কবিতাবিষয়ক গল্প – তানিম হুমায়ুন

কবির বয়স হয়েছে। এত বয়স যে চোখে দেখেন না। কয়েকটা অস্ত্রপোচার হয়ে গেছে চোখের ওপর। শেষ অস্ত্রোপচারটা চোখের একেবারে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। অথবা বারোটা হয়তো আগেই বেজে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর ব্যাপারটা আনুষ্ঠানিকতা পেয়েছে। আসছে বছর কবির বয়স আশি হবে। ছেলেমেয়ে থাকে কানাডায়। জিগাতলার এই চারতলা বাড়িটাতে কবি ত্রিশ বছর হলো ভাড়া আছেন। স্ত্রী বিগত হয়েছেন বছর পাঁচেক। কবির দেখাশোনার জন্য আছে তাঁর ভাইয়ের মেয়ে নিলুফার। নিলুফারের স্বামী আরেকটা বিয়ে করেছে। নিলুফার তার ছেলে তুফানকে নিয়ে এই বাসায় থাকে।
কবির দেখভালের অবশ্য তেমন কিছু নেই। কবি তেমন কোনো ঝামেলাবাজ বুড়ো নন। বয়স আশি ছুঁলেও দিব্যি হাঁটাচলা করেন। টয়লেটে যেতেও লোক লাগে না। মাঝেমধ্যে বাইরে হাঁটতেও বেরিয়ে পড়েন। নিলুফারের ছেলে তখন তাঁর সঙ্গী হয়। খাওয়াদাওয়া নিয়েও কবির কোনো ফ্যাকড়া নেই। সমস্যা খালি একটাই। হয়তো নিলুফার স্কুল থেকে ফেরা ছেলেটাকে দুপুরের ঘুম পাড়ানোর জন্য বিছানায় তুলে দিয়ে জি-বাংলায় একটা সিনেমা কি সিরিয়াল দেখতে বসেছে, এমন সময় ডাক, ‘নিলু, এই দিকে একটু আসো তো!’ তখন নিলুফারকে যেতে হবে আরামচেয়ারে মাথা এলিয়ে শুয়ে থাকা কবির পাশে। মোলায়েম গলায় বলতে হবে, ‘চাচা, খাতাটা আনব?’ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে কবি ঝাড়া তিন মিনিট সময় নেবেন। এর অর্থ, খাতা তো লাগবেই। খাতা এনে নিলুফারকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আরামচেয়ারের পাশে। চাচা একটা লাইন বলবেন, তারপর কই যে হারিয়ে যাবেন কে জানে! নিলুফারের হয়তো মনে হবে, চাচা ঘুমিয়ে পড়েছেন। এমন সময় তিনি বলে বসবেন, ‘কী লিখসো, নিলু? মাটিরও তো মৃত্যু আছে? এটা কাটো। লেখো, মৃত্তিকায় জেঁকে বসে মৃত্যুর হিম। ঠিকাসে?’ নিলুফার কলকাতার সিরিয়ালের ডাকিনি চরিত্রের অনুকরণে মনে মনে মুখ ভ্যাঙাবে, ‘আ মরণ!’
কবির কানে নামাজরোজার কথা তোলার কম চেষ্টা করেনি নিলুফার। দুই দিন পর গোরআজাবে হাড্ডিগুড্ডি সব পটপট করে ফাটবে, বুড়ার সেদিকে খেয়াল নেই। অথচ মেয়েমানুষের শরীরের এমন সব জিনিস নিয়ে নিলুফারকে তিনি লিখতে বলেন যে তাঁর গোরআজাবের শব্দ এখান থেকেই নিলুফার শুনতে পায়। এই সব লেখালেখির বাই একবার চাপলে দুই-আড়াই ঘণ্টার আগে নিলুফারের নিস্তার নেই। মাঝেমধ্যে কবি চোখ বুজে নতুন লাইন হাতড়ানোর চেষ্টা করলে সে রান্নাঘরে যায় চা চড়িয়ে দিতে। এদিকে কবি নতুন লাইন পেয়ে গেছেন হয়তো। গরগর করে বলছেন সে লাইন। অথচ চেয়ারের পাশে নিলুফার নেই। তখন কী তার রাগ! ‘কই গেসলা তুমি, নিলুফার?’
‘চাচা, চা চড়াতে।’
‘তুমি জানো, এই একটা লাইন হারিয়ে গেলে কত বড় ক্ষতি?’
নিলুফারের পিত্তিটা জ্বলে যায়। একটা লাইন হারিয়ে গেলে ক্ষতি! কার ক্ষতি? এই জিনিস লিখলে লাভই বা কার? কে এসব এই বুড়াকে বোঝায়?
এই লেখালেখির মামলাটা বাদ দিলে নিলুফারের জীবন নিরুপদ্রব, কবিরও তা-ই। কবি দীর্ঘদিন হলো আড়ালের জীবন বেছে নিয়েছেন। যাঁদের সঙ্গে তরুণ বয়সে তিনি লেখা শুরু করেছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই বিগত। অনেকে বেঁচে থাকলেও কবিতার জগৎ থেকে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু কবির কবিতার বই আজও বেরোয়। এ কালের তরুণ কবিরা অনেক উচ্ছ্বাস নিয়ে তাঁর কবিতা পড়ে। পত্রিকাগুলোও কবির কবিতা পেলে বর্তে যায়। সবাই তাঁর কবিতা পেলেও কেউ তাঁর দেখা পায় না। কারণ কাউকেই তিনি দেখা দেন না। তাঁর কবিতা উপযুক্ত জায়গায় পৌঁছে দিয়ে আসে শমসের। শমসের কবির দুঃসম্পর্কের ভাই। দীর্ঘদিন থেকে সে এই বিষয়টা সামলিয়ে আসছে।
তবে নিলুফার কবির এই দিকটার সঙ্গে একেবারেই অপরিচিত। সে এটুকু জানে, তাঁর চাচা অনেক আগে থেকেই কবিতাটবিতা লেখেন। কিন্তু মানুষের কাছে তার চাচার কবিতার যে কদর আছে, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। ধারণা থাকার অবশ্য কোনো কারণও নেই। ইডেন কলেজে অনার্স পড়ার সময় তার বিয়ে হয়েছিল। সে বিয়ে দেড় বছরও টেকেনি। এদিকে বাবার পেনশনের টাকায় সংসার চলে না। তাই চাচার বাসায় এসে নিলুফার আশ্রয় নিয়েছে। তার দিন কাটে ছেলে তুফান আর কবিকে সামলে। সংসারের খুঁটিনাটি কাজের তো আর শেষ নেই। ফাঁকে যে সময়টুকু সে পায় তা জি-বাংলা কিংবা স্টার প্লাসের জন্য বরাদ্দ। সাহিত্যের খোঁজ রাখার তার সময় কই?
কিন্তু সাহিত্যের খবর ঠিকই নিলুফারের কাছে পৌঁছায়। কারণ তার জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যায়। ঘটনার সূত্রপাত রেহানা ভাবির মাধ্যমে। নিলুফারের প্রতিদিনকার রুটিনের একটা হলো ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া, তারপর ছেলেকে স্কুলের গেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে রাস্তার পাশের টিনের ছাউনিতে জিরোনো। এর মধ্যে স্কুলের সামনের ছোট রাস্তাটায় রিকশার জ্যাম বেধে যায়। রেহানা ভাবি, সফুরা আন্টি, নার্গিস আপা কপাল মুছতে মুছতে এসে ছাউনির ভেতর ঢুকে পড়েন। কোনো এক রোববার রেহানা ভাবি নিলুফারকে বলেন, ‘আরে, জানো তো না, গতকাল যা একটা রেসিপি দিসে ভুনা খিচুড়ি রান্নার!’
নিলুফার বলে, ‘কোথায়, ভাবি?’
‘গতকালের পত্রিকায়। আমি একবার ট্রাইও করসি রেসিপিটা। তৃষার আব্বুর খুব পসন্দ হইসে।’
নিলুফার বলে, ‘পত্রিকাটা আমারে একটু দিতে পারবেন, ভাবি?’
ফলে পরদিন স্কুলের কোনো এক টিচারের মেয়ের পালিয়ে বিয়ে করার কেচ্ছা শোনানোর একফাঁকে রেহানা ভাবি নিলুফারের হাতে একটা পত্রিকার কাটিং গুঁজে দেন। ছেলেকে নিয়ে রিকশা করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে নিলুফার চোখ রাখে পেপার কাটিংটায়। খিচুড়ির রেসিপিতে আদাবাটার উল্লেখ নেই। এ তো খিচুড়ি হবে না, হবে জাউভাত। ভাবতে ভাবতে নিলুফার কাটিংটা উল্টে অন্য পাশটা দেখে এবং একটা জায়গায় তার চোখ আটকে যায়। সে আরেকবার পড়ে। আরও একবার পড়ে। কয়েকটা লাইন, এলোমেলো বিন্যাসের। নিলুফার বোঝে, এগুলো কোনো কবিতার লাইন। এবং এই কবিতাটা দিন পনেরো আগে সে-ই লিখেছে। মানে তার চাচা লিখেছে আরকি। পেপার কাটিংটা সে তার ঝোলানো ব্যাগের চেইনওয়ালা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে।
চাচার চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাটানো বিরক্তিকর বিকেলগুলো নিলুফারের কাছে কিছু মানে তৈরি করে। চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি ভরে সে এত দিন যা সব লিখেছে তাদেরও তাহলে একটা গন্তব্য আছে। ড্রয়িংরুমের ঝুল ঝাড়তে ঝাড়তে, রান্নাঘরে বসে আলু ছিলতে ছিলতে নিলুফারের মনে ঘুরেফিরে কবিতার লাইনগুলো আসে। সে সেগুলোকে তাড়াতে পারে না। তার হঠাৎ একটু ভয় ভয় করে। লজ্জাও কি করে না? লজ্জা শরীরবিষয়ক সেই শব্দগুলোর জন্য। সে কী করে লিখেছিল এসব শব্দ? লেখার সময় লজ্জা লাগেনি? ছাপা হয়ে যাওয়ার পর শব্দগুলোকে কেমন ন্যাংটা ন্যাংটা লাগে যেন। যেন কেউ শব্দগুলোর শাড়ি খুলে নিয়েছে। কবিতাটাতে ধূসর স্তনবৃন্তের কথা লেখা। বিষণ্ন স্তনবৃন্তের ধূসরতা। গোসল করতে করতে নিলুফার তার স্তনে হাত রাখে। গোসলখানায় একটা আয়না আছে। আয়না গড়িয়ে গড়িয়ে পানি নামতে থাকে। নিলুফার সেদিকে তাকায়। তার এক হাতে স্তন। হ্যাঁ, স্তনের বোঁটাটাকে তার ধূসর লাগে। কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারে না, স্তনের মন খারাপ হয় কীভাবে? শাওয়ার থেকে হিসহিস করতে করতে পানি ঝরতে থাকে। নিলুফার ভাবে, ছাপা হওয়ার আগে তার একবারও মনে হলো না কেন, স্তনের বিষণ্নতা কী জিনিস?
তবে শব্দের মারপ্যাঁচ তাকে খুব বেশি দিন বিচলিত রাখতে পারে না, কারণ একই সঙ্গে তার ছেলের জ্বর আর কবির পায়ের গিঁটে ব্যথা শুরু হয়। মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে কবি ধানমন্ডি লেক পার হয়ে শুক্রাবাদের দিকে চলে গিয়েছিলেন। ফেরার পর থেকে গিঁটে ব্যথা শুরু হয়েছে। পা লম্বাও করতে পারছেন না, ভাঁজ করে রাখতেও কষ্ট হচ্ছে। আর ছেলেটাও স্কুল থেকে ফিরে শুয়ে আছে। দুপুরের হালকা জ্বর বিকেল হতে হতেই ১০১-এ গিয়ে উঠেছে। কবি নিলুফারকে বলেছেন ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। নিলুফার ভাবছে, কবিকেও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। যদিও চোখের অস্ত্রোপচারটার পর থেকে কবি কখনোই ডাক্তারের কাছে যেতে চান না—‘ডাক্তার যতক্ষণ না বলতেসে ততক্ষণ তো তুমি রোগী না, তাই না? যেচে পড়ে রোগী হওয়ার কী দরকার?’ ফলে সর্দিজ্বর এবং গিঁটে ব্যথার যৌথ অভিযানে নিলুফার শব্দ নিয়ে ভাবার আর সময় পায় না। কিন্তু একদিন পরই, কবির পায়ের ব্যথাটা সহনীয় পর্যায়ে এসেছে কি আসেনি, তিনি ডাক পাড়েন, ‘নিলু…!’
নিলুফার রান্নাঘরে ম্যাগিস্যুপ তৈরি করছিল। কবির ডাকে সে হঠাৎ চমকে ওঠে, কিছুটা স্যুপ ছলকে পড়ে তার হাতে। চুলার নবটা কোনোমতে ঘুরিয়ে সে একদৌড়ে কবির চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরিটা নিয়ে ইজিচেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কবি বলেন, ‘এমন হাঁপাইতেসো কেন? তোমার ছেলেটারে ডাক্তারের কাছে তো নিলা, কিন্তু জ্বর কমসে? ডা. আহাদের নাম শুনসো? চাইল্ড স্পেশালিস্ট। কলেজে সে তোমার আব্বার ক্লাসমেট ছিল। ছেলেকে নিবা নাকি তার কাসে?’
নিলুফার তার শাড়ির তলায় ডায়েরিটা লুকাতে লুকাতে বলে, ‘চাচা, জ্বর তো এখন নাই। আজ সকাল থেকে জ্বর কমে গেসে।’ হঠাৎ করে দাম্পত্যের কিছু রাতের কথা মনে পড়ে নিলুফারের, যেসব রাতে সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তুফানের বাবার অপেক্ষা করত। লোকটার পায়ের শব্দে তার যৌনতার অনুভূতি হতো। সে প্রস্তুত হতো। শক্ত হয়ে পড়ে থাকত। অথচ লোকটা বাতি নিভিয়ে নির্লিপ্তের মতো তার পাশে এসে ঘুমিয়ে পড়ত। নিজের জন্য লজ্জা হতো নিলুফারের। অনেক দিন পর সে লজ্জা আবার তাকে গিলে ফেলতে চায়। সেই লজ্জাটাই টের পায় নিলুফার।
নিলুফার মাছ কোটে, সবজি বাছে, ডিটারজেন্টে ছেলের জামা-প্যান্ট ভিজিয়ে রাখে, কিন্তু তার কান খাড়া থাকে সব সময়। কবির রুম থেকে ভেসে আসা হাঁটাচলার শব্দ, কবির গলা খাঁকারির শব্দ, ইজিচেয়ারের ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দের প্রতি সে সমূহ মনোযোগ রাখে। কিন্তু কোনো এক কারণে তার অপেক্ষা কেবল দীর্ঘায়িত হয়। কবি ইদানীং শোন, ঘুমান, একঘেয়ে রাগসংগীত শোনেন—কেবল লেখার কোনো তাড়া নেই তাঁর। নিলুফার নিজের ভেতর অস্থিরতা টের পায়। এই অস্থিরতাকে পাত্তা দিতে চায় না সে। কিন্তু চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরির আকর্ষণ তার পক্ষে দমানো সম্ভব হয় না।
অবশেষে একদিন, ঢাকা শহরে যখন ঠা-ঠা এক দুপুর, জিগাতলার ট্যানারি থেকে ভেসে আসা থিকথিকে বর্জ্যময় ড্রেন ঘেঁষে চলাচল করা রিকশার ঝাঁকুনি যখন থিতিয়ে এসেছে কিছুটা, শাহরুখ-মাধুরীর নাচ দেখতে দেখতে নিলুফারের যখন ঝিমুনি ধরে আসে আসে—এমন সময় কবির সাড়া পাওয়া যায়। ‘নিলুফার, এদিক আসো তো একটু।’
অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নিলুফার এসে পড়ে। ঘোলা হয়ে যাওয়া চশমার কাচ ঘষতে ঘষতে কবি নিলুফারকে ডায়েরি আনার আদেশ করেন।
ইজিচেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে নিলুফার আগ্রহ নিয়ে শব্দের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিছু বাক্য তার কাছে দুর্বোধ্য লাগে। কিন্তু মনে হয় না যে এগুলোর কোনো মানে নেই। বাক্যগুলো তার কাছে ধাঁধার মতো লাগে। দৃশ্যগুলো সে ভেবে বের করতে চায়। তার মনে হয়, প্রতিটা শব্দ জোড়া দিয়ে দিয়ে আবছায়া একটা ছবি দাঁড় করানো যায়। সে ছবিজুড়ে নগ্ন, সুন্দর, ম্লান সব শরীর। নিলুফারের ছবিটা ভেবে উঠতে পারে। ফলে তার ঘোর ঘোর লাগে। কবিতা লেখার কাজ শেষ করে যখন সে বাঁধাকপি কাটতে বসে, বঁটির চিকন ফলাকে তার এমন একটা কিছু মনে হয়—আগে যা কখনো মনে হয়নি। কী যে মনে হয় তা অবশ্য সে নিশ্চিত হতে পারে না। কিন্তু সে বুঝতে পারে, চাইলেই সবকিছুকে ছায়া হিসেবে ভেবে নেওয়া যায়। কিংবা সবকিছুর পরও অদৃশ্য অনেক কিছুই হয়তো তৈরি করে নেওয়া যায় আপনাআপনি। সে জন্য জাদু জানা লাগে। সবাই পারে না সে জাদু। কবি পারেন। কবিকে নিলুফারের জাদুকর বলে মনে হয়। এবং সুখের একটা ধোঁয়াটে অনুভূতিতে নিজেকে চুবিয়ে ফেলে সে। কত দিন হলো এই সুখ সে পায় না।
টানা কয়েক দিন কবিতা লেখালেখি চলে। সন্ধ্যা নাগাদ ডায়েরির তিরিশ-চল্লিশ পাতা ভরে ওঠে। এই প্রথম নিলুফারের কাছে শব্দগুলো অর্থবহ লাগে। প্রতিটা শব্দ কেটে নতুন শব্দ বসাতে তার এমন এক অনুভূতি হয়, যা তার আগে কখনো হয়নি। কিছু কিছু শব্দের প্রতি তার মায়া ধরে যায়। কবি সেগুলো বদলাতে বললে তার ভালো লাগে না। আবার কিছু কিছু শব্দের বিকল্পও সে তৈরি করে ফেলে। হয়তো একটা শব্দ সে পছন্দ করে ফেলেছে, কবি হুট করে সেটা কাটতে বলে আত্মমগ্ন হয়ে গেলেন। আর তাঁর খবর নেই। এদিকে নিলুফারের সেই শব্দ কাটতে ইচ্ছা করে না। কবিতা লেখার এই অভিজ্ঞতা তাকে নতুন এক অস্বস্তি দেয়। এই অস্বস্তি থেকে বের হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই এক সন্ধ্যায় কবি যখন ‘মানুষ মূলত জমা স্মৃতির পলি’ কেটে ‘স্মৃতির জমাট বাঁধা পলিই মানুষ’ লিখতে বলেন, নিলুফার বলে ওঠে, ‘চাচা, আগের লাইনটাই ভালো ছিল!’
কবি চোখ মেলেন, নিলুফারের দিকে ঘুরে তাকান, তারপর আবার চোখ বোজেন। কবির এমন ঠান্ডা চোখ আগে কোনো দিন দেখেনি নিলুফার।
সেদিন আর কোনো কবিতার লাইন বের হয় না কবির মুখ থেকে। কিছুক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে থাকার পর লাঠিতে ভর করে চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে যান তিনি।
রাতে বালিশে মুখ চাপা দিয়ে অনেকক্ষণ কাঁদে নিলুফার। তুফানের ঘুম ভেঙে যায়। সে জানতে চায়, ‘আম্মু, তোমার কী হইসে?’
নিলুফার বলে, ‘তুই ঘুমায় যা। সকালে স্কুল আসে।’
পরদিন সকাল থেকে সবকিছু আবার নিয়মে ফিরে আসে। সকাল সকাল পরোটা ভাজতে বসে নিলুফার। রিকশায় করে ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যায়। স্কুলের সামনের টিনের ছাউনিতে বসে রেহানা ভাবির কাছে কচুড়ি বানানোর রেসিপি শোনে। কবিও সকালবেলা লাঠি ঠুকে ঠুকে মর্নিংওয়াক সেরে আসেন। দুপুরের খাবারের পর ভাতঘুম দেন। দুপুরবেলা ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে নিলুফার আগের রাতের সিরিয়ালগুলো রিভাইজ করে। দুপুরের ভাপ আর সিরিয়ালগুলোর জমকালো আবহ নিলুফারের ভেতর ঘোর তৈরি করে। সে ঘুমে ঢলঢল হয়। বিকেলবেলা কবিকে চা দিতে গিয়ে নিলুফার দেখে শমসের এসেছে। সোফায় বসে পান খাচ্ছে। ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে শুয়ে আছেন কবি। তিনি নিলুফারকে বলেন, ‘নিলু, শমসেরকে এক কাপ চা দাও তো। আর ডায়েরিটা দিয়ে যাও।’ নিলুফার ডায়েরি দিয়ে যায়। তারপর শমসেরের জন্য চা দিতে গিয়ে দেখে ইজিচেয়ারের ডান পাশে পান চিবোতে চিবোতে ডায়েরি আর কলম হাতে দাঁড়িয়ে আছে শমসের। কবি চোখ বন্ধ করে আছেন। নিলুফার টি-টেবিলে সন্তর্পণে চা রেখে সরে যায়।
কিচেনে ফিরে থালাবাটিগুলো সশব্দে সিঙ্কে ফেলে দিয়ে ধুতে শুরু করে নিলুফার। যে সন্ধ্যায় তুফানের আব্বু ভেগেছিল, ডিটারজেন্ট দিয়ে থালাবাসন ধুতে ধুতে সে সন্ধ্যাটার কথা হঠাৎ করে মনে পড়ে নিলুফারের। তুফানের বয়স তখন দুই মাস। এ রকম একটা সন্ধ্যাতেই তুফান, তুফানের আব্বু আর নিলুফার—তিনজন রিকশা করে বাসায় ফিরছিল। তাজমহল রোডের এক মোড়ে রিকশা থামিয়ে তুফানের আব্বু বলল, ‘তোমরা এইখানে একটু দাঁড়াও, আমি আসতেসি।’
‘কই যাও তুমি?’
‘আসতেসি। সিগারেট নিয়া আসতেসি।’
এরপর তুফানকে নিয়ে আধাঘণ্টা রিকশায় বসে ছিল নিলুফার। লোকটা আর ফেরেনি।
ডিটারজেন্ট দিয়ে থালাবাসন ধুতে ধুতে কখন যেন আঙুল দিয়ে একটা প্লেটের ওপর নিজের নাম লিখে ফেলে সে। নি-লু-ফা-র। তারপর থমকে গিয়ে প্লেটটার দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের কড়ে আঙুলটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে। তার মুখে একটা বাঁকা হাসি ভেসে ওঠে, ‘আ মরণ!’

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ২৩, ২০১০

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *