ঘনাদার হিজ্‌ বিজ্‌ বিজ্‌

ঘনাদার হিজ্‌ বিজ্‌ বিজ্‌

রান্না হয়েছে?

না। ঘোড়াগুলো বাগানে।

সে কী? কামড়ালেই তো হয়।

মোটে সাততলা যে।

এ পর্যন্ত পড়ে কী মনে হচ্ছে? কোনও পাগলা গারদে হঠাৎ গিয়ে পড়েছেন বলে যদি ভয় হয় তা হলে অন্যায় কিছু নয়।

পাগলা গারদে ছাড়া আর কোথাও ওরকম আলাপ চলতে পারে কি?

হ্যাঁ, পারে। একটিমাত্র তেমন জায়গা দুনিয়ায় আছে। বলতে না বলতেই মনে পড়েছে নিশ্চয়। হ্যাঁ, অনুমানে কারও ভুল হবার কথা নয়। সে সৃষ্টিছাড়া জায়গাটির ঠিকানা হল বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন।

সেই বাহাত্তর নম্বরের নীচের তলায় খাবারঘরে বসে এক ছুটির দিনের সকালবেলা আমাদের এই আজগুবি আলাপের আতশবাজি চলছিল।

এ খেল বেশিক্ষণ চালানো বড় সোজা কথা নয়। আমাদের দুর্বুদ্ধির ভাঁড়ারে তখন প্রায় টান পড়ার জোগাড়।

তবু থামলে আমাদের তো চলবে না।

যার জন্য এসব কারসাজি তিনি একেবারে কাবু না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ছুটি নেই।

কাবু হবার কিছু লক্ষণ কি দেখা যাচ্ছে! যেভাবে নিজের টং থেকে হাঁক না পেড়ে সকালের দোসরা দফা চায়ের জন্য নেমে এসেছেন, তাতে মনে হচ্ছে ভেতরের চিড়বিড়িনিটা শুরু হয়ে গেছে বা হতে দেরি নেই।

আমাদের সঙ্গ সম্পূর্ণ পরিহার না করে এইখানেই যে নেমে এসেছেন সেটা এই চিড়বিড়িনিরই একটা লক্ষণ। যেখান থেকে জ্বালার উৎপত্তি শোধ নেবার আশায় সেখানেই ঘুরে ফিরে আসাটা আশাপ্রদ। কিন্তু শোধটা কী নেবেন ঘনাদা তা-ই দেখতে চাই।

আমরা মাত্রাটা একটু বাড়িয়ে দিই তিনি ঘরে ঢুকে খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে রান্নাঘরমুখো চেয়ারটায় বসবার পর।

যাক, খেলাটা আজ থলথলে, শিবুই শুরু করে।

তাহলে বিকম পাশু বেয়াই চাই,আমি যোগ দিই।

চিনেমাটির কথা আসছে কেন? শিশির বলে।

সন্দেহ থাকে তো বেলের পানা খাও? বলে গৌর পালাটা শেষ করে দেয়।

বনোয়ারি তখন সকলের সামনে চায়ের পেয়ালা ধরে দিয়েছে। সেই সঙ্গে একটা বড় থালায় টেবিলের মাঝখানে এক পাহাড় পাঁপর ভাজা।

হ্যাঁ, আমরা এ কদিন ধরে এমনই হিসেবিই হয়েছি। খরচখরচা সম্বন্ধে দারুণ কড়াকড়ি চালাচ্ছি। পয়সা খরচের কিপটেমিটা পুষিয়ে নিচ্ছি প্যাঁচালো কথার ঝুড়ি উজাড় করে।

কিন্তু সে ঝুড়িও যে প্রায় ফুরিয়ে এল।

থালা থেকে পাঁপর তুলে নিয়ে চিবোতে চিবোতে আড়চোখে ঘনাদার ওপর নজর রাখি।

ঘনাদা অবজ্ঞা করে পাঁপর স্পর্শ করেননি। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেবার ধরনটা কিন্তু ঠিক স্বাভাবিক নয়।

ফাটব ফাটব হয়েছে কিনা বলতে পারি না, কিন্তু সলতে যে একটু ধরেছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

আর একটু প্যাঁচ কষে সুতরাং দেখতে হয়। গৌরের ইশারায় শিবুই রামভুজকে হাঁক পেড়ে ডাকে।

আমাদের সঙ্গে এতকাল থেকে রামভুজ বাহাত্তর নম্বরের চালচলনে পোক্ত হয়ে গেছে। সব কিছুর জন্যই সে প্রস্তুত।

সে ভাবলেশহীন মুখে রান্নাঘর থেকে কোমরে বাঁধা গামছাটায় হাত মুছতে মুছতে এ ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে যেন আদেশের অপেক্ষায় বলে, হাঁ, বাবু?

হাঁ! শিশির উত্তেজিত হয়ে ওঠে রীতিমত, হাঁ কী বলছ, রামভুজ। উইটজেনস্টাইন কী প্রমাণ করেছেন জানো তো?

হাঁ, বাবু। রামভুজ অম্লান বদনে বলে।

ফের হাঁ। এবার শিবু আপত্তি জানায় দুঃখের সঙ্গে।

হাঁ বলে কিছু নেই–সব চোখ আর কান।

তা গতকালের মেনু কী করছ বলো? গৌর আগ্রহভরে জানতে চায়।

এত আগে থাকতে কেন? আমি প্রবল আপত্তি জানাই, গতকালের তো এখনও এক বছর বাকি।

তা বটে! এক কথায় স্বীকার করে গৌর, তা হলে পাঁজিটা এখন ছেঁড়া যাক।

আরে! আরে! যেন ককিয়ে ওঠে শিবু, ওটা ময়রার ভিয়েনে ভাজা!

না–আ!

প্রতিবাদ নয়, যেন হুংকার মেশানো হ্রেষা ধ্বনি। আর ও ধ্বনি যে কার তা বোধহয় বলতে হবে না।

হ্যাঁ, অবশেষে সলতের ধিকি ধিকি আগুন বোমার খোল পর্যন্ত পৌঁছয়।

ঘনাদাই দাঁড়িয়ে উঠে হুংকার ছেড়ে বলেন, ভিয়েন নয়, হোয়েল! তিমি! তা তিমি না ধরে বুনো সিম খুঁজলেই পারো! হোয়েল ছেড়ে হো-হো-বা।

মনে মনে সাবাস বলতেই হয়। প্রলাপের পাল্লাতেও ঘনাদা যে আমাদের টেক্কা দিয়েছেন তা স্বীকার না করে উপায় নেই।

কথাগুলো জ্বলন্ত স্বরে আমাদের শোনাতে শোনাতেই ঘনাদা কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে একেবারে দোতলার সিঁড়িতে।

সেখানে তাঁর স্যান্ডালের শব্দ শুনতে শুনতে আমরা একেবারে যাকে বলে বেপথু অবস্থায় পরস্পরের মুখের দিকে চাই।

ঘনাদার এ চালটার কী মানে করব?

যেমনটি আমরা চেয়েছি তাই হল কি?

না, ঘনাদা আমাদের আর-এক ল্যাং মেরে গেলেন! তাঁর এই ল্যাং মারার অপমানেই তাঁকে জব্দ করার জন্য এ ক-দিন বাহাত্তর নম্বরকে এমন পাগলাগারদ বানিয়েছি। নিজের দাওয়াই তিনি নিজেই একবার চেখে দেখুন কেমন লাগে।

একদিন-দুদিনে নয়, হপ্তার পর হপ্তা এক জ্বালা সয়ে সয়েই না আমরা এমন খেপেছি!

অপরাধ আমাদের কী ছিল?

না, কথায় কথায় আমাদের মাথায় মহাভারতের গাঁট্টা আমরা আর সহ্য করতে পারছিলাম না। ঘনাদাকে তখন পুরাণের প্রেতে পেয়েছে। দিন-রাত শুধু মহাভারতই দেখছেন সব কিছুতে সর্বত্র—যা কিছু বলো, যা কিছু করো, মহাভারত এনে ফেলবেনই সেই সুবাদে।

দিনকয়েক মন্দ লাগেনি। তার সঙ্গে দু-চারবার সঙ্গতও করেছি।

কিন্তু তারপর আর কতদিন ভাল লাগে। আমরা ক্রমে ক্রমে একটু বাঁকা সুর ধরছিলাম। মহাভারতের কথা তুললেই যেন জরুরি দরকারে কেটে পড়ছিলাম টঙের ঘর থেকে।

তাইতেই আমাদের ওপর বিগড়ে ঘনাদা এক বেয়াড়া চাল ধরলেন।

এবার আর বাক্যালাপ বন্ধ কি মেস ছেড়ে যাবার হুমকি নয়। এক হিসেবে যেন মিছরির ছুরি চালানো।

আমরা অনেক আশা করে বনোয়ারিকে দিয়ে প্লেটজোড়া কবিরাজি কাটলেট আর মটন চপ সযত্নে বইয়ে নিয়ে টঙের ঘরে হাজির হই।

ঘনাদা সাদরেই আমাদের অভ্যর্থনা করেন। প্লেট সাফ করার ব্যাপারেও কর্তব্যের ত্রুটি করেন না। শুধু আমরা উসকে দেবার জন্য যে কথাই তুলি তা যেন কান শুনতে ধান শোনেন।

তাঁকে একটু তাতাবার মতলবে বড় রাস্তার সেরা ময়রার অমৃতি আর খাজার ঘুষ সমেত আমরা হয়তো পাটনার ভয়াবহ বন্যার খবরটা একটু ফলাও করে বলি। তিনি খাজার পাঁপরগুলো তারিয়ে তারিয়ে চিবোতে চিবোতে আমাদের দিকে দৃকপাতই যদি না করতেন তা হলেও আগের নজির মনে করে আমরা একটু ভরসা পেতাম।

কিন্তু তিনি চাল একেবারে পালটে ফেলেছেন।

আমাদের দিকে ফিরে তিনি উৎসাহভরে খাজার পাঁচালি শুরু করে দেন। কোথায়  যেন ময়রার হাতে খাজার পাক একেবারে আহামরি এই আলোচনা।

আমরা একটু খোঁচা দিয়ে যদি আসল প্রসঙ্গটা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই তাতে আরও বে-লাইনে তিনি চলে যান।

পাটনাকে সাতনা শুনে তিনি সেখানকার রেলস্টেশন থেকে নেমে একেবারে খাজুরাহেই প্রায় রওনা হয়ে পড়েন।

অনেক কষ্টে তাঁকে থামিয়ে অন্য টোপ ধরাবার চেষ্টা করতে হয়।

কিন্তু যা-ই করি, ফল সেই একই। ঘনাদা কোনও টোপ তো গেলেন-ই না, তার বদলে উলটো বোঝার ভান করে আমাদের সব চাল বেচাল করে দেন।

তাঁর এই মতলবি বেয়াড়াপনাতেই মেজাজ বিগড়ে গেছে সবচেয়ে বেশি।

পাটনার বন্যায় তাঁকে ভাসাতে না পেরে আমরা পরদিন বিকেলে হয়তো রুশ-মার্কিন মহাকাশ মিতালির কথা একটু পাড়তে গেছি। ফাঁকা কথার উসকানি নয়, তার পেছনে একটা গোটা কমিসারিয়েট আছে বলা যায়। পার্ক স্ট্রিটের সেরা কেটারার-এর প্যাটি রোল থেকে পেস্ট্রির রকমফের।

ঘনাদার সামনে এই নৈবিদ্যে সাজিয়ে একটু উৎসুকভাবেই হয়তো বলেছি, মহাকাশের কোলাকুলি এবার কি আর মাটিতে নামবে না? কী বলেন, ঘনাদা?

ঘনাদা চুপ করে থাকেননি। ছোটখাটো পাশবালিশের মতো সসেজ রোলটি প্রায় চোখ বুজে গলাধঃকরণ করতে করতে ঘাড় নেড়ে যেন আমাদের কথাতেই সায় দিয়ে বলেছেন, নিশ্চয়!

আমাদের তখন আর পায় কে? ঘনাদা আমাদের দিকেই ঘাড় কাত করে বলেছেন, নিশ্চয়! আমরা উৎফুল্ল মুখে পরস্পরের দিকে একবার চেয়ে নিয়ে ঘনাদার দিকে চাতকের মতো চেয়ে থেকেছি।

ঘনাদা বিমুখ করেননি।

কিন্তু জল চাইতে ছুড়ে দিয়েছেন একটি নিরেট বেল।

সসেজ-রোল-এর মর্যাদা রেখে চিকেন প্যাটি-টির দিকে হাত বাড়িয়ে বলেছেন, মাটিতে নিশ্চয় নামবে। ওরা গাছে গাছেই থাকতে ভালবাসলেও মাটিতে মাঝে-সাঝে নামে। বড় সেঁতে জানোয়ার—আমেরিকার স্লথের যেন মামাতো ভাই। নামটা অবশ্য কোলা নয়, কোয়ালা। ডাকনাম ছেড়ে আসল নামও বলতে পারো ফ্যাসকোলারুকটস সিনেরিয়স।

কী মনে হয় এরকম বুকনি শুনলে?

সিনেরিয়স শুনে ভেতরে ভিসুভিয়সই জেগে উঠেছে বলে ভয় হয় না?

সে রকম কিছু হবার আগেই অবশ্য মুখ গোঁজ করে সবাই নীচে নেমে যাই। নীচে নেমেই ইমার্জেন্সি মিটিং বসে যায় এ অত্যাচার আর নীরবে সহ্য করবার নয়। পালটা জবাব এর দিতেই হবে। তাতে এসপার ওসপার যা হয় তোক।

সেই জরুরি পরামর্শ সভাতেই বাহাত্তর নম্বরকে বাতুলাশ্রম বানাবার এই নতুন

প্যাঁচ আমরা ছকে বার করেছি।

সোজা প্যাঁচ তো নৃয়, একেবারে সূচিকাভরণ। ঘনাদা হয় পুরো ঠাণ্ডা মেরে যাবেন, নয় তেতে উঠবেন, স্ফুটনাঙ্ক মানে বয়লিং পয়েন্ট পর্যন্ত।

তা, পয়লা নম্বরের প্রলাপটি ছেড়ে যেভাবে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন তাতে একশো ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তো ছাড়িয়ে গেছেন বলেই মনে হয়।

পারাটা এমনই তুঙ্গে থাকতেই থাকতেই যা করবার করতে হয়। সময় নষ্ট না করে তাই অভিযানটা তখনই শুরু করে দেওয়া হল।

আক্রমণের কায়দাটা এবার একটু ভিন্ন। সেই সবাই মিলে একসঙ্গে হুড়মুড় করে টঙের ঘরে গিয়ে ওঠা নয়। তার বদলে প্রায় অগোচরে অনুপ্রবেশ।

প্রথম পাঠানো হবে বনোয়ারিকে। সঙ্গে টুকটাক কিছু ঘুষ তো নয়ই, এক কাপ উপরি চা-ও না। হাতে একটা শুধু কাগজের চিরকুট।

এহি কাগজ পড়িয়ে দেখেন বড়াবাবু! বলে বনোয়ারি কাগজের চিরকুটটি নিবেদন করবে।

ঘনাদা বেশ একটু অবাক হবেন নিশ্চয়। অবাক আর সেইসঙ্গে গরমও। বনোয়ারি ওপরে এসেছে খালি হাতে শুধু তাঁকে একটা চিরকুট দিতে?

মেজাজ গরম হোক, চিরকুটটা দেখবার কৌতূহল ঘনাদা বোধহয় সামলাতে পারবেন না।

কিন্তু হাতে নিয়ে একটু চোখ বুলোতে না বুলোতেই মেজাজের পারা চড় চড় করে চড়বে।

চিরকুটের ওপর লেখা রাত্রের মেনু। তার নীচে যে ফর্দটি থাকবে তাই ঘনাদার বিস্ফোরণের পক্ষে যথেষ্ট।

সেখানে খাবারের ফর্দে থাকবে মাত্র তিনটি আইটেম-চাপাটি, সবজি, চাটনি।

রাত্রের মেনুর এই হাল দেখে ঘনাদার ফাটবার উপক্রম হতে না হতেই প্রথমে আমার প্রবেশ।

টঙের ঘরে প্রবেশের পরই বনোয়ারিকে বকুনি। বুদ্ধিশুদ্ধি কোনওকালে কি হবে! ও চিরকুট কে আনতে বলেছিল!

নিজেই চিরকুটটা তারপর ঘনাদার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে, বা তিনি গোড়াতেই ও চিরকুট অবজ্ঞাভরে ফেলে দিয়ে থাকলে তা কুড়িয়ে নিয়ে, আমি নাক বাঁকিয়ে পড়ব, চাপাটি। সবজি! চাটনি! একেবারে ভারতীয় থ্রি কোর্স ডিনারের মেনু করেছেন ওঁরা। খাদ্য বাঁচাও আন্দোলনের সব নেতা! না, না, ও সব চলবে না?

চিরকুটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমি পকেট থেকে আর-একটি ফর্দ বার করব।

ঘনাদা সেটি পড়তে উৎসাহ প্রকাশ করুন বা না করুন, তার অপেক্ষায় না থেকে, নিজেই পড়তে শুরু করব সেটা। এই দেখুন না—মিহি বাসমতী চালের ভাত, ভাজা মুগের ডাল, মাছভাজা, মাছের ডালনা—

ওই পর্যন্ত পড়তে পড়তেই পেছন থেকে বাঁকা সুরে ভ্যাংচানি শোনা যাবে— ভাত, ডাল, চচ্চড়ি! ভারী আমার মেনু শোনাতে এসেছেন, যেন শ্রাদ্ধবাড়ির নেমন্তন্ন!

গলাটা শিশিরের। বুলতে বলতে সে এগিয়ে এসে ঘনাদার তক্তপোশে বসে পড়েই বলবে, না, না, ঘনাদা। ও সব বাজে মেনু একদম বাতিল! এই নতুন মেনু শুনুন-লুচি, বেগুনভাজা, ধোঁকার ডালনা, কুমড়োর ছক্কা, ছোলার ডাল নারকেল দিয়ে, মাছের কালিয়া—

থাক। গৌরের কড়া গলা শোনা যাবে এবার। দরজা থেকেই প্রায় ধমকের সুরে ওই কথাটি বলে গৌর ঘরে এসে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক চেয়ে অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করবে—কী সব যা-তা মেনু শুনিয়ে ঘনাদার খিদেটা নষ্ট করছ তোমরা! লুচি বেগুনভাজা! যেন পাত পেড়ে নেমন্তন্ন খাওয়াতে ডাকছ ঘনাদাকে! না, ঘনাদা ওসব কথায় কান দেবেন না। আজকের যা মেনু সব অর্ডার দিতে পাঠিয়েই আসছি। ও লুচি-ফুচি নয়, স্রেফ বিরিয়ানি পোলাও, আর রগন জুশ আর মাংসের হাঁড়িয়া কাবাব–

এই পর্যন্ত বলতে বলতেই শিবু এসে হাজির হবে।

কী! যা যা বলেছি, অর্ডার দিয়ে এলি তো? গৌর আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করবে শিবুকে।

শিবুর শুধু সংক্ষিপ্ত উত্তর শোনা যাবে–না।

না! গৌরের গলা থেকে যেন ভূমিকম্পের গুরু গুরু শোনা যাবে—না মানে? বিরিয়ানি, পোলাও, রগন জুশ—এ সবের অর্ডার দিয়ে আসিসনি?

না তো বললাম! শিবু মাতব্বরি চালে জানাবে, এই বর্ষার দিন, এমনিতেই সব শরীর নরম যাচ্ছে, তার ওপর ওই সব ঘি মশলার বাদশাহি খানা খেয়ে ঘনাদার ভালমন্দ কিছু হোক আর কী? ওধার দিয়েই তাই যাইনি!

তা হলে? গৌরের বদলে শিশিরই খিঁচিয়ে উঠবে, জল বার্লি আর থিন অ্যারারুট বিস্কুটের অর্ডার দিয়ে এসেছ নাকি?

তা কেন দেব! শিবু ভারিক্কি চালে বলবে, এই পোলাও কালিয়া ছাড়া পেটের সুসার আর মুখের তার দুই জোগাবার কিছু নেই?

কী আছে কী শুনি? আমাদের যেন সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসা।

ফ্রায়েড রাইস! ফ্রায়েড প্রন! চিকেন চাউমিন! সুইট অ্যান্ড সাওয়ার ফিশ। বেকড় ক্র্যাব—

শিবু একটা করে চিনে খাবারের নাম করবে আর আমাদের অন্ধকার মুখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

ঘনাদারও কি নয়!

এই প্রোগ্রাম ধরেই ঘনাদাকে শেষ পর্যন্ত কাত করে তাঁর প্রলাপের জবাবদিহির কালীয়দহে নিয়ে গিয়ে ফেলব এই ছিল মতলব।

আমাদের ওপর খেপে যে পাগলা গারদ মার্কা গুলটি আজ ছেড়েছেন তা থেকে কেমন করে বেরিয়ে আসেন তাই দেখব এই আশাতে তখন আমরা ডগমগ।

কিন্তু যা ভাবা যায় তা কি আর ঘটে!

বনোয়ারিই প্রথম দফায় তার বোকামিতে সব প্ল্যান গুবলেট করে দিলে। তারপর আমি।

হ্যাঁ, আমিই সেই আসল অপরাধী বাহাত্তর নম্বরের কলঙ্ক, সে কথা নিরুপায় হয়ে স্বীকার করছি।

অবশ্য বনোয়ারি জমিটাই গোড়ায় অমন নষ্ট করে না দিলে আমি অমন বেসামাল হই না। কিন্তু একটা প্যাঁচ যখন কষতে গেছি, তখন সব কিছু সম্বন্ধে হুঁশিয়ার থাকা আমার উচিত ছিল নাকি! বনোয়ারির গলতিটা তো আমিই শুধরে নিতে পারতাম।

তার বদলে যা হল, গোড়া থেকেই ব্যাখ্যান করি।

পাকা টাইমটেবল মাফিক বনোয়ারির মেনুর চিরকুট দাখিল করার ঠিক গুণে গুণে ত্রিশ সেকেন্ড বাদে আমার প্রবেশটা একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরেই হয়েছিল।

ঘনাদা তখন বনোয়ারির দেওয়া চিরকুটটাই ভুরু কুঁচকে পড়ছেন।

ঘনাদা নিজেই যখন পড়তে শুরু করেছেন তখন হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পড়ার চেষ্টাটুকু বাদ দিয়েছি। বাদ না দিলে ঘনাদার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিরকুটটা তাঁর হাত থেকে নিতে হয়। ঘনাদা কোনখানে বসে চিরকুটটা পড়বেন সে বিষয়ে হিসেবের একটু ভুলের জন্যই এই অবস্থাটা হয়েছে অবশ্য।

লেখাটা কেড়ে নেওয়া যখন হল না তখন দূরে দাঁড়িয়েই ঘনাদাকে সেটা পড়ায় সাহায্য করবার চেষ্টা করলাম।

কী পড়ছেন ওটা? বিক্ষোভের সুর লাগিয়ে বললাম, বনোয়ারিটা যেমন হাঁদা—একেবারে ভুল মেনুর ফর্দটা দিয়েছে আপনাকে।

ভুল!ঘনাদা চিরকুটটা চোখের সামনে থেকে নামিয়ে যেন একটু অবাক হয়ে আমার দিকে চাইলেন।

হ্যাঁ, ভুল নয়? আমি মাত্ৰামাফিক গরম হয়ে উঠলাম, এই আমাদের রাত্রের ডিনার খাওয়া নাকি? চাপাটি, সবজি, আর চাটনি। আমরা যেন হেলিকপ্টার থেকে বিলানো খাবার প্যাকেট নিতে যাচ্ছি? না, না ফেলে দিন ও চিরকুট। আমরা—

কথাটা আর শেষ করতে পারলাম না। ঘনাদা যেন দুঃখের সঙ্গে বাধা দিয়ে বললেন, ফেলে দিতে বলছ? কিন্তু তা হলে একটু লোকসান হয়ে যাবে না?

লোকসান? আমি একটু হোঁচট খেলাম। তারপর সেটা সামলে নিয়ে ব্যাখ্যাটা নিজের মনের মতো করে বললাম, লোকসান ওই বন্যাত্ৰাণ মাকা থ্রি কোর্স ডিনারটা বাতিল করছি বলে। তা হোক লোকসান। বাহাত্তর নম্বরে ও মেনু চলবে না। ছিঁড়ে ফেলে দিন ও চোথা চিরকুট।

কিন্তু চিরকুটটা খাবারের মেনুটেনুর যে নয়। ঘনাদা যেন দুঃখের সঙ্গে জানালেন।

খাবারের মেনুর নয়? তা হলে? বলতে বলতেই আমার চক্ষু তখন স্থির হয়ে গেছে।

মেনুর চিরকুট ছাড়া আর একটি কাগজের টুকরোও তো আমাদের খাবার টেবিলে ছিল। সেইটিই আমাদের মূর্তিমান বনোয়ারিলাল যদি ঘনাদার হাতে এনে দিয়ে থাকে

তা হলেই তো চিত্তির!

ঘনাদার দিকে চেয়ে কী বলব কী ভেবে না পেয়ে তোতলা হয়ে গেলাম এবার।

মে-মে-মেনুর–কী বলে—! বলতে গিয়ে পেছন থেকে শুনলাম, কী বলে কী? গলাটা শিশিরের।

টাইমিং না রাখতে পারার গলতিতে শিশির তখন হাজির হয়ে গেছে টঙের ঘরে।

তার পিছু পিছু গৌর আর শিবুকেও তখন টঙের ছাদে দেখা যাচ্ছে।

শিশিরের কড়া প্রশ্নের উত্তরে তার দিকে বেশ একটু কাঁপা গলাতেই বললাম, বনোয়ারি ঘনাদাকে যে চিরকুটটা দিয়েছে সেটা নাকি রাত্রের খাবারের মেনুর নয়।

না ঘনাদা যেন নিরীহ ভাল মানুষের গলায় বললেন, এটা যে কী বাজি রাখার হিসেব মনে হচ্ছে। এই যে লেখা—বাজি শিশির—দুদিনে ঠাণ্ডাইলে দুদিন চীনে হোটেল। তারপর শিবু শায়েস্তার পুরো একটি হপ্তা। তার আগে হলে জোড়া ইলিশ। এবার সুধীর—পাঁচ দিনে জরুর হিটনইলে আইসক্রিমের চার দুকুনে আটটি ইট। শেষে গৌর—যখন হবার তখন তোক বাজি রাখে আহাম্মক।

ঘনাদা সমস্তটা পড়ে টুকরোটা আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই দেখো তোমরা।

দেখব আর কী, ও চিরকুট যে কী তা কি আমাদের বুঝতে বাকি আছে?

ঘনাদা আসবার আগে নীচের খাবার ঘরে আর কিছু না করার পেয়ে আমরা ওই বাজি রাখারাখি খেলছিলাম। ঘনাদার এবারের ঠাণ্ডা লড়াই কতদিন চলবে তাই নিয়ে বাজি।

শিশির সব চেয়ে আশাবাদী। সে বলেছে, দুদিনের মধ্যে ঘনাদাকে ঠাণ্ডা হতেই হবে। তার ভবিষ্যদ্বাণী যদি না ফলে তা হলে সে দুদিন আমাদের চিনা হোটেলে খাইয়ে দেবে কথা দিয়েছে।

শিবু কিন্তু অতটা আশা করে না। তার ধারণা হপ্তাখানেক লাগবে ঘনাদাকে ধাতে আনতে। এক হপ্তাতেও কিছু না হলে সে মেসে জোড়া ইলিশ কিনে আনতে রাজি হয়েছে।

গৌর কিন্তু এ বাজিটাজি রাখার একেবারে বিপক্ষে। তাই সে সোজা জানিয়ে দিয়েছে, এ সবের মধ্যে সে নেই।

গৌরের ওপর টেক্কা দেবার এমন মৌ-কা কি ছাড়া যায়!

আমি তাই শিশির আর শিবুর মাঝামাঝি পাঁচ-ই পাকড়ে ধরেছি। ঘনাদাকে পাঁচদিনেই সন্ধির সাদা নিশান ওড়াতে হবে এই আমার গণনা।

নিজেদের এই সব বেয়াদবি হাতে হাতে ধরা পড়ায় যখন আমরা লাল থেকে বেগনে হয়ে উঠেছি তখন ঘনাদাই আমাদের অমন করে সামলাবার সুযোগ দেবেন তা ভাবতে পারিনি।

আমাদের মুখের চেহারাগুলো যেন লক্ষই না করে ঘনাদা বললেন, তা বাজি কীসের বলো তো?

প্রশ্নটায় নয়, সেটা উচ্চারণের স্বর আর ভঙ্গিতেই আমরা তখন চমকিত। পুলকিতও সেই সঙ্গে হতে পারি বলে যেন একটু আশা হল। ঘনাদার গলায় রাগ-বিরাগের ঝাঁঝ কই? তার বদলে প্রায় মিঠে মোলায়েমই তো যায়—ঘনাদার জন্য স্পেশাল মার্জিন দিয়ে।

সাহস করে মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে দেখলাম ক-দিনের বেলা গুমোট একেবারে কেটে গিয়ে রীতিমত পরিষ্কার আকাশ।

বাজিটা! বাজিটা! আমি আমতা আমতা করে শুরু করবার এবার ভরসা পেলাম।

কিন্তু বাজিটা কীসের তা বলি কী করে?

শিশির আমার কাছ থেকে খেইটা টেনে নিয়েও সুবিধে করতে পারলে না। বাজিটা বুঝেছেন কিনা— বলে একবার ঘনাদার, একবার আমাদের দিকে চেয়ে বোকার মতো একটু হাসিতেই পদ পূরণ করতে চাইলে।

এদিকে সময় যে গড়িয়ে যাচ্ছে! ঘনাদার মুখ এখনও খুশি-খুশি। কিন্তু আমরা বাজির কথাটা নিয়ে আর কিছুক্ষণ এমন মিথ্যে লোফালুফি করলে এ খুশি ভাব আর থাকবে কি?

একটা কিছু এখন না বার করলেই নয়। গৌর তারই একটু ভূমিকা করবার চেষ্টা করলে, বাজিটা মানে, ওই চিরকুটে লেখা সেরকম কিছু নয়, মানে—

মানেটা ওইখানেই আটকে থাকত। পরিষ্কার আর হত না। যদি না শিবুর মাথায় পট করে মুশকিল আসানের বুদ্ধিটা এসে যেত।

গৌরের হাতড়ে ফেরা খেইটাই ধরে ফেলে সে বললে, মানেটা সত্যি কী, জানেন? মানে বলতে আপনাকে একটু লজ্জা হচ্ছে।

তাই নাকি? ঘনাদার সুরটা এখনও কিন্তু বাঁকা নয়।

তাইতেই উৎসাহ পেয়ে শিবু যেন বেপরোয়া হয়ে বলে ফেলল, আসলে আমরা বাজি ধরেছিলাম আপনার হারা-জেতার ওপর।

আমার হারা-জেতার ওপর! ঘনাদা একটু যেন অবাক, কিন্তু মুখের কোথাও এখনও মেঘের চিহ্ন নেই।

আজ্ঞে হ্যাঁ—একবার লাইন পেয়ে গেলে আর ভাবনা! শিশির গড়গড়িয়ে এবার এজাহার চালিয়ে দিলে, আপনি হারলে ক-দিনে হারবেন তারই হিসেবের ওপর আমরা বাজি রাখছিলাম।

আমি কিন্তু রাখিনি, গৌর তার সাধুত্ব ঘোষণা করলে, আমি জানতাম, ও বেড়াটা আপনি তুড়ি দিয়ে উতরে যাবেন। ওরা যখন পাঁচদিন সাতদিন বলছে তখন আমি মনে মনে হাসছি। ভাবছি ঘনাদার কেরামতি নিয়ে বাজি ধরছে, পরীক্ষা করছে। তাঁর ধাঁধা জোড়ার বাহাদুরি। যেন কবজির মাপ নিচ্ছে মহম্মদ আলির।

গৌরের গাছের মগডালে তোলার প্যাঁচ বিফলে যায় না। ঘনাদা যেন যে বর চাই, দেবার জন্য মুখিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তা পরীক্ষাটা কীসের?

আরে—তাকে কি পরীক্ষা বলে! আপনার কাছে সেটা নস্যি— গৌর নাকটা সিঁটকেই বললে, ওই যে আপনি শেষ বলে এলেন-না—তা তিমি না ধরে বুনো সিম খুঁজলেই পারো। হোয়েল ছেড়ে হোহ বা।

গৌর একটু থামতে আমরা আড়চোখে ঘনাদার মুখের দিকে তাকালাম। একটু

ভারী ভারী যেন লাগছে।

ঠিক মাপা সেকেন্ডের ফাঁক দিয়ে গৌর তার কথাটা শেষ করলে, ওরা বলছে যে মুখ ফসকে অমন প্রলাপের বুজকুড়িটা বেরিয়ে গেছে বলেই আপনি নাকি উঙের ঘরে পালিয়ে এসেছেন। ওই তিমির সঙ্গে সিম মেলাতে ক-দিন আপনাকে হিমসিম খেয়ে মরতে হবে, বাজি ধরেছে তার ওপর। আমি তাই ভাবছি, এতদিন সঙ্গ পেয়েও থোড়াই চিনেছে ওরা আপনাকে। হেঁঃ!

শেষের নাসিকাধ্বনিটা গৌরের। সেটা আমাদের প্রতি নকল অবজ্ঞার, না যেমন

মগডালে ঘনাদাকে তুলেছে, তেমনই সেখান থেকে মই কেড়ে নেবার বাহাদুরির তা। বলা শক্ত।

কিন্তু গৌরের নাসিকাধ্বনি শেষ হতে না হতে তার প্রতিধ্বনি আসছে কোথা থেকে!

না, প্রতিধ্বনি তো নয়, এ যে ঘনাদার নিজেরই অকৃত্রিম পেটেন্ট করা নাসানাদ।

মগডালে তোলার পর মই কেড়ে নেওয়া মেজাজের মতো তো ঠিক শোনাচ্ছে না? ঘনাদা যেন করুণা আর কৌতুক মেশানো হাসি চাপছেন মনে হচ্ছে!

আমরা বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাতে ঘনাদা নাসিকা ছেড়ে রসনাই ব্যবহার করলেন আমাদের আমাদের প্রতি কৃপা করে।

আরেকটা বাজির কথা মনে পড়ল কিনা, তাই হাসি পাচ্ছে। ভাষায় প্রকাশ করেন ঘনাদা।

আরেকটা বাজি!

হ্যাঁ, আরেকটা বাজি। আমাদের সন্দিগ্ধ কৌতূহলটা মেটালেন ঘনাদা, বাজি রেখেছিল গাওয়ার, ড্যানি গাওয়ার। গাওয়ার না বলে গোঁয়ার বলা যায়, আর তার চেয়ে গোরিলা বললেই মানায়।

ঘনাদা সেই গোঁয়ার গোরিলার স্মৃতিতেই যেন তন্ময় হয়ে যেতে তাঁকে একটু উসকে দিতে হল।

হ্যাঁ, কী যেন বাজির কথা বলছিলেন, ওই কোন গোরিলার সঙ্গে!

গোরিলা নয়, গাওয়ার। ঘনাদা বর্তমানে ফিরে এসে আমাদের সংশোধন করলেন, তবে চেহারাটা ললাম-ছাঁটা সাদা গোরিলারই মতো।।

ঘনাদা আবার একটু অন্যমনস্ক হয়ে থামলেন। তারপর আমাদের দিকে চেয়ে কী যেন মনে করবার চেষ্টায় বললেন, কিন্তু তোমরা তখন কী যেন বলছিলে, কী যেন কী মেনুর কথা!

এরপর আর আমাদের কিছু বলতে হয়! রাত্রের খাবারের মেনুর কথা সবে শুরু হয়ে ভারতীয় থ্রি-কোর্স চাপাটি ভাজি চাটনির বেশি তখন এগোয়নি। কিন্তু নিজেদের তাড়ায় মাঝখানের ধাপগুলো টপকে একেবারে চিনে ফ্রায়েড রাইসে পৌছতে আমাদের দেরি হল না।

হ্যাঁ, সেই গোঁয়ার গোরিলা মার্কা ড্যানি গাওয়ার, ঘনাদার অন্যমনস্কতাও এবার দূর হল, তাকে ড্যানি বলে ডাকতাম। সেই ড্যানিই একবার জবর এক বাজি রেখেছিল আমার সঙ্গে।

আপনার সঙ্গে বাজি? গোঁয়ার গোরিলা ড্যানির স্পর্ধায় আমরা বিদ্রুপের হাসি হাসলাম-নাকে খত দিয়ে ছাড়া পেয়েছিল নিশ্চয়!

না। ঘনাদা আমাদের তাজ্জব করলেন—সে বাজি হেরেছিলাম আমি, গো-হারান হার যাকে বলে। কিন্তু সে বাজি জিতেই শেষ পর্যন্ত খেপে গিয়েছিল ড্যানি। হারের বদলে জেতার শোধ নিতেই প্রতিজ্ঞা করেছিল, আমি যেখানে থাকি, খুঁজে বার করে হারপুন কামানে এ-ফোঁড় ওফোঁড় না করতে পারলে গোঁফদাড়ি আর কামাবে না।

ড্যানিও তখন তার পেশা-নেশা ছেড়ে হন্যে হয়ে সারা দুনিয়া আমায় খুঁজে ফিরছে, আর আমিও ওই তিমির সঙ্গে সিম মেলাতে অ্যারিজোনার মরু থেকে আলাসকার বেরিং সাগর পর্যন্ত পালিয়ে বেড়িয়ে শেষ পর্যন্ত অ্যাটকায় গিয়ে লুকিয়েছি। তিমির সঙ্গে সিম মেলাবার সময়টকর জন্যই অবশ্য এমন করে পালিয়ে বেড়ানো।

পালিয়ে বেড়ানো, কী বললেন, ওই তিমির সঙ্গে সিম মেলাতে? আমাদের চোখগুলো ছানাবড়া হতে খুব দেরি নেই মনে হল।

হ্যাঁ, ঘনাদা যেন সত্যের খাতিরে স্বীকার করলেন, ওইটেই আসল দরকার। আর তার জন্য লুকিয়ে থাকার পক্ষে অ্যাটকা একেবারে আদর্শ বলা যেতে পারে।

অ্যাটকা কোথায় জানো না বোধহয়। না জানবারই কথা। কারণ, পৃথিবীর ভূগোল কোনও দেবতারই হাতের কেরামতি যদি হয়, তা হলে আলাসকা থেকে পূর্ব সাইবিরিয়া আঁকতে যাবার সময় অসাবধানে তাঁর তুলির কিছু ছিটে পড়ে গিয়েছিল বেরিং সাগরে। অ্যাটকা সেই ছিটেফোঁটার একটি।

দ্বীপটা লম্বায় চওড়ায় কুড়ি বাইশ মাইলের বেশি কোনওদিকে নয়। সারা দ্বীপে পাহাড়ের ছড়াছড়ি। সবসুদ্ধ মোট শ-দেড়েক অ্যালুট আদিবাসী দ্বীপের ওই অ্যাটকা নামের গ্রামেই থাকে। বাকি দ্বীপটা জনমানবহীন। সেখানে শুধু বলগা হরিণের রাজ্য।

বেরিং সাগরের ওপর ভূগোলের দেবতার তুলির ছিটেগুলোর সাধারণ নাম অ্যালুসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ।

এ-দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসী অ্যালুটরা সতেরোশো খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাদের স্বাধীন জীবন কাটিয়েছে। তারা মাটির চাপড়ার ঘরে থাকত, সমুদ্রের মাছ আর সিল ধরত, কখনও বা দ্বীপের ভেতরে পাহাড়ে জলায় বলগাহরিণ শিকার করত একটা-আধটা।

তাদের দুঃখের দিন শুরু হল প্রমিসলেন্নিকি শব্দটার সঙ্গে পরিচয় হবার পর। প্রমিসলেন্নিকি শব্দের মানে হল পশুলোমের ব্যাপারী। প্রথমে এ সব ব্যাপারী যারা আসত তা রুশ। রুশরাই সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অ্যালুসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করে সেখানে সাগর-ভোঁদড়, মেরু-শেয়াল—এইসব জানোয়ারের লোমওয়ালা চামড়া জোগাড় করবার জন্য আসতে শুরু করে।

রুণ ব্যাপারীরা অ্যালুটদের অনেক কিছু উপকার করেছে। তাদের ধর্ম দিয়েছে, খাওয়া-দাওয়া পোশাক-পরিচ্ছদ শিকার ইত্যাদির নতুন পদ্ধতি শিখিয়েছে। ব্যাপারী হয়ে এলেও লাভের লোভে তারা কাণ্ডজ্ঞান হারায়নি। সাগর-ভোঁদড়ের চামড়ার দাম বরাবরই খুব বেশি। প্রমিসলেন্নিকিরা এই অ্যাটকা দ্বীপে বছরে তিনশোর বেশি সাগর-ভোঁদড় কিন্তু কখনও মারত না।

রুশ ব্যাপারীদের সংস্পর্শে এসে অ্যালুটদের সভ্যভব্য হবার দিকে যত ঝোঁকই হোক, ভাগ্যের মার তারা খেল সম্পূর্ণ অন্য এক অভাবিত দিক থেকে।

অ্যালুটরা হাজার বছর তাদের দ্বীপে প্রকৃতির সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছে। সভ্য মানুষের কাছে সে ভাল অনেক কিছু যেমন পেল তেমনই পেল তাদের রোগ। সে সব রোগ তাদের রাজ্যে একেবারে অজানা বলে তা রোধ করবার ক্ষমতা তাদের হল না। সামান্য ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুখ মহামারি হয়ে তাদের বসতি-কে বসতি উজাড় করে দিলে।

রুশরা আসবার আগে যাদের সংখ্যা ছিল বিশ হাজার তারা দুশো বছরে প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ হয়ে মাত্র দু হাজারে নেমে এল।

১৮৬৭-তে আমেরিকা রাশিয়ার কাছ থেকে আলাসকার সঙ্গে এই দ্বীপপুঞ্জ কিনে নেবার পর অবস্থা আরও সঙ্গিন হল। রুশ ব্যাপারীরা বুঝেসুঝে চামড়ার জন্য সাগর-ভোঁদড় বা মেরু-শেয়াল শিকার করত। প্রথমে মার্কিন ব্যাপারীরা এসে মায়াদয়ার ধার না ধেরে কোনও নিয়মকানুনই আর মানলে না। দেখতে দেখতে উনিশশো দশ সালে সাগর-ভোঁদড়ের বংশই যেমন লোপ পেল তেমনই নির্বংশ হল মেরু-শেয়াল। অ্যাটকা দ্বীপের আদিবাসীদের নিয়তিও যেন মনে হল তাই। তারাও গুনতিতে তখন আধা হয়ে গেছে।

এর পর এল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। প্রথমে জাপানি, তারপর আবার মার্কিনরা ছিনিমিনি খেলল অ্যাটকাবাসীদের ভাগ্য নিয়ে। যে কজন তাদের তখনও টিকে ছিল, তাদের চালান করা হল আর-এক অখদ্দে অ্যালুসিয়ান দ্বীপে। সেখান থেকে যুদ্ধের শেষে ফিরল মাত্র গোনা-গুনতি ক-জন।

অ্যাটকার এই বিবরণ বেশ একটু যত্ন করেই আমায় জোগাড় করতে হয়েছিল, লুকোবার জায়গা হিসেবে দ্বীপটা বেছে নেবার আগে।

অ্যাটকা দ্বীপের সুবিধে অনেক মনে হয়েছিল আমার। প্রথমত সারা দ্বীপের একটি মাত্র গ্রাম-গোছের বসতিতে শ-দেড়েকের বেশি মানুষ থাকে না। দ্বীপের বাকি অংশের দুর্গম পাহাড় আর জলা বান্দার রাজ্যে ইচ্ছে আর ক্ষমতা থাকলে সারা জীবনই বুঝি লুকিয়ে থাকা যায়। পাহাড়ে গুহা আছে, শুকনো শ্যাওলা বিছিয়ে নাও আরামের জন্য। বলগা হরিণ আছে পালে পালে। দরকার মতো শিকার করো, মুখ বদলাবার জন্য মাছ ধরতে পারো ছোটখাটো খাঁড়িতে কিংবা টারমাগান বা বুনো হাঁসও মারতে পারো একটা-আধটা। আর জলের জন্য পাহাড়ি ঝরনা একটা-দুটো মিলবে, দারুণ শীতের দিনে পাহাড়ের গায়ের একেবারে নির্মল বরফ গালিয়ে নিলেই হল।

আমার পক্ষে অ্যাটকা দ্বীপের সবচেয়ে বড় সুবিধে হল এই যে সেখানে আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা একরকম নেই বললেই হয়। মাসে একবার আবহাওয়া ভাল থাকলে একশো কুড়ি মাইল দূরের নৌঘাঁটি আডাক থেকে একটা ছোট টাগবোট অ্যাটকায় আসে। অ্যাটকায় চেষ্টা করলেও প্লেন নামাবার উপায় নেই। এমনকী রেডিও সেখানে বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে তিনশো দিন অচল হয়ে থাকে।

অনেক ভেবেচিন্তেই তাই একদিন ঝড়ের দোলা খেতে খেতে মোচার খোলার মতো টাগবোটে আটকায় এসে নেমেছিলাম। বেশিদিন তো নয়, আমার হিসেব মতো মাস তিনেক এখানে গা ঢাকা দিতে পারলেই ড্যানি গাওয়ারের মওড়া আমি নিতে পারব।

কিন্তু তার আগে সে আমায় খুঁজে পেলেই সর্বনাশ!

তার হাতে আমার কী হাল হবে জানি না, কিন্তু দুনিয়ার মানুষের জাত ক্ষমাহীন একটা পাপের ভাগী হয়ে থাকবে চিরকাল।

দ্বীপের খুদে বন্দর আর গ্রাম অ্যাটকায় নেমেই সামান্য কিছু দরকারি জিনিসপাতি নিয়ে আমি অজানা পাহাড়-বাদার অঞ্চলে পাড়ি দিয়েছিলাম।

কটাই বা অ্যাটকার বাসিন্দে। তবু কম বলেই নতুন মানুষের প্রতি তাদের কৌতূহল বেশি। আমি ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে অ্যাটকার মাটি পাথর পরীক্ষা করতে এসেছি বলে তাদের ভুল বোঝাতে হয়েছিল। ফন্দিটা যা হয়েছিল তা একেবারে চমৎকার।

মাসে একটিবার শুধু দ্বীপের ভেতরের আমার অজ্ঞাতবাস আডাক থেকে সরকারি টাগবোট আসার দিন চিঠিপত্রের জন্য আমায় অ্যাটকায় আসতে হত।

এই চিঠিপত্রের জন্য আমার না এলে নয়। হয় সানফ্রানসিসকো, নয় লেনিনগ্রাডের একটা চিঠির ওপর আমার জীবনমরণ শুধু নয়, তার চেয়েও দামি কিছু ব্যাপারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

এ চিঠির জন্য দিন গুণেই জংলি জানোয়ারের মতো এই দুনিয়ার বার দ্বীপে লুকিয়ে কাটাচ্ছি।

প্রথম মাসে চিঠির খোঁজে এসে পুরোপুরি হতাশ হতে হল। সানফ্রানসিসকো থেকে জানিয়েছে যে কাজ যেভাবে এগোচ্ছে তাতে আশ্চর্য কিছু ফল পাওয়ার আশা করা যেতে পারে।

লেনিনগ্রাড একেবারে চুপ। সেখান থেকে কোনও সাড়াশব্দই নেই। দ্বিতীয় মাসে চিঠির আশায় বন্দরে এসে একটু অসুবিধেতেই পড়তে হল। আবহাওয়া ভয়ানক খারাপ বলে টাগবোট নির্দিষ্ট দিনে ছাড়তে পারেনি আডাক থেকে।

সুতরাং বোটের জন্য অ্যাটকাতেই অপেক্ষা না করে উপায় নেই। তাও একদিন, না দুদিন, না কতদিনে আবহাওয়ার মেজাজ ফিরবে তা কে জানে। তেমন অবস্থা হলে হপ্তাখানেক বোট না আসতে পারে।

বোটের অপেক্ষায় না থেকে আমার অজ্ঞাতবাসে ফিরে যেতে তো পারব না।

চিঠিপত্র কী আসে না আসে তার জন্য আমায় অপেক্ষা করতেই হবে।

কিন্তু এই বন্দর গ্রামে থাকব কোথায়? অজানা পাহাড়ের রাজ্যে গুহায় থাকতে পারি। এখানে তো সে সুবিধে নেই। এই দেড়শো মানুষের বসতিতে হোটেলও নেই থাকবার। শেষ পর্যন্ত ওখানকার রুশ পাদ্রির দয়ায় তাঁর অর্থডকস লজের এক কোণে একটু থাকার জায়গা হল।

প্রথম দিনই সন্ধের সময় গ্রামের বয়স্ক দু-চারজন আলাপ করতে এলেন।

কী করে ওই জনমানবহীন পাহাড়ের রাজ্যে একলা কাটাচ্ছি। শিকার-টিকার পাচ্ছি কী রকম, দামি পাথরটাথর কি পেট্রলের খনিটনির হদিসটদিস কিছু সত্যি মিলেছে। কি না এই সব প্রশ্নের সত্যিমিথ্যে মিলিয়ে জবাব দিলাম।

যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে একটি লোককে গোড়া থেকেই কেমন একটু বেয়াড়া লাগছিল। তাঁর কৌতূহল অন্যদের থেকে একটু আলাদা।

এ দ্বীপে কী করছি না করছি সে বিষয়ে নয়, কোথা থেকে আসছি কোথায় থাকি এই সবই যেন তার জানবার আগ্রহ।

দ্বীপে যে নাম ভাঁড়িয়ে ছিলাম তা আর নিশ্চয় বলবার দরকার নেই। নকল নামের সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয়ও কিছু তাঁকে বানিয়ে বলতে হল তাঁর জিজ্ঞাসার উত্তরে।

আলাপ করবার সময়ই জানলাম লোকটির নাম মাইক মর্গান। নামটা ইঙ্গ-মার্কিন হলেও লোকটা অ্যালুট আদিবাসী। এ দ্বীপের ঠিক বাসিন্দাও নয়, আলাসকার রাজধানী জুনোতেই থাকে। ক-দিনের জন্য এখানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছে।

আলাপ-টালাপ শেষ হবার পর আর সকলের সঙ্গে মাইক মর্গানও বিদায় নিয়ে গেল। কিন্তু খানিকবাদেই তাকে আবার ফিরে আসতে দেখে যেমন অবাক তেমনই একটু বিরক্তই হলাম।

গলাটা খুব প্রসন্ন না রেখেই জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু কি এখানে ফেলে গেছেন, মি.

মর্গান?

না। বেশ গম্ভীর হয়েই বললে মাইক, আপনাকে একটা বিষয়ে সাবধান করতে এলাম, মি. দাস।

দাস! আমি বেশ গরম মেজাজেই বললাম, দাস কাকে বলছেন? আমি তো দাস নই, আমার পদবি হল রাও।

আচ্ছা, বেশ, রাওই হল।মাইক একটু হাসল, আপনাকে শুধু জানাতে এলাম যে যত তাড়াতাড়ি পারেন এ অ্যাটকা ছেড়ে চলে যান। পারেন তো এবারের বোট এলে তাইতেই।

কেন? ভেতরে ভেতরে ভাবনায় পড়লেও বাইরে আমি রীতিমত অবাক হবার ভান করে বললাম, অ্যাটকা ছেড়ে আমার পালাবার কী হয়েছে! আমি কি চোর-ডাকাত না খুনে!

চোর ডাকাত খুনে হলে তবু হয়তো রক্ষা পেতেন, মাইক মর্গান ধীরে ধীরে প্রত্যেকটি কথায় জোর দিয়ে বললেন, কিন্তু আপনার অবস্থা তাদের চেয়ে ভয়ংকর। যার বিষ নজরে আপনি পড়েছেন, বুকে আপনার একটু ধুকধুকুনি থাকা পর্যন্ত, সে আপনাকে রেহাই দেবে না।

শুনুন! শুনুন! আমি যেন ধৈর্য হারাবার ভান করলাম, কার কথা কাকে আপনি বলছেন আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আপনি বোধহয় সম্পূর্ণ ভুল করছেন মানুষ চিনতে।

তা যদি হয় তা হলে আপনার ভাগ্য ভাল, এবার মাইক মর্গান একটু বিদ্রুপের সঙ্গেই বললে, তবু ভুল খবরটা একটু শুনে রাখুন। ড্যানি গাওয়ার বলে কারও নামই হয়তো আপনি শোনেননি। কিন্তু তিনি আড়াক পর্যন্ত এসেছেন এইটুকু জেনে রাখুন। আমি আগের মাসের টাগবোটে আড়াক থেকে আসবার সময় ড্যানি গাওয়ারকে ওখানকার বন্দরে দেখেছি। তিনি একটা হোটেলের বার-এ দু-একজনের কাছে তাঁর এক বন্ধু দাসের কথা গল্প করছিলেন। বন্ধু দাসের নাম করবার সময়েই তাঁর চোখে যে ঝিলিকটা দেখেছি তাতে বন্ধু প্রীতিটা একটু খুনখারাপি রঙের মনে হয়েছে।

একটু থেমে মর্গান আবার বললে, আচ্ছা, গুডনাইট। আপনি রাও হলে আপনাকে মিছিমিছি ভয় দেখাবার জন্য মাপ চাইছি। আর যদি আপনি দাস হন তা হলে বলছি, এখনও সময় আছে সাবধান হবার।

মাইক মর্গান চলে যাবার পর বেশ একটু ফাঁপরে পড়েই ভাবতে বসলাম। মাইক মর্গান-এর ওপর মিছিমিছিই বিরূপ হয়েছি। সে তো আমার সত্যিকারের হিতৈষীর কাজ করেছে। কিন্তু এখন কী আমার করা উচিত?

ড্যানি গাওয়ারকে আর কোথাও নয়, একেবারে আডাক-এই দেখা গেছে। কেমন করে কী সূত্র ধরে সে আডাক পর্যন্ত আমার খোঁজে আসতে পেরেছে তা জানি না। কিন্তু গন্ধে-গন্ধে অতদূর পর্যন্ত আসতে পারলে টাগবোটে এই অ্যাটকা পর্যন্ত পাড়ি দিতে পেছপা হবার মানুষ সে নয়।

অবশ্য মাইক মর্গান ড্যানিকে একমাস আগে আডাক-এ দেখেছিল। ইচ্ছে থাকলে ড্যানি সেবারের টাগবোটেই মাইকের সঙ্গী হতে পারত।

তা যখন হয়নি তখন একমাস ধরে সে কি আর আডাক-এ বসে কাটাচ্ছে! তার যা স্বভাব তাতে এতদিনে তার পৃথিবীর উলটো পিঠেই আমার খোঁজে ফেরবার কথা।

কিন্তু তবু ওই বিশ্বাসে অ্যাটকায় নিশ্চিন্ত হয়ে আটকে থাকা কি চলে?

দুটি মাত্র রাস্তা এখন অবশ্য আমার সামনে খোলা। এক, এবারের টাগবোটের জন্য বন্দরে অপেক্ষা না করে দ্বীপের ভেতরে গিয়ে এখুনি লুকিয়ে পড়া, আর নয়তো, একটু হুঁশিয়ার হয়ে থেকে ড্যানি এবারের বোটে আসছে কি না দেখে নিয়ে ফিরতি খেয়াতেই আডাক-এ ফিরে যাওয়া।

প্রথম উপায়টার আসল অসুবিধে এই যে, এখন বন্দর ছেড়ে দ্বীপের ভেতর গিয়ে লুকোলে সানফ্রানসিসকো কি লেনিনগ্রাডের চিঠির খবর আর নেওয়া হয় না।

চিঠিটিঠি এলে পোস্টাফিসেই অবশ্য মজুদ থাকবে আমার জন্য। কিছুদিন বাদে টাগবোট চলে যাওয়ার পর এসে সেগুলোর ডেলিভারি নেওয়া যাবে। কিন্তু তা করলে চিঠির জন্য হাপিত্যেশ করে থাকার উদ্দেশ্যই তো ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। যা আশা করছি সে রকম কিছু যদি কোনও চিঠিতে থাকে তা হলে তখুনি তো আমার অ্যাটকা ছেড়ে যথাস্থানে যাওয়া দরকার। এখন টাগবোট ছেড়ে দিলে তার জন্য তো আরও একমাস অপেক্ষা করে এই দ্বীপে বন্দী হয়ে থাকতে হবে।

ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত এবারের টাগবোটের ওপরই একটু আড়ালে থেকে নজর রাখব বলে ঠিক করলাম। এ খেপের ফেরি থেকে ড্যানি গাওয়ারকে যদি নামতে না দেখি তা হলে ফিরতি পাড়িতেই যাব আডাক। তারপর দরকার হলে সানফ্রানসিসকো আর লেনিনগ্রাডের সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্য কোথাও লুকোব, কিন্তু এ অ্যাটকা দ্বীপে আর নয়।

আবহাওয়া একটু ভাল হতে তার পরের দিনই টাগবোটটা এল। বোট নাজান বে-তে ঢুকে বন্দরে নোঙর ফেলতেই সাত-আটটা ডিঙি বোেট এগিয়ে গেল টাগবোট থেকে মাল আর সওয়ারি তীরে নিয়ে আসতে। অ্যাটকায় সমুদ্রের গভীর জল পর্যন্ত বাড়িয়ে ধরা জেটি নেই। তীরের কাছে অগভীর জলে তাই ছোট ডিঙি বোটেই আসতেযেতে হয়।

বন্দরের ধারের একটা ডাঙায় ভোলা বোটের ধারে বসে সব কটা ডিঙি নৌকোকেই লক্ষ করলাম।

না, ড্যানি গাওয়ার কোনও বোটে নেই। যা ছদ্মবেশই সে নিক না, ওই গোরিলার মতো চেহারাটা কুঁচকে ছোট করবার মতো কোনও দাওয়াই তো নেই।

ড্যানি সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে পোস্টাফিসে গিয়ে চিঠির খোঁজ করার পর যা পেলাম তাতে আনন্দে নিজেকে সামলে রাখাই শক্ত হল।

চিঠি এসেছে সানফ্রানসিসকো আর লেলিনগ্রাড দু জায়গা থেকেই।

লেনিনগ্রাড থেকে চিঠি এসেছে অনেক আগেই। আগের বারের টাগবোট আসাযাওয়া করার কিছু পরে এসেছে বলে একমাস ধরে আডাক-এই আটকে পড়ে ছিল।

ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রানসিসকো থেকে চিঠিটা মাত্র দুদিন আগেই এসে পৌঁছেছে আড়াক-এ। সেটা তাই লেনিনগ্রাডের চিঠির সঙ্গেই আমি এখন পেলাম।

চিঠি পাওয়া নিয়ে তো কথা নয়, কী আছে চিঠির মধ্যে সেইটেই হল আসল। যা আছে তা একেবারে আশাতীত। দু জায়গার চিঠির মধ্যেই এমন মিল যে একটা আর-একটা দেখে টোকা বলে মনে হয়। এ দুই চিঠি পড়বার পর আর অ্যাটকায় থাকার কোনও দরকার নেই। সেখানকার স্বেচ্ছানির্বাসন আমার শেষ।

সামান্য জিনিসপত্রের যে ঝোলাঝুলি নিয়ে অ্যাটকার পাহাড় জঙ্গলে এতদিন লুকিয়ে কাটিয়েছি তাই নিয়ে ফিরতি টাগবোটে তুলে দেবার জন্য একটা ডিঙিতে যথাসময়ে উঠে বসলাম।

টাগবোটে গিয়ে জানলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা ছাড়বে। তারপর তো মাত্র কয়েক ঘণ্টার মামলা। ছাড়বার জন্য যত অধীরই হই—টাগবোটের ইঞ্জিন চালু হবার শব্দ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবুজ পাহাড় আর নীল জলের দ্বীপটির দিকে চেয়ে মনটা খারাপই হয়ে গেল।

মনটা খারাপ লাগছে বুঝি! তা ভাল করে দেখে নাও। দুনিয়াটাই দেখে নাও শেষবারের মতো।

ঠিক একেবারেই পেছনেই হাঁড়ি-গলায় কথাগুলো শুনলাম। কে বলছে ঘাড় ফিরিয়ে দেখার উপায় কিন্তু তখন নেই।

বিশমনি একটি থাবা আমার ঘাড়টাকে একেবারে যেন জাঁতাকলে ধরে আছে।

দেখতে পাই না-পাই বিশমণি থাবাটি আর হাঁড়ি গলার আওয়াজটি যে কার তা বুঝতে তখন আর বাকি নেই।

গলায় একটু খুশির সুর লাগাবার চেষ্টা করে বললাম, যাক, তুমি তা হলে নিজেই এসে গেছ! তোমাকেই খুঁজতে যাচ্ছিলাম?

তাই নাকি? আমার ঘাড়টা ধরে এবার ঘুরিয়ে দিয়ে একেবারে মিছরির ছুরির মতো গলায় ড্যানি গাওয়ার বললে, অমন জানলে আমার জাহাজটাই আগে পাঠিয়ে দিতাম! যাক, আমায় দেখে খুশি তো হয়েছ।

ড্যানি আমায় বেড়ালের মুখের ইঁদুরের মতো বার কয়েক ঝাঁকুনি দিয়ে খুশিটার বোধহয় মাপ নিতে চাইল।

বাঃ, খুশি না হয়ে পারি, ড্যানির হাতের ঝাঁকুনি খেতেখেতেই বললাম, তোমার সুমতি আনবার জন্য এতদিন এত কষ্ট করলাম, আর তোমায় দেখে খুশি হব না! তা বদ খেয়ালটেয়ালগুলো সব ছেড়ে দিয়েছ তো!

দিই নি, তবে দেব। এবার আর দাঁতে দাঁত না ঘষে পারল না ড্যানি, তোকে হারপুন বন্দুকে এফোঁড়ওফোঁড় করেই সব ছেড়ে দেব ঠিক করেছি। এখন ভালয় ভালয় সুবোধ ছেলে হয়ে আমার সঙ্গে আসবি না কোঁৎকাটোঁকা দিতে হবে?

কিছু দিতে হবে না। আমি উদার আশ্বাস দিয়ে বললাম, তোমায় না খুঁজতেই যখন পেয়েছি তখন প্রাণ থাকতে আর তোমায় ছাড়ব না জেনে রাখো।

বেশ! বেশ! ড্যানি ঠাট্টার সুরটা আবার গলায় ফিরিয়ে এনে বললে, চল, তা হলে আমার সঙ্গে। ক্যাপ্টেনের কেবিনটা এই সামনের কয়েক ঘণ্টার জন্য ধার নিয়ে রেখেছি। সেখানে বসেই দুজন দুজনের সব কথা শোনা যাবে।

ক্যাপ্টেনের ছোট কেবিনটা সত্যিই ড্যানি আগে থাকতে বলে কয়ে বা টাকা দিয়ে যেভাবে তোক নিয়ে রেখেছিল। আমায় সেখানে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে কেবিনের দরজাটা বন্ধ করে বললে, নে, বল শুনি তোর ইতিহাসটা এবার।

না, আমি যেন আবদার ধরলাম, তোমার বৃত্তান্তটাই আগে শুনতে চাই। তার আগে অবশ্য তারিফ করি তোমার বুদ্ধিকে। টাগবোটে থেকে তীরে না নেমেই তুমি কিস্তিমাত করেছ। তুমি যে টাগবোটেই ওত পেতে আছ শিকারের জন্য তা বোঝাই যায়নি।

বুঝলে আর আহাম্মকের মতো টাগবোটেই এসে উঠতিস না, কেমন? যেন 3েংচি কেটে জিজ্ঞাসা করেছে ড্যানি।

উঠতাম না মানে! আমি যেন ক্ষুণ্ণ হলাম, জানলে তো আরও খুশি হয়ে আসতাম। একটা কথা শুধু যদি বলো। তা হলে খুশিটা এখন আমার ষোলো কলায় পূর্ণ হয়।

বটে! টিটকিরি দিলে ড্যানি, কী কথাটা জানতে চাস, শুনি!

দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে এই ভূগোলের ভুলে যাওয়া দ্বীপটায় আমার ঠিকানা পেলে কী করে? সত্যিকার আগ্রহ নিয়েই এবার জিজ্ঞাসা করলাম।

ঠিকানা কী করে পেলাম? বলতে বলতেই ড্যানির হাসি আর যেন থামতে চায় না। বেশ কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে বললে, কী করে পেলাম, শুনবি? অতি বুদ্ধির গলায় দড়ি বলে। আমার কাছ থেকেই তুই লুকিয়েছিস। কিন্তু নিজের আহম্মকির বাতিকের কাছে লুকোবি কী করে। সেই আহাম্মুকিই তোকে ধরিয়ে দিয়েছে! বুঝলি কিছু।

গলাটা আপনা থেকেই গম্ভীর হয়ে এল। বললাম, হ্যাঁ, বুঝলাম এবার। ইন্টার— ঠিকই বুঝেছিস? ড্যানি আমার কথাটা শেষ করতে না দিয়ে বললে, ইন্টারন্যাশনাল হোয়েলিং কমিশন। সেখানে আহাম্মকের মতো লুকিয়ে থাকবার সময়ও তুই যে চিঠি লিখেছিস তার আমি যে সন্ধান পাব তা তুই ভাবতে পারিসনি।

তা পারিনি। সত্যিই একটু খুশি হয়ে উঠে বললাম, কিন্তু তুমি যে ইন্টারন্যাশন্যাল হোয়েলিং কমিশনে গেছলে এ খবরটুকু শুনেই সব দুঃখ আমার ঘুচে গেল।

অত অল্পে দুঃখ ঘোচাতে যাসনি রে, আহাম্মক, ড্যানি গাওয়ার গলাটা তেতো করে বললে, তুই যা ভাবছিস সে জন্য হোয়েলিং কমিশনে যাইনি! গেছলাম ওদের আইনের প্রতিবাদ দাখিল করতে।

প্রতিবাদ দাখিল করতে! একটু কুটি করে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রতিবাদটা কী?

প্রতিবাদ—ওরা যা হিসেব বেঁধে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে। ড্যানি নিজের কথায় নিজেই উত্তেজিত হয়ে উঠল, আমাদের অস্ট্রেলিয়ায় বেঁধে দিয়েছে মাত্র ন-শো আর পাঁচশোয়। সব রকম তিমি নিয়ে ন-শো মদ্দা শিকার করতে পারব আর পাঁচশো পাঁচটা মাদি। পাঁচশোর ওপর ওই পাঁচটা কীসের বলতে পারো?

নিজের মামলার ওকালতির উৎসাহে ড্যানিকে তুই থেকে আবার তুমিতে উঠতে দেখে মনে মনে একটু হেসে বললাম, তা পারি বোধহয়। তোমার মতো যাদের হাত হারপুন ছুঁলেই খুনে হয়ে ওঠে তাদের জন্য ও পাঁচটা ফাউ। কিন্তু ন-শো আর পাঁচশো পাঁচটার বরাদ্দ পেয়ে অত গোঁসা হচ্ছে কেন? ওই ন-শোটা ন-টায় আর পাঁচশো পাঁচটা শুধু পাঁচটায় নামতে যে আর দেরি নেই।

হ্যাঁ, তোর মতো উজবুক নচ্ছাররা সেই চেষ্টা করছে তা জানি, ড্যানি গাওয়ার রাগের জ্বালায় আবার তুমি থেকে তুই-এ নেমে গর্জন করে উঠল, কিন্তু মুখখু গবেটরা কি জানে যে তিমিদের দুঃখে গলে গেলে দুনিয়ার কত কারবার লাটে উঠবে! জানে যে——

তা জানে ড্যানি, ওরা কেন, সবাই জানে। ড্যানিকে এবার আমিই বাধা দিয়ে বললাম, তিমির চর্বি, বিশেষ করে স্পার্ম হোয়েলের মাথার তেল আর স্পার্মাসেটি যে কতদিক থেকে অমূল্য তা স্কুলের ছেলেদেরও আজকাল মুখস্থ। সাবান মোমবাতি থেকে আমাদের প্রসাধনের জিনিস আর তার চেয়েও বেশি ইস্পাত থেকে শুরু করে অতি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির জন্য তিমির তেলের কোনও জুড়ি নেই বলেই মানুষ জানে। খনি থেকে তোলা বা বাদাম তিল কি সরষের মতো বীজ পিষে বার করা দুনিয়ার কোনও তেল স্পার্ম তিমির মাথার তেলের মতো অত চড়া উত্তাপ কি চাপ সইতে পারে না। সেদিক দিয়ে বলতে গেলে স্পার্ম তিমি শিকার বন্ধ করলে দুনিয়ার অনেক দামি কাজ কারবার বন্ধ হয়ে যাবে বলে ভয় করাটা মিথ্যে নয়। তবু একবার ভেবে দেখো

থাক!দাঁত খিঁচিয়ে উঠল এবার ড্যানি, তোর ওসব বক্তিমে ঢের শুনেছি। সময় তোর ফুরিয়েছে। ইচ্ছে হয় তো যত খুশি তিমিদের কথা এ কামরায় বসে ভাব। এখানেই আপাতত তোকে বন্দী করে যাচ্ছি। আর একটা কথাও শুনে রাখ। তোকে হারপুনে এফোঁড় ওফোঁড় করব বলেছিলাম। কিন্তু এ দেশের আইনগুলোর কোনও মাথামুণ্ড নেই। তোর মতো একটা আরশোলা মারার জন্যও হয়তো আমায় ইলেকট্রিক চেয়ারে তুলবে। তাই ঠিক করেছি, যেখানে প্রথম তুই আমার সঙ্গে শয়তানির বাজি রেখে চালাকি করেছিলি অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ পশ্চিম কোণের সেই অ্যালব্যানির বন্দর থেকেই তোকে আরেকবার তিমি শিকারে নিয়ে যাব। তারপর হারপুন কামান দেব তোকেই শুধু ছুড়তে। যতগুলো স্পার্ম পাত্তা মিলবে, একটিবারও না ফসকে সব যদি শিকার করতে পারিস তা হলে এ যাত্রা তোকে ছেড়ে দেব। কিন্তু একটিবার ফসকালেই হারপুন-গোলার রশিতে কী করে তোর পা জড়িয়ে যাবে কে জানে। তারপর হারপুন ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে দড়িতে জড়িয়ে পাকিয়ে মাংসের দলা হয়ে হাঙরদের খোরাক হতে সমুদ্রের জলে পড়বি। গোড়া থেকেই এবার কোমরে দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকবি, সুতরাং অন্য চালাকির সুবিধে পাবি না সেটা মনে রাখিস।

বাঃ! রীতিমত প্রশংসার সুরে বললাম, এই তো সাচ্চা খেলোয়াড়ের মতো কথা। শুধু একটা অনুরোধ তোমায় করছি। অ্যালব্যানিতে নিয়ে যাবার আগে একটিবার যদি অ্যারিজোনায় আমায় কয়েক ঘণ্টা থাকতে দাও।

অ্যারিজোনায়? ড্যানি সত্যি একটু অবাকই হল। অ্যারিজোনায় কী? সে তো মরুভূমি বললেই হয়।

ওই মরুভূমির ওপরই আমার কেমন একটা টানাগলা একটু ভারী করে বললাম, নিজের জীবনটার সঙ্গে মিল আছে বলেই বোধহয়।

বেশ! বেশ! ড্যানি এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল। অ্যালব্যানির ঠাণ্ডা সমুদ্রে চোবাবার আগে তোকে একবার অ্যারিজোনার গরম বালিতে সেঁকে নিয়ে যাব। আড়াকে আমার প্লেনটাই মজুত রেখে এসেছি। অ্যারিজোনার মরুতে তোকে ঘণ্টা কয়েকের জন্য নামাতে কোনও অসুবিধা হবে না। এখন দরজায় তালা দিয়ে যাচ্ছি। নিশ্চিন্ত হয়ে ইষ্ট চিন্তা মানে তোর তিমি কুটুমদের কথা ধ্যান কর।

ড্যানি বাইরে থেকে কেবিনের দরজায় তালা দিয়ে চলে যাবার পর তার পরামর্শই না নিয়ে পারলাম না।

ড্যানি যেখানে আমায় নিয়ে গিয়ে তার বাজি জেতার শোধ নিতে চায় মনটা সেখানে চলে গেল আপনা থেকেই।

বাজি জিতে খুশি হবার বদলে যে হেরো তারই ওপর এ রকম আক্রোশের কথা শুনতে একটু অদ্ভুত সন্দেহ নেই। কিন্তু বাজিটা কী আর খেলাটা হয়েছিল কী রকম তার বিবরণ শুনলে ড্যানিকে খুব বেশি দোষ দেওয়া যাবে না।

দুনিয়ার একজন সেরা হারপুনার হিসেবে ড্যানির সঙ্গে পরিচয় একটু আধটু আমার ছিল। ড্যানি শুধু হারপুন ছোড়ায় ওস্তাদ নয় তার নিজের একটা তিমি শিকারের কোম্পানিও আছে। অস্ট্রেলিয়াতেই তার প্রধান ঘাঁটি হলেও দক্ষিণ মেরু থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত শিকারযোগ্য সবরকম তিমির চরবার এলাকাতেই সে তার নৌবহর নিয়ে তিমি শিকার করে ফেরে।

নৌবহর তার খুব ছোটখাটো নয়। তিমি ধাওয়া করবার তিনটে সব হালের যন্ত্রপাতি সাজানো জাহাজ ছাড়া একটা প্লেনও সে ব্যবহার করে ওপর থেকে তিমির পাত্তা নেবার জন্য।

কোনও জাতের তিমিতেই অরুচি না থাকলেও ড্যানি গাওয়ারের আসল ঝোঁক হল স্পার্ম হোয়েল শিকারের দিকে।

নির্মম বেহিসেবি মানুষের অবাধ শিকারের ফলে পৃথিবীর বহু অংশেই তিমির বংশ প্রায় লোপ পেতে বসেছে। অনেক দেশ তাই তিমি শিকারের বরাদ্দ আইন করে এখন বেঁধে দিয়েছে।

লুকিয়েচুরিয়ে দু-চারটে শিকার কেউ কেউ করলেও সাধারণভাবে ড্যানির মতো বড় কোম্পানিওয়ালাদের এ আইন মোটামুটি মানতে হয়।

তিমি শিকার যারা কমাতে বা বন্ধ করতে চায় তাদের ওপর ড্যানি তাই খাপ্পা। বিশেষ করে স্পার্ম তিমি শিকারের বরাদ্দ বেঁধে দেওয়ায় তার বেশি আপত্তি।

অ্যালবানির একটা খানদানি ক্লাবের বাইরে খোলা আকাশের তলায় পাতা টেবিলে বসে ওখানকার ক-জন রহিস আদমির সঙ্গে সেদিন গল্প করছিলাম। সেই গল্প করতে করতেই তিমি শিকারের কথা উঠতে, উত্তেজিত হয়ে উঠে টেবিলটাই প্রায় ঘুসি মেরে ভেঙে ড্যানি বলেছিল স্পার্ম তিমির আবার বরাদ্দ কী? স্পার্ম তিমি কি লোপ পেতে যাচ্ছে। এ সমস্ত হচ্ছে যত বেঁড়ে মাতব্বরদের মহানুভব সাজবার প্যাঁচ। আসল মতলব তো ইলেকশনে ভোট কুড়োনো।

সবারই কি তাই? আমি নিরীহ ভালমানুষ সেজে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, একটা প্রাণীকে নির্বংশ হয়ে যেতে দেখলে দুঃখ পায়, এমন মানুষও তো আছে। তা ছাড়া জন্তুজানোয়ার সম্বন্ধে আমাদের একটা দায়িত্বও কি নেই?

আছে নাকি! ড্যানি তখনই যেভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিল তাতে মনে হয়েছিল আমার সম্বন্ধে তার দায়িত্বটা সে তখুনি ঘাড়টা একটু মুচড়ে ঢুকিয়ে দিতে চায়।

তার মেজাজের পারাটা চড়াবার জন্যই আরও ন্যাকা সেজে আমি বলেছিলাম, নিশ্চয় আছে, বিশেষ করে তিমির মতো একটা মহৎ প্রাণীর বিষয়ে। ভেবে দেখো তো, কী একটা আশ্চর্য প্রাণী সমুদ্রের রাজ্যে সম্রাট হয়ে ফেরে অথচ মাছেদের জাত নয়। এককালে ডাঙায় উঠে এসে চার পায়েই চলাফেরা করত। তারপর ওদের কোনও আদি পূর্বপুরুষ কী সুবিধে বুঝে আবার ফিরে গিয়েছিল সমুদ্রে। হাতপাগুলো বদলাতে বদলাতে মাছের ডানার মতো হয়ে গেছে, কিন্তু মাছের মতো কানকো দিয়ে জল থেকে হাওয়ার অক্সিজেন নিতে পারে না। জলে ড়ুবে সাঁতার কেটে ফিরলেও পাঁচ থেকে পনেরো মিনিট অন্তর ওপরে উঠে নিশ্বাস ছাড়তে আর নিতে হয়। বাচ্চাদেরও স্তন্যপায়ীদের মতো বড় করে। আর চেহারায় তাদের কোনও বংশ হাঙরটাঙর এমনকী ডাঙার হাতিকেও ছাড়িয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বিরাট প্রাণী হয়ে উঠেছে। স্পার্ম হোয়েল বা ক্যাচালটদের মদ্দারাই তো পঁচাশি ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়, তার চেয়েও বড় হয় নীল তিমি, যাদের বলে সালফার বটম হোয়েল। পৃথিবীর সমুদ্রের এই আশ্চর্য বিরাট প্রাণীকে শুধু আমাদের নোংরা নীচ লোভে নিশ্চিহ্ন করে দেব!

ড্যানি গাওয়ার যে ক্রমশ গোঁয়ার গোরিলা হয়ে উঠছে তা এই দীর্ঘ বক্তৃতা ইচ্ছে করে তাকে শোনাতে শোনাতেই বুঝতে পারছিলাম। তাকে ভাল করে তাতাবার জন্য শেষকালে বলেছিলাম, তিমি শিকার আজকাল তো এমনিতে শক্ত কিছু নয়। একটা জাহাজ আর একটা হারপুন কামান থাকলেই হল। তারপর শুধু দেখো আর মারো। তার মধ্যে বাহাদুরিটা কোথায়?

বাহাদুরি নেই? এবার যেন আগ্নেয়গিরির ভেতর দিয়ে চাপা গর্জন উঠেছিল,

তুমি পারো দেখতে আর মারতে?

পারি মানে! আমি যতদূর সম্ভব তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বলেছিলাম, কামানে। যতগুলো হারপুন ততগুলো শিকার করতে পারি। একটা ফসকে যাবে না। শুধু চোখে একবার দেখতে পেলেই হল।

টেবিলের অন্য সবাই বেশ একটু সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল এবার। কারণ ড্যানি গাওয়ারের চেহারা দেখেই তখন বোঝা যাচ্ছে যে তার ফাটতে আর বেশি দেরি নেই।

কিন্তু ড্যানি পরে শোধ নেবার জন্য নিজেকে তখনকার মতো সামলে নিয়ে গলাটা মোলায়েম করেই বলেছিল, বেশ কালই আমার সঙ্গে চলুন না। আমার খাস চেজার জাহাজে আপনাকে নিয়ে যাব। হারপুন কামানও আপনার হাতে থাকবে। আপনার গোলন্দাজিটা দেখিয়ে আমাদের একটু ধন্য করবেন। কেমন রাজি?

আলবত রাজি। এমন একটা খেলোয়াড়ের চ্যালেঞ্জ ফিরিয়ে দিতে পারি!

উৎসাহ ভরে বলেছিলাম।

একটা কিছু বাজি তা হলে ধরা উচিত নয় কি? ড্যানি গলাটা যথাসম্ভব সহজ রেখে বলেছিল।

তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে বলেছিলাম, বাজি তো রাখতেই হবে। বাজি না রাখলে এ রকম একটা চ্যালেঞ্জের মান থাকে! কী বাজি রাখতে চান বলুন!

আপনিই বলুন না সেটা, ড্যানি আমাকেই প্রথম সুযোগ দিয়েছিল। বেশ, একটু যেন ভেবে নিয়ে বলেছিলাম, যা বলেছি তাই ঠিক মতো করে আমি যদি জিতি তা হলে আপনাকে একবার কানমলা খেয়ে ওই আপনার জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে হবে। আর আমি যদি হারি তা হলে কানমলা খেয়ে ঝাঁপ দেব আমি।

প্রথমটা চোখগুলো এরকম আজগুবি বাজিতে একটু জ্বলে উঠলেও শেষ পর্যন্ত সে রাজি হয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল এই শর্তের ওপর হাত মেলাবার জন্য।

করমর্দনের নামে আমার হাতটা গোরিলার থাবায় ধরে সে প্রায় গুঁড়িয়েই দিয়েছিল অবশ্য।

আমিও মুখটা কাঁদো কাঁদো করে যেন কাতরাতে কাতরাতে বলেছিলাম, তা হলে এই বাজিই রইল।

যতক্ষণ সে ছিল ডান হাতটা তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে অনেকক্ষণ বাঁ হাত দিয়ে ঘষাঘষি করেছিলাম যেন সাড় ফেরাবার জন্য।

বেশিক্ষণ সে অবশ্যি থাকেনি। আমার হাত দলাই-মলাইটা বেশ তৃপ্তিভরে খানিক দেখে উঠে যাবার সময় বলেছিল, তা হলে ওই কথাই রইল, কাল ভোর ঠিক সাড়ে তিনটেতে। অত আগে না বেরুলে ঠিক জায়গায় সময়মতো পৌঁছনো যাবে না।

আমি মুখে যেন কথা না বলতে পেরে শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলাম। পরের দিন ভোর সাড়ে তিনটের জায়গায় মাত্র মিনিট পনেরো দেরি করে, রাত পৌনে চারটেতেই, অ্যালব্যানির ছোট পাহাড়ঘেরা বন্দর থেকে ড্যানির তিমি শিকারের জাহাজে তার সঙ্গে রওনা হলাম।

অ্যালব্যানি অস্ট্রেলিয়ার দিক থেকে বেশ পুরনো শহর। প্রায় দেড়শো বছর আগে থেকে সেটা তিমি শিকারিদের একটা বড় ঘাঁটি।

অ্যালব্যানির বন্দরের জেটি থেকে জাহাজ নিয়ে আমাদের কন্টিনেন্টাল শেলফ পর্যন্ত যেতে হল। কন্টিনেন্টাল শেলফ হল স্থলভাগ যেখানে অগভীর সমুদ্র প্রথম থেকে একেবারে সমুদ্রের গভীরে নেমে গেছে সেই খাঁজ। সেই অতল সমুদ্রের ধার দিয়েই ও অঞ্চলের তিমিরা পুর্ব থেকে পশ্চিমের দিকে সাঁতরে পাড়ি দেয়। তিমি শিকারের পক্ষে তাই সেটা স্বর্গ।

ভোর পৌনে চারটেয় বেরিয়ে সকাল হতে না হতে যথাস্থানে আমরা পৌঁছে গেলাম।

ভাগ্যটা আমাদের ভাল। গভীর জলের কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই উল্লাসে চিৎকার করে উঠল ড্যানি, দেখো, দেখো! স্পার্ম তিমির একেবারে যেন যুবরাজ আসছে। অন্তত পঞ্চাশ ফুট লম্বা একটা মন্দা, ওজন কিছু না হোক পঞ্চাশ টনের কম হবে না।

উৎসাহের চোটে ড্যানি বাজির কথা ভুলে গিয়ে নিজেই হারপুন কামানের পেছনে দাঁড়িয়েছিল।

স্পার্ম তিমিটা তখনও নিশ্চিন্ত মনে ধীরে সুস্থে পুব থেকে পশ্চিমের দিকে ভেসে। যাচ্ছে।

উত্তেজনায় অস্থির হয়ে ড্যানি কামান থেকে হারপুন ছোড়বার জন্য তৈরি হয়েছে এমন সময়ে পিঠে হাতটা পড়ায় একটু চমকেই উঠল।

এমন মোক্ষম সময়ে এই উপদ্রবের জন্যে ঘাড় ফিরিয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলে, কী চাও এখন?

চাই ওই কামানটা চালাতে, শান্ত বিনীত স্বরেই বললাম, হারপুন ছোঁড়বার পালাটা আজ আমার কিনা। কারণ বাজিটা আমিই রেখেছি। সুতরাং তোমায় একটু সরতে হবে দয়া করে।

ড্যানি সরেই এল। কিন্তু কীভাবে দাঁতে দাঁত চেপে তাকে নিজেকে সামলাতে হল সে স্পষ্টই দেখতে পেলাম।

নিজেকে সামলে সরে এলেও ভেতরের জ্বালা আর গলার ঝাঁঝটা সে লুকোতে পারল না। দাঁতে দাঁত চেপেই বললে, হারপুন কামান নাও। কিন্তু অমন একটা তিমি হাতছাড়া যেন না হয়ে যায়।

হাতছাড়া! আমি এবার অবজ্ঞার ভঙ্গি করে বললাম, একটু ধৈর্য ধরে কেরামতিটা আমার দেখোই না।

আরও গা জ্বালানো ভঙ্গিতে যেন হাত পায়ের খিল ছাড়াবার ভান করে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, কি-টা হারপুন আছে তোমার জাহাজে, গোটা ছয়েক জোড়া হবে

তো?

হ্যাঁ, হ্যাঁ হবে! অধৈর্যর সঙ্গে প্রায় খিঁচিয়ে উঠল ড্যানি গাওয়ার, তুমি এখন একটাই সামলাও তো।

আরে, ওটা তো গাঁথা হয়ে গেছে ধরে নিতে পারো। আমি আরও গড়িমসি করে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, হারপুনগুলোর প্রত্যেক জোড়ায় একটা করে বোমা মাথা, আছে তো?

আছে! আছে! ড্যানি নেহাত বাজি রাখার কড়ারের দরুনই নিজেকে সামলে রেখে বললে, আজকাল প্রত্যেক জোড়া হারপুনে একটার মাথায় খুদে বোমা লাগানোেই থাকে তা আবার বলতে হবে।

বেশ, বেশ–আমি যেন আশ্বস্ত হয়ে এবার আমার সামনের শিকারে মন দিলাম।

ঝানু তিমি শিকারির কোনও ভাবভঙ্গিই বাদ দিলাম না।

একবার ডান হাতটা নেড়ে ডানদিক দেখলাম, তারপর আবার বাঁ হাতটা নাড়লাম। আস্তে, বলে হঠাৎ চিৎকার ছেড়ে কামানের ওপর যেন কুঁজো হয়ে ঝুঁকে পড়লাম।

তারপর কামানের মুখটা একটু এদিক ঘুরিয়ে দিলাম হারপুনের গোলা ছুড়ে।

কামান ছোড়ার পর আর সমুদ্রের দিকেই চাইলাম না। বাহাদুরিটা তোমরাই দেখো ভাব করে মুখ ঘুরিয়ে ড্যানির দিকে চেয়ে গায়ের জামা থেকে যেন কাল্পনিক ধুলো ঝেড়ে ফেললাম টুসকি দিয়ে।

ড্যানি তো বটেই, জাহাজের মাল্লামাঝি সবাই প্রথমটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য হতভম্ব হয়ে চুপ!

তারপর হঠাৎ সে কী হাসির ধুম।

আগের রাগটাগ ভুলে ড্যানিও তখন দুমড়ে গিয়ে পেটে হাত চেপে হাসতে হাসতে বলছে, কী হারপুন ছুড়লে হে তুমি! স্পার্ম তিমি যে বাসায় তাই নিয়ে গল্প করতে চলে গেল।

চলে গেল! একেবারে যেন তাজ্জব হয়ে সমুদ্রের দিকে ফিরে আমার শিকারের তিমিটাকে বহাল তবিয়তে ড়ুব মারতে দেখে যেন রেগেই গেলাম সকলের ওপর।

প্রায় গর্জন করে বললাম, হতে পারে না কখনও।

হতে পারে না? ড্যানি তখন হাসিটা কিছুটা সামলে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন আজব গোলন্দাজি? তা ঠিকই বলেছ। তিমিটাকে যে অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল তাতে তাকে মারতে গিয়ে ফসকানো রীতিমত উঁচুদরের কেরামতি।

যেন এ সব ঠাট্টা কানেই না নিয়ে আমি গোমরাতে গোমরাতে বললাম, আচ্ছা, এবার দেখাচ্ছি।

হ্যাঁ, তাই দেখাও, ড্যানি আবার হাসতে শুরু করে বললে, তবে তোমার যা হাতের তাগ তাতে ভরসা করে আর কোনও তিমি এ রাস্তা মাড়ালে হয়।

কোনও জবাব না দিয়ে গোমড়া মুখে আমি কামানটা একবার পরীক্ষা করার ভান করলাম, তারপর হারপুন জোড়াও দেখলাম খুব মন দিয়ে।

আমার কাণ্ডকারখানায় হাসাহাসিটা তখন মাঝি-মাল্লাদের মধ্যেও ছড়িয়ে গেছে। তাদের হাত তুলে একটু থামিয়ে ড্যানি বললে, অত খুঁচিয়ে দেখছ কী হে? কামানটা এ লাইনের সেরা কারখানায় তৈরি। আর প্রত্যেকদিন শিকারে আসবার আগে জাহাজের পাকা মিস্ত্রি দিয়ে পরীক্ষা করানো।

একটু থেমে সত্যি কথা থেকে আবার ঠাট্টায় ফিরে গিয়ে ড্যানি বললে, কিন্তু এ সব বাজে কামানবন্দুকে তোমার বোধহয় হাত খোলে না। একটা গুলতি-টুলতি এনে দেব কি?

কথাটা আর সে শেষ করতে পারলে না। হঠাৎ ওপরের এক মাল্লা চিৎকার করে উঠল, সামনে বাঁয়ে! চল্লিশ ফুটিয়া মাদি স্পার্ম—

ওই হাসি ঠাট্টার ভেতরও এ হাঁক শুনে সবাই উত্তেজিত হয়ে উঠল। আমি তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাফঝাঁপ দিয়ে একটা হই-চই বাধিয়ে চিৎকার করে বললাম, ঘোরাও জলদি স্টারবোর্ড।

স্টারবোর্ড কী বলছে আহাম্মক কোথাকার! হাসতে হাসতেই ধমক দিয়ে উঠল এবার ড্যানি, কোন দিকে পোর্ট কোন দিকে স্টারবোর্ড জানো না?

সব জানি, সব জানি। গম্ভীর আর বিরক্ত হয়ে বললাম, আমায় আর জাহাজের বিদ্যে শেখাতে এসো না, তাড়াতাড়িতে মুখ ফসকে একটু ভুল বেরিয়ে গেছে, তা নিয়ে অত কী?

না, তাতে অত কিছুই হয়নি। ড্যানি এখন আমায় নাচাবার খেলা ধরে বললে, কিন্তু মুখ ফসকে যা বার হয় হোক, কামানটা আর যেন না ফসকায়।

তাই কিন্তু ফসকাল।

প্রথম হারপুনটা মাদি তিমিটার ঠিক পেছনে পড়ে লেজে যেন একটু সুড়সুড়ি দিলে আর বোমার বারুদ-ভরা মাথা নিয়ে পরেরটা মাথার একেবারে কাছে দিয়ে গিয়ে গভীর জলে পড়ে ফাটল।

অন্যেরা হাসল কি রাগল কিছুই যেন খেয়াল না করে আমি হম্বিতম্বি লাগিয়ে দিলাম জাহাজ সরগরম করে।

বুঝেছি, বুঝেছি, আমি যেন চেঁচিয়ে আমার ভাগ্যকেই শোনালাম, আমার ওপর শাপ লেগেছে দুনিয়ার সব তিমির। সেই আদ্যিকাল থেকে যত তিমি মানুষের হাতে জান দিয়েছে তাদের প্রেতগুলোই আমার হাতের তাগ নাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমিও দেখে নেব। শরীরী অশরীরী যে যাই করুক সব শত্রুতা তুচ্ছ করে আজ স্পার্ম তিমি একটা ঘায়েল করবই। এবার যেটা আসবে সেটাকে শমনেই টেনেছে জেনো।

ভাগ্যও সেদিন যেন আমাদের বাজির খেয়ালে হাত লাগিয়েছে মনে হল। শমনে টানার খবর পেয়েই কি না জানি না, পর পর আরও তিনটে স্পার্ম তিমি আমাদের শিকারের জাহাজের নাকের সামনে দিয়ে নইলে ঘুরে যায়!

তারা ঘুরেই গেল শেষ পর্যন্ত। ক্রিকেটের ব্যাটে বলে না হওয়ার মতো আমার ছোড়া হারপনের সঙ্গে তাদের একটু ছোঁয়াছুঁয়িও হল না।

দুটোর পর তিনটে হারপুন ফসকাবার সময়েই ড্যানি গাওয়ারের মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল। তারপর চারটে ফসকাতে তার মুখে যেন ঝড়ের কালো মেঘ।

পাঁচটা ফসকাবার পর তার দিকে আর না তাকিয়ে আমি নিজেই কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে তুলেছি কামানটাকে ধরে।

অসম্ভব! অসম্ভব! এ নিশ্চয় কারও কারসাজি! আমায় জব্দ করবার জন্য কামানটা বিগড়ে রাখা হয়েছে।

একটা করে কথা বলি আর কামানটায় এটা-সেটা নেড়ে, পড়ে থাকা শেষ হারপুনটা দিয়েই তাতে খোঁচা দিই।

বেশিক্ষণ এ খেলা আর খেলা গেল না। একেবারে যেন সাক্ষাৎ গোরিলা হয়ে কামানটার দিকে ছুটে এসে ড্যানি বললে, কামান খারাপ? কেউ বিগড়ে রেখেছে? দেখবি তাহলে কামান ঠিক আছে কি না, আয় তোকেই কামানের সামনে ধরে দেখিয়ে দিচ্ছি কামান বিগড়েছে কি না!

কিন্তু দেখিয়ে দেবে কী! হারপুন কামানটা তখন সত্যিই অচল হয়ে গেছে আমার খোঁচাখুঁচিতে।

বেশ কিছুক্ষণ সেটা নাড়াচাড়ার চেষ্টা করেও বাগে আনতে না পেরে ড্যানি যে-দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল তাতে মনে হল বিনা হারপুনেই বুঝি এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাব।

শুধু তাকিয়েই ক্ষান্ত হবার পাত্র সে নয়। হরিণ ছানার দিকে কেঁদো বাঘের মতো আমার দিকে এগোতে এগোতে তার মুখ দিয়ে যেন ফেনা ওঠার মতো দাঁত কিড়মিড় করা ক-টা আওয়াজ তখন বেরিয়ে আসছে—তুই! তুই এই শয়তানি মতলব নিয়ে জাহাজে এসেছিলি! পাঁচ পাঁচটা শিকার আমার নষ্ট করেছিস, তারপর আবার কামানটাও দিয়েছিস বিগড়ে!

ড্যানি যত এগোয় আমি তত যেন অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ আর অবাক হয়ে পেছোই জাহাজের ডেকের ওপর।

পেছোতে পেছোতে নালিশের সুরে বলি, এ তোমার কী রকম ব্যাভার! বাজি জিতে অত রাগারাগি কীসের? তুমি জিতেছ আমি হেরেছি। এইতেই তো সব চুকে গেল, ব্যস। হারার শাস্তি আমি অবশ্য নিচ্ছি। এই যে মলছি নিজের কান আর

ড্যানি শেষটা ঝাঁপিয়ে আসবার আগে আমি কান দুটো মলে, ডেকের রেলিং টপকে নীচের জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম।

সেই যে পড়লাম তার পর থেকে ড্যানি গাওয়ারের কাছ থেকে পালিয়েই বেড়াচ্ছি।

শেষ লুকোবার জায়গা আটকা থেকে তার কাছে ধরা পড়ায় খুব দুঃখিত কিন্তু আমি নই। ঠিক এই সময়টিতেই ধরা পড়ায় তার মধ্যে যেন ভাগ্যের হাত আছে বলতে ইচ্ছে করে।

 

কয়েক ঘণ্টা বাদে ড্যানি এসে যখন কেবিনের দরজা খুলল তখন ভাবনা-চিন্তা যা করবার করে নিয়ে ক্যাপ্টেনের বিছানাতেই আমি ঘুমোচ্ছি।

ঘুমোচ্ছ তুমি! আমায় এই অবস্থায় ঘুমোতে দেখেই ড্যানি আবার তুই থেকে তুমি-তে উঠে এল কিনা কে জানে! কিন্তু নিজেই বেশ একটু যেন অপমানিত বোধ করে রেগে বললে, মাথার ওপর এমন খাঁড়া নিয়ে ঘুমোতে তুমি পারছ!

পারলাম তো দেখছি। আমি যেন এ বেয়াদবির জন্য দুঃখিত হয়ে বললাম।

হুঁ, পাগল! ড্যানি গাওয়ার গজরাতে গজরাতে বললে, ভাবছ—খাঁড়াটা ওই পেপার টাইগার-এর মতো কাগজে আঁকা খাঁড়া! ড্যানি গাওয়ার কি সত্যিই স্যালব্যানিতে ধরে নিয়ে গিয়ে যা বলেছে তাই করতে পারবে—এইরকম ভাবছ, কেমন? ভাবছ ড্যানি মুখেই শাসাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত দুটো গালাগাল আর গাঁট্টাটাট্টা দিয়ে ছেড়ে দেবে! কিন্তু ড্যানিকে তাহলে চেনো না। ওই যেমন যেমনটি বলে রেখেছি ঠিক তাই করব অ্যালব্যানিতে নিয়ে গিয়ে। তিমিদের ওপর বড় দয়া তোমার। একেবারে দয়ার সাগর! তিমি মারবে না বলে ইচ্ছে করে হারপুনগুলো ভুল টিপ করে ছুড়েছ! আমার কামানটা পর্যন্ত নষ্ট করে দিয়ে এসেছ। তার শোধ আমি নিই কি না দেখবে। তোমায় দিয়ে ওই তিমিই শিকার করাব। আর এবারে একটা হারপুন যদি ফসকায় তাহলে হারপুন বাঁধা রশি গায়ে জড়িয়ে দিয়ে গোলা ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিমা বানিয়ে ছাড়ব।

ভাবছ, এসব পারব না! পারি কি না দেখবে। আমার বুকের ভেতরটা জ্বলছে না। এই এক বছর ধরে? কী লোকসান আমার করিয়েছ তা জানো? তিমি ধরা মহলে আমার মান সম্মান তো গেছেই, তার ওপর এক বছরে একটা তিমি না ধরতে পেরে সব কাজ কারবার আমার লাটে উঠেছে। আমি ড্যানি গাওয়ার আজ দেউলে হতে চলেছি, শুধু তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্য!

ড্যানি গাওয়ারের এই সমস্ত গজরানি অ্যাটকা থেকে আডাক যাবার টাগবোটর কেবিনে বসেই অবশ্য শুনতে হয়নি।

টাগবোটের কেবিনে যা আরম্ভ হয়েছিল, আমাকে নেমে তার নিজের প্লেনে চড়ার পরও সে গজরানি সমানে চলেছে, আর শেষ হয়েছে সে প্লেন থেকে অ্যারিজোনার গিলা নদীর উপত্যকায় আমার নির্দেশমত নামার পর।

যতক্ষণ সে কথা বলে গেছে ধৈর্য ধরেই শুনেছি। শুধু প্লেন থেকে আমার দিকে আঙুল তুলে তার শেষ আস্ফালন মেশানো আক্ষেপ জানাবার পর যেন অনুশোচনার সঙ্গে বললাম, তোমার এসব লোকসানের হিসেব করে রেখেছি। আশা করি তা পুষিয়ে দিয়ে শোধ করার ব্যবস্থা করতে পারব।

শোধ করার কথা শুনেই আবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছে ড্যানি গাওয়ার। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তৎক্ষণাৎ তুমি থেকে তুই-তে নেমে বলেছে, লোকসান শোধ করে দিবি তুই? তোর মতো চিমসে চামচিকে করবে ড্যানি গাওয়ারের কারবারের ক্ষতিপূরণ? জানিস কত লক্ষ লক্ষ ডলার এই তিমি শিকারের কোম্পানিতে আমি ঢেলেছি? অ্যালব্যানির মূল ঘাঁটি ছাড়া সারা পৃথিবীতে কত আমাদের তিমি ধরা আর তেল বার করার আস্তানা আছে তা জানিস? সে সব লোকসান তুই মিটিয়ে দিবি?

দেব, একটু জোর দিয়েই বললাম এবার, শুধু একটি শর্ত তোমায় মানতে হবে।

শুধু একটি শর্ত? ড্যানি সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল, কী শর্ত?

বলছি, একটু দাঁড়াও! বলে যা করতে যাচ্ছিলাম ড্যানি তা করতে দিলে না।

আমি তার সঙ্গে আবার কিছু চালাকি করছি ভেবে ঘাড়টা ধরে আমায় আটকে রেখে জ্বলন্ত গলায় বললে, কী সে শর্ত বলবার আগে আমার আর একটা প্রশ্নের জবাব দে? যে শর্তের কথা বলতে চাইছিস তা কি প্লেনের তেল পুড়িয়ে এতদূরের এই অ্যারিজোনার মরুভূমির মাঝখানে না নেমে বলা যেত না। কথাটা সেই অ্যাটকা থেকে আডাকে এসেই কি বলতে পারতিস না।

না, তা বলা যেত না, মাথা নেড়ে জানালাম, তা ছাড়া অন্য কোথাও বললে কথাটা তোমায় বিশ্বাস করাতেই পারতুম না। এখানকার মতো এমন জোরও হত না কথাটায়।

হুঁ? এবারে বিদ্রুপ না করে যেন পারল না ড্যানি—এই আগাছার ঝোপ-সম্বল মরুভূমিটায় এমন জাদু আছে যে এখানে কথা বললেই তার দাম বেড়ে যাবে?

একটু থেমে বেশ একটু সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আমাকে লক্ষ করতে করতে ড্যানি তারপর জিজ্ঞাসা করলে, আচ্ছা, বেশ বলো শুনি, কী তোমার শর্ত যা পালন করলে আমার

সমস্ত লোকসান তুমি মিটিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবে।

শোনো তাহলে, ধীরে ধীরে বললাম, তিমি শিকারের কারবার তোমায় একেবারে ছাড়তে হবে আর–

এর বেশি এগোবার আর সুযোগ পেলাম না।

এবারে একটু ধৈর্য ধরেই শোনবার চেষ্টা করছিল ড্যানি। কিন্তু শর্তটা রাখতে তিমি শিকার চিরকালের মতো ছাড়তে হবে শুনে এক মুহূর্তে সত্যিকার গোঁয়ার গোরিলা হয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

এখন আর অহংকারে সুড়সুড়ি দেবার সময় নেই। তাই গাটায় একটু ঝাঁকুনি দিতে

হল।

তারপরও তাকে ঠাণ্ডা করতে একটু সময় লাগল।

অ্যারিজোনায় গিলা নদীর উপত্যকার সেই আধামরুর একটা বুনো ঝোপের ওপর সচাপটে গিয়ে পড়েও তার রোক কি সহজে যায়!

তুই সুঁটকো চামচিকে! তোর এতবড় আস্পর্ধা! বলে আবার এল আমার দিকে ছুটে। তবে এবার আর আগের মতো অসাবধানে নয়। বেশ একটু হুঁশিয়ার হয়েই এল।

তা সত্ত্বেও আবার সেই ঝোপটার ওপরেই গিয়ে পড়ে ড্যানি সত্যি এবার হতভম্ব।

খানিকক্ষণ তার আর নড়নচড়ন নেই।

হাড়গোড় কিছু ভাঙল কিনা দেখবার জন্য তার দিকে এগিয়ে যেতেই আবার। একবার তেড়েফুঁড়ে ওঠবার চেষ্টা করলে।

তারপর নিজেই কী বুঝে হতাশভাবে কাঁধ দুটো ঝাঁকিয়ে একটু বেঁকেচুরে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, বলো কী বলতে চাও! তিমি শিকার না হয় ছাড়লাম, তারপর আমার লাভ-লোকসান পুষিয়ে যাবে কীসে?

যে-ঝোপটার ওপর সে দু-দুবার গিয়ে পড়েছিল সেই বুনো ঝোপটারই জংলা খুঁটি সমেত একটা ভাঙা ডাল কুড়িয়ে এনে তার হাতে দিয়ে বললাম, এই তোমার সব দুঃখু ঘোচানো মুশকিল আসান। স্পার্ম তিমির বংশ বাঁচানোর জাদুকাঠি।

এক পলকের জন্য ড্যানির চোখ দুটো জ্বলে উঠতে গিয়েই আবার নিভে গেল।

মড়ার ওপর যেন খাঁড়ার ঘা দিয়েছি এমনই করুণ কাতর মুখ করে বললে, তোমার জন্যই সর্বস্বান্ত হয়ে তোমার হাতেই এখন পড়েছি। যত পারো ঠাট্টা করে নাও।

ঠাট্টা তোমায় করছি না, ড্যানি, গাঢ় অন্তরঙ্গতার সঙ্গে তাকে বললাম, সত্যিই এ মরুভূমির এই বুনো সিমের ঝোপ স্পার্ম তিমির বংশরক্ষা থেকে দুনিয়ার সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির তেল জোগানো পর্যন্ত অবিশ্বাস্য সব অসাধ্যসাধন করতে পারে।

অ্যারিজোনা মরুভূমির এ বুনো সিমের ঝোপকে এখানকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানরা বলত, হো-হো-বা! এ অঞ্চলের মানুষ সেকালে এই বুনো সিমের তেল ধন্বন্তরী মনে করত পেটের অসুখ থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত সব রকম রোগের। এ যুগের সভ্য শিক্ষিতেরা বুনো সিমের এসব গুণের খ্যাতি হেসে উড়িয়ে দিলেও তেলটা একেবারে অবহেলায় পড়ে থাকেনি। এ অঞ্চলের প্রথম স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকরা এই জলের মতো রংছুট মোম জাতের তেল তাদের গোঁফ পাকাতে অন্তত ব্যবহার করত।

তারপর উনিশশো ত্রিশ সালে এই অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়েরই কৃষি কলেজের এক রাসায়নিকই গবেষণা করে বার করেন যে স্পার্ম তিমির মাথার তেলের সঙ্গে এই বুনো সিম হো-হোবার তেলের আশ্চর্য মিল আছে।

রাসায়নিকের সে আবিষ্কারে কেউ তেমন নজর দেয়নি, কারণ তখনও অবাধে স্পার্ম তিমি শিকার চলছে সারা দুনিয়ায়। স্পার্ম তিমি তখন নির্বংশ হবারও উপক্রম হয়নি।

আজ এ-তিমির বংশ লোপের সম্ভাবনা দেখে দুনিয়ার সর্বত্র বৈজ্ঞানিক ব্যবসায়ী মহলের টনক নড়েছে। স্পার্ম তিমির তেলের বদলি কী হতে পারে তাই খুঁজছে সবাই হন্যে হয়ে।

যা খুঁজছে হাতের কাছে এই মরুভূমিতেই কিন্তু প্রায় অবহেলায় পড়ে আছে।

তিমির বংশ বাঁচাবার জন্য যোঝবার সময়ই অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রাসায়নিকের গবেষণার রিপোর্ট আমার চোখে পড়ে।

অ্যালবানির সমুদ্রে ওইভাবে তোমার সঙ্গে চালাকি করে তিমি শিকার বন্ধ করার পর সেখান থেকে পালিয়ে নানা জায়গা আমি অকারণে ঘুরে বেড়াইনি। ইনটারন্যাশন্যাল হোয়েলিং কমিশনকে চিঠির পর চিঠি যেমন লিখেছি, লেনিনগ্রাড আর সানফ্রানসিসকোর বড় বড় ল্যাবরেটরিতে হো-হোবা সিমের তেলের গুণাগুণও তেমনই পরীক্ষা করিয়েছি। অ্যাটকা থেকে চলে আসার সময় যেদিন তুমি আমায় ধরে ফেলো, সেইদিনই একসঙ্গে দু ল্যাবরেটরির চিঠি আমি পাই। দু জায়গার রিপোর্টই এক। হো-হোবা সিমের তেল অনায়াসে স্পার্ম তিমির তেলের বদলে ব্যবহার করা যায়।

একটু থেমে পকেট থেকে দু জায়গার রিপোর্ট দুটো বার করে ড্যানির হাতে দিয়ে এবার বললাম, এই নাও সব রিপোর্ট। এখন এর পর যতটা পারো ইজারা নিয়ে ফলাও করে হো-হো-বার চাষ শুরু করো। লোকসান যা দিয়েছ তার ডবল লাভ পাবে।

ড্যানি গাওয়ার সেই চাষই শুরু করেছে বলে জানি।

 

ঘনাদা থামলেন। তারপর একটু উসখুস করে বললেন, ওহে একটা কথা মনে হল হঠাৎ। তোমাদের ওবেলার মেনুতে চপ-সুই-টা কি লেখা আছে?

থাকবে, ঘনাদা, থাকবে! আমরা সমস্বরে ভরসা দিলাম।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *