০১. অন্তর্জলী যাত্রা – আলো ক্রমে আসিতেছে

অন্তর্জলী যাত্রা – আলো ক্রমে আসিতেছে

আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে।

অনতিদূরে উদার বিশাল প্রবাহিনী গঙ্গা, তরল মাতৃমূর্ত্তি যথা, মধ্যে মধ্যে বায়ু অনর্গল উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে; এই স্থানে, বেলাতটে, বিবশকারী উদ্বিগ্নতা ক্ষুদ্র একটি জনমণ্ডলীকে আশ্রয় করিয়া আছে। কোথাও কারণের বিকার মাত্র নাই, প্রতিবিম্ব নাই, কোথাও স্বপ্ন পর্য্যন্ত নাই; এ কারণে যে, একটি মুহূর্ত্তের সকল কিছুতে বাস্তব করত স্মরণীয় করিয়া একের যে নাম ভিন্ন ক্রমাগতই অপ্রাকৃতিক পার্থিব, তাহারই প্রাণবায়ু নিষ্ক্রান্ত হইবে এবং তাই মানুষমাত্রই নিশ্চল, ম্রিয়মাণ, বিমূঢ়। ইহাদের প্রত্যেকেরই মুখে মুখে নির্ব্বোধ গাম্ভীর্য্য আরূঢ় হইয়া রহিয়াছে মনে হয়, কখন তাহারা কপালে করাঘাত করিবার অমোঘ সুযোগ পাইবে তাহারই যেন বা কাল গণনা করিতেছে। কেননা চির অসূর্য্যস্পশ্যা জীবন এই প্রথম আলোকের শোরণাপন্ন, কেননা শূন্যতা লবনাক্ত এবং মহাআকাশ অগ্নিময় হইবে।

আমাদের স্নেহ্নের এ জগৎ নশ্বর, তথা চৈত্ররুক্ষ অগণন অন্ধকার সকলই, মৃন্ময় এবং অনিত্য; তথাপি ইহার, এই জগতের, স্থাবর ও জঙ্গমে পূর্ণিমা; ইহার চতুর্ব্বিংশতিতত্ত্বে, মানুষের দুঃখে, কোমল নিখাদে—সর্ব্বত্রে, এরূপ কোন তন্মাত্রা নাই যেখানে যাহাতে—হাসি নাই, কারণ সর্ব্বভূতে, বহুতে, তিনি বিরাজমান।

হায়! ইদানিং সেই বহুর মধ্যে একটিকে পরিত্যাগ করত মহাব্যোমে, বিরাট শূন্যতায়, চক্ষুহীন জিহ্বাহীন স্তব্ধতায় তিনি অব্যক্ত হইবেন; চির রহস্যের অনন্তের রূপ একই রহিবে। গঙ্গাতীরে অন্তর্জলী উদ্দেশ্যে আনীত সীতারাম চট্টোপাধ্যায় এই অগণিত বহুর মধ্যে—সেই নিঃসঙ্গ একটি।

সীতারাম অতীব প্রাচীন হইয়াছেন; অধুনা খড়ের বিছানায় শায়িত, তিনি, যেমত বা স্থিতপ্রজ্ঞ, সমাধিস্থ যোগীসদৃশ, কেবল মাত্র নিষ্পলক চক্ষুর্দ্বয় মহাকাশে নিবন্ধ, স্থির; তিলেক চাঞ্চল্য নাই, প্রকৃতি নাই—ক্রমাগতই বাঙ্‌ময়ী গঙ্গার জলছলাৎ তাঁহার বিশীর্ণ পদদ্বয়ে লাগিতেছিল।

অন্তবন্ত, অন্তরঙ্গ এ দেহ যে বৈরাগ্য আনিবার পক্ষে যথেষ্ট অঢেল তাহা অতিবৃদ্ধ সীতারামের দেহের প্রতি তাকাইলেই সম্যক্‌ উপলব্ধি হয়; তদ্দর্শনে, আপনার হস্ত হইতে শিশুর কপোলস্পর্শজনিত যে রেশমী অনুভব তাহা অচিরেই উধাও হইবে; আপনার সকল স্মৃতি—একদা হয়ত যে মানসবেগ চম্পকে জড়াইয়াছিল, কখন হয়ত দূর পথশ্রমের পর—স্রোতস্বিনী দর্শনে যে শান্তি অনুভব, অথবা পরিপ্রেক্ষিত হইতে সৃষ্ট হইয়া ক্রমে দিনের আলোয় ভাঙিয়া পড়া যেমন বুদ্ধুদেব চরিত্র এবং তাহা অনুধাবনে মানুষ যেমন বিনয়ী হইতে গিয়া অহঙ্কারী হইয়া উঠিয়াছে—এই সকল স্মৃতি মাত্রই ভ্রংশ হইতে এবং দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করত আপনাকে নিশ্চিত বারম্বার বলিতেই হইবে, হায় এ-দেহ কি গোলাপের অন্যতম দীর্ঘতম পুরস্কার! এবং অজানিতের প্রতি বালকের মতই, আপনার অনার্য্য অভিমান জন্মিবে।

বৃদ্ধের দেহে দেহে কালের নিষ্ঠুর ক্ষতচিহ্ন, অসংখ্য ঘুণাক্ষর, হিজিবিজি। মনে হয়, এ-দেহে পাপ অথবা পুণ্য, কিছুই করিবার যোগ্যতা নাই। বিশুষ্ক চর্মের আবরণে কঙ্কালসমান মুখমণ্ডল—এখানে, কপালে চন্দন প্রলেপ অধিকন্তু বীভৎসতা হানিয়াছে। ভাববর্ণহীন চক্ষুর্দ্বয় কালান্তরে আপনি নিমীলিত হয়, পুনর্ব্বার কিসের আশায় খুলিয়া যায়। অব্যক্তের লীলা-সহচরী মাতা, কোন মাতা এ-দেহ হইতে বারেক সৃষ্টির বীজ সঞ্চয় করিয়া আপনার সঙ্গোপনে রাখিবেন কে জানে!

বৃদ্ধের ওষ্ঠদ্বয় বিচ্ছিন্ন এবং এই অপরিসর ফাটালে বিন্দু বিন্দু গঙ্গোদক পড়িতেছে, এক একটি বিন্দু কুঞ্চিত ওষ্ঠে পড়িয়া চমকাইয়া টলিয়া স্থির হয়, পরক্ষণেই অতর্কিতে কোনরূপে মুখগহ্বরে প্রবেশ করে; কোনটি বা, কীট-পতঙ্গ যেমত, জীবন লাভ করিয়া চিবুকের অঙ্কুরিত দাড়িমধ্য দিয়ে পথ পায়, নামিয়া যায়। এই সঙ্গে বিলম্বিত লয়ে ‘গঙ্গা-নারায়ণ-ব্রহ্ম বলো’র দুঃসহ নিপীড়িত মর্মান্তিক ভৌতিক ধ্বনিবিস্তার উত্থিত হইতেছে। তবুও সীতারাম পৌঢ়শিলার মতই অনড়, গঙ্গা-নারায়ণ-ব্রহ্ম বলিবার কোন ধৈর্য্য তাঁহার আয়ত্তের মধ্যে ছিল না।

শিয়রের নিকটে কুলপুরোহিত কৃষ্ণপ্রাণ, কণ্ঠলগ্ন চেলীতে নারায়ণ শিলা, অত্যন্ত সন্তর্পণে কুশী হইতে গঙ্গাজল (চরণামৃত) বৃদ্ধের ওষ্ঠে ঢালিতেছেন। সীতারামের মস্তক তাঁহারই জ্যেষ্ঠপুত্র বলরামের ঊরু-উপরে ন্যস্ত। দক্ষিণে কনিষ্ঠ পুত্র হরেরাম। ইহারা সকলেই বৃদ্ধের আত্মার সদ্‌গতি নিমিত্ত ‘গঙ্গা-নারায়ণ-ব্রহ্ম’ পদটি আবৃত্তি করিতে যত্নবান। হরেরাম ঠোঁট কম্পিত করিতেছিল, ঝিমাইতেছিল, এবং মাঝে-মাঝে চক্ষুদুইটি বড় করত আপনাকে সজাগ করিয়া আবৃত্তির সুরের সহিত কণ্ঠস্বর মিলাইতেছিল।

মধ্যে, একপার্শ্বে, কবিরাজ বিহারীনাথ হাতের নাড়ী টিপিয়া অনন্য মনে বৃদ্ধের মুখপানে চাহিয়া আছেন। তাঁহার স্পর্শের মধ্যে নীলাব্ধিবসনা এই পৃথিবীর বাঁচার তীর্য্যগ্‌ সূক্ষ্মগতি এবং তৎসহ সংখ্যাবাচক একের প্রথম উপলব্ধি ছিল। কবিরাজের পিছনেই একজন সর্ব্বাঙ্গ চাদরে আবৃত করিয়া, অথচ, মুখটুকু খোলা, দুলিয়া দুলিয়া গীতাপাঠ করিতেছে। লোকটির সম্মুখে পুঁথি, কিন্তু পুঁথি দেখিবার আলো নাই, প্রয়োজনও নাই একারণে যে লোকটির গীতা কণ্ঠস্থ। কখনও বা তাহার ঘুম বিজড়িত স্বরে শ্লোক পরম্পরা ব্যাখ্যাও শুনা যায় যথা “কৌমার যৌবন কিছুই স্থির নয়, আত্মার হেতু নাই, মৃত্যু নাই—আশ্চর্য্য, কেহই আমরা থাকিব না, আমরা অমৃতে যাইব…” সমস্ত কিছুই একসঙ্গে লোকটি বলিতে চাহে।

এবম্বিধ পাঠ, মরণোন্মুখ সীতারাম ব্যতীত আর আর যাঁহারা উপস্থিত তাঁহাদের মনে স্বতঃই নৈরাশ্যের সঞ্চার করিতেছিল। এই পরিবেশকে, গীত বাখ্যার গোঙানি ছাড়াও, এইক্ষণে অধিকতর ভয়ঙ্কর রহস্যময় করিয়াছিল নিকটবৰ্ত্তী চিতা নিৰ্ব্বাপিত করার উদ্দেশ্যে জল নিক্ষেপের ফলে হস্ হস শব্দ, তৎসহ অনর্গল ধূমরাশি, যাহা বিচিত্র আকারে কুণ্ডলী সৃষ্টি করত এক এক সময়ে ইহাদের অতিক্রম করিয়া অস্তৰ্হিত হইতেছিল এবং অস্বস্তিকর নরবসার গন্ধ এখানে উদাম উপস্থিত সকলে প্রতীয়মান সমস্ত কিছুর মধ্যে ভয়ঙ্কর চিরসত্যটি গাইতেছিল৷ কীৰ্ত্তনীয়রা, তাহারা হতাশার চোখ দিয়া একটি গীত গাহিতেছিল। উপস্থিত সকলে মন দিয়া অনেক গীত শুনিতেছিল।

সীতারাম ও নিকটবর্তী সকলকে পরক্রমণ করিয়া একটি আধো-ঘুমন্ত কীৰ্ত্তনের দল মণ্ডলাকারে ঘুরিতেছে। দলটি ইহাদের পরিক্রমণ করিতে গঙ্গার উপর দিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছিল, যেহেতু সীতারামের পদদ্বয় গঙ্গা স্পর্শ করিয়া আছে। কীৰ্ত্তনের দল শ্রান্ত, তাহর উৎসাহহীন, তাহারা ক্ষুধাৰ্ত্ত, তাহারা শিথিল গতিতে মনে হয় যেমন বা পলাইতেছে, তাহদের নৌকার-গাত্রে-লাগা তরঙ্গরাজির শব্দের মত ভয়প্রদ ভাঙা ভাঙা স্বরে নাম গান স্থানটিতে যথার্থই অন্ধকারের সৃষ্টি করিয়াছিল।

এই গোষ্ঠীর কিছু দূরে; জ্যোতিষী অনস্তহরি উবু হইয়া বসিয়া তামাক খাইতেছিলেন, তাঁহার মন তথম সৌরজগতে বিচরণ করিতেছে, বিরাট অনৈসর্গিক জ্যোতির্মণ্ডলে তিনি যেন হারাইয়া গিয়াছেন। যেমন বা অশরীর হইয়া গিয়াছেন। তাঁহার হুকার গম্ভীর শব্দ এবং কন্তু বা হুঁকা হইতে মুখ সরাইয়া বিড় বিড় করিয়া কথা বলা, তাঁহারই পার্শ্বস্থিত অন্য এক ব্যক্তিকে ক্রমাগতই রোমাঞ্চিত করিতেছিল, এই ধৈর্ষচ্যুতি এবং অতি উগ্র-আগ্রহের কারণ হইতেছিল, লক্ষ্মীনারায়ণ যেন বা শীতকাতর; তিনি বারম্বার উদ্‌গ্ৰীব হইয়া অনস্তহরির নিকটে মুখ সরাইয়া আনিতেছিলেন, এ কারণে যে, তাঁহার মনে হইতেছিল জ্যোতিষী তাঁহাকেই লক্ষ্য করিয়া কিছু বা বলিতেছেন; ইহাই সত্য যে তিনি কিছু শুনিবার আশায় বসিয়াছিলেন। এই স্থানে কাহার কণ্ঠস্বর আসিতেছিল, “হিঃ ইরে ডরে গেলে হে, হারে মন নিছুনি জান লা গো, উ ঠাঁই মরণ নাই গো, লাও গো আঁট করি কলসটা ধর বটে লীচ্চু করি হে, একঠাঁই শান্তি দাও হে”—এ স্বরগভীরে এতাবৎ মিলন অভিলাষী হরিণীর কণ্ঠ ছিল। এ স্বর প্রাণময়, কেননা ‘শাস্তি দাও’ কথাটি উচ্চারিত হয়।

একটি চিতা সাজান হইয়াছে, উপরে বর্ত্তমান সত্য যেন বা স্মৃতি হইয়া দেখা দেয়, যেখানে নক্ষত্র নাই। চিতার নিকটে বসিয়া একটি ক্ৰন্দনরত বালক, সে লাউডগা-রুগ্ন সুন্দর, পিণ্ড হাতে করিয়া বসিয়া আছে, তথাপি তাহার ক্রদনে আকাশ আঁকা ছিল, তখনও লহরীতত্ত্ব ছিল। বালকের সম্মুখেই ব্রাহ্মণ। তাঁহার মুখে ভয়জনিত ক্লাব অবিশ্বাস; কিন্তু অনর্গল শ্লোক ধারা উৎসারিত হয়, এবং মাঝে মাঝে অঙ্গুলীস্থিত কুশ-অঙ্গুরীয় যথাযথ করার ইচ্ছাও দেখা যায়, মনে হয় যেন বা এই বন্ধনে সমস্ত কিছু বাঁধা আছে এই নূতন আয়োজনের পাশেই আর একটি চিতা প্রায় নিৰ্ব্বপিত। যেখান হইতে উক্ত কণ্ঠস্বর আসিতেছিল।

ক্রমাগত জল দেওয়ার ফলে এই চিতা প্রায় নিৰ্ব্বাপিত হইয়া আসিতেছে; এই স্থান হইতে গঙ্গাজল পর্য্যন্ত অনেক জন লোক দণ্ডায়মান ; যে ব্যক্তি গঙ্গায় দাঁড়াইয়া, সে কলস পূর্ণ করিতেছে–তাহার হাত হইতে পূর্ণ কলস হস্তাস্তরিত হইয়া আসিয়া এই চিতায় নিঃশেষিত হয়। ভস্মরাশি বিরক্ত হইয়া উঠে। কিন্তু প্রতিবারই দেথা যায় দণ্ডায়মান লোকগুলি এ কার্য সম্পাদন করিতে, কলসটি হাতে লইয়া, কেমন যেন বা ভীত। পয়ারবিলাসী মন উধাও, পা কাঁপিয়া উঠে। সকলেই নির্ব্বাক, সকলেই এই ত গাছ নড়ে, এই ত অন্য সকলে  রহিয়াছে—এই কথা ভাবিয়া সমস্ত কিছুকে কলস প্রমুখীং যুত করিতে চাহে তত্ৰাচ কলম প্রায় হস্তচু্যত হয়। সকলেরই কলস বাঁচাইতে দেহ বাঁকিয়াছিল।

কেবলমাত্র বৈজু চাঁড়াল, রূপরসগন্ধের সততা মানিয়া নিৰ্ভীক, দাঁড়াইয়া আছে, সে তাহার দুঃসাহসিক মোচে দৃপ্ত চাড়া দিয়া অদ্ভুত করুণাবাচক হাসি হাসিয়া অনেক কথাই বলিতেছিল, তাহার চোখে ঘুম নাই। কহিল, “আই গো, হুঁশিয়ার গো খুব হে, মনকে আঁচ ঠেল, হিঃ গতর খুব খাড়া রাখ মন” পুনৰ্ব্বার দু’এক কদম নিকটে আসিয়া বলিল, “ওগো মশাই গো, উটি কলসটি, তোমার হৃদয় গো, আবার উটি তোমার স্মৃতি বটে, দেখ যেন ভাঙেনি, উটি ভেঙে দিয়ে যাবে চিতায় হে” বলিয়া মাথাটি দিয়া এখানকার আলোকে ঈষৎ মাড় দিল।

বৈজু কারণ সলিলে একটি ক্ষুদ্রপল্লবিত শাখাবৎ, দূরে কোথাও দ্বীপ প্রচ্ছন্ন হইয়া আছে, সুতরাং তার প্রতি সকলের আকর্ষণ অহেতুক নহে। তথাপি বৈজুর কথায় জনগণ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিতেছিল, শুধু কথা কেন, তাহার তুচ্ছ হেরফের গভীর হইয়া দেখা দেয়, যেহেতু একটি চাকচিক্য যেন স্বস্তিলাভ করিয়াছে। জনগণের একজন বৈজুর কথার উত্তরে, কেবলমাত্র নিজের অস্তিত্ব উপলব্ধির কারণেই বলিল, ‘এতেক কথা শিখালে কে বটে হে!’

বৈজু-আশ্রিত চাকচিক্য দুলিয়া উঠিল!  বৈজু চাঁরাল হাস্য সংবরণ করিতে পারিল না। ভোরের হাসিতে যে ভাই-ভাই ভাবটুকু থাকে, সেইটুকু এ-হাসিতেও ছিল। কিন্তু বৈজু একটু বেশী রকমে অভিমানী, সে নীচ কুলোদ্ভব, পাছে তাঁহার হাস্যধ্বনি কাহারও দেহে লাগে সে-কারণে সে উৰ্দ্ধ আকাশে হাস্যধ্বনি ছড়াইয়া দিয়া কহিল, “কেনে গো বাবু মশায়, এখনও (!) অবাক কি হেতুক, তোমার কি মনে লয় ?” বলিয়া আয়ত নয়নে ঈষৎ বিস্ময় হানিয়া তাহার দিকে চাহিল।

বৈজুর হাস্যধ্বনি শ্রবণে লোকটি ভয়াৰ্ত্ত হয়, অত্যধিক অস্বস্তি সহকারে তাহার প্রতি সকলেই তাকাইয়াছিল, কারণ এরূপ হাস্য স্থানকালপাত্র ভেদে যারপরনাই অসংযত বলিয়া মনে হয়। অন্যপক্ষে বৈজু চাঁড়াল বুঝিল, লোকটি এক্ষেত্রে ছায়াবং, কোন স্বাভাবিকতা নাই, এবং তাহার যাহা কিছু বোধ ছিল, তাহার কিছুটা শবদাহের সহিত পুড়িয়া ছাই হইয়া গিয়াছে। সুতরাং সে এই শ্মশানভূমি নির্দেশ করিয়া কহিল, “তুমি কি ভাব মনে রাত্তদিন শুধু জোড় খায় ই ঠাই।” এই উত্তরে ভীত লোকেরা ধরা পড়িয়া গেল। “ই যে মহাটোল বটেক, কত ডাগর ড্রাগর পণ্ডিত আচাজি ই ঠেন পাঠ দেয় গো, কত যুক্তি আঁটে, আমি শুনি ..হাঁ..আমি শুনলাম বটে, তত্ত্বকথা বেজায় জানি হে, আত্মার সাকিম কুথাকে তার থানা কোথী; আমি যে তার সরিক !” বলিয়া আনন্দে ডানহাতখানি বাঁ হাতের এবং বা হাতখানি ডানহাতের পেশীকে চাপড়াইল। ইহার কিঞ্জিং পরে অত্যন্ত গোপন খবর দিবার মত করিয়া বলিল, “কলস ? সে যে হ্রিদয়! ইটা যে স্মৃতি, সি-কথা গোবিন্দ আচাজ্জি বললে, মড়া পুড়াতে এসে বললে, বৈজু এ-ইটা ঘটাকাশ, ভাঙলেই পটাকাশে মিলবে বটে, হিসাব মিলে যাবে, আমরা ভাবি কলসটা স্মৃতি… হে হে আমনভাবে না..না…গো বাবু মশায়।”

বৈজুর কথার মধ্যেই নিৰ্ব্বাপিত চিতার নিকটে এক কলস জল রাখা হইয়াছিল, শ্মশান যাত্রীদের একজন এই কলসটিকে ভাঙিয়া, এই স্থান পরিত্যাগ করত চলিয়া যাইবে; যে জন ভাঙিবে সে বাঁশটিকে ঠিক যুত করিয়া ধরে নাই দেখিয়াই, বৈজু তাহার কথা থামাইয়া হাঁ-হাঁ করিয়া ছুটিয়া আসিল পাছে চণ্ডালের ছোঁয়া লাগে তাই সকলেই যথাসম্ভব সরিয়া গেল। বৈজু আপনাকে সামলাইয়া বলিল, “খুব ডাগর জোর ধর হে বটে, এ হে বাবু…উ তো কলসী-তোমার মাগ লয়।” এবার মুচকি হাসিয়া কহিল, “আর কেনই বা তা লয়, হ্যাঁ জোর করি ধর, অন্যদিকে চাও, লাও মার শালা জোর গুঁতো, যাক শালা ঘটাকাশ পটাকাশে “

রুদ্ধশ্বাস-স্তব্ধতা দেখা দিল, বৈজু পুনরায় বলিল, “ভাঙার শব্দ হলে ইদিক পানে আর চাহিবে না গো, শুধু হরি বোল দিবে..হরি বোল।”

এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিকট ভাঙার শব্দ হইল, শূন্যতা বাড়িল। এই সঙ্গে অযুত হরিধ্বনি শোনা গেল, বৈজু তাহার কথা কয়েকটি বলিয়া মুখখানি অৰ্দ্ধ-উন্মুক্ত করিয়া দাঁড়াইয়াছিল। সেও শব্দ শোনা মাত্র বলিয়া উঠিল, “সাবাস সাবাস” এবং ইহার ক্ষণেক পরেই, সে চকিত হইয়া বলিয়া ছিল, “হে রে রে রে..ই দিকে চেগুনী…সোজা ঘরকে যাও…”

তাহারা সকলেই ত্বরিত পদে, শ্মশান পরিত্যাগ করিয়া সুউচ্চ ভেড়ীপথে উঠিল, অদৃশ্য হইয়া গেল। ইহারা সকলেই—যে ইতিপূৰ্ব্বে ছিল–তাহার প্রমাণস্বরূপ বৃক্ষদির পাতা কম্পিত হইতে লাগিল; কেননা তাহারা ভেড়াপথ হইতে নামিবার কালে বৃক্ষের ডাল আকর্ষণ করত নামিয়াছিল।

কম্পমান পত্রাদির দিকে বৈজু কিয়ংকাল চাহিয়া রহিল, কাহাকেও সে দেখিতে পায় নাই, সহসা নিৰ্ব্বাপিত চিতার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল, এখন সে তাহার পৌরুষে দুৰ্দ্ধৰ্ষ ঘাড়খানি খুরাইয়া দেখিল, ছোট ছোট প্রজ্বলিত পাটকাঠির টুকরা মাটিতে পতিত হইয়া ক্রমে নিভিতেছে, এবং তৎসহ গম্ভীর মস্ত্রেচারণ উৎসারিত হয়, “যে তোমার শোক মোহ এ সকল গেল” (শুধু মাত্র প্রেম রহিল সম্ভবত) বৈজুনাথ, চিতাপ্রদক্ষিণকারী বালকের হস্তধৃত মুখাগ্নিনিমিত্ত প্রজ্বলিত পাটকাঠির আলোকে ভাঙা কলসের অনেক টুকরার মধ্যে পুনরায় কি যেন অনুসন্ধান করিতে ব্যস্ত হইল।

দুই একটি সেই ভাঙা কলসের টুকরা পা দিয়া সরাইতেই একটি রৌপ্যখণ্ড তাহার চোখে পড়িল, ইহাই সে খুঁজিতেছিল। সত্বর রৌপ্যখণ্ডটি কুড়াইয়া লইয়া মহা উল্লাসে এক কদম, বগল বাজাইয়া, নৃত্যু করিতে গিয়া সে একীভূত স্থির!

ক্বচিৎ কখনও সেও স্থির হয়!

সমীপস্থ চিতাস্থিত মৃতের কণ্ঠলগ্ন ফুলমালা জ্বলিতেছে, আর অন্য পাশে, বালকের বিহ্বল বিমূঢ় সদ্য স্তনছিন্ন অসহায় মুখমণ্ডল আর ইতিমধ্যেই অগ্নিশিখ, এবং বালকের সম্মুখে ঘূর্ণিহাওয়া যেমত আবৰ্ত্তিত হয় তদ্রুপ সমস্ত সৃষ্টি ঘুরিয়া উঠিল। পরক্ষণেই, বাবা গো’ বলিয়াই বহ্নিমান চিতার দিকে সে ছুটিতে উদ্যত হইল।

বৈজুনাথ অন্যমনস্ক, তথাপি আপনার দায়িত্বজ্ঞানে হাঁ-হাঁ করিয়া বাধা প্রদান করিতে গিয়াছিল। বালকটির বয়সী সঙ্গীরা বালককে ধরিয়া ফেলিল; তবুও এখনও, বালক স্বীয় আবেগ সম্বরণ করিতে সমর্থ হয় নাই। একথা সত্য যে, মৃত্যুর গভীরতায়, এক মুহূৰ্ত্তের জন্য চন্দ্ৰ সূৰ্য্যকে হারাইবার মত স্থিরতা তাহার নাই। যদিচ, সবুজতা তাহার কাছে নিশুতি রাত্রের বিধি স্বর এমত, যদিও আপনার নিঃশ্বাস পরিদৃশ্যমান আলোকে আড়াল করিয়াছিল, যদিও স্পৰ্শবোধ ভোরের পাখীর কণ্ঠস্বরে উধাও।

বয়সী সঙ্গীরা তাহাকে, এমত মনে হয়, যেন বা দাঁত দিয়া টানিয়া ধরিয়া আছে। সুতরাং সাতুন দিবার ভাষা থাকিলেও উপায় ছিল না। সকলেরই জিহ্বা কটু কোন স্বাদে লিপ্ত, মুখ বিকৃত। তথাপি শুধুমাত্র একজন কহিল, “ছিঃ পাগল” একথা সংস্কারবশতঃই সে বলে।

এই ছোট মন্তব্যটি বালকের সম্বিৎ ফিরাইয়া দিল; চিন্তাপ্রসূত, উত্থিত ধূম্রজালের দিকে তাকাইয়া, অন্যেরা ভীতভাবে মাথা নাড়িল। বৈজু বালকের দিকে ব্যাকুলভাবে চাহিয়া ধীরে ধীরে বলিল, “হা রে ননু, খোঁকা গো, মন তোমার পুড়ে” এবং পরক্ষণেই অতিশয় কোমল কণ্ঠে উচ্চারণ করিল, “দেহ চিতায় মন পুড়ে গো” এ কথার আবৃত্তির রীতিতে মনে হইল, সে কোন এক গীতের প্রথম কলি উদ্ধৃত করিল। সমবেত জনমণ্ডলী, অল্পক্ষণের জন্য ক্ষিতিতত্ত্বের অনিত্যতা হইতে মন ফিরাইয়া তাহার দিকে আগ্রহভরে দেখিতে লাগিল। ইহাদের সকলেরই আশা, সে কিছু বলুক, কেননা তাহদের তালু শুকাইয়াছে, কেননা মনে নানাবিধ হাড় স্তুপীকৃত হইয়াছে, কেননা তাহারা অলৌকিক পথশ্রমে ক্লান্ত।

বৈজু পুনৰ্ব্বার বলিল, “কেঁদোনি খোঁকা, একটি গল্প শুন—যে দিলে সেই নিলে, তুমাকে ভাল’র মধ্যে লোভী করে দিলে, কি করবে হে”–তাহার গলার স্বরে সহজ ঠিকানা ছিল, ফলে বালক ভুকরাইয়া কাঁদিয়া ক্ষণিক জিহ্বা দ্বারা ওষ্ঠ বুলাইয়া, একহাতে চোখ কচলাইতে কচলাইতে আপনার পিতার দেহের দিকে চাহিয়াছিল। এবং ক্ষণেক পরেই বৈজুনাথের বিষাদব্লিষ্ট স্মিতহাস্যময় মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল।

অন্যপক্ষে বৈজু আপনার কণ্ঠকে ঈষৎ সরস করিবার মানসে একটি টোক গিলিয়া নিতান্ত মেটে হইবার চেষ্টা করে। কিন্তু বালকের লাল চক্ষুদ্বয়-যেখানে কেন ড়োর নাই, তাহাকে বিভক্ত করিয়া দিয়াছে। সে বিমূঢ়, কোনরূপে আপনার লাঠিখানি তুলিয়া লইয়া মুখখানি নীচু করিল, হস্তধৃত লাঠিখানি সে মৃদু মৃদু মাটিতে যুঁকিতেছিল। একবার কি এক কথা বলিতে গিয়া মুখ তুলিয়াই তৎক্ষণাৎ নামাইয়া অতি ধীরে বলিল, “কেঁদনি গো, খোঁকা গো” এই কথার পর একটি বিদেশী নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল, এবং তদনন্তর আপনার রোমশ বক্ষে হাত বুলাইতে বুলাইতে সে কহিল, “ওগো বাবু ইঠাই একো জীব আছে হে, ধূক ধূক ধূক ধূক করে, আমার যেটা সেটা লোহার” ইহার পর আকাশের দিকে চাহিয়া বলিল, “লোহারই বা কেনে, দধীচীর অস্তি দিই গড়া, পালোয়ান পালোয়ান বাজ দিই গড়া, গড়া হঁই গেল? আকন্দ ফুল এমন কি, আমি দেখলে চিন্‌তে লারবো, টুকুম ভাত গরীসে মনে লেয় আকাশ খাইছি। তবু তোমার চোখের জলের ভূতে আমাকে পেল।.হারে বাবু মানুষ, দেখনা কেনে গ্রামে গায়কে হলুদ নিশান দিইছে, ভারী গরম (কলেরা) হ’ল, তার উপর বলে কাৰ্ত্তিক মাস যমের দক্ষিণ দুয়ার খোলা, কত থানা মুলুক ঠেন মড়া এল, এই দেখনা কেনে দড়িতে গিঁটদি…” বলিয়া কোমরের দড়ি দেখাইয়া পুনরায় কহিল, “সব শালা গরমের দেনাদার প্রজাখতক, কত যে অনাথ হইল তা পাইমাপে আসে না খোঁকা, তাদের দেখলে আর কনতিসনা গো…উই যে শালা উপরে, যে শালা সবার ভিতরে, তার কলম মানতে হবেক…সে বড় কঠিন প্রাণ গো, কোন বোধ নাই, কান নাই, হাত নাই…বিকার নাই–এতবড় সংসারটা…চালায় হে…আইগো কথা শুনছে তোমরা…মড়ার হাত যে…মাটি ছুঁতে চায়, মাটি হা হা মাটি…”

এই দৃশ্যে তাহারা সকলে যারপরনাই তটস্থ হয়; কিন্তু দক্ষতা এবং দূরত্ব বিচার তখনও পরিচ্ছন্নভাবে আসে নাই, তখনও তাহারা ললাটে করাঘাত-সুখে অলস। ফলে বৈজুর সাবধান বাণী কাজে দেয় নাই।

“হে হে গো, বাবু গো, হাতকে ঠেক দাও ঠেকা দাও, না হলে জীবন বড় লষ্ট করবেক হে” এ কথার পর খানিক দ্রুত অগ্রসর হইয়া অঙ্গুলী নির্দ্দেশ করিয়া বৈজুনাথ বলিয়াছিল।

হাতটিকে তুলিবার জন্য,একজন একটি বাঁশ দিয়া ধরিবার চেষ্টা করিল, মৃত সাপের মত শ্লথ এ হস্ত-সৌহার্দ্দ্য অভিমানী, এ হাতখনি ব্যগ্রতার স্থির নশ্বর রূপ। ইদানীং পুনৰ্ব্বার অগ্নিতে সে মনোরমত্ত্ব ঠেলিয়া দেওয়া হয়, লাখ প্রবাদবচন এবং দিগদর্শন পুড়িয়া পুড়িয়া ছাই হইবে।

বালক এ হেন দৃশ্য যে সহিতে পারে নাই, তাহা বৈজুনাথের চোখ এড়াইল না। বালক দৃঢ় করিয়া আপনকার নয়নযুগল মুদ্রিত করিল, আপনকার মুষ্টির মধ্যে কাহার মুষ্টি প্রবলভাবে ধরিতে চেষ্টা করিতেছিল। তাহার দেহ প্রদীপের শিখাবৎ।

বালকের স্বভাব বৈজুনাথকে আমোদের সন্ধান দিল। সে হাসিয়া উঠিল—আর অন্ধকার নাই, ব্যাঘ্ৰ দীন হয়। সে কহিল, “লাও গো মানুষ বাবু, ভয়ে না ভালবাসায় চোখ বুজলে, এমন যেন শত্রুর না হয়— বলে সবাই শুরু করে, অথচক এমনি হয়।”

আর আর সকলেই তাহার ইত্যাকার বাক্যবাণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। সকলেই তাহাকে শক্ত করিয়া দেখিল, ইহাদের দৃষ্টিতে ভর্ৎসনা ছিল। বৈজুনাথ বুঝিল, মুখ দিয়া অনেকটা হাফ ছাড়িয়া কহিল, “হে গো, আমার কথা ধর না হে, কথায় আমার অাঁকসাট নাই, আমি জাতচাঁড়ল গো, আমি তারাগুলা জলে দেখি আমার মাস শেয়াল শকুনে খায় না গো!”

এইটুকু মাত্র পদবিন্যাসে সকলেই মোহগ্ৰস্ত, এ কারণে যে তাহার বাক্যসমূহে জীবনের ক্লান্তি ছিল। “মড়া দেখি দেখি আমি মাটি হইছি গো, আমি তো শব গো, বহুদিন মরে আছি হে,লাও বাবু মশায়, তোমাদেরই ই চিতাত এখন গোড়া গাঁথছে, খোঁকাকে লিয়ে উ ঠাঁই বস গী, মনের কথা বল গা উ ঠাঁই…” বলিয়া বৈজু গঙ্গার দিকে অগ্রসর হইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *