আরজুমান্দ বানুকে বহনকারী গাড়িটা স্টার্ট দিয়েছে – আন্দালিব রাশদী

আরজুমান্দ বানুকে বহনকারী গাড়িটা স্টার্ট দিয়েছে মির্জা গালিবের স্ত্রীর নাম কোকিলা বানু। মির্জা গালিব মেয়েদেরও পাখির নামই দিল। প্রথমটা শ্যামা, তারপর সহেলি, মুনিয়া ও কাকাতুয়া। কাকাতুয়া যখন ক্লাস ফোরে, ব্যাপারটা তখনকার।
চাচাতো বোন নুসরাত মির্জার বিয়ে। স্বামীর সঙ্গে শারজা চলে যাবে।
বিয়েটা দরবার হলে। খুব আয়েশ করে সবাই খেল। কাকাতুয়ার ভালো লাগল বোরহানি। ডেজার্ট হিসেবে সার্ভ করা হলো ছোট ছোট মাটির পাত্রে দই এবং বড় পেয়ালায় জর্দা। কাকাতুয়া জর্দা খাওয়ার পর এক গ্লাস বোরহানি খেল, দই শেষ করার পরও এক গ্লাস। ফেরার আগেও এক গ্লাস খেতে ইচ্ছে করছিল। বাসায় ফিরতে বারোটা বেজে গেল। বোরহানিতে প্রচুর লবণ থাকে। শরীরে লবণের পরিমাণ বেড়ে গেলে শরীর আরও পানি টানে। সুতরাং আরও ছয় গ্লাস পানি খেয়ে কাকাতুয়া শুয়ে পড়ল।
তিনটা বেডরুমে তিনটা ডাবল খাট। একটাতে মির্জা গালিব ও কোকিলা বানু, একটাতে শ্যামা মির্জা ও মুনিয়া মির্জা, একটাতে সহেলি মির্জা ও কাকাতুয়া মির্জা।
ঘটনাটা সে রাতেই, সম্ভবত ভোরের দিকে ঘটেছে। সকালে সহেলির প্রবল চেঁচাচেচি। কাকাতুয়ার সঙ্গে আর থাকবে না। কাকাতুয়া পেশাব করে বিছানা ভাসিয়ে দিয়েছে। কোকিলা বানু যতই বলে চুপ কর, সহেলি ততই চেঁচায়, আমি ওর সঙ্গে আর থাকব না, আমি আলাদা রুম চাই।
চতুর্থ দিন মাগরেব ও এশার মাঝামাঝি সময়ে কাকাতুয়ার বাম বাহুতে তাবিজ বাঁধা হলো। তাবিজের কারণে ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র হয়েই গেল। তাবিজ ও আনুষঙ্গিক কথাবার্তা কাকাতুয়ার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করল। বিছানা ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন ঘটল। শ্যামা ও কাকাতুয়া এক বিছানায়, সহেলি ও মুনিয়া অন্যটায়।
মির্জা গালিব বলল, এটা জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট।

কাকাতুয়া ক্লাস নাইনে। সময় কত দ্রুত বয়ে যায়।
সময় দ্রুত বয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা অন্য কারও চোখে না পড়লেও বড় খালার চোখে পড়েছে। তিনিই বলেছেন, দেখেছ কাণ্ড! কী কাণ্ড তাঁর চোখে পড়েছে, যা শ্যামাদের কারও পড়েনি?
বাসায় দুটো—দুটো নয়, তিনটি বাড়তি মানুষ। শ্যামার ক্লাসমেট অহমিকা, বড় খালা আর তাঁর দেবরের ছেলে, ওল্ড টাউনের মাদ্রাসায় ফাজিল শ্রেণীর ছাত্র আবু তৈয়ব আবদুল্লাহ। বড় খালা সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। শ্যামা বলেছে, আবু তৈয়বের দাড়ি হো চি মিনের দ্বিতীয় সংস্করণ।
চায়ে একটা বড় চুমুক দিয়ে বড় খালা বললেন, দেখেছ কাণ্ড, মেয়েটা না সেদিনই বিছানায় মুতেছে আর এখন ক্লাস নাইনে পড়ে।
যে সহেলি ব্যাপারটা নিয়ে নতুন কাণ্ড বাধিয়েছে, সে-ই বড় খালাকে চেপে ধরল, কী আজেবাজে বকবক শুরু করলেন। কে বিছানায় মুতেছে?
বড় খালা বললেন, তোর মাকে জিজ্ঞেস কর, মুতাই হুজুরের তাবিজ তো আমিই এনে দিয়েছি।
সহেলির রাগ পড়ছে না। বাইরের দুটো মানুষের সামনে ঘরের এমন একটা বিব্রতকর বিষয় ফাঁস করে দেওয়াতে রাগটা বরং আরও চড়ে যাচ্ছে। সহেলি বলল, ও বিছানায় হিসু করেছে তো আপনার কী হয়েছে?
এবার বড় খালাও রেগে যান, আমার হবে না তো কার হবে? আমার বোনের মেয়ের ভালো-মন্দ আমিই তো দেখব।
এ সময় কোকিলা বানু এসে সহেলিকে বলল, এক থাপ্পড় দিয়ে সবগুলো দাঁত ফেলে দেব। মুরব্বিদের মুখে মুখে কথা!
সামলে নিল কাকাতুয়া নিজেই। যেন বড় খালা ছাড়া আশপাশে আর কেউ নেই, এমন ভাবে বলল, বড় খালা, আমার অসুখটা সারেনি। এখন তো আর ওর সঙ্গে ঘুমাই না, সে জন্য সহেলি জানে না। প্রায়ই আগের অবস্থাটা হতে যায়, আমি তখন তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে যাই। রাতে ঘুমোতে পারি না। গত ছয় মাস ধরে রাত এগারোটার পর থেকে বই নিয়ে কমোডেই বসে থাকি। কখনো দু-চার পাতা পড়ি, কখনো কমোডে বসেই ঘুমিয়ে থাকি। বোঝেন তো বড় খালা, এ বয়সে তো আর বিছানায় করা যায় না—তা শয়তান যত প্ররোচনাই দিক।
অহমিকা বলল, আমার মেজো চাচা প্রফেসর নাজমুস সোবহান এসবের স্পেশালিস্ট। তাঁর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্ট করিয়ে দেব।
শ্যামা বলল, সি ইজ জাস্ট মেকিং এ ফান।
আবু তৈয়বও বসে থাকার নয়। বলল, কালই বড় হুজুরের পানি পড়া নিজে এসে দিয়ে যাবে। টাকাপয়সা লাগবে না।
বড় খালা কাকাতুয়াকে আদুরে গলায় বললেন, তা আমাকে এত দিন পরে বললি? খালা আর ফুপুরা কী জন্য?

মির্জা গালিবের আপন বোন না থাকায় মেয়েরা ফুপুবঞ্চিত। বড় খালা বললেন, আর একটা তাবিজ আনিয়ে দিচ্ছি। তাবিজটা হাতে বেঁধে সেদিন থেকেই বিছানায় ঘুমাবি। ইনশাল্লাহ, কোনো সমস্যাই দেখতে পাচ্ছি না। সেরে যাবে।
সহেলি বলল, সি ইজ লাইইং। ও মিথ্যে বলছে। ও কমোডে ঘুমায় না।
বড় খালা আঙুল উঁচিয়ে তাকে ধমকে দিলেন, সমস্যাটা তোর, না ওর? তুই আর একটা কথা বলতে পারবি না।
বড় খালা কাকাতুয়াকে কাছে টেনে কোলে বসাতে চাইলেন। শেষে তার কপালে একটা চুমো খেয়ে আবু তৈয়ব আবদুল্লাহকে নিয়ে কচ্ছপের মতো দেখতে ভক্সওয়াগান গাড়িতে উঠলেন। এ রকম গাড়ি ঢাকা শহরে এখন দু-একটার বেশি নেই।

দুই.
দুই দিন পর তাবিজ দিয়ে গেল আবু তৈয়ব আবদুল্লাহ। বলল, বাম হাতে কালো রঙের ঘুঞ্চি দিয়ে বেঁধে রাখবেন একাশি দিন। ইনশাল্লাহ সব বালাই নাশ। একটু দাড়ি নাড়িয়ে আবু তৈয়ব বলল, আপা, শরমের কথা। আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময়ও শয্যার মধ্যে মূত্রপাত করেছি। জি আচ্ছা, বাই বাই বলে আবু তৈয়বকে বিদায় করে কাকাতুয়া তাবিজটা ইনস্ট্রুমেন্ট বক্সের ভেতর রাখল। তাবিজের ভেতর নিশ্চয়ই আরবি কিছু লেখা আছে। আরবিকে অবজ্ঞা করতে নেই।
শ্যামার বিয়ের আলাপ চলছিল। দেখাদেখিও হয়ে গেছে। অনার্স পরীক্ষার পরপরই তারিখ দেওয়া হবে। দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এর মধ্যে অনেকটা আকস্মিকভাবে পাত্রের বড় বোন ও দুলাভাই হাজির। তাঁরা খালি হাতে আসেননি। স্পঞ্জ রসগোল্লা এনেছেন। এসেছেন কেবল একটা কথা জিজ্ঞেস করতে—পাত্রীর ফ্যামিলিতে নাকি খারাপ আছর আছে। মেয়েরা বড় হয়েও নাকি ঘুমের মধ্যে বিছানা ভাসিয়ে দেয়?
মির্জা গালিব বলল, এসব কথা কোথায় শুনেছেন?
সরাসরি আমি শুনিনি। আমার এক কাজিন শুনেছে। রিমা আর মিসেস আরজুমান্দ বানু একই জিমে এক্সারসাইজ করে। শ্যামা নাকি মিসেস আরজুমান্দের আপন বোনের মেয়ে।
বাসাজুড়ে আতঙ্কের নীরবতা।
মির্জা গালিব বলল, আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। আমি এইমাত্র সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার মেয়ে শ্যামাকে আপনাদের বাড়িতে বিয়ে দেব না। আদৌ বিয়ে দেব কি না, সেটা পরে বিবেচনা করব।
নীরবতার ভার অনেক বেশি। অতিথিরা চলে যাওয়ার পর শ্যামা বাবাকে জাপটে ধরে কাঁদতে থাকে। মির্জা গালিবের চোখ থেকেও যখন এক ফোঁটা অশ্রু শ্যামার হাতে পড়ল, হাউমাউ করে শ্যামা কেঁদে উঠল—বাবা, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথায় যাব না।
তিন.
নিঃসন্তান আরজুমান্দ বানুর স্বামী এলাহী নওয়াজ মূলত সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় দ্বিতীয় বিয়ে করা ঠিক হবে কি না ভাবছিলেন। আরজুমান্দই তাঁকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছে। বলেছে, কোনো সমস্যা নেই। তোমার নতুন বউ আমাকে বাড়ি থেকে বের না করে দিলেই হলো। তুমি তো জানো, আমার আর কোনো আশ্রয় নেই। তা ছাড়া ইদানীং কথা একটু বেশিই বলছি, এটা আমার নিজের কাছেই ধরা পড়ছে। আত্মীয়স্বজনও এই বয়সী বকবক করা কাউকে বুয়া হিসেবেও রাখতে চাইবে না।
এলাহী নওয়াজ বলেছেন, আরজু, তোমার স্থান অনেক ওপরে। এমনকি সোফিয়া লরেনও যদি আমার স্ত্রী হয়ে আসে, তাকেও তোমার আদেশ-নির্দেশ মেনে চলতে হবে।
এলাহী নওয়াজ কথা রেখেছেন। সিতারা পারভিনকে দোতলায় উঠিয়ে প্রথমে এনেছেন আরজুর ঘরে।
সালাম করো সিতারা, তোমার বড় বোন। আরজু কোথায় দুঃখ পাবে, নিভৃতে বুক ভাসাবে, উল্টো সিতারাকে বলল, এত দেরি করলি কেন? তিনটা বছর আগে যদি আসতি, বাচ্চার বয়স এখন দুই পেরিয়ে যেত।
বছর ঘুরতে যে মেয়েটির জন্ম হলো, এলাহী নওয়াজ তার নাম রাখলেন পুষ্প। পুষ্প নওয়াজ।
সিতারা পারভিনকে যখন এলাহী নওয়াজ তুলে আনেন, মেয়েটি তখন সদ্য বিধবা। বয়সের ব্যবধান মেনে নিলে স্নেহ ও ভালোবাসার সামান্য কমতি ছিল না এলাহী নওয়াজের। অল্প দিনের মধ্যেই পুষ্প আরজুর স্নেহাচলে চলে গেল। তরুণী স্ত্রীকে ভর্তি করে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সিতারা পারভিন মেধাবী, পারবে।
খুব সংক্ষেপে পরের অংশগুলো হচ্ছে: অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর আলী কবীর সিতারার প্রেমে পড়েছেন এবং সিতারাকে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ানোর জন্য রীতিমতো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেছেন। বিষয়টি তদন্তে উদ্ঘাটিত হয়েছে। সরকারি দলভুক্ত শিক্ষক হওয়ায় কেবল সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। বিরোধী পক্ষের হলে চাকরি চলে যেত। সিতারা নিজে আলী কবীরকে আদৌ ভালোবাসে কি না নিশ্চিত হতে পারছে না। এলাহী নওয়াজ আরজুর সঙ্গেই শুয়ে ছিলেন, মাঝখানে ফুটফুটে পুষ্প। হঠাৎ বললেন, বুকের ভেতর খুব চাপ লাগছে, ড্রাইভারকে গাড়ি লাগাতে বলো, শেরেবাংলা নগরে হূদরোগ হাসপাতালে একটু দেখিয়ে আসি।
এলাহী নওয়াজ গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। দোতলা থেকে নামার সিঁড়িতে প্রথমে বসে পড়েন, তারপর হুমড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়েন। আরজুমান্দের চিৎকারে ড্রাইভার ছুটে আসে। ঠেলে তাঁকে বসাতে চেষ্টা করে। পরে ড্রাইভারই রায় দেয়, আপা, ইন্নালিল্লাহ পড়েন।
সিতারা পারভিন তখন ডিপার্টমেন্টের সহপাঠীদের সঙ্গে শিক্ষা সফরে সিলেটে ডানকানের চা-বাগানে। আলী কবীরও সঙ্গে আছেন।
বছর খানেকের মধ্যে আলী কবীর, পুষ্প ও সিতারা পারভিন একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। আলী কবীর প্রথমে খণ্ডকালীন শিক্ষকতায় নাম লেখায় লুইসিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, দেড় মাসের মধ্যে একাডেমিক রেজিস্ট্রিতে ডেটা এন্ট্রির কাজ পায় সিতারা। পুষ্পর জন্য কিন্ডারগার্টেন কাম ডে-কেয়ার সেন্টার ক্যাম্পাসের ভেতরই। শুরু হয় তাদের আমেরিকান ড্রিম বাস্তবায়নের কাজ।
স্বামী হারিয়ে আরজু যতটা অসহায় বোধ করছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি অসহায় হয়ে পড়ল পুষ্পকে হারিয়ে। এলাহী নওয়াজ নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপই করতেন না। আরজুরও আগ্রহ ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর পরই জানল, একদা কোটিপতি স্বামী মৃত্যুর তিন দিন আগে আদালত থেকে দেউলিয়া ঘোষিত হয়েছে। তার পরও এককভাবে স্বামী তাকে যা কিছু দিয়ে গেছেন, আমৃত্যু তার ভালোই চলবে।
তারপর অনেকটা সময় পার হয়েছে। হয়তো এটা আরজুমান্দ বানুরই অক্ষমতা, কোনো সম্পর্কই ধরে রাখতে পারেনি। সপ্তাহে এক দিন দেবরপুত্র আবু তৈয়ব আবদুল্লাহ তার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটায়, কেনাকাটা কিছু করে দেয়—এ পর্যন্তই।

চার.
আরজুমান্দ বানুর প্রস্রাব বন্ধ। শরীরে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্টকে ফোন করে নিজের সমস্যার কথা বলল এবং আবু তৈয়বকে দ্রুত পাঠিয়ে দিতে অনুরোধ করল। আবু তৈয়বের হাতে এক বান্ডিল টাকা দিয়ে বলল, যা লাগে খরচ কর। আর আমার অবস্থা বেশি খারাপ হলে আমার বোন কোকিলা বানুকে খবর দিস।
হাসপাতালের ডাক্তার খেপে গেলেন। এমন টার্মিনাল স্টেজে কেন এসেছেন? দুটো কিডনিই ডিজফ্যাংশনাল। আরজুমান্দ বানুর মুখ চলছে। ডাক্তারকে বললেন, আরলি স্টেজে এলে না হয় দুই দিন বেশি বাঁচতাম। দুই দিন আগে আর পরে—একই কথা। আবু তৈয়বকে বলল, আরও দু-একটা দিন বেঁচে থাকব। এর মধ্যে কতগুলো জরুরি কাজ সেরে নিতে হবে। উকিল সাহেবকে আজই ধরে নিয়ে আয়। কাল তুই আমাকে তওবা পড়াবি। আমার লাশ কাউকে দেখাবার জন্য রেখে দেওয়ার দরকার নেই। গোসল দিয়ে জানাজা করিয়ে সরাসরি আজিমপুর গোরস্থানে।
উকিল সাহেব যখন এলেন, নিজের হাতে লেখা একটা কাগজ তাঁর হাতে দিয়ে বলল, এই আমার সহায়-সম্পত্তি। কে কী পাবে, সব লিখে দিয়েছি। আপনি পাকা করে নিয়ে আসুন। আমি কালকের দিনটাই আছি।
আবু তৈয়ব আবদুল্লাহ চাচির বোনের বাসায় পৌঁছাল সাড়ে চারটায়। ডিজফ্যাংশনাল কিডনি, প্রস্রাব বন্ধ হওয়া, ক্যাথিটার লাগানো—অনেক কথাই বলল। কোকিলা বানু যখন নির্বাক দাঁড়িয়ে, শ্যামা বলল, এটাই তার প্রাপ্য ছিল। এভাবেই প্রস্রাব বন্ধ হয়েই তার মৃত্যু হবে। মুনিয়া বলল, আপু ঠিকই বলেছে।
আবু তৈয়ব রাস্তায়। পেছন থেকে তার পাঞ্জাবি টেনে ধরেছে সহেলি। আমি যাব, আপনার সঙ্গে। আমি বড় খালাকে দেখতে চাই।
আবু তৈয়ব নারীর ওয়াসওয়াসায় পড়তে চায় না। বলল, আমি একটা রিকশা নিচ্ছি, আপনি আরেকটা রিকশা নিয়ে পেছন পেছন আসুন।
সহেলি বলল, আমার কাছে টাকা নেই।
অসুবিধা নেই। নামার পর আমি দিয়ে দেব।
আবু তৈয়ব রিকশায় উঠল। সহেলি দৌড়ে গিয়ে বলল, ডান দিকে চাপুন, আমি আপনার সঙ্গেই যাব।
তা হয় না।
যদি আমাকে সঙ্গে না নেন, আমি চিৎকার করে লোক জড়ো করে বলব, আপনি আমাকে ফেলে যাচ্ছেন।
আরজুমান্দ বানু যেখানে মৃত্যুশয্যায়, এই পাগলাটে মেয়ের হইচই নিয়ে বিব্রত হওয়ার কোনো মানে নেই। এটি স্পষ্ট বিভেদরেখা তৈরি করে মেয়েটিকে বসতে দিল এবং বলল, কাজটা ঠিক করেননি।
আবু তৈয়বকে অবাক করে দিয়ে সহেলি তার হাত চেপে ধরল। বলল, আপনি প্রথম দিন থেকে আমাকে ইগনর করছেন।
আপনি আমার বড় চাচিকে অনেক কটু কথা বলেছেন। আপনি আমার হাত ছাড়ুন এবং সরে বসুন। আমার এবাদত নষ্ট করবেন না।
সহেলি কথার মোড় ঘুরিয়ে দিল। বলল, আপনার আচরণে কেউ কষ্ট পেলে আপনার সারা জীবনের এবাদত ভেস্তে যাবে।
আবু তৈয়ব বলল, আপনার কথা ঠিক যে মানুষকে কষ্ট দিতে নেই। কিন্তু আমি সজ্ঞানে কাউকে কষ্ট দিইনি।
সহেলি জবাব ঠোঁটের ওপর, চোর, ডাকাত ও ধর্ষণকারী যখন অপরাধকর্ম করে তখন তার ভিকটিম যে কষ্ট পেতে পারে, তা ভাবে না। বোঝেও না। ধর্ষণকারী শব্দটি সহেলি উচ্চারণ করতে চায়নি, এমনিই মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে।
আবু তৈয়ব বলল, অস্তাগফিরুল্লাহ। আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? বড় হুজুর আমাদের নারীসান্নিধ্য এড়িয়ে চলতে বলেছেন।
সহেলি খ্যাপা কণ্ঠে বলল, নারী কি মানুষ নয়, না বড় হুজুর আর আপনিই কেবল মানুষ?
আবু তৈয়বও যে কথাটি বলতে চায়নি, বলে ফেলল, অস্তাগফিরুল্লাহ। আপনি ছোট মানুষ। ছোটদের এ কথা বলতে নেই। আসলে বড় হুজুর ঠিকই বলেছেন, নারীসান্নিধ্যে শরীরে ভিন্ন ভাবের উদয় হয়। এই ভাব আর এবাদত একসঙ্গে চলে না।
সহেলি গলা আর একটু চড়িয়ে বলল, ছোট মানুষ ছোট মানুষ বলছেন কেন? আমার বয়সের অনেক মেয়ে দুই বাচ্চার মা। আপনার বড় হুজুর বিয়ে করেননি? তিনি কি সন্তানের পিতা হননি? নাকি আপনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন?
অস্তাগফিরুল্লাহ! আপনি এ কথা বলছেন কেন?
বলছি কারণ, আমি আপনাকে বিয়ে করব। আমি শরিয়ত মেনে চলব। আপনি চাইলে বোরকা পরব। কাজেই আপনার শরীরে ভিন্নভাবের উদয় হলে কিচ্ছু এসে যায় না। আর একটা কথা শুনুন, জিনস প্যান্ট পরা একটা মেয়েকে আপনার পছন্দের পথে নিতে পারলে বেশি সওয়াব পাবেন।
আর কথা হয়নি।
আইসিইউতে সেদিন রোগী কম।
ভেতরে ঢুকে সহেলি খালাকে জাপটে ধরল, আপনি আমাকে মাফ করে দেবেন।
আরজুমান্দ বানু ঘাড় নাড়ে। তার মানে আচ্ছা।
আবু তৈয়ব অবাক হয়ে দেখল, অল্প সময়ের ব্যবধানে তওবা পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরজুমান্দ বানু নির্বাক হয়ে গেছে। জবান একেবারে বন্ধ।
সে রাতের সবচেয়ে অস্থির করা খবর হচ্ছে, সহেলি বাড়ি ফেরেনি। পাঁচটার দিকেও তাকে বাসায় দেখা গেছে। তারপর আর খবর নেই। চিরদিনের অভ্যাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান একটি কাজ করেছে মির্জা গালিব। যে মানুষ রাত দশটার খবর শেষ হতে না হতে ঘুমিয়ে পড়ে, সে রাতে বাসায় ফিরেছে সোয়া বারোটায়। স্কুলজীবনের কোনো বন্ধু তাকে ঢাকা ক্লাবে নিয়ে গেছে। সে-ই তাকে আটকে রেখেছে, আসতে দেয়নি।
সহেলির অন্তর্ধানের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে আরজুমান্দ বানুর মৃত্যুর শয্যা। মির্জা গালিবেরও মনে হয়েছে, তার বাড়িটা কোনো মরাবাড়ি নয়। মেয়েকে কোথায় খুঁজতে যাবে এই বিশাল ঢাকা শহরে। মুনিয়া কেঁদেছে। শ্যামা ফোন করেছে অন্তত দশটা জায়গায়। কাকাতুয়া কেবল বলেছে, দেখিস, এসে পড়বে। বলেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
ফজরের আজানের পরপরই বাসার ফোনটা বেজে উঠল।
কোকিলা বানু ও প্রান্তের চিৎকার শুনল, মা, পাঁচ মিনিট আগে বড় খালা মারা গেছেন। মারা যাওয়ার সময় মাথাটা আমার কোলের ওপর ছিল। এখনই চলে এসো।
বাসার সবাই জানল, সহেলিকে পাওয়া গেছে। হাসপাতালে বড় খালার কাছে। কোকিলা বানু অপরাধী, বলল, বড় আপা আর নেই।
মির্জা গালিব, কোকিলা বানু ও কাকাতুয়া যখন হাসপাতালে পৌঁছাল তখন পৌনে সাতটা। আবু তৈয়বের হঠাৎ দক্ষ হয়ে ওঠা হাত মুদ্দারের সব আয়োজন সম্পন্ন করল। নারীসান্নিধ্য তাকে বিচলিত করেনি। এই নির্লিপ্ততা সহেলিকে আরও আকুল করে তুলল।
ডেড বডি রিলিজ করিয়ে সাড়ে আটটার মধ্যে কার পার্কিংয়ের কাছে নামিয়ে আনা হলো। গাড়িও ঠিক করা হয়েছে। ততক্ষণে আরও পাঁচ-সাতজন আত্মীয়, এক উকিল সাহেব হাজির।
উকিল সাহেবই বললেন, ভূতেরগলি মসজিদের দক্ষিণে চার কাঠা জমিসহ বাড়িটা সতিনকন্যা পুষ্প ও দেবরপুত্র আবু তৈয়ব আবদুল্লাহকে সমান ভাগ করে দিয়েছেন। বালিকা এতিমখানায় দিয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা। আড়াই লাখ করে মোট দশ লাখ টাকা দিয়েছেন একমাত্র বোনের চার কন্যা শ্যামা, সহেলি, মুনিয়া ও কাকাতুয়াকে। আবু তৈয়বের স্ত্রীর জন্য, যা তার বিয়ের পর বলবৎ হবে, দিয়েছেন আড়াই লাখ টাকা। আর এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছেন বোনের ছোট মেয়ে কাকাতুয়ার মূত্ররোগ চিকিৎসার জন্য।
অসমর্থিত আরও একটি খবর, গত রাতেই সহেলি মির্জা ও আবু তৈয়ব আবদুল্লাহ মগবাজার কাজি অফিসে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।
কিন্তু সহেলি জানে, এটা ঠিক নয়। কারণ আবু তৈয়ব বলেছে, আমি যে শহীদি রাস্তায় পা বাড়িয়ে দিয়েছি, পরীক্ষার পর পরই প্যালেস্টাইন চলে যাব। আপনি দোয়া করবেন।
আরজুমান্দ বানুকে বহনকারী গাড়িটা স্টার্ট দিয়েছে। সামনে ড্রাইভার। পেছনে একজন মৃত ও দুজন উজ্জীবিত মানুষ।
সহেলি মির্জা বলল, আমি আপনাকে যেতে দেব না।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ০৪, ২০১০

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *