আর একবার – প্রফুল্ল রায়

আর একবার
প্রফুল্ল রায়

এই সতেরো তলা হাইরাইজ বিল্ডিংটার টপ ফ্লোরে সুশোভনের ফ্ল্যাট। এখানে যে কোনও জানালায় দাঁড়ালে বিশাল আকাশ চোখে পড়ে। কলকাতার মাথার ওপর যে এত বড় একটা আকাশ ছড়িয়ে আছে, এখানে না এলে টের পাওয়া যায় না।

বেশ কিছুক্ষণ আগেই সকাল হয়েছে। শীতের মায়াবী রোদে মেঘশূন্য আকাশটাকে অলৌকিক মনে হচ্ছে।

কটা শঙ্খচিল অনেক উঁচুতে, আকাশের নীলের কাছাকাছি, ডানা মেলে অলস ভঙ্গিতে হাওয়ার ভেসে বেড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে কোনও জাপানি চিত্রকরের আঁকা একটি ছবি যেন।

বেডরুমে সিঙ্গল-বেড খাটে হেলান দিয়ে দুরনস্কর মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সুশোভন। হাতের কাছে একটা টি-পয় টেবিলে সাজানো রয়েছে আজকের মর্নিং এডিশরে বগুলো খবরের কাগজ, অ্যাশ-ট্রে, সিগারেটের প্যাকেট, এইটার আর এক কাপ চা।

কুক-কাম-বেয়ারা সতীশ ঘন্টাখানেক আগে খবরের কাগজ-কাগজ দিয়ে গেছে কিন্তু একটা কাগজেরও ভাজ খুলে এখন পর্যন্ত দেখেনি সুশোন। মেটালের অ্যাশ ট্রেটা ঝকঝকে পরিষ্কার, পোড়া সিগারেটের টুকরো বা ছাই কিছুই তাতে নেই। এমন কি, সতীশ যেভাবে চা দিয়ে গিয়েছিল ঠিক সেই ভাবেই পড়ে আছে। কাপে একটা চুমুকও দেয়নি সুশোভন। চা জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে। ক’দিন ধরে এভাবেই তার সকালটা কাটছে।

অনেকটা সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার পর আস্তে আস্তে চোখ নামায় সুশোন। একটানা একভাবে বসে থাকার কারণে কোমরে খিচ ধরার মতো একটু ব্যথা ব্যথা লাগছে। অর্থাৎ ব্লড সার্কুলেশনটা ঠিকভাবে হচ্ছে না। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে হাত-পা টান টান করে বাঁ দিকে সামান্য কাত হল সুশোভন। আর তখনই ওধারের বেডরুমে মণিকাকে দেখতে পেল। তার আর মণিকার শোবার ঘরের মাঝখানে যে দরজাটা রয়েছে সেটা আধাআধি খোলা। সুশোভন দেখল, মণিকা তারই মতো সিঙ্গল-বেড খাটে হেলান দিয়ে আকাশ দেখছে। তার পাশের টি-পয় টেবিলেও চা জুড়িয়ে ওপরে পড়ে গেছে।

মাসখানেক ধরে রোজ সকালে সুশোভন এবং মণিকার ঘরে এই একই দৃশ্য চোখে পড়ে।

সপ্তাহের অন্য ঘ দিন অবশ্য এভাবে সুশোভনকে বেশিক্ষণ বসে থাকতে হয়। কাটায় কাটায় সাড়ে নটায় অফিসের গাড়ি এসে যায়। তার আগেই শেভ করে, আন এবং ব্রেকফাস্ট চুকিয়ে রেডি হয়ে থাকতে হয়। লাঞ্চের সময় সে ফ্ল্যাটে ফেরে না। ওটা অফিসেই সেরে নেয়।

আজ রবিবার। সপ্তাহের কাজের দিনগুলো প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে কেটে যায়। কিন্তু ছুটির দিন নিয়েই যত সমস্যা। সময় আর কাটতে চায় না তখন। রেল স্টেশনের

প্ল্যাটফর্মে অপরিচিত যাত্রীদের মতো পাশাপাশি ঘরে তারা চুপচাপ বসে থাকে।

অবশ্য এরকম অস্বাভাবিক গুমোট আবহাওয়া খুব বেশিদিন থাকবে না। এ সপ্তাহেই যে কোনও সময় এলাহাবাদ থেকে মণিকার দাদা অমলের আসার কথা আছে। সে তার বোনকে নিয়ে যেতে আসছে। মণিকা সেই যে চলে যাবে, তার আর ফেরার সম্ভাবনা নেই। সেটাই হবে সুশোভনের জীবন থেকে তার চিরবিদায়। তারপর আনুষ্ঠানিক ভাবে কোর্টে গিয়ে ডিভোর্সের জন্য দরখাস্ত করবে। ঝগড়াঝাঁটি, হই চই বা পরস্পরের দিকে কাদা ছোড়াছুড়ি নয়, শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়ে যাবে দু’জনের চার। বছরের ক্ষণস্থায়ী দাম্পত্য জীবন।

অথচ সুশোভন এবং মণিকা, দু’জনেই ভদ্র, শিক্ষিত। তাদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউণ্ডও চমৎকার। লুও তাদের মধ্যে বনিবনা বা অ্যাডজাস্টমেন্ট ঘটেনি। অমিলের কারণ বা বীজটি রয়েছে তাদের চরিত্রের মধ্যে।

মণিকা খুবই শান্ত, স্বল্পভাষী এবং ইনট্রোভার্ট ধরনের মেয়ে। সে কথা বললে দশ ফুট দূরের লোক শুনতে পায় না। জোরে টিভি বা রেডিও চালায় না সে। চলাফেরার সময় এত আস্তে পা ফেলে যে শব্দই হয় না। চা খায় আলতো চুমুকে— নিঃশব্দে।

বিয়ের পর এই চারটে বছর বাদ দিলে আজন্ম এলাহাবাদেই কেটেছে মণিকার। কলকাতার বাইরে বাইরে নানা প্রভিন্সের নানা জাতের মানুষের কসমোপলিটান পরিবেশে বড় হয়ে উঠলেও সে রীতিমত রক্ষণশীল ধরনের মেয়ে। তাদের বাড়ির আবহাওয়াতেও এই রক্ষণশীলতার ব্যাপারটা রয়েছে। তার মা বাবা বা ভাই-বোনের কেউ পুরনো ধাঁচের পারিবারিক কাঠামো ভেঙে বৈপ্লবিক কিছু ঘটাবার কথা ভাবতে পারে না। তার বাপের বাড়িতে মদ ঢোকে না। ড্রিংক করাটা সেখানে ট্যাবু। উনিশ শতকের সুখী যৌথ পরিবার যেভাবে চলত সেই চালেই তাদের বাড়ি চলছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানো ছাড়া সেখানে বিশেষ কোনও পরিবর্তনের ছাপ পড়েনি।

সুশোভনদের ফ্যামিলি একেবারে উলটো। হই চই, পার্টি, ড্রিংক, ওয়েস্টার্ন পপ মিউজিক, কেরিয়ারের জন্য যতদূর দরকার নামা— এসব নিয়ে তারা মেতে আছে। জয়েন্ট ফ্যামিলিতে তাদের আস্থা নেই। ছেলেরা চাকরি-বাকরিতে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গে সুশোভনের বাবা তাদের আলাদা করে দিয়েছে। নিজের নিজের সংসার বুঝে নাও এবং সুখে থাকো। অন্যের দায় বা সাহায্য, কিছুই নেবার প্রয়োজন নেই। এতে সম্পর্ক ভাল থাকবে। মোটামুটি এটাই হল তাঁর জীবনদর্শন এবং ছেলেদের প্রতি অমূল্য উপদেশ।

এই ফ্যামিলির ছেলে হবার ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে পারিবারিক ট্রাডিশানের সব কিছুই পেয়েছে সুশোভন। সে একটা নামকার অ্যাড কোম্পানির টপ একজিকিউটিভ। বড় বড় ফার্মের হয়ে তারা বিজ্ঞাপনের পরিকল্পনা তো করেই, তাছাড়া প্রচুর অ্যাড-ফিল্মও তুলতে হয়।

আজকাল অগুনতি অ্যাডভার্টাইজমেন্ট কোম্পানি গজিয়ে উঠেছে। কমপিটিশন প্রচণ্ড। বড় বড় ক্লায়েন্টদের হাতে রাখতে হলে প্রায়ই পার্টি দিতে হয়। শুধু হোটেল বা ‘বার’-এ নয়, বাড়িতে ডেকেও মাঝে মাঝে ড্রিংকের আসর বসাতে হয়। এমন কি বড় কোম্পানি ধরে রাখতে হলে অনেক সময় জায়গামতো টাকাপয়সাও দিতে হয়। কারও কারও যুবতী সুন্দরী মেয়ে সম্পর্কে দুর্বলতা রয়েছে। কাজেই দরকারমতো। তারও ব্যবস্থা করতে হয়। যে ছেলেমেয়েদের নিয়ে অ্যাড-ফিল্ম ভোলা হয়, তারা তো প্রায়ই সুশোভনদের ফ্ল্যাটে এসে হানা দেয়। যতক্ষণ তারা থাকে চড়া সুরের ওয়েস্টার্ন মিউজিকের সঙ্গে হুল্লোড় চলে।

জীবন সম্পর্কে ধ্যানধারণা, রুচি, কালচার, কোনও কিছুতেই সুশোভন আর মণিকার মধ্যে এতটুকু মিল নেই। তু তাদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। প্রেমের বিয়ে নয়। দুপক্ষেরই এক আত্মীয় যোগাযোগটা ঘটিয়ে দিয়েছিল।

বিয়ের পর কলকাতায় এসে দু-চারদিন কাটাতে না কাটাতেই চমকে উঠেছিল মণিকা। সুশোভনের বন্ধুবান্ধব বা বড় বড় কোম্পানির একজিকিউটিভ এবং তাদের স্ত্রীরা প্রায়ই আসত। সতীশ হুইস্কি-টুইস্কি বার করে দিত। যে মহিলারা আসত তারাও পাড় মাতাল। পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা রাম কি হুইস্কি খেত।

এমন দৃশ্য আগে আর কখনও দেখেনি মণিকা। সে শিউরে উঠত। অন্য একটা ঘরে ঢুকে দম বন্ধ করে সিঁটিয়ে বসে থাকত। সুশো এসে ডাকাডাকি করত, কী। হল? ওঁরা তোমার জন্যে ওয়েট করছে— এস। মণিকা জানাতো, মদের আসরে সে যাবে না। কাকুতি-মিনতি করেও ফল কিছুই হত না। সুশোভন বলত, ‘ওঁরা কী ভাবছেন বল তো?’ মণিকা বলত, ‘যা খুশি ভাবুক। বাড়িতে ‘বার’ না বসালেই কি হয় না?’ সুশোভন কৈফিয়তের ভঙ্গিতে বলত, কী করব বল। দিস ইজ আ পার্ট অফ মাই জব। আমার কেরিয়ার, আমার ফিউচারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্লিজ এস, ফর মাই সেক।

প্রথম প্রথম কিছুতেই মদের আসরে যেত না মণিকা। পরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও খানিকটা অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছিল। সুশোভনের বন্ধুবান্ধব এবং তাদের স্ত্রীরা এলে সে ওদের সামনে যেত ঠিকই, তবে হুইস্কির ছোঁয়া বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে চলত। অবশ্য সঙ্গ দেবার জন্য হাতে একটা সফট ড্রিঙ্কের গেলাস রাখত।

সুশোভনের বন্ধুরা বলত, একটু হুইস্কি টেস্ট করুন ম্যাডাম। পুরাকালে ঋষিটিষিরাও সোমরস পান করতেন। জিনিসটা খুব অস্পৃশ্য নয়।

মণিকা উত্তর দিত না।

বন্ধুরা আবার বলত, আফটার ডেথ যখন ওপারে যাবেন তখন ব্রহ্মা বিষ্ণুরা এক্সপ্লেনেশন চাইবে— মা জননী, ওয়ার্ল্ডে যে তোমাকে পাঠালাম, হুইস্কিটা টেস্ট করে এসেছ তো? তখন কী উত্তর দেবেন? মানব জীটা এভাবে নষ্ট হতে দেবেন না ম্যাডাম।

মণিকা আবারও চুপ।

বন্ধুদের স্ত্রীরা বলত, ‘তোমার মতো পিউরিটান মেয়ে লাইফে দেখিনি। ড্রিংক করলে ক্যারেক্টার নষ্ট হয় না।’

এসব কথারও উত্তর দেওয়া দরকার মনে করত না মণিকা। মনের দিক থেকে সায় না থাকলেও দাম্পত্য জীবনের খাতিরে দাঁতে দাঁত চেপে এসব মেনে নিতে হত তাকে। তবে কম বয়সের ছেলেমেয়েদের লেভেলে নেমে তাদের সঙ্গে সমান তালে সুশোভন যখন হুল্লোড় করত তখন অসহ্য লাগত।

ভেতরে ভেতরে বারুদ একটু একটু করে জমছিলই। কিন্তু বিস্ফোরণটা ঘটল দেড়-দুই বছর আগে। মণিকা যেদিন জানতে পারলে, কাজটাজ বাগাবার জন্য সুশোভন কাউকে ঘুষ দেয়, কাউকে কাউকে সঙ্গ দেবার জন্য সুন্দরী যুবতী যোগাড় করে তখন তার মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। যা কখনও সে করে না, যা তার স্বভাবের বাইরে, ঠিক তাই করে বসেছিল। উত্তেজিত মুখে চিৎকার করে বলেছিল, তুমি ঘুষ দাও?

স্থির চোখে অনেকক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থেকেছে সুশোভন। বলেছে, ‘ঘুষ না, গিফট।

‘একই বস্তু। আর ওই মেয়েদের ব্যাপারটা?’

‘নাথিং নাথিং’ টোকা দিয়ে গা থেকে পোকা ঝাড়ার মতো ভঙ্গি করে বলেছিল সুশোন।

দাঁতে দাঁত চেপে মণিকা বলেছিল, ‘নাথিং বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে, দুই হাত উলটে সুশোভন হালকা গলায় বলেছিল, ‘এ নিয়ে তোমায় মাথা ঘামাতে হবে না। খুব সিম্পল ব্যাপার। কেউ কেউ মেয়েদের কোম্পানি পছন্দ করে। এই একটু গল্প-টল্প করতে চায়। জাস্ট আ টেণ্ডার ফেমিনিন টাচ।’

সোজাসুজি সুশোভনের চোখের দিকে তাকিয়ে মণিকা চাপা অথচ কঠিন গলায় বলেছে, ‘এ তোমাকে ছাড়তে হবে।‘

হাসির একটা পলকা ভঙ্গি করে সুশো বলেছে, কী যে বল, তার কোনও মানে হয় না।

‘নিশ্চয়ই হয়। আমি চাই না আমার স্বামী কেরিয়ারের জন্য এত নিচে নামুক।‘

‘নিচে নামানামির কী আছে! দিস ইজ আ পার্ট অফ আওয়ার লাইফ।‘

‘এ ধ্বনের লাইফের দরকার নেই আমার। তোমার সম্পর্কে আমার শ্রদ্ধা নষ্ট হতে দিও না।‘

মণিকার কণ্ঠস্বরে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যাতে সুশোভন চমকে উঠেছে। বলেছে, ‘একটা তুচ্ছ বাজে ব্যাপার দেখছি তোমার মাথায় ফিক্সেশানের মতো আটকে গেছে। আজকাল র‍্যাট রেসে টিকে থাকতে হলে, জীবনে ওপরে উঠতে হলে, মানুষকে অনেক কিছু করতে হয়।‘

‘খুব বেশি রাইজ আর অনেক টাকার দরকার কী? ভদ্রভাবে চলে গেলেই হল।‘

সুশোভন বোঝাতে চেষ্টা করেছে, তার বন্ধুবান্ধবরা টাকা পয়সার জন্য, প্রোমোশনের জন্য কত কী করে বেড়াচ্ছে। তাদের স্ত্রীরা এই নিয়ে মণিকার মতো খিটিমিটির তো করেই না, বরং রীতিমত উৎসাহই দেয়।

মণিকা বলেছে, তোমার দুর্ভাগ্য, আমি তোমার বন্ধুর স্ত্রীদের মতো উপযুক্ত সহধর্মিণী হতে পারিনি।

মাথার ভেতরটা এবার গরম হয়ে উঠেছে সুশোভনের। বলেছে, ‘দেখ, মস্তিষ্কে নাইনটিনথ সেঞ্চুরির কিছু ভ্যালুজ ঢুকিয়ে বসে আছ। ও আজকাল একেবারে অচল, টোটালি মিনিংলেস। তোমার বাপু কোনও সাধু-টাধু টাইপের লোককে বিয়ে করা উচিত ছিল। আমি তোমার লাইফে মিসফিট।’

হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের মতো মণিকা তৎক্ষণাৎ বলেছে, ‘বোধহয়। এই বিয়েটা তোমার আমার কারও পক্ষেই হয়তো ভাল হয়নি।’

এরপর আর কিছু বলার ছিল না সুশোভনের। স্তব্ধ বিস্ময়ে বিমূঢ়ের মতো সে তাকিয়ে ছিল।

ক্রমশ যত দিন গেছে, দু’জনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছিল। পারস্পরিক শ্রদ্ধা বিশ্বাস বা মমতা বলতে কিছুই প্রায় আর অবশিষ্ট ছিল না। রাত্তিরে এক ঘরে তারা থাকে না। তাদের বিছানা আলাদা হয়ে গেছে। কথাবার্তাও একরকম বন্ধ। সুশোভন ফ্ল্যাটে থাকলে পাশাপাশি দুই ঘরে তারা চুপচাপ বসে থাকে। ইদানীং বেশ কিছুদিন বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে ডাকে না সে। ওদের কারও কিছু দরকার হলে সতীশকে দিয়ে বলায়। সমস্ত ফ্ল্যাট জুড়ে এখন দম বন্ধ করা আবহাওয়া।

এভাবে মন এবং স্নায়ুর ওপর মারাত্মক চাপ নিয়ে জীবন কাটানো অসম্ভব। এর মধ্যে একদিন মণিকা সোজা তার ঘরে এসে বলেছে, ‘তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।’

প্রায় দেড়মাস পর সুশোভনের ঘরে এসেছিল মণিকা। রীতিমত অবাকই হয়ে গিয়েছিল সুশোভন। বলেছিল, কী কথা?

‘আমরা যেখানে এসে পৌঁছেছি তাতে নিশ্চয়ই তোমার খুব অসুবিধে হচ্ছে।‘

‘আমার কথা থাক। অসুবিধাটা বোধহয় তোমারই বেশি। তা কী করতে চাও তুমি?’

‘এলাহাবাদ যেতে যাই। দাদাকে চিঠি লিখেছি। কয়েকদিনের ভেতরেই আমাকে নিতে আসবে।‘

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল সুশোভন। তারপর বলেছিল, একেবারে নিয়ে যাবার জন্যে চিঠি লিখে ফেললে! একটু থেমে বলেছিল, ঠিক আছে।

তারপর থেকে শুধু অমলের জন্য অপেক্ষা করে থাকা। আজ কাল পরশু, যে কোনওদিন সে এসে পড়তে পারে। সুশোভনের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, অমলের সঙ্গে সেই যে মণিকা চলে যাবে, আর কোনওদিনই ফিরবে না।

কতক্ষণ আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে মণিকার দিকে তাকিয়েছিল, খেয়াল নেই। আচমকা কলিং বেল বেজে উঠল।

আজকাল তাদের ফ্ল্যাটে বিশেষ কেউ আসে না। বন্ধুবান্ধব, অফিসের কলিগ, অ্যাড-ফিল্মের মডেলরা—কেউ না। মণিকার সঙ্গে তার সম্পর্কটা কোন পর্যায়ে। পৌঁছেছে, মোটামুটি সবাই তারা জেনে গেছে। তাই পারতপক্ষে এধার মাড়ায় না। একটা অস্বস্তিকর আবহাওয়ার ভেতরে গিয়ে কী লাভ?

সুশোভন প্রথমটা ভেবেছিল, জমাদার বাথরুম সাফ করতে এসেছে। কিংবা যে ছেলেটা মিল্ক বুথ থেকে দুধ এনে দেয় সে-ও হতে পারে। যে-ই আসুক বিশেষ, কৌতূহল নেই সুশোভনের। ওরা এলে সতীশ দুধ নিয়ে ফ্রিজে রেখে দেবে বা বাথরুম পরিষ্কার করাবে। কাজকর্মে লোকটা দারুণ চৌখস।

একটু পরেই দরজা খোলার আওয়াজ কানে এল। পরক্ষণেই ফ্ল্যাট কাঁপানো চিৎকার, সুশোভন কোথায় রে?

গলার আওয়াজেই টের পাওয়া গেল পরিমল। আস্তে, গলার স্বর নিচু পর্দায় নামিয়ে কথা বলতে পারে না সে। কলেজে সুশোভনের সঙ্গে পড়ত। পরে এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে চাকরি যোগাড় করে ক’বছর আগে মিডল ইস্টে চলে গিয়েছিল। ওখানে তাদের কোম্পানি কী একটা প্ল্যান্ট বসাচ্ছে। সেখানে পরিমল টপ একজিকিউটিভ এঞ্জিনিয়ার।

ব্যস্তভাবে খাট থেকে নেমে বাইরে আসতেই সুশোভনের চোখে পড়ে, লিভিং কাম-ড্রইং রুমে পরিমল আর তার স্ত্রী সুজাতা দাঁড়িয়ে আছে। পরিমলের হাতে একটা মাঝারি সাইজের দামি সুটকেস। তাকে দেখেই সুটকেসটা নামিয়ে রেখে প্রায় দৌড়ে এসে দু’হাত জড়িয়ে ধরল, ‘কেমন আছিস রে শালা?’

সেই কলেজ লাইফ থেকেই পরিমলটা দারুণ হুল্লোড়বাজ আর আমুদে। তার মধ্যে কোনওরকম প্যাঁচ বা নোংরামি নেই। ওর স্বভাব অনেকটা দমকা বাতাসের মতো-ও এলেই মনে হয় ঘরের সব বন্ধ দরজা-জানলা খুলে গেল।

পরিমলকে দেখে মনটা খুশি হয়ে গেল সুশোভনের। বলল, এই চলে যাচ্ছে। তোরা কেমন আছিস বল।

‘আমরা কখনও খারাপ থাকি না। অলওয়েজ ইন আ জলি গুড মুড। আমাদের মতো স্বামী-স্ত্রী হোল ওয়ার্ল্ডে খুব বেশি খুঁজে পাবি না।‘ বলে ঘাড় ফিরিয়ে চোখের কোণ দিয়ে স্ত্রীকে দেখতে দেখতে পরিমল বলল, ‘না কি বল?’

সুজাতা হাসল, অর্থাৎ পরিমল এবং সুজাতা দাম্পত্য জীবনে খুবই সুখী। পারফেক্ট আণ্ডারস্ট্যাণ্ডিং বলতে যা বোঝায় তা তাদের রয়েছে। হঠাৎ নিজের আর মণিকার কথা মনে পড়তে অদ্ভুত বিষাদে বুকের ভেতরটা ভরে যেতে লাগল সুশোভনের।

বন্ধুকে ছেড়ে দিয়ে একটা সোফায় বসতে বসতে পরিমল বলল, অনেকদিন পর তোর সঙ্গে দেখা হল। কী ভাল যে লাগছে!

সুশোভন দাঁড়িয়েই ছিল। একটু ভেবে বলল, ‘হ্যাঁ, প্রায় বছর পাঁচেক পর তোকে দেখলাম। এখন যেন তুই মিডল-ইস্টে কোথায় পোস্টেড?’

‘কুয়েতে। আমাদের কোম্পানি ওখানে একটা বিরাট এয়ারপোর্ট তৈরি করছে।‘

সুশোভন জানত, যাদবপুর থেকে ডিগ্রি নিয়ে বেরুবার পর পরিমল বছর দুই তিন কলকাতার একটা ফার্মে কাজ করেছে। তারপর চলে যায় বম্বে অন্য একটা কোম্পানিতে। সেই কোম্পানি মিডল-ইস্ট আর আফ্রিকার নানা দেশে বিরাট বিরাট প্রোজেক্ট করেছে। ক’বছর ধরে পরিমল এই সব প্রোজেক্টের কাজে কখনও আবুধাবি, কখনও বাগদাদ, কখনও ত্রিপোলিতে রকির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাইরে দিনরাত তার এত ব্যস্ততা যে দেশে ফেরার সময়ই পায় না। আগে তবু দেড় দু’বছর পর পর। আসতে পারত। ক’বছর আগে একবার সুজাতাকে বিয়ে করতে এসেছিল। এবার তো এল পাঁচ বছর বাদে।

পরিমল বলল, এবার একমাসের ছুটি নিয়ে এসেছি। লাস্ট উইকে বম্বে পৌঁছেছি। হেড অফিসে দুটো জরুরি কনফারেন্স ছিল। সেসব সেরে পরশু মর্নিং ফ্লাইটে এসেছি কলকাতায়। তোকে সারপ্রাইজ দেব বলে ফোন-টোন না করেই চলে এলাম। কতকাল একসঙ্গে থাকি না। এবার তোর এখানে তিন-চার দিন থেকে যাব। সুটকেসটা দেখিয়ে বলল, এই দ্যাখ, একেবারে জামাকাপড় নিয়ে রেডি হয়ে এসেছি।

সুশোভন চমকে উঠল। পরিমল তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। সেই স্কুল কলেজে পড়ার সময় থেকে যতদিন পরিমল কলকাতায় ছিল, রোজ দু’জনের একবার করে

দেখা না হতে চলত না। কতদিন পরিমল তাদের বাড়ি এসে থেকে গেছে, সে-ও গিয়ে থাকত পরিমলদের বাড়ি। কোনওদিন যে তাদের ছাড়াছাড়ি হবে, এ যেন ভাবাই যেত না।

পরিমল তার কাছে ক’দিন থাকবে। সোনার সুতো দিয়ে বোনা যৌবনের সেই দিনগুলো নতুন করে ফিরে আসবে, এর চেয়ে আনন্দের ব্যাপার আর কী হতে পারে। কিন্তু কয়েক দিন না, কয়েকটা মিনিট থাকলেই তার আর মণিকার এখনকার সম্পর্কটা ওদের চোখে ধরা পড়ে যাবে। ভেতরে ভেতরে দারুণ গুটিয়ে গেল সুশোভন। ফ্যাকাসে একটু হেসে কোনওরকমের বলল, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।

সুজাতা ওধারের একটা সোফায় এর মধ্যে বসে পড়েছিল। সে এবার বলে উঠল, ‘আপনার মিসেস কোথায়? তার তো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। বাড়িতে নেই?’

সুজাতার দিকে তাকাল সুশোভন। গোলগাল আদুরে চেহারা। চোখে মুখে হাসির আভা মাখানো। সে যে সুখী, তৃপ্ত সেটা যেন তার সর্বাঙ্গে হালকা লাবণ্যের মতো মাখানো রয়েছে।

সুজাতাকে আগে খুব বেশি দেখেনি সুশোভন। পরিমলের বিয়েটা প্রেম-ফ্রেম করে বিয়ে নয়। পুরনো স্টাইলে বাড়ি থেকে মেয়ে দেখে বিয়ের ব্যবস্থা করা। হয়েছিল। মেয়ে দেখার সময় একবার সুজাতাকে দেখেছে সুশোভন। তারপর বিয়ে এবং বৌভাতের দিন। পরে খুব সম্ভব বারদুয়েক। সুজাতার সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ বেশি পাওয়া যায়নি। যাই হোক, হৃৎপিণ্ড পলকের জন্য থমকে যায় সুশোভনের। কাঁপা দুর্বল গলায় সে বলে, বাড়িতেই আছে।

ওধারের সোফা থেকে প্রায় চেঁচিয়েই ওঠে পরিমল, তুই আশ্চর্য ছেলে তো বৌকে কোথায় গায়েব করে রেখেছিস? ডাক, এক্ষুনি ডেকে আন।

অগত্যা প্রায় মাসখানেক-মাসদেড়েক বাদে মণিকার বেডরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল সুশোভন। দূরমনস্কের মতো এখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মণিকা। পরিমলরা যে এসেছে, সে কি টের পায়নি?

কয়েক মুহূর্ত দ্বিধান্বিতের মতো তাকিয়ে থাকে সুশোভন। তারপর আস্তে করে ডাকল, মণিকা–

চমকে মুখ ফেরায় মণিকা। রীতিমত অবাকই হয়ে যায়। কতদিন পর সুশোভন তাকে ডাকল, মনে করতে পারল না। জিজ্ঞাসু চোখে সে তাকিয়ে থাকে।

সুশোভন এবার বলল, ‘পরিমলকে তো তুমি চেন।‘

মণিকা মাথা নাড়ল—চেনে। যদিও তার বিয়ের পর দু-একবার মাত্র পরিমলকে দেখেছে। অবশ্য সে যে সুশোভনের প্রাণের বন্ধু, এ খবর তার অজানা নয়।

সুশোভন বলল, ‘পরিমল ওর স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে। ড্রইং রুমে বসে আছ। ওরা ক’দিন আমাদের এখানে থাকবে।‘

মণিকার চোখে মুখে চাঞ্চল্য ফুটে উঠল কিন্তু এবারও কিছু বলল না সে।

সুশোভন গলার ভেতর একটু শব্দ করল। তারপর ইতস্তত করে বলল, ‘আমার একটা অনুরোধ রাখবে?’

মণিকা আবছা গলায় বলল, ‘কী?

‘আমাদের মধ্যে যা-ই হয়ে থাক না, পরিমলরা যেন বুঝতে না পারে। ওরা যে কদিন থাকে একটু অ্যাডজাস্ট করে নিও। আই মীন–’ বলতে বলতে থেমে যায় সুশোভন। তার দু’চোখে অনুনয়ের ভঙ্গি ফুটে ওঠে। অর্থাৎ বাইরের লোকজনের সামনে পরস্পরের তিক্ত সম্পর্কটা যাতে বিস্ফোরণের মতো ফেটে না পড়ে সেই জন্যই সুশোভনের এই কাকুতি-মিনতি।

মণিকা এক পলক ভেবে নিল। আর কদিন বাদেই দাদা এলে সে তো এলাহাবাদ চলে যাচ্ছেই। তার আগে দু-চারটে দিন সুখী দম্পতির রোলে অভিনয় করলই না হয়। যে সম্পর্ক চিরকালের মতো শেষ হয়ে যাচ্ছে, যার আর জোড়া লাগার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই, খুশি মুখে পরিতৃপ্ত ভঙ্গিতে কয়েকটা দিনের জন্য তার জের টেনে চলতে হবে। এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ডিভোর্স হয়নি, আইনের চোখে এখনও তারা স্বামী-স্ত্রী। এ সবই ঠিক, তবু মনে মনে তারা বিবাহ-বিচ্ছেদের জন্য প্রস্তুত হয়েই আছে। এই সময় আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করাটা একটা নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা বৈকি।

মণিকা বলল, ‘ঠিক আছে। তোমার সম্মান যাতে নষ্ট না হয়, যাতে কোনও রকম অস্বস্তিতে না পড় সেটা আমি দেখব।‘

মারাত্মক একটা টেনশান কেটে যায় সুশোভনের। দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে একটু হাসে সে। বলে, পরিমলরা ড্রইং রুমে বসে আছ। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল। বলে গভীর আগ্রহে মণিকার দিকে তাকাল।

সুশোভনের ইচ্ছেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না মণিকার। খাট থেকে নামতে নামতে সে বলে, চল, আমি যাচ্ছি। একটু পরে সুশোভনের সঙ্গে ড্রইং রুমে এসে স্নিগ্ধ হেসে মণিকা পরিমলকে বলে, কতদিন পর আপনার সঙ্গে দেখা। কী ভাল যে লাগছে। আমাদের এখানে কিন্তু কদিন থেকে যেতে হবে। পরিমলরা যে এখানে থাকতেই এসেছে সে খবর সুশোভনের কাছে কিছুক্ষণ আগেই পেয়েছে মণিকা। তবু কথাটা যে বলল, সেটা নিতান্তই আন্তরিকতা বোঝাবার জন্য।

পরিমল বলল, ‘থ্যাংক ইউ। আমরা তো সেইরকম প্ল্যান করেই এসেছি। ক’টা দিন হই-হই কাটিয়ে দেওয়া যাবে।‘

মণিকা হেসে হেসে বলল, আপনারা দুই বন্ধু গল্প করুন। আমি এঁর সঙ্গে একটু কথাটথা বলি। আপনাদের বিয়ের সময় সেই একবার মোটে দেখেছিলাম। তারপর যে দু’বার কলকাতায় এসেছিলেন তখন আমি এলাহাবাদে, বাপের বাড়িতে। বলতে বলতে সুজাতার পাশে গিয়ে বসল মণিকা। বলল, ‘প্রথমেই বলে রাখছি, আমি কিন্তু আপনি-টাপনি করে বলতে পারব না।

সুজাতা হাসল।

‘তুমি করে বললে রাগ করবে না তো?’ মণিকা ফের বলে।

‘আরে না না, তুমি করেই তো বলবে।’ মণিকা যে এত দ্রুত আপন করে নেবে সুজাতা ভাবতে পারেনি। তাকে খুবই খুশি দেখাল।

বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে চোখের কোণ দিয়ে মণিকাকে লক্ষ করতে লাগল সুশোভন। হেসে হেসে সুজাতার সঙ্গে গল্প করছে মণিকা। খুবই ইনট্রোভার্ট ধরনের মেয়ে সে। কোনওদিন তাকে এত উচ্ছ্বসিত হতে দেখেনি সুশোভন। যেভাবে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে সুজাতার সঙ্গে সে কথা বলছে তাতে মনে হয় সুজাতা যেন তার কতকালের চেনা। মণিকার সঙ্গে তার সম্পর্কটা যে একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, এই মুহূর্তে তাকে দেখলে কে তা বুঝবে!

কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে সতীশকে দিয়ে প্রচুর কেক, প্যাস্ট্রি, সন্দেশ আর চা নিয়ে নিজের হাতে সাজিয়ে সবার সামনে ধরে দিল মণিকা। তারপর বাজার থেকে কী কী আনতে হবে, তার একটা লিস্ট করে তাকে পাঠিয়ে দিল। প্রায় দেড়মাস বাদে এভাবে তাকে বাজারে পাঠাল মণিকা। এই ক’সপ্তাহ সতীশ নিজের থেকেই যা ইচ্ছে কিনে এনেছে বা বেঁধেছে। কিভাবে কি হচ্ছে, সে সম্পর্ক একটা কথাও বলেনি মণিকা। এমন কি রান্নাঘরে উঁকি পর্যন্ত দেয়নি। গভীর উদাসীনতায় সংসার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে চুপচাপ নিজের ঘরে বসে থেকেছে। সতীশও সুশোভনের মতোই অবাক হয়ে গেছে। বিমূঢ়ের মতো মণিকাকে দেখতে দেখতে সে চলে গেল।

এদিকে আচমকা কিছু মনে পড়ে যেতে পরিমল স্ত্রীর দিকে ফিরে বলল, ওদের জন্যে কী সব এনেছ, সেগুলো বার করে দাও।

‘আরে তাই তো—’ ব্যক্তভাবে নিজেদের সুটকেসটা খুলে সুশোভনের জন্য দামি প্যান্টের পিস, টাই-পিন, টেপ-রেকর্ডার এবং মণিকার জন্য ফরেন কসমেটিকস, হাউস কোট ইত্যাদি ইত্যাদি কত রকমের জিনিস যে বার করে দিল সুজাতা!

সুশোভন বলল, ‘এত সব কী এনেছিস! তোদের কি মাথা-টাথা খারাপ!’

সুজাতা এবং পরিমল একসঙ্গে জানালো, এমন কিছুই তারা আনেনি। খুবই সামান্য জিনিস।

হাত পেতে হাউস কোট-টোট নিতে নিতে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যাচ্ছিল মণিকা। এসব তাকে নিতে হচ্ছে সুশোভনের স্ত্রী হিসেবে, যার সঙ্গে কিছুদিনের মধ্যেই তার সম্পর্ক চিরদিনের মতে ছিন্ন হয়ে যাবে। এই উপহারগুলিতে তার এতটুকু অধিকার নেই। এক ধরনের ক্লেশ এবং অস্বস্তি মণিকাকে খুবই কষ্ট দিতে থাকে। মনে মনে সে স্থির করে ফেলে, এলাহাবাদ যাবার সময় এর একটি জিনিসও নিয়ে যাবে না, সব এখানে রেখে যাবে।

মণিকা নিজের মনোভাবটা মুখে চোখে ফুটে উঠতে দেয় না। শুধু বলে, এর কোনও মানে হয়!

ওদের কথাবার্তার মধ্যেই একসময় বাজার করে ফিরে আসে সতীশ। কী কী রান্না হবে, ভাল করে তা বুঝিয়ে দেয় মণিকা। শুধু তা-ই নয়, মাঝে মাঝে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে উঠে গিয়ে রান্না দেখিয়ে আসে, কখনও বা চা করে আনে।

অতিথিদের যে এত যত্ন করতে পারে, যে এমন নিপুণ সুগৃহিণী, কদিন পরেই তার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না, ভাবতেই বুকের ভেতর অদৃশ্য কোনও শিরা ছিঁড়ে যায় সুশোভনের।

.

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার সময় অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটে যায়। টেবিলের এক দিকে পাশাপাশি বসেছে পরিমল এবং সুজাতা। তাদের মুখোমুখি মণিকা আর সুশোভন। মণিকা অবশ্য একসঙ্গে বসতে চায়নি। সবাইকে খাইয়ে, পরে খাবে বলে ভেবে রেখেছিল। কিন্তু সুজাতা রাজি হয়নি, একরকম জোরজার করে তাকেও সঙ্গে বসিয়ে দিয়েছে।

মণিকার ইঙ্গিতে এবং নির্দেশে সতীশ সবার প্লেটে খাবার দিয়ে যাচ্ছিল। একটা বড় মাছের মাথা সে যখন পরিমলের প্লেটে দিল তক্ষুনি পরিমল সেটা সুজাতার পাতে তুলে দিল। লজ্জায় এবং সুখে মুখটা আরক্ত দেখাচ্ছে সুজাতার।

ওদিকে সতীশ আর একটা মাছের মুড়ো সুশোভনের পাতে দিয়েছে। দ্রুত সুশোভন এবং মণিকা পরস্পরের দিকে একবার তাকায়। আগে হলে মুড়োটা কিছুতেই নিত না সুশোভন। মাছের মুড়ো মণিকার খুব পছন্দ। কিন্তু এখন তাদের যা সম্পর্ক তাতে হুট করে মুড়োটা তুলে দেওয়া যায় না। ভেতরে ভেতরে ভয়ানক

অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে লাগল সুশোভন।

এদিকে আচমকা চেঁচিয়ে উঠল পরিমল, ‘কি রে শালা, তুই তো টেরিফিক সেলফিশ দেখছি।‘

সুশোভন চমকে ওঠে, ‘কেন, কী করলাম?’

‘নিজে এত বড় মাছের মুড়োটা সাবড়ে দেবার তাল করছিস। আর তোর বউ মুখ চুন করে বসে আছে। বৌকে কী করে ভালোবাসতে হয় আমার একজাম্পল দেখেও শিখলি না। মুড়োটা মণিকার পাতে তুলে দে এক্ষুণি।‘

সুশোভন অস্পষ্ট গলায় কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল, বোঝা গেল না। মণিকাই তাড়াতাড়ি বলে উঠল, মাছের মুড়ো-টুড়ো আমার ভাল লাগে না। ভীষণ কাটা।

এরপর যান্ত্রিক নিয়মে খেতে লাগল মণিকা আর সুশোভন। পরিমল অবশ্য প্রচুর কথা বলছিল। আর করছিল বিদেশবাসের সময়কার মজার মজার সব গল্প। একটু আধটু হাসছিল সুশোভন। মাঝে-মধ্যে হুঁ হাঁ করে যাচ্ছিল।

.

খাওয়া-দাওয়ার পর সুশোভন বলল, সতীশকে বিছানা করে দিতে বলি। তোরা একটু রেস্ট নে।

পরিমল জোরে জোরে মাথা ঝাঁকায়, দিবানিদ্রা দেবার জন্যে কুয়েত থেকে তোর এখানে এসেছি নাকি? কদিন এখন শুধু আড্ডা, বাংলা সিনেমা, তাস, বাংলা থিয়েটার, এটসেট্রা, এটসেট্রা।

দু’মিনিটের ভেতর কদিনের একটা প্রোগ্রামও ছকে ফেলে পরিমল। আজ এই দুপুরবেলায় তাসের আসর বসবে। বিকেলে চা-টা খেয়ে একটা বাংলা নাটক কি সিনেমা। রাত্রে ফিরে এসে আবার আচ্ছা, তারপর ডিনার, অবশেষে ঘুম। কাল সকাল থেকে আড্ডা-নাটক ইত্যাদি ব্যাপারগুলোর সঙ্গে ছেলেবেলার বন্ধুদের বাড়িতেও হানা দেবে। ক’টা দিন কলকাতাকে জমিয়ে মাতিয়ে পরিমলরা আবার কুয়েতে ফিরে যাবে। ঠিক হয়, কাল থেকে দিন চারেক সুশোভন ছুটি নেবে।

কাজেই ড্রইং রুমে আবার সবাই চলে আসে। হালকা মেজাজে নতুন করে গল্পটল্পর ফাঁকে একসময় সুশোভনকে ডেকে দক্ষিণ দিকের ব্যালকনিতে নিয়ে যায় মণিকা। বেশ অবাকই হয়েছিল সুশোভন। জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবে?

হ্যাঁ। আস্তে মাথা হেলিয়ে দেয় মণিকা, তোমার বন্ধুরা আমাদের জন্যে এত জিনিস এনেছে। ওদেরও আমাদের দিক থেকে কিছু প্রেজেন্টেশন দেওয়া দরকার। নইলে খারাপ দেখাবে।

এই ব্যাপারটা আগে মাথায় আসেনি, অথচ আসা উচিত ছিল। সংসারের সব দিকে মণিকার চোখ কান খোলা। বরাবরই সুশোভন লক্ষ করেছে, তার কর্তব্যবোধের তুলনা হয় না। মণিকা সম্বন্ধে রীতিমত কৃতজ্ঞতাই বোধ করল সে। খুব আন্তরিকভাবে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, দেওয়া তো নিশ্চয়ই দরকার। ওদের জন্যে তোমার পছন্দমতো কিছু কিনে এনো।

তুমিই নিয়ে এস না।

দোকানের ভিড়ভাট্টায় আমার যেতে ইচ্ছে করে না। সাফোকেটিং মনে হয়। তুমিই একসময় চলে যেও।

ওরা যেরকম প্রোগ্রাম-ট্রোগ্রাম করেছে তাতে পরে যাবার সময় পাওয়া যাবে। গেলে এখনই যেতে হয়।

‘বেশ তো, গাড়িটা নিয়ে চলে যাও।‘

মণিকা নিজে ড্রাইভ করতে জানে। সুশোভন বলা সত্ত্বেও মণিকা কিন্তু গেল না, দাঁড়িয়েই রইল।

সুশোভন জিজ্ঞেস করল, আর কিছু বলবে? মুখ নামিয়ে দ্বিধান্বিতের মতো মণিকা বলে, ‘মানে—’ বলেই থেমে যায়।

হঠাৎ সুশোভনের মনে পড়ে, ডিডোর্স সম্পর্কে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্ত নেবার পর থেকেই আলমারির চাবি নিজের কাছে আর রাখে না মণিকা, সতীশকে দিয়ে সুশোভনের কাছে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে।

দ্রুত নিজের বেডরুমে গিয়ে বালিশের তলা থেকে চাবির গোছাটা এনে মণিকাকে দিতে দিতে সুশোভন বলে, আলমারি থেকে টাকা নিয়ে যাও—

কুণ্ঠিত মুখে মণিকা বলে, ‘কিন্তু—’

বিষণ্ণ হাসে সুশোভন, ‘স্বামী-স্ত্রীর নকল রোলে যখন অভিনয় করতে রাজিই হয়েছ তখন সামান্য খুঁতটা আর রাখছ কেন? ফিউচারে আমাদের যা-ই ঘটুক না, আমি কি তোমাকে কোনওদিন অবিশ্বাস করতে পারব?’ তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত এক কষ্টে বুজে আসে।

মণিকা উত্তর দেয় না। চাবি নিয়ে সোজা সুশোভনের ঘরে গিয়ে আলমারি খোলে। কতকাল বাদে সে এই ঘরে ঢুকল।

একটু পর টাকা নিয়ে একাই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল মণিকা। যাবার আগে পরিমলদের বলল, একটা দরকারি কাজে সে বেরুচ্ছে। ঘন্টাখানেকের ভেতর ফিরে আসবে। ইচ্ছে হলে পরিমলরা একটু ঘুমিয়ে নিতে পারে।

পরিমল জানালো, দুপুরে ঘুমোবার অভ্যাস তার বা সুজাতার কারও নেই। মণিকা যতক্ষণ না ফিরছে তারা সুশোভনের সঙ্গে গল্প করে কাটিয়ে দেবে। সে ফিরে। এলে চারজনে জমিয়ে তাসের আসর বসাবে।

.

এক ঘন্টা না, প্রায় ঘন্টাদুয়েক বাদে সুজাতার জন্য দামি মাইশোর সিল্কের শাড়ি, নামকরা গায়কদের লং-প্লেয়িং রেকর্ড, কিছু ইন্ডিয়ান পারফিউম আর পরিমলের জন্য দামি প্যান্ট এবং শার্টের পীস ইত্যাদি নিয়ে ফিরে এল মণিকা।

পরিমল প্রায় চেঁচামেচিই জুড়ে দিল, এই জন্যে বেরুনো হয়েছিল! কোনও মানে হয়?

সুজাতা মজা করে বলল, ‘ওই যে আমরা কি একটু দিয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে তার রিটার্ন দেওয়া হল।

মণিকা বলল, রিটার্ন আবার কী! সামান্য উপহার। এগুলো দেখলে আমাদের কথা মনে পড়বে।

পরিমল বলল, এগুলো না দিলেও মনে পড়বে।

‘জানি। তবু—’

এরপর এ নিয়ে আর কথা হয় না। পরিমল বলে, এবার তা হলে তাস নিয়ে বসা যাক।

মণিকা বলে, আমার আপত্তি নেই। পুরুষ ভার্সান মহিলা খেলা হোক। সুজাতা আর আমি একদিকে, আপনার ফ্রেণ্ড আর আপনি আরেক দিকে।

‘ও, নো নো—’ জোরে জোরে প্রবলবেগে মাথা নাড়ল পরিমল, ওটা হবে না। ওই ইভস ভার্সান আদমস-এর কারবারে আমি নেই। সুজাতা আমার লাইফ পার্টনার। সুখে-দুঃখে ভালয়-মন্দয়, চেস্ট বেঙ্গলিতে কী যেন বলে শ্মশানে রাজদ্বারে সব সময় ও আমার পার্টনারই থাকবে। এই তাস খেলাতেও ওকে আর কারও পার্টনার হতে দেব না বলে রগড়ের ভঙ্গিতে চোখ টিপল।

পরিমল এবং সুজাতার মধ্যে সম্পর্কটা কতটা গভীর, নতুন করে আরেক বার টের পাওয়া গেল। সুশোভন একধারে এতক্ষণ চুপচাপ সিগারেট হাতে বসে ছিল। কোনও এক যান্ত্রিক নিয়মেই যেন তার চোখ চলে যায় মণিকার দিকে। মণিকাও তার দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয় মণিকা। সুশোভন টের পায়, বুকের অতল থেকে ঢেউয়ের মতো কিছু একটা উঠে আসছে।

একসময় খেলা শুরু হয়। পরিমলের ইচ্ছে মতোই সুজাতা তার পার্টনার হয়েছে। অগত্যা সুশোভনের পার্টনার হয়েছে মণিকা।

সুজাতা ভুল তাস ফেললেই হই চই করে একটা কাণ্ড বাধিয়ে দিচ্ছে পরিমল, তুমিই আমাকে ডোবাবে।

মণিকা খুব ভাল তাস খেলতে জানে না। সে এনতার বাজে তাস ফেলে যাচ্ছে। আগেকার সম্পর্ক থাকলে পরিমলের মতোই সুশোভনও চেঁচামেচি করত। কিন্তু হারজিত্রে ব্যাপারে এখন তার মনোভাব একেবারেই নিস্পৃহ। প্রতি দানেই তারা পরিমলদের কাছে হেরে যাচ্ছে। কিন্তু কী আর করা যাবে। জয় পরাজয়, দুইই তার কাছে এখন সমান। নিঃশব্দে অন্যমনস্কর মতো সে খেলে যেতে লাগল।

প্রতি দানে জিতে জিতে দারুণ মেজাজে আছে পরিমল। সে বলল, কি রে, তোর বউ তোকে ফিনিশ করে দিলে!

চমকে মণিকার দিকে তাকায় সুশোভন। চমকানো ভাবটা তার একার নয়, মণিকারও। দ্রুত মণিকা তার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল।

এক পলক কিছু ভাবল সুশোভন। তারপর বলল, ‘আরে বাবা, খেলাটা খেলাই। এটা তো আর লাইফ অ্যান্ড ডেধের ব্যাপার নয়। তাসের খেলায় তোরা না হয় জিতলিই। এই তুচ্ছ জিনিস নিয়ে বউকে বকাবকি করতে যাওয়াটা মিনিংলেস।’ বলে চিন্তাটিস্তা না করেই হাতের তাসগুলো থেকে একটা বেছে টেবিলের ওপর ফেলল।

একটানা ঘন্টা দুয়েক খেলা চলল। তারপর সন্ধের আগে আগে পরিমল বলল, অনেকক্ষণ তাস হল। এবার চল, একটু বাইরে ঘুরে আসা যাক।

সুশোভন বলল, ফাইন। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে থেকে কোমর ধরে গেছে।

দশ মিনিটের ভেতর চারজন টপ ফ্লোর থেকে নিচে নেমে সুশোভনের গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়ল। ময়দানের চারপাশে চক্কর দিতে দিতে হঠাৎ পরিমল বলল, ‘অনেকদিন বাংলা নাটক দেখিনি। কলকাতায় এখন ভাল ড্রামা কী চলছে?

সুশোভন বলল, ঠিক বলতে পারব না। আমরাও অনেক দিন নাটক-টাটক দেখিনি। অ্যাকাডেমিতে গ্রুপ থিয়েটারগুলো রোজই নাটক করে। ওদের ড্রামায় একটা ফ্রেশ ব্যাপার থাকে। দেখবি নাকি?

পরিমল বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠল। বলল, চল না, দেখাই যাক।’

আহামরিও না, আবার খুব খারাপও না, একটা নাটক দেখে ফ্ল্যাটে ফিরতে ফিরতে সাড়ে নটা বেজে গেল।

.

রাত্তিরে খাওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ আড্ডা-টাজ্ঞা দিতে দিতে পরিমলের হাই উঠতে লাগল। সে বলল, ‘ঘুম পাচ্ছে রে। এবার শুতে হবে। আমি আবার রাতটা বেশি জাগতে পারি না।

শোওয়ার কথায় চমকে উঠল সুশোভন। কেননা তার এই ফ্ল্যাটে মোটে দুটো বেডরুম। পরিমলদের যদি একটা ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়, অন্য ঘরটায় তাকে আর মণিকাকে থাকতে হবে। অনেকদিন মণিকা এবং সে এক ঘরে রাত কাটায় না।

একটু ভেবে সুশোভন বলল, এক্ষুনি শোবার ব্যবস্থা হচ্ছে। এক কাজ করা যাক—’

‘কী?’

‘তুই আর আমি এক ঘরে শোব। আমাদের বউরা অন্য ঘরে। সেই কলেজ লাইফে তুই আর আমি কতদিন এক বিছানায় রাত কাটিয়েছি। এতদিন পর যখন একটা চান্স—’

সুশোভনের কথা শেষ হতে না হতেই প্রবল বেগে দুই হাত এবং মাথা নাড়তে নাড়তে পরিমল বলল, ‘নো নো, নেভার। কলেজ লাইফে যা হয়েছে, হয়েছে। এখন আমাদের ম্যারেজ লাইফ। বউকে ছাড়া আমি ভাই ঘুমোতে পারব না। পরক্ষণেই গলার স্বরটা ঝপ করে অনেকখানি নামিয়ে বলল, তুই কী রে, বউকে ফেলে আমার মতো একটা দুম্বো পুরুষের সঙ্গে শুতে চাইছিস! তোদের মধ্যে কোনওরকম গোলমাল টোলমাল হয়েছে নাকি?’ বলে রগড়ের ভঙ্গিতে হাসতে লাগল।

নেহাত মজা করার জন্যই কথাটা বলেছে পরিমল, কিন্তু সুশোভন এবং মণিকার শিরদাঁড়ার ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ চমকের মতো কিছু খেলে গেল। তাদের সম্পর্কটা কি বাইরের একজন মানুষের চোখে ধরা পড়ে গেছে? দ্রুত পরস্পরের দিকে একবার তাকিয়ে নিল তারা। তারপর সুশোভনই আবহাওয়াটাকে সহজ করে নেবার জন্য। হেসে বলল, ঠিক আছে বাবা, তুই তোর বউয়ের কাছেই শুবি। ম্যারেজ লাইফের হ্যাবিট তোকে নষ্ট করতে হবে না।

সতীশকে দিয়ে একটা ঘরে পরিমল এবং সুজাতার বিছানা করে দেওয়া হল। এবং নিতান্ত নিরুপায় হয়েই অন্য ঘরটায় গিয়ে ঢুকল সুশোভন আর মণিকা। দরজায় তারা খিল দেয়নি। পান্না দুটো ভেজিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল দু’জনে। তারপর মণিকা আস্তে আস্তে ডান দিকে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।

জানালার ফ্রেমের ভেতর দিয়ে যে আকাশ দেখা যায় সেখানে হাজার হাজার তারা জরির ফুলের মতো আটকে আছে। রুপোর থালার মতো গোল চাঁদ উঠেছে। অপার্থিব জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে কলকাতা।

শহর এখনও ঘুমোয়নি। নিচে অবিরত গাড়ি চলার শব্দ। অবশ্য হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের এই টপ ফ্লোরে বাতাসের ছাঁকনির ভেতর দিয়ে সেই আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে উঠে আসছে।

সুশোভন খুবই অস্বস্তি বোধ করছিল। দ্বিধান্বিতের মতো খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আস্তে করে বলল, ‘পরিমলটা ভীষণ ঝামেলায় ফেলে দিল।’

মুখ ফিরিয়ে এদিকে তাকায় মণিকা। সুশোভন কী বলতে চায়, সে বুঝেছে। ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল সে।

সুশোভন এবার বলল, ‘আমি বরং এক কাজ করি।‘

আবার চোখ তুলে তাকায় মণিকা। তবে কিছু বলে না।

সুশোভন বলল, ‘আমি বাইরের ড্রইং রুমে গিয়ে শুই। তুমি এখানেই থাক। আধফোঁটা গলার মণিকা বলল, কিন্তু—’

‘কী?’

‘ড্রইং রুমে তো সতীশ শোয়। ওখানে—’

ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধে হয় না। কাজের লোকের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাড়ির কর্তা গিয়ে শোবে, দৃশ্যটা একেবারেই মনোরম নয়। তাছাড়া সতীশ ভাববেই বা কী!

সুশোভন বলল, ‘তা হলে?’

ঘরের চারপাশ একবার দেখে নেয় মণিকা। তারপর বলে, তুমি শুয়ে পড়। আমি ওই জানালাটার ধারে সোফায় বসে থাকি। একটা তো রাত।

‘আজকের রাতটা না হয় না ঘুমিয়ে কাটাবে। কিন্তু পরিমলরা তো কয়েক দিন থাকছে। বাকি রাতগুলো?’

মণিকা কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই হঠাৎ পাশের ঘর থেকে টুকরো টুকরো হাসি, জড়ানো গাঢ় গলার আবছা আবছা কথা, চুমুর শব্দ, খুনসুটির আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে।

চমকে মণিকা সুশোভনের দিকে একবার তাকাল। পরক্ষণেই মুখ নামিয়ে নেয়। আর সুশোভনের সমস্ত অস্তিত্বের ভেতর দিয়ে তীব্র স্রোতের মতো অনেকক্ষণ, একটানা কী যেন বয়ে যেতে থাকে। নিজের অজান্তেই কখন যে সে মণিকার কাছে চলে এসেছে, জানে না। কোনও এক অভ্রান্ত নিয়মে তার হাত মণিকার কাঁধে উঠে। আসে। সঙ্গে সঙ্গে কী এক অলৌকিক বৈদ্যুতিক ক্রিয়া ঘটে যায়। হঠাৎ সুশোভন টের পায় মণিকার মুখ তার বুকের ওপর আটকে আছে এবং মণিকার শরীরটাও ক্রমশ তার শরীরের ভেতর মিশে যাচ্ছে।

অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে তারা। তারপর কাঁপা গম্ভীর গলায় সুশোভন। বলে, তোমার দাদা অমল এলে বলব, তুমি এলাহাবাদ যাবে না। আরেক বার আমরা চেষ্টা করে দেখি না। তুমি কী বল?

মণিকা উত্তর দেয় না। অনবরত তার মুখটা সুশোভনের বুকে ঘষতে থাকে।

একটু পর সুশোভন বুঝতে পারে, তার বুক চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে। মণিকার কান্না তার মধ্যেও বুঝিবা ছড়িয়ে পড়ে। ভাঙা ভাঙা, ঝাঁপসা গলায় বলে, ‘কেঁদো না, কেঁদো না।‘

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *