উৎসবের রাত

উৎসবের রাত

এখনও অনেক কিছু পারেন না প্রতিভা। এই যেমন, একা-একা বাড়ির বাইরে যাওয়া, ছেলে মেয়েদের উঁচু গলায় ধমক দেওয়া, বউমাদের খোঁটা দিয়ে কথা বলা কিংবা অপরেশ ঘরে থাকলে তাঁর সামনে কাপড় পালটানো। শেষেরটি নিয়ে নিয়ত কথা শুনতে হয় তাঁকে। তুমি কি এখনও আঠারো বছরের খুকি যে আমায় দেখে লজ্জায় মরে যাচ্ছ! পঞ্চাশ বছর ঘর করছি তবু যে এত লজ্জা কোত্থেকে আসে বুঝতে পারি না। যে পুরুষের সঙ্গে সারারাত শোওয়া যায়, পঞ্চাশ বছর ঘর করা যায়, দিনের আলোয় তাঁর সামনে বেআব্রু যদি না হতে পারেন তো তিনি কি করবেন! পারেন না এইটেই শেষ কথা।

অথচ অপরেশ এই নিয়ে অনর্গল খোঁটা দিয়ে যাবেন। মাঝে-মাঝে মনে হয় প্রতিভার তাঁর কি লজ্জাটজ্জার বাড়াবাড়ি আছে? নেই-নেই করেও সত্তর বছর হয়ে গেল। সত্তর বছরে স্ত্রীলোকের শরীরে আর কী রহস্য থাকে? চল্লিশের পর থেকেই একটু মোটার দিকে ধাত ছিল কিন্তু এমন। মোটা নন যাতে চলা-বসায় কষ্ট হয়। মেয়েদের বয়স হলে যেসব রোগ জোটে, বলতে নেই, সেগুলো এখনও তাঁকে স্পর্শ করেনি। মন ভালো থাকলে অপরেশ তাঁকে ভুবনেশ্বরী বলে ডাকেন। নাতনি কাজল বলে, দিদা, তোমার স্কিন দেখলে হিংসা হয়। মাইরি এই বয়সেও কী করে ম্যানেজ করে রেখেছ কে জানে! ব্লাউজ ছেড়ে এখন সেমিজ পরেছেন প্রতিভা তবু ছুঁড়ির কথার ছিরি দ্যাখো। যার দুদিন বাদে বিয়ে হবে তার মুখে রকের ভাষা শুনলে গা রিরি করে। কিন্তু কিছুই করার উপায় নেই। ওর বাবা, মানে প্রতিভার বড় ছেলে ধীরেনেরও হাত-পা বন্ধ ও ব্যাপারে। কাজল অপরেশের চোখের মণি। নাতনিকে কিছু বললেই দাদু কুরুক্ষেত্র বাধাবেন। তা তেনারও তো পঁচাত্তর পেরিয়ে গেছে গত শ্রাবণে। গোলগাল মোটাসোটা চেহারা। চশমা ছাড়াই কাগজ পড়ার চেষ্টা করেন মাঝে-মাঝে। সারাজীবন নেশাভাঙ করেননি, এখন প্রতিভার পান চেয়ে নেন মাঝে-মাঝে। প্রতিভা ওঁর মুখে জরদার গন্ধটা পান কিন্তু সেটা আসে কোত্থেকে বুঝতে পারেন না। কারণ সেবার প্রেসারে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার পর থেকে অপরেশের বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ। তা এই মানুষের যদি এখনও শখ হয় সত্তর বছরের বুড়ির কাপড় ছাড়া দেখবেন, তাহলে ভীমরতি ছাড়া আর কি বলা যায়! পুরুষমানুষের বোধ হয় চিতায় না শোওয়া পর্যন্ত ওই ভাবটা মরে না। ভগবান যৌবন কেড়ে নিয়েছেন শরীর থেকে অনেকদিন তবু তার ছায়ায় রং বোলানোর চেষ্টা। যত বয়স হচ্ছে তত মুখে আগল থাকছে না। কিন্তু রাত্রে যখন শুতে যান প্রতিভা তখন একটা হাত ওঁর গায়ের ওপর রেখে শিশুর মতো ঘুমোন অপরেশ।

আজ কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটল। সকালবেলায় স্নান সেরে ঘরের দরজা ভেজিয়ে কাপড় ছাড়ছেন এমন সময় তিনি এলেন। অথচ এই সময় সামনের বাগানে থাকার কথা অপরেশের। চমকে উঠে কাপড়-চোপড় নিয়ে তিনি ঠাকুরঘরে সেঁধিয়ে যাওয়ার সময় বুঝতে পারলেন আজ কথার হুল সইতে হবে। কিন্তু ঘরে যখন ফিরে এলেন চিরুনির জন্যে তখন অপরেশ ইজিচেয়ারে শরীর এলিয়ে কাগজ পড়ছেন। তিনি ঘরে ঢুকেছেন তা নজরেই নেই। খটকা লাগল, এরকম তো হওয়ার নয়। কাছে গিয়ে বললেন, আজ কোনদিকে সূর্য উঠেছে?

গলার স্বর পেয়েই যেন চমকে উঠলেন অপরেশ। চকিতে কাগজটা ভাঁজ করে সন্ত্রস্ত চোখে তাকালেন তিনি, কী বলছ, কিছু বলছ?

অমন করছ কেন? স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন প্রতিভা।

কই, কিছু না তো! স্নান হয়ে গেল?

হ্যাঁ। তোমার শরীর ঠিক আছে তো?

একটু-একটু করে হাসি ফুটল অপরেশের মুখে, না না, আমি ভালো আছি। তোমার একথা মনে হল কেন?

প্রতিভার সন্দেহ তবু ঘুচল না। একটা কিছু লুকোচ্ছে মানুষটা। কী সেটা? বললেন, দশটার মধ্যে মেয়েদের এসে যাওয়ার কথা।

হুম।

প্রতিভা আর দাঁড়ালেন না। কতক্ষণ আর! আজ অবধি যখন কোনও কথা না বলে থাকতে পারেনি তখন এটাও চেপে রাখতে পারবে না। আজ প্রচুর কাজ, এই নিয়ে থাকলে তাঁর চলবে না!

বারান্দায় পা দিতেই বড় বউমা বলল, একি মা, আজকে নতুন শাড়ি পরলেন না?

প্রতিভা হাসলেন, আর লজ্জা দিও না বাপু, তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, আর তোমরা। সত্যি ওঁর মুখটা লালচে হয়ে উঠেছিল।

না, তা বললে শুনছিনা। বড়দি এলে কী বলবেন?

ঠিক আছে সে হবে খন। তোমরা কিন্তু তিলকে তাল করছ। কেউ যেন আর পঞ্চাশ বছর একসঙ্গে থাকে না। লোকে শুনলে কী বলবে?

পাশ কাটাচ্ছিলেন প্রতিভা কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কাজল উদয় হল, এম্মা দিদা, তুমি এখনও ঝি হয়ে আছ! উফ, তোমাকে নিয়ে পারি না। জানো না, সেদিন কাগজে বেরিয়েছে একটা পেয়ার পঞ্চাশ বছর একসঙ্গে থাকার পর ফ্রেস বিয়ে করেছে। বিয়ে দিয়েছে ছেলেমেয়েরা। সে রকম। একটা কিছু করলে হত।

গ্র্যান্ড আইডিয়া! বড় নাতি সুব্রত চেঁচিয়ে উঠল, এটা আগে বলিসনি কেন?

বেটার লেট দ্যান নেভার। এখনই করা যেতে পারে। কাজল হেসে বলল।

তাহলে আমাদের ঠাকুরমশাইকে ডেকে আনি। দিদা, না বললে কিন্তু শুনছি না। সুব্রত এগিয়ে এসে দুহাতে প্রতিভাকে জড়িয়ে ধরল আচমকা, আঃ, মাইরি তুমি কী নরম!

প্রতিভার তখন হাঁসফাঁস অবস্থা, ছাড়-ছাড়, উঃ, কি দস্যি ছেলে রে বাবা! এই সময় বড় মেয়ে সুনীতা এসে গেল। পঞ্চাশও হয়নি কিন্তু এর মধ্যেই মাথার চুল প্রায় সাদাটে। পেটের গোলমালে খুব ভোগে বলে একটু খিটখিটে স্বভাবের হয়ে গেছে। সঙ্গে দুই। ছেলে আর ওর স্বামী সুখেন। দৃশ্যটা দেখে সুনীতা পর্যন্ত হেসে ফেলল, এই অত জোরে চাপিস না, লেগে যাবে।

সুব্রত প্রতিভাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, না পিসি, দিদার মোটেই লাগবে না। দাদু বলেন যৌবনে উনি নাকি গামার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারতেন।

সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত উঠোনটায় হাসির ফোয়ারা উঠল। প্রতিভা এমন অপ্রস্তুত যে পালিয়ে পথ পান না। যেমন নাতি তেমন নাতনি, কারোরই মুখে কিছু আটকায় না। অপরেশই এদের মাথায় তুলেছেন, ছেলেমেয়েরা এরকম ছিল না।

রান্নাঘরে তখন তুলকালাম কাণ্ড। ঠাকুর উনুন ধরিয়ে বসে আছে। জলখাবারের তরকারি কাটা হয়নি। এটা ছোট বউমার দায়িত্ব। অন্যদিন যেমন তেমন, আজ সে বেচারা পেরে উঠছে না। বছর চারেক বিয়ে হয়েছে, এখনও পেটে কিছু আসেনি। কাজকর্ম যা কিছু বিয়ের পর প্রতিভাই শিখিয়েছেন। বলেছিলেন, ঠাকুর চাকর যতই থাক, যে মেয়ে স্বামীর মনের মতো খাবার তৈরি করতে পারে না সে কিন্তু কখনওই ভালো স্ত্রী নয়।

প্রতিভা বললেন, তুমি সরো ছোট, আমাকে দাও।

ছোটবউমা মাথা নাড়ল, সেকি, না মা, আপনি আজকে কাজ করবেন কেন? ছি ছি আমার হয়ে এসেছে।

প্রতিভা দ্বিতীয় বঁটিটা টেনে নিলেন, পাকামি করোনা তো! এত লোক খাবে, তুমি ছেলেমানুষ একা কি করে পারবে?

কিন্তু প্রতিভার পক্ষে তরকারি কাটা বেশিক্ষণ সম্ভব হল না। সুপ্রিয়া ওর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে এসেই হই-চই বাধিয়ে দিল, একি বউদি, তুমি আজও মাকে খাটাচ্ছ!

গলা শুনে বড়বউমা ছুটে এল, ওমা, এ আপনি কী করছেন?

চেঁচামেচি শুনে বড় ছেলে ধীরেন বারান্দায় নেমে এল, ছি-ছি, তোমরা কী! বাড়িতে এতগুলো বউ মেয়ে, আর মাকে আজকের দিনে হেঁসেলে ঢুকতে হচ্ছে। তোমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। এই কাজল, দিনকে দিন ধিঙ্গি হচ্ছ, একটু রান্নাঘরে গেলে কি মান যাবে? কাজলের গলা শোনা গেল, দিদাই তো আমাকে ঢুকতে মানা করেছে ওখানে। তুমি খামোকা আমাকে দোষ দিচ্ছ বাবা।

ছোটছেলে প্রাণেশ নিজের বউয়ের উদ্দেশে চেঁচাল, মাত্র এই কটা লোকের খাবার, তাতেও যদি মায়ের সাহায্য নিতে হয় তাহলে বলার কিছু নেই।

ব্যাপারটা এমন হচপচে হয়ে গেল যে ছোটবউ হাঁটুতে চোখ রাখল। প্রতিভা কী করবেন বুঝতে পারলেন না। তারপর ছোটবউয়ের কাঁধে হাত রেখে নিচু গলায় বললেন, একটা কথা বলি ছোট, পুরুষমানুষের কথা এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করবে। ওদের কথায় শুধু হুলই থাকে কিন্তু হুলে বিষ নেই। ওদের কথা শুনে কাঁদবে কেন বোকা মেয়ে!

বড়বউমা পাশে এসে বসল, আজকের দিনে মন খারাপ করিস না ছোট। ওদের কথাই ওইরকম। আর আপনিও কিছু মনে করবেন না মা, একটা দিন কাজ না করলেই কি নয়!

অতএব প্রতিভাকে উঠতে হল। বাইরে বেরিয়ে আসতেই দুই ছেলে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ফিরে গেল জামাইদের নিয়ে। কাজল বলল, তোমার জন্যে খামেকা বাবার কাছে বকুনি খেলাম। প্রতিভা বললেন, আহা মাখনের পুতুল, গলে গেলেন! বলার ভঙ্গি দেখে কাজল পর্যন্ত হেসে উঠল।

সুপ্রিয়া এগিয়ে এল, একি মা, তুমি আজ নতুন শাড়ি পরোনি?

সুনীতা মায়ের দিকে তাকিয়ে রান্নাঘরে মুখ ফেরাল, সত্যি বড়, তোমরা এ বাড়িতে কী করতে আছ বুঝতে পারি না। আজকের দিনে মাকে পুরোনো কাপড় পরিয়ে রেখেছ!

প্রতিভা বলে উঠলেন, আরে কী যা-তা বলছিস! বউমা তো বলেছিল, আমি রাজি হইনি। এই বুড়ো বয়সে এমন আদেখলেপনা মানায় না।

কী যা-তা বলছ মা! সুনীতা প্রতিবাদ করল, স্বামী-স্ত্রী পঞ্চাশ বছর একসঙ্গে আছে, এরকম কটা ঘটনা চোখে পড়ে! আমাদের মতন ভাগ্যবান আর কে আছে বলো। এরকম দিনে আমরা একটু আনন্দ করব না!

এই সময় সুব্রত অপরেশের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এসে গলা তুলে বলল, না, না, এখন পুরোনো শাড়ি অঙ্গে থাক। আমার সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।

সুপ্রিয়া বলল, কী ব্যবস্থা?

সুব্রত জানাল, আমি চাকরি পেয়েছি বলে তোমরা খেতে চেয়েছিলে। তা সেই টাকাটা আমি অন্যভাবে খরচ করব আজ। দুই পিসি এবং মা কাকিমা, তোমরা পাঁচ মিনিটের জন্যে বাবার ঘরে এসো। ও, ওখানে তো সবাই আছে, ভালোই হয়েছে। একটা জরুরি আলোচনা সেরে নেওয়া। যাক। আর দিদা, তোমার হাজব্যান্ড তোমাকে ডাকছেন কিন্তু আমি বলেছি আজ বিকেলের আগে দেখা হবে না। কাজল, তুই দিদার কাছে থাক। দিদাকে আজ চা ছাড়া কিছু সলিড খেতে দিবি না।

কাজল বোধহয় বুঝেতে পেরেছিল, ছুটে এসে সে প্রতিভার দুহাত চেপে ধরল।

এরা যে এতটা করবে প্রতিভা বুঝতে পারেননি। একই সঙ্গে অস্বস্তি, সঙ্কোচ, এমনকী বেশ রাগও হচ্ছিল। রাগটা অপরেশের ওপর। ঘটা করে নাতি-নাতনিদের বলতে যাওয়া হয়েছিল! এখন উনি তো সেঁধিয়ে আছেন ঘরের কোণে। যত জ্বালা হয়েছে প্রতিভার। প্রতিভা বললেন, হাত ছাড় বাপু, আর পারি না।

কাজল চোখ পাকিয়ে বলল, যাবে কাথায়? উঁহুদাদুর ঘরে তোমার যাওয়া চলবে না। ঠিক আছে, তুমি এই ঘরে এসো।

প্রতিভা হাল ছেড়ে দিলেন। কাজল ওঁকে ওর ঘরে নিয়ে এল।

ইস, কী নোংরা করে রেখেছিস ঘরটাকে। এত বড় মেয়ে, একটুও লক্ষ্মীশ্রী নেই!

তোমাদের মতো অত পিটপিটুনি আমার ভালো লাগে না।

তাই বলে বাসি শাড়ি পেটিকোট চারধারে ছড়ানো থাকবে? বইগুলোর কী দশা!

ঠিক আছে, দশা তো দশা, তুমি এখানে চুপ করে বসো। কাজল দ্রুত হাতে বিছানাটা ঠিক করে বলল, তোমার বিয়ের বেনারসিটা এখনও তোলা আছে?

সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত জল যেন বরফ হয়ে গেল। প্রতিভার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কাজল সেদিকে লক্ষ না করে বলল, ঠিক আছে, না থাকলে ম্যানেজ হয়ে যাবে। তুমি এখান থেকে নড়ো না, আমি ওদিকে কী হচ্ছে দেখে আসি।

কাজল বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রতিভা খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেন। ওঁর বুকের ভেতর সেই চাপ কষ্টটা যেন ওজন বাড়াচ্ছিল। একী গেরোতে পড়লেন তিনি! পঞ্চাশ বছর পরে এদের খেলার সামগ্রী হতে হল! হ্যাঁ, বেনারসিটা এখনও যত্ন করে ভোলা আছে। পঞ্চাশ বছর আগে যেটা পরে তিনি অপরেশের সঙ্গে ট্রেনে উঠেছিলেন। কিন্তু বুকের মধ্যে উথাল-পাথাল শুরু হল প্রতিভার। এই ঘরে বেশিক্ষণ বসতে পারলেন না তিনি। পা টিপেটিপে দরজার কাছে এসে দেখলেন বারান্দা কিংবা উঠোন ফাঁকা। ওরা বোধহয় এখন ধীরেশের ঘরে।

বারান্দা পেরিয়ে নিজেদের ঘরে চলে এলেন প্রতিভা। নিজের বাড়ি নিজের বারান্দা তবু হাঁটতে অস্বস্তি হচ্ছে। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন অপরেশবিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে আছেন, চোখ বোজা। বুকের ওপর খবরের কাগজটা ভাঁজখোলা হয়ে রয়েছে। ছিলা ছাড়া তীরের মতো ছিটকে এলেন প্রতিভা, অপরেশের মুখের সামনে এসে চাপা গলায় শুধোলেন, এসব কী করছ?

চমকে উঠেছিলেন অপরেশ, খবরের কাগজটা পড়ে যাচ্ছিল, ধরে ফেললেন, তারপর দুচোখে প্রশ্ন করলেন কী?

সুবুকে তুমি লেলিয়ে দিয়েছ!

ওই নিজে থেকে বলল।

কিন্তু তুমি রাজি হলে কেন?

ওটা হওয়া দরকার। অপরেশের গলা পরিষ্কার।

দরকার? এতদিন এই দরকারি কথাটা মনে ছিল না?

ছিল, কিন্তু গুরুত্ব দিইনি।

তার মানে বুড়ো বয়সে তোমার পাপবোধ হল? প্রতিভার গলাটা ধরে গেল।

অপরেশ উঠে বসলেন, না, পাপ আমি কখনও করিনি। প্রায়শ্চিত্তের কোনও প্রশ্ন তাই ওঠে না। তুমি এই ব্যাপার নিয়ে এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন?

প্রতিভার চোখে জল, গলায় কি যেন কি, বললেন, পঞ্চাশ বছর আগে আজকের রাত্রে তুমি কী বলেছিলে ভুলে গেলে?

ভুলিনি। প্রভা, পঞ্চাশ বছরে এমন একটা দিনের কথা বলতে পারো যেদিন আমি তোমার অসন্মান করেছি? অপরেশ কাতর গলায় প্রশ্ন করলেন।

প্রতিভা জবাব দিলেন না, কিন্তু তাঁর দু-চোখের ধারা বন্ধ হচ্ছিল না।

অপরেশ নিচু গলায় বললেন, ওরা যা করছে করতে দাও।

সঙ্গে-সঙ্গে প্রতিভা মুখ তুললেন, বুড়ো বয়সে টোপর পরার খুব শখ হয়েছে না? লজ্জার মাথা খেয়েছ?

অপরেশ এবার হাসলেন, এ-কথাই যদি বলো তো আমাদের এমন একটা বয়স যখন লজ্জাঘেন্না থাকার কথা নয়। আর কখনও তো টোপর পরিনি, তাই আজ যদিনাতি-নাতনি ওটা পরায় তো একটু লোভ হয় বইকি।

প্রতিভা কিছুক্ষণ শূন্যচোখে অপরেশের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর অদ্ভুত নিস্তেজ গলায় বললেন, আমার ভয় করছে।

কেন?

সব যদি ভেঙে পড়ে!

কিছুই ভাঙবে না। স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলো প্রভা। ভাসতে-ভাসতে দেখবে কিছু-না-কিছু গায়ে এসে ঠেকবে, সেইটুকুই লাভ।

সেটা তো নোংরাও হতে পারে।

নাও তো হতে পারে।

যাই বলল আমার মন মানছে না। এতদিন ধরে তিল-তিল করে এই সংসারটাকে সাজালাম, যদি কিছু হয়–!

কিছু হবে না। অপরেশ যেন নিশ্চিন্ত।

প্রতিভা ওঁর দিকে একটু অবাক হয়ে তাকালেন। কী সাধারণ গলায় কথা বলছে মানুষটা! কোনও তাপ-উত্তাপ নেই! প্রতিভা এবার সত্যি কথাটা বললেন, ওরা ছেলেমানুষি করছে আর তুমি তাতে সায় দিচ্ছ, কিন্তু আমি পারব না।

প্রভা! এবার অপরেশ একটু বিচলিত।

হ্যাঁ। সেই রাত্রের কথা আমার–, আমি পারব না।

পঞ্চাশ বছরেও সেই রাতটাকে ভুলতে পারলে না প্রভা!

ভুলে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করো তাকে আমার একটুও মনে নেই। একবার হয়তো দেখেছিলাম কিন্তু আজ মুখটাকেও মনে করতে পারব না। কিন্তু বিয়ের আসরটাকে–!

প্রভা, তুমি তোমার চার ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছ।

দিয়েছি। তুমি কি আমাকে একবারটির জন্যেও ওদের বিয়ের আসরে যেতে দেখেছ!

অপরেশকিছুক্ষণ শূন্যদৃষ্টিতে প্রতিভার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ক্রমশ ওঁর মুখ কালো হয়ে আসছিল। মাথা নিচু করে বললেন, ভেবেছিলাম সব ভুলে গেছ তুমি।

প্রতিভা কী করে বোঝান ওটা একটা কাটা দাগের মতো। কবে রক্ত পড়েছিল জ্বালা করেছিল এখন শুধু শরীরে দাগ রয়ে গেছে মাত্র। কিন্তু তা নিয়ে মাথা ঘামানোনয়। সময়ে সেটা মিলিয়ে যেতে-যেতে যেটুকু রয়ে গেছে সেটুকু ভুলেও চোখে পড়ার কথা নয়। কেউ যদি মোটা আঙুল সেই দাগে বোলায় তখনই হয়তো জ্বালা কিংবা রক্ত নয়, কিন্তু অনুভূতিটা ফিরে আসে। এও ঠিক। সেইরকম।

খবরের কাগজটাকে ভাঁজ করে অপরেশ বললেন, আমি তোমাকে কোনওদিন শাসন করিনি প্রভা, কোনওদিন জোর করে কিছু চাপিয়ে দিইনি, কিন্তু আজ আমি বলছিনাতি-নাতনিরা যা চাইছে তাই হোক!

এতদিনে নিজের ওপর বিশ্বাস হারালে?

এতদিনে মুক্ত হলাম।

মুক্ত! মানে?

সব মানে জানতে চেয়ো না প্রভা। আমরা তো জীবনের পঁচানব্বই ভাগ শেষ করে এসেছি। এখন ঈশ্বর ছাড়া কারও কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু ওই পাঁচ ভাগের জন্যে মানুষকে আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে। ওদের খেলা যদি আমাদের মুক্ত করে সেইটুকুই লাভ।

কী মুক্তি বলছ? আমি কি তোমাকে জোর করে বেঁধে রেখেছি?

ছি! প্রভা, অবুঝ হয়ো না!

ঠিক এইসময় উঠোনে ওদের কথাবার্তা শোনা গেল। প্রতিভা একটু যেন হকচকিয়ে গেলেন। বাইরে কাজলের গলা পাওয়া গেল, দিদা, দিদা কোথায় গেলে?

প্রতিভা চাপা গলায় বললেন, এখনই চেঁচামেচি শুরু করবে।

ঠিক বালিকার মতো প্রতিভা দ্রুত পাশের ঠাকুরঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই কাজল দরজায় এসে দাঁড়াল, জ কুঁচকে ঘরটাকে দেখল, তারপর বড়-বড় পা ফেলে অপরেশের সামনে এসে বলল, দিদা এই ঘরে এসেছিল?

ওকি এল, ওকি এল না, বোঝা গেল না। অপরেশনাতনির হাত ধরলেন।

ইস মাগো, একটুও লজ্জা নেই! বিয়ের নামেই গান গাওয়া হচ্ছে!

তবে বিয়ের পাত্রী যদি বদলে যেত তাহলে আরও নির্লজ্জ হতে পারতাম।

থাক অনেক হয়েছে। আচ্ছা, তোমাকে বাবা কাকা পিসিরা এত ভয় পায় কেন?

আর একটা নাম বললি না তো।

কে? হ্যাঁ, দিদাও। শোনো, আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি আজ সন্ধেবেলায় তোমাদের সুবর্ণজয়ন্তী বিবাহ পালন করা হবে। একদম ঠিকঠাক যেমন করে বিয়ে হয় সেইসব নিয়ম মেনে। তবে তোমাদের বয়স হয়েছে বলে বর-কনের মতো সব নিয়ম মানতে হবে না, মানে খেতেটেতে পারো। এটা অবশ্য বাবার অর্ডারে আমাদের মানতে হয়েছে।

তাহলে আমার পাঞ্জাবিটাকে গিলে আর ধুতিটাকে কুচিয়ে রাখিস।

ওমা! তুমি যে পা বাড়িয়ে বসে আছ আর দিদা বিয়ের নামে উধাও হয়ে গেছে। দেখি কোথায় গেল! কাজল যেমন এসেছিল তেমন বেরিয়ে গেল। অপরেশ এবার খাট ছেড়ে নিচে নামলেন। তারপর খবরের কাগজটা নিয়ে ঘরের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে একটা উপায় ভাবছিলেন। এটাকে কোথাও লুকিয়ে রাখা দরকার। অবশ্য যে জায়গাটায় ওটা ছাপা হয়েছে সেটুকু ছিঁড়ে ফেললেই ল্যাটা চুকে যায় কিন্তু ছিড়লেই তো সকলের নজরে পড়বে। বয়স হয়ে গেলে লুকোবার জায়গাগুলো বড্ড কমে যায়।

কেমন আছ বাবা? সুনীতা ঘরে এসে দাঁড়াল, পেছনে ওর স্বামী।

অপরেশ মেয়েকে দেখলেন। ঠিক ঊনপঞ্চাশ বছর বয়স এখন। ও যখন হল তখন খুব সামান্য রোজগার করতেন তিনি। ওর ছেলেবেলায় অপরেশ ওকে কিছুই দিতে পারেননি। বললেন, কখন এলি?

এই তো। আজ তোমাদের নিয়ে খুব কাণ্ড হবে।

হুঁ।

তোমার শরীর ঠিক আছে তো?

ওই আর কী! তুই কেমন আছিস?

আমার কথা আর বলো না। পেটটাই শত্রু হয়ে গেল। একটু রিচ কিছু খেলে তিনদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। ছেলেমেয়েদের ধকল সামলে হাঁপিয়ে উঠি। সুনীতা স্বামীর দিকে তাকাল।

বড় জামাই বলল, রোজ যদি তিনটে বাজিয়ে দেয় খেতে তাহলে শরীরের কি দোষ বলুন। নিজে যদি নিজের শরীরের অযত্ন করে তাহলে ওষুধে কি হবে!

এই সময় সুপ্রিয়া এল। বড় ও ছোটর বয়সের ব্যবধান অনেক ব্যবহারেও। সুপ্রিয়া এসে চুপ করে বসে রইল খাটে। ওর স্বামী বোধহয় প্রাণেশের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। এই মেয়ের বিয়েটা ঠিকঠাক হয়নি বলে মাঝে-মাঝে মনে হয় তাঁর। ওদের দুজনের স্বভাবের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল বেশি। কতদিন মানিয়ে থাকতে পারবে কে জানে!

তোর শরীর ভালো আছে তো? ছোট মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন অপরেশ।

নীরবে মাথা নাড়ল সুপ্রিয়া।

তোরা দুই বোনে কিছুদিন থেকে যা না এখানে।

সুনীতা বলল, তাহলেই হয়েছে। দুদিন সংসার ছেড়ে এলে ওদিকে ত্রাহি রব উঠবে। একমাত্র শ্মশানে যাওয়ার আগে মুক্তি পাব না।

আঃ, যত বাজে কথা! তোর স্বভাব খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে দেখছি। এসব কুকথা খামেকা না বললে সুখ পাস না, না? বেশ জোরেই ধমক দিলেন অপরেশ।

সুনীতা কিন্তু রাগ করল না। হেসে বলল, তুমি বুঝবে না। কখনও তো সংসার চালাওনি, সব ঝক্কি মা একা সামলাচ্ছে।

কিন্তু তোমার মা কোনওদিন এসব বাজে কথা বলেনি! কথাটা বলেই অপরেশের মনে হল বলাটা ঠিক হয়নি। কারণ ওদের মুখের হাসিটা অস্বস্তিকর।

বড় জামাই নিচু গলায় বলল, এখন এই হয়েছে বাবা, মেজাজ কিছুতেই ঠান্ডা থাকে না।

এই সময় ছোট বউমা অপরেশের খাবার নিয়ে এল। ট্রেতে এক গ্লাস হরলিক্স আর গোটাচারেক বিস্কুট। অথচ এই সময় রোজ পেটভরতি জলখাবার খান অপরেশ। ট্রের দিকে তাকিয়ে ওঁর। কপালে ভাঁজ পড়ল। ছোট বউমার দিকে একনজর দৃষ্টি বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার।

ছোট বউমা মাথা নিচু করে বলল, ওঁরা বললেন, আজ এই দিতে।

কেন? আমি কি আমাশার রুগি?

সুনীতা বলল, বাঃ, আজ তোমাদের বিয়ে দিচ্ছে নাতিনাতনি, বিয়ের দিন কি কেউ খায় নাকি? কথা শেষ করে সে হাসল। এবং অপরেশ বুঝলেন ব্যবস্থাটায় এদের প্রত্যেকের সন্মতি আছে।

এইসময় কাজল ফিরে এল, কী আশ্চর্য, ও বড় পিসিমা, দিদাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

সেকি? সুনীতা চমকে উঠল, পাওয়া যাচ্ছে না মানে?

সমস্ত বাড়ি খুঁজে কোথাও দেখতে পেলাম না। বাথরুমেও নেই।

প্রত্যেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। সুনীতা, ছোট বউমা এবং জামাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। অপরেশ দেখলেন সুপ্রিয়ার নজর ঠাকুরঘরের দিকে। তিনি হাসলেন, ঠিক ধরেছিস। যা, ওকে ডাক।

বাবা!

হরলিক্সে চুমুক দিয়ে অন্যমনস্ক গলায় অপরেশ জবাব দিলেন, কী?

বাবা! এবার সুপ্রিয়ার গলা ধরে এল।

কী হয়েছে মা? অপরেশ গ্লাসটাকে টেবিলে রেখে মেয়ের দিকে তাকালেন। দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে ডুকরে উঠল সুপ্রিয়া, আমি কখনও মা হতে পারব না।

বুকের ভেতর লোহার বলটা যেন ছিটকে উঠল। অপরেশ কয়েক মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে গেলেন। শেষপর্যন্ত গলায় স্বর ফুটল, কী করে জানলি?

ডাক্তার বলেছে।

ঘরে তখনও সুপ্রিয়ার কান্না ফোয়ারার মতো ছিটকে উঠছে। কি করবেন অপরেশ? এখন চেয়ে থাকা ছাড়া আর কি বা করা যায়? এই মেয়ে একটু-একটু করে বড় হল, চোখের সামনে পূর্ণতা। পেল, তাকে নিষ্ফলা জানার পর কিছু কি করার থাকে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বন্ধুর মতো কোনওকালেই মেশার সময় পাননি কিন্তু এইটের ওপর তাঁর খুব টান ছিল। বিয়ের পর চারপাশ ফাঁকা লাগত। সেই মেয়ে আজ কি শোনাল! অপরেশের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে জড়িয়ে ধরতে। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে তিনি বলতে পারলেন, ভেঙে পড়িস না মা, ডাক্তার ভুল করতে পারে। এরকম কত ঘটনা আমি জানি।

এই মুহূর্তে কোনও ঘটনা তিনি জানতেন না কিন্তু বলতে পেরে হালকা লাগল কিছুটা।

সুপ্রিয়া নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রাণপণে, এমন সময় ঠাকুরঘরের দরজা খুলে প্রতিভা বেরিয়ে এলেন। মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না অনেকখানি কেঁদে নেওয়া হয়েছে এর মধ্যে। অপরেশ দেখলেন দুটো মুখে একই মেঘ, একজন অতীতের কথা ভেবে অন্যজন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।

অপরেশ স্বাভাবিক গলায় বলতে চেষ্টা করলেন, ওই তো, তোদের মা এসে গেছেন। কোথায়। থাকো? এদিকে বাড়িসুদ্ধ লোক তোমায় খুঁজে বেড়াচ্ছে!

প্রতিভা কথাটাকে আমলই দিলেন না। একটু বিস্মিত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাছে এগিয়ে গেলেন, কি হয়েছে তোর?

ঘাড় নাড়ল সুপ্রিয়া, কিছু না।

ওরকম মুখ করে বসে আছিস কেন? প্রতিভা একবার মেয়ে আর একবার অপরেশের মুখের দিকে তাকিয়ে কারণটা বুঝতে চাইছিলেন।

অপরেশ তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, আমি ওকে বকেছি বলে কাঁদছে।

কেন, কি করেছে ও? সত্যি, ওই একটি জিনিস ছাড়া তুমি বোধহয় কিছু জানো না।

প্রতিভা ঘরের বাইরে যেতেই উঠোনে হইচই উঠল। তার দেখা পেতেই যেন সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। অপরেশ মেয়ের কাছে এসে কাঁধে হাত রাখলেন, চুপ করে বসে থাকিস না মা। ভগবানেরও যে ভুল হয়, ডাক্তার তো সাধারণ মানুষ! ওঠ, সহজ হ।

সুপ্রিয়া উঠল। তারপর মাথা নিচু করে বাইরে পা বাড়াল। হঠাৎ কি হল অপরেশের, কোনওদিন যা বলেন না আজ তাই বললেন, এবার আমার কাছে কিছুদিন থেকে যাবি?

সুপ্রিয়া যেন এরকম কিছুর প্রত্যাশায় ছিল, মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে বারান্দায় নামল।

দুপুরেও আহার জুটল না। সরবত আর মিষ্টি খেতে হল। বয়স বাড়ার পর মিষ্টিটাকে এড়িয়ে চলেন অপরেশ। ডায়াবেটিস এখনও থাবা বাড়ায়নি। কিন্তু ওৎ পেতে যে নেই তাই বা কে জানে! সেবার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার পর ডাক্তার বলে দিয়েছিল দুশ্চিন্তা একদম করবেন না। বললেই যেন দুশ্চিন্তা বন্ধ করা যায়। কাজলকে দিয়ে এক কৌটো জরদা আনিয়েছিলেন কিছুদিন আগে, পানের সঙ্গে সেটা খেলে গা গরম হয়। কিন্তু তা খেতে হয় প্রতিভাকে লুকিয়ে-চুরিয়ে। কৌটোটা রয়েছে রবীন্দ্র রচনাবলীর পেছনে। প্রয়োজনে বের করা সম্ভব হয় না প্রতিভা ঘরে থাকলে।

খাবার নিয়ে ভেবেছিলেন চেঁচামেচি করবেন। বুড়ো বয়েসের একটা মানুষকে ওরা না খাইয়ে রাখছে এ কেমন রসিকতা! কিন্তু সুব্রত আর কাজল যেভাবে বুঝিয়ে গেল তাতে সে ইচ্ছেটাকে বাতিল করতে হল। বড় ছেলে ধীরেশ এতটা বাড়াবাড়ি পছন্দ করেনি কিন্তু শেষপর্যন্ত সেও চুপ করে গেল। প্রতিভা যে সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন আর ফিরে আসেননি।

মিষ্টি খেয়ে অপরেশ বারান্দায় এলেন। হায় ভগবান, ওরা এর মধ্যেই বাড়িটার হাল পালটে দিয়েছে। উঠোনে ছাদনাতলা হয়েছে। কলাগাছ পোঁতা হয়ে গেছে। মাথার ওপর সামিয়ানা। কে যেন চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, গায়েহলুদটা হল না তো? বড় বউমা বোধহয় জবাব দিলেন, ভরদুপুরে ও কথা মনে করে কি হবে।

অপরেশের বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে লজ্জা করছিল। একটু আগে ওরা জিজ্ঞাসা করেছিল তাঁর বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করা হবে কিনা। তিনি না বলে দিয়েছেন। বন্ধু বলতে তো এখন কেউ নেই। দু একজন সমবয়সি পরিচিত আছেন মাত্র, তাঁদের বলে কি হবে। ডেকোরেটারের লোকজনদের দেখে বুঝতে পারলেন ওরা অনেককেই হয়তো নিমন্ত্রণ করেছে। অপরেশ আবার ঘরে ফিরে এলেন। আর তখনই কাগজটার কথা মনে পড়ে গেল। টেবিলের ওপর সেটা নেই। কে নিয়ে গেল? লুকিয়ে রাখবেন ভেবেছিলেন কিন্তু রাখা হয়নি। দুটো কাগজ আসে এই বাড়িতে। সাধারণত অপরেশের কাগজ নিয়ে টানাটানি করা হয় না। তিনি আবার দরজায় এসে গলা তুলে বললেন, কাগজটা কে নিয়ে গেল?

কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ, তারপর বড় বউমার গলা শোনা গেল,  কে নিয়ে এসেছে কাগজ?

একটু বাদেই বড় জামাই কাগজটা নিয়ে ওঁর সামনে এল, আমি ভেবেছিলাম আপনার পড়া হয়ে গেছে!

ঈষৎ মাথা নেড়ে সেটি হস্তগত করে বিছানায় ফিরে এলেন তিনি। তারপর সন্তপর্ণে সেটিকে বালিশের তলায় চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন অপরেশ। সকালবেলায় কাগজের দ্বিতীয় পাতায় ছবিটা দেখে কিছু বুঝতে পারেননি। কিন্তু নিচের লেখাগুলো পড়ার পর থেকেই তাঁর যেন খুব। ভয়-ভয় করছিল। সুব্রত কাজল যখন আবদার করল তখন মনে হল এটাই ওই ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তা। চট করে রাজি হয়ে গেলেন। পঞ্চাশ বছর হয়ে গেছে তাদের একসঙ্গে থাকার কাল। পঞ্চাশটা বছর ধরে একসঙ্গে অনেক সুখ এবংদুঃখকে ওঁরা মেনে নিয়েছেন। দুজন থেকে আরও চারজন এসেছে। তাদের বিয়ে-থা দিয়ে এখন তো ভরা সংসার। চিরকালই উগ্র আধুনিকতা তিনি পছন্দ করেন না আর এই স্বভাবটা পেয়েছে বড়ছেলে। ফলে এই বাড়িতে একটা আপাত কনজারভেটিভ পরিবেশ আছে। এসবই ভেঙে পড়বে, দুমড়ে মুচড়ে থেবড়ে যাবে যদি ওরা জানতে পারে অপরেশ এবং প্রতিভার মধ্যে কখনই আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়নি।

এতদিন এসব কথা ভাবেননি অপরেশ–আজ ভাবছেন। কি হতে পারে ওরা যদি জানতে পারে একথা! ওরা কি নিজেদের জারজ ভাববে? ধর্ম ও আইনের স্বীকৃতি ছাড়া যে বন্ধন তার ফসল হিসেবে নিজেদের গায়ে থুতু দেবে? অপরেশ জানেন, বড়ছেলে এটা সহ্য করতে পারবে না। হয়তো আত্মহত্যা করতে পারে সে। মেয়েদের ওপর নিশ্চয়ই চাপ আসবে তাদের শ্বশুরবাড়ি থেকে। কাজল আর সুব্রত কি করবে তিনি জানেন না কিন্তু এক মুহূর্তেই এই সুন্দর সংসার। তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। নিজে প্রেম করে বিয়ে করেও ছেলেমেয়ের প্রেম সহ্য করতে পারে না এমন ঘটনা তো আকছার দেখা যায়। কিন্তু বৃদ্ধ পিতামাতা অবিবাহিত –এই সত্যটি সহ্য করা যে বড় মুশকিল হবে ওদের কাছে। শোনার পর কি ছেলেমেয়েরা ওঁদের মৃত্যুকামনা করবে? বড় ভয় হল, তাই সুব্রতদের কথায় রাজি হয়ে গেলেন। পঞ্চাশ বছর পর ওরা বিয়েটার নবীকরণ করতে চাইছে, সেই সুযোগে আসল কাজটি সেরে নেওয়া যেতে পারে। তারপর যে যাই বলুক কিছু এসে যায় না।

কিন্তু এতদিন কি কিছু এসে যাচ্ছিল? এতদিন কি বুক ফুলিয়ে অপরেশ পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়াননি? একথা ঠিক প্রতিভা বাড়ি থেকে একদমই বের হত না কিন্তু চেষ্টা করলে কি অপরেশের খোঁজ পাওয়া যেত না? এটাই ওঁর কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার বলে মনে হয়। সেই মানুষটা এত নির্লিপ্ত হয়ে রইল কী করে? একটাও খোঁজ করল না, পুলিশকে জানাল না! প্রতিভার মামা না হয় লজ্জায় ঘেন্নায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে ধরে নেওয়া চলে। ব্যাপারটা প্রথম দিকে অপরেশের ভাবনায় আসত। কিন্তু কখনই তিনি প্রতিভার সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেননি। গোড়ার দু-তিনটে মাস কেটে গেলে প্রতিভা ভুলেও এসব প্রসঙ্গ তোলেননি। বছরের ধুলোগুলো জমে-জমে ঢেকে দিয়েছে সেই রাতটাকে। কিন্তু আজ সকালের খবরের কাগজটা যে এক ফুয়ে সব উড়িয়ে ওটাকে নগ্ন করবে এটা কল্পনা করেননি অপরেশ।

অপরেশের প্রথম চাকরি কানপুরে। ভার্গবদের বিরাট চামড়ার ব্যবসায় মোটামুটি মাইনেতে ওঁর একার চলে যাচ্ছিল। তখন বয়স চব্বিশ চলছে। টগবগে যৌবন। বিয়ে-থা করার জন্য কৃষ্ণনগরের বাড়ি থেকে চাপ দিচ্ছে। এই সময় উনি প্রতিভাকে দেখতে পেলেন, প্রথম দেখায় জড়িয়ে গেলেন।

কাছাকাছি বাড়ি অথচ দুই-একবার কথা হয়েছে কি হয়নি। কিন্তু বুঝতে অসুবিধে হয়নি প্রতিভারা ব্রাহ্মণ, বাপ-মা নেই, মামার কাছে মানুষ। প্রতিভার মামার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, ভাগনিকে ঘাড় থেকে নামাতে তিনি একটি সৎব্রাহ্মণ পাত্রের সন্ধানে ব্যস্ত। অপরেশ ব্রাহ্মণ নন জানার পর তাঁর সম্পর্কে কোনও আগ্রহ ছিল না ভদ্রলোকের। এই সময় প্রতিভার চিঠি এল অপ্রত্যাশিতভাবে, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে, কিছু একটা করুন।

মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল অপরেশের। এই মাইনেতে বিয়ে করা যায় না। অথচ প্রতিভাকে তাঁর চাই। বিভিন্ন জায়গায় দরখাস্ত ছেড়ে ছেড়ে তখন তিনি ক্লান্ত। শেষপর্যন্ত গৌহাটির এক ওষুধের কোম্পানি থেকে ডাক এল ইন্টারভুর। চাকরিটা হবে ভাবতে পারেননি। খুশি মনে কানপুরের পুরোনো পাট চুকোতে ফিরে এসে হতভম্ব হয়ে গেলেন। দিন সাতেকের মধ্যেই নদীর জল। অনেক এগিয়ে গেছে। সেদিনই প্রতিভার বিয়ে। পাত্র কানপুরের একজন বড় ব্যবসায়ী। তাঁর। গৌহাটিতে চাকরি পাওয়ার খবর ওখানে না জানিয়ে তিনি ভার্গবদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলেন। সেই রাতের ট্রেনে ফিরে যাবেন এমন ব্যবস্থা ঠিক।

রাত এগারটায় ট্রেন। স্টেশন তেমন দূরে নয়। প্রতিভার বিয়ে সন্ধে-লগ্নে চুকে গেছে। জিনিসপত্র নিয়ে বেরোতে যাবেন এমন সময় সে এল। বেনারসি নয়, সিল্কের শাড়িতে প্রতিভা ঝকঝক করছে। এই সময়, যত কাছেই হোক, বিয়ের কনে বাড়ি থেকে বের হতে পারে তা কল্পনায় ছিল না।

উত্তেজনায় কাঁপছিলেন প্রতিভা, চিঠিটা পেয়ে কিছুই করলেন না?

অপরেশ বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন, তুমি!

শুধু প্রশ্নটা করব বলে এসেছি।

করতে চেয়েছিলাম। যখন করলাম তখন সময় পেরিয়ে গেছে।

সময় কি সত্যি পেরিয়ে গেছে?

ওঁর হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদূর। অপরেশ কথাটার মানে বুঝতে পারছিলেন না।

আমাকে গ্রহণ করতে আপত্তি আছে?

না, নেই।

অপরেশ ওই দুটি কথাই বলতে পেরেছিলেন। এবং সেই রাত্তিরেই কানপুরের ট্রেন ধরেছিলেন ওঁরা। একটুও দ্বিধা করেননি প্রতিভা। স্টেশন অবধি কী আশঙ্কায় কেটেছিল! প্রতিভাকে দেখে বিয়ের কনে বলে না মনেও হওয়ার কোনও কারণ ছিল না। কানপুর বলে তবু রক্ষে কিন্তু কনের বাড়ি থেকে যে লোকজন বেরিয়ে পড়বেই খোঁজাখুঁজি করতে, অথচ কিছুই হল না–স্বচ্ছন্দে গৌহাটি চলে এলেন ওঁরা। নতুন জায়গায় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে চমৎকার মানিয়ে গেলেন দুজনে। শাঁখা-সিঁদুর থাকায় কোনও ঝামেলা পোয়াতে হয়নি। কিন্তু প্রতিদিন মনে হত এই বুঝি পুলিশ এল! সেই আশঙ্কায় একটার-পর-একটা চাকরি ছেড়েছেন আর জায়গা পালটেছেন অপরেশ। প্রতিভা কোনওকালেই বাইরে বের হতে চাইত না, কানপুরের কেউ দেখে ফেলবে সে আশঙ্কা। তাই কম ছিল! মাঝখান থেকে অপরেশের সঙ্গে কৃষ্ণনগরের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু তার জন্যে কোনওদিন আপশোস হয়নি। যে সত্যটা তাঁকে খুব আলোড়িত করত তা হল, সামান্য। আলাপ এবং কোমল সম্পর্কটাকে এতখানি গুরুত্ব দিয়েছিল প্রতিভা যে বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠে সরাসরি চলে এসেছিল যাচাই করতে। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেই এলে তো বিয়ের। আগে এলে না কেন?

প্রতিভার যুক্তিতে সত্য ছিল। সেদিনই তো তিনি কানপুরে ফিরেছেন। ফিরে খবর শোনার পর আর বাড়িতে থাকেননি। সব কিছু চুকিয়ে সন্ধের পর ঘরে এসেছিলেন। প্রতিভার পক্ষে তাঁর। দেখা পাওয়া সম্ভব ছিল না। জানতে চেয়েছিলেন, যদি রাজি না হতাম তোমার কথায়?

প্রতিভা হেসেছিলেন, ভেব না বলব, আত্মহত্যা করতাম। আমি স্বচ্ছন্দে ফিরে যেতাম তোমাকে কাপুরুষ ভেবে।

প্রতিভা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমাদের আইন বা ধর্মের বিয়ে হয়নি, তুমি কি তাই চাও?

এক মুহূর্ত ভেবেছিলেন অপরেশ, তারপর হেসে বলেছিলেন, কোনও দরকার আছে? মনের চেয়ে। কি ধর্ম এবং আইন বড়? যে মুহূর্তে তুমি আমার কাছে এসেছ সেই মুহূর্তে আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে।

প্রতিভা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার বিবেক পরিষ্কার তো?

অপরেশ জানিয়েছিলেন তিনি এ ব্যপারে মুক্ত।

তারপর তো পঞ্চাশটা বছর কেটে গেল। একটাও ঢেউ ওঠেনি, আর পাঁচটা বিবাহিত দম্পত্তির মতো তাঁরা সহজ স্বচ্ছন্দ। ঠিক এই সময় ওই কাগজে দেখতে পেলেন অপরেশ খবরটা। সঙ্গে সঙ্গে সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। একটা ভয়, যা কিনা বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই উঠে আসছে। তার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যেই নাতি-নাতনিদের আবদারে সম্মতি দিয়ে। দিয়েছেন অপরেশ। কিন্তু একথা তো বোঝানো যাবে না প্রতিভাকে। জানেন, এ নিয়ে কথা বললে প্রতিভার কাছে ছোট হয়ে যেতে হবে তাঁকে। অতএব এই ভালো, এখন তো ধর্মের বিয়েতে আপত্তি নেই।

খবরটা চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে তা বোঝা গেল। কারণ বিকেল হতেই আত্মীয়স্বজনরা এসে পড়লেন। পাড়াপ্রতিবেশীও। এমনকী কাগজের লোকেরাও। তাঁদের প্রশ্নের জবাব দিতে হল অপরেশকে।

সন্ধে নাগাদ সুনীতা এল নতুন পাঞ্জাবি-ধুতি নিয়ে। বলল, বাবা, এগুলো পরে নিতে হবে। তখন ঘরভরতি লোক। বয়স্কারই এখানে বসেছেন। অপরেশ লক্ষ করছিলেন, যে কোনওদিন তাঁর। সামনে হালকা কথা বলার সাহস পেত না সেও আজ রসিকতা করছে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে এবার একটু দুর্বল বলে মনে হল নিজেকে। শেষপর্যন্ত ওর হাতে ছেড়ে দিলেন সব।

প্রতিভার দর্শন সকালের পর আর পাননি তিনি। সারাদিন ধরে ইচ্ছে করছিল নিভৃতে ওর সঙ্গে একটু কথা বলেন। সুযোগ পাওয়া যায়নি কিংবা প্রতিভা নিজেই সুযোগ দিতে চাননি। খবরের কাগজটাকে এখন নিরাপদে রেখেছেন অপরেশ। আলমারির জামাকাপড়ের তলায় পাতা পুরোনো কাগজ ফেলে দিয়ে আজকেরটাকেই ভাঁজ করে রেখেছেন। কারও চোখে পড়বে না।

হাসি চিৎকার চেঁচামেচিতে উঠোনটায় বিয়েবাড়ির পরিবেশ। ওখান থেকে যখন হুকুম হল বর আনো বর আনো, তখন ছুটে এল সুব্রত আর কাজল। দাদুকে দুহাতে জড়িয়ে নিয়ে এল আসরে। সমবেত দর্শকরা হাততালি দিয়ে উঠল ওঁকে দেখে। আসবার সময় কাজল তাঁর রূপটি দেখিয়ে দিয়েছে আয়নায়। ভাঙা গাল, বয়সের নখবসা মুখ অথচ সব মিলিয়ে কি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। মাথায় টোপর পরার পর সত্যি বলতে কি, একটু লজ্জাই লাগছিল তাঁর। জীবনে প্রথমবার এই বেশধারণ।

কিন্তু ছাঁদনাতলায় ও কে বসে? লাল বেনারসির পুঁটুলিটাই কি প্রতিভা? মাথা নিচু করে থাকায় মুকুটটি বর্শার মতো দেখাচ্ছে। কেউ যেন চেঁচাল, ও দিদিমা, দ্যাখো দাদুকে কেমন দেখাচ্ছে!

কাজল কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, পঞ্চাশ বছরে কোনও চেঞ্জ হয়েছে?

বিয়ের প্রতিটি কাজ মেয়েরা যত্ন নিয়ে করছে। ছোট জামাই চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, বাপের বিয়ে দেখা কি উচিত? বোধহয় সুপ্রিয়ার প্রতি কটাক্ষ এটা কিন্তু অন্যদেরও মনে লাগল কথাটা। কিন্তু পুরুতমশাই জানিয়ে দিলেন, সুবর্ণজয়ন্তীর বিবাহ তো ছেলেমেয়েরাই দেয়।

আলোচনা কানে আসছিল, কত ভাগ্য হলে তবেই না পঞ্চাশ বছরের বিবাহিত জীবন কাটানো। যায়। কজনার ভাগ্যেই বা ঘটে এমন?

জামাইরা এসে পিঁড়ি ধরল। অপরেশ দাঁড়িয়ে আছেন চুপচাপ, প্রতিভাকে পিঁড়িতে বসিয়ে ওরা তাঁকে পাক দিচ্ছে। তারপর মুখোমুখি হলেন ওঁরা। এবং যতই মুখ নামিয়ে থাকুন অপরেশ, বুঝতে পারলেন যে-কোনও মুহূর্তেই প্রতিভা কেঁদে ফেলবেন। ওঁর হাতের আঙুল কাঁপছে। অপরেশের খুব ইচ্ছে করছিল বলেন, প্রভা, একটু শক্ত হও। অন্তত সবার সামনে কিছু করে বসো না। এই সময় চিৎকার-চেঁচামেচিতে কান রাখা দায়। সুব্রত বলল, দাদু, এবার মালাবদল হবে। কাজল বলল, সেকি রে! আগে শুভদৃষ্টি হোক, তারপর তো–। জামাইরা বলল, আর পারছি না ধরে রাখতে, তাড়াতাড়ি-তাড়াতাড়ি–I কে যেন ফুট কাটল, পঞ্চাশ বছরের ভার জমেছে তো হাজার হোক।

কাপড় দিয়ে চাঁদোয়া করা হল। কাজল এল দাদুর পাশে, সুব্রত দিদার। বলল, এবার দাদুর চোখের দিকে তাকাও।

কাজল বলল, খবরদার দাদু, দিদাকে এখন চোখ রাঙাবে না, বেশ রোমান্টিক চোখে তাকাও তো!

অনেক অনুরোধে প্রতিভা মুখ তুললেন। চোখের পাতা খুলতেই অপরেশ সেখানে টলটলে জল দেখতে পেলেন। সঙ্গে-সঙ্গে শাঁক বাজল, উলু দিল মেয়েরা। শুধু কাজল বলল, ওমা দিদা, তুমি কাঁদছ কেন? প্রতিভা মুখ নামালেন। ওঁর শরীরে এখন কাঁপুনিটা ছড়িয়ে পড়েছে।

যা আশঙ্কা করছিলেন অপরেশতা ঘটল না। বিয়েটা নির্বিঘ্নেই ঘটে গেল। ছাঁদনাতলা থেকেই অপরেশ চলে এলেন নিজের ঘরে, প্রতিভাকে নিয়ে গেল মেয়েরা। ঘরে ঢুকে একটু হতভম্ব হয়ে গেলেন অপরেশ। এর মধ্যে ওরা বিছানাটাকে ফুলে-ফুলে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। কাজল বলল, এখন শুধু টোপরটা খোলো। শোওয়ার আগে পাঞ্জাবি ছাড়বে না। পুরুতমশাই বলেছেন। তোমাদের কালরাত্রি করতে হবে না, আজই ফুলশয্যা।

তারপর আরও রাত বাড়লে, খাওয়াদাওয়ার পাট চুকলে প্রতিভাকে নিয়ে ওরা এল। এখন অবশ্য প্রতিভার মাথায় মুকুট নেই কিন্তু বেনারসি আর ফুলের মালায় হঠাৎ অপরূপা বলে মনে হল অপরেশের। কাজল বলল, নতুন বউকে দিয়ে গেলাম দাদু, একটু দেখো।

দরজা ভেজিয়ে ওরা চলে যেতেই প্রতিভা ধীরপায়ে ঠাকুরঘরে ঢুকলেন। ইজিচেয়ার ছেড়ে

অপরেশ অস্থির চোখে ঠাকুরঘরের দিকে একবার তাকিয়ে দরজার আগল তুলে দিলেন। তারপর আবার ফিরে এসে বসলেন ইজিচেয়ারে। খুব ক্লান্ত লাগছে এখন। সারাদিন ধরে কম ধকল গেল না।

কাজের বাড়ির লোকজনের গলা ধীরে-ধীরে মিইয়ে এল। শেষপর্যন্ত অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন। অপরেশ। পায়ে-পায়ে ঠাকুরঘরের দরজায় এসে দেখলেন প্রতিভা পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন সেখানে। খুব নিচুগলায় তিনি ডাকলেন, প্রভা!

চেতনা এল যেন শরীরে। তারপর আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়ালেন প্রতিভা। আলো নিভিয়ে এই ঘরে এসে বললেন, রাত হয়েছে, শুয়ে পড়ো।

অপরেশের গলায় যেন কিছু আটকাল, প্রভা!

প্রতিভার চিবুক অকস্মাৎ বুকে গিয়ে ঠেকল, তুমি খুশি হয়েছ তো?

তুমি হওনি?

আমি? হ্যাঁ হয়েছি। তুমি খুশি হলেই তো আমি খুশি হব।

প্রতিভা গলা থেকে মালা খুলে টেবিলে রাখলেন। তারপর ওপাশের আলনা থেকে আটপৌরে শাড়িটাকে নিয়ে পাশের ঘরে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে কি একটা ভাবলেন। অপরেশ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। যে ঘটনাটা কখনও ঘটেনি এখন তাই ঘটল। এই ঘরে ওঁর সামনে। দাঁড়িয়ে প্রতিভা শাড়ি পালটাচ্ছেন। নিজের কাছেই অস্বস্তিকর মনে হল অপরেশের। তিনি যেন লক্ষ করছেন না এমন ভাব করে পাঞ্জাবি খুলে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলেন।

এখন টুকিটাকি কাজ সারছেন প্রতিভা। রোজই যেমন করেন। অপরেশ টানটান শুয়ে ফুলের গন্ধ পেলেন। নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। আহা, এরই নাম ফুলশয্যা! বালিশ থেকে ফুলগুলো সরিয়ে একটু দূরে রাখলেন তিনি। আর এই সময় কাগজটার কথা মনে পড়ে গেল।

আজ তাঁর শ্রাদ্ধ। কাগজের দ্বিতীয় পাতায় যে বৃদ্ধের ছবি ছাপা হয়েছে তাঁকে দেখে চিনতে পারেননি অপরেশ। ইদানীং শোকসংবাদ দেখলেই চোখ বোলান, চেনাজানা কেউ গেল নাকি! বৃদ্ধের ছবির তলায় লেখাটাই তাঁকে টালমাটাল করে দিল। কানপুরের বিখ্যাত ব্যাবসায়ী অমুকচন্দ্র অমুক গত দোসরা বৈশাখ সাধনোচিতধামে গমন করেছেন। আগামী পনেরোই বৈশাখ তাঁর পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তাঁর আত্মার শান্তির জন্য আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের উপস্থিতি কাম্য।

এর একটু নিচে ব্যক্তিগত কলমে আর একটি বিজ্ঞাপন–দাদা যাওয়ার আগে আপনার কথা। বলতেন। আপনি আছেন কিনা জানি না, কোথায় আছেন তাও জানি না। যদি এই কাগজ চোখে পড়ে তাহলে পনেরোই বৈশাখে দাদার কাজ করলে তিনি তৃপ্ত হবেন!

আজ সেই পনেরোই বৈশাখ। পঞ্চাশ বছরে একটি কথাও প্রতিভাকে লুকিয়ে রাখেননি তিনি, আজ রাখতে হল। সারাদিন ধরে যত ভাবছেন তত ছবিটা তাঁকে তাড়া করছে। যে মানুষটা পঞ্চাশ বছর নিরাসক্ত হয়ে রইল সে ছবি হয়ে তাঁকে বিব্রত করতে পারল?

সকালবেলায় ছবিটি দেখেই যে চিন্তাটা তাঁর মাথায় চলকে উঠেছিল তা হল আইন এবং ধর্মের চোখে প্রতিভা আজ বিধবা হয়ে গেল। কথাটা মনে হতেই নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলেন। তাই সুব্রত যখন এসে আবদার করল তখন সম্মতি দিয়েছিলেন বিয়েতে। হ্যাঁ, এখন তো কোনও বাধা নেই!

আলো নিভিয়ে প্রতিভা পাশে এসে শুলেন। অপরেশ শক্ত হয়ে শুয়ে ওঁর নড়াচড়া অনুভব। করছিলেন। প্রতিভা কথা বলছিলেন না, তিনিও। ক্রমশ এই নিস্তব্ধতা অসহ্য হয়ে উঠতেই ওঁর সুপ্রিয়ার কথা মনে পড়ল। কথা বলতে চেষ্টা করলেন অপরেশ, ছোট মেয়ের কথা শুনেছ?

প্রতিভা জবাব দিলেন না। কয়েক মহূর্ত অপেক্ষা করে অপরেশ বললেন, খুব ভেঙে পড়েছে বেচারি।

আর ঠিক তখনই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন প্রতিভা। বালিশে মুখ গুঁজে থাকা সত্বেও কান্না ছিটকে উঠছিল। অপরেশ হতভম্ব গলায় ডাকলেন, প্রভা!

প্রতিভা কান্না গিলতে চাইছেন, পারছেন না। অপরেশউঠে স্ত্রীর পিঠে হাত রাখলেন, কি হল তোমার?

আমি পারছি না, আজ কেবলই সেই রাতের কথা মনে পড়ছে। স্বামীর হাত জড়িয়ে ধরলেন প্রতিভা। অপরেশ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।

প্রতিভা বললেন, কেন তুমি রাজি হলে? তুমি যে মন্ত্র উচ্চারণ করলে আমি তাঁকে সেই মন্ত্র উচ্চারণ করতে শুনেছি। ও, ভগবান বিশ্বাস করো, এতদিন বাদে নিজেকে বেশ্যার মতো মনে হচ্ছিল!

অপরেশ অন্যমনস্ক গলায় বললেন, তিনি তো আজ না-ও থাকতে পারেন। তাহলে–।

প্রতিভা ধীরে-ধীরে অপরেশের কোলে মাথা রাখলেন। তারপর কেমন করুণ গলায় বললেন, দ্যাখো, আমার হাত দ্যাখো, আজ আমি নতুন শাঁখা, নতুন নোয়া পরেছি।

অপরেশ নিজেকে সংবরণ করলেন। না, খবরটা কিছুতেই দেবেন না তিনি। সস্নেহে বললেন, তুমি খুব সরল।

জানি, এরকম কান্না বোকামি। আর কাঁদব না, দেখো। পঞ্চাশ বছরের পুরোনো নোয়াটাকে যে আজ গঙ্গায় ফেলে দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *