অগ্রন্থিত গল্প

২ অগ্রহায়ণ ছিল কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁর একটি অগ্রন্থিত গল্প ছাপা হলোঃ

মাহমুদুল হক
ল্যুগার ও বেলুন

২ অক্টোবর, অপারেশন জু· দোঃ জুদোঃ
আমার কবজির অটোম্যাটিক শেকোয় কাঁটায় কাঁটায় তখন বিকেল চারটে। গতকালকের দিনটা ছিল বিচ্ছিরি রকমের রেনি। আজকের দিনটা বেশ ঝকঝকে। রুপোর টাকার মতো উজ্জ্বল রৌদ্র, রৌদ্রের চোখেমুখে বেশ হাসিখুশিভাব; শিশিরভেজা ফুলকপির ভেতর সাধারণত এই ধরনের হাসি হাসি ভাব লক্ষ করা যায়। কাঁটায় কাঁটায় ঠিক চারটেয় বঙ্গমিতা সু-স্টোরে ইন করলাম আমি, পকেটে ল্যুগার, হিটলারের যা ছিল; হিটলারের অবশ্য ওয়ালথার পিপিকে-ও ছিল। দেরি না করে আমার পেছনে পেছনে ঢুকল টাইফুন। স্টোরে ইন করেই কুইক সবকিছু অ্যাসেস করে ফেললাম। বল্টু, ডিনামাইট আর সুজুকি প্ল্যান মতোই আগে থেকে কাস্টমার সেজে জুতো দেখছে, দিব্যি বিজি রেখেছে তারা সেলসম্যানদের। তিনজন সেলসম্যান, তিনজনেই ভীষণ বিজি। ফাইন! এই তো চাই! ইলেকট্রিক অর্থাৎ আমরা যে যার পজিশন ঠিক করে ফেলেছি এরই মধ্যে; টাইফুনের পজিশন দোরগোড়ায়, আমার ক্যাশ কাউন্টারে। ল্যুগার বের করে আমি গর্জে উঠলাম, হ্যান্ডস আপ! যে যেখানে যেভাবে আছো হাত তোলো! ইতিমধ্যে স্টেইন বের করে ফেলেছে টাইফুন। সবার চক্ষু ছানাবড়া! গর্জন করে বললাম, কোনো ভামকিবাজি না করে ক্যাশে যা আছে বের করো, মাত্র এক মিনিট সময়, কুইক, কুইক! ডেস্কে বসা ক্যাশিয়ার-কাম-ম্যানেজার লোকটি একটি এনোফিলিস-বিশেষ, তবু চোট আছে তার! একেবারে ঝুনো উল্লুক, রামপাঁঠা। বললে, চাকরি যাবে আমার, প্রাণ থাকতে কিছুতেই ক্যাশ দেব না, যা ইচ্ছে করুন, মেরে ফেলুন! আস্ত উল্লুক একটা! গেলেই হলো চাকরি! চাকরি যাবে আর ইউনিয়ন বসে বসে স্রেফ ধুদুল চষবে, এটা কোনো কথা। কেউ এভাবে ক্যাশ পাহারা দেয়, যাকে বলে নিছক মড়া পাহারা দেওয়াঃ মড়াটাকে আমাদের হাতে তুলে দিলেই সব ল্যাঠা চুকে যায়। ডোন্ট শাউট, টাইফুন গর্জে উঠল, কুইক কুইক, ঝটপট, ড্রাকুলা তুই দশ কাউন্ট করে যা, নয় পার হলেই আমি ব্রাশফায়ার স্টার্ট করব, হ্যারিয়াপ ম্যান, হ্যারিয়াপ! সমানে গুনেই মরবে তবু মাল ছাড়বে না। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে অনুনয়ে ভেঙে পড়ল সুজুকি, প্লিজ ক্যাশিয়ার সাহেব, যা চাচ্ছে দিয়ে দিন, এরা সব পারে, এরা ড্যাকোয়েট! ক্যাশিয়ার-কাম-ম্যানেজার অর্থাৎ পর্বতপ্রমাণ যার গোঁয়ার্তুমি, মাথা নেড়ে বললে, মরতে রাজি আছি আমি! নির্ঘাৎ নাটবল্টু ঢিলা এই লোকটির, বলে কি! ছটফট করে উঠল সুজুকি। এসে কান্না কান্না ভাব নিয়ে বললে, আমাদের ভ্যালুয়েবল লাইফ নিয়ে ছেলেখেলা করার কোনো রাইট নেই আপনার, দিয়ে দিন যা চাচ্ছে, আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে, ওহ-নো, প্লিজ! ফাইন অ্যাকটিং, রাফ র‌্যাংলার প্যান্টে টেরিফিক লাগছিল ওকে, নটিগার্ল! এবারে সত্যি সত্যিই হেঁচকি তুলে কেঁদে ফেললে সুজুকি, এই লোকটির জিদের জন্য আমাদের মরতে হবে, উ ম্যাগো। আশ্চর্য, লোকটি তখনো অনড়। বিজ্ঞের মতো বললে, জিদ না থাকলে বাংলাদেশ কোনো দিন স্বাধীন হতো, এ্যাঁ! লেব্বাপ, বলে কি লোকটা, যেন ওই এনোফিলিসটাই ইন্ডেপেডেন্স এনেছে। অগত্যা কাউন্টিং ্লো করতে হলো। বল্টুটা একটা ভাবদা মাছ, ননসেন্সটার বুদ্ধি সব সময় একটু দেরিতেই খোলে। সত্যি, মেয়েরা আমাদের তুলনায় ঢের বেশি শার্প, যেমন সুজুকি, ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীমাভো বন্দরনায়েক, শ্রীমতী গোল্ডামায়ার। এই সেঞ্চুরিতে টেরিফিক প্রগ্রেস করেছে মেয়েরা। ওরা অনেক অ্যাডভান্স। সুজুকিকে টপে তুলতে হবে, খুবই শার্প, খুবই শার্প ওর ব্রেন। আমার কাউন্টিং যখন আট পর্যন্ত তখন তড়াক করে লাফিয়ে উঠল বল্টু, উঠেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললে, এরা হাইজ্যাকার, বিদায় করুন এদের, এই বলে নিজের হাতেই হড়াম করে ড্রয়ারে টান দিল সে। ড্রয়ারে এক বান্ডিল নোট, শকুনটার বুকে ল্যুগারের নল ঠেকিয়ে বান্ডিলটা পকেটে ভরে নিলাম ঝটিতি, টাইফুন তখন দোরগোড়ায় পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে। কোনো বাধা দিল না ক্যাশিয়ার-কাম-ম্যানেজার, দাঁড়িয়ে রইল হাবার মতো, আশ্চর্য! হয়তো মনে মনে এতক্ষণ এটাই চাচ্ছিল এনোফিলিসটা। চাচ্ছিল সবকিছু নিজেদের হাতেই আমরা করি, তাতে ওর স্যানিটি বজায় থাকে, চাকরির ব্যাপার যখন! খুব ভালো করেই আমরা এসব সাইকোলজি বুঝি। সেলসম্যান তিনজন আড়চোখে দেখতে লাগল আমাদের, ভাবলেশহীন। ওদের আমরা গ্রাহ্যের মধ্যেই আনি না। ওরা প্রলেতারিয়েৎ, বুর্জোয়াবাস্টার্ডদের জন্য কোন দুঃখে মরতে যাবে! সমাজতন্ত্রের সঙ্গে কথাবার্তা সব পাকাপাকি, এখন শুধু শামিয়ানা খাটিয়ে ভেঁপু বাজিয়ে বিরিয়ানি খাইয়ে ঘটা করে ঘরে তোলার অপেক্ষা। ডেস্ক কাউন্টারের ওপরে হাত রেখেছিল শালার মসকুইটো, হয়তো ভুলক্রমেই, আঙুলগুলো থেঁতলে দিলাম। বললাম, কোনোরকম শাউটিং করবে না গুদামবাস্টার্ড, ছাতুছানা করে দেব, উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকো। যন্ত্রচালিতের মতো সবাই তাই করল। বল্টু ডিনামাইট আর সুজুকিই অবশ্য এ ব্যাপারে বেশি উদ্যোগী। ডিনামাইটের মুখ যাকে বলে একেবারে ম্যাড়ামার্কা, এখন কে বলবে জুডোকারাটের এক্সপার্ট ছোকরা ও। স্যুপার্ব, এইমিংয়ে ওর জুড়ি নেই, প্রয়োজন হলে দু-দশজনকে একাই ঘায়েল করে দেয় ডিনামাইট। সে যাক। আমি আর টাইফুন বেরিয়ে এলাম। পঞ্চাশ গজ দূরে একটা লাল টয়োটা দাঁড় করানো ছিল আমাদের-ভুশ্‌। ঝড়ের বেগে কেটে পড়লাম। ন্যুমার্কেটের গেটে গাড়িটাকে পার্ক করে সরে পড়লাম দুজন, এখন আর কোনো প্রয়োজন নেই ওটার, খেল খতম। এসব জিনিস ল্যাংবোট করার কোনো মানে হয় না, ভীষণ রিস্কি, যেকোনো সময় ধরা পড়ার চান্স থাকে। খেয়াল করে দেখেছি গাড়িওয়ালারা নিজেদের গাড়িকে কেপ্টের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আমিই ওয়ার্ল্ডের একমাত্র ব্যতিক্রম, গাড়ির ব্যাপারে আমার কোনোরকম স্মবারি নেই, ভাবালুতা নেই। থাকলে থাকল, গেলে গেল, আছে একখানা ইসুজু ব্যালেট, এই পর্যন্তই! সুজুকি অবশ্য গাড়ির ব্যাপারে ফুললি কনশাস, নতুন মডেলের প্রতি ওর দারুণ ফ্যাসিনেশন। যে যাই বলুক সুজুকি কিন্তু টেরিফিক মেয়ে। ডিনামাইট বলে টম্বয়, টাইফুন বলে ভোলাপচুয়াস, আর আমি বলি আমাদের দেশে এমন ফরোয়ার্ড মেয়ে, ভাবাই যায় না। এই যে ছ্যাকড়ামার্কা পুরোনো মূল্যবোধকে ধনাদ্দন ভেঙে দিচ্ছে, এ ব্যাপারে ওর রোল কি ঐতিহাসিক নয়! কবে যে বাংলাদেশের মেয়েরা সবাই সুজুকির মতো হবে! তখন হয়তো আমরা কেউই থাকব না, আমরা শুধু নিজেদের স্যাক্রিফাইস করার জন্য জন্মেছি! তারপর সোজা সাংহাই, এখানেই সকলে সকলের জন্য অপেক্ষা করার কথা। আধঘণ্টাও লাগল না সকলের একত্র হতে। প্রথমে এল সুজুকি, ডিনামাইটের হাতে জুতোর বাক্স। সব শুনলাম ওদের মুখ থেকে। আমরা চলে আসার পর মসকুইটো ব্যাটা বল্টু ও সুজুকিকে উল্টোপাল্টা কথা বলার চেষ্টা করলেও বিশেষ এঁটে উঠতে পারেনি। এ ব্যাপারটা সুন্দরভাবে ম্যানেজ করে দিয়েছে ডিনামাইট। সে একটা রং টেলিফোন নম্বর দিয়ে শান্ত করে বেচারাকে। সে বলেছে, প্রয়োজন হলে এই নম্বরে আমাকে ডাকবেন, আমি সাক্ষ্য দেব, এ ব্যাপারে আপনি যে কত হেল্পলেস ছিলেন স্বচক্ষেই তো তা দেখেছি। একটা ব্যাপার আছে এখানে। বল্টু, সুজুকি আর ডিনামাইটের মধ্যে কোনো মিকসাপ্‌ করানো হয়নি। যা-ই হোক, সকলের সামনে টাকার বান্ডিলটা বের করা হলো, হোপলেস, মাত্র আড়াই হাজার। রিস্কের তুলনায় একেবারে যা-তা অ্যামাউন্ট। আমাদের সকলের মুখ কালো হয়ে গেল। পুওর সুজুকি, এমন মেয়ের মুখ কালো দেখা যায় না। কিন্তু আমার কী দোষ, আমার তো কোনো হাত নেই এতে! কী আমি করতে পারি, কী এমন করতে পারে ড্রাকুলা। ড্রাকুলা শুধু পারে-না থাক!

বিশ্ববাসীর প্রতি
কী আশ্চর্য! আমি এসব লিখছি কেন, এত দিন পরে হঠাৎ আজ এ কথা মনে উদয় হয়েছে, কী এমন প্রয়োজন এসবের। ভাবালুতাকে আমি ঘৃণা করি, ভাবালু ভাবালুতা, ফাকাপ ভাবালুতা, হেট করি ন্যাকামিপনাকে। কৃতকর্মের জন্য আমার মনে তো কোনো রকমের কোনো খেদ নেই, কোনো আক্ষেপ নেই, তবু কেন এসব। নির্বিকারচিত্তে আমি একাধিক মার্ডার করেছি, প্রয়োজন হলে আরও করব; মেরুদণ্ডহীনদের বেঁচে থাকা আর না থাকা সমান। মাছি মেরে হাত গন্ধ করা, এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু লিখছি কেন এসব। আমি অনেক ভেবে দেখেছি, আমাদের কথা বিশ্ববাসীর জানা দরকার। পতন আমাদের অবধারিত, পাকিস্তানি বাহিনীর পতন যেমন অমোঘ ছিল, আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব। বেশি কিছু নয়। ডিসিশনে একটু ভুল কিংবা একটু অসাবধানতা এই-ই তো আমাদের জন্য এনাফ। সত্যি আমাদের কথা বিশ্বাসীর জানা দরকার। হে মহান বিশ্ববাসী শোনো, আমরা তোমাদেরই নষ্ট সন্তান, আমাদের বুকে নিদারুণ জ্বালা, কোনো হুইস্কি-ব্রান্ডি এ জ্বালা নেভাতে পারে না, ঈশ্বরের খেয়ালখুশি চরিতার্থ করার জন্য আমরা জন্মেছি। আমি মনোয়ার হোসেন ছিলাম, ঈশ্বরের খেয়াল আমাকে ড্রাকুলা করেছে। এভাবে গিয়াস হয়েছে ডিনামাইট, মজিদ হয়েছে বল্টু, তৌফিক হয়েছে টাইফুন, আর রেবা সুজুকি। মনোয়ার, রেবাকে এভাবে হত্যা করল কে? হে ঈশ্বর তোমার দুর্দান্ত খেয়াল! আমি একে শয়তানি বলব! ঈশ্বরের শয়তানি! হে মহান বিশ্ববাসী শোনো, অনেক কষ্ট ভোগ করে গেলাম আমরা, অনেক জ্বালা, কেননা শত চেষ্টা করেও আমরা সুস্থির হতে পারিনি। আমি ড্রাকুলা হতে চাইনি! আমি ড্রাকুলা হতে চাইনি।

কী ভালোবাসি
ইন্টিমেন্ট কোলোন, ফিল্টার টিপড ক্র্যাভেন, রনসন লাইটার, রোলিংস্টোনের রেকর্ড, ব্ল্যাকজনি, পাইথনের চামড়ার বেল্ট, রেডইন্ডিয়ানমুখো স্টার্লি রিং, ল্যুর্গার, সিলভিক্রিম হেয়ার অয়েল, রেবেন সানগ্লাস, টিসট ঘড়ি-আমি এসব ভালোবাসি! জানি না! এসব তো ভালোবাসার জিনিস নয়, প্রয়োজনের জিনিস। প্রয়োজন আর ভালোবাসা এক কি না আমার তা জানা নেই। না থাকলেও আমি নিঃসন্দেহ এ ব্যাপারে, এসব ভালোবাসার সামগ্রী নয়। একসময় মাকে বোধহয় ভালোবাসতাম। লুলু, আমার ছোট বোনটাকেও। মিক্সডপার্টি এসিড, এসবে ডুবে আছে এখন লুলু, ওকে পাওয়াই যায় না। ওর বয়ফ্রেন্ডটাকে একটুও পছন্দ নয় আমার, ওর ভাবসাবে লোকদেখানোর একটা গুরুতর প্রচেষ্টা আছে, সিলি! মা আর লুলু দুজনকেই এখন আমার ভীষণ ভালগার লাগে। কী জানি কেন! ভালোবাসা জিনিসটা আসলে কী? সুজুকি যেমন বলে, ভীষণ ভালোবাসি! এলিজাবেথ আর্ডেনের মেকআপের প্রসঙ্গে কিংবা ফ্রেঞ্চ ফিল্ম কিংবা ফ্রেঞ্চ পারফিউমের প্রসঙ্গেও তাই, অর্থাৎ ভীষণ ভালোবাসি! নিজেকে উপভোগ করার ভেতরে একধরনের নির্বোধ আনন্দ আছে, মঙ্গোলিয়ানদের চেহারার মতো চোখ-নাক বোজা আনন্দ। কিন্তু সে আর কতটুকুই বা! বেঁচে থাকার জন্য এ আনন্দ কি যথেষ্ট? জানি না। তবে হ্যাঁ, নিজেকে কষ্ট দেওয়ার ভেতরেও তীব্র আনন্দ আছে, রিয়েলি টেরিফিক এ আনন্দ! এই আনন্দকেই কি আমি ভালোবাসি? জানি না! জানি না!

ড্রাকুলা ও মনোয়ার
আমার মনে পড়ে মনোয়ারকে। এ একধরনের শোক, মৃত মানুষের জন্য শোক। সত্যি এটা একটা টেরিফিক অভিজ্ঞতা; নিজেকে হত্যা করে সেই নিহতের জন্য কষ্ট পাওয়া, মন্দ কি! ড্রাকুলা মনোয়ারের জন্য কষ্ট পাক, এই কষ্টই তাকে সত্যিকারের ড্রাকুলার পথে নিয়ে যাবে। অবশ্য মনোয়ার ড্রাকুলা হতে চায়নি, মনোয়ার চেয়েছিল মার্কুইস দ্য সাদ হতে। এটা টাইফুনের বজ্জাতি। টাইফুনটা একটা কুত্তার বাচ্চা। ইমপোটেন্ট টাইফুন। ড্রাকুলা নামের প্রস্তাবটা ওরই ছিল, ও জানত ব্যক্তিগতভাবে আমি মার্কুইস নামটাই বেশি পছন্দ করি। অদ্ভুত কমপ্লিকেটেড ওর ক্যারেকটার, যা হয় ইমপোটেন্টদের। সাংঘাতিক ক্লিকি। দারুণ অভিনয় জানে কুত্তার ছাওয়ালটা। মেয়েদের ব্যাপারে ওর ভূমিকা সেন্টের মতো, কেননা এ ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই ওর। কিন্তু সুজুকি ও বল্টুর মতো নাদামাদা গুড-ফর-নাথিংয়ের পক্ষে এতটা বাড়াবাড়ির পেছনে নিশ্চয়ই কারও চতুর হাতের কলকাঠি নাড়ানোর ভূমিকা আছে। এই তো সেদিন সকলের চোখের সামনে সুজুকিকে প্রেজেন্ট করলে বল্টু বিশ্রী কতগুলো জিনিস। যেমন, ল্যাকমে লিপস্টিক, কান্তা সেন্ট, ক্যালিকো রুমাল আর এক বাক্স স্যানিটারি টাওয়েল। সমগ্র পুরুষজাতের মুখে চুনকালি লেপে দিল শুয়োরের বাচ্চা। বাজারে কী না নেই! রেভলঁরে লিপস্টিক, নিনা রিচি শ্যানেল, চেকো্লাভ রুমাল-সবই পাওয়া যায়। আশ্চর্য, সুজুকি হাসিমুখে ওগুলো গ্রহণ করল। ভেবেছিলাম ছুড়ে ফেলে দেবে সকলের চোখের সামনে। কিন্তু ও তা করল না। মেয়েরা সত্যিই এক-একটা চিজ। হয়তো বাড়ির ঝি-চাকরানিদের জন্য জিনিসগুলো নিল সে, কিন্তু রুচি বলে একটা কথা আছে। যে মেয়ে এলিজাবেথ আর্ডেনের কসমেটিক ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করে না, যে মেয়ে ফ্রেঞ্চ পারফিউম ছাড়া অন্য কিছু চেনে না তার কাছে এসব অপ্রত্যাশিত। মেয়েদের নিজস্ব গ্রামারে স্থূলরুচির কুমড়োরাই সবচেয়ে ভালো মক্কেল, ভালো অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত পা-চাটা ক্রীতদাস। ভাবতে পারি না, হলিক্রসে পড়া সুজুকির মতো অমন আপস্টার্ট মেয়ে কী করে একতাল ষাঁড়ের গোবরকে সকলের চোখের সামনে আশকারা দেয়। পাছাভারী পুরুষ আমার দুচোখের বিষ। ইচ্ছে করে একধারসে এগুলো বেছে বেছে লাথি মারি। ভারী পাছা দুলিয়ে বল্টুব্যাটা যখন হাতে ‘পাইপটিপাইপ’ (বল্টুর উচ্চারণ)-এর প্যাকেট নিয়ে মচর মচর করে হাঁটে, তখন রক্ত গরম হয়ে যায় আমার, একটা ক্যাপসুলই কুমড়োটার জন্য যথেষ্ট। বল্টু-জীবনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ঘটনা ‘ববি’, ওর মতে ‘ওয়ার্ল্ডের মধ্যে বেস্ট’। শুয়োরের বাচ্চা! কিন্তু আসল কালপ্রিট কে? টাইফুন। ডিনামাইট আর ড্রাকুলাকে কোণঠাসা করে ও আনন্দ পায়, লেডিকিলার হিসেবে এই দুজনেরই সুনাম আছে, সুদর্শন তো বটেই। টাইফুনই মদদ জোগাচ্ছে ওদের। ওর সব অভিসন্ধিই কূট। ওর টার্গেট ড্রাকুলা আর টাইফুন। কিন্তু টাইফুন, মনে রেখো কমরেড মনোয়ার যদি ড্রাকুলা হতে পারে, ড্রাকুলার মাকুêইস হতে কতক্ষণ! সাবধান বন্ধুরা। বিভীষণের জাগরণ তোমরা দ্যাখোনি! সাবধান বন্ধুরা! মাকুêইস! মাকুêইস। ওই যে ডিভাইন মাকুêইস!
এলিফ্যান্ট রোডের এক পরিচিত গ্যারেজে গাড়িটাকে রেখে মনোয়ার ওরফে ড্রাকুলা বেরিয়ে এল। পিঠেপিঠি কয়েক দিন থেকে ট্রাবল দিয়ে আসছে গাড়িটা। বিরক্তি ধরে গেছে মনোয়ারের, থরো চেকাপ দরকার, সার্ভিসিংও হয়নি বহুকাল। কয়েক দিন থেকেই মন ভালো যাচ্ছে না মনোয়ারের। মন ভালো না থাকলে সাধারণত সে ডায়েরি লেখে। মন ভালো না থাকলেই সে মৃত্যুর গন্ধ পায়, দ্রুত লেখালেখি শুরু করে।
ডায়েরি লেখা তাকে মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি দেয়।
ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্র, মাথার ঠিক ওপরে গনগনে সূর্য; এত আলো ঠিক বরদাশত হয় না মনোয়ারের। চারপাশের সব দৃশ্য তার চোখে বিসদৃশ মালুম হয়; এলোমেলো, ছড়ানো-ছিটানো, বিশৃঙ্খল।
পায়ে পায়ে হাঁটতে থাকে মনোয়ার। মানুষজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বিজাতীয় ঘৃণায় তার গা গোলায়, কী নির্বিকার, কী ভরপুর! এদের এত সুখের উৎসটা কী! কৃমিকীট! কৃমিকীট!
পকেটের ল্যুগারের কথা মনে পড়ে। ল্যুগার দ্রুত উত্তেজিত করে ফেলে তাকে। ট্রাফিক আইল্যান্ডের ওপর দাঁড়িয়ে একটা একটা করে এই নির্বোধ ও নেড়িকুত্তার মতো মানুষগুলোকে খতম করে দেওয়ার কথা মনে তোলপাড় করে।
এমন একটা চেহারা নেই, যাকে বলা যায় আপসহীন। মেরুদণ্ডহীন ক্রীতদাসের পাল কিলবিল করছে চতুর্দিকে।
মনোয়ারের দৃঢ়বিশ্বাস এদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই, কেননা এদের অস্তিত্ব পৃথিবীকে এক ইঞ্চিও এগিয়ে দেবে না।
ন্যাতাকাগজ কুড়োনো এক ন্যুব্জপৃষ্ট বৃদ্ধ পিঠে বস্তা নিয়ে হুঁটরে হুঁটরে এগিয়ে চলেছে। বৃদ্ধের সারা গায়ে থুকথুকে চর্মরোগ। ওকে শান্তি দিতে পারে একটি ক্যাপসুল, মনোয়ার মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করে গাল দেয় বৃদ্ধকে।
ছেলে নিয়ে একটি মধ্যবয়েসী ঢ্যাঙা লোক বিমর্ষ মুখে হেঁটে চলেছে, কাঁধে বোঁচকা, টুনুর টুনুর করে পেছনে পেছনে ছুটছে তার পরিবার, মুখ ঘুরিয়ে নেয় মনোয়ার নিদারুণ বিতৃষ্ণায়।
আজ তার হত্যা করার ইচ্ছা ভয়ানক তীব্র। টাইফুনের ধারণা এ ব্যাপারে তার হাত এখনো কাঁচা। এ পর্যন্ত মোট বারোটা স্কোর করেছে টাইফুন, মনোয়ার মাত্র তিনটা। এই একটা ব্যাপারে সে পিছিয়ে আছে, মনোয়ারের মতো মাস্টার ডিগ্রি তার নেই। মনোয়ার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, আজ থেকে নতুন করে হত্যাভিযান শুরু করবে সে, টাইফুনের মতো পেছন থেকে মেরে অন্ধকারে হাওয়া হয়ে যাওয়া নয়, মার্কুইসের মতো! বীভৎস হত্যাকাণ্ড চালাতে হবে তাকে, মনোয়ার মনে মনে পুলকে শিউরে ওঠে, প্রথমে একটা ক্যাপসুল, তারপর একটু একটু করে তার রক্ত পান করা, তারপর তার শরীরের বিশেষ কতগুলো অংশকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
দুনিয়ার মানুষকে নিদারুণ হাস্যকর এক জীব বলে মনে হতে থাকে মনোয়ারের। ডিনামাইট ফাটিয়ে ফালতু কর্মকাণ্ডে মুখর গোটা বিশ্বের মাথার খুলি উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। দাঁত কিড় কড় করতে থাকে মনোয়ারের, সে হিংস্র হয়ে যায়।
পায়ে পায়ে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হাঁটছিল মনোয়ার, ভেতরের দাঁতাল হিংস্রতা প্রতি মুহূর্তেই খোঁচা মারছিল তাকে। একটা রিকশা নেওয়া দরকার, মনে মনে সে ভাবল, একটা রিকশা ধরে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলে হয়। শাহবাগ মার্কেটের সামনে এসে সে দাঁড়াল। কোনো রিকশা নেই, গাড়ির অভাব এই সময় তীব্রভাবে পীড়া দেয়। টকটকে লাল শার্ট গায়ে একটি উষ্কখুষ্ক মেয়ে তার পাশ কাটিয়ে স্টেশনারি দোকানে ঢুকল। কাঁধে ঝোলাওয়ালা মেয়েটির চমৎকার স্বাস্থ্য, যে স্বাস্থ্য মানুষের সমস্ত দুঃখকে ভুলিয়ে দেয়। ভীষণ আনমনা হয়ে যায় মনোয়ার। কোথাও যেন একটা মিল আছে এর সুজুকির সঙ্গে। এর চালচলনে এমন একটা তাচ্ছিল্যের ভাব আছে, যা বিশেষ কোনো আদর্শ বা রীতিনীতি থেকে সাধারণত জন্মায়। হয়তো আর্ট স্কুলের ছাত্রী। মনোয়ার মনে মনে মার্কুইস দ্য সাদ হয়ে যায় এক মুহূর্তে।
ছয়-সাত বছরের ন্যাংটো একটি স্ট্রিটআর্চিন মনোয়ারের সামনে এসে দাঁড়ায় এই সময়, তার কোমরে পেতলের ঘুণ্টি ও কড়ি ঝোলানো। ওকে একনজর দেখে নিয়ে অকারণে ফিক করে হাসে।
বাচ্চাটির ময়লা মুখের দুষ্টুমির ছাপ সমস্ত রৌদ্রকে নিঃশব্দে ঝলসে দিচ্ছে, নজর এড়ায় না মনোয়ারের।
হঠাৎ চুনচুন করে তার চোখেমুখে কিছুটা পানি এসে লাগে, মনোয়ার চমকে ওঠে; যন্ত্রের মতো তার হাত চলে যায় ল্যুগারে।
বেলুনের ভেতর পানি ভরে মহানন্দে এই অপকর্মটি করে বেড়াচ্ছে শয়তানের ছাওয়ালটা। পা থেকে মাথা অবধি রি রি করে জ্বলে যায় মনোয়ারের; একটা ধমক মেরে প্রায় লাফিয়ে পড়ে সে বাচ্চাটির দিকে, ঘেটি ধরে এক আছাড় দেবে। কিন্তু পারে না, খিলখিল করে হেসে এক দৌড়ে সে পালায়। তারপর আবার চাপ দেয় বেলুনে, ফলে আর এক পশলা বৃষ্টি হয়। নির্বোধ শিশুর সারল্যে তার মুখ এমনই উজ্জ্বল যে মনোয়ারের হাবার মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।

সূত্রঃ প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০৫, ২০০৮

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *