অনিকেত – সঞ্জয় ব্রহ্ম

অনিকেত – সঞ্জয় ব্রহ্ম

রাতের খাওয়া সেরে অনিকেত বসার ঘরে বসে টেলিভিশন দেখছিল। স্ত্রী বিজয়ার তখন সংসারের কাজ গুছিয়ে রাতে শোবার সময়। পাঁচ বছরের মেয়ে শ্রীপর্ণা ঘুমিয়ে পড়েছে।

টেলিভিশনে কোন একটা চ্যানেলে তখন অর্থনৈতিক বিষয়ের ওপর বিতর্কে অংশ গ্রহণ করেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদগ্ধ পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ। অনিকেত খুব মনোযোগ দিয়ে এদের আলোচনা শুনছে। স্ত্রী বিজয়া এসে পাশের সোফায় বসল। তার মুখটা কঠিন। চোখে মুখে বিরক্তি ভাব। কপাল কুঁচকে রয়েছে। সে হঠাৎ বলে ওঠে,—তোমার বাবা একটা অর্থপিচাশ। তুমি একটা অপদার্থ, তাই তোমার নাকের ডগা দিয়ে তোমাকে কাঁচকলা দেখিয়ে সম্পত্তি ভাগ হয়ে গেল।

অনিকেত টেলিভিশনের ঐ অনুষ্ঠানটি মন দিয়ে শুনছিল। সে বিজয়ার ঐ আকস্মিক বাক্যবাণে প্রায় কার কণ্ঠে বলে, কেন আমার জন্য তিনতলার ছাদের ঘরটা তো আছেই। বাবার অবর্তমানে ঐ ঘরটা তো আমার। প্লাস ক্যাশ।

বিজয়া মুখ ভেঙ্গিয়ে হাত নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করে বলে, নিচ তলার ঘর…ক্যাশ!–বাবার অবর্তমানে তুমি কচু পাবে।

অনিকেত একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, আচ্ছা তুমি হঠাৎ আমার পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে পড়লে কেন? সে প্রসঙ্গ তো আমিও তুলতে পারি। আইন অনুযায়ী পৈত্রিক সম্পত্তিতে তোমারও সমান অধিকার রয়েছে।

তুমি তো খুব লোভী দেখছি। পরের সম্পত্তিতে লোভ।

বাবা কি তোমার পর নাকি?

দেখ ফালতু কথা বলবে না। আমি কেন বাবার বাড়িতে ভাগ বসাতে যাবো। বাবা আমাকে খরচা করে বিয়ে দিয়েছেন।

অনিকেত দৃষ্টি টেলিভিশনের দিক থেকে সরে এসেছে। সে এবার বিজয়ার মুখোমুখি হয়ে কুঁচকে বলে, খরচা করে? তুমি তোমার বাবার হয়ে ওকালতি করছ। কর। কিন্তু তোমার বাবাও কম ধুরন্ধর না। আমাদের পক্ষ থেকে দাবীহীন বলায় ওনার তো পোয়াবারো হয়েছিল। ঐ যা দিয়েছেন সব তোমাকে। তোমার গয়নাগাটি। আর আত্মীয় ডেকে খাওয়ানো। তাও-তো সে খাবার খেয়ে আমার দুই অফিস কলিগ। অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কাজেই তোমার বাবা একটা পয়লা নম্বরের…কথাটা শেষ করে অনিকেত।

বিজয়া চেঁচিয়ে ওঠে। তুমি আমার বাবাকে গালি দেবে না। খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি। তোমার কোন ধারণা নেই—একটা মেয়ে বিয়ে দিতে কত খরচ। নিজের একটা মেয়ে হয়েছে তো; বুঝবে তাকে পার করতে কত খরচ। তখন মুরোদ কত দেখব।

বিজয়ার দিকে আঙুল তুলে অনিকেত বলে তুমি কিন্তু প্রসঙ্গ ছেড়ে এখন উল্টোপাল্টা বলছ, চুপ করবে?

ইস্ আমি উল্টোপাল্টা বলছি। আর তুমি যা বল ঠিক বল? মাসের আজ কুড়ি তারিখও হয়নি। এখনই তোমার পকেট গড়ের মাঠ। টাকা চাইলে পাওয়া যায় না।

মাসের শেষে পকেটের দুরুবস্থা সব চাকরীজীবির-ই হয়।

সবার হয় না। হয় তোমার মত পাঁচু কেরাণীর। এ কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছ কেন?

এবার অনিকেতের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। সে বলে, জেনে শুনে তোমার বাবা কেরাণীর সাথে বিয়ে দিলেন কেন?—ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, টাকাওয়ালা ব্যবসাদার খুঁজলেই পারতেন।

সেটা তোমার বাবার আদিখ্যেতা। আমাকে দেখার পর থেকেই এ মেয়ে সুলক্ষণা, এর সাথেই ছেলের বিয়ে দেব। আর বিয়েটা তাড়াতাড়ি দেবার জন্য কত মিষ্টি মিষ্টি কথা। নইলে কত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আমাকে প্রপোজ করেছিল।

বেশ তো তাদের কাঁধে ঝুলে পড়লেই পারতে।

অনিকেতের এই কথা শুনে, বিজয়া এবার তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। ঝুলে পড়া মানে কি বোঝাতে চাইছো? তার মানে আমি তোমার বোঝা?

আহ্ বোঝা হতে যাবে কেন? আমার রোজগারের ওপর নির্ভরশীল।

সে-তো তোমার জন্য। বিয়ের পরই বাচ্চা হল। বাচ্চা মানুষ করতে করতে এপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের কার্ডটা ল্যান্স হয়ে গেল।

ইস্ কার্ড থাকলেই যেন চাকরী হেঁটে হেঁটে বাড়িতে হাজির হোত।

হ্যাঁঁ  হত। স্কুল মাস্টারী অবশ্যই হত। আর শিক্ষকতা করব বলেই অনার্স পাশ করে বি.এড পাশ করেছিলাম।

রাখ রাখ তোমার মত বাংলায় অনার্স বি.এড রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।

কি বললে, রাস্তায় গড়াগড়ি। তার মানে আমি একটা রাস্তার মেয়ে। কথাটা বলে বিজয়া ঘ্যান ঘ্যান করে ওঠে।

হরিবল্। তুমি দেখছি পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করছ।

কী বললে, হরিবল তুমি আমাকে মরতে বলছ?

কী অসহ্য।

আমাকে অসহ্য লাগছে। কথাটা শেষ করেই বিজয়া হঠাৎ যেন আগুনের মতো ফুঁসে ওঠে।

আমি এক্ষুনি এখান থেকে বেরিয়ে যাবো।–রইল তোমার মেয়ে।

কথা লতার মতো লতিয়ে লতিয়ে ধোয়ার কুণ্ডলী হয়ে শেষ পর্যন্ত চারদিক ঝাঁপসা করে দেয়। বিজয়া এখন কথা থামিয়ে ছুটে যায় ভেতরের ঘরের দিকে।

বসার ঘরে টেলিভিশন সেটটা তখনও চলছিল। এটা বোধ হয় দাম্পত্য কলহের সাথে নবীনতম সংযোজন। টেলিভিশনের শব্দে উঁচু গলায় কথা কাটাকাটি বা দাম্পত্য কলহের বিন্দু বিসর্গও বাইরের লোক শুনতে পাবে না। টেলিভিশনের শব্দ এই কলহে এক বিশেষ আবহ সংগীতের মাত্রা যোগ করে। বিচিত্র ধ্বনি সৃষ্টি হয়। ভেতরের সব টুকু ঢাকা দিয়ে দেয়।

অনিকেত কি করবে দিশা পায় না। ভাগ্যিস টেলিভিশন সেটটা চলছিল। নইলে মেয়েটা ঘুম থেকে জেগে উঠত। বাবা মায়ের ঝগড়া দেখলে মেয়েটা অসহায়ের মতো কাঁদতে থাকে। সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে

অগ্নিসংযোগ করবে, এমন সময় বেশ জোরে একটা ভারি কিছু পতনের শব্দ হয়।

অনিকেত অতি দ্রুত ভেতরের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

ভেতরের ঘরে তখন গোদরেজের স্টিলাক্স আলমারিটা হাটখোলা। শাড়ি, জামা, কাপড় লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে। আলমারির ছাদ থেকে তখন আঠাশ ইঞ্চি ফাইবারের বাক্সটা মেঝের ওপর ছড়িয়ে রাখা জামা কাপড়ের উপর চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে।

অনিকেত কতকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। মুখে সিগারেট হাতে লাইটার। স্তম্ভিত দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে সে চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখে।

একটু আগেই বিজয়ার মুখ দিয়ে খই ফুটছিল। এখন মুখটা পাথরের মত কঠিন করে চারদিকে কী যেন খোঁজে। তারপর হঠাৎ কাপড়ের এক পাশে মাঝারী সাইজের একটা হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে বুকে চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়ে। তারপর বোম টিপে ঢাউস ভি. আই. পি. লাগেজটা খুলে ফেলে। বাক্সটা উলের জামাকাপড়ে ঠাসা। শরীরটাকে ঈষৎ ঝুঁকিয়ে সে উলের জামা কাপড়গুলো মেঝের ওপর ছড়িয়ে সামনে এসে পড়েছে। অবিন্যস্ত বেশবাস। চোখদুটো স্থির মুখটা কঠিন।

অনিকেত বোকার মত তাকিয়ে দেখছে। সিগারেটটা হাতের আঙুলের ফাঁকে রয়েছে। লাইটারটা অন্যহাতে ধরা রয়েছে। হঠাৎ পাশের ঘর থেকে ঘুম থেকে জেগে উঠে মেয়ে শ্রীপর্ণা এই ঘরে উপস্থিত হয়। বিজয়া তখন ফুসছে। মেয়েকে দেখেই বিজয়া হঠাৎ অগ্নিমূর্তি ধারণ করে তার দিকে তেড়ে গিয়ে বলে, এ্যাই তুই-তোর

জন্য আমি মরতেও পারছি না। তোকে আজ খুন করে….

কথাটা শেষ করার আগেই মেয়ে শ্রীপর্ণা ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলে। সে কী আকুল কান্না। মেয়ের কান্নার সাথে সুর মিলিয়ে বিজয়াও হা-হুতাশ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাবা গো কী পাষণ্ডর সাথে আমায় বিয়ে দিলে গো…

বিজয়ার কান্নার হিক্কা ওঠে প্রথম। এখন ও কী বলছে বোঝা যায় না। একটু আগেই অনার্স গ্রাজুয়েট, বি. এড পাশ শিক্ষিকা হওয়ার প্রবল ইচ্ছা ফুৎকারে কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেল।

মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বিজয়া কাঁদতে থাকে। এবার ওদের কলরোল কেবল টি.ভি’র শব্দকেও ছাপিয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে চোখ পড়ায় অনিকেত দেখল, ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা বেজেছে। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে তখন মা-বিটিতে মিলে কান্নার রোল তুলেছে। বাইরে একদল কুকুর ডেকে ওঠে। অনিকেত মেয়ের মাথায় হাত রাখে। মেয়ে মাথাটা সরিয়ে নেয়। অনিকেত বোঝে মেয়ে তার দিকে আসতে ভয় পাচ্ছে। অনিকেত স্ত্রী বিজয়ার মাথায় হাত রাখে। সাথে সাথে কান্নার হিক্কা বাড়ে।

অনিকেত বলে, প্লিজ চুপ করবে। আচ্ছা বেশ সব দোষ আমার। আমি সংসার প্রতিপালনে অক্ষম এক অপদার্থ মানুষ।

কে কার কথা শোনে। কান্নার প্রবল হিক্কা এবার মেয়ে শ্রীপর্ণাকে সংক্রামিত করেছে। অনিকেত ওদের দুজনের মাঝখানে বসে দুজনকেই একসাথে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে।

বিজয়া বিজয়া কী হচ্ছে এত রাতে? বলছি তো সব দোষ আমার।—অনিকেত খানিকটা নার্ভাস হয়ে মেয়েকে বলে, মামনি তুমি কাঁদছ কেন? এই তো আমি তোমাকে আদর করছি।

মেয়ের কান্না থামে। ওর চোখের কোল দিয়ে জলের ধারা চিবুক অবদি নেমেছে। সে বাবাকে বলে, মাকেও আদর করো।

অনিকেত অসহায়ের মত বলে। সেই তো কতক্ষণ ধরে তোমাদের আদর করে চলেছি। এবার অনিকেত তার দুহাত দিয়ে বিজয়ার এলোমেলো অবিন্যস্ত চুলগুলো গুছিয়ে দেয়। বলে, বিজয়া প্লিজ একটু আমার কথা শোনো। বিজয়ার কান্নার শব্দ থামে। সে তখনও হাফাচ্ছে। চোখের জল গালে মাখামাখি হয়ে চিবুক দিয়ে বক্ষদেশের দিকে এগিয়েছে। সে যেন চোখের জলে বুক ভাসিয়ে-মনের সমস্ত অভিমান ধুইয়ে নিয়েছে।

অনিকেত বসার ঘরে এসে টি.ভি. সেটটা বন্ধ করে মেয়ে বউকে নিয়ে ডিভানের ওপর বসে। ডানদিকে বিজয়া। বাম দিকে মেয়ে শ্রীপর্ণা। অনিকেত সমান স্নেহে দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।

রাত বাড়ে বিজয়া ও কন্যাকে তখন দুই কাঁধে নিয়ে অনিকেত তখন ক্লান্ত শ্রান্ত। চোখে ঘুম জড়িয়ে এসেছে।

অনিকেত দুজনকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলে। ঘুমুতে যাবে চল। রাত প্রায় ভোর হতে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *