কালার টি.ভি. – সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

কালার টি.ভি. – সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

‘পই পই করে বলেছিলাম ভাড়া দিও না। নিজেদেরই জায়গা কুলোয় না। নাঃ ভাড়া না দিলে আর চলছিল না। যদিও বা দিলে তা সেখানে ছুতোয় নাতায় যাবার কি হয়েছে। মনে রেখো জামাই ছেলে হয় না, বউ মেয়ে হয় না আর ভাড়াটে কোনদিন আপন হয় না। বলি তোমাকে কি তুকতা করল নাকি! তুমিতো এমনটি ছিলে না। আজকাল বাবুর আবার কালার টি.ভি.র ব্যামো হয়েছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নাকি মানুষের দেখার নয়। কালে কালে দেখব কত রাধার গায়ে থতমত! হুঁ:।

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে অমলা কাঁধের গামছায় হাত মুছতে থাকল। আর যাকে উদ্দেশ্য করে এই কথার বৃষ্টিপাত সে কিন্তু ভিজেছে বলে মনে হ’ল না। বক্স জানালায় বসে উদাস হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখছে। আর এই ঔদাসীন্য অমলাকে যেন আরও তাতিয়ে তুলল।

কে বলবে কথা কানে যাচ্ছে। বধির না কি! বিয়ে হয়ে ইস্তক এই এক জ্বালায় আমি জ্বলছি। বাবা যে কি দেখেছিল এই পাথরে! কালা হলেও নয় বুঝতুম। ও বাঃ এ তো শেয়ান পাগল রে। ভাড়াটের ঘরে যেতে বলতে হয় না। দাঁড়াও আমি দেখাচ্ছি মজা। উঠুক একবার। আর ভাড়া দেয় কোন হারামজাদা। পয়সা আমার দরকার নেই। হায় ভগবান দুটো পয়সার মুখ দেখতে গিয়ে শেষে কি মানুষটাই বেহাত হয়ে যাবে নাকি! বলছি অফিস থেকে তো অনেকক্ষণ এসেছ এবারে চা করি? নাকি সেটাও ভাড়াটের ঘরে সারবে?

বক্স জানালা থেকে অর্ণব নামতে নামতে শুধু বলল, ‘অমলা! এবার রেকর্ডটা বদলাও। ব্যাস তেতে ওঠা কড়াতে তেল পড়ল যেন। ছাত্ করে উঠল অমলা। হ্যাঁ তা তো বলবেই তোমার পিন যে ঐ ফাটা রেকর্ডেই আটকেছে।

অর্ণব প্রসঙ্গ বদলে জানতে চায়, অম্বলের ওষুধটা খেয়েছিলে তো? এত বলি জল খাও বেশী করে কে কার কথা শোনে। সাধে কি মেয়েদের কোলাইটিস হয়।

চা দিতে দিতে বলল, অমলা, হলে তো বাঁচতাম। রেকর্ড বন্ধ হয়ে যেত। তোমারও মুক্তি হত। আমি কি আর বুঝি না সেই সকালে বেরোও আর রাতে ফের। এসব কচকচানি কি কারো ভাল লাগে। নাও চা খেয়ে হাত-পা-মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নাও।

চা খাওয়া সেরে অর্ণব বলল, যাই একটু খবরটা—

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অমলা ঝামরে উঠল, দেখে আসি তাই তো? আমি তো জানতাম। বলি ঘেন্না পিত্তির মাথা খেয়েছ নাকি!

অর্ণব জামাটা গলাতে গলাতে বলল, কেন তোমার গুরুদেবই তো বলেছে–লজ্জা-ঘেন্না-ভয়, তিন থাকতে নয়। আমি কি তোমার গুরুদেবের কথা কক্ষনো অমান্য করতে পারি?

জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল। চুপসে গেল অমলার হম্বিতম্বি। ফ্যা ফ্যা করে তাকিয়ে রইল পায়ে পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে যাওয়া অর্ণবের দিকে।

সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে অর্ণব চেঁচিয়ে বলল, তুমি আবার খেয়ে দেয়ে শুয়ে পোড় না। আমি এই যাব আর আব।

অমলা উত্তর দেয় না। কটমট করে তাকিয়ে থাকে।

আবার পিছনে এসে অমলাকে চেঁচিয়ে অর্ণব বলে, বনে বনে জলে জঙ্গলে আমাকে স্মরণ করিও আমিই রক্ষা করিব।’ বলে আর দাঁড়ায়নি। কি জানে আবার কি বলে।

অমলা রাগে গজগজ করতে করতে ফ্রিজ খুলে অবাক! মাছভাজার বাটিটাই হাওয়া। মনে মনে ভাবে নির্ঘাৎ অর্ণব নিয়ে গেছে তলায়। তলার বউটিও হয়েছে বড্ড গায় পড়া। দাদা দাদা করে আর রাখছে না। এবার যদি ফোঁটার ঘটা কেউ দেখত। যত সব আদিখ্যেতা। আমারটি বোধহয় রূপদেখে গলে জল। উঃ উঠলে বাঁচি। কি সাংঘাতিক! শেষ পর্যন্ত স্বামী টপকে হেঁসেলে ঢুকে পড়েছে দেখছি! রান্নাঘরে ফিরে এসে খুব লজ্জায় পড়ল অমলা। একদম ভুলেই গেছে গ্যাসে মাছ বসিয়ে সে। পাগলের মত খুঁজছে।

.

২.

সকাল থেকেই আকাশের মুখ গোমড়া। যে কোন সময়তেই তুমুল বৃষ্টি নামবে। বেলা তখন এগারোটা। ভাড়াটে গিন্নি অনিতা এসে হাজির।

–কি করছেন দিদি? রান্না বান্না হ’ল? দাদা বেরোয়নি বুঝি আজ?

-না ভাই। ও ছেলেকে আনতে গেছে। তা তুমি এ সময়ে কি মনে করে?

-এলুম। কত্তা বেরিয়ে গেছে। সে বেরিয়ে গেলে তো ঝাড়া হাত পা। কোন্ ছেলেকে আনতে গেছে?

-আমার দেওরের ছেলে। আমার তো কপাল পোড়া তা তো তুমি জান ভাই। ছেলেপুলে তো হ’লই না।

-তাতে কি হয়েছে। দাদার মত স্বামী পেয়েছে।

—দেখ অনিতা ঘরে একটা ছেলেপুলে না থাকলে সংসার শূন্য মনে হয় বুঝলে।

-হবে হবে অত ভাববেন না। মা ষষ্ঠি ঠিক দয়া করবে।

-তা তুমি কিছু বলবে?

-না বলছিলুম দাদা যখন আজ বেরোয়নি। আমি একটু বাপের বাড়ি যাব—

—তা যাও না। দাদা কি করবে?

-না বলছিলাম যদি একটু ধর্মতলা থেকে দীঘার বাসে তুলে দিয়ে আসে।

—কেন তোমার কতা এটুকু পারল না।

–তাহলে তো হয়েইছিল। যে যাকে নিয়ে ঘর করে সে বোঝে হাড়ে হাড়ে।

—দেখ অনিতা! পরের বউ পরের স্বামী চিরকালই ভাল হয় বুঝলে।

–একি বলছেন দিদি! আমি দাদাকে—

—ফোঁটা দিয়ে ভাই বানিয়ে তিন মাসের ভাড়া বাকি রেখেছ তাইতো?

—সে টাকা আপনাদের দিয়ে দেব। আপনি এসব কি বলছেন?

—যা বলছি ঠিকই বলছি। স্পষ্ট বলে দিচ্ছি সামনের মাসের মধ্যে ভাড়া না দিলে অন্যত্র উঠে যাও। আমার তো হরিহর ছত্রের মেলা নয়। তোমার দাদার আর কি, সে তো সংসারে হর্ষবর্ধন সেজে বসে আছে।

—ছিঃ আপনার মন এত নীচ।

—আর তোমার মন উঁচু।

–লজ্জা করে না পরের স্বামীকে বশ করতে চাও।

—দিদি ভুল বুঝছেন। দাদা টি.ভি.টা একটু দেখতে যায়।

—ঐ কালার টি.ভি. টাই তো আমার সংসার ডিকালার করে দিচ্ছে। এত টি.ভি. খারাপ হয়, ওটা কি খারাপও হয় না। তবে বাঁচতুম।

—আমি ভাবতেই পারছি না। আপনি দাদাকে সন্দেহ করেন?

—মুখ সামলে কথা বল। আমি কি করি তোমায় বলতে হবে আঁ! বিকেল হলেই সাজুগুজু। খোঁপায় মাছে দাঁতের মত ক্লিপ, কপালে টিপ, নখে রঙ, ঠোঁটে রঙ। কই তোমার কত্তাকে দেখেতো আমি অমন হ্যাংলাপনা করি না।

—আমি হ্যাংলা? আপনি অনেক কথাই বললেন। তা আপনিও তো পারেন আপনার স্বামীটিকে বশ মানাতে!

—যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা। তুমি যাও, যাও বলছি। একটি কথাও আর বলবে না। আজ আসুক। ভগবান! কপালে এও ছিল। শেষপর্যন্ত কিনা ভাড়াটে এসে বাড়িওয়ালাকে স্বামী মানুষ করা শেখাচ্ছে।

অনিতা নেমে যেতে যেতে শুধু বলল বিড় বিড় করে, দাদার মত মানুষ হয় না। দাদা যদি শিব হয় তো আপনি নন্দীভূঙ্গি। বাব্বাঃ এমন বউ নিয়ে মানুষে ঘর করে!

.

৩.

অর্ণব ইলিশ মাছ এনে বলল, আজ যখন বেরোলামই না। তিন কিসিম ইলিশ কর। তোমার হাতের ভাপা কি যে স্বাদ হয়! আহা অপূর্ব।

অমলা পাশে এসে দাঁড়ায়। গামছা এগিয়ে দিয়ে বলে, ঘামটা মোছ। মুছে মুখ হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হও দেখবে ভাল লাগবে। একটু চা দেবো?

না চাইতে চা, গামছা, মিষ্টি মিষ্টি সোহাগ মাখা কথা শুনে অর্ণবের তো ভিরমি খাবার জোগাড়। মনে মনে ভাবে চোরা অম্বল নয় তো! আজ হ’ল কি! তাহলে নির্ঘাৎ তলার সঙ্গে উপরের একটা জবরদস্ত পাঞ্জা কষাকষি হয়েছে।

চা এনে অমলা পাশে এসে গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আব্দারের সুরে বলে, চল না গো আজ কোথাও বেড়াতে যাই।

অর্ণব তো অবাক! বলল, বেশ তো কোথায় যাবে? তুমিই বল।

অমলা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল, গঙ্গাস্নান ছাড়া তো যাইনি কখনো, চল আজ গঙ্গার পাড়ে ঘুরে আসি। যাবে গো!

অর্ণব বলল, এ আর এমন কি যাব।

অমলা গুন গুন করে গাইতে গাইতে রান্না ঘরের দিকে হেঁটে গেল, লাজবতী। নূপুরের রিনিঝিনি রিনি, ভাল যদি লাগে তবে দাম দিয়ে কিনি, বেশী তো নেব না…। বেশ গায় অমলা। একান্নবর্তী পরিবারের হ্যাপা সামলাতে গিয়ে কত সাধ আহ্লাদ যে গলা টিপে মেরেছে সে।

অমলা হঠাৎ সরষে বাটা থামিয়ে রান্না ঘর থেকে চেঁচাল, তার চেয়ে ভিক্টোরিয়ায় চল। দারুণ মজা হবে।

অর্ণব ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলে, ধ্যস্‌ ছেলে ছোঁকড়ারা প্রেম করে ওখানে একটু নিরিবিলি। জানতে এই কাজে যে বাধা দেয় সে সুখী হয় না।

কাটা ঘায়ে নুনের ছিট পড়ল। বিষম খেল জোর অমলা। অর্ণব দৌড়ে এসে মাথা চাবড়াতে লাগাল। অমলা মনে মনে ভাবে এ কথা তাকেই বলল, ঝি মেরে বৌ শেখানো আর কি। তার মানে ভাড়াটে বউয়ের সঙ্গে ফস্টিনস্টিতে আমি বাঁধা না দিই। ভাবতে ভাবতে সাধের ইলিশ পুড়ে ছাই। অর্ণব দৌড়ে এসে দেখে আঁচলে চোখ মুছছে অমলা। ইলিশ, বালিশ ফাটা তুলোর মত ছত্রাখান।

অর্ণব চেঁচাল, কি হ’ল কি আবার? সব যে পুড়ে গেল!

অমলা ঝাঁঝিয়ে উঠল, যাক সব ছাই হয়ে যাক। কপাল পোড়ার আর পুড়তে কি বাকি আছে!

অর্ণব পিঠে হাত দিয়ে বলে, একটু শান্ত হও অমলা।

তোমার ঐ নীচের ঘরের টাইফুনটাকে শান্ত হতে বল গে যাও। বেশ ছিলুম। সংসারটা তছনছ করে দিল আমার। বলে আবার কাঁদতে থাকে।

অর্ণব অপ্রস্তুত হয়ে বলে, আরে বাবা এই তো গঙ্গার ঘাটে যাব। আবার কি এমন হল?

তুমি ঐ অনিতা কে নিয়ে যাও ঘুরে এসো গিয়ে খুশী হবে। ভেবেছিলুম বয়স বাড়লে স্বস্তি হবে ও ব্বাবাঃ কোথায় কি রস একদম গইড়ে পড়ছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। সাধে কি আর কেউ ভাড়া দিতে চায় না। বলেই খস খস করে শিলের উপর নোড়াটাকে ঘসে ব্যাপ করে একদলা সরষে মাছের উপর ছুঁড়ে দিয়ে উঠে পড়ল অমলা।

অর্ণব জিজ্ঞাসা করে, কি হয়েছে বল তো?

অমলা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, আর মিষ্টি কথায় দরকার নেই। গোড়া কেটে উনি এলেন আগায় জল দিতে। এসব মেয়ে মানুষের ঝেটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিতে হয়। এসে বলে কিনা বাপের বাড়ি যাব, দাদাকে একটু এগিয়ে দিতে বলবেন। বাপের চাকর যেন। আজ তোমার দুর্বলতার জন্যে ভাড়াটে বউয়ের এত আস্পর্ধা। ঘরে স্বামীর পায়ে শিকলি বেঁধে, পরের স্বামী নিয়ে টানাটানি। আমি বরদাস্ত করব না বুঝলে।

ব্যাপারটা বুঝে অর্ণব হেসে বলল, শোন মানুষকে ভালবাসা কোন পাপ কাজ নয় গো। আস্তে কথা বল। লোকে শুনলে কি ধারণা হবে। আমি একটু টি ভি দেখতে যাই, তাও কালার টি.ভি. বলে। তাতে এত চেঁচামেচি করছ কেন?

অমলা হাসতে হাসতে বলল, দেখ রাগ কোর না। পাঁচজনে কি বলে বলতো, তুমি কি একবার ভাব না।

অর্ণব বলল, তুমিও কিছু মনে কোরনা একটা কথা বলি। আমি যে নীচের ঘরে টি.ভি. দেখতে যাই তা তো তোমার পঁয়ষট্টি ডেসিব এর বেশী চিল চিৎকারে সারা পাড়া জেনে গেছে।

অমলা অর্ণবের হাতটা ধরে বলে, আমি ওসব জানিনা, তুমি ও ঘরে আর যাবে। এই নাও গলার হার। বন্ধক দিয়ে একটা কালার টি.ভি. নিয়ে এসো। তবে তো হবে। নাকি টি.ভির সাথে চাঁদ মুখও চাই-ই?

অর্ণব উত্তেজিত হয়ে বলল, দেখ রমলা সহ্যের একটা সীমা আছে। তুমি অনেক কথাই বললে আমি আপত্তি করিনি। তুমি আমাকে বিয়ের রজতজয়ন্তী বর্ষ উদযাপনের পরেও সন্দেহ কর আমি ভাবতেই পারছি না। এই জন্যই বলে স্ত্রী চরিত্র দেবা ন জনন্তি। বুঝলে। খেয়ে দেয়ে রেডি হয়ে নেবে তাড়াতাড়ি। বেরোবো।

অমলার গলায় কপোট অভিমান ঝরে পড়ল, না আমি যাব না। সব মাটি হয়ে গেল। না আছে একটা ছেলেপুলে। না আছে শখ আলাদ। নিজেরা পুরুষ মানুষ বাইরে বাইরে থাক বুঝবে কি! আমিই এখন সংসারের দায় হয়ে উঠেছি। আমাকে সরাতে পারলেই তোমার পোয়াবারো। ‘প্রৌঢ়ের তরুণী আসক্তি’ পালাটা বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে আর কি! একটা দিন নিজে থেকে বলেছ, যে ভাড়াটা সময়মত দিন। তাতে কি মান যাবে? তিন মাসের ভাড়া বাকি কিন্তু ফস্টি নস্টির তো কিছু বাকি নেই। কাল, কাল যখন তুমি খবর দেখে বেরোচ্ছ তখন হাসতে হাসতে অনিতা এসে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়নি? আমি সব দেখেছি; বুঝলে। নিজের কপাল পুড়ছে নিজের চোখে দেখে কি আর চেঁচানো যায়!

অর্ণব মুখ ফসকে বলে ফেলল, দেখ অমলা! আজ দু বছর ওরা এসেছে ওর কোনদিন চিৎকার শুনেছ? বড় শান্ত স্বভাব। মেয়েদের স্বভাবে কোমলতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় অলংকার। যেটা ওর আছে।

অমলা চোখ মুছে আগুন ঝরিয়ে তাকায়। চেঁচিয়ে ওঠে, ও তাহলে তলে তলে এত! আজ আমার সব খারাপ। আমার কিছুই নেই? পঁচিশটা বছর তো এই রূপের দাঁড়ে আটকে দোল খেয়েছ। ভীমরতিতে এসে ধরল শেষ বয়সে! তা যাও আবার

তলায় যাও চাঁদ মুখ না দেখলে যে মূৰ্ছা যাবে।

অর্ণব রাগতস্বরে বলল, এর থেকে অফিস গেলেই ভাল ছিল।

হঠাৎ নীচে কড়া নাড়ার শব্দ কানে ভেসে এলো। অমলা বলল, যাওনা দেখ কে এল আবার।

অর্ণব বলল, না আমি আর নীচে নামব না। এই তো বললে ভাড়াটে আছে নীচে যাবে না। যাব না। নিজে যাও।

অমলা গজ গজ করতে করতে নামতে থাকে। মুখেই অনিতার সঙ্গে দেখা হতেই মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল দরজা খুলতে। যেন শত জন্মের রাগ।

দরজা খুলে থ্‌!

কাঁধে এক পেল্লায় বাক্স নিয়ে এক মুসলিম ভদ্রলোক বললেন, মা অর্ণব দত্তর বাড়ি এটা?

অমলা বিস্মিত চোখে খানিক চেয়ে থেকে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু এটা কি ভাই? ছেলেটি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, টি.ভি.।

অমলা বলল, উপরমে চলিয়ে।

ছেলেটি টি.ভি. কাঁধে ঘরে ঢুকে নামিয়ে কাঁধের গামছায় মুখ মুছতে মুছতে বলল, বকশিস দিন বাবু। এটা কি কম ভারী বলুন!

অর্ণবও অবাক!

এমন সময় অনিতা পিছন থেকে ঢুকে অর্ণবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাতে ছোট পিতলের থালায় মিষ্টি। আর একটা রাখী। বলল, আজ রাখী পূর্ণিমা তাই দিদিকে মিষ্টি মুখ করাতে এলাম। আর দাদা হাতটা বাড়ান রাখীটা পড়িয়ে দিই।

অমলা অবাক হয়ে অনিতার আব্দারের দিকে তাকিয়ে থাকে।

অনিতা বলে, ছাপোসা ঘরে কালার টি.ভি. চট করে কি কেনা যায়! তিনমাসের যে ভাড়ার টাকা সেটা অ্যাডভান্স দিয়ে দাদার জন্য এই কালার টি.ভি.টা এনে দিলাম।

অমলা লজ্জায় কুঁকড়ে লাল। হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি কিছু মনে কোর না অনি! আমি হয়তো মাথা গরম করে ফেলি। কিন্তু এ আমার মনের কথা নয়।

অনিতা অর্ণবের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ধীর অথচ শান্ত গলায় বলে, দাদা ও ট্রান্সফার হয়ে গেছে নর্থ বেঙ্গল। আমরা এ মাসটা আর থাকব। যাক এবার অন্ততঃ আপনাদের দাম্পত্য কলহর অবসান হবে। দাদাকেও আর কালার টি.ভি. দেখতে পাঁচবাড়ি যেতে হবে না।

অর্ণবের চোখের কোল ভিজে উঠতে দেখে অনিতাও চোখের জল সামলাতে পারল না। অমলাও কেমন যেন ভিতরে ভিতরে ভিজে উঠতে লাগল।

অনিতা অস্ফুটে বলল, দাদা! দিদি! প্রিয়জনের বিদায়বেলায় চোখের জল ফেলতে নেই। দিদি চা করুন। দাদা! টি.ভি.টা লাগান। তারপর চালিয়ে দিন। আজ আপনার টি.ভি. দেখতে দেখতে জমিয়ে গল্প করি।

অমলা চা করতে উঠতে উঠতে বলল, তোমরা বসে গল্প কর। আমি এক্ষুনি চা আর পাঁপড় নিয়ে আসছি কেমন।

অর্ণব কালার টি.ভি.টা সেট করতে করতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতে থাকে কলহপ্রিয় গুটিপোকার ভিতর থেকে বেরিয়ে অমলা যেন আজ আনন্দ প্রজাপতি।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *