আবছায়া – প্রশান্ত মৃধা

ললিতার সঙ্গে হলের গেট পর্যন্ত গিয়ে, কিছুক্ষণ কথা বলে, ফিরে যাত্রীছাউনির কাছে দাঁড়ানো তারিকের কাছে পৌঁছানোর আগে কমল বলল, ‘তারিক, তুই আর ললিতার মুখের সামনে ওভাবে হাত নাড়ায়ে কথা বলিস না।’
শুনে বিস্ময়ে কমলের মুখের দিকে চেয়ে থাকল তারিক। এটা তার স্বভাব। কিন্তু সেখানেও একটু হোঁচট খেল। তারিক যতক্ষণ কমলের চোখের দিকে তাকিয়েছিল, ততক্ষণ কমলও তারিকের চোখের দিকে, চোখ নামায়নি।
কমল যেভাবে কথাটা বলেছে, তাতে কথাটা বলেই তার অন্য কথায় যাওয়া উচিত ছিল। তাই যেতও হয়তো। কিন্তু তারিকের তাকানোর রিঅ্যাকশন হিসেবে কমল তাকিয়েছে। হয়তো তাও না। কিন্তু এর কোনোটাই ভেবে নিতে পারল না তারিক। সে সরাসরি প্রশ্ন করল, ‘কেন?’
‘এমনি—’
‘না, আমার তো মনে হলো, ললিতা তোরে এতক্ষণ বইসে শিখোয়ে দেল—যে আমাগো আইসে কবি আমরা যেন ওর সামনে বইসে আর কথা না কই—’
‘ভুল বুঝি না, ভাই।’
‘এ বোকাচো, এর মদ্যি আবার ভুল বোঝার কী দেকলি?’
‘না, তুই বোঝার চেষ্টা কর।’
‘বুজিচি—তোর চোখ দেইহে।’
‘না কিচু বুঝিস নাই। বোঝলে ওইভাবে কইতি না।’
এ সময় হিটো পেছন থেকে তারিককে ডাকল, ‘এ তারিক, দাঁড়া। আগুন দিয়ে যা।’
তারিক পকেট হাতাল। পকেটে ম্যাচ নেই। এ জন্য কমলের সঙ্গে কথায় ছেদ পড়ল। হিটো কমলের কাছেও ম্যাচ আছে কি না, জিজ্ঞেস করেছে। কমল কিছু বলল না। তারিকের সঙ্গে যা নিয়ে কথা বলছিল, তা হিটোর সামনে বলা যায় না। অথচ হিটো কিন্তু একটু পেছন থেকে শুনছিল, কমল আর তারিক উঁচু গলায় কথা বলছে। হিটো সামনে আসায় তা থেমে গেলে সে বলল, ‘কী, তোগো কথা থামায়ে দিলাম?’
কমল বলল, ‘না।’
‘না, কী? তোরা তো জোরে জোরে কথা বলছিলি, থামলি কেন?’
‘না, না—’ কমল আবার বিড়বিড় করল, যেন এই আলাপের অর্থ হিটো বুঝে যাওয়ায় সে বিব্রত। কিন্তু তারিকের কাছে বিষয়টা কোনোভাবেই তা নয়। সে কমলের বিড়বিড়ানি দেখল। আবার দেখলও না। সন্ধ্যার আগে আগে এই রাস্তায় আধো আলো আধো অন্ধকারে মুখের ভাষা সম্পূর্ণ পড়া যায়। এমনিতে তারিক তা পড়ত না। পড়ার কথাও না। কথার ফ্লোতে থাকলে এসব সে কখনো খেয়ালও করে না। এখনো করত না। কিন্তু কমল যেখান থেকে কথা শুরু করেছে, সেই থেকে সে বিষয়টার একটু হলেও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। পরে এ নিয়ে হয়তো সে সোহেল কি হুমায়ুন কি দুলালের সঙ্গে কথা বলবে। সে যে কমলের আচরণে একটু অবাকই হয়েছে, তা বলবে। বলবে, এ কথা বলার সময় কমলের মুখের অবস্থা কী ছিল। বলবে, কমলরে ললিতা দিনে দিনে কেমন ভাউরা বানাইয়ে ফেলছে।
ওদিকে কমলও জানে, বিষয়টা এখনই খোলাসা করা দরকার। নইলে তারিকের যা মুখ, হলে সে টিকতে পারবে না। এখান থেকে গিয়ে তারিকের হলের সামনে চা খাওয়ার সময় যাকে যাকে পাবে তাদের এবার বলবে, তারপর তাতেও যদি কমলকে ঠিকঠাক বিব্রত না করা হয়, ওই কথা বলার জন্য মাফ না চায়, তাহলে কমলকে পচানো কমবে না। সে জন্য প্রয়োজনে তারিক আজ রাতে নিজের হলের ক্যান্টিনে না খেয়ে কমলের হলের ক্যান্টিনে খেতে যাবে। সেখানে ক্লাসমেট কি কমলের রুমমেট কাউকে পেলে ওই কথা বলবে। কমল জানে। সেই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে ললিতাকে মুক্ত করার জন্য, আর নিজের বিব্রত হওয়া ঠেকানোর জন্য কমল মনে মনে ভাবে, হিটো দেখো কেমন বিষয়টা বেশ পাকিয়ে দিল।
হিটো বলল, ‘তা ম্যাচ যখন নাই একটা সিগারেট দে—’
তারিক একটু অবাক হওয়ার ভান করল, ‘এ তোর বাড়ি কোতায় রে? নেয়াখালী? না, কুমিল্লা? না, বরিশাল?’
‘কেন? এট্টাও না—
‘তা’লি মামাবাড়ি?’
‘ক্যান?’
‘প্রথমে চা’লি ম্যাচ, তারপর ম্যাচ নেই দেইহে সিগারেটা চাচ্চিস্—এমন ধান্দাবাজি নোয়াখাইল্যে ছাড়া সম্ভব না—’
কমল হিটোকে সিগারেট দিল, ‘এই নে—এহোন যা দিন—!’
‘ওরে বোকাচো মংমনসিংগে—’ তারিক বলল, ‘দিয়ে দিলি টাউটরে এট্টা সিগারেট।’
‘দেব না? শত হইলেও আমার দেশি—’
‘তাই নাই? আমি তো ভাবিলাম—’
হিটো বলল, ‘তুই এট্টু বেশি ভাবিস—গান্ধীর মতো এট্টা মাথা নিয়ে তোর ভাবনা এট্টু বেশি—’
তারিককে কেউ কেউ গান্ধীও ডাকে। তার ছোট্ট মাথায় চুল কম, মাঝেমধ্যে সে মাথা কামিয়ে ফেলে। তখন গায়ে-গতরে চিকনা তারিককে ওই সরু সরু হাত-পা নিয়ে মনে হয় মোহনদাস গান্ধী। এতে সে খুশিই হয়।

২.
হিটো চলে গেলে কমলের সুযোগ এল তারিককে বলার। কিন্তু যতটুকু সুযোগ সে ললিতার কথাকে খোলাসা করার জন্য খুঁজছিল, তা সঙ্গে সঙ্গে পেল না।
ললিতা যখন তাকে কথাটা বলেছিল, ‘এই কমল, তারিক, হুমায়ুন, সুহেল, সুবিন, দুলাল—বুচ্ছো না, এই আমরা যারা একসাতে মিশি—সবাইরে কইয়ো—আমার সামনে যেন্ ওইরম হাত না নাড়ায়ে কথা কয়।’
ললিতার মুখ ততক্ষণে একটু হলেও থমথমে। সেখানে চাপা দেওয়া অস্বস্তি। যেন সে এখন ভাবছে, এই কথা কেন বলতে গেল। না বললেও তো চলত। অথবা, হতে পারে মুখে যত অস্বস্তিই থাক, চোখে যে আতঙ্ক—ললিতা বলতে পেরে ভেতরে ভেতরে একরকম স্বস্তিই পেল। হয়তো তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে এই আশঙ্কা যে যদি কমল বেশি জনকে কথাটা বলে দেয়। কিন্তু ললিতা জানে, কমল তা বলবে না। সে বলার ছেলে না। অন্য অনেকের চেয়ে সরল ছেলে। অনেক বিষয়েই কথার মারপ্যাঁচ বোঝে না। বুঝলেও অনেক পরে বোঝে, ততক্ষণে সেই কথার ঝোঁক সরে যায়।
এই যেমন এখন, কমলের বলা কথাটা তারিক যেভাবে বুঝেছে, কমল কথার লবেজ যে ইঙ্গিত দিয়েছে, কমল নিজে কিন্তু সেখান থেকে বোঝেনি। একদিক থেকে সে তারিকে কথার ইঙ্গিতটাই বুঝতে পারেনি। হয়তো পরে বুঝবে। পরে যখন তারিকের অন্য কথার ইঙ্গিত ধরে সে ভাববে, তারিক তাকে বলেছিল, ললিতা এতক্ষণ ধরে তাকে পড়িয়ে শুনিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, কেউ যেন তার সামনে হাত নেড়ে কথা না বলে—এই কথার অন্য অর্থ যেভাবে কমল করেছে, সেই ইঙ্গিতও তখন মনে মনে ভাবতে পারবে, যে, তার মানে কমল আর ললিতা কথা বলার সময় তাদের সামনে যেন আর কেউ না-থাকে। এই ইঙ্গিতটা তারিক যদি দেয়, এই দিয়ে তাকে বলবে, আসলে ললিতা চায় না, তাদের সামনে কেউ থাকুক—কমল কেন তা বোঝে না, সে একটা বড়সড় বলদ। কিন্তু কমল তো বিষয়টা সেভাবে ভাবেনি, ভাবতে চায়ও না। সে ললিতার কথায় কোনো ইঙ্গিত দেখেনি। সরাসরি তাকে ললিতা বলেছে সে যেন সবাইকে বলে, অন্তত যখন রেস্টুরেন্টে চা খেতে তারা ঢোকে, যারা তার মুখোমুখি থাকে, কি আকাশমণিতলায় যখন এদিক-ওদিক মুখোমুখি বসে থাকে, তখন যেন কেউ ললিতার সামনে হাতের পাঁচ আঙুল মেলে ধরে হাত নাচিয়ে কথা না বলে!
কেন?
এ কথা আগে তো বলেনি ললিতা!
কমল বিস্ময়ে ললিতার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। ললিতা জানত, এমন কথা শুনলে কমল একটু ভ্যাবাচেকা খাবে। এখনো তা-ই খেল। চোখ বড় করে, দীর্ঘ শরীরটাকে ঝুঁকিয়ে মাথা নিচের দিকে দিয়ে তাকিয়ে থাকল। যেন, কেন বলল ললিতা এই কথা, তা জানার সাহস হচ্ছে না তার। অথবা, এমন মাথা ঝুঁকিয়ে রেখে সে জানতে চায়, কেন, কী হয়েছে, কেউ তাকে কিছু বলেছে? ওইভাবে হাত নাচিয়ে কোনো অশালীন ইঙ্গিত করেছে কেউ? অথবা, হতে পারে, কমলের যেমন ধরন, সে জানতে চায় না, হয়তো এমন কিছু শুনবে, যা সে শুনতে চায় না কোনোভাবেই।
বিষয়টা তা-ই ঘটল।
কথাটা জানাতে জানাতে ললিতা বলেছিল, কেন, তুমি দেখো নাই, তারিক যখন আমার সামনে ওইরম হাত নাচায়ে কথা বলছিল, তখন আমি কেঁপে উঠছি, মাথা বারবার পিছনের দিকে নিয়া গেছি!
তাই নাকি? তা কেন লক্ষ করে নাই কমল?
কিন্তু এর কোনো কিছুই তো লক্ষ করার কথা নয়। আগেও তো এমন কত হয়েছে, এমনভাবে সে নিজেই তো ললিতার সামনে কথা বলেছে, তখন তো ললিতা বলে নাই, আজ কেন বলল?
কমল জানতে চাইল, ‘আইজ আবার কী হইল?’
ললিতা কিছু একটা বলতে গিয়েও থামল। থমকে গেল। হয়তো ভাবল বলবে, অথবা, বলবে না। অথবা, কথাটা যখন মনে এসেছে এখনই বলা ভালো, তার মনে পড়ায় সে বলল, ‘আইজ মনে পড়ল—’
‘কী?’

৩.
হলের গেট থেকে থেকে ফিরে আসতে আসতে কমলকে ললিতা বলেছিল, ‘সহজ হও। মেয়েদের জীবনে এমন ঘটে।’
‘জানি।’
‘জানলে এত আপসেট হচ্ছ কেন?’
‘শুধু হাত দেখলেই সমস্যা?’
‘আর কিছু তো বলব না। যা বলার বলছি—’
কমল চুপ।
একটু বাদে কমল জানতে চেয়েছে, ‘তারিকরে কী কব?’
‘কবা আমি কইচি আর ওইরম পাঁচ আঙুল মেলে আমার মুখের সামনে হাত এনে কথা না বলতে।’
‘বলব—’
‘তোমার দেখি আমার চেয়ে অবস্থা খারাপ।’
‘না। মানে, তারিক কি-না-কি ভাববে—’
‘কী ভাববে? মেয়েদের জীবনে এমন ঘটে।’
কমল বিড়বিড় করল। কী বলল শোনা গেল না। এটা তার অভ্যাস, হয়তো বলেছে, হয়তো, যেটুকু শোনা গেল, শালার পুরুষমানুষ—হয়তো তাও না। এক অর্থে, ললিতা কিছু শোনেনি। শুধু অনুমানে বুঝে নিয়েছে।
‘যাও। মন খারাপ কোরো না।’
‘না।’
‘আমার জীবন এইরমই।’
‘কী যে কও।’
‘ঠিকই কইচি। ইজি হও।’
‘আচ্ছা।’ কমল বোকার হাসি হাসল।
আবার তারিকের গলা, ‘আয়রে বাপ—হইচে—’
ললিতা বলেছে, ‘যাও—তারিক ডাকে, বি ইজি—’

৪.
হিটো চলে গেলে কমল জানত তারিক তারে খোঁচাবে। তার আগে বিষয়টা যেন ঠিকঠাক বোঝানো যায়, সে জন্য ভূমিকা দিল, ‘তোরে কইলে তো তুই সব কথা উড়োয়ে দিস—’
‘না, ক।’
‘তোরে যা বললাম তাই কর—’
‘আহা, ক না! গোপন কিছু, তা’লি জানতি চাব না।’
‘না। থাক।’
কমলের মনে পড়ল, একটু আগে ললিতাও তাকে এভাবে বলেছিল, সেভাবে এখন সে কী করে বলে। ললিতা তো তাকে বলেছিল, ‘না থাক।’
‘থাক কেন?’
‘না থাক।’
‘তাড়াতাড়ি কও—’
এই সময় সুবিন ডাক দিয়েছিল, ‘কমল, তুই পরে আয়—গান্ধী থাকল—আমি আর সোহেল গেলাম—’
‘যা—আমি আসতেছি।’
কমল ললিতার আরও কাছে। যেন ললিতা এমন কোনো কথা শোনাবে, যে কথা শুনতে তেমন শারীরিক দূরত্ব রাখতে নেই। অথবা, হতে পারে এমন গোপন কথা, যা আরও একটু কাছে এগিয়ে শুনতে হয়।
তখন তারা শুনেছিল সুবিন আর সোহেলের উদ্দেশে তারিকের গলা, ‘কমল আর আইচে—আমিও তোগো সাতে যাই—দেহিস না দুইজনে প্রায় জইমে গেইচে—’
শুনে কমলের কাছ থেকে একটু সরে যায় ললিতা।
কমল বলেছে, ‘কও—দেহো না গান্ধী কী বাণী দিতেছে—’
‘দিক—’
‘পরে কব তাইলে।’
‘না—’
‘একবার আমারে ঘুমের ভিতরে একজন—’
‘কে?’
‘তা তোমার জানার দরকার নাই—ওইরম মুখে হাত চাপা দিয়ে—চোখ খুলে দেখি মুখে হাত—’
‘তারপর?’
‘জানার দরকার নাই—’
‘আইজকা হঠাত্! হাত দেখে সেই কথা মনে পড়ল?’
কমলের চোখ তখন ললিতার মুখে। বিকেলের রং ধরে আসছে। কমলের চোখে ললিতার মুখ—সেখানে প্রথম ওই জিজ্ঞাসায় ‘!?’। তারপর, কমল যেন কোন খেয়ালে, ‘তুমি ঘুমাইয়া ছেলা—তখন, ওইরম একটা হাত,’ কমল হাতের পাঁচ আঙুল মেলে ললিতার মুখের সামনে নেয়, ললিতা যেন সেই দৃশ্য মনে পড়ায় পেছনে সরে যায়, হয়তো। কমল বলে চলল, ‘তোমার মুখের সামনে হাত—মুখ চেপে ধরে—তারপর?’
‘তারপর আর জানা লাগবে না। যাও—’
‘না। তারপর?’
‘বললাম তো তারপর আর জানা লাগবে না—’
‘না, মানে তার পর থেকে মুখের সামনে ওইরম হাত দেখলে তোমার—’
‘হ।’

৫.
এরপর ললিতার কাছে কমলের আর কিছু জানার ছিল না।

————-
প্রশান্ত মৃধা
সূত্র: প্রথম আলো, জানুয়ারী ১৮, ২০০৯

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

One thought on “আবছায়া – প্রশান্ত মৃধা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *