অন্তর আত্মা

অন্তর আত্মা

বেশ কিছুক্ষণ হল আমার ঘুম ভেঙেছে এবং আমি এই সময়টুকু সমস্ত শরীর গুটিয়ে নিয়ে, অনেকটা তেমাথা বুড়ির মতো, ঘুমের আমেজটাকে জিইয়ে রাখতে চাইছিলাম। আচার খাওয়ার পর জিভটাকে চকচক শব্দে নাড়াচাড়া করতে যেমনটি লাগে।

এখন এই কাল মেঝেতে পাতা বিছানায় শুয়ে আমি সারা ঘরে ছড়ানো কাগজ, একটা মাটির ভাঁড়ে উপচেপড়া সিগারেটের টুকরো ও আমার বালিশের পাশে গোঁড়ালি সাদা-হওয়া একপাটি জুতো আবিষ্কার করে ঈষৎ বিরক্ত হলাম। এবার আমি উঠব। রাত্রে নগ্ন হয়ে শোওয়া স্বাস্থ্যপ্রদ মনে করায় এখন লেপের আড়ালে প্যান্টটা গলিয়ে নিয়ে থার্মোমিটারের মতো টুথব্রাশ মুখে পুরে একতলায় নামব। দরজা খোলার আগে আমার দশ ইঞ্চি এবং প্রায় অস্বচ্ছ আয়নায় মুখটা। একবার বুলিয়ে চোখের শ্রী ফিরিয়ে নেব। কারণ আমি জানি, এ সময়ে নিচে কলতলায় কয়েকটি মেয়ে ব্যস্ত থাকবেই। এ-বাড়ির বাসিন্দে মেয়েরা সুন্দরী কি! হলেও তাদের প্রতি কোনও দুর্বলতা আমার নেই; তথাপি পিচুটি-চোখে কোনও মহিলার মুখোমুখি হওয়া আমি ক্রাইম মনে করি। কলতলায় নামলেই চাক ঘিরে থাকা মৌমাছির মতো কল আঁকড়ে থাকা মেয়েগুলো আলগা হবে এবংইত্যবসরে আমি সুড়ুৎ করে কর্মটি সেরে নিই। এই সময় নিয়মিত দুটি বাক্য শ্রবণ করি –আজ বড় তাড়াতাড়ি উঠলেন যে! অথবা আজ অনেক বেলা হয়ে গেছে কিন্তু। এক টুকরো। প্রণামি হাসি চটকাতে-চটকাতে যখন ওপরে উঠে আসি তখন তলপেটে ঈষৎ চাপ অনুভূত হওয়া সত্বেও কোনও বাথরুম খালি না থাকায় আমাকে জামা গলিয়ে ভালো আছেন মাসিমা গোছের মুখ করে পাড়ার চায়ের দোকানে ছুটতে হয়। আমার প্রাত্যহিক খরচের একটা বাজেট থাকে। কিন্তু ব্যক্তিগত খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সেটি মেনে চললেও প্রায়শই তা অতিক্রম করে যাই। কারণ যে-কোনও সময় যে-কোনও মহিলার সঙ্গে আলাপ হলে ইত্যাদির জন্যে কিছু খরচ আমার হয়ই। আমি একটি সরকারি অফিসে মাঝারি চাকরি করলেও কর্তৃপক্ষ আমার ইতিহাসে রাজনীতির গন্ধ খুঁজে-খুঁজে ক্লান্ত। যদিচ তাঁরা সন্দেহের কাঁটাকে লালন করতে বদ্ধপরিকর এবং আমি নিশ্চিন্তে আনন্দে নিয়মিত মাইনে নিয়ে যাচ্ছি।

সম্পূর্ণ টিপটপ না হয়ে পথে বের হই না আমি। আমার টেরি থেকে জুতোর টো পর্যন্ত আমার ঝকঝকে থাকবেই। ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে সিগারেট কেনার সময় পানের দোকানের আয়নায় কোদাল চালানোর মতো চুলে কয়েকটা কোপ মারি চিরুনি দিয়ে। দ্বিতীয়টির জন্য আমাকে ট্রামবাসে উঠতে হয়। কারণ, প্রকাশ্যে পকেটের রুমালে জুতোর টো মোছা–সে একটা বিশ্রী ব্যাপার। ট্রামে উঠে ইচ্ছে করে রুমালটাকে পায়ের কাঠে ফেলে দিই। এবং সেটাকে ওঠাবার ভঙ্গি করে নিপুণ হাতে টো পালিশ করে নিই। রুমালটির দুটো ভাঁজ আছে। একটিতে মুখ মুছি অন্যটিতে জুতো।

যেদিন প্রথম ডিপার্টমেন্টে ঢুকেছিলাম সেদিন খুব গম্ভীর হয়ে কথা বলেছিলাম। কারণ জেনেছিলাম যে, আমার অফিসাররাও আমার ডিগ্রির কাছাকাছি যাননি। বস্তুত এম-এ পাশ শব্দ দুটো কাগজ পাকিয়ে কানে সুড়সুড়ি নেওয়ার মতো আমার কাছে আরামদায়ক ছিল। আমার পাশের সহকর্মী আমার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছিল আমার ডিগ্রির খবর পেয়ে। দাদা এখানে আর কদিন থাকবেন! ইত্যাদি স্তুতি সে করেছে প্রচুর। কিন্তু যেদিন শুনল আমার এম-এ র সাবজেক্ট কি ছিল সেদিন থেকেই লোকটা ইয়ার-দোস্তের মতো আরে শালা বলতে শুরু করল। আমার খুব সন্দেহ, লোকটা কলেজেই ঢোকেনি। ফলত এখন আমি নিজেকে গ্র্যাজুয়েট বলি পরিচয়-প্রসঙ্গে। বাংলায় এম-এ বলা মানে দেশি আয়নায় নিজের তিন রকম মুখ দেখা এ। সত্য জেনেছি মজ্জায়-মজ্জায়।

অত্যন্ত দ্রুত স্নান সেরে নিই। কারণ এই বারোয়ারি স্নানঘরটা যেমন অন্ধকার তেমনি নোংরা। মেয়েদের মাথার চুল থেকে সাবানের ফেনা সর্বদা জলে ভাসে। বেশিক্ষণ গায়ে জল না ঢাললে আরশোলার আদর খেতে হবে সর্বাঙ্গে। এই গা-ঘিনঘিন ভাবটা এড়াবার জন্যে আমি একটা। সিগারেট ধরিয়ে স্নান শুরু করি। শুকনো গামছা দিয়ে মাঝে-মাঝে কয়েকটা টান দিই। অনেকটা ট্রলি গাড়ির বেগ কমে এলে পেছন থেকে ঠেলার মতন।

সকাল বেলায় আমি খুব অসহায় বোধ করি। কারণ এখন কোনও বন্ধুকে পাওয়া যাবে না। যে যার বস-এর কাছে বশংবদ। তবু চৌরাস্তায় এসে একটা সিগারেট ধরালাম প্রাত্যহিক অভ্যাসে। এখন মেয়েদের স্কুল ছুটি হয়েছে। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বত্রিশদাঁতে পান চিবুনোর মতো ডাঁটোগুলোকে দেখি। কতক মুখ আমার চেনা হয়ে গেছে। এবং একসময় হঠাৎ বাসে প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ করে ঈষৎ বিরক্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। মেয়েদের পেছনে হাঁটার উত্তাপ সর্বাঙ্গে নিয়ে আমি এক বন্ধুর দোকানে ঢুকে পড়লাম। সুহৃদ টেবিল বাজাচ্ছিল। ওর বাবার দোকান এটা। রেডিও-র। ভদ্রলোক বারোটার পর নামেন। এ সময়টা সুহৃদ সম্রাট। টালিগঞ্জ পাড়ায় একদা ঘোরাঘুরি করেছিল, বাবার হুকুমে সেটা স্থগিত থাকলেও বর্তমানে নবনাট্য করছে। নাটক মঞ্চস্থ হবে কিনা ঠিক নেই, কিন্তু রিহার্সাল দিয়ে চলেছে। ফলত সদস্যরা অনিয়মিত হচ্ছে নিয়মিত। আমাকে দেখেই সুহৃদ ওদের কানা দারোয়ানটাকে এক ভাঁড় চায়ের হুকুম দিয়েই পাশ থেকে এক দিস্তে কাগজ টেনে আনল, বুঝলি অনিমেষ, এখানটায় যা ট্রিটমেন্ট করেছিনা–অনেকটা পিকচারাইজড। জাম্প শট বুঝিস? ফিল্মে আছে–নাটকেও তাই আনছি। আই অ্যাম দ্যা ফাস্ট ম্যান, ফাস্ট অ্যাক্টিং-এর সঙ্গে–

চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে একটা বিরাট হাই তুলে বললাম, ওটা গর্ডন ক্রেগ করেছে।

চোয়াল ঝুলিয়ে ঘসঘসে গলায় সুহৃদ বলল, গর্ডন করেছে! যেন গর্ড আমাদেরই আর এক বন্ধু। ওর হাতটা যেভাবে মুঠো হল তাতে গর্ডন ক্রেগ সামনে থাকলে একটা কিছু হয়ে যেত। তাড়াতাড়ি সামলে নিলাম–রবার্ট লুইস তো সেইরকমই লিখেছেন। বুঝলি সুহৃদ, এই নাটক ফাটক করে কিস্যু হবে না। তার চেয়ে ফিল্মের দিকে–আসলে সুহৃদকে বধ করতে হলে এইসব নাম বলতে হবে এটা আমি জানতাম। এসব নিয়ে ও পড়াশুনা করে তা আমি জানি। নাম দুটো আমার মুখে শোনার পর ও একটা ফিল্টার টিপ বেশশ্রদ্ধার সঙ্গে এগিয়ে দিয়ে বলল, না, ডকুমেন্টারি করব। হাজার দুয়ের মামলা তো। ষোলো মিনিটে ট্যালেন্ট দেখিয়ে দেব। বিন্দুতে সিন্ধু।

ডকুমেন্টারির চেয়ে ফিচার ফিল্ম বেটার। তবে নেহাতই যদি করিস ইন্দিরা গান্ধীর ওপর কর। প্রিয়দর্শিনী নাম দে। গর্ভমেন্ট কিনে নেবে।

এবং আমরা এইসব কথাবার্তা বলে গেলাম বারোটা অবধি। এবং গত দু-বছরের ম তো আমাদের আলোচনার কোনও সিদ্ধান্ত হবে না। আমরা যখন কথা বলি, সুহৃদ ও আমি একটা ছবি করব, সিরিয়াস হয়েই বলি। সেই মুহূর্তে আমরা কেউ স্মরণে আনি না যে নাটকের জন্যে একজন অভিনেত্রী পঞ্চাশ টাকা পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন এবং তা সাধ্যাতীত ছিল বলে আমরা রিহার্সাল বন্ধ রেখেছি। এই সময় চলচ্চিত্রের যাবতীয় খুঁটিনাটি নিয়ে আমরা আলোচনা করব। এক সময় আমি উঠে পড়লাম। আমি ও সুহৃদ কেউই আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাথা ঘামালাম না।

এই সময় আমি দ্বিপ্রহরিক আহার গ্রহণ করি। এ ব্যাপারে সাধারণত পাঞ্জাবি দোকানই আমার পছন্দ। কারণ বাঙালি পাইস হোটেলের অপরিচ্ছন্নতা এবং ভাত ছ-আনা ডাল দু-আনা ইত্যাদি দ্রুত নামতার মতো কানের কাছে চেঁচানো হয় বলে আহার গ্রহণে বিঘ্ন ঘটে।

এসব ব্যাপারের বাইরে আমি নিভৃতে পকেটের সঙ্গে বো ঝাঁপড়ি করি। অল্প পয়সায় রুটি সহযোগে তড়কা অত্যন্ত উপাদেয়–পাঞ্জাবি হোটেলে ঢোকার পেছনে এ আমার অন্যতম যুক্তি। বস্তুত পেঁয়াজ ও লেবু সহযোগে তড়কা খেতে আমি মাংসের আঘ্রাণ পাই। অবশ্যই স্বীকার করব দিনের মধ্যে দু-বার খাওয়ার সময়, বহু যোজন দূরে অবস্থানকারী আমার পিতামাতার মুখ স্মরণ। হয়। অন্যথায় আমি নিজেকে ভালোবাসি বা আত্মকেন্দ্রিক এই বিশেষণ অস্বীকার করি না। তা ছাড়া বিচিত্র হিন্দি ভাষা শেখার অন্যতম জায়গা পাঞ্জাবি হোটেল এবং স্বীকারে লজ্জা নেই, আমি শিক্ষানবিশ।

বেশ কয়েকটা পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আমি ট্রামে উঠলাম। সাধারণত যেসব ট্রামের পেছন দিকের দরজা থাকে সেগুলো আমি পরিহার করি। স্বচ্ছন্দ হয়ে থাকা যায় না। বরং পেট-কাটা। ট্রামের দরজায় দাঁড়ানো বেশ আরামদায়ক। জয়ন্ত, আমার এক বিরাটাকায় বন্ধু পেশ করেছিল, প্রথমটি পুরুষ ও দ্বিতীয়টি স্ত্রী ট্রাম। এবং আমার পক্ষে স্ত্রী জাতির প্রতি অনুরাগ দেখানো। স্বাভাবিক। ট্রামে উঠেই আমার চোখ উজ্জ্বল হল। মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে রাস্তায় নজর দিতেই দ্বিধামুক্ত হলাম। যদিও ওর চোখে কালো চশমা, কিন্তু ফাঁপানো চুল আর খাটো ব্লাউজের সঙ্গে সাদা ঝোলানো ব্যাগটা আমি দেখতে পেয়েছিলাম। এই মেয়েটার সঙ্গে আমি কখনও কথা। বলিনি। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমি একলা নই। ক্রমশ স্থির করে ফেললাম আজ আলাপ করবই। এবং কীভাবে কথা বলব তার একটা ফর্মুলা আমার আছে। যেমন মেয়েটির সামনে গিয়েই একটু অবাক ও চিন্তিত চোখে বলব, মাফ করবেন, আপনাকে যেন কোথায় দেখেছি মনে হচ্ছে কোথায় থাকেন বলুন তো? সাধারণত এই প্রশ্নের উত্তরে যে-কোনও মেয়েই বলবে, কেন, আপনার কি দরকার? তখন কাঁধ দুটো বেশ প্রস্তুত করে ঈষৎ লজ্জা এবং বিব্রত ভঙ্গিতে বলতে হবে, না, তেমন কিছু নয়, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনি খুব চেনা। অবশ্য মানুষেরই। ভুল হয়। এর পরে চোখ রাখতে হবে মেয়েটির চোখে। প্রশ্রয়ের আভাস পেলে ভরা পালে কথার নৌকো ছুটবে। নইলে সেটা দুরস্ত ইংরেজি ভদ্রতা।

নিউ সিনেমার সামনে মেয়েটি নামতেই আমি ট্রাম ছেড়ে দিলাম। ঠিক এই মুহূর্তে আমার একটা আশঙ্কা ছিল–হয়তো এর কোনও ব্যক্তিগত বন্ধু অপেক্ষা করছে কোথাও। মেয়েটি মার্কেটের রাস্তায় এগোতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম সহসা, ত্বরিতে মেয়েটিকে ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে। নির্জনতম জায়গায় দাঁড়ালাম। মেয়েটি অন্যমনে হাঁটছে। হাঁটবার সময় উর্ধ্বাঙ্গের ও নিম্নাঙ্গের আন্দোলন আমার শিরায়-শিরায় রোমাঞ্চ জাগাচ্ছিল। কাছাকাছি হতেই এগিয়ে গেলাম, মাথাটা বেঁকিয়ে ঈষৎ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে (সম্প্রতি কোনও ছবিতে নায়ককে এভাবে হাঁটতে দেখেছিলাম)। হঠাৎই সব এলোমেলো হয়ে গেল এবং আমি আমার ফর্মুলা ভুলে দু-হাত জোড় করে ঈষৎ হেসে বললাম, নমস্কার, আপনাকে আমি অনেকবার দেখেছি, আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চাই।

মেয়েটি হঠাৎ থমকে দাঁড়াল এবং দীর্ঘ নরম ঘাড় বেঁকিয়ে আমাকে দেখল, তারপর আলতো করে উচ্চারণ, কেন বলুন তো?

এ প্রশ্নটাই মারাত্মক। আমি চোখ বুজে পরক্ষণেই হেসে ছোট্ট শ্রাগ করে বললাম, আলাপ করতে ইচ্ছে হল খুব।

কি হবে আলাপ করে? মেয়েটি দৃষ্টি আমাকে মাপছে।

আমি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বললাম, জানি না, তবে এক-একটা ইচ্ছেকে চেপে রাখা যায় তাই!

ও।

আমি নিখিল রায়। কাস্টমসে আছি। এখান থেকেই আমার ফর্মুলায় এসে গেলাম। কখনওই আসল নাম ও অফিস আমি কাউকে বলি না। আপনি তো এদিকেই যাবেন?

মেয়েটি হাসল, হ্যাঁ। আমরা এগুলাম। কথা নেই কিছু। অস্বস্তি হচ্ছে। মেয়েটির পরিচিত কেউ এসে পড়লে অপ্রীতিকর হবে। গলায় কৌতুক নিয়ে বললাম, কারও সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে বুঝি?

আছে। টেলারের সঙ্গে। আমার কয়েকটা জামা ফিট করতে দিয়েছি, আজ ট্রায়াল ডেট।

এর পর আমরা কথা বললাম। যে কেউ এ মুহূর্তে আমাদের অন্তরঙ্গ ভাববে। অফ ডিউটিতে সিনেমা দেখার উদ্দেশ্যে এ পাড়ায় আমার আগমন–জানালাম। আসলে মেয়েটি সিনেমায় আসুক এ আমি চাইছিলাম।

এই যে আমার শপ। মেয়েটি বাঁ-চোখে আমাকে দেখল।

তাড়াতাড়ি জোড়া দিলাম, আমি অপেক্ষা করব?

ভেতরে ঢোকার আগে মেয়েটি বলল, আচ্ছা।

এটি একটি ফরাসি দরজির দোকান। বিরাট-বিরাট গাড়িতে বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা আসছে। অনবরত। তাদের ব্লাউজের চেহারা দেখে আবার জয়ন্তকে মনে পড়ল। মার্কেটে ঘুরতে-ঘুরতে একদা ক্রিসমাসে জয়ন্ত বলেছিল, বালিসের ঢাকনা, লেপের ওয়াড় যেমন আছে, বুঝলি এই ব্লাউজগুলো তেমনি অন্তর্বাস ঢাকনা। মাপে-মাপে তৈরি।

তিনটে সিগারেট শেষ হলে মেয়েটি বেরুল। পাশাপাশি কয়েক পা হেঁটে সমস্যায় পড়া গেছে এমন ভঙ্গিতে বললাম, অথ গন্তব্য কোথায়?

মণিবন্ধে বাঁধা চৌকো বড় ঘড়িটা দেখল সে, আমাকে তিনটের মধ্যে বাড়ি ফিরতেই হবে।

অর্থাৎ এখনও ঘণ্টাখানেক সময় আমি পাব। কৃতার্থ ভঙ্গিতে বলি, ওঃ অনেক দেরি আছে। চলুন কোথাও জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাক। জমিয়ে আড্ডা শব্দ দুটো আমি ইচ্ছে করেই বললাম। কারণ এতে আমার সরলতা আর নির্লোভ প্রকাশ পাবে। তা ছাড়া মেয়েটি যদি কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্রী হয়, তাহলে আমার মেজাজের সঙ্গে একটা সাধর্ম খুঁজে পেয়ে খুশি হবে। কফিহাউসে অনেক মেয়েকে শব্দ দুটো ব্যবহার করতে শুনেছি।

কোথায় আড্ডা দেবেন। যা রোদ্দুর। আকাশ দেখল।

চলুন কোথাও বসা যাক। আমি দরাজ হলাম। ক্রমশ আমি একটি করে রেস্তোরাঁর নাম বলে গেলাম এবং সে নাকচ করে গেল। হয় তার কোনও আত্মীয় নিয়মিত সেখানে আসেন অথবা। পরিচিত। শেষপর্যন্ত যে দোকানে আমরা প্রবেশ করলাম, সেটি সাহেবপাড়ার অত্যন্ত দামি এবং আমার দীর্ঘকালের বাসনায় ছিল। সেই স্বল্পলোক শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সজ্জিত কক্ষের কোণায়। সোফায় বসে মেনু হাতড়ে-হাতড়ে যে পানীয়র হুকুম দিলাম, তার বিনিময়ে আমার চারবেলার মিল খাওয়া হয়ে যেত। বেশি কিছু খেতে পারব না, এই মাত্র লাঞ্চ সেরেছি আমি, আপনি? বলার সময় তড়কার ঢেকুর উঠল যেন। আমি জানতাম, যে-কোনও মেয়েই একবার অর্ডার দেওয়া হয়ে গেলে মুখ ফুটে অন্য খাবার চাইবে না। এবং এই সময় মনে-মনে এই বাড়তি খরচটুকু আগামী সাত দিনের বাজেট থেকে কীভাবে পুষিয়ে নেব, তার একটা খসড়া করে নিলাম অতি দ্রুত।

এখনও পর্যন্ত মেয়েটির নাম আমি জানতে চাইনি, কারণ আমি চেয়েছিলাম, মেয়েটি বুঝুক, আমি ঠিক লাইনের ছেলে নই। লাইন বলতে আমি লোভী কামুক এবং ইতর কিছু মানুষ যে পদ্ধতিতে আনাগোনা করে, সেই পদ্ধতির কথাই বলছি। এছাড়া আরও একটা কারণ, এই যে মেয়েটির বিরাট চ্যাপটা সাদা চামড়ার ঝোলানো ব্যাগটার গায়ের খোপে বসানো সাদা কাগজে লেটারিং করা নাম দয়ামন্তী গুপ্ত বি-এ (অনার্স) দেখতে পেয়েছিলাম। এবং এই বিশ্ব-চরাচরে প্রথম কোনও স্ত্রীলোককে হাত-ব্যাগের শরীরে নিজের নাম ও ডিগ্রির খবর লিখতে দেখে পুলকিত হলাম।

সোফায় মাথা এলিয়ে মেয়েটি বসেছিল। আমি ওর স্ফীত ঊর্ধ্বাঙ্গে ইচ্ছে করেই চোখ রাখছিলাম না। কারণ আমি জানি, মেয়েরা এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং আমাকে এ ব্যাপারে উদাসীন দেখলে সে ক্রমশ আমার ওপর আস্থাশীল হবে।

রেস্টুরেন্টটা খুব ডেকোরেটিভ। মেয়েটি দেওয়াল দেখছিল।

সাহেবপাড়ার সঙ্গে আমাদের উত্তর কলকাতার পার্থক্য এইখানেই। সুন্দর করে বললাম আমি।

দুটো জ্ব এক করে মেয়েটি বলল, আপনি নর্থে থাকেন?

শ্যামবাজারে।

আচ্ছা–। এমন আলতো স্বরে সে উচ্চারণ করল যে ওর ঠোঁট একটুও কাঁপল না, আমি বিডন স্ট্রিটে।

তাহলে বেগুনে পড়েছেন? আমরা ক্রমশ সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্কের মতো ধাপে-ধাপে নামছিলাম। আমি খুব কাছাকাছি বসে আইসক্রিম খেতে-খেতে মেয়েটির সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হলাম। আমার অনেক কিছু শখ হচ্ছিল, কিন্তু আমি কোনও উৎসাহ দেখাচ্ছিলাম না। হঠাৎ লক্ষ করলাম আমাদের বিপরীত কোণে দুটি মাড়োয়াড়ি ছেলে মেয়েটির সম্পর্কে আলোচনা করছে বিশ্রী ভঙ্গিতে। আমি উত্তেজিত হলাম। মাথা নিচু করে মেয়েটির কানের কাছে মৃদু স্বরে বললাম, ওই কোণের ছোঁকরাগুলোকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।

স্প্রিংয়ের মতো মাথা ঘুরিয়ে কোণের দিকে তাকাল মেয়েটি। তারপর ক্রমশ মুখের পেশি শিথিল করে লাফিয়ে উঠল, হ্যালো ম্যান, হা ডু য়ু ডু? লাটুর মতো শরীর ঘুরিয়ে মারোয়ারি-টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল সে। কয়েক মুহূর্ত নির্বিকারভাবে দর্শন করলাম। বিলটা পে করতেই বাঁ-চোখে ঝাঁকুনি দিয়ে মেয়েটি ডাকল, ওঁকে চেনেন না? ওমপ্রকাশ–টেবল টেনিস চ্যাম্পিয়ন! উঃ, কদ্দিন পরে তোমার সাইট পেলাম প্রকাশ!

ওরা আমাকে লক্ষ করছিল না। পায়ে-পায়ে কখন দরজার কাছাকাছি চলে এসেছি নিজেই টের পাইনি। শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত কক্ষের বাইরে এসে এক ঝলক আগুনের তাপ নিলাম সর্বাঙ্গে। সেয়ানে-সেয়ানে পাঞ্জা কষে পরাজিত সম্রাটের মতো প্রচণ্ড রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে মনে হল, লক্ষ-লক্ষ সিসিফাস তো জন্মাচ্ছে, তবু সূর্যের তেজ একটুও কমছে না। শালা!

কয়েকশো টাকা বাজি হেরে যাওয়ার মতো মেজাজ নিয়ে হাঁটছিলাম। ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলা দরকার। যদিও শেষ দিন কথা বলার সময় আমি ভেবেছিলাম আর আসব না। ইনি বাংলাদেশের তথাকথিত সম্মানিত ও পদস্থ ব্যক্তি। এঁকে দেখে আমার মিশরের প্রাক্তন রাজা ফারুকের চেহারা মনে পড়ে। আমার কর্তৃপক্ষ যে রাজনীতির গন্ধে আমার ইতিহাসে পাচ্ছেন বলে শুনেছি, তার সঙ্গে চোদ্দ পুরুষের আমার সম্পর্ক ছিল না। অতএব এই মিথ্যে অভিযোগকে মিথ্যে প্রমাণ করতে আমাকে লাটুর মতো ঘুরতে হচ্ছে। আমাকে প্রমাণ করতে হবে আমি সৎ। শ্রীরামচন্দ্রকে যদি বলা যায়–ওহে বাপু, তুমি প্রমাণ করো দেখি, দশরথ তোমার বাপ কিনা। তবে ভদ্রলোকের সমস্যা নিশ্চয়ই আমার চাইতে নেহাত কম হত না। ঈশ্বরের তৃতীয় নয়নের মতো সর্বদুয়ারের অদৃশ্য চাবিকাঠি এই ফারুক ভদ্রলোকের হস্তগত। অতএব আমাকে তার সামনে লেজ নাড়াতে হচ্ছে সমানে।

লালদীঘির কাছাকাছি আসতেই শুনলাম কে যেন চেঁচিয়ে আমাকে ডাকছে। সেই ঘড়িওয়ালা গির্জার সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে মল্লিকদা হাত নাড়ছেন। মল্লিকদাকে দেখেই আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লাম। সুরার পাত্রে মল্লিকদা আমার গুরুদেব। পনেরো পেগেও ভদ্রলোক যথাযথ। এক টেবিলে বসে একদিন বিল মেটাতে গেছিলাম চক্ষুলজ্জায়। ফোঁস করে উঠেছিলেন মল্লিকদা, বয়েস কত? আমাকে যেদিন বয়সে টপকাবে সেদিন বিল পে করতে এসো। অর্ডাসিটি! হতচ্ছাড়া, ওই বয়গুলোকে টিপস দিতেই ফতুর হয়ে যাবে যে। মল্লিকদার অবস্থা কীরকম জানতাম না। তবে কখনও পকেট খালি দেখেনি। মল্লিকদা বিবাহিত, দুটি সন্তানের জননী তাঁর স্ত্রী। ষোলো পেগের ঝোঁকে একদিন বলে ফেলেছিলেন, তোমার বউদির বাচ্চা দুটো আমার নয়। ওর পূর্ব প্রেমিকের। প্র্যাকটিক্যালি ওকে বিয়ে করে এসব শুনে আর টার্চ করার ইচ্ছে জাগেনি। আর তাই দার্জিলিং-এর নেপালি মেয়ে লীনার মায়ের কাছে কুশলবার্তা নিয়ে যান মল্লিকদা। ডরোথির বুড়ো বাপকে লাঠি কিনে দিয়ে আসেন ডক্টর লেনে গিয়ে। গহন রাত্রে টেম্পল বা ঈশাকে বসে লক্ষ রাখেন দশ পেগ পেরিয়ে গিয়েও ডরোথি লীনারা খদ্দেরের চাপে হুইস্কি খাচ্ছে কিনা!

কোথায় চললে? মল্লিকদা নাক কোঁচকালেন, চল! লীনার কাকা এসেছে দার্জিলিং থেকে। বেশ মজার লোক।

অল রাইট। রাত সাড়ে নটার মধ্যেই ঈশাকে এসো। এক মুহূর্ত আর অপব্যয় করলেন না মল্লিকদা। ট্যাক্সির জন্যে হাত তুলে ছুটলেন রাস্তার ওধারে।

সিংহদুয়ারে অনেক কথা খরচ করে অনুমতি যদিও মিলল ভেতরে যাওয়ার, মধ্যদুয়ার একপ্রস্থ তদারকিতে কঠোর হল। ক্রমশ যখন সেই আকাঙ্ক্ষিত দেবতাটির সামনে এসে দাঁড়ালাম, ঠিক তখনই লাল আলো জ্বলে উঠল। শুনলাম এইমাত্র একজন বিখ্যাত মহিলা অন্দরবর্তী হয়েছেন। তাকিয়ে দেখলাম অপেক্ষা করার ছোট্ট ঘরে তিনজন পুরুষ ও জন-ছয়েক মহিলা কাগজ পড়ছেন। একটি অজস্র ছাপার ভুল ও কালি চুপসানো খবরের কাগজ টেনে নিয়ে সোফায়। বসতেই কানে সুড়সুড়ি দেওয়ার মতো আরামদায়ক কিছু সংলাপ ভেসে এল, আমি সাধারণত স্লিভলেস পরি না, তবে যেখানে যেমন–শুনেছি ইনি অত্যন্ত আপ-টু-ডেট। সঙ্গে-সঙ্গে সোডার। বোতল খোলার শব্দ হল। ইয়ং ম্যান অব সেভেনটি। আমাকে এখনও এসো খুকি বলেন। ওঁর একটা লাইসেন্স আজ দেবেন বলেছেন। আফটার অল ত্রিশ বছরের সম্পর্ক। মুহূর্তে আমার মনে হল, আমি দেবদর্শনে এসেছি এবং অপ্সরাবৃন্দের কাকলি শুনছি। অনেক অপেক্ষার পর শেষে মুখোমুখি হলাম। দু-পা টেবিলের নিচে চালান করে স্ফীত ভুড়ি দামি সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবিতে ঢেকে শ্রীফারুক বসে আছেন। ভদ্রলোকের গায়ের চামড়া অসম্ভব। রকমের ফরসা। পেছনের দেওয়ালে সর্বাঙ্গ জুড়ে জনকের পার্ক-স্ট্রিটীয় ছবি আছে। নীল পরদা দিয়ে ঘরের একটি দিক ঘেরা। ওখানে ইনি বিশ্রাম করেন। একটা টাইপ-করা চিঠি হাতে নিয়ে চশমার ফাঁকে তাকালেন তিনি, চাকরিটা এখনও আছে?

গলায় আমার এত কফ ছিল জানতাম না। কোনও মতে বললাম, হ্যাঁ, তবে ওয়ার্নিং দিয়েছে। আমাকে স্যার আপনি বাঁচান। আমি কোনওদিন রাজনীতি করিনি। স্যার এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। অভিযোগ। আমার ঠাকুরদাকে তো আপনি চেনেন। মানে সেই লিয়াকত আলির আমলে, যখন উত্তর বাংলার সাঁওতাল শ্রমিকদের উনি মুসলমান বলে প্রচার করেছিলেন। তখন আপনাকে আমার ঠাকুরদা ওই ব্যাপারের বিরুদ্ধে অনেক তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। আমরা কেউ রাজনীতি করিনি স্যার।

আমার কথায় কোনও আঁচড় পড়ল না মেদগঠিত ফারুকের মুখে। বাঁ-হাত বাড়িয়ে টেলিফোন তুলে অপারেটরকে বললেন, হোম ডিপার্টমেন্টে লাইনটা দিতে। আমার শিরদাঁড়ায় একটা আনন্দ ছটফট করছিল। এমন সময় এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে টেবিল থেকে কয়েকটা সাদা। কাগজ তুলে আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন। নাকটা কুঁচকে শ্রীফারুক বললেন, এর কেসটা নিয়ে একটা কিছু করার জন্য হোম ডিপার্টমেন্টে ফোন করছি। কি বলো?

কী কেস স্যার?

রাজনীতি করেছে বলে চাকরি যাচ্ছে, আমার ডিস্ট্রিক্টের ছেলে।

সে কী স্যার! আপনি ডিপার্টমেন্টে ফোন কেন করবেন? আপনার একটা স্ট্যাটাস আছে তো? আপনি বরং এর কাছ থেকে একটা দরখাস্ত নিয়ে হোম মিনিস্টারকে ফরোয়ার্ড করে দিতে পারেন।

সঙ্গে-সঙ্গে বাঁ-হাতটা রিসিভারে তুলে আনল এবং শ্রীফারুক অপারেটারকে জানিয়ে দিলেন হোম ডিপার্টমেন্টকে দরকার নেই। তারপর টেবিলে রাখা প্রতীক্ষিতদের ভিজিট কার্ডগুলো তুলে নিয়ে বাছতে-বাছতে বললেন, তাহলে একটা দরখাস্ত লিখে দিয়ে যাও। আমি ফরওয়ার্ড করে দেব। আচ্ছা–।

ভদ্রলোকের ঘাড় নাড়ার পর আমার দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে কোনও যুক্তি নেই। কিন্তু আমার হঠাৎ ইচ্ছে করল ভদ্রলোককে প্রণাম করতে। ছেলেবেলায় প্রথম ঠাকুর বিসর্জন দেখে গুরুজনদের প্রণাম করার জন্যে যেমন একটা ইচ্ছের আবেগ বুকে ছটফট করত ঠিক তেমনি। বিরাট চন্দ্রাকার টেবিলের তলায় পা দুটো খুঁজতে লাগলাম ব্যাকুল দৃষ্টিতে। শ্রীফারুক তাকাতেই বলে ফেললাম গাঢ় স্বরে, আপনাকে স্যার প্রণাম করব।

ঠিক আছে যান। পার্শ্ববর্তী ভদ্রলোক ভেটকি মাছের মতন মুখ করে আমার ইচ্ছেটাকে চুরমার করে দিলেন। পায়ে-পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

আঃ, কী হালকা লাগছে নিজেকে। বিরাট ঐতিহাসিক বারান্দা, চওড়া কাঠের সিঁড়ি, প্রেস রিপোর্টার, পুলিশ ইত্যাদিকে আদৌ লক্ষ না করে আমি জুতোর টো-তে হাঁটতে-হাঁটতে কয়েকটা শিস দিয়ে নিলাম। আপাতত পৃথিবীতে কোনও সমস্যা নেই।

বাইরে প্রচুর আলো। দুপুর গড়িয়ে চলেছে, ডালহৌসির ছুটি হতে বেশি দেরি নেই। গর্ভবর্তী মেয়ের নরম প্রহরের অস্বস্তি ভাব চারদিকে। এবার আমার সময় রুটিনে বাঁধা। ট্রামে ঝুলে সোজা এলাম কলেজ স্ট্রিট বাজারের সেই বই-এর দোকানে। সুবোধদা এবং পঁচিশ থেকে পঞ্চান্ন কয়েকজন নানা বয়সি মানুষ রোজ দোকানটার পেছনদিকে জমা হই। দু-ঘণ্টা ধরে টানা সাহিত্য চলে। আমি কনিষ্ঠতম। কথা বলার অধিকার তাই কম। সুবোধদাই বলেন। বিখ্যাত এক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত উনি, বাকি সবাই এপাশে-ওপাশে লেখেন।

আমাকে দেখেই সুবোধদা চোখ বন্ধ করে কিছু ভেবে নিয়েই আকৰ্ণ হেসে মাথা দোলালেন, তোমার গল্পটা পড়লাম। সেন্টেন্স কনস্ট্রাকশনে নজর দাও। কথা বলা আর লেখা এক জিনিস নয়।

এসব কথায় আমি খুব বিব্রত বোধ করি। এবং সব চেয়ে বাঁচোয়া যে, কোনও বিষয়ের আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এখানে সুবোধদাই সমালোচক, আমরা তাঁর কথায় ডিটো দিই। আসলে আমাদের মধ্যে একটা রেষারেষি আছে সুবোধদার করুণা পাওয়ার, সেই বিখ্যাত লেখা ছাপাবার রাস্তাটা আয়াসসাধ্য। সুবোধদার করুণাপ্রাপ্তির লোভ আমাদের আছে।

সন্ধে ঘন হওয়ার পর বেরিয়ে পড়লাম। এত মানুষের চলাফেরা, এই ভিড় দেখে আমার ক্রমশ বিরক্তি বাড়ছিল। এখন আমি এক জায়গায় ফোন করতে পারি, আমার সমস্ত পাপ ও পাপহীনতার একমাত্র শরিকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারি।

আমি বলছি।

কলেজ স্ট্রিট থেকে করছ?

হ্যাঁ।

কেমন আছ?

ভালো।

ডান হাতের ব্যথাটা সেরে গেছে?

হ্যাঁ।

কটা সিগারেট খেয়েছ?

জানি না।

তুমি আমার কথা একটুও শোনা না, কিছু বলছ না যে।

কি বলব?

বেশি সিগারেট খাবে না, বেশি ঘুরবে না; কেমন?

আচ্ছা।

কাল ফোন করবে তো?

হ্যাঁ।

পরশু?

হ্যাঁ।

আমার জন্যে তোমাকে–

রাখছি।

কাল করবে তো?

হ্যাঁ।

একটা ফোঁপানোর শব্দ কানে আসতে-না-আসতেই রিসিভার নামিয়ে রাখলাম। ঠিক এই কটি মুহূর্তে সারাদিনের এই সময়টুকু আমি সৎ, আমার বুকের ভেতর কোনও ছলনা নেই, ফর্মুলা নেই। আসলে মুখোশের তলায় দগদগে ঘা-ভরা-মুখে ওষুধ লাগাবার সময় এটা। প্রতিদিনের ফোনের সময় আমার শান্তির সময়। একটা বাইশ বছরের যৌবন ওদিকে সর্বাঙ্গ শুকিয়ে বিছানায় লেপটে আছে, থাকবে সারা জীবন, শুধু দুটো হাত আর মুখ ছাড়া সর্বাঙ্গ নিথর। ক্রমশ হয়তো ফুরিয়ে যাবে সেটুকু, আর কোনও হাত প্রতিদিন হয়তো অপেক্ষা করবে না রিসিভারটা তুলে নিতে এবং আমি গির্জায় স্বীকারোক্তির পরে তৃপ্তির স্বাদ আর পাব না। আমার ভালোবাসা, আমার কান্না, আমার শান্তি–এই সময়টুকুতে–কয়েকটি সংলাপের উদ্যানে।

দরজা ঠেলতেই মনে হল আমি নরকে এলাম। বিরাট হলঘরে অগুন্তি টেবিল ঘিরে অসংখ্য নারী পুরুষ, মদের গেলাস, সিগারেটের ধোঁয়া। আর চিৎকারের মধ্যে পথ করে সেই ব্যালকনিতে উঠেই মল্লিকদাকে দেখতে পেলাম। সর্বাঙ্গ চেয়ার এলিয়ে বসে রয়েছেন। টেবিলে গ্লাসের তলায় চাপা দেওয়া বিলের সংখ্যায় বুঝতে পারলাম বেশ কয়েক পেগ হয়ে গেছে। জায়গাটা বেশ নির্জন। যদিও নিচে মেয়েদের অশ্লীল হাসি আর তাদের শরীর জড়িয়ে ধরে মাতাল পুরুষদের চিৎকার এখানে আসে। সেসব দৃশ্যও স্পষ্ট দেখা যায় এখান থেকে কিন্তু ওপরে ওদের ভিড় কম।

এত দেরি হল যে। মল্লিকদার গলার স্বর বেশ জড়ানো।

উত্তরে হাসলাম, লক্ষ রাখো তো, ওই নিচের কোণার থামটার পাশে নিগ্রোটার সঙ্গে বসেছে ডরোথি। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কি খাচ্ছে ও? রাম না হুইস্কি?

এখান থেকে সাদা চোখেই বোঝা মুশকিল। তবু গ্লাসের আয়তনে বোঝা গেল বিয়ার। শুনেই মল্লিকদা লাল ছোপ ধরা দাঁতে হাসলেন, গুড। জানো, ডরোথি খুব ভালো মেয়ে। ওর বাবা বললেন, ও নাকি স্কুলে ফার্স্ট হত। কি খাবে?

আজ থাক।

না, কিছু বলি। কেন খাবে না?

এমনি।

মল্লিকদা একবার একটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করে হাসলেন। গুড। জানো, তোমার বউদিকে আজ দেখে বুঝলাম দ্যাট ম্যান ইজ গোয়িং স্ট্রং!

মানে?

শী ইজ এক্সপেক্টিংহার থার্ড ইস্যু।

বেশ কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলাম না। মল্লিকা গেলাসটা শেষ করেই উঠে দাঁড়ালেন, লেটস গো। ব–য়!

মল্লিকদার পেছন-পেছন নিচে নামছিলাম। সিঁড়ির মুখটায় প্রচণ্ড হইহই হচ্ছে। একটা ছাইমাখা মাগুর মাছের মতো মেয়ে দুই বুকের মধ্যে একটা টইটুম্বর পেগ গ্লাস নিয়ে মাথাটা পেছনে অনেকটা বেঁকিয়ে দ্রুততালে নাচছে। ওর সামনে একটা অ্যাংলো টেকো, প্রচণ্ড মোটা বুড়ো ছুঁচোর মতো মুখ করে গ্লাস থেকে চুমুক দেওয়ার চেষ্টা করছে সমস্ত শরীর দুলিয়ে। কয়েকটা অ্যাংলো ছোঁকরা রক্ত গরম করা সুর বাজাচ্ছে উৎসাহ দিতে। ভিড়ের মধ্যে একটু দাঁড়াতেই দেখলাম টেকো ঠোঁট দিয়ে গেলাসটা তুলে নিয়েছে এবং মেয়েটাকে একটা লম্বা গ্লাসভরতি। বিয়ার ছুটে এনে দিল। সবাই চিৎকার করে উঠল আনন্দে। মেয়েটি বিয়ার দেখে কান-ফাটানো খিস্তি করল বুড়োটার উদ্দেশ্যে। আমরা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে আসছিলাম, হঠাৎই মেয়েটি খিস্তি থামিয়ে গ্লাসভরতি বিয়ার ছুঁড়ে দিল আমার শরীরে। এবং দোলের দিনের শিশুসুলভ চাপল্যে। হাততালি দিতে লাগল দাঁত বের করে। আচমকা সমস্ত শরীর বিয়ারে ভিজে যেতে আমি চিৎকার করে উঠলাম। সমবেত জনতার উল্লাসের মধ্যে মল্লিকদা আমায় বাইরে টেনে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন। ডোন্ট ওরি। এখানে এসে না খেয়ে বেরোনোটা অত্যন্ত অভদ্রতা। ভগবান তাই তোমার শরীরে কিছু চালান করিয়ে দিলেন, থ্যাঙ্কস।

পাড়ার কাছাকাছি আসতেই ওদের সঙ্গে দেখা হল। আচ্ছা শেষ করে ফিরছে। আমি কাছে যেতেই সুহৃদ চেঁচিয়ে উঠল, কপেগ টেনেছ গুরু। দেশি না জাহাজি?

জয়ন্ত আমার মুখ বুক শুকে চাপা আপসোশের যেন ফেটে পড়ল, সুখে আছিস রে! রেগুলার মাল। টানছিস। আর আমি শালা তিন হপ্তা–। এবং আমি হঠাৎ এইসব কথা শুনতে-শুনতে মাতালের। মতো কথা বলতে শুরু করলাম। ওদের সিদ্ধান্ত সঠিক রাখতে এই গভীর রাত্রে কয়েকটি যুবকের বুকে ঈর্ষা ঢুকিয়ে ইচ্ছে করে বেতালে হাঁটতে শুরু করলাম। আহা কী আনন্দ!

সমস্ত বাড়ি অন্ধকার। এখন গভীর রাত। চোরের মতো পা টিপে টিপে, একটুও শব্দ না করে তালা খুললাম। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালতে ইচ্ছে হল না। আমি এখন এসেছি এটা এ-বাড়ির কাউকে জানাতে ইচ্ছে হচ্ছিল না আমার। এই রাত্রে যখন এ-বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে অচেতন, যখন অন্ধকার-চোয়ানো বাতাসে বেশ একটা ঠান্ডা আমেজ আসছে তখন আমার জামা থেকে উপচে পড়া বিয়ারের গন্ধে মাথা ভার-ভার করতে লাগল। জামা খুলতে গিয়ে মনে হল কিছু। একটা পড়ে গেল পকেট থেকে, অথচ আলো জ্বালার ইচ্ছে হচ্ছিল না কিছুতেই। এই অন্ধকার মেঝেয় পাতা বিছানায় শরীর এলিয়ে এবার ঘুম–সারা রাতের জন্য ঘুম।

কিন্তু বিছানায় শুয়ে অস্বস্তি ভাবটা কাটল না। আমার পাশ থেকে বিয়ারের গন্ধ আসছে। অথচ জামাটা আমি ওই কোনায় ছুঁড়ে ফেলেছি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি আলো জ্বালালাম। পোস্টকার্ডটা কুড়িয়ে নিতেই আমার সমস্ত শরীর যেন কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসতে লাগল। গতকাল থেকেই বুক পকেটে পোস্টকার্ডটা ছিল। এখন আমার হাতে ধরা পোস্টকার্ড থেকে ভুরভুর করে। বিয়ারের গন্ধ আসছে। সম্পূর্ণ ভেজা। চিঠিটা লেখাগুলো  ঝাঁপসা হয়ে গেছে–পড়া যাচ্ছে না কোনও শব্দ। অথচ কোন অলৌকিকতায় শেষ শব্দগুলো বেঁচে থেকে আমার সকল ইচ্ছাকে এক ভাঁড়ের পোশাক পরিয়ে দিল জানি না, কিন্তু দু-চোখ বন্ধ করলে এই বুক কী ভরাট মনে হয়, শব্দগুলো বাজে: ভালো থেকো। ইতি আশীর্বাদিকা, তোমার মা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *