ধৰ্ম্মার্থে সম্পত্তি দান – দশম অধ্যায়

ধর্ম্মকার্য্যে বা দাতব্য কার্য্যে সম্পত্তি দান করিতে পারা যায়। কোন বিগ্রহস্থাপনার জন্য, বা বিগ্রহসেবার জন্য, বা কোনও অতিথিশাল, মঠ, বিদ্যালয়, চিকিৎসালয় প্রভৃতি স্থাপনের জন্য সকলেই সম্পত্তি দান করিয়া যাইতে পারেন।

এইরূপ দান দুইপ্রকারের হইতে পারে :– ক) পারিবাবিক, অর্থাৎ যাহাতে কেবলমাত্র ঐ পরিবারের মেম্বরগণ উপকুত হন, যথা গৃহদেবতাব জন্য মন্দির প্রতিষ্ঠাকল্পে ব; গৃহদেবতার পূজার জন্য কোন সম্পত্তি দান, (খ) সাধারণের উপকারার্থে দান, যথা সাধারণেব জন্য পেন ও দিব, মঠ, বিদ্যালয়, চিকিৎসালয় প্রভৃতি স্থাপনকল্পে কোনও সম্পত্তি মন। এই দুইয়ের মধ্যে প্রভেদ এই মে, কোনও পারিবারিক ঠিতার্থে কোনও সম্পত্তি দান করিলে পরিবারের মেস্বরগণ যদি যথেচ্ছরূপে নিজেদের জন্য উহার উপস্বত্ব ব্যয় করেন, তাহা হলে জনসাধারণে তাহাতে আপত্তি করিতে পরিবে না। কোনও পারিবাবিক বিগ্রহের জন্য যদি কোন সম্পত্তি দান করা যায়, তাই হইলে পরিবারের মেম্বরগণ একত্র মিলিয়া ঐ সম্পত্তি অন্য কোন কার্য্যে ব্যয় করিতে পারেন (কনোয়ার ব: রাম, ২ কলিকাতা ৩৫১ প্রিভিকৌন্সিল); অথবা ঐ মেম্বরগণ মিলিয়া যাহাতে নিয়মিতরূপে ঠাকুরসেবা হয় এই উদ্দেশ্যে ঐ গৃহদেবতাটী অন্য কোনও পরিবারকে দান করিতে পারেন (ক্ষেত্র বঃ হরিদাস, ১৭ কলিকাতা ৫৫৭)। কিন্তু ঐ বিগ্রহ যদি সাধারণের সম্পত্তি হইত তাহা হইলে এইরূপ হস্তান্তর করা কোনমতেই চলিত না।

ধৰ্ম্মার্থে সম্পত্তি দান করিতে হইলে নিম্নলিখিত বিধানগুলি পালন করিতে হইবে –

(১) যিনি সম্পত্তি দান করিতেছেন, তিনি ঐ সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে এবং চিরকালের জন্য দান করিয়া দিবেন, তিনি ঐ সম্পত্তির কোনও অংশ অথবা উহার উপস্বত্ব আর নিজে ভোগ করিতে পারিবেন না।

(২) দ্বিতীয়তঃ, সম্পত্তিটা প্রকৃতপক্ষে এবং স্পষ্ট ভাষায় দান করিতে হইবে; শুধু যদি একটী মন্দিরের নামে কোনও সম্পত্তি খরিদ করা হয়, এবং দেখা যায় যে, খরিদদার সম্পত্তির উপস্বত্ব নিজেই ভোগ করিতেছেন, তাহা হইলে উহা মন্দিরের সম্পত্তি বলিয়া গণ্য করা যাইবে না। ঐ সম্পত্তিটা প্রকৃতপক্ষে মন্দির কে দান করিতে হইবে, এবং দাতা উহার কোনও উপস্বত্ব গ্রহণ করিবেন না; তবেই উহা মন্দিরের সম্পত্তি হইবে। নচেৎ উহা দানকৰ্ত্তার নিজ সম্পত্তি বলিয়া গণ্য হইবে, এবং তাহার দেনার দায়ে বিক্রয় হইয়া যাইতে পরিবে (ব্রজসুন্দরী বঃ লছমী, ২০ উইক্‌লি রিপোর্টার ৯৫)। সেইজন্য, কোনও লিখিত অপর্ণনাম থাকিলে দান সম্বন্ধে উত্তম প্রমাণ হয়।

(৩) কোনও নিদিষ্ট বস্তুর উদ্দেহে সম্পত্তি দান করা প্রয়োজন। “আমি এই সম্পত্তি ধৰ্ম্মকার্য্যে দান করিয়া গেলাম” এইরূপে দান করিলে চলিবে না, কারণ ‘ধৰ্ম্মকাৰ্য্য’ বলিলে তাহার কোনও নিদিষ্ট অর্থ হয় না (২৩ বোম্বাই ৭২৫ প্রিভিকৌন্সিল); সেইরূপ,”আমি এই সম্পত্তি ভগবানের সেবার জন্য দান করিলাম” এইরূপভাবে দান করিয়া দিলেও তাহাতে কোন নিদিষ্ট কাৰ্য্য বুঝায় না (চণ্ডীচরণ বঃ হরিবোলা, ৪৬ কলিকাতা ৯৫১); কোন নির্দিষ্ট কার্য্যে ঐ সম্পত্তির ব্যয় হইবে তাহা স্পষ্ট করিয়া বলা চাই। যাহাকে সম্পত্তি দান করা হইতেছে তাহা কোন নির্দিষ্ট মন্দিরের দেবতা, বা নির্দিষ্ট অতিথিশালা বা মঠ বা বিদ্যালয় বা চিকিৎসালয় ইত্যাদি হওয়া চাই; অথবা কোন নূতন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার জন্য বা নূতন বিদ্যালয়, অতিথিশালা ইত্যাদি স্থাপনের জন্যও দান করা যাইতে পারে। এমন কি, যদি এইরূপ লেখা থাকে যে, সম্পত্তি হইতে কাঙ্গালীভোজন, ব্রাহ্মণভোজন, প্রতিবৎসর দুর্গাপূজা সম্পন্ন হইবে, তাহা হইলেও ঐ দান সিদ্ধ হইবে।

কোনও মনুষ্যকে কোনও সম্পত্তি দান করিতে কইলে এই নিয়ম যে ঐ মনুষ্য বৰ্ত্তমান থাকা চাই; অর্থাৎ যে ব্যক্তি জন্মায় নাই তাহার কোনও সম্পত্তি দান করা যায় না। কিন্তু ধৰ্ম্মার্থে সম্পত্তি দান সম্বন্ধে ঐ নিয়ম প্রয়োজ্য হয় না। কেহ কোনও মন্দির বা বিদ্যালয় বা চিকিৎসালয়ে সম্পত্তি দান করিতে ইচ্ছা করিলে কোন বর্তমান মন্দির বা বিদ্যালয় বা চিকিৎসালয়ে দান করিতে হইবে, এমন কোন কথা নাই। তিনি এরূপ মর্ম্মে দান করতে পারেন যে, তাঁহার সম্পত্তি হইতে ভবিষ্যতে কোনও মন্দির বা বি গ্রহ স্থাপন করে এবং ঐ সম্পত্তির অংশ হইতে উহার পূজার ব্যয় নির্বাহ হইবে। (ভবতিনাথ স্মৃতিতীর্থ ব: রামলাল, ৩৭ কলিকাতা ১২৮ ফলবেঞ্চ)।

পূৰ্ব্বেই লিখিত হইয়াচে যে দানকর্তা যে সম্পত্তি দান কবিবেন তাহা তিনি সম্পূর্ণরূপে দান করিয়া দিবেন, ঐ সম্পত্তির কোনও অংশে তাহার কোনও স্বত্ব থাকিবে না। তবে তিনি বা তাহার পরিবারের মেম্বরগণ বংশানুক্রমে সেবাইত হইতে পারিবেন, এবং সেবাইত স্বরূপ ঐ সম্পত্তি হইতে কিছু কিছু (এমন কি অৰ্দ্ধেক উপস্বত্ব ভরণপোষণ বাবদ পাইতে পারেন (যদুনাথ বঃ সীতারামজী, ৩৯ এলাহাবাদ ৫৫এ প্রিভি. কৌন্সিল)। কিন্তু তাহা বলিয়া ঐ সেবাইত উক্ত সম্পত্তির মালিক বলিয়া গণ্য হইবেন না,ঐ মন্দিরের দেবতা, বা বিদ্যালয় বা অতিথিশাল, বা মঠ ইত্যাদিই সম্পত্তির মালিক বলিয়া বিবেচিত হইবে। সুতরাং সেবাইতের নিজের যদি কোনও দেনা থাকে, তাহা হইলে তাহার জন্য এই সম্পত্তি দায়ী হইবে না। কিন্তু কেহ যদি এই মৰ্ম্মে কোন মন্দিরে সম্পত্তি দান করিয়া যান যে, তাহার বংশীয় ব্যক্তিগণ পুত্রপৌত্রাদিক্রমে সেবাইত হইবে, এবং সম্পত্তির উপস্বত্বের সামান্য অংশ ঠাকুরসেবায় ব্যয় হইয়া বাকী অধিকাংশই সেবাইতের ভরণপোষণনিৰ্ব্বাহের জন্য ব্যয় করা যাইবে, তাহা হইলে আদালত অনুমান করিবেন যে, ঐ ধৰ্ম্মার্থে সম্পত্তি দান একটী উপলক্ষ মাত্র; ঐ সম্পত্তি যাহাতে হস্তান্তরিত না হয় এবং পাওনাদারগণ যাহাতে দেনার জন্য উহা ক্রোক করিতে না পারে এই উদ্দেশ্যেই ঐরূপ দান করা হইয়াছে। এরূপ ক্ষেত্রে ঐ সম্পত্তি মন্দিরের সম্পত্তি বলিয়া গণ্য হইবে না, দাতার নিজের সম্পত্তি বলিয়াই গণ্য হইবে, তাহার মৃত্যুর পর তাহার ওয়ারিশে সাধারণ নিয়মানুসারে বৰ্ত্তিবে, এবং দেনার জন্য ক্রোক নিলামও হইতে পারিবে; এবং সেই সঙ্গে ঠাকুরসেবার জন্য দাতা যে অংশ ব্যয় করিতে বলিয়াছেন তাহাও উক্ত কাৰ্য্যে ব্যয় করিতে হইবে (প্রমথ ব; রাধিকা, ১৪ বেঙ্গল ল রিপোট ১৭৫)।

উত্তরাধিকার

ধৰ্ম্মার্থে প্রদত্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার সম্বন্ধে কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নাই। যিনি সম্পত্তি দান করিয়া যান, তিনি নিজে নিয়ম করিয়া যাইতে পারেন যে, কাহারা ঐ সম্পত্তিতে পর পর সেবাইত হইবেন। অনেক স্থলে একজন সেবাইত, তাহার পরে কে সেবাই ত হইবেন তাহা আদেশ করিয়া যান। অনেক স্থলে প্রথানুসারে সেবাহত নিযুক্ত হইয়া থাকে (২২ কলিকাতা ৮৪৩)। যথা, তারকেশ্বরে এইরূপ প্রথা আছে যে, একজন মোহন্তের পর তাহার শিস্য পরবত্তী মোহন্ত হইবেন। যেস্থলে উক্তরূপ প্রথা বা আদেশ না থাকে, সেস্থলে স্থাবর সম্পত্তিতে যে যে ব্যক্তিগণ পর পর উত্তরাধিকারী হন, সেই সেই ব্যক্তিগণ পর পর সেবাহত হইবেন। ৮ কলিকাতা ল জার্ণল ৬৭০)।

সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা

ঐ সম্পত্তি সম্বন্ধে সেবাইতের বা ট্ৰাষ্টীর ক্ষমতা ঠিক নাবালকের সম্পত্তি সম্বন্ধে ম্যানেজারের ক্ষমতার ন্যায়। তিনি কেবলমাত্র আইমসঙ্গত আবশ্যকতার জন্য ঐ সম্পত্তি হস্তাস্তর করিতে পারিবেন; যথা, মন্দিরের দেবসেবা বজায় রাখিবার জন্য, মন্দিরে মাঝে মাঝে যে সকল উৎসব হয় সেই সকল উৎসবের ব্যয় নিৰ্ব্বাহের জন্য, মন্দির ভগ্ন হইলে তাহার মেরামতের জন্য, ঐ সম্পত্তি রক্ষার জন্য, গবর্ণমেণ্টের রাজস্ব দিবার জন্য, ঐ সম্পত্তি রক্ষার্থে মোকদম চালাইবার জন্য, সেবাইত ঐ সম্পত্তি বন্ধক দিতে বা একাংশ হস্তান্তর করিতে ক্ষমতাপন্ন হইবেন।

নাবালকের সম্পত্তি খরিদ করিবার সময়ে খরিদদারের যেরূপ ত দন্তু করা আবশুক (তৃতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য), সেবাহত বা ট্রাষ্টার নিকট হইতে সম্পত্তি খরিদ করিবার সময়েও তাহার সেইরূপ, তদন্ত করা কৰ্ত্তব্য (হনুমান প্রসাদ ব: বাবুই, ৬ মূর্‌স্‌ ইণ্ডিয়ান আপীলস্ ৩৯৩)।

সেবাইত যদি কোনও সম্পত্তি আত্মসাং করেন, কিংবা নষ্ট কবেন, কিংবা ঐ সম্পত্তি সম্বন্ধে তন্য কোন প্রকার বিশ্বাসঘাতকতার কার্য্য করেন, তাহা হইলে তাঁহাকে দূরীভূত করিবার জন্য দুইজন সাধারণ ব্যক্তি মিলিয়া এডভোকেট জেনারেলের (কলিকাতায়) বা কালেক্টরের (মফঃস্বলে) সম্মতি লইয়া নালিস করিতে পারেন (দেওধানী কার্য্যবিধি আইন, ৯২ ধারা)।

অন্যান্য কথা

ধৰ্ম্মার্থে সম্পত্তি দান করিলে তজ্জন্য কোনও দলিলের প্রয়োজন হয় না, কিন্তু দলিল থাকিলে উত্তম প্রমাণ হয়, কারণ তাহা হইলে দানকৰ্ত্তার মহাজনগণ তাঁহার দেনার জন্য ঐ সম্পত্তি ক্রোক নিলাম করিতে পারেন না। অৰ্পণনামা সম্পাদন করিতে তইলে তাহাতে ষ্ট্যাম্প দিতে সম্পত্তির মূল্য ধরিয়া তাহার উপর শতকরা __ হিসাবে ষ্ট্যাম্প লাগে) এবং রেজিষ্টারী করিতে হইবে। দানকর্ত্তা ইচ্ছা করিলে উইল দ্বারাও ধৰ্ম্মার্থে সম্পত্তি দান করিয়া যাইতে পারেন।

যাত্রীগণ মন্দিরে যে সকল দ্রব্য দান করে তন্মধ্যে যেগুলি ক্ষয়শীল পদার্থ (যথা, ফল, ফুল, চাউল ইত্যাদি) তাহা সেবাইতেরই ভোগ্য হয়; যে দ্রব্যগুলি ক্ষয়শীল নহে (যথা ধাতুদ্রব্য, অলঙ্কার) এরূপ দ্রব্য কেহ মন্দিরে দান করিলে তাহা মন্দিরের ঠাকুরের সম্পত্তি হইবে, সেবাইত তাহা নিজের জন্য লইতে পাবিবেন না।

অনেকগুলি সেবাইত থাকিলে তাতার সুবিধার জন্য পালা ক্রমে তাহাদের কার্য্য বিভাগ করিয়া লন। অনেক স্থলে (যথা, কালীঘাটে্র মন্দিরে) প্রথানুসারে এই পালা হস্তান্তর (যথা বিক্রয়, বন্ধক, ইজারা) করিতে পারা যায় (মহামায়া দেবী বঃ হরিদাস হালদার ৪২ কলিকাতা ৪৫৫ )।

যে নির্দিষ্ট কার্য্যের জন্য দানকৰ্ত্তা সম্পত্তি দান করিয়াছেন, তাহা যদি সম্পন্ন করা অসম্ভব হইয়া উঠে, তাহা হইলে ঠিক সেই পকীবের অন্য কোনও কার্য্যে ঐ সম্পত্তি ব্যয়িত হইবে। যদি কেহ কোনও নির্দিষ্ট মন্দিরের ঠাকুরের সেবার জন্য সম্পত্তি দান করিয়! ধান, এবং যদি সেই মন্দির পড়িয়া গিয়া ঐ ঠাকুর ভাঙ্গিয়া যায়, তাহা হইলে নূতন মন্দির নির্মাণ করিয়া তাহাতে নূতন ঠাকুর স্থাপনা কবিয়া তাহার সেবায় ঐ সম্পত্তি ব্যয়িত হইবে (বিজয়চাদ বঃ কালীপদ, ৪১ কলিকাতা ৫৭)। যদি কেহ তাহার গ্রামের স্কুলের উন্নতি রিধানের জন্য সম্পত্তি দিয়া যান, এবং যদি ঐ স্থল উঠিয়া যায়, তাহা হইলে ঐ গ্রামে যদি কোনও পাঠশালা থাকে বা নিকটবৰ্ত্তী গ্রামে কোনও স্কুল থাকে, সেই পাঠশালা বা স্কুলের জন্য ঐ সম্পত্তি ব্যয়িত হইবে, অথবা ঐ সম্পত্তি হইতে নূতন স্কুল বা পাঠশালা স্থাপিত হইবে। ইহার কারণ এই যে, ধৰ্ম্মার্থে বা দাতব্য কাৰ্য্যে সম্পত্তি দান করিলে তাহা কোন মতেই প্রত্যাহার করা যায় না; ঐ সম্পত্তি যে কোনও ধৰ্ম্মকাৰ্য্যে বা দাতব্য কার্ষ্যে বা সাধারণের উপকারজনক কার্ষ্যে ব্যয় করিতেই হইবে।