হযরত আলী ও ফাতিমার বিবাহ

ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম যুহরীর বরাতে আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, হিজরী ২য় সালে তিনি ফাতিমাকে সহধর্মিণী রূপে নিজ ঘরে তুলে আনেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা) বলেন, : বদর যুদ্ধের গনীমত থেকে আমার অংশে একটি উট পাই। ঐ দিন নবী করীম (সা) ফায়া’ থেকে প্রাপ্ত এক-পঞ্চমাংশ থেকে আরও একটি উটি আমাকে প্ৰদান করেন। এরপর যখন আমি নবী দুহিতা ফাতিমাকে স্ত্রী রূপে নিজ ঘরে তোলার সংকল্প করলাম, তখন বনু কায়ানুকার এক ইয়াহুদী স্বর্ণকারকে ঠিক করলাম যে, তাকে নিয়ে ইযখির ঘাস সংগ্ৰহ করবো এবং পরে তা স্বর্ণকারীদের নিকট বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ আমার বিবাহের ওলীমায় খরচ করবো। এ উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে আমি আমার উট দুটোর জন্যে গদি, বস্তা ও রাশির ব্যবস্থা করছিলাম। উট। দুটোকে আমি জনৈক আনসারীর বাড়ীর পার্শ্বে বসিয়ে রাখি। আমার যা কিছু সংগ্ৰহ করার তা সংগ্রহ করে নিয়ে এসে দেখলাম, উট দুটোর কুজ কেটে ফেলা হয়েছে এবং উভয় উটের বক্ষ বিদীর্ণ করে কলিজা খুলে নেয়া হয়েছে। এ দৃশ্য দেখে আমি আমার অশ্রু সংবরণ করতে

পারলাম না। আমি নিকটস্থ লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, এ কাজ কে করেছে? তারা জানাল, আবদুল মুত্তালিবের পুত্ৰ হামযা এ কাজ করেছেন। এখন তিনি এ ঘরের মধ্যে আনসারদের কিছু মদ্যপায়ীদের সাথে মদপান করছেন। সেখানে তার সাথে আছে তার গায়িকা দাসী ও কতিপয় সঙ্গী-সাখী। গায়িকাটি গানের ছন্দে বলেছিল, “ওহে হামযা! মোটাতাজা উদ্ভুদ্বয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া।” এ কথা শুনে হামযা তলোয়ার হাতে উটি দুটোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওগুলোর কুজ কেটে নিলেন আর তাদের তখন পেট চিরে কলিজা বের করে নিয়ে আসলেন। হযরত আলী বলেন, আমি তখন নবী করীম (সা)-এর নিকট চলে গেলাম। তখন তার কাছে যায়দ ইবন হারিছ। উপস্থিত ছিল। আমাকে দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন যে, আমি কোন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হয়েছে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজকের ন্যায় বেদনাদায়ক ঘটনার সম্মুখীন আমি কখনও হইনি। হামযা আমার উট দুটোর উপর জুলুম করেছেন। তিনি উটি দুটির কুজও পেট কেটে ফেলেছেন। এখন তিনি ঐ ঘরের মধ্যে একদল মদ্যপায়ীর সাথে অবস্থান করছেন। তখন নবী করীম (সা) তার চাদরখানা চেয়ে নিলেন এবং তা গয়ে দিয়ে সেদিকে রওনা হলেন। আর আমি ও যায়দ ইবন হারিছা তাকে অনুসরণ করে চললাম। হেঁটে হেঁটে তিনি ঐ ঘরের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন যে ঘরে হামযা অবস্থান করছিলেন। তিনি অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে ভিতরে প্রবেশ করে তিনি হামযাকে তার কৃতকর্মের জন্যে ভৎসনা করতে লাগলেন। হামযা তখন নেশাগ্ৰস্ত। চোখ দুটো লাল। তিনি নবী করীমের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। তারপর দৃষ্টি উপরে উঠিয়ে তার হাঁটুর দিকে তাকালেন। এরপর দৃষ্টি আরও উপরে উঠিয়ে তার চেহারার দিকে তাকালেন এবং বললেন, তোমরা তো আমার পিতার গোলাম। একথা শুনে নবী করীম (সা) বুঝলেন যে, হামযা এখন নেশাগ্ৰস্ত। তাই তিনি পেছনের দিকে হেঁটে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। আর আমরাও তাঁর সাথে বেরিয়ে আসলাম। W

ইমাম বুখারী কিতাবুল মাগাষীতে ঘটনাটি এ ভাবে বর্ণনা করেছেন। মাগাষী ছাড়া বুখারী শরীফে আরও বহু স্থানে বিভিন্ন শব্দমালায় এ ঘটনার বর্ণনা আছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে বদর যুদ্ধের গনীমত থেকে খুমুস বা পঞ্চমাংশ বের করা হয়েছিল। কিন্তু আবু উবায়দ কাসিম ইবন সাল্লাম কিতাবুল আমওয়াল গ্রন্থে বলেছেন যে, বদর যুদ্ধের গনীমত বণ্টনের পর খুমুসের বিধান অবতীর্ণ হয়। তবে অনেকেই এ মতের বিরোধিতা করেছেন। যেমন ইমাম বুখারী, ইবন জারীর প্রমুখ। আমরা তাফসীর গ্রন্থে এবং এই কিতাবেও ইতোপূর্বে এ মতটি যে ভুল তা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এ ঘটনায় হামযা ও তার সঙ্গীদের মদ্যপান প্রশ্নে বলা হয়েছে যে, তখনও মদ্যপান নিষিদ্ধ হয়নি। তদুপরি হযরত হামযা (রা) উহুদ যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন। আর মদ্যপান নিষিদ্ধ হয় উহুদ যুদ্ধের পরে। এ হাদীছ থেকে দলীল গ্রহণ করে আলিমগণ বলেছেন যে, নেশাগ্ৰস্ত লোকের জ্ঞান রহিত হয়ে যায়–এ কারণে তালাক ১ স্বীকারোক্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তার কথা অগ্রাহ্য করা হয়। ফিকহ শাস্ত্রে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত রয়েছে। ইমাম আহমদ (র) সুফিয়ানের বরাতে… আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। আলী (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যাকে বিবাহ করার জন্যে তাঁকে প্রস্তাব দেয়ার সংকল্প করলাম। কিন্তু মনে মনে ভাবলাম আমার তো কোন অর্থ-সম্পদ নেই। কিছু দিন পর পুনরায় সংকল্প করলাম

এবং তাঁর নিকট এসে প্রস্তাব দিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কোন অর্থ-সম্পদ আছে কি? আমি বললাম, নেই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমি তোমাকে ঐ দিন যে খিতমী বর্মটি দিয়েছিলাম তা কোথায়? আমি বললাম, সেটি তো আমার কাছেই আছে। তিনি বললেন, আমার নিকট নিয়ে এসো। এরপর আমি সে বর্মটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট পৌছিয়ে দিলাম। ইমাম আহমদ তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে এ ভাবেই বর্ণনা করেছেন। তবে এর সনদের মধ্যে একজন অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী রয়েছেন। আবু দাউদ ইসহাক ইবন ইসমাঈল সূত্রে… ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেনঃ হযরত ফাতিমার সাথে আলীর বিবাহ হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেনঃ ফাতিমাকে (মহর হিসেবে) কিছু দাও! আলী (রা) বললেন, আমার কাছে দেয়ার মত কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তোমার খিতমী বর্মটি কোথায়? এ হাদীছ ইমাম নাসাঈ। হারূন ইবন ইসহাক সূত্ৰে… আইয়ুব সাখতিয়ানী থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাউদ কাহীর ইবন উবায়দ হিমসী সূত্রে. জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আলীর সাথে ফাতিমার বিবাহ হয়ে যাওয়ার পর আলী তাকে বাসর ঘরে নিয়ে আসতে মনস্থ করেন। কিন্তু ফাতিমাকে কিছু না দেয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ তা করতে নিষেধ করেন। আলী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কাছে তো তেমন কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমার বর্মটি দিয়ে দাও। এরপর আলী তাঁর বর্মটি ফাতিমাকে প্ৰদান করার পর বাসর ঘরে যান।

ইমাম বায়হাকী তাঁর ‘দালাইল গ্রন্থে আবু আবদুল্লাহ হাফিয-এর মাধ্যমে. মুজাহিদ সূত্রে আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। হযরত আলী (রা) বলেন, : রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট ফাতিমা বিবাহের প্রস্তাব আসে। তখন আমার এক দাসী আমাকে বলল, আপনি কি জানেন রাসূলুল্লাহর কাছে ফাতিমার বিবাহের প্রস্তাব এসেছে? আমি বললাম, তা তো জানি না। দাসী বলল, হ্যা তার সম্পর্কে প্রস্তাব এসেছে। আপনি কেনো রাসূলুল্লাহর নিকট যাচ্ছেন না? আপনি গেলে তিনি আপনার সাথেই ফাতিমাকে বিবাহ দিবেন। আমি বললাম, আমার কাছে তো তেমন কিছুই নেই, যা দিয়ে বিবাহ করতে পারি। দাসী বললো, আপনি গেলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আপনার সাথে তাঁকে বিবাহ দিবেন। হযরত আলী বলেন, দাসীর বারবার অনুরোধে অবশেষে আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট গেলাম। কিন্তু যখন তাঁর সম্মুখে গিয়ে বসলাম, তখন আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। আল্লাহর কসম! তাঁর প্রভাব ও ভয়ে আমি কোন কথাই বলতে পারলাম না। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এসেছ, তোমার কোন প্রয়োজন আছে কি? আমি চুপচাপ বসে থাকলাম। এরপর তিনি বললেন, সম্ভবত তুমি ফাতিমাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়ার জন্যে এসেছ! আমি বললাম, জী হাঁ্যা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তোমার কাছে কোন মাল আছে–যা মহরানা হিসেবে প্ৰদান করে তাকে হালাল করে নেবে? আমি বললাম। ইয়া রাসূলাল্লাহ। আল্লাহর কসম!! আমার কাছে সে রকম কিছুই সেই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, যুদ্ধান্ত্র হিসেবে তোমাকে আমি যে বর্মটি দিয়েছিলাম, তা কী করেছ? কসম আল্লাহর! সেই খিতামী বর্মটির মূল্য হবে চার দিরহাম। আমি বললাম, সে বর্মটি আমার নিকট আছে। এরপর

১. হানাকী মাযহাব অনুসারে নেশাগ্ৰস্ত ব্যক্তির তালাকও কার্যকরী হয়ে যায়।–সম্পাদকদ্বয়

রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফাতিমাকে আমার সাথে বিবাহ দিলেন এবং বললেন, বর্মটি তার নিকট পাঠিয়ে দাও। এতে সে তোমার জন্যে হালাল হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা ফাতিমার বিবাহের এটাই ছিল দেনমহর।

জন্মগ্রহণ করেন। পুত্রত্ৰয় হচ্ছেন হাসান, হুসাইন ও মুহসিন। কিন্তু মুহসিন শিশুকালেই ইন্তিকাল করেন। আর কন্যাদ্বয় হলেন উম্মে কুলছুম ও যায়নব। বায়হাকী আতা ইবন সাইব সূত্রে আলী থেকে বর্ণনা করেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফাতিমাকে বিবাহোত্তর বিদায়কালে উপঢৌকন হিসেবে একটি পশমী চাদর, একটি পানির মশক ও ইযখির ঘাসভর্তি একটি চামড়ার বালিশ প্ৰদান করেন। ইমাম বায়হাকী আবু আবদুল্লাহ ইবন মানদা রচিত কিতাবুল মাআরিফা’ থেকে উদধতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আলী ফাতিমাকে বিবাহ করেন হিজরী প্রথম সালের পর এবং ঘরে তুলে আনেন। তার পরবতী সালে।

বায়হাকীর বর্ণনা মতে, ফািতমার সাথে আলীর বাসর হয় তৃতীয় হিজরীর প্রথম দিকে। কিন্তু উপরোল্লিখিত উদ্ভুদ্বয়ের ঘটনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, বদর যুদ্ধের অল্প দিন পরেই বাসর হয় এবং সে হিসেবে ২য় হিজরীর শেষ দিকেই হওয়া প্ৰমাণিত হয়।

Print Friendly
%d bloggers like this: