০১. পায়ের তলা কাদা

পায়ের পাতা কাদায় একটুখানি গেঁথে যেখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গলার রগ টানটান করে যতোটা পারে উঁচুতে তাকিয়ে গাঢ় ছাই রঙের মেঘ তাড়াতে তমিজের বাপ কালো কুচকুচে হাত দুটো নাড়ছিলো, ঐ জায়গাটা ভালো করে খেয়াল করা দরকার। অনেকদিন আগে, তখন তমিজের বাপ তো তমিজের বাপ, তার বাপেরও জন্ম হয় নি, তার দাদা বাঘাড় মাঝিরই তখনো দুনিয়ায় আসতে ঢের দেরি, বাঘাড় মাঝির দাদার বাপ না-কি দাদারই জন্ম হয়েছে কি হয় নি, হলেও বন-কেটে বসত-করা বাড়ির নতুন মাটি ফেলা ভিটায় কেবল হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে, ঐসব দিনের এক বিকালবেলা মজনু শাহের বেশুমার ফকিরের সঙ্গে মহাস্থান কেল্লায় যাবার জন্যে করতোয়ার দিকে ছোটার সময় মুনসি বয়তুল্লা শাহ গোরা সেপাইদের সর্দার টেলরের বন্দুকের গুলিতে মরে পড়ে গিয়েছিলো ঘোড়া থেকে। বন্দুকের গুলিতে ফুটো গলা তার আর পুরট হলো না। মরার পর সেই গলায় জড়ানো শেকল আর ছাইভস্মমাখা গতর নিয়ে মাছের নকশা আঁকা লোহার পান্টি হাতে সে উঠে বসলো কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছের মাথায়। সেই তখন থেকে দিনের বেলা রোদের মধ্যে রোদ হয়ে সে ছড়িয়ে থাকে সারাটা বিল জুড়ে। আর রাতভর বিল শাসন করে ওই পাকুড়গাছের ওপর থেকেই। তাকে যদি এক নজর দেখা যায়–এই আশায় তমিজের বাপ হাত নাড়াতে নাড়াতে আসমানের মেঘ খেদায়।

তা না হয় হলো, কিন্তু এখন থেকে দুই বছর সোয়া দুই বছর পর, না-কি আড়াই তিন বচ্ছরই হবে, বিলের পানি মুছতে মুছতে জেগে-ওঠা ডাঙার এক কোণে চোরাবালিতে ড়ুবে মরলে তমিজের বাপটা উঠবে কোথায়? তাকে ঠাঁই দেবে কে? বড়ো বানের ছোবলে বড়ো বড়ো কঁঠালগাছ তো সব সাফ হয়ে গেছে মেলা আগে, শরাফত মণ্ডলের বেটা ইটখোলা করলে বাকি গাছগুলোও সব যাবে ভাটার পেটে। তখন? তখন তমিজের বাপ উঠবে। কোথায়? দিনে দিনে বিল শুকায়, শুকনা জমিতে চাষবাস হয়, জমির ধার ঘেঁষে মানুষ ঘর তোলে। বড়ো বিরিক্ষিকে জায়গা দেওয়ার মতো জায়গা তখন কি আর পাওয়া যাবে?

দিনের বেলা হলে ভালো করে দেখা যায়,-বিলের পশ্চিমে বিলের তীর থেকে। এদিকে খালপাড় পর্যন্ত জায়গাটা এখন পর্যন্ত খালিই পড়ে রয়েছে। তারপরই মাঝিপাড়া। মাঝিপাড়ার মানুষ অবশ্য নিজেদের গ্রামকে ওভাবে ডাকে না, গোটা গ্রাম জুড়ে তো আগে তাদেরই বসবাস ছলো। এখন পাঁচ আনা ছয় আনা বাসিন্দাই চাষা। আগে কয়েক ঘর কলু ছিলো, আট মাইল পশ্চিমে টাউনে তবিবর মুক্তারের রহমান অয়েল মিল হওয়ার তিন বছরের মধ্যে কলুদের অর্ধেকের বেশি চলে গেলো পুবে যমুনার ধারে। যে কয় ঘর আছে তাদের কারো কারো ঝোঁক জমিতে আবাদ করার দিকেই বেশি।

বিলের ওপারে অনেকটা জমি জুড়ে চাষবাস, তারপর ছোটো খালটা পার হলে চাষাদের গ্রাম। সেখানে একেকটা ঘরের পাশে বাঁধা গোরু, বৃষ্টির পানিতে ভিজে কালচে হয়ে-যাওয়া হলদে খড়ের ভাঙাচোরা গাদা, ভেরেণ্ডা ঝোপের পাশে গোবরের সার, কলাগাছের ঝাড়, বৌঝিদের আব্রু করতে শুকনা কলাপাতার পর্দা, ঘরের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা লাঙল, মই ও জোয়াল। সকাল থেকে দুপুর, এমন কি আষাঢ়ের বিকালে বৃষ্টি না হলে সন্ধ্যাবেলাতেও এপারে দাঁড়িয়ে ওপারটা স্পষ্ট দেখা যায়। শরাফত মণ্ডলের হাতে খাজনা দিয়ে দূৰদূরান্তের জেলেরা এসে মাছ ধরে। ওপারের চাষারা, চাষাদের বৌঝিরা পর্যন্ত সার করে দাঁড়িয়ে তাই দেখে। সেসব দিনে বিলে হুলুস্থুল কাণ্ড। জেলে আর কয়জন? সংখ্যায় তাদের তিন গুণ চার গুণ বেশি চ্যাংড়াপ্যাংড়া বিলের তীরে লাফাতে লাফাতে হৈ চৈ করে। তখন কি বিল কি জমি, কি পানি কি ডাঙা কারো কোনো আব্রু নাই। তখন মানুষ বলো, গোরুবাছুর বলো, মেয়েমানুষ বলো আর ছোলপোল বলো, মাছবলো শামুক বলো, সব, সব শালা উলঙ্গবাহার হয়ে বেহায়ার। মতো খ্যামটা নাচন নাচে।

এখন রাত। এখন কিন্তু অমন নয়। সন্ধ্যা থেকে আবছা কালো পাতলা একটা জাল পড়ে বিলের ওপর, সন্ধ্যা গড়ায় রাত্রিতে আর ঐ অদৃশ্য জালের বিস্তার বাড়ে ঐ সঙ্গে। অন্ধকার গাঢ় হতে হতে সেই বেড় জালের নিচে ধরা পড়ে সমস্ত এলাকা। রাত বাড়ে, রাত আরো বাড়ে, কেউ টের পাবার আগেই শুরু হয় জাল গোটানো। পাকুড়গাছ থেকে টান পড়ে জালের দড়িতে, আস্তে আস্তে দুই পাড়ের গ্রাম নিয়ে গোটা বিল তিরতির করে কাঁপতে কাঁপতে এসে থিতু হয় বিলের মাঝখানে। পূর্ণিমা, অমাবস্যা, একাদশী-কী শুক্লপক্ষ কী কৃষ্ণপক্ষ-গিরিরডাঙা-নিজগিরিরডাঙা-কাৎলাহার বিলের দুই পাড়ের দুই গ্রাম এই বিলের মধ্যে একাকার হয়ে যায়। তখন যাই দেখো, একটার থেকে আরেকটার ফারাক ধরতে পারবে না। তখন বিলের সিথান থেকে সেই পাকুড়পাছ মস্ত ছায়া ফেলে বিলের ওপর। রাত বাড়ে, বিলু জুড়ে তার ছায়া খালি ছড়াতে থাকে, ছড়াতেই থাকে। অমাবস্যার ঘনঘোট অন্ধকার কি পূর্ণিমার হলদে জ্যোৎস্না কিংবা কৃষ্ণপক্ষের ঘোলা লাল আলোয় সেই মস্ত ছায়া গতরে মুড়ে কাৎলাহার বিল, বিলের দুই পাশে গ্রাম, বিলের কাছে খাল, বিলের সিথানে পাকুড়তলা, ওদিকে দক্ষিণে শরাফত মণ্ডলের টিনের বাড়ি এবং বাড়ির পুবে সাদা বকে-ছাওয়া শিমুল গাছ-সব, সবই মায়ের কাছে ভাতের জন্যে কাঁদতে কাঁদতে গায়ে মাথায় জাল জড়িয়ে ঘুমিয়ে-পড়া মাঝিপাড়ার বালকের মতো একটানা নিশ্বাস নেয়। সেই নিশ্বাসের টানে ফেঁপানির রেশ। সব একসঙ্গে দেখার তখন ভারী জুত। এই সময় বেড়জালের দড়ি টানতে টানতে বিলের মাঝখানের আসমানে এসে দাঁড়ায় মুনসি বয়তুল্লা শাহ। তার আগে সাঁতার কেটে কেটে চলে যায় ভেড়ার পাল। মুনসিকে এক নজর দেখার সুযোগটা নিতেই তমিজের বাপের এখানে আসা। মুনসি কখনোই বেশিক্ষণ থাকে না। ওপরে আসমান আর নিচে পানি ও জমিন একেবারে একাকার। সবখানে মুনসির ইচ্ছামতোন বিচরণ। সবাইকে একটি লহমার জন্যে এক জায়গায় ঠাঁই করে দিয়ে জাল নিয়ে সে উড়াল দেবে উত্তরের দিকে। বাঙালি নদীর পথভোলা রোগা একটি স্রোত এসে মিশেছে। সেখানে কাৎলাহার বিলে। বিলের শিওরে পাকুড়গাছে বসে সকাল থেকে শকুনের চোখে মণি হয়ে ঢুকে মুনসি সূর্যের আকাশ পাড়ি দেওয়া দেখবে, দেখতে দেখতে হঠাৎ রোদে মিশে গিয়ে রোদের সঙ্গে রোদ হয়ে ওম দেবে বিলের গজার আর শোল আর রুই আর কাৎলা আর পাবদা আর ট্যাংরা খলসে আর পুঁটির হিম শরীরে। আর হয়রান হয়ে পড়লে পাকুড়গাছের ঘন পাতার আড়ালে কোনো হরিয়াল পাখির ডানার নিচে ছোটো একটি লোম হয়ে নরম মাংসের ওমে টানা ঘুম দেবে সারাটা বিকাল ধরে।

বিলের শিওরের আরো উত্তরেও কিন্তু সবই মুনসির কবজায়, সেখানেও তারই। রাজত্ব। তা তমিজের বাপ সেখানে গিয়েছে বৈ কি! সেখানে অনেক দিনের ঘন কাশবন সাফ করে পাটের জমি তৈরির আয়োজন করেছিলো শরাফত মণ্ডল। তখন পৌষ মাস। খুব ভোরবেলা কুয়াশার নিচে দুটো নৌকা করে নিজগিরিরডাঙার চাষাদের সঙ্গে এপারের মাঝিপাড়ার কয়েকজন গেলো, তমিজের বাপও চললো কামলা খাটতে। কাশবনে ওই সময়ে পানি থাকে না বলে তখনি এই উদ্যোগটা নেয়। কিন্তু না, কাশবনে খটখটে শুকনা জায়গা কোথাও নাই। তখনো পায়ের নিচে প্রতিটি কদমে পানি ছপছপ করছিলো। পৌষ মাসের হিম কাটাতে হাজার হাজার জোঁক গা শুকাচ্ছিলো কাশগাছের রোগা কাণ্ডে, তদের ভারে গাছগুলো একটু একটু নুয়ে পড়েছিলো। এতোগুলো মানুষ কাস্তেকোদাল নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়লে দারুণ বুভুক্ষু জোঁকগুলো নিজেদের পছন্দমতো দলে দলে একেকজন কামলার হাতে পায়ে পেটে তলপেটে উরুতে নুনুতে পাছায় হাঁটুতে, এমন কি গোয়ায়-যে যেখানে সুবিধা করতে পারে—খামচে ধরে ঝুলে পড়লো। তাদের বহুকালের খিদে মেটাতে গিয়ে গিরিরডাঙার মাঝি ও নিজগিরিরডাঙার চাষারা ঠিক ভয় না পেলেও যন্ত্রণায় সেগুলো ছাড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে এবং শরীরের কোনো না কোনো জায়গায় আস্ত জোঁক বা জোঁকের কামড়ের দাগ নিয়ে ঘরে ফেরে সন্ধ্যার পর। তা ওই জমি ব্যবহারের জন্যে শরাফত মণ্ডলকে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো আরো কয়েকটা বছর। তাও সে নিজে নয়, তার বড়োবেটা। ওটার পত্তনি নেবে তখন ওখানে কাশগাছ একটাও নাই। চাষা ও মাঝিদের গতরে জোঁকের গাঢ় চুম্বনের রেশ মুছে যাবার আগেই কাশবনের বন্দোবস্ত নিয়েছিলো টাউনের উকিল রমেশ বাগচি। টাউনের বাবু,-জোতজমি করা কি এদের কাজ? তার বেকার ভাগ্নে টুনুবাবুকে জমির তদারকির ভার দিয়ে রমেশবাবু নিশ্চিন্ত হতে পারে না। টুনুবাবুকে সাহায্য করার জন্যে এবং তার ওপর একটু নজর রাখার জন্যেও বটে, রমেশবাবু এদিককার একজন বেশ কর্মঠ, বিশ্বাসী ও বোকাসোকা মানুষ খুঁজছিলো। তমিজের বাপ ইচ্ছা করলেই সুযোগটা নিতে পারতো। খবরটা যখন পায় তার তখন একরকম উপাস চলছে, তমিজের মায়েরও আটমাস, কাজকাম করতে পারে না।

কিন্তু শরাফত মণ্ডল বললো, বিলের উত্তর সিথান জায়গা ভালো লয়। হুঁশিয়ার হয়া কাম করা লাগবি। তা মণ্ডল তো মিছা কয় নি, মুনসির রাগ একটু বেশিই বটে। কারো ওপর মুনসির আসর একবার হয় তো সারা জীবনের মতো তার সব কাজ কাম বন্ধ। তখন তার কিসের বৌ আর কিসের বেটাবেটি! তমিজের বাপ জাহেল মাঝির বেটা, পাক নাপাকের সে জানে কী? সেখানে গিয়ে কখন কী করে বসে সেই ভয়ে সে একেবারে গুটিয়ে পড়লো। তারপর আট মাস শেষ না করেই একটি মরা মেয়ে বিয়ে তমিজের মা মণ্ডলবাড়ির বৌঝিদের মতো বিছানায় শুয়ে পড়লে মণ্ডলের দুই নম্বর বিবি গলা নিচু করে সাবধান করে দেয়, তমিজের বাপ, বিলের সিথানে যাওয়া আসা করার চিন্তা করিস না। আবার কী মুসিবত হয় কে জানে?

এসব সেই কোন কালের কথা, কত বছর আগে, সে হিসাব করা তমিজের বাপের সাধ্যের বাইরে। আর দেখো, আজকাল মুনসিকে একটু দেখার লালচে সেই তমিজের বাপ রাতবিরেতে ঘুমের মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিলের ধারে এসে হাজির হয় একই রাস্তা ধরে। তা মুনসির কোনো আলামত দেখতে হলে রাত্রিবেলাই হলো ঠিক সময়। তমিজের বাপের হাতের ঢেউয়ে ঢেউয়ে মেঘের গাঢ় ছাই রঙ হালকা ছাই হয়ে আসছে। এইবার বিলের পানিতে ভেড়ার পাল হাবুড়ুবু খেতে খেতে সাঁতার কাটবে। ছাইরঙ ঝেড়ে ফেলে মেঘ সম্পূর্ণ হাওয়া হয়ে যাবে। তখন ভেড়াগুলোর ময়লা সাদা পশমে ঢাকা শরীর দেখে ভেড়া বলে সনাক্ত করা সোজা। তা শালার মেঘ আর কাটে কৈ? মেঘ কাটলেই না ভেড়াগুলোর পিছে পিছে এসে হাজির হবে মুনসি। তার হাতে মাছের নকশা কাটা লোহার পান্টি। এই পান্টি তার হাতের সঙ্গে জোড়া লাগানো, বড়ো একটা আঙুলের মতো বেরিয়ে এসেছে তার হাতের তালু থেকে। মুনসির গলার ফাঁক দিয়ে তার হাঁকডাক দিনদিন একটু একটু করে কমলেও তার দাপটে শরীর এখনো কাঁপে। ওই ফাঁকের জন্যে সে কথা বলতে পারে না, তবে ওখান থেকে প্রচণ্ড বেগে বাতাসের যে ধমক বেরিয়ে আসে ভেড়ার পালের কাছে তার হুকুম বোঝার জন্যে তাই মেলা। চার পা ছুড়ে তারা সাতার কাটে, হাবুড়ুবু খায়। উত্তরে পাকুড়গাছ থেকে দক্ষিণে শিমুলগাছ, এমন কি উত্তর পূর্বে পোড়াদহ মাঠ ছুঁয়ে পানিতে সারারাত তাদের ডোবা ও ভাস, যাওয়া ও আসা সব চলে এই বাতাসের গর্জন মোতাবেক। তাদের তোলপাড়-করা চলাচলে বিলের সব মাছ সরে সরে যায়। প্রবীণ বোয়াল কি বুড়ো বাঘাড় তার পরিবার। পরিজন নিয়ে অনেক নিচে ড়ুব দিয়ে বিলের তলায় শ্যাওলায় কিংবা সোয়াশো বছর আগে ভূমিকম্পে তৈরি বন্যার তোড়ে মাঝির হাত থেকে খসে-পড়া বৈঠায় বুক পেতে অপেক্ষা করে, কখন ভেড়ার পাল গুটিয়ে নিয়ে ভেড়াগুলোকে গজার মাছের চেহারা ফিরিয়ে দিয়ে মুনসি এদের পাঠিয়ে দেবে বিলের নির্ধারিত জায়গায়। আর নিজে উঠে পড়বে পাকুড়গাছের মগডালে। তারপর? পরদিন সারাটা দিন ধরে শকুনের চোখের ধারালো মণি হয়ে আকাশ ফালা ফালা করে ফৈলবে। আর যদি ফুর্তি ওঠে তো রোদের মধ্যে রোদ হয়ে মিশে বিলের পানিতে তাপ দেবে। আর হাপসে গেলে পাকুড়গাছের ঘন পাতার আড়ালে হরিয়াল পাখির ডানার তলে লোমের মধ্যে লোমশিশু হয়ে হরিয়ালের নরম মাংসের ওমে টানা ঘুম দেবে একেবারে সন্ধ্যাবেলা পর্যন্ত।

তা না হয় হলো, কিন্তু এখন?—ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এতোদূর এসে তমিজের বাপ এখন মুনসিকে কৈ কোথাও দেখতে পায় না। জাগরণে তাকে দেখতে পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার, স্বপ্নের আড়ালেই কি সে রয়ে যাবে চিরটা কাল? মুনসি মানুষ ভালো লয় গো। মানুষটা মুনসি ভালো লয়! ব্যামাক মানুষের আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে থাকতে সে বড়ই ওস্তাদ।হায়! হায়! মুনসি কি মানুষ নাকি? তওবা! তওবা! মুনসিকে মানুষের সারিতে নিয়ে এলে তোরকম বালামুসিবতই না সে দিয়েই চলবে! মরার আগে পর্যন্ত মুনসি হয়তো মানুষই ছিলো। তা সে কি আজকের কথা? সেই কোন আমলে এক বিকালবেলা বেলা ডোবার আগে আগে মজনু শাহের হাজার হাজার বেশুমার ফকিরদের সঙ্গে করতোয়ার দিকে ছোটার সময় গোরাদের সর্দার টেলরের বন্দুকের গুলিতে মরে সে পড়ে গিয়েছিলো সাদা ঘোড়া থেকে। সব্ব অঙ্গে তীর-বেঁধা সেই ঘোড়া উড়ে গেলো কোথায় কে জানে, আর এখানে এই কাদায় পড়ে থাকতে থাকতে মুনসির লাশ জ্বলে উঠলো লাল আগুন, নীল আগুন, কালো আগুনের শিখায়। তিন দিন তার জ্বলন্ত শরীর ছোঁয়ার সাহস কারো হলো না, কাফন দাফন সবই বাকি রইলো দেখে মুনসি কী আর করে, গুলিতে ফাঁক-করা গলা নিয়ে সোজা চড়ে বসলো পাকুড়গাছের মাথায়। মুনুসি সেই থেকে আগুনের জীব। তার গোটা শরীর, তার ল দাড়ি, তার কালো পাগড়ি, তার বুকের শেকল, তার হাতের পান্টি সবই এখন আগুনে জ্বলে। এরকম একটা মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করে ফেলার ভয় ও আফসোসে তমিজের বাপ চমকে চমকে ওঠে। হয়তো এই চমকেই ধাক্কা খায় তার ঘুমের ঘনঘোর আন্ধার। হঠাৎ ঘুম-ভাঙা মানুষের মতো চোখ মেলে সে পা ফেলে সামনে। পায়ের গিরে-সমান পানিতে নিজের পায়ের ছপছপ আওয়াজে সে শোনে মুনসির গলা থেকে বেরুনো চাপা গর্জনের বন্ধু কাত্রানি। আশায় আশায় তার বুক ছটফট করে : এই বুঝি মুনসির দেখা পাওয়া গেলো! ভয়ে ভয়ে তার বুক ছমছম করে : এই বুঝি রে মুনসি এসে পড়লো! বিলের শাপলার মূল তার পায়ে ঠেকলে একটু উপুড় হয়ে সে আঁকড়ে ধরে শাপলার ডাঁটা। কিন্তু শাপলার লতা কি তার শরীরের ভার বইতে পারে? বিলের তলার কাদাই তাকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্যে যথেষ্ট। তার হাতের মুঠোয় ছিড়ে চলে আসে শাপলার পাপড়ির দোমড়ানো টুকরা। হেঁড়া পাপড়ির নরম ছোঁয়ায় তার ঘুমের পাতলা কয়েকটা খোসা উঠে গেলেও ঘুম কিন্তু সবটা কাটে না। তার মধ্যে হাঁটি হাঁটি পা পা করে সে চলতে থাকে বাড়ির দিকে। তার হাতে শাপলার হেঁড়াখোঁড়া পাপড়ি। কাধে জাল। তন্দ্রা কেটে যাবার আগেই পথ চলার একেকটি কদমে তন্দ্রা ফের ঘন হতে থাকে ঘুমে।

কিন্তু সবসময় কি এমনি হয়?-না কোনো কোনো দিন টানা কোনো আওয়াজে তমিজের বাপের ঘুম একদম ভেঙে গিয়েছে। অনেক দূর থেকে, পাকুড়গাছ ছাড়া আর কোখেকে হবে?-ভাঙা ভাঙা গলায় টেনে টেনে কে যেন কয়,

সিথানে পাকুড়গাছ মুনসির বসতি।
তলায় গজার মাছ অতি হিংস্ৰমতি।।
গভীর নিশিতকালে মুনসির আদেশে।
বিলের গজার মাছ রূপ লয় মেষে।।

এর পরেও অনেক কথা শোনা যায়, কিন্তু তমিজের বাপ দারুণভাবে চমকে ওঠায় সেগুলো চলে যায় তার কানের এখতিয়ারের বাইরে, ফলে মাথায় চুলকানি তুলেই সেসব হারিয়ে যায়। এমন হতে পারে যে, কথাগুলো তার শরীর জুড়ে শিরশির করছিলো। সেগুলো শব্দের আকার পেতে না পেতে তমিজের বাপের ঘুম ভাঙে এবং ততক্ষণে আওয়াজটি ফিরে গেছে পাকুড়গাছে। যে বাতাসে ভর করে আওয়াজ আসে তারই প্রবল। ঝাপটায় এর পরের কথাগুলো উড়ে যায় দক্ষিণে মণ্ডলবাড়ির খুলি পর্যন্ত, তাইতে জেগে ওঠে শরাফত মণ্ডলের শিমুলগাছের সাদা বকের ঝক। এইসব বক হলো শরফতের পেয়ারের জীব, মণ্ডলের প্রতাপেই এরা বাঁচে এদের সবটা হায়াৎ নিয়ে। তার কড়া নিষেধ আছে বলেই গ্রামের মানুষ দূরের কথা, মাঘ মাসের শেষ বুধবারে দুর-দুরান্ত থেকে পোড়াদহের মেলায় আসা হাজার হাজার মানুষের কারো সাধ্যি নাই যে ঐ গাছের দিকে একটা ঢিল ছোঁড়ে। শরাফত মণ্ডলের মতো এই বকেদের পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিলো নিজগিরিরডাঙা গ্রামে। সেখানে চাষাপাড়ার খালের পর কামারপাড়া, কামারপাড়ার সীমানা শুরু হয় দশরথ কর্মকারের অর্জুনগাছ দিয়ে। দশরথের পূর্বপুরুষের নাম যদি মান্ধাতা না-ও হয়ে থাকে, তবু মান্ধাতার আমলেই যখন দশরথ তো দশরথ, তার ঠাকুরদারও জন্ম হয় নি, এমন কি ঠাকুরদার বাপেরও জন্ম হয়েছে কি হয় নি, হলেও বন কেটে নতুন বসতকরা নতুন ভিটায় সদ্য-বসানো হাঁপরের আঁচে হামাগুড়ি দিচ্ছে, অর্জুনগাছে বকেদের ঘর সংসারের শুরু সেই তখন থেকেই। বক ও কামারের বংশ বেড়েছে পাশাপাশি। গত আকালের সময় কামাররা পটাপট মরতে আরম্ভ করলে বেশ কয়েকটা বকও মরে পড়ে রইলো অর্জুনগাছের নিচে। আকালের সময় কামারদের জমিজমার অর্ধেক চলে যাচ্ছিলো জগদীশ সাহার দখলে, কামারদের ডেকে শরাফত টাকা দিলে সেই টাকা তারা জগদীশকে দিয়ে জমিগুলোকে ক্রোক হওয়া থেকে বাঁচায়। তবে সেগুলোর মালিক হয় শরাফত নিজেই। ওইসব কামার টাউনের দিকে চলে গেলে তাদের ভিটায় হাল দিতে যায় মণ্ডলের কামলারা এবং তখন অর্জুনগাছের বকের ঝাক বিল পাড়ি দিয়ে উড়ে এসে বসলো শরাফত মণ্ডলের শিমুলগাছের ডালে ডালে। এই অবলা পক্ষীর জাতকে শরাফত মণ্ডল ঠাঁই দিয়েছে পরম যত্নে। আল্লা মেহেরবান, তার নজরে এড়ায় না কিছুই, এই কাজে শরাফতের সওয়াব মিলেছে মেলা। তার পয়মন্ত সংসারে ছেলেমেয়ে, বৌঝি, গোরুবাছুর, হাঁস-মুরগি, জমিজমা, কামলাপাট দিনদিন বেড়েই চলেছে। তবে একটা কথা—হিন্দু গাঁয়ের পাখি কি কারো কপাল এতো ফেরাতে পারে? আসলে কথাটা মুখে বলতে একটু বাধো বাধো ঠেকলেও গ্রামের মানুষ জানে এই গাছভরা বক হলো মুনসির হুকুমের গোলাম। বকের মন্থর উড়ালে তমিজের বাপ তাই থরথর করে কাপে। এই কাঁপুনি আবার ঘুমের মধ্যে শোনা কিংবা ঘুম ভাঙানিয়া শোলোকেরও রেশ হতে পারে। এই শোলোক কি বের হয় মুনসির ফুটো গলার ভেতর দিয়ে বাতাসের ওপর ভর করে? নাকি তমিজের বাপের পরিচিত কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর তার লোমভরা কানে আটকে গিয়ে ভোঁ ভোঁ করে? ভোঁ ভোঁ আওয়াজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সমস্ত বিলের ওপর উড়াল দিয়ে দিয়ে তাই জরিপ করার দায়িত্ব পালন করতে করতে ৭/৮টা বক আবার তমিজের বাপের মাথার ওপর ঘুরে ঘুরে সে পাক কি নাপাক তাই হিসাব করে চলেছে। গজার মাছের চেহারা নেওয়ার জন্যে মুনসি ভেড়ার পালকে হুকুম করে কীভাবে তাই দেখতে তমিজের বাপের ঘুমে-নেতানো দুটো হাত একটু আগে নড়ছিলো আকাশের মেঘ তাড়াতে, তাই এখন চট করে চেপে বসে তার নিজেরই মাথার ওপর। পাটের আঁশের মতো চুলে ঢাকা এই মাথায় বকের নজর পড়লেই মুনসির হাত থেকে তার আর রেহাই নাই গো, রেহাই নাই! মুখ ঘুরিয়ে তমিজের বাপ কাদা ঠেলে উঠে পড়ে ডাঙার ওপর। এবং সোজা পথ ধরে বাড়ির দিকে। এবার তার কদম পড়ে এদিক ওদিক। কয়েকবার গাইখুরা গাছের কাঁটা লাগে পায়ের নিচে, হাজা-পড়া পায়ের অজস্র ফুটোর কয়েকটিতে কাটা বিধেও যায়। হাঁটতে হাঁটতে কাঁটা ছাড়াতে ছাড়াতে আরো কাঁটা বেঁধার ঝুঁকি নিয়ে আরো জোর কদম ফেলে সে ছোটে বাড়ির দিকে। এরকম কতোবার আকাশের মেঘ তাড়িয়ে মুনসিকে দেখতে গিয়ে পাতলা ছাই রঙের উড়ন্ত মেঘ চোখে পড়লে তারই ভয়ে পিছু হটতে গিয়ে তমিজের বাপ তার ঘাড়ের তৌড় জাল ফেলে গেছে বিলের ধারে, কখনো কাদার ওপর, কখনো বৃষ্টিভেজা ডাঙায়।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

3 thoughts on “০১. পায়ের তলা কাদা

  1. সেই কবে অল্প একটু দিয়ে আটকিয়ে রেখেছেন কেনও?বাকিগুলো দ্রুত দিন।

    1. খেয়াল ছিল না। দেয়া হলো পুরোটা আপনাদের আগ্রহ দেখে। ধন্যবান মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *