আমাকে নিয়ে যত – আবদুশ শাকুর

বোধের উন্মোচন থেকেই আমি অনুভব করে আসছি—আবদুশ শাকুর যেন তার সহজাত প্রবণতাগুলি নিয়ে ঠিক ততখানি প্রতিকূল ভুবনেই জন্মেছে যতখানি অনুকূল ভুবনে জন্মেছেন, ধরুন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যেমন, কর্ণে সুর আর তাল বেজে উঠতেই আমাকে বুঝতে হল যে আমি একটি ঐতিহ্যবাহী আলেম খান্দানের সদস্য। কণ্ঠে ভাষা ও ছন্দ ফুটে উঠতেই আমাকে জানতে হল যে আমি স্বনামধন্য (!) একটি বিশেষ অঞ্চলের মানুষ এবং অবোধ্য এক উপভাষাভাষী। বলতে চাইছি, মৌলিক এসব গুণকের কোনোটিই আমার স্বাভাবিক বিকাশের অনুকূল ছিল না। আমাকে নিয়ে এ ছকটা বিধাতার হলে, এরপরের শখটা ছিল পিতার। নিজের বিদ্যায় তাঁর মানের কাউকে না-পেয়ে আমাকেই সহযাত্রী বানালেন তিনি জীবনের শুরুতে আরবি-ফার্সি-উর্দু পড়িয়ে। এরপর কামিল প্রথমবর্ষেই আমাকে মেটাতে হল মাতার গরজ, তবে পিতারই অকালমৃত্যুজনিত।
আম্মার অপ্রত্যাশিত আহ্বানে ঢাকা থেকে গ্রামে গিয়ে দেখলাম ভাই এবং দুলাভাই আমার আগেই বাড়ি পৌঁছে গেছেন, তাঁদের কর্মস্থল মাইজদী এবং চট্টগ্রাম থেকে। ভরদুপুরবেলাতেই ছিপ ফেলে ফিসফিস করছেন দুজনে, পুকুরপাড়ে বসে। আমি গিয়ে জুটতেই বড়শিতে অন্য একজনকে বসিয়ে দিয়ে দুজনেই উঠে এসে আমার দু পাশে বসলেন। প্রথমে মুখ খুললেন বড়ভাই: মধুবালাকে বিয়ে করতে তোমার মন চায়? অতবড় অসত্য আমি কী করে বলি যে চায় না। রসনা খসে পড়বে না? সুতরাং চিনি-হেসে মাটির দিকে মিটিমিটি চেয়ে থাকা ছাড়া আর উপায় কী। অন্তত অমত নাই দেখে শ্যালকচরিত্রটির বলিষ্ঠতার সম্মানে আমার পিঠ চাপড়ে হেঁকে উঠলেন দুলাভাই: ‘শাবাশ শালা! সিনেমার মধুবালা কি দাঁড়াতে পারে লায়লার সামনে?’
কৈশোরের প্রেরণা আর যৌবনের যাতনার মাঝখানে পড়ে ঘড়ঘড়ে গলার আপ্লুুত স্বরে বলতে গিয়েছিলাম: ‘একটুখানি কি বাড়াবাড়ি— ’।
থামিয়ে দিলেন দুলাভাই: ‘বাড়াবাড়ি? জান তুমি, বম্বের মধুবালার মেকাপে কত কী লাগে? আর তোমার মামাতোবোন মধুবালা বিনা-মেকাপে কী না করতে পারে!’
এমনি আরো নানান প্ররোচনার অন্তে বললাম: ‘বিয়ে তো পুরুষমাত্রেরই পারতপক্ষে মধুবালাকেই করা উচিত। তবে— ’
‘আর কোনো তবে নয়। তোমার দায়িত্ব শুধু বিয়ে করা, ঘরবাড়ি ভরা, আর লেখাপড়া করা। খাওয়া-পরা থেকে সমস্ত সংসার ম্যানেজ করা হল আমাদের ব্যাপার। আব্বার অবর্তমানে আম্মার পক্ষে শূন্য একা গ্রামের বাড়িতে থাকা সম্ভব নয়। অথচ তাঁর আপন হাতে গড়া ঘরসংসার ফেলে আমাদের সঙ্গে যাযাবরের মতো শহরে-শহরে ঘোরাফেরাও তিনি করবেন না।’
এখান থেকে টেকাপ করে ফিনিশিং টাচ্টা দিতে চাইলেন দুলাভাই: ‘এ-সমস্যায় পড়বেন আম্মা, তা জানতেন বলেই দুনিয়া থেকে বিদায়ের মুখে আব্বা অসুস্থ শরীরেও পাঁচটা মাইল পায়ে হেঁটে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে হবু পুত্রবধূটিকে তাঁর আশীর্বাদের আংটিটি নিজের হাতে পরিয়ে দিয়ে এসেছিলেন।’
‘তাহলে সেটা পরেই বসে থাকবে বধূ, আমার প্রস্তুতি শেষ হওয়া পর্যন্ত।’
‘সেকি সম্ভব? তোমার প্রস্তুতির দূরত্ব তো এখনো অনির্দিষ্ট, রূপরেখাটি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। কে কার মেয়ে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশায় অতটা কাল বসে থাকতে পারে?’
‘কেন পারে না?’
‘তুমি যদি তদ্দিনে ঢাকাশহরের কোনো আ-ঢাকা বেশরমের প্যাঁচে পড়ে গিয়ে ধরা খাও?’
অন্তিম মন্তব্যটি ছিল মূল মুরুব্বি বড়ভাইয়ের: ‘মরহুম আব্বার মনে কষ্ট দেয়া ঠিক হবে না।’
না, কষ্ট আমি দিইনি তাঁর মনে। বস্তুত কারও মনেই না। মানে আমার আর লায়লার মনেও না। কেননা আমরা তো আমাদের মনের মধ্যে যৌবনের উন্মেষের মুহূর্তেই পরস্পরের জন্যে ভালোবাসা আবিষ্কার করেছিলাম।
তবু আমাকে নিয়ে যত শখের শেষ হল না স্বজনদের। নানার হাফেজ বানানোর শখ, বাবার আলেম বানানোর শখ, মামার জামাই বানানোর শখের পরে এল খালুর শাসক বানানোর শখ। খালুর শখ কেন? খালাতোভাইয়ের ‘সিএসপি’ হবার জন্য পাকিস্তানের ‘সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসেস’-এর কম্পিটিটিভ পরীক্ষা বারবার দিয়েও ‘রিটেনে’ই ফেল করা। শাসক বানানোর শখ খালুর জামাইয়েরও—অর্থাত্ আমার আপনভাইয়েরও। তাঁর শখ কেন?
ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরির বিভিন্ন স্টেশনে সিএসপিদের হাতে কখনো অসম্মানিত, কখনো অপমানিত, কখনো লাঞ্ছিত হওয়ার কারণে। যেমন একবার তেইশে মার্চ পাকিস্তাানের ‘রিপাবলিক ডে’র জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মহকুমা পর্যায়ের সরকারি উত্সবে বড়ভাই আমন্ত্রিতই হননি, যদিও অনুষ্ঠানটিকে সফল করার যাবতীয় আয়োজন—যথা সিএসপি এসডিও সাহেবের স্যালিউট নেওয়ার মঞ্চ এবং ভিআইপি গেস্টদের প্যান্ডেল থেকে গোটা স্টেডিয়ামের তাবত ব্যবস্থাপনা সাবডিভিশানটির এসডিও (কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিল্ডিংস) হিসেবে তিনিই করেছিলেন। বেচারি বিব্রত হয়েছিলেন স্ত্রীর কাছে তো বটেই, ছোটভাইটির কাছেও।
আরেক সাবডিভিশানে তো নবাগত এসডিও সাহেবের অফিসে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে গিয়ে সৌহার্দ্যের হাত বাড়িয়ে ‘এসডিও-সিঅ্যান্ডবি’ পরিচয় দিতেই পদদর্পী সিএসপি নিজের বাড়িয়ে ধরা হাতখানি না-মিলিয়ে গুটিয়ে নিলেন এবং স্পর্ধাভরে ঘোষণা করলেন, সভাসদদের হাসিয়ে: “দ্যার ইজ ওনলি ওয়ান ‘এসডিও’ ইন দ্য সাবডিভিশান, ফর ইয়র ইনফর্মেশন!”
‘দ্যার ইজ নান্ ফর ইয়র ইনফর্মেশন!’
‘কী বলতে চান আপনি?’
‘আপনার কনফিডেনশিয়েল অ্যাসিস্ট্যান্টের এগিয়ে দেয়া জয়েনিং-রিপোর্টে সই করার আগে তো এসডিও আপনি হতে পারেন না। আর আমি এ-সাবডিভিশনের এসডিও দু বছর আগে থেকেই, সিঅ্যান্ডবির হলেও। তাই আপনার যেমন হাতের কাজ এখনো শুরু হয়নি, আমার তেমনি হাতের কাজ আজও শেষ হয়নি। আপনাকে সুস্বাগত জানাতে এসেছিলাম, স্বাগত জানিয়ে চলে গেলাম।’
এবার কেবল মহকুমার অন্যান্য বিভাগীয় প্রধান হেসেছিলেন, নিঃশব্দে হলেও।
তবে বড়ভাই হাইসাহেবকে চূড়ান্ত লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহের এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার (সিঅ্যান্ডবি) হিসেবে, জেলাটির ডেপুটি কমিশনার, পাঞ্জাবি সিএসপি এসএমএ কাজমীর হাতে। ভাইসাহেবকে তিনি আদেশ (!) দিয়েছিলেন তাঁর বাংলোয় একটা মুরগির খাঁচা বানিয়ে দিতে। ডেপুটি কমিশনারের সুরটা আদেশের এবং ভাষাটা কাঠখোট্টা হওয়াতে দ্বিধার শিকার হয়েছিলেন এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, যদিও আনুষঙ্গিক লজিস্টিক্সের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহীপ্রধান হিসেবে সৌজন্যস্বরূপ এ-ধারার কাজ করে দিয়ে অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের কলিগদের ধন্যবাদ অর্জনে তাঁরা অভ্যস্ত ছিলেন। দেরি দেখে দু দিন পরে তিক্ত ডিসি তাঁর অফিসে ডেকে অনেকের সামনেই ভাইকে যা বললেন তা তাঁর এক্তিয়ার-বহির্ভূত ‘পাবলিক সেন্সারে’র পর্যায়ে পড়ে: ‘এক আদেশ আমি দুবার দিতে অভ্যস্ত নই। ইউ বেটার টেক কেয়ার!’
এরপর কেয়ার নয়, কাজটা না করার ডেসিশনই ‘টেক’ করলেন ভাই। তার মাত্র তিনদিন পরেই কাজমিসাহেব তাঁর অফিসে ডেকে হাইসাহেবের ওপর মেজাজী ফরমানই জারি করলেন: ‘আমার কাজটা আপনাকে আর করতে হবে না। কারণ এবার আপনার কাজটাই আমি করব—আই উইল সেন্ড ইউ আউট অফ দিস ডিস্ট্রিক্ট।’
জবাবে ভাইসাহেব করলেন বিনীত নিবেদন: “সিএসপি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের আসমান থেকেই পড়ে না, পূর্ববঙ্গের মাটি থেকেও ওঠে। আপনি সেক্রেটারি হয়ে আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে আমার ছোটভাইটিকে পাবেন আপনাদের ‘ব্রাহমিন’ সার্ভিসে। তাকে আদেশ দিয়ে দেখবেন—ইয়াঙার ব্রাদার-ইন-সার্ভিস হিসেবে আপনার ‘মুরগির খাঁচা’ বানানোর মতো খেদমত সেও করবে না।”
এই-যে আমাকে তাঁর অনির্বচনীয় লীলার অবোধ্য খেয়ালে নিখিল বিশ্ব থেকে বেছে নিয়ে রামেশ্বরপুরের মতো বিচিত্রভাষী একটি গ্রামে জন্মানোর জন্য পরমেশ্বরের পাঠানো, বিপত্তিকর মাদ্রাসায় পড়ানো, আপত্তিকর অকালবিবাহ করানো এবং সবশেষে বিরক্তিকর প্রশাসক বানানো—সবকিছুকেই চলমান বর্তমানকালে নিদারুণ কণ্টকময় মনে হয়েছিল আমার, এবং স্বভাবতই। অথচ এখন অতিবাহিত অতীতকালের দিকে তাকালে কাঁটা আর তেমন দেখা যায় না, ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় বরং গোলাপ। কী রকম?
প্রথমত ওই উপহাস্য উচ্চারণসংবলিত উপভাষা আমাকে উচ্চারণ ও ভাষামনস্ক করেছে শৈশবেরও শুরু থেকে। কারণ এসব উচ্চারণ: ‘হিঁয়ানে হেতির হিসেদি’ (সেখানে মেয়েটির পেছনে), ‘বুস্সুমের মতন হ্যাগাম দরি বই রইছত্ কা?’ (উজবুকের মতো মুখ খিঁচে বসে আছিস কেন?)। কারণ এসব ভাষাও: ‘হ্যাটকাইচ্চা’ (হাসিস না), ‘বইস্সঁডস্ কা?’ (পা মাড়াস কেন?)। দ্বিতীয়ত উর্দু-ফার্সি-আরবি ভাষাগুলি আমার বোধের এবং স্ববিশ্বাসের শক্তি বাড়িয়েছে অমেয় পরিমাণে। তৃতীয়টির উপহার: স্বশিক্ষিতা ভার্যা লায়লার স্বরচিত অনস্তিত্ব আমার নিজের অস্তিত্ব ঘোষণায় অমূল্য অবদান রেখেছে। চতুর্থটি অর্থাত্ প্রশাসনের চাকরি আমাকে লক্ষ লক্ষ দেশবাসীর কখনো পাশাপাশি আবার কখনো মুখোমুখি করেছে। সুযোগ দিয়েছে ‘টু স্টাডি দ্য ম্যান অ্যাজ হি ইজ অ্যাটাচ্ড টু ল্যান্ড’ অর্থাত্ মনুষ্যকে মৃত্তিকাসম্পৃক্ত অবস্থায় পর্যবেক্ষণ করার। কারণ মাটিবিযুক্ত মানুষ বস্তুত নকল মানুষ।

রসরচনা
নির্বাচিত রম্যরচনা
আবদুশ শাকুর
প্রকাশ করছে:
মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ২৯, ২০১০

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *