান করিয়াছেন।

দারোগা। কি সর্বনাশ! উভয়কেই ফাঁসির আদেশ দিয়া ছেন?তাঁহারাই কি এখন আমার এই থানার হাজতে আছেন?

হোসেন। হাঁ মহাশয়! তাহাদিগের সহিতই আমরা আসিয়াছি।

দারোগা। আচ্ছা, আপনারা থানাতেই থাকুন, আপনা, দিগের এখান হইতে গমন করিবার প্রয়োজন নাই।

হোসেন। মহাশয়! আমাকে মাপ করিবেন। আপনি দেখিতেছি, আমাদিগের সমস্ত অবস্থা অবগত আছেন; কিন্তু জামি এ পর্যন্ত চিনিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

দারোগা। আমি আমার পোষাক-আদি পরিবর্তন করিয়া এখনই আসিতেছি, আমাকে ভাল করিয়া দেখিলেই চিনিতে পারিবেন। আপনাদিগের জমিদারীর ভিতর গাজিনগর নামক একখানি গ্রাম আছে না?

হোসেন। আছে।

দারোগা। সেই গ্রামের কতকগুলি জমী লইয়া অপর একজন জমিদারের যে সময় বিবাদ হয়, সেই সময় আমাকে দেখিয়াছেন।

এই বলিয়া দারোগা সাহেব আপনার পোষাক পরিচ্ছদ পরিবর্তন করিবার মানসে আপনার গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলেন।

দারোগা সাহেব সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলে পর, দারোগা সাহেব সম্বন্ধীয় সমস্ত কথা হোসেনের মনে হইল। তখন মনে হইল, যে সময় গাজিনগর লইয়া গোফুর খাঁর সহিত অপর একজন জমিদারের বিবাদ উপস্থিত হয়, এবং পরিশেষে উভয় পক্ষে ভয়ানক দাঙ্গা হইয়া যায়, সেই সময় ইনিই সেই স্থানের দারোগা ছিলেন। দাঙ্গার সংবাদ ইঁহার নিকট প্রেরিত হইলে, ইনিই আসিয়া তাহার অনুসন্ধান করেন। সেই সময় ইনি গোফুর খাঁর বাড়ীতে গিয়াও কয় দিবসকাল অতিবাহিত করেন। ইনি সেই সময় গোফুর খাঁর নিকট হইতে সহস্র মুদ্রা গ্রহণ করিয়াছিলেন। সে সময় ইহারই সাহায্যে সেই মোকদ্দমায় গোফুর খাঁ জয়লাভ করেন, ও গাজিনগর গ্রাম সেই সময় হইতে সুচারুরূপে শাসন করিতে প্রবৃত্ত হন। তাহার পর হইতে এ পর্যন্ত সেই গ্রাম লইয়া আর কোনরূপ গোলযোগ ঘটে নাই। এই সময় হইতে দারোগা সাহেব সর্বদা গোফুরের নিকট গমন করি তেন, এবং আবশ্যক হইলে দুই একদিবস তথায় অবস্থানও করিতেন। কিন্তু যে পর্যন্ত তিনি সেই থানা হইতে বদলি হইয়া গিয়াছেন, সেই পর্যন্ত তিনি আর গোফুর খাঁর নিকট গমন করেন নাই, বা তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে সমর্থ হন নাই। গাজিনগর উপলক্ষে যে সময় দারোগা সাহেবের সহিত গোফুর খাঁর আলাপ পরিচয় হয়, হোসেনও সেই সময় ইতে তাঁহার নিকট পরিচিত। ইহার পর অনেক দিবস পর্যন্ত হোসেনের সহিত তাহার সাক্ষাৎ না হওয়ায়, প্রথমেই হোসেন দারোগা সাহেবকে চিনিয়া উঠিতে পারেন নাই। সেই কারণে তিনি মনে মনে একটু লজ্জিত হইলেন। যাহা হউক, তখন তিনি মনে করিলেন, থানার বাহিরে গিয়া আর তাহাকে রাত্রিযাপন করিতে হইবে না।

হোসেন সেই স্থানে বসিয়া বসিয়া দারোগা সাহেব সম্বন্ধীয় পুরাতন কথা সকল মনে করিতেছেন, এমন সময়ে একজন প্রহরী আসিয়া কহিল, দারোগা সাহেব আপনাকে সেলাম দিয়াছেন।

হোসেন। দারোগা সাহেব কোথায়?

প্রহরী। তিনি তাঁহার বাসায়।

হোসেন। তাহা হইলে আমাকে এখন কোথায় যাইতে হইবে? কোথায় গমন করিলে তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইবে?

প্রহরী। তাঁহার বাসায় আপনাকে ডাকিয়াছেন, সেই স্থানে গমন করিলেই, তাহার সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইবে।

হোসেন। কোন্ সময় আমাকে সেই স্থানে গমন করিতে হইবে?

প্রহরী। এখনই। আপনি আমার সহিত আসুন, তিনি হায় বাহিরের গৃহে আপনার প্রতীক্ষায় বসিয়া আছেন।

হোসেন। চল।

এই বলিয়া : হোসেন সেই স্থান হইতে গাত্রোখান করিয়া সেই প্রহরীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। যাইবার সময় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি এই থানায় কতদিবস পর্যন্ত আছ?

প্রহরী। প্রায় আট নয় বৎসর।

হোসেন। দারোগা সাহেব এখানে কতদিবস আসিয়াছেন? প্রহরী। এক বৎসরের কম হইবে না, বরং কিছু বেশী হইবে।

হোসেন। তোমাদিগের দারোগা সাহেব কেমন লোক?

প্রহরী। খুব ভাল লোক; গরিবের মা-রাপ। আমরা সবিশেষ সুখ-সচ্ছনে তাহার নিকট কৰ্ম্ম করিতেছি।

হোসেন। দারোগা সাহেবের বাসায় তাহার পরিবারগণ কেহ আছেন, কি তিনি একাকীই এই স্থানে বাস করিতেছেন?

প্রহরী। তাঁহার পরিবার ও পুত্র কন্যাগণ এই স্থানেই ছিলেন; অদ্য আন্দাজ একমাস হইল, কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে তিনি তাঁহাদিগকে আপনার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিয়াছেন। এখন কেহই এখানে নাই, কেবল দারোগা সাহেব একাকী এখানে আছেন।

প্রহরীর সহিত এইরূপ নানাপ্রকার কথা কহিতে কহিতে হোসেন দারোগা সাহেবের বাসায় গিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, দারোগা সাহেব একাকী হোসেনের অপেক্ষায় তাঁহার বাহিরের গৃহে বসিয়া রহিয়াছেন।

এইরূপ অবস্থায় দারোগা সাহেবকে একাকী বসিয়া থাকিতে দেখিয়া, হোসেন একটু বিস্মিত হইলেন। কারণ, ইতিপূর্বে অনেকবার তিনি দারোগা সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন, কিন্তু কখনই তাঁহাকে একাকী দেখিতে পান নাই। অপর কেহ উপস্থিত না থাকিলেও, অভাবপক্ষে দুই চারিজন পরিচারকও সর্বদা তাহার নিকট থাকি।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

দারোগা সাহেবের নিকট হোসেন গমন করিলে, তিনি হোসেনকে সেই স্থানে বসিতে বলিলেন। হোসেন তাহার সন্নিকটবর্তী এক স্থানে উপবেশন করিলে, তিনি কহিলেন,

আপনি আমাকে চিনিতে পারেন নাই?

হোসেন। আপনাকে আর চিনিতে পারি না, খুব চিনিতে পারিয়াছি। কিন্তু প্রথমতঃ আপনাকে চিনিতে পারি নাই বলিয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি, মাফ করিবেন।

দামোগা। আপনার মনিব ও মনিব-পুত্র যে একটা মোক জমায় পড়িয়াছেন, এ কথা আমি পূৰ্বে শুনিয়াছিলাম; কিন্তু তাঁহাদিগের যে এই অবস্থা ঘটিবে, তাহা আমি একবারের নিমিত্তও মনে করি নাই।

হোসেন। মনে না করিবারই কথা। ইহারা যে একবারে চরমদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন, তাহা আমরা একবারের নিমিত্তও মনে করি নাই, বা আমাদিগের উকীল কৌশলীগণও কখন এরূপ ভাবেন নাই।

দারোগা। আপনি বহুদর্শী ও একজন পুরাতন কর্ম্মচারী। জমিদারী-বুদ্ধি আপনার যথেষ্ট আছে। প্রথমতঃ এই মোক দমার নিমিত্ত যদি একটু চেষ্টা করিতেন, তাহা হইলে বোধ হয়, এরূপ অবস্থা কখনই ঘটিত না।

হোসেন। আমার সাধ্যমত চেষ্টা করিতে কিছুমাত্র ত্রুটি করি নাই; কিন্তু সেই সকল চেষ্টাতেও কোন ফলই দর্শিল না।

দারোগা। প্রথমে কি চেষ্টা করিয়াছিলেন। অনুসন্ধান কারী দারোগার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন কি?

হোসেন। এই মোক প্রথমে যে সময় রুজু হয়, সেই সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না; জমিদারীর কাৰ্য্য উপলক্ষে মফঃস্বলে গমন করিয়াছিলাম। মোকমার সংবাদ যেমন আমি শুনিতে পাইলাম, অমনি আমি চলিয়া আসিলাম।

আসিয়াই অনুসন্ধানকারী দারোগাকে কিঞ্চিৎ প্রণামী দিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। সেই সাক্ষাতের ফল আপনি এই দেখিতেই পাইতেছেন।

দারোগা। প্রণামীর পরিমাণটা, বোধ হয়, কম হইয়াছিল; তাই তাহার দ্বারা সবিশেষরূপ উপকার প্রাপ্ত হন নাই।

হোসেন। তাহার পক্ষে সামান্য হইতে পারে, কিন্তু আমার পক্ষে কম নহে। আমি তাঁহাকে সহস্র মুদ্রা প্রদান করিয়াছিলাম।

দারোগা। তাহা হইলে তিনি কোনরূপ তোমাদিগের সাহায্য করিলেন না কেন?

হোসেন। সে অনেক কথা। এই মোকদ্দমা যেরূপ ভাবে সাজান হইয়াছিল, প্রকৃত পক্ষে তাহার কিছুই ঘটে নাই, সমস্তই মিথ্যা।

দারোগা। দারোগা তোমাদিগের নিকট হইতে সহস্র মুদ্রা গ্রহণ করিলেন, এবং তোমাদিগের উপরই মিথ্যা মোকদ্দমা সাজাইলেন, এ কথা শুনিতে কেমন কেমন বোধ হয়।

হোসেন। তাহার কারণ আছে।

দারোগা। এমন কি কারণ হইতে পারে?

হোসেন। লজ্জার কথা বলিব কি! দারোগা সাহেব কোথা হইতে একটী সুরূপা স্ত্রীলোককে বাহির করিয়া আনিয়াছিলেন, এবং তাহার সমস্ত খরচ-পত্ৰ দিয়া একখানি বাড়ীতে তাহাকে রাখিয়াছিলেন। আমার মনিব-পুত্র ওসমানের চরিত্র নিতান্ত মন্দ হইয়া পড়ে। এমন কি, কোন সুশ্রী রমণীর প্রতি লোভ হইলে তাহাকে তাহা হইতে নিবৃত্ত করিবার ক্ষমতা কাহারও ছিল না। এই নিমিত্তই প্রজাদের মধ্যে সকলেই তাহার শক্ত হইয়া পড়ে। যে রমণীকে দারোগা সাহেব রাখিয়াছিলেন, সেই রমণীর কথা ওসমান কিরূপে জানিতে পারে। পরিশেষে কোনরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া তাহাকে আয়ত্ব করে। দারোগা সাহেব এই কথা জানিতে পারিয়া, প্রথমতঃ ওমানের নিকট সংবাদ পাঠাইয়া সেই রমণীকে যথাস্থানে পুনরায় রাখিয়া আসিতে কহেন; কিন্তু ওসমান তাহার এই অনুরোধে কর্ণপাতও করেন না। তখন দারোগা সাহেব তাহার উপর সবিশেষরূপ অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহার চরিত্রের কথা তাহার পিতা গোফুর খাঁর নিকট গিয়া বলেন। গোফুর খাঁও পুত্র-স্নেহ বশতঃ তাহার প্রতিবিধানের কোনরূপ চেষ্টাও করেন না। কাজেই দারোগা সাহেব উভয়ের প্রতি অন্তরের সহিত চটিয়া যান, এবং কিরূপে উভয়কেই সবিশেষরূপে বিপদাপন্ন করিতে সমর্থ হইবেন, কেবল তাহারই ছিদ্র অনুসন্ধান করিতে থাকেন। সেই সময় একটা সুযোেগ উপস্থিত হয়। হেদায়েৎ নামক এক ব্যক্তি আসিয়া নালিশ করে যে, সে তাহার যুবতী কন্যাকে পাইতেছে না, এবং শুনিতেছে যে, ওসমান তাহার কন্যাকে লইয়া গিয়াছে। এই সংবাদ পাইয়া দারোগা সাহেব তিলকে তাল করিয়া ফেলি লেন। পিতা-পুত্র উভয়কেই জড়াইয়া তাহার নিকট হইতে এজাহার লইলেন, ও যেরূপ ভাবে সাক্ষি-সাবুদের সংগ্রহ করিবার প্রয়োজন, তাহার সমস্তই ঠিক করিয়া আপনার প্রতিহিংসা সাধুন পূর্বক মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিলেন। লাভের মধ্যে আমাদিগের আরও সহস্র মুদ্রা নিরর্থক নষ্ট হইল।

দারোগা। এতদুর ঘটিয়াছিল, এ কথা আমাকে পূর্বে বলেন নাই কেন? অনুসন্ধানকারী দারোগা সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া কোন না কোনরূপে আমি ইহার প্রতিবিধানের চেষ্টা করিতাম। আপনার কি মনে নাই যে, অনেক সময় গোফুর খাঁর নিকট আমি অনেক উপকার প্রাপ্ত হইয়াছি।

হোসেন। আপনার কথা সেই সময় আমাদিগের মনে এক বারেই পড়ে নাই। বিশেষতঃ মনে পড়িলেই বা কি হইত? আপনি যে এই থানায় আছেন, তাহা আমরা কেহ অবগত ছিলাম না। আপনি গোফুর খাঁর নিকট অনেক সময় উপকার পাইয়াছেন বলিতেছেন বটে; কিন্তু এখন আপনার নিকটেই বা কিরূপে উপকারের প্রত্যাশা করা যাইতে পারে?

দারোগা। আপনার এ কথার অর্থ কি?

হোসেন। অর্থ যে কি, তাহা আর আপনি বুঝিতে পারিতেছেন না? আজ কালকার যেরূপ নিয়ম হইয়া পড়ি তেছে, তাহা ত আপনি বেশ জানেন। আপনি যাহার উপকার করিবেন, সে কিসে সেই উপকারকারীর অনিষ্ট করিতে সমর্থ হইবে, তাহারই চেষ্টা সর্বদা করিয়া থাকে।

দারোগা। আপনার কি বিশ্বাস যে, জগতের সকলেই সেই চরিত্রের লোক?

হোসেন। সকলে না হইতে পারেন; কিন্তু পনর আনা লোকের চরিত্র যে সেইরূপ, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

দারোগা। আমি যদি পূৰ্ব্বে ইহার অণুমাত্রও জানিতে পারিতাম, তাহা হইলে বোধ হয়, আমি সবিশেষরূপে আপনাদিগের উপকার করিতে পারিতাম।

হোসেন। যাহার সময় উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে, তাহার আর উপায় নাই! এখন বলুন দেখি, আপীলে কোনরূপ ফল পাইবার উপায় আছে কি?

দারোগা। আমার বোধ হয়, আপীলে এ মোকদ্দমার কিছু হইবে না।

হোসেন। এই মোকদ্দমার কাগজ-পত্ৰ ত আপনি কিছুই দেখেন নাই, তবে আপনি কিরূপে বলিতেছেন যে, আপীলে কোনরূপ ফল পাওয়া যাইবে না?

দারোগা। কাগজ-পত্র না দেখিলেও আমার জানিবার বিশেষ কারণ আছে। যে জজসাহেব এই মোক দমার বিচার করিয়াছেন, তাঁহাকে আমি অনেক দিবস হইতে উত্তমরূপে অবগত আছি। তাঁহার মত বুদ্ধিমান কর্ম্মচারী অতি অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়। তাহার উপর মোকদ্দমার রায় লিখিবার ক্ষমতা তাঁহার যেরূপ আছে, সেরূপ ক্ষমত। এই প্রদেশীয় বর্তমান কর্ম্মচারীগণের মধ্যে আর কাহারও আছে কি না সন্দেহ। এ পর্যন্ত তাহার বিচারিত যত মোকদ্দমার আপীল হইয়াছে, হাইকোর্ট হইতে তাহার একটীও মোকদ্দমার রায় পরিবর্তিত হয় নাই। বরং তাহার রায় দেখিয়া, সকলেই তাহার প্রশংসা করিয়াছেন।

হোসেন। যে আশায় আমি উঁহাদিগকে এতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত রাখিয়াছি, তবে কি আমাদিগের সে আশা নাই?

দারোগা। আপীলের আশা ছাড়িয়া দিয়া যদি আর কোনরূপ উপায় থাকে, তাহার চেষ্টা দেখুন। আপীলে কিছু হইবে না।

হোসেন। আর উপায় কি দেখিব? এমন উপায় আর কি হইতে পারে, যাহাতে উঁহাদিগের উভয়ের প্রাণরক্ষা হয়?

দারোগা। কোনরূপ যোগাড়যন্ত্র করিয়া যদি লাটসাহেবের নিকট হইতে উঁহাদিগের জীবন-ভিক্ষা লইতে পারেন, তাহা হইলেই হইতে পারে।

হোসেন। সেরূপ যোগাড় কিরূপে হইতে পারে? সে ক্ষমতা আমাদিগের নাই।

দারোগা। কেন থাকিবে না, যাহার প্রচুর অর্থ আছে, তাহার সমস্ত ক্ষমতাই আছে। তবে যোগাড় চাই, পরিশ্রম চাই, তাহার উপর অর্থ ব্যয় করিবার ইচ্ছা চাই।

হোসেন। আমাদিগের যতদূর সম্ভব, অর্থ সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছি; কিন্তু যোগাড় করিবার ক্ষমতা আমাদিগের নাই। গোফুর খাঁর উপর যদি আপনার এতদূর দয়া হইয়াছে, তাহা হইলে অনুগ্ৰহ করিয়া বলিয়া দিন, কিরূপ ভাবে যোগাড় করিলে, বা কাহার সাহায্য গ্রহণ করিলে, আমার মনিবদ্বয়ের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ হইব।

দারোগা। এখন আপনি উঁহাদিগের জীবনের নিমিত্ত কত অর্থ ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন?

হোসেন। আমাদিগের যতদুর সাধ্য, তাহা অপেক্ষা আরও অধিক অর্থ ব্যয় করিতে আমি প্রস্তুত আছি।

দারোগা। আপনাদিগের কি ক্ষমতা আছে, তাহা আমি জানি না। কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করিতে পারিবেন, তাহা আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলুন, তাহা হইলে আমি বুঝিতে পারি যে, উঁহাদিগের জীবন রক্ষা হইতে পারিবে কি মা! তাহা হইলে আমার যেরূপ বুদ্ধি, সেইরূপ একটা সামান্য উপায় বলিয়া দিব, বা আবশ্যক হয়, আমি নিজে উহাতে হস্তক্ষেপ করিব।

হোসেন। দেখুন দারোগা সাহেব! জীবনের অপেক্ষা অর্থ কিছু অধিক মুল্যবান্ নহে। যদি ইহারা জীবন প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে আমার বিশ্বাস, উঁহাদিগের নিকট যাহা কিছু সঞ্চিত অর্থ আছে, এবং চেষ্টা করিয়া আরও যতদূর অর্থের সাহায্য হইতে পারে, তাহার সমস্তই উঁহারা ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন।

দারোগা। ওরূপ গোলযোগের কথা আমি বুঝি না। আমাকে পরিষ্কার করিয়া বলুন দেখি, পাঁচ লক্ষ টাকা উঁহারা ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন কি?

হোসেন। পাঁচ লক্ষ টাকা। এখন ব্যয় করিবার ক্ষমতা উঁহাদিগের নাই।

দারোগা। তবে কয় লক্ষ টাকা ব্যয় করিবার ক্ষমতা উঁহাদিগের আছে?

হোসেন। উঁহাদিগের সহিত পরামর্শ না করিয়া, আমি এ কথার ঠিক উত্তর দিতে পারিতেছি না। আমার বোধ হয়, যদি উঁহাদিলের জীবন রক্ষা করিতে পারেন, তাহা হইলে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত উঁহারা ব্যয় করিতে সমর্থ হইবেন। তাহার অধিক যে পারিবেন, তাহা আমার বোধ হয় না।  দারোগা। আচ্ছা, আপনি গমন করুন, এবং হাজত গৃহের বাহির হইতে উঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া আসুন; দেখুন, উঁহারা কি বলেন। দুই লক্ষ মুদ্রার কম এ কাৰ্য্য কখনই সম্পন্ন হইতে পারে না। যদি উঁহারা আমার প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহা হইলে আপনি সময় নষ্ট না করিয়া, শী আমার নিকট আগমন করিবেন। আমি আপনার অপেক্ষায় এই স্থানে বসিয়া রহিলাম।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া হোসেন সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় মনে মনে ভাবিতে লাগি লেন, অর্থ ব্যয় করিয়া দারোগা সাহেব কিরূপে ইহাদিগের প্রাণ রক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন? আপীল করিলে যখন বলিতেছেন, কিছুই হইবে না, লাট সাহেবের নিকট কোন রূপ চেষ্টা করিবার ক্ষমতা যখন আমাদিগের বা দারোগা সাহেবের নাই, তখন কিরূপে ইনি ইহাদিগের জীবন বাঁচাইতে সমর্থ হইবেন? তবে কি ইহারও ইচ্ছা, অনুসন্ধানকারী দারোগা সাহেবের সদৃশ আমাদিগের নিকট হইতে ফঁাকি দিয়া কিছু অর্থ গ্রহণ করা? অনুসন্ধানকারী দারোগা সাহেব কেবলমাত্র সহস্র মুদ্রা গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু ইদার, দেখিতেছি, আশা অতিরিক্ত। ইতিপূর্বে ইনি আমাদিগকে অনেক মোকদ্দমায় সাহায্য করিয়াছেন ও আমাদিগের নিকট হইতে সময় সময় অনেক অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু এ পর্যন্তু কখনও বিশ্বাসঘাতকের কার্য করেন নাই। যখন যাহা করিবেন বলিয়াছেন, কার্যে ঠিক তাহাই করিয়াছেন। এরূপ অবস্থায় ইহার কথায় একবারে অবিশ্বাসও করিতে পারি না। আর অনেক টাকা দিয়া একবারেই বা বিশ্বাস করি কি প্রকারে? এতদিবস সভাবে কাৰ্য্য করিয়াছেন বলিয়াই যে, এখন অসভাবে কাৰ্য্য না করিবেন, তাহারই বা প্রমাণ কি? গোফুর ও ওসমান উভয়েই জীবন পরিত্যাগ করিতে বসিয়াছেন, তাহাদিগের নিকট হইতে শেষ অবস্থায় এইরূপ অর্থ গ্রহণ করিলে, উহার প্রতিবিধানের আর কোন উপায়ও থাকিবে না। উঁহাদিগের উভয়েরই জীবন শেষ হইলে উঁহাদিগের পরিবারবর্গ যে অর্থ সাহায্যে অনায়াসেই জীবনযাপন করিতে সমর্থ হইতেন, সেই অর্থও কি অতঃপর এইরূপে নষ্ট করিব? বড়ই গোলযোগের কথা।

মনে মনে এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে যে স্থানে গোফুর খাঁ ও ওসমান খ আবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন, সেই স্থানে গমন করিলেন; কিন্তু সেই হাজত-গৃহের আসামীদ্বয়কে যে ব্যক্তি পাহারা দিতেছিল, সে তাহাকে উঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে, বা কথা কহিতে দিল না। তখন হোসেন অনন্যোপায় হইয়া পুনরায় দারোগা সাহেবের নিকট আগমন করিলেন ও তাঁহাকে কহিলেন, যাহার পাহারা আছে, সেই প্রহরী আমার মনিবদ্বয়ের সহিত আমাকে কোনরূপে কথা কহিতে, বা তাহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে কোনরূপে দিল না।

হোসেনের এই কথা শুনিয়া দারোগা সাহেব সেই প্রহরীকে জাকাইলেন ও তাহাকে বলিয়া দিলেন, আসামীদ্বয়ের সহিত এই ব্যক্তিকে সাক্ষাৎ করিতে দেও, এবং বাহির হইতে যদি কোন কথা উঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতে চাহে, তাহাও করিতে দেও; কিন্তু ইহাকে ফটকের ভিতর প্রবেশ করিতে দিও না।

প্রহরী দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালন করিল। হোসেন হাজতের নিকট গমন করিলে, সে হাজতের দরজা খুলিয়া দিল; কিন্তু হোসেনকে তাহার ভিতর প্রবেশ করিতে দিল না। নিজেও সেই স্থানে দণ্ডায়মান রহিল।

উভয়কেই সম্বোধন করিয়া হোসেন কহিল, আমি এখন একটা কোন সবিশেষ প্রয়োজনের নিমিত্ত আপনাদিগের নিকট আগমন করিয়াছি, সবিশেষরূপে মনঃস্থির করিয়া কথাগুলি শুনিতে হইবে।

পূর্বে যে একটী মুসলমান দারোগা অনেক সময় আমা দিগের উপকার করিয়াছিলেন, এবং অনেক সময় যিনি আমাদিগের বাড়ীতে গমন করিয়া সময় সময় দুই তিনদিবস পর্যন্ত অতিবাহিত করিতেন, তাহাকে এখন আপনাদের মনে হয় কি?

গোফুর। তাহাকে বেশ মনে হয়। তিনি অতি ভদ্র লোক। যখন যাহা করিবেন বলিয়াছেন, তখনই ঠিক তাহাই করিয়াছেন। তাহার কথা এ সময়ে জিজ্ঞাসা করিতেছ কেন?

হোসেন। যে থানায় এখন আপনারা আবদ্ধ, তিনি সেই থানার দারোগা।

গোফুর। তিনি এই থানার দারোগা! তাহার সহিত এই শেষ সময় একবার সাক্ষাৎ হয় না কি?

হোসেন। আমার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছে। আপনাদিগের সম্বন্ধে অনেক কথা তিনি নিজেই উল্লেখ করিয়া, অনেক দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন, এবং অনেক কথা আমাকে বলিয়াছেন। তাহারই কথা মত এখন আমি আপনাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছি।

গোফুর। তিনি কি বলেন?

হোসেন। তিনি বলেন, উপযুক্ত পরিমিত অর্থ ব্যয় করিতে পারিলে, তিনি আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে পারেন।

গোফুর। কিরূপে? আপীল করিয়া?

হোসেন। না। তিনি বলেন, আপীলে কিছু হইবে না। তবে লাট সাহেবের নিকট কোনরূপ চেষ্টা করিতে পারিলে, যদি তিনি দয়া করেন, তাহা হইলেই জীবনের পুনরায় আশা করা যাইতে পারে।

গোফুর। টাকায় লাট সাহেবের নিকট কোনরূপ চেষ্টা হইবে না, অপর কোন উপায়ও আমাদিগের নাই।

 হোসেন। সে কথা আমি পূৰ্বেই তাহাকে বলিয়াছি। তাহা শুনিয়াও তিনি বলেন, যদি অধিক পরিমাণে টাকা ব্যয় করিতে সমর্থ হন, তাহা হইলে তিনি জীবনদানের উপায় করিবার চেষ্টা করেন।

গোফুর। কত টাকার আবশ্যক, তাহা তিনি কিছু বলিয়াছেন কি?

হোসেন। প্রথম বলিয়াছিলেন, পাঁচ লক্ষ টাকার আবশ্যক; কিন্তু আমি যখন তাঁহাকে কহিলাম, এত টাকা কোনরূপেই সংগ্রহ হইবার সম্ভাবনা নাই। তখন তিনি কহিলেন, দুই লক্ষ টাকার কম এ কাৰ্য কোনরূপেই হইতে পারে না।

গোফুর। কিরূপ উপায়ে তিনি আমাদিগের প্রাণ বাঁচা ইতে সমর্থ হইবেন, তাহা কিছু বলিয়াছেন কি?

হোসেন। কি উপায়ে বাঁচাইবেন, তাহার কোন কথা বলেন নাই। কেবল বলিয়াছেন, টাকার যোগাড় করিতে পারিবে কি না দেখ।

গোফুর। দেখ হোসেন! আমার জীবনের আশা নাই, বাঁচিবারও আর সাধ নাই। তবে যদি ওসমানকে কোন রূপে বাঁচাইতে পার, তাহার চেষ্টা কর। আমার জন্য কোনরূপ চেষ্টা করিবার প্রয়োজন নাই।

হোসেন। তবে আমি দুই লক্ষ টাকা দিতে স্বীকার করিব?

গোফুর। পুল-স্নেহ যে কি, তাহা তুমি যে না জান, তাহা নহে। আমার পুত্রের জীবনের নিকট দুই লক্ষ টাকা অতি অল্প।

হোসেন। এত টাকা এখন আমি সংগ্রহ করি কি প্রকারে? এ পর্যন্ত যোগাড় করিয়া অনেক কষ্টে প্রায় দুই লক্ষ টাকা সংগ্রহ করিয়াছিলাম, মোকদ্দমায় এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় হইয়া গিয়াছে, অবশিষ্ট এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা আমার নিকট আছে। ভাবিয়াছিলাম বে, এই মোকদ্দমায় আপনাদিগের যতই অর্থদণ্ড হউক না কেন, সেই টাকা হইতে তাহা প্রদান করিয়া আপনাদিগকে বাড়ীতে লইয়া যাইব। কিন্তু যাহা ভাবিয়াছিলাম তাহা হইল না।

গোফুর। দুইটা জীবনের জন্য যখন তিনি দুই লক্ষ টাকা চাহিতেছেন, তখন একটা জীবনের জন্য যে টাকা তোমার নিকট আছে, তাহা তাহাকে প্রদান কর, তাহাতে যদি তিনি সম্মত না হন, তাহা হইলে অবশিষ্ট টাকা পরে সংগ্রহ করিয়া তাহাকে প্রদান করিও।

হোসেন। এই সময় এত টাকা উহার হস্তে প্রদান করিব, আর উনি যদি কিছু না বলিয়া, কেবলমাত্র টাকাগুলি হস্তগত করেন, তাহা হইলে উপায়?

গোফুর। উপায় কিছুই নাই। আমার পুত্রের জীবনের সঙ্গে মা হয়, সেই টাকাও নষ্ট হইবে। দারোগা যেরূপ চরিত্রের লোকই হউক না কেন, আমাদিগের এরূপ অবস্থায় প্রতারিত করিয়া, এইরূপ ভাবে আমাদিগের জীবনের সহিত এত অর্থ গ্রহণ করিতে পারে, এরূপ বিশ্বাসঘাতক বোধ হয়, আজও জন্মগ্রহণ করে নাই। বিশেষতঃ যে দারোগার কথা তুমি বলিতেছ, সেই দারোগা আমার সহিত কখনও অবিশ্বাসের কাৰ্য করেন নাই।

হোসেন। আচ্ছা, তাহার কথায় বিশ্বাস করিয়া দেখি, ইহাতে আমাদিগের অদৃষ্টে যাহাই কেন হউক না।

এই বলিয়া হোসেন সেই স্থান হইতে উঠিয়া পুনরায় দারোগা সাহেবের নিকট গমন করিলেন। প্রহরী হাজতের দরজা পুনরায় বন্ধ করিয়া দিল।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

হোসেন দারোগা সাহেবের নিকট প্রত্যাবর্তন করিলে, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, গোফুর খাঁর সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইয়াছিল কি?

হোসেন। হাঁ মহাশয়। সাক্ষাৎ হইয়াছিল।

দারোগা। তিনি কি বলিলেন?

হোসেন। তিনি আপনার প্রস্তাবে সাত আছেন, কিন্তু অত টাকা এখন দিয়া উঠিতে পারিবেন না।

দারোগা। কত টাকা এখন তিনি প্রদান করিতে সমর্থ হইবেন?

হোসেন। এখন এক লক্ষ টাকা তিনি প্রদান করিতে সমর্থ আছেন।

দারোগা। এত অল্প টাকায় ত আমি এই কাৰ্য শেষ করিতে পারিব না।

হোসেন। দুই লক্ষ টাকা এখন আমাদিগের হস্তে নাই। এখন আমি এক লক্ষ টাকা প্রদান করিতেছি, আসামীদ্বয় মুক্তিলাভ করিবার একমাস পরে বক্রী এক লক্ষ টাকা যেরূপে পারি, সেইরূপে সংগ্রহ করিয়া আপনাকে নিশ্চয়ই প্রদান করিব। তাহার কোন অস্থা হইবে না।

দারোগা। এখন কি এক লক্ষ টাকার অধিক আর কিছুই দিতে পারিবেন না?

হোসেন। নিতান্ত আবশ্যক হয়, আরও কিছু দিতে পারি। আপনার নিকট আমি কোন কথা গোপন করিতেছি না, আমার নিকট এখন এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা আছে, ইহার মধ্যে আপাততঃ আবশ্যক উপযোগী যে কয় হাজার টাকার প্রয়োজন, তাহা রাখিয়া অবশিষ্ট সমস্তই আমি আপনাকে প্রদান করিতে প্রস্তুত আছি। কাৰ্য শেষ হইয়া গেলে, অবশিষ্ট টাকাগুলি আপনাকে আমি প্রদান করিয়া যাইব।

দারোগা। আবশ্যক খরচ-পত্রের নিমিত্ত আপাততঃ আপনি পাঁচ হাজার টাকা আপনার নিকট রাখিয়া দিন। অবশিষ্ট এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা আমাকে প্রদান করুন। আমি আপনার মনিবদ্বয়ের জীবন রক্ষা করিতেছি। অবশিষ্ট টাকা আমাকে সময় মত দিয়া যাইবেন।

হোসেন। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকিবেন। আপনি কি উপায়ে উঁহাদিগের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন, তাহা আমরা এখন জানিতে পারিব কি?

দারোগা। জানিতে পারিবেন বৈ কি। আমি উহা দিগের জীবন রক্ষা করিব বটে; কিন্তু কিছুদিবস উঁহাদিগকে সবিশেষ কষ্ট সহ্ করিতে হইবে।

হোসেন। কিরূপ কষ্ট সহ করিতে হইবে, তাহা আমাকে বলিয়া. দিন।

দারোগা। কেবলমাত্র আপনাকে বলিলে চলিবে না। গোফুর ও ওসমামকে আমি এই স্থানে আনাইতে পাঠাইতেছি; তাঁহারা আসিলে তাহাদিগকে আমি আমার মনের কথা বলিব, তাহাতে যদি উঁহারা সম্মত হন, তাহা হইলে আমি এই কার্যে হস্তক্ষেপ করিব, এবং আমাকে যে অর্থ প্রদান করিতে চাহিতেছেন, তাহা গ্রহণ করিব। নতুবা সেই অর্থে আমি হস্তক্ষেপ করিব না।

হোসেনকে এই কথা বলিয়া দারোগা সাহেব একজন প্রহরীকে ডাকিলেন ও তাহাকে কহিলেন, হাজতের ভিতর যে দুইজন আসামী আছে, তাহাদিগকে আমার নিকট লইয়া আইস।

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া প্রহরী সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল, এবং অবিলম্বেই গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্রকে আনিয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। দারোগা সাহেব তাহা দিগকে সেই স্থানে বসিতে বলিলে, অশ্রুপূর্ণ-লোচনে উভয়েই সেই স্থানে উপবেশন করিলেন।

দারোগা। এখন আর রোদন করিবার সময় নাই। আমি আপনাদিগকে যে সকল কথা বলিতেছি, তাহা সবিশেষ মনোযোগের সহিত শ্রবণ করুন। পরে সবিশেষ বিবেচনা করিয়া তাহার উত্তর প্রদান করুন। আমি আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে চাহি। ইহাতে আপনাদিগের অভিমত কি?

গোফুর। ইহাতে আমাদিগের আর অভিমত কি হইতে পারে? যখন মৃত্যু নিশ্চয় হইবেই, তখন বাঁচিতে পারিলে আর কে না বাঁচিতে চাহে! আপীলে কিছু হইবে কি?

দারোগা। আপীলে আপনাদিগের জীবন রক্ষা কিছুতেই হইবে না।

গোফুর। তবে কি কোনরূপ যোগাড়যন্ত্র করিয়া লাট সাহেবকে ধরিবেন?

দারোগা। সেরূপ যোগাড়যন্ত্র করিবার ক্ষমতা আমার নাই। করিলেও তাহার নিকট হইতে ক্ষমা পাইবার আশা নাই।

গোফুর। তবে কি আপনি বিলাত আপীলে কিছু করিতে পারিবেন?

দারোগা। সে স্বপ্নেও ভাবিবার কথা নহে। বিলাতের আপীলে কিছু হইবে না, তাহার চেষ্টাও করিব না।

গোফুর। তবে কিরূপে আমাদিগকে বাঁচাইবেন?

দারোগা। উপায় অপর আর কিছুই নহে, উপায়ের মধ্যে কেবল এই আছে যে, যদি আমি আপনাদিগকে ছাড়িয়া দি, তাহা হইলেই আপনাদিগের জীবন রক্ষা হইতে পারে; নতুবা জীবন রক্ষার আর কোন উপায় নাই। যাহা দিগকে ফাঁসি দিবার হুকুম হইয়াছে, তাহাদিগকে অনুসন্ধান করিয়া যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে আর ফাঁসি হইবে কাহার?

গোফুর। আমাদিগকে যদি ছাড়িয়া দেন, তাহা হইলে আমাদিগকে ধরিয়া আনিয়া ফাঁসি দিবে। তাহা হইলে আমা দিগের জীবন রক্ষা হইল কি প্রকারে?

দারোগা। সেই নিমিত্তই আমি আপনাদিগকে এখানে আনিয়াছি। আপনাদিগকে ছাড়িয়া দিলে, আপনাদিগকে একবারে দেশ পরিত্যাগ করিয়া গমন করিতে হইবে। যে স্থানে আপনাদিগের পরিচিত কোন লোক আছে, সে স্থানে, আপনারা থাকিতে পারিবেন না; বহু দূরবর্তী কোন স্থানে গমন করিয়া আপনাপন নাম পরিবর্তন করিয়া সেই স্থানে আপনাদিগকে বাস করিতে হইবে। আপনার জীবিত আছেন, এ কথা জানিতে পারিলে, আপনাদিগের বড়ই অমঙ্গল হইবে। তাহা হইলে গবর্নমেন্ট পুনরায় আপনাদিগকে ধরিয়া আনিয়া ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাইয়া দিবে। এইরূপে স্বদেশ পরিত্যাগ করিয়া কোন স্থানে আপনাপন পরিবারবর্গ লইয়া গিয়া বাস করুন, তাহাতে কিছুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু যত দিবস আপনারা বাঁচিবেন, ততদিবস না হউক, কিছু দিবস পর্যন্ত আপনাদিগকে লুক্কায়িত অবস্থায় থাকিতে হইবে। বিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখুন, এরূপ প্রস্তাবে যদি আপ নারা সম্মত হইতে চাহেন, তাহা হইলে আমাকে বলুন, আমি আপনাদিগকে মুক্তি প্রদান করি।

গোফুর। এ বিষম কথা। এরূপ অবস্থায় আমরা কিরূপে জীবনধারণ করিতে সমর্থ হইব?

হোসেন। অপর কোন উপায়ে যখন আপনাদিগের বাঁচিবার সম্ভাবনা নাই, তখন এই উপায় অবলম্বন না করিলে, আর উপায় কি? আপনি বৃদ্ধ হইয়াছেন, আপনার নিজের জীবনের মায়া তত না থাকিলেও থাকিতে পারে; কিন্তু ইহা ভিন্ন ওসমানের জীবন আর কিরূপে রক্ষা হইতে পারে। যে সকল দেশে এতদিবস বাস করিয়াছেন, সেই সকল দেশে না হয়, আর নাই থাকিলেন। অপর স্থানে গমন করিয়া সেই স্থানে পরিবারগণের সহিত বাস করুন। আমি নিজে পারি, বা অপর কোন লোক রাখিয়া পারি, জমিদারীর বন্দোবস্ত করিব। আবশ্যক হইলে সময় সময় আপনার নিকট গমন করিয়া পরামর্শ গ্রহণ করিব। আপনারা সেই স্থানে বসিয়া বসিয়া জমিদারীর উপসহ ভোগ করিতে থাকিবেন।

গোফুর। এরূপ স্থান আমরা কোথায় পাইব?

হোসেন। এরূপ স্থানের অভাব নাই। অনুসন্ধান করিয়া এত বড় পৃথিবীর ভিতর ওরূপ স্থান আর বাহির করিতে পারিব না?

দারোগা। যদি আপনারা এরূপ প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহা হইলে ওরূপ স্থান অনেক পাওয়া যাইবে। আপাততঃ আপনারা কোন প্রধান সহরে গমন করিয়া তথায় বাস করুন। পরিশেষে উপযুক্তরূপ স্থান ঠিক হইলে সেই স্থানে গমন করিবেন।

গোফুর। এমন কোন্ সহর আছে যে, সেই স্থানে আমরা অপরের অজ্ঞাত ভাবে বাস করিতে পারিব?

দারোগা। হয় কলিকাতায় গমন করুন, না হয় বোম্বাই সহরে গিয়া একটা বাড়ী ভাড়া লইয়া আপনাপন নামের ও বাসস্থানের পরিবর্তন করিয়া বাস করুন। কোন কাৰ্য্যের নিমিত্ত আপনারা বাড়ীর বাহিরে গমন করিবেন না, বা পরিচিত কোন লোকের সহিত সাক্ষাৎ করিবেন না। তাহা হইলে আপনাদিগকে কেহই জানিতে পারিবে না। ইচ্ছা করিলে পরিবারবর্গের সহিতও সেই স্থানে বাস করিতে পারেন। কৈবল দেশ হইতে চাকর-চাকরাণী সঙ্গে গ্রহণ করিবেন না। নূতন স্থানে গমন কর য়। সেই প্রদেশীয় নুতন, চাকর-চাকরাণী নিযুক্ত করিবেন। তাহা হইলে তাঁহারা আপনা দিগের প্রকৃত পরিচয় জানিতে পারিবে না। এইরূপে দুই পাঁচ বৎসর অতিবাহিত করিতে পারিলে, আর সবিশেষ কোনরূপ ভয়ের কারণ থাকিবে না।

গোফুর। তাহা ত হইল, আমরা যেন এইরূপ উপায়ে জীবন রক্ষা করিলাম! কিন্তু দুই দুইটা প্রাণদণ্ডের আসামী ছাড়িয়া দেওয়া অপরাধে আপনার কি হইবে? অবশ্যই তাহার জন্য আপনাকে দণ্ড গ্রহণ করিতে হইবে?

দারোগা। রাজদণ্ডে আমি দণ্ডিত হইতে পারি। এই অপরাধে আমার কারাদণ্ড হইবে, কিন্তু আমার প্রাণদণ্ড হইবে না। আমি কারাবাসে গমন করিয়া যদি দুইজনের জীবন রক্ষা করিতে পারি, তাহা হইলে আমার হাতে কোনরূপ কষ্ট হইবে না। আপনার নিকট হইতে আমি যে অর্থ গ্রহণ করিতেছি, তাহা হইতে আমাকে কুড়ি পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করিতে হইবে। অবশিষ্ট যাহা থাকিবে, আমার জেল হইলে, তাহার দ্বারা আমার স্ত্রী-পুত্র সকলে জীবনধারণ করিতে পারিবে। অথচ আপনাদিগের কিরূপ উপকার করিতে সমর্থ হইব, একবার তাহা মনে করিয়া দেখুন দেখি।

গোফুর। আমাদিগের জীবন রক্ষা করিবার নিমিত্ত আপ নাকে কারাদণ্ড ভোগ করিতে হইবে, এরূপ উপকার আমি প্রার্থনা করি না। কিন্তু আপনার পরোপকারিতার নিমিত আমি আপনাকে ধন্যবাদ না দিয়া থাকিতে পারিলাম না, ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি, আপনার মঙ্গল হউক।

দারোগা। আমার নিমিত্ত আপনাকে ভাবিতে হইবে না। সহজে আমাকে কেহ জেলে দিতে পারিবে না। তবে ঈশ্বর

করুন, যদি আমি কোনরূপ গোযোগে পতিত হই, তাহা হইলে হোসেনকে বলিয়া দিন, তিনি যেন আমাকে সবিশেষরূপ সাহায্য করেন, লোকের দ্বারাই হউক, বা অর্থের দ্বারাই হউক।

হোসেন। হোসেন এরূপ নীচ-প্রকৃতিবিশিষ্ট লোক নহে যে, আপনাকে এইরূপ সাহায্য করিবার প্রয়োজন হইলে, মনিবের আদেশ গ্রহণ করিতে হইবে।

দারোগা। এখন আপনাদিগের এখানে আর অধিক বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই। শীঘ্র আপনারা এখান হইতে প্রস্থান করুন। রাত্রির ভিতরেই আপনাদিগকে এতদূরে গিয়া উপস্থিত হইতে হইবে যে, অনুসন্ধান করিয়াও পুনরায় যেন আপনাদিগকে আর পাওয়া না যায়।

হোসেন। আমরা এখন কিরূপ উপায়ে এই স্থান হইতে গমন করিব?

দারোগা। আমি তাহারও বন্দোবস্ত করিয়া দিতেছি।

এই বলিয়া দারোগা সাহেব তাঁহার বিশ্বাসী দুইজন এক্কাওয়ালাকে ডাকাইতে কহিলেন। একজন প্রহরী গিয়া তাহাদিগকে ডাকিয়া আনিলে, দারোগা সাহেব তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদিগের খুব দ্রুতগামী ঘোড় আছে?

এক্কাচালক। আছে।

দারোগা। সমস্ত রাত্রিতে কত ক্লোশ পথ অতিবাহিত করিতে পারিবে?

এক্কাচালক। ত্রিশ ক্রোশের কম নহে। চল্লিশ ক্রোশ যাইলেও যাইতে পারি।

দারোগা। এখান হইতে * * * রেলওয়ে ষ্টেশন পঁয়তাল্লিশ ক্রোশ হইবে, বেলা নয়টার ভিতর সেই ষ্টেশনে ইহাদিগকে পৌছিয়া দিতে হইবে।

এক্কাচালক। ভাড়া কত দিবেন?

দারোগা। কত চাহ?

এক্কাচালক। দুইখানি এক্কায় পনর টাকা করিয়া ত্রিশ টাকা লই।

দারোগা। তাহাই হইবে। তদ্ব্যতীত তোমরা যে কোথায় গিয়াছিলে, কাহাকে লইয়া গিয়াছিলে, এবং কাহার আদেশে গিয়াছিলে, এ কথা কিছুতেই কাহাকেও বলিবে না। ইহার নিমিত্ত তোমাদিগের প্রত্যেককে পঞ্চাশ টাকা করিয়া আরও এক শত টাকা প্রদান করিতেছি। তোমরা তোমাদিগের এক্কা এখনই লইয়া আইস।

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া একাওয়ালাগণ তাহা দিগের একা আনিবার নিমিত্ত আপন স্থানে গমন করিল। হোসেন এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা দারোগা সাহেবের হন্তে প্রদান করিলেন। দেখিতে দেখিতে এক্কা-চালকগণ আপনাপন একা আনিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল। দারোগা সাহেবের আদেশমত হোসেন তাহাদিগের হতে এক শত ত্রিশ টাকা প্রদান করিয়া গোফুর খাঁ, ও ওসমান খাঁ এবং দুইজন পরিচারকের সহিত সেই এক্কায় আরোহণ করিয়া দ্রুতগতি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় ভোগা সাহেব উভয়ের হস্ত হইতে হাতকড়ি খুলিয়া লইয়া হোসেনকে বলিয়া দিলেন, ইহাদিগকে কোন স্থানে রাখিয়া দিয়া, দুই চারিদিবস পরে একবার এখানে আসিয়া এদিকের কিরূপ অবস্থা ঘটে, তাহার সংবাদ লইয়া যাইবেন।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

গোর খাঁ প্রভৃতি সকলে সেই স্থান হইতে গমন করিলে পর, যে পাঁচজন প্রহরী আসামীদ্বয়কে আনয়ন করিয়াছিল, দারোগা সাহেব তাহাদিগকে ডাকাইলেন। তাঁহারা তাহার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলে, তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরা যে খুনী মোকদ্দমার আসামীদ্বয়কে আমার থানায়, আনিয়াছ, তাঁহারা কি সমস্ত রাত্রি এই থানায় থাকিবে?

প্রহরী। হাঁ। কল্য প্রত্যুষে আমরা উঁহাদিগকে লইয়া যাইব। দারোগা। তোমরা আসামীদ্বয়কে নিজ জিম্মায় হাজতে রাখিয়াছ, কি আমাদিগের জিম্ম করিয়া দিয়াছ?

প্রহরী। আপনাদিগের জিম্ম করিয়া দিয়াছি। বাবোগা। যে সময় তোময়া আসামীদ্বয়কে এখানে আনিয়াছিলে, সেই সময় আমি থানায় উপস্থিত ছিলাম না; জমাদার সাহেব ছিলেন। তিনি আসামীদ্বয়কে থানার ডায়েরী ভুক্ত করিয়া লইয়াছেন কি?

প্রহরী। বোধ হয়, লইয়া থাকিবেন।

দারোগা। আসামীদ্বয়কে ভালো যে আমাদিগের জিম্মা করিয়া দিয়াছ, তাহার নিমিত্ত তোমরা রসিদ পাইয়াছ কি?

প্রহরী। না।

প্রহরীর এই কথা শুনিয়া জানোপা সাহেব জমাদার সাহেবকে ডাকাইলেন, এবং তাহাকে কহিলেন, খুনী মোকদ্দমার আসামীদ্বয়কে ডায়েরীভূক্ত করিয়া লইয়াছ কি?

জমাদার। লইয়াছি।

দারোগা। তবে সেই আসামীদ্বয়ের নিমিত্ত উঁহাদিগকে রসিদ দাও নাই কেন?

জমাদার সাহেব এখনই রসিদ দিতেছি। এই বলিয়া দারোগা সাহেবের সম্মুখেই একখানি রসিদ লিখিয়া প্রহরী গণকে প্রদান করিলেন।

রসিদ প্রদান করিবার পর দারোগা সাহেব প্রহরীগণকে কহিলেন, তোমরা এখন আসামীর রসিদ পাইয়াছ, আসামী দ্বয়ের নিমিত্ত এখন আর তোমাদিগের জবাবদিহি নাই। এখন তোমরা সন্নিকটবর্তী বাজারে বা সরাইয়ে গমন করিয়া অনায়াসেই সেই স্থানে আহারাদি ও বিশ্রাম লাভ করিতে পার। কল্য প্রাতঃকালে আগমন করিয়া এই রসিদ মামাকে প্রত্যর্পণ পূর্বক তোমাদিগের আসামীদ্বয়কে লইয়া যাইও।

প্রহরী। থানার ভিতর আমাদিগের থাকিতে কোন আপত্তি আছে কি?

দারোগা। আপত্তি কিছুই নাই। তবে আমার থানায় স্থান অতি সঙ্কীর্ণ, নিরর্থক কষ্ট সহ্ করিয়া এই স্থানে থাকি বার কোন প্রয়োজন নাই। বাজারে থাকিবার উত্তম স্থান আছে। এই থানায় একজন প্রহরীকে সঙ্গে লইয়া যাও। সে তোমাদিগকে উৎকৃষ্ট স্থানে রাখিয়া আসিবে। ইহাতে তোমাদিগের কোনরূপ ব্যয় হইবে না, অথচ সুখে থাকিতে পারিবে।

এই বলিয়া নোগা সাহেব তাহার থানার একজন প্রহরীকে ডাকিলেন, এবং তাহার সমভিব্যাহারে সেই প্রহরী পাঁচজনকে বাজারে পাঠাইয়া দিলেন ও বলিয়া দিলেন, ইহাদিগের আহারাদি করিতে যাহা কিছু ব্যয় হইবে, তাহা যেন দোকানদার প্রহরীগণের নিকট হইতে গ্রহণ না করিয়া আমার নিকট হইতে লইয়া যায়।

প্রহরীগণ সেই স্থান হইতে গমন করিলে পর, দারোগা সাহেব জমাদার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমাদিগের এই থানায় প্রহরীর সংখ্যা দশজন, তাঁহারা সকলেই থানায় উপস্থিত আছে কি?

জমাদার। না; তিনজন আজ দুইদিবস হইল, দুইজন আসামী লইয়া সদরে গমন করিয়াছে।

দারোগা। তাহাদিগের ফিরিয়া আসিতে কয় দিবস হইবে?

জমাদার। চারি পাঁচদিবসের কম তাঁহারা ফিরিয়া আসিতে পারিবে না।

দারোগা। আর সাতজন? : জমায়। তাহাদিগের মধ্যে তিনজন উপস্থিত আছে। একজন আপনার সহিত গমন করিয়াছিল, সেও এখন থানায় উপস্থিত আছে; কিন্তু উপস্থিত বলিতে পারিতেছি না।

কারণ, আপনি বা আপনার সঙ্গিবাহারী সেই প্রহরী ফিরিয়া আসিয়াছেন, তা এখনও জায়েরীভূক্ত হয় নাই।

দারোগা। আমি প্রহরীর সহিত সফল হইতে ফিরি আসিয়াছি, ইহা ডায়েরীভূক্ত করিয়া লও, এবং তোমার নিকট থানার চার্জ ছিল, তাহা আমাকে দেওয়া হইল, ইহাও চায়েরীতে লিখিয়া লও।আরও লিখি ক্লখ যে, থানায় যে দুইজন খুনী মোকদ্দমার আসামী আছে, তাহাও থানার চার্জের সহিত আমার জিম্মায় দেওয়া হইল।

জাবোগা সাহেবের কথা শুনিয়া জমাদার সাহেব তাহাই লিখিয়া ডায়েরী পুস্তক আনিয়া তাহাকে দেখাইলেন। তিনিও দেখিয়া আসামীর সহিত খাবার চার্জ পুনঃ প্রাপ্তিস্বীকার লিখিয়া দিলেন; এবং জমাদার সাহেবকে কহিলেন, তিন জন কনষ্টেবলের সহিত তুমি রোদগন্তে গক্ষন কর। ইহা ষ্টেশন ডায়েরীতে লিখিয়া রাখিয়া তোমরা এখনই খানা হইতে বহির্গত হইয়া যাও। অবশিষ্ট চারিজন প্রহরী কেবল মাত্র পানায় আমার সহিত অবস্থিতি করুক।

দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালিত হইল। জমাদার সাহে তিনজন কনষ্টেবলের সহিত আপনাকে ষ্টেশন ডায়েরীতে খরচ লিখিয়া থানা হইতে বহির্গত হইয়া গেলেন।

জমাদার সাহেব থানা হইতে কহির্গত হইয়া যাইব কিয়ৎক্ষণ পরেই, আমোগা সাহেব, যে প্রহরী চারিজন থানায় উপস্থিত ছিল, তাহাদিগকে তাকাইলেন, তাহাদিগের মধ্যে যে অল্পদিবসের চাকর, তাহাকে কহিলেন,  তোমার কয় বৎসর চাকরী হইয়াছে?

১ম প্রহরী। বার বৎসর হইবে।  

দারোগা। তোমার বয়ঃক্রম এখন কত হইয়াছে?

১ম প্রহরী। চলিশ বৎসর হইবে।

দারোগা। তবে তুমি আরও পনর বৎসর চাকরী করিবে।

১ম প্রহরী। যদি শরীর ভাল থাকে, বা আপনারা যদি অনুগ্রহ করেন।

দারোগা। তোমার বেতন এখন কত?

১ম প্রহরী। সাত টাকা।

দারোগা। আর কত বাড়িতে পারে, আশা কর? ১ম প্রহরী। আর কতই বাড়িবে, জোর আট টাকা হইবে।

দারোগা। আট টাকার হিসাবে, তোমার এক বৎসরের বেতন হইতেছে-ছিয়ানব্বই টাকা।

১ম প্রহরী। যাহা হয়।

দারোগা। তাহা হইলে তোমার পনর বৎসরের বেতন হইতেছে, এক হাজার চারি শত চল্লিশ টাকা।

১ম প্রহরী। হিসাবে যাহা হয়।

দারোগা। আর পনর বৎসর পরে যদি তুমি পে নাও, এবং সেই সময় যদি তোমার বেতন আট টাকা হয়, তাহা হইলে তুমি মাসিক চারি টাকা হিসাবে পেন্‌সন পাইতে পারিবে।

১ম প্রহরী। তাহাই হইবে।

দারোগা। তাহা হইলে বৎসরে তোমার পেন্ন্ হইবে আটচল্লিশ টাকা কেমন?

১ম প্রহরী। হ মহাশয়!

দারোগা। যখন তোমার বয়স পঞ্চান্ন বৎসর হইবে, সেই সময় তোমার পেন্‌সন হইবে। পেন্‌সন হইবার পর, তুমি আর কতদিবস বাঁচিবে।

১ম প্রহরী। তাহা কে বলিতে পারে। দশ বৎসরও বচিতে পারি।

দারোগা। দশ বৎসর কেন, যদি তুমি পনের বৎসরও বাঁচ, তাহা হইলে পেন্‌সন-বাবুদ তুমি সাত শত কুড়ি টাকা পাইতে পার। কেমন না?  

১ম প্রহরী। হাঁ মহাশয়।  

দারোগা। তাহা হইলে আজ হইতে তুমি যে পর্যন্ত বাঁচিবে, তাহাতে তুমি দুই হাজার এক শত ষাট টাকা বেতন বা পেন্‌সন পাইবে।

১ম প্রহরী।

দারোগা। এখন তোমাদিগকে একটা কাৰ্য্য করিতে হইবে। সেই কাৰ্য্য করিলে হয় ত তোমাদিগের চাকরী যাইলেও যাইতে পারে; কিন্তু আমি যেরূপ ভাবে কাৰ্য্য করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি, তাহাতে চাকরী না যাইবারই সম্ভাবনা। তথাপি তাহা অগ্ৰেই ধরিয়া লও। ধরিয়া লও, এই কাৰ্যে তোমাদিগের চাকরী গেলে, তোমাদিগের প্রত্যেকের দুই হাজার এক শত ষাট টাকার অধিক ক্ষতি হইবে না, কেমন?

সকল প্রহরী। উহার অধিক আর কি করিয়া ক্ষতি হইবে?

দারোগা। সেই টাকা আমি তোমাদিগকে এখনই এক বারে প্রদান করিতেছি, গ্রহণ কর। তদ্ব্যতীত আমার কাৰ্য্যের নিমিত্ত তোমাদিগকে আরও কিছু আমি প্রদান করিতেছি, অর্থাৎ তোমাদিগের প্রত্যেককে আমি তিন হাজার করিয়া টাকা প্রদান করিতেছি, গ্রহণ করিয়া আমার কাৰ্য্যে হত্যার্পণ কর।

এই বলিয়া দারোগা সাহেব প্রত্যেককে তিন হাজার করিয়া চারিজনকে মোট বার হাজার টাকা প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, কেমন, এখন তোমরা আমার কাৰ্য্য করিতে প্রস্তুত আছ?

প্রহরীগণ। আমরা সকল সময়েই আপনার কাৰ্য্য করিতে প্রস্তুত। এখন আমাদিগকে কি করিতে হইবে বলুন।

দারোগা। আর কিছুই করিতে হইবে না। এখন তোমরা গোরস্থানে গমন করিয়া আজ যে সকল মৃতদেহ মাটি দেওয়া হইয়াছে, তাহার মধ্য হইতে দুইটী দেহ উঠাইয়া আন। কেমন পারিবে ত?

প্রহরীগণ। এই সামান্য কাৰ্য্য আর পারিব না?

দারোগা। এ কাৰ্য্য সামান্য নহে। কারণ, এই কার্যের নিমিত্ত তোমরা অপর কাহারও সাহায্য গ্রহণ করিতে পারিবে না। নিজ হন্তে খনন করিয়া তোমাদিগকে সেই স্থান হইতে মৃতদেহ উঠাইতে হইবে, এবং নিজেই উহা বহন করিয়া আনিতে হইবে।

প্রহরীগণ। আমরা চারিজন আছি। সুতরাং এ কার্যের নিমিত্ত আমাদিগকে আর কাহারও সাহায্য গ্রহণ করিতে হইকেনা; অনায়াসেই এ কাৰ্য আমরা সম্পন্ন করিতে পারি। স্ত্রীলোকের মৃতদেহ না, পুরুষের মৃতদেহ আবশ্যক?

দারোগা। স্ত্রীলোকের মৃতদেহ আবশ্যক নহে, পুরুষের মৃতদেহের প্রয়োজন।

প্রহরী। ইহার জন্য আর ভাবনা নাই। আজ দিবা ভাগে আমি একবার গোরস্থানে গিয়াছিলাম, আমার সম্মুখ চারিটী পুরুষের মৃতদেহ মাটি দেওয়া হইয়াছে। উহা হইতে অনায়াসেই আমরা দুইটা উঠাইয়া আনিতে পারি।

দারোগা। যে কবর হইতে মৃতদেহ উঠাইয়া লইবে, মৃত্তিকা দিয়া সেই কবর পুনরায় পূর্ণ করিয়া দেওয়া আবশ্যক।

৩য় প্রহরী। এ কথা কি আর আমাদিগকে আপনার বলিয়া দিতে হইবে?

দারোগা। তোমরা বুদ্ধিমান, তাহা আমি জানি। তথাপি যদি ভুলিয়া যাও, এই নিমিত্ত পূর্ব হইতেই তোমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিতেছি।

৪র্থ প্রহরী। সেই মৃতদেই আমরা কোথায় আনিব?

দারোগা। এই স্থানেই আনিবে, এই থানার ভিতরেই আনিবে।

এই কথা শুনিয়া সকলে টাকাগুলি আপন আপন বাক্সে বন্ধ করিয়া দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালনার্থ গমন করিল। যাইবার সময় দারোগা সাহেব কহিলেন, তোমরা তোমাদিগের যে সকল টাকা আপনাপন বাক্সে বন্ধ করিয়া রাখিলে, মৃতদেহ আনিবার পর সেই টাকা সেই স্থানে রাখিও না; বাক্স হইতে বাহির করিয়া আপনাদিগের সঙ্গেই রাখিও। রাখিবার সুবিধা হইবে বলিয়াই, নগদ টাকার পরিবর্তে আমি তোমাদিগকে নোট প্রদান করিয়াছি।

প্রহরীগণ থানা হইতে প্রস্থান করিলে পর, অনেকক্ষণ পৰ্য্যন্ত দারোগা সাহেব বসিয়া বসিয়া; নানারূপ ভাবিতে লাগিলেন। পরিশেষে নিজেও থানা হইতে বহির্গত হইয়া সেই গোন অভিমুখে গমন করিলেন।

সেই স্থানে গমন করিয়া দেখিলেন, তাঁহার প্রেরিত প্রহরীগণ প্রায় কাৰ্য শেষ করিয়া আনিয়াছে। একটা মৃতদেহ কবর হইতে বাহির করিয়া উপরে রাখিয়াছে, অপরটী কয়ে ভিতরেই আছে। কিন্তু তাহার মৃত্তিকা খনন করা হইয়াছে।

এই অবস্থা দেখিয়া ফারোগা সাহেব পুনরায় থানায় প্রত্যা বৰ্তন করিলেন। তাঁর আসিবার কিয়ৎক্ষণ পরেই প্রহরীগণ দুইট মৃতদেহের সহিত উপস্থিত হইল। আসিয়া দারোগা সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিল, এই মৃতদেহ কোথায় রাখিয়া দিব?

উত্তরে দারোগা সাহেব কহিলেন, উভয় মৃতদেহই হাজতের ভিতর রাখিয়া দেও! প্রহরীগণ তাহাই করিল। তখন তিনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কবর হইতে মৃতদেহ উঠাইবার সময় বা উহা বহন করিয়া থানায় আনিবার সময়, অপর আর কেহ দেখিয়াছে কি?

উত্তরে প্রহরীগণ কহিল, না মহাশয়! কেহই দেখে নাই। দেখিলেও, যেরূপ ভাবে আমরা উঁহাদিগকে আনিয়াছি, তাহাতে কেহই কোনরূপ সন্দেহ করিতে পারিবে না।

দারোগা। যাহা হউক, আমরা পাঁচজন ব্যতীত এই মৃতদেহের কথা আর কেহই অবগত নহে। সাবধান! এ কথা কোনরূপে যেন কেহই জানিতে না পারে। অপরে জানিতে পারিলে, আমারও চাকরী থাকিবে না, তোমাদিগেরও চাকরী থাকিবে না। অধিকন্তু জেলে যাইতে হইবে।

প্রহরীগণ। না মহাশয়। এ কথা কেহই জানিতে পারিবে না। আমাদিগের বুকে বাঁশ দিয়া ডলিলেও আমরা এ কথা কিছুতেই প্রকাশ করি না।

ইহার পর দারোগা সাহেব গোফুর খাঁ ও ওসমানের হস্তে যে হাতকড়ি ছিল, এবং উহা প্রস্থান করিবার সময় তিনি যে হাতকড়ি খুলিয়া রাখিয়াছিলেন, সেই হাতকড়ি লইয়া হাজত-গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলেন, এবং মৃতদেহদ্বয়ের দুই হতে সেই হাতকড়ি লাগাইয়া দিলেন। পরিশেষে হাজতের বাহিরে আসিয়া হাজত-গৃহের তালা বাহির হইতে বন্ধ করিয়া দিলেন। আসামীদ্বয় হাজিত-গৃহে থাকিবার সময় সেই হাজত গৃহের বাহিরে যেরূপ ভাবে প্রহরীর পাহারা ছিল, সেই চারিজন প্রহরীকেই সেইরূপ ভাবে পাহারায় নিধুক্ত করিয়া রাখিলেন। এই সকল কাৰ্য শেষ করিতে রাত্রি বারটা বাজিয়া গেল।

রাত্রি আন্দাজ তিনটার সময়, থানার বাটীর দুই তিন স্থানে একবারে ধু ধু করিয়া আগুন জ্বলিয়া উঠিল, হাজত গৃহ জ্বলিতে লাগিল। তিনজন প্রহরী সেই সময় থানার ভিতর শয়ন করিয়াছিল, কেবলমাত্র একজন প্রহরী হাজতের সম্মুখে পাহারায় নিযুক্ত ছিল। কিরূপে থানার চতুর্দিকে এক বারে অগ্নিময় হইল, তাহা সেই প্রহরী কিছুমাত্র জানিতে না পারিয়া যেমন চীৎকার করিয়া উঠিল, অমনি সম্মুখে দারোগা সাহেবকে দেখিতে পাইল।

দারোগা তাহাকে কহিলেন, চুপ কর। অপর প্রহরী গণকে শীঘ্র উঠাইয়া দেও, এবং আফিসের কাগজপত্র যদি কি বাহির করিতে পার, তাহার চেষ্টা কর। হাজত-গৃহের চাবি আমাকে প্রদান কর। ইহার পর চাবি-সম্বন্ধে যদি কোন কথা উঠে, তাহা হইলে এইমাত্র বলিও, থানায় আগুন লাগিতে দেখিয়াই আমি দ্রুতপদে দারোগা সাহেবকে সংবাদ দিতে গিয়াছিলাম, সেই সময় হাজতের চাবু আমার হস্ত হইতে সে কোথায় পড়িয়া যায়, তাহার কিছুই স্থির করিতে পারি নাই। পরিশেষে আমি ও দারোগা সাহেব হাজতের দরজা ভাঙ্গিয়া আসামীদ্বয়কে বাহির করিবার নিমিত্ত অনেক চেষ্টা করিলাম; কিন্তু কোনরূপেই সেই দরজা ভাঙ্গিয়া উঠিতে পারিলাম না। দেখিতে দেখিতে থানার সহিত হাজত গৃহ ভষ্মে পরিণত হইয়া গেল। অপর প্রহরীগণ তাহাদিগের সাধ্যমত সরকারী কাগজ-পত্র অনেকগুলি বাহির করিয়াছিল, কিন্তু সমস্ত বাহির করিয়া উঠিতে পারে নাই।

থানা গ্রামের বাহিরে। গ্রাম হইতে লোকজন আসিতে আসিতে হাজত-গৃহের সহিত সেই থানা ভস্মে পরিণত হইয়া গেল। দশ পনর মিনিটের মধ্যে সেই থানার আর কিছু মাত্র চিহ্নও রহিল না।

থানায় হঠাৎ আগুন লাগিয়া, দুইজন আসামীর সহিত উহা ভস্মে পরিণত হইয়াছে এই সংবাদ উর্ধতন কর্ম্মচারী গণের কর্ণগোচর হওয়ায়, তাঁহারা আসিয়া ইহার অনুসন্ধান করিলেন। কিরুপে থানায় অগ্নি লাগিল, তাহার কোন প্রমাণ পাওয়া গেল না। কিন্তু ইহা সাব্যস্ত হইল যে, কোন ব্যক্তি উহাতে অগ্নি প্রদান করিয়াছে। তাঁহারা সেই দগ্ধাবশিষ্ট মৃতদেহদ্বয়কে হাতকড়ির দ্বারা আবদ্ধ দেখিয়া, ইহাই স্থির করিলেন যে, গোফুর খাঁ ও তাঁহার পুত্র ওসমান অগ্নিদাহে প্রাণত্যাগ করিছে। প্রমাণে আসল কথা কিছু বাহির হইল না। কেবল দারোগা সাহেব এবং সেই সময় যে সকল প্রহরী থানীয় উপস্থিত ছিল, তাহাদিগের অসাবধানতা বশতঃ থানায় আগুন লাগিয়াছে, এই অপরাধে তাঁহারা কৰ্ম্মচ্যুত হইল মাত্র। এদিকে গোফুর খাঁ ও ওসমান দূরদেশে লুক্কায়িত অবস্থায় কালযাপন করিতে শাগিলেন। কিন্তু কিছু দিবস পরে লোকমুখে প্রকাশ হইয়া পড়িল যে, তাঁহারা পুড়িয়া মরেন নাই, এখনও জীবিত আছেন। অনুসন্ধানে তাহার কতক প্রমাণও হইল, কিন্তু কর্ম্মচারীগণ জেলে যাইতে পারে, এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া গেল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *