যৌনবোধ : উহার স্বরূপ; মনের সহিত উহার সম্বন্ধ; কাম ও প্রেম
প্রথম খণ্ড, সপ্তম অধ্যায়

পূর্ব অধ্যায়ে যৌনবোধ সম্বন্ধে আমরা যাহা বলিলাম, তাহাতে ইহার দৈহিকতা সুস্পষ্টরূপে প্ৰতীয়মান হইয়াছে বলিয়া মনে করিতে পারি। যৌনবোধের মানসিক রূপও উপেক্ষণীয় নহে। মনের সহিত যৌনবোধের সম্বন্ধ উহার দৈহিক সম্বন্ধের মতই ঘনিষ্ঠ। এ সম্বন্ধে আমরা এখানে মনোবিজ্ঞানের কতিপয় তত্ত্বের আলোচনা করিতেছি।

যৌনবোধের মানসিকতা

যৌনবোধের ‘বোধ’ শব্দটি হইতেই পাঠকগণ বুঝিতে পারিতেছেন যে, ইহা প্ৰধানত মানসিক ব্যাপার; আমাদের ইন্দ্ৰিয়লব্ধ অনুভূতিসমূহ স্নায়ুর সাহায্যে মস্তিষ্কে উপনীত হইলে উহারা জ্ঞানে পরিণত হয়। যৌন-ইন্দ্ৰিয়লব্ধ অনুভূতি সম্বন্ধেও অবিকল উহাই সত্য। তাহা আমাদের স্নায়ুমণ্ডলীর  সাহায্যে মস্তিষ্কে উপনীত হইলে আমরা পুলক অনুভব করিয়া থাকি। মস্তিষ্কই আমাদের মনের পীঠস্থান। সম্ভবত মস্তিষ্কের ক্রিয়াসমষ্টিরই নাম মন। মন বলিয়া কোন স্বতন্ত্র পদাৰ্থ নাই। সুতরাং আমাদের যৌনবোধ মূলত মানসিক।

নিম্নস্তরের প্রাণিজগতেও ইহা কতকটা সত্য। যদিও উহাদের মধ্যে মিলনে মন অপেক্ষা শরীরের কাৰ্য অধিকতর সুস্পষ্ট, তথাপি পশুপক্ষীর মধ্যেও নারীর পশ্চাতে পুরুষকে ঘুরিতে ফিরিতে ও একই নারীর জন্য একাধিককে সংগ্রাম করিতে দেখা যায় এবং একত্র বাস, চলাফেরা ও  পরম্পরের জন্য মমতাবোধের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, সেইজন্য উহাদের যৌনবোধকে কোনও মতেই নিছক দৈহিক ব্যাপার মাত্র বলা যাইতে পারে না।

আমরা উপরে বলিয়াছি যে, মানুষের যৌনবোধ যেমন দৈহিক তেমনি মানসিক। সুতরাং ইহার প্রত্যেকটি প্রক্রিয়াও দৈহিক এবং মানসিক উভয়বিধই হইয়া থাকে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা হইতেই আমরা বুঝিতে পারি যে, প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান আমাদের মনের মধ্যে কোন না-কোনও প্রকারের উপলব্ধি বা সংবেদনস্থষ্টি করে। ইহাদের মধ্যে কতকগুলি আমাদের প্রিয় এবং কতকগুলি অপ্ৰিয়। প্রিয় অভিজ্ঞতা আমাদিগকে আনন্দ এবং অপ্ৰিয় অভিজ্ঞতা আমাদিগকে বিরক্তি দান করিয়া থাকে। এই সমস্ত অভিজ্ঞতা শুধু ঘটনার সময়েই নহে, উহাদের স্মৃতিও আমাদিগকে আনন্দ ও বিরক্তি দান করিয়া থাকে। কারণ মানুষের মন স্মৃতিফলক বিশেষ। এই ফলকে ইন্দ্ৰিয়-গৃহীত সমস্ত অভিজ্ঞতা খোদিত থাকে। দুঃখের অভিজ্ঞতা অপেক্ষা আনন্দের অভিজ্ঞতা স্বভাবত অধিকতর সুস্পষ্টভাবে আমাদের মনের স্মৃতিফলকে লিপিবদ্ধ থাকে।

যৌন-অভিজ্ঞতা আমাদের আনন্দ-অভিজ্ঞতাগুলির মধ্যে তীব্রতম। সুতরাং মনের উপর উহার ছাপও সর্বাপেক্ষা অধিক সুস্পষ্ট। এইভাবে আনন্দের স্বতি যেমন আমাদের মানস চক্ষেব সম্মুখে আনন্দদায়ক ক্রিয়াসমূহকে সুস্পষ্টরূপে অঙ্কিত করিয়া তোলে, তেমনই আনন্দদায়ক ক্রিয়াবিশেষের চাক্ষুষ দর্শনও আমাদের মনের পূর্বলব্ধ আনন্দ-অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত রসের উদ্রেক করিয়া থাকে। এই রসবোধের জাগরণ আমাদিগকে সেই আনন্দদায়ক কাৰ্য পুনঃ সম্পাদনে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করিয়া থাকে।

কিন্তু আমাদের আনন্দবোধ আমাদের ইন্দ্ৰিয়-গৃহীত অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ নহে। তাহা হইলে আমাদের আনন্দবোধও অতিশয় সীমাবদ্ধ হইত। মানুষের মন শুধু আনন্দভোক্তা নয়, আনন্দ স্রষ্টাও বটে। লব্ধ অভিজ্ঞতার তুলনা সমালোচনা, সংযোজন দ্বারা মানব-মন কল্পনায় নিত্য নূতন আনন্দচ্ছবি অঙ্কিত করিতে সমর্থ হয়। এই সৃষ্টি নৈপুণ্যাবলে মানব-মন নিত্য নূতন আনন্দপ্রক্রিয়ার আবিষ্কার করতঃ ভোগের ঐশ্বর্য বৃদ্ধি করিতেছে।

যৌনজীবনেও মনের এই সৃষ্টি-নৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। কারণ, যৌনজীবন যদিও মানুষের ভোগজীবনের সবটুকু নহে, তথাপি ইহা ভোগজীবনের প্রধানতম অংশ। যৌনজীবনের ভোগপ্রক্রিয়া-সমূহের অনেকগুলিকে নীতিবাদীরা যৌন-বিকার (Perversion) বলিয়া নিন্দা করিলেও উহা যে মানুষের সৃষ্টি-নৈপুণ্যের পরিচায়ক, তাহাতে সন্দেহ নাই। এই সমস্ত প্রক্রিয়া মানব-মনের এমন এক তীব্র বাসনার ফল যে, নানাপ্রকার কঠোর ব্যবস্থা দ্বারাও ঐ সমস্ত আচরণ দূর করা সম্ভব হয় নাই।

ইহার সুস্পষ্ট অর্থ এই যে, মানুষের যৌনবোধ তীব্র মানসিক ব্যাপার। এবং ইহাও সত্য যে বহির্জাগতিক প্রভাব বিস্তারের দ্বারা মনোজগতের কার্ধ নির্মাণ করা একরূণ অসম্ভব। অসম্ভব বলিয়াই ধর্মের চোখ-রাঙানি, বিকেকের দোহাই, শাসনের ভীতি, কিছুই মানব-মনের স্বাভাবিক কামোপভোগের বিবিধ অসামাজিক প্রক্রিয়ার সৃষ্টি নৈপুণ্যকে পঙ্গু করিতে পারে নাই। কিন্তু মনকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করিতে পারে কেবল মনই। মানুষ ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগের দ্বারা তাহার সমস্ত বৃত্তিকে কত পরিমাণে সংযত ও সুপরিচালিত করিতে পারে। মানুষের যৌনবোধ তাহার মানসিক বৃত্তি, সুতরাং তাহাই এই বৃত্তিকেও সংযত ও সুপরিচালিত করিতে হইবে তাহারই ইচ্ছাশক্তির দ্বারা—বাহ্য বা দৈহিক শাসনের দ্বারা নহে। শারীরিক বলপ্রয়োগে মানুষের অনেকে মানসিক বৃত্তিকে আমরা শৃঙ্খলিত রাখিতে পারি; কিন্তু শৃঙ্খলিত করিয়া রাখা এক কথা, আর সুপরিচালিত করা সম্পূর্ণ আর এক কথা। আমরা শাসনের পক্ষপাতী নহি, আমরা নিয়ন্ত্রণেরই পক্ষপাতী। আমরা বিশ্বাস করি যে, মানুষের মধ্যে কোন বৃত্তিই অনাবশ্যকরূপে সৃষ্ট হয় নাই।

আমাদের দাম্পত্যজীবন সুখময় করিতে হইলে যৌনবোধের মানসিকতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ, যৌনক্রিয়ার বিবিধ পৰ্যায় দম্পতির মনের উপর কিভাবে ক্রিয়া করিবে, উভয়েরই সেই জ্ঞান সম্যকভাবে থাকা প্রয়োজন।

তাহা হইলে যৌনবোধের প্রকৃত স্বরূপ কি?–ইহা প্ৰধানত শারীরিক, না মানসিক?

যৌনবোধের প্ৰকৃত স্বরূপ লইয়া বহু মতামতেব ছড়াছড়ি দেখা যায়। হ্যাভলক এলিস্‌ তাহার বিখ্যাত পুস্তকে (Studies in the Psychology of Sex-এর অন্তর্গত The Sexual Impulse) এই বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করিয়াছেন। তিনি তাহার স্বভাবসিদ্ধ সাধারণ রীতি অনুযায়ী বহু পণ্ডিতের মতামত উদ্ধৃত করিয়া যুক্তিতর্কের সাহায্যে নিজ সিদ্ধান্ত স্থাপন করিয়াছেন।

প্ৰথমত পণ্ডিতেরা যৌনবোধকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং মলমুত্র ভ্যাগের প্ৰয়োজনের মতই একটা দৈহিক প্রয়োজন বলিয়া মনে করিতেন। প্ৰোটেষ্টাণ্ট ক্রিশচান ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রবর্তক জার্মানীর মার্টিন লুথার ও বলিয়াছেন যে, বিবাহের প্রয়োজন শুধু মূত্ৰত্যাগের মতই।

যৌনলালসা চরিতাৰ্থ করিতে পারিলে একটা অব্যক্ত আনন্দানুভূতির শিহরণ সমস্ত দেহমনকে চঞ্চল করিয়া তোলে। মলমূত্ৰত্যাগ একটি অতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, ইহাতেও শারীরিক এবং মানসিক আনন্দানুভূতির অভিজ্ঞতা ঘটে; কিন্তু তবুও উভয়কে কখনও একই পৰ্যায়ে ফেলা যায় না।

মলমূত্ৰত্যাগ একটা প্রাত্যহিক ব্যাপার। ইহাতে অপ্রয়োজনীয় ও অনিষ্টকর পদার্থসমূহ শরীর হইতে বাহির হইয়া যায়। পুরুষের শুক্ৰস্থলন হওয়ায় শরীর অপেক্ষাকৃত হালকা হয় বটে, কিন্তু শুক্রসঞ্চয়ের পুর্বেও বালক ও কিশোরের যৌনবোধ থাকে। আবার স্ত্রীলোকের তা শুক্ৰস্খলন হয় না। শুক্ৰস্খলনে যে সামান্য রস নিষ্ক্রান্ত হয়, তাহার তুলনায় যৌনমিলনে শরীরে যে সমস্ত লক্ষণ দেখা যায় তাহাদের তীব্রতা ও ফলাফলের মাত্রা অত্যধিক।

অধিকতর যুক্তিবাদী ও অনুসন্ধিৎসু ইহার পর ধারণা করিল যে, যৌনবোধ মানুষের সৃষ্টি বাসনার নামান্তর মাত্র। দার্শনিক সোপেন হাওয়াবের মতে সমাজের লোকসংখ্যা বুদ্ধি পাওয়া উচিত এবং মিলনের মুখ্য উদ্দেশ্য হইবে সন্তানোৎপাদন। কিন্তু পরবর্তীকালে এই ধারণাও পরিত্যক্ত হইয়াছে।–উচ্চস্তরেব প্ৰাণিক্ষগতে মিলনের সঙ্গে প্রজননের অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ দেখা যায়। কিন্তু অতি নিম্নস্তরের অনেক প্রাণীর বংশবৃদ্ধি যৌনসম্বন্ধনিরপেক্ষ।(1) যৌনবৃত্তির পবিতৃপ্তির ফলে সচরাচর সন্তান উৎপন্ন হয় বটে, কিন্তু ইহা উহার লক্ষ্যও নয় কিংবা অবশ্যম্ভাবী ফলও নয়। যৌনবোধ সন্তান-লাভেচ্ছার পূর্বে আত্মপ্ৰকাশ করে। যৌনলালসা পরিতৃপ্ত করিবার দুৰ্নিবার আকাঙ্ক্ষা নরনারীর মধ্যে প্ৰায় সকল সময়েই জাগরক থাকে, কিন্তু সন্তানলাভেচ্ছা হয়ত অনেক ক্ষেত্রে আদৌ না থাকিতে পারে অথবা সামান্য মাত্রায় থাকিতে পারে।

সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষার সহিত যৌনবোধের মুখ্য যোগ থাকিলে নারী গৰ্ভবতী হইবার পর তাহার যৌনলালসা নির্বাপিত না হইয়া বরং কোন কোন ক্ষেত্রে আরও উদ্দীপিত হয় কেন? নারীর সন্তানধারণের বয়স পার হইয়া গেলেও যৌন-আকাঙ্খা নির্বাপিত হয়ে না কনে? পুরুষ বা নারীকে  কৃত্রিমভাবে সন্তান জন্মদানের অযোগ্য করিয়া ফেলিলেও তাহাদের কাম-লালসা বর্তমান থাকে কেন? চিরবন্ধ্যা নারীও রতিক্রিয়ায় উন্মুখ হয় কেন? সুরতিক্রিয়ায় (অসমর্থ ধ্বজভঙ্গ পুরুষত্বহীন) লোকেরও কামোচ্ছা থাকে কেন?

সৃষ্টির জন্য মানুষের যৌনকামনার প্রয়োজন হয় না। পুরুষেরা শুক্রকীট যে কোন প্ৰকারে স্ত্রীলোকের ডিম্বের সহিত যথাস্থানে মিলিত হইতে পারিলেই ভ্রূণের সৃষ্টি হইয়া থাকে। সহবাস-প্ৰণালী ব্যতিরেকেও শুক্র পিচকারীর বা টিউবের সাহায্যে নারীর শরীরে প্রবিষ্ট কারাইয়া (Artificial insemination) সন্তানের জন্মদান করা যায়। (২৮নং চিত্র)।

তবুও মনে হয়, যৌনবোধের তীব্ৰতা জাগ্ৰত রাখিয়া বংশবিস্তারের সহায়তা করাই প্ৰকৃতির অন্যতম উদ্দেশ্য। ঘৃণা, বিরক্তি, শ্রম বা অবহেলা স্ত্রীপুরুষের মিলন কাৰ্যকে ঠেকাইয়া রাখতে পারে না বলিয়াই বংশবিস্তার সম্ভবপর হইয়াছে। যৌনবোধে সাধারণত নরনারীর দেহে ও মনে উত্তেজনা ও উদ্দীপনা বর্তমান থাকে। যৌনলালসার তৃপ্তি হইলে ঐ উত্তেজনা ও উদ্দীপনা প্রশমিত হয়। এই প্রশমন আনন্দদায়ক, তৃপ্তিকর ও স্বাস্থ্যকর।

যৌনবোধের প্রকৃত স্বরূপ

মোটের উপর, মানুষের যৌনবোধ গোড়াতে মানসিক, মধ্যভাগে শারীরিক ও উপসংহারে বিশেষাঙ্গিক।(2) এ কথা বলিবার কারণ এই যে, গোড়াতে সে কোনও বিশেষ স্থানে বা অঙ্গে ঐ বোধের স্থান নির্দেশ করিতে পারে না। অথচ সে বোধটা কতই না তীব্র। তৎপরে ক্ৰমে যখন তাহার সমস্ত শরীরে উত্তেজনা আসে, যখন বিপরীত লিঙ্গের আসঙ্গলিপ্সা তাহার মনে তীব্ৰ হয়, তখন তাহার যৌন-অঙ্গও উত্তেজিত হয়। সেই উত্তেজনা হেতু তখনকার অনুভূতিকে শারীরিক অনুভূতি বলা যাইতে পারে। কিন্তু উহা তখনও সুনির্দিষ্টভাবে আঙ্গিক নহে। পরবর্তী আঙ্গিক-মিলন হেতু যখন উভয়ের উত্তেজনা বাড়িতে থাকে, তখন স্নায়ুবিক ও মানসিক সমস্ত যৌনবোধ শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গে আসিয়া কেন্দ্রীভূত হয়। রতিক্রিয়ার সহিত ত্বকের বিশেষ সংস্রব এইখানেই প্ৰকটিত হয়। যৌনবোধ গোড়াতে মানসিক বলিয়াই রতিক্রিয়ার আয়োজন শৃঙ্গাবের দ্বারা করিতে হয়। উভয়ের মনকে রতিক্রিয়ায় নিবিষ্ট করিয়া উভয়ের দেহকে উক্ত কার্যের উপযোগী করিবার প্রক্রিয়াকে শৃঙ্গার, প্ৰেমক্রীড়া বা কামকেলি (physical courtship) বলা হয়। শৃঙ্গার সম্ভোগের ভূমিকমাত্ৰ, এ বিষয়ে, ২য় খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে।(3)

কাম ও প্রেম

কাম যৌনবোধের দৈহিক পরিণতি, কিন্তু উহা মনের সহিতও সংশ্লিষ্ট থাকায় মানুষের মধ্যে আরও উন্নত এক অনুভূতির সৃষ্টি হইয়াছে। আমরা ইহাকে প্রেম বলিব।

পাশ্চাত্য মতে, প্রেম ও প্রণয়ই বিবাহের ভিত্তি হওয়া উচিত। এলেন কী (Ellen Key) বলেন, সত্যকারের বিবাহের একটি মাত্র শর্ত থাকিবে–যাহারা পরস্পরকে ভালবাসে তাঁহারাই স্বামী-স্ত্রী।

এখানে প্রণয় ও প্রেম একই অর্থে ব্যবহৃত হইতেছে; প্ৰণয়ের ঘনীভূত অবস্থার নামই প্ৰেম। এই প্ৰণয় বা প্রেম কি? প্রেমের ব্যাখ্যা করা কষ্টকর। বনষ্টেটেন (Bonstretten) বলেন—‘প্ৰেম কথাটার মত বহু ব্যবহৃত শব্দ আর নাই; তথাপি উহার মত রহস্যময় বিষয়ও আবার নাই, আমরা যাহার প্রভাব সব চেয়ে বেশী বোধ করি, তাহার সম্বন্ধে জানিও ততই কম। আমরা তারকারাজির গতিবিধির পবিমাপ করি, কিন্তু কি করিয়া প্রেমে পড়ি, তাহাই জানি না।’ আমরা উহাকে কখনও ক্ষূৎ-পিপাসার মত প্রয়োজন মনে করি; কখনও মনে করি উহা বিদ্যুতের মত শক্তিবিশেষ; কখনও মনে করি উহা চুম্বকের মত আকর্ষক। বস্তুতঃ নানা রূপকের বর্ণনায় আমরা উহার ব্যাখ্যা করিবার প্রয়াস পাই।

হাৰ্বার্ট স্পেন্সার প্রেমের স্বরূপ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া দেখাইয়াছেন যে, উহা দেহ ও মনের বহু সূক্ষ্ম উপকরণ লইয়া গঠিত, যথা :-(১) দৈহিক যৌন-বৃত্তি, (২) সৌন্দর্য উপভোগবৃত্তি, (৩) মায়া-মমতা, (৪) সম্মান ও শ্ৰদ্ধাবোধ, (৫) অনুমোদন ভিক্ষা, (৬) আত্মসম্মানবোধ, নিজস্ব মনে করা, (৮) ব্যক্তিত্বের বাঁধ ভাঙিয়া যাওয়ার কর্মস্বাধীনতা, (৯) সহানুভূতিসূচক মনোবৃত্তিসমূহের উন্নয়ন।

আমি পূর্ব-পূর্ব অনুচ্ছেদে দেখাইয়াছি যে, যৌনবোধ জন্মগত শারীরিক ও মানসিক একটি প্রবল বৃত্তি। ইহার শারীরিক উৎস যৌন-ইন্দ্ৰিয়সমূহ ও অন্তঃস্ৰাবী যৌনগ্ৰন্থিসমূহের রস। ইহাদের প্ৰকৃতিদত্ত কাৰ্যই হইতেছে শরীরে যৌন-ক্ষমতা ও উত্তেজনার সৃষ্টি করা এবং ঐ ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য শরীরকে প্ৰস্তুত এবং উন্মুখ করা। শারীরিক উত্তেজনা শারীরিক তৃপ্তিতে পর্যবসিত হইতে চায়। আত্মরতিব যে সমস্ত প্রক্রিয়ায় নর বা নারী স্বীয় উত্তেজনা প্ৰমাণিত করে, তাহার আলোচনা আমরা পরে করিতেছি। ইহাতেও যে তৃপ্তি বোধ হয়, উহাতেই মনের সম্বন্ধ আসিয়া যায়। কারণ, আমাদের ভাল লাগা বা না লাগার বিচার মনের কাছে। ক্লোরোফৰ্ম-প্ৰয়োগে কাহাকেও অজ্ঞান করিয়া তাহার রেতঃস্খলন করিয়া স্নায়বিক তৃপ্তি আনিয়া যৌনযন্ত্রসমূহের উত্তেজন; লঘু করা গেলেও যাইতে পারে, কিন্তু উহাতে তাহার মানসিক তৃপ্তিবোধ হইবে না।

যৌনবোধ শারীরিক ও মানসিক পরস্পর-সম্পর্কিত বলিয়া শরীর এবং মন উভয়ের সহিত যৌনতৃপ্তিরও সম্বন্ধ থাকিবে। তবে শরীর ও মনের তৃপ্তির তারতম্য হইতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে, প্ৰেমহীন ও সহানুভূতিহীন সাধারণ বেশ্যাগমনে পুরুষের শারীরিক তৃপ্তিই বেশী হয়, মানসিক তৃপ্তি না হইবারই কথা। তবে দুই-চারি ক্ষেত্রে যে প্রেমের স্ফূরণও হইতে পারে, এ কথা বলিয়া রাখা ভাল। সাময়িকভাবে পাত্ৰনির্বিশেষে ঐ রূপ যৌনতৃপ্তির কথাই আমরা এখানে বলিতেছি। ঐ রূপ ক্ষেত্রেই সাধারণতঃ ‘কাম (lust) কথাটার ব্যবহার হইয়া থাকে। প্রেম (love) কথাটা একটু উন্নত ধরনের।(4)

ফ্ৰয়েড ও তাহার বহু অনুবর্তীর মতে, সকল প্ৰেমরই উৎস কাম; এমন কি পিতামাতার প্রতি শিশু যে প্রেমের পরিচয় দেয় তাহা ও কামভাবসঞ্জাত। ডাঃ ফোরেলও বলেন, প্রেমকে অন্য কথায় আদি কামবৃত্তি বলা যায়। বয়ার (Bauer) প্ৰমুখের মতে, প্রেম শব্দটার পরিবর্তে মনে করিতে হইবে কতকগুলি প্রবল প্রেরণার কথা যাহাদের প্রভাবে নর ও নারী পরস্পরে মিলিত হইবার উদ্দেশ্যে অনুভব করিয়া থাকে।

কামবর্জিত প্ৰেম (Platonic Love) কথার কথা মাত্র। বস্তুতঃ সুস্থ ও স্বাভাবিক নর ও নারীর মধ্যে ঐরূপ প্রেম অতি বিরল যে, উহা হইতে পারে না ধরিয়া লওয়াই যুক্তিযুক্ত।

বস্তুত, কাম ক্রিয়াগত আসক্তি, প্রেমপত্রগত আসক্তি। কাম সম্পূৰ্ণ দৈহিক; প্ৰেম অনেকাংশে মানসিক। কাম অন্ধ; উহা পাত্ৰনির্বিশেষে তৃপ্তি চায়; প্ৰেম সজাগ, উহা পাত্রবিশেষে নিবন্ধ হয়। কাম পাশবিক; প্রেম মানবীয়। কামুক নিজের তৃপ্তি চায়। প্রেমিক প্ৰেমাস্পদের তৃপ্তিই বেশী চায়। কামুক স্বার্থন্বেষী, প্রেমিক প্ৰেমাস্পদের জন্য ত্যাগেই আনন্দ পায়।

কাম ও প্রেমের ব্যাখ্যা এবং ইহাদের বিশ্লেষণ ও পার্থক্য নির্ণয় সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র এইভাবে করিয়াছেন : ‘মনের অনেকগুলি ভাব আছে, তাহার সকলকেই লোকে ভালবাসা বলে। কিন্তু চিত্তের যে অবস্থায় অন্যের সুখের বিসর্জন করিতে স্বতঃপ্ৰস্তুত হই, তাহাকে প্ৰকৃত ভালবাসা বলা যায়। স্বতঃপ্ৰস্তুত হই, অর্থাৎ ধৰ্মজ্ঞানে বা পুণ্যাকাঙ্ক্ষায় নহে। সুতরাং রূপবতীর রূপভোগ লালসা, ভালবাসা নহে। যেমন ক্ষুধাতুরের ক্ষুধাকে অন্নের প্রতি প্ৰণয় বলিতে পারি না, তেমনই কামাতুরের চিত্তচাঞ্চল্যকে রূপবতীর প্রতি ভালবাসা বলিতে পারি না। সেই চিত্তচাঞ্চল্যকেই আৰ্য কবিরা ‘মদনশরজ’ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। যে বৃত্তির কল্পিত অবতার বসন্ত সহায় হইয়া মহাদেবের ধ্যান ভঙ্গ করিতে গিয়াছিলেন (কবি কালিদাসের ‘কুমার-সম্ভব’ কাব্য দেখুন–লেখক), যাহার প্ৰসাদে কবির বর্ণনায় মৃগেরা মৃগীদের গাত্ৰে গাত্ৰ-কণ্ডুয়ন করিতেছে, কবিগণ কবিণীদিগকে পদ্মের মৃণাল ভাঙিয়া দিতেছে (কবি কালিদাসের ঋতু-সংহার-এ বসন্ত বৰ্ণনা দেখুন–লেখক)–এ সেই রূপজ মোহ মাত্র। এ বৃত্তিও জগদীশ্বর প্রেরিত, ইহার দ্বারাও সংসারের ইষ্টসাধন হইয়া থাকে এবং ইহা-সর্বজীব-মুগ্ধকরী। কালিদাস, বায়রন, জয়দেব ইহার কবি—বিদ্যাসুন্দর উহার ভেঙ্গান। কিন্তু ইহা প্রণয় নহে। প্রেম বুদ্ধি-বৃত্তিমূলক। প্রণয়াস্পদ ব্যক্তির গুণসকল যখন বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা পরিগৃহীত হয়, হৃদয় সেই সকল গুণে মুগ্ধ হইয়া তৎপ্রতি সমাকৃষ্ট ও সঞ্চালিত হয়, তখন সেই গুণাধরের সংসৰ্গলিপ্তদা তৎপ্ৰতি ভক্তি জন্মে। ইহার ফল সহৃদয়তা এবং পরিণামে আত্মবিস্মৃতি ও আত্মবিসর্জন। এই যথার্থ প্ৰণয় সেক্সপিয়ার, বাল্মীকি, শ্ৰীমদ্ভাগবতকার। ইহায় কবি, ইহা রূপে জন্মে না। প্ৰথমে বুদ্ধি দ্বারা গুণ গ্ৰহণ, গুণ গ্রহণের পর আসঙ্গলিপ্সা, আসানঙ্গলিপ্সা সফল হইলে সংসৰ্গফলে প্ৰণয়, প্ৰণয়ে আত্মবিসর্জন। আমি ইহাকেই ভালবাসা বলি। নিতান্তপক্ষে স্ত্রী-পুরুষের ভালবাসা আমার বিবেচনায় এইরূপ। আমার বোধ হয়, অন্য ভালবাসার মূল এইরূপ, তবে স্নেহ এক কারণে উপস্থিত হয় না। কিন্তু সকল কারণই বুদ্ধিবৃত্তিমূলক। নিতান্তপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিমূলক কারণজাত স্নেহ ভিন্ন স্থায়ী হয় না, রূপজ মোহ তাহা নহে। রূপ-দর্শনজনিত যে সকল চিত্ত-বিকৃতি তাহার তীক্ষ্মতা পৌনঃপুন্যে হ্রাস হয়। অর্থাৎ পৌনঃপুন্যে পরিতৃপ্ত জন্মে। গুণজনিতের পরিতৃপ্তি নাই। কেননা রূপ এক-প্রত্যহই তাহার একরূপই বিকাশ, গুণ নিত্য নূতন নূতন ক্রিয়ায় নূতন হইয়া প্ৰকাশ পায়। রূপেও প্ৰণয় জন্মে, গুণেও প্ৰণয় জন্মে-কেননা উভয়ের দ্বারা অসঙ্গলিপ্ত জন্মে। যদি উভয় একত্র হয়, তবে প্ৰণয় শীঘ্ৰ জন্মে। কিন্তু একবার প্রণয়-সংসর্গ-ফল বদ্ধমূল হইলে, রূপ থাকা না থাকা সমান। রূপবান ও কুৎসিতের প্রতি স্নেহ ইহার নিত্য উদাহরণস্থল।

‘গুণজনিত প্ৰণয় চিরস্থায়ী বটে, কিন্তু গুণ চিনিতে সময় লাগে। এইজন্য সে প্ৰণয় একেবারে হঠাৎ বলবান হয় না-ক্ৰমে সঞ্চারিত হয়। কিন্তু রূপজ মোহ এককালীন সম্পূর্ণ বলবান হইবে। তাহার প্রথম বল এমন দুর্দমনীয় হয় যে, অন্য সকল বৃত্তি তদ্দ্বারা উচ্ছিন্ন হয়। এই মোহ কি—ইহা স্থায়ী প্রণয় কি না জানিবার শক্তি থাকে না। অনন্তকাল স্থায়ী প্রণয় বলিয়া তাহাকে বিবেচনা করা হয়। ভালবাসার কখনও অযত্ন করিবে না। কেননা ভালবাসাতেই মানুষেরা একমাত্র নির্মল ও অবিনশ্বর সুখ। ভালবাসাই মনুষ্যজাতির উন্নতির শেষ উপায়–মনুষ্যমাত্রে পরস্পরে ভালবাসিলে আর মনুষ্যকৃত অনিষ্ট পৃথিবীতে থাকিবে না।’(5)

আমি পূর্বেই বলিয়াছি যে, শিশুরা জ্ঞান উন্মেষেরা সঙ্গে সঙ্গেই অজ্ঞাত কারণে নিজেদের প্ৰিয়জন নির্ধারিত করিয়া ফেলে। কাহারও পিতাকে ভাল লাগে, কাহারও মাতাকে। এই ভাল লাগাই পরে ব্যাপ্ত হইয়া অন্ধেব সংস্পর্শে গিয়া অপর ক্ষেত্রে নিবন্ধ হয়। এই ভাল লাগা বা মৃদু তৃপ্তির ঘনীভূত অবস্থাই প্রেম। এই প্রেম বা ঘনীভূত প্ৰণয় মানবজীবনে যেকোনও সময়ে উচ্ছসিত হইয়া উঠিতে পারে। তবে সাধারণতঃ যৌবনের প্রাক্কালই উহার উন্মেষের প্রশন্ত সময়। উহা লিঙ্গনির্বিশেষে যে কোনও ব্যক্তিতে নিবন্ধ হইতে পারে, তবে বিপরীত লিঙ্গ হওয়াই স্বাভাবিক।

প্রেমের বিশ্লেষণ

প্ৰেম পাত্ৰভেদে ভিন্ন নাম ও প্রকৃতি পরিগ্রহ করে। পিতা ও মাতার প্ৰতি সশ্রদ্ধ ভালবাসাকে আমরা পিতৃভক্তি বলি, জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা-ভগ্নীর প্রতি ভালবাসাকে যথাক্রমে ভক্তি ও স্নেহ বলি, সমশ্রেণীর অপর লোকের প্রতি ভালবাসাকে (friendship) আখ্যা দিয়া থাকি। প্ৰকৃতি, হিসাবে ঐ রূপ প্ৰণযে সাধারণতঃ কাম ভাবের প্রভাব থাকে অতি সামান্য এবং প্ৰচ্ছন্ন। জাপানীদের মধ্যে নারী স্বামীব প্ৰতি যাহা বোধ করে তাহা সাধারণতঃ প্ৰেম নয় –কর্তব্য, বশ্যতা, মমতা মাত্র।

প্ৰেম কথাটার প্রয়োগ হয় সাধারণতঃ যৌনগন্ধযুক্ত ভালবাসার ক্ষেত্রে। কামগন্ধহীন প্রেমকে বন্ধুত্ব আখ্যা দিয়া আমরা উক্ত অর্থেই ইহার ব্যবহার করিব। প্ৰেমের বিশেষত্ব হইল-(১) পাত্ৰ নির্দিষ্ট হওয়া, (২) সাময়িকভাবে হইলেও ঐ পাত্রে সম্পূৰ্ণ আসক্ত হওয়া, (৩) যৌনপ্রভাব বিদ্যমান থাকা।

বন্ধুত্ব, ভক্তি, স্নেহ ব্যাপকভাবে অনুভূত হইতে পারে ও হইয়া থাকে। একজনের একাধিক বন্ধু, ভক্তির পাত্ৰ, স্নেহাস্পদ থাকিতে পারে। কিন্তু যৌনপ্রণয়ের যে ঘনীভূত অবস্থাকে প্ৰেম বলা হয়। উহা একই সময়ে একাধিক পাত্রে নিবদ্ধ হইতে পারে না, ইহাই সাধারণ কথা। প্ৰেমিকপ্রেমিকার একে অপরকে সমস্ত মন দিয়া ভালবাসিবার নামই প্ৰেম।(6)

অবশ্য সময়বিশেষে প্ৰেমের পাত্ৰ বদলাইতে পারে। প্ৰেমাস্পদের অবহেলা উপেক্ষা, প্ৰত্যাখ্যান বা অন্য প্রেমিকের প্রতি পক্ষপাতিত্ব সহসাই প্ৰেমকে বিষময় ঘৃণা বা রোষে পরিণত করা মোটেই বিচিত্র নহে। দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিতে ভুলিয়া যাওয়াও অসম্ভব নহে। কিন্তু যতক্ষণ প্ৰেম বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ প্রেমিকের হৃদয়ের যাবতীয় তন্ত্রী প্রেমাম্পদের কামনাতেই ঝঙ্কত থাকে। প্ৰেমাস্পদের সহিত দৈহিক মিলন-আকাঙ্ক্ষাই সাধারণতঃ যৌনপ্রভাব সঞ্জাত। উহাকে স্মরণ, উহার সম্বন্ধে আলোচনা, উহাকে পত্ৰ লিখন, উহার পত্র বা অপর কোনও লেখা বার বার পাঠ, উহার নাম বার বা লেখা, উহার উদ্দেশ্যে কবিতা অথবা উচ্ছাসপূর্ণ বাক্য ডায়েরী প্ৰভৃতিতে লেখ, উহাকে উপহার পাঠানো অথবা স্বহস্তে দান, উহার ফটো বা উহাকে দর্শন, উহার সহিত যে কোনও বিষয়ে কথোপকখন, উহাকে বিদ্যা, সঙ্গীত চিত্রাঙ্ক প্ৰভৃতি শিক্ষাদান, ভাবভঙ্গী ও কথায় প্ৰণয জ্ঞাপন, নানাভাবে তাহার সেবা, নানা ছলে তাহার দেহ স্পর্শ, চুম্বন, আলিঙ্গন, ক্রোড়ে ধারণ এবং উহার মধ্যস্থতায় দৃশ্যত বা অদৃশ্যত যৌনতৃপ্তিসাধন ও প্রেমলীলার অন্তভূক্ত।

ইতর প্রাণীর মধ্যে প্ৰেম

আমরা একটু পূর্বেই বলিয়াছি; কাম পাশবিক, প্রেম মানবীয়। ইহ মোটামুটি সত্য মাত্র। অপর প্ৰাণীদের মধ্যেও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রেমের অভিব্যক্তি দৃষ্ট হয়, শুধু তাহাই নহে। প্ৰেমের মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্তও দেখা যায় কপোত-কপোতী বা চকোর-চকোবী প্ৰভৃতি যে সকল পাখী জোড়া বাধিয়া অবস্থান করে, উহাদের মধ্যে প্রেমের নিদর্শনই শুধু নহে, প্ৰেমের গভীরতা দেখিয়াও অবাক হইতে হয়।

শিকার-প্ৰমত্ততায় নদীসৈকতে চখা-চখীব একটিকে মারিয়া ফেলার পর অপরটিরও শোকতপ্ত করুণ বিলাপ লক্ষ্য করিয়া অনেক ক্ষেত্রে স্তব্ধ হইয়া গিয়াছি, মনে হইয়াছে, হায়, কি করিলাম!

ব্যক্তিগত আর একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করিব। বিভিন্ন জাতীয় কবুতর পালিবার আমার খুব সখ ছিল। গুণাবলীর কথা সন্তানে বর্তে ইহা দেখিবার জন্য বহুদিন পরীক্ষা চালাইয়াছিলাম। একটি পুরুষ-কবুতরের সাহিত অপর শ্ৰেণীর একটি মেয়ে-কবুতবকে খাঁচায় আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলাম। উহাদের পূৰ্ববতী সঙ্গী ও সঙ্গিনী প্রতিদিন খাঁচার চারিপাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া নিজ নিজ যৌন-অংশীদারি ফিরিযা পাইবার উদ্দেশ্যে যে আকুল আগ্রহ প্ৰকাশ করিত তাহা দেখিয়া শুধু আশ্চৰ্যবোধ করি নাই, রীতিমত অনুশোচনা হইয়াছে। উহাদের মধ্যে যে দৈহিক সম্পর্কই ছিল, প্রেমের লেশমাত্র ছিল না, এ কথা কে বলিতে পারে?

বাল্য ও কৈশোর প্ৰেম

আমরা সমমৈথুনের আলোচনা-প্রসঙ্গে বালক-বালিকা ও কিশোরকিশোরীর সমলিঙ্গ ব্যক্তির প্রতি প্ৰেমের উল্লেখ পরে করিতেছি। সাধারণতঃ এইরূপ প্ৰেম উহাদের সাময়িক উচ্ছাস মাত্র। বিপরীত লিঙ্গ ব্যক্তির সাহচৰ্যলাভ হইলেই উহা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফুরাইয়া যায়। সহপাঠ ও মিলিবার মিশিবার সুযোগ হেতুই স্কুল-কলেজের বালক-বালিকা ও কিশোরকিশোরীদের সমশ্রেণীর প্ৰতি আকৃষ্ট হইবার কারণ। এই সাহচৰ্য হইতে তাহাদের কোমল অন্তঃকরণে প্ৰণয়ের সূত্রপাত হওয়া বিচিত্ৰ নহে।

বস্তুতঃ পুরাকালে গ্রীকদের মধ্যে আদর্শ প্রেমের নিদর্শনও ছিল সমপ্ৰেম (Homosexual love)। স্ত্রীজাতিকে কামতৃপ্তি এবং সন্তান জন্মদানের যন্ত্রবিশেষ মনে করা হইত।

কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সমপ্রেমের এমন সমস্ত বিচিত্র বিকাশ দেখা যায়, যাহাকে দস্তুবমত রোমাণ্টিক ভালবাসা বলিতে পারি। ইহারা দেবতা সাক্ষী রাখিয়া পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসে; পরস্পরের বিশ্বাস রক্ষা করিবে, জীবনে সে বিশ্বাস ভঙ্গ করিবে না, শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠা সারাজীবন জাগ্ৰত রাখিবে ইত্যাদি ইত্যাদি প্ৰতিজ্ঞা-জ্ঞাপক ভাবের আদান প্ৰদানও করে। ইহারা একের অভাবে অপারে নিদারুণ বেদন অনুভব করে। ইহাদের বিদায়ের দৃশ্য নাটকীয়-দৃশ্যকেও পরাভূত করে, ইহার প্ৰেমপত্ৰ লিখিয়া লিখিয়া বিবাহ-কাতরতা জ্ঞাপন করে।

স্কুল-কলেজের মেয়েদের মধ্যে এইরূপ প্ৰেমকে ‘Flame’ বলে। ইহাতে প্রমিকা প্রেমাম্পদা ছাত্রী অথবা শিক্ষয়িত্ৰীব প্ৰতি যৌন-অনুবাগেব মতই প্ৰবল আকর্ষণ অনুভব করে। অনেক ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনায়, মেলামেশায় প্ৰেম গড়িয়া উঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শুধু ‘প্ৰথম দৃষ্টিতে’ একজন অপরজনের প্রতি আসক্ত হইয়া পড়ে। সৌন্দর্য, হাঁটিবার বা বলিবার ভঙ্গী কিংবা অন্য কোন ব্যক্তিগত গুণ একজনকে মুগ্ধ করিয়া বসে, তখন হইতেই প্ৰেমাবদ্ধ বালিকা প্ৰেমাস্পদার ধ্যানে মুগ্ধ ও আদর আপ্যায়নে ব্যস্ত হইয়া পড়ে। ইহার পরে নাটকীয় প্ৰেমপত্র-বিনিময়, একত্র আলিঙ্গনাবদ্ধভাবে শয়ন, আদর, সোহাগ ইত্যাদিও হইতে থাকে। মান, অভিমান, অভিযোগ, অভিশাপ, ঈৰ্ষা, ক্ৰোধ ইত্যাদির পালা ও সঙ্গে সঙ্গে চলিতে থাকে।

যৌবন ও প্ৰেম

এই সমস্ত বয়সের সাময়িক প্রেমকে স্বাভাবিক প্রেমেব পূর্বাভাস মনে করিয়া আমরা বলিব, যৌবনই প্রেমের প্রশস্ত সময় এবং নর ও নারীর মধ্যেই তাহার স্বাভাবিক বিকাশ। যৌবনের প্রাক্কালে নর ও নারীর সমস্ত মন উন্মুখ হইয়া থাকে মানস প্রতিমার খোঁজে, নিজের নিজের দেহ ও মনকে তাঁহারা প্ৰস্তুত করে উপযুক্ত পাত্রে বিলাইয়া দিবার জন্য।

আশা প্ৰত্যাশার এই যে গভীর অনুভূতি, আদান-প্ৰদানের এই যে প্ৰস্তুভি ইহা প্ৰকৃতিরই এক অপূর্ব রহস্যময় ব্যবস্থা। অনেকে তাই এই বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন যে, প্রেম একটা স্বাভাবিক উন্মাদনা, একটা সাময়িক মোহ হইলেও ব্যক্তি ইহা জাতির স্বার্থেই অনুভব করে। তাই একটি যুবক যখন কোন যুবতীর মোহে আত্মবিস্মৃত হইয়া পরস্পরে উপগত হয়, তখন তাহাকে আত্মসুখ মনে করিলেও তাহারা যে (অনিচ্ছায় হইলেও) জাতির দাবি মিটাইতেছে তাহা মনে করিতে হইবে, ইহাদ্বারা পরোক্ষভাবে অনাগত বংশধরের সুচনা সম্পাদিত হইতেছে বলিয়া ধরিয়া লইতে হইবে।(7)

প্ৰথম দৃষ্টিতে প্ৰেম

একটা অনির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা যুবক-যুবতীর মনে তৃপ্তিকর অন্ধ অনুভূতি সৃষ্টি করে। উহারা ক্রমাগত অসংখ্য নর ও নারীর মধ্যে নিজেদের মানস-প্রতিমা খুঁজিয়া বেড়ায়। অনেকে গল্প, নাটক, নভেল, জীবনী ইত্যাদি হইতে কল্পনায় জোড়াতালি দিয়া নিজেদের কল্পপ্ৰেমাস্পদ গড়িয়া তোলে। ইহার পরে ঐ কল্পিত প্ৰতিমার অনুরূপ কাহাকেও দেখিয়া উহার সহিত প্রেমে পড়ে। ফ্ৰয়েভ ও তাহার শিষ্যবৃন্দ বলেন যে, বালিকারা সাধারণতঃ তাহাদের পিতাকে ভালবাসে ও শ্রদ্ধা করে। কৈশোর বা যৌবনে তাঁহার মত কাহাকেও দেখিলে স্বভাবতই তাহার প্ৰতি আকৃষ্ট হয়। অনেক স্থলে জ্যেষ্ঠ ভ্ৰাতাকে ঐ রূপ মনে মনে পূজা করে ও তাঁহার মত স্বামী কামনা করে। এইরূপ মানসিক অবস্থা হইতেই আমরা যাহাকে ‘প্রথম দৃষ্টিতে প্রেম’ (Love at first sight) বলি, তাহা সংঘটিত হয়। সাধারণতঃ প্ৰথম দৃষ্টিতে এইরূপ হইলেও শুধু যে সহসা অকারণে উহা সংঘটিত হইল, তাহা নহে। যে ব্যক্তির সহিত নর বা নারী প্রেমনিবন্ধ হইল, পূর্বেই তাহার প্রতিমূর্তি তাহার মনে অঙ্কিত হইয়াছিল। ঐ মূর্তির পূজা মনে মনে কতবারই সে করিয়াছে। শুধু বাস্তব মিলনের অপেক্ষা করা হইয়াছিল মাত্র।

প্রেমের কাম্য

নারী তাহার বাঞ্ছিত আদর্শকে খুঁজে বেড়ায় শক্তিমান তেজোদীপ্ত পুরুষের মধ্যে, পুরুষ তাহার বাহিতাকে কামনা করে সুন্দরী মমতাময়ী নমনীয়া নারীর মধ্যে। পুরুষের শোৰ্য, বীর্ঘ, সাহস, সুনাম প্রতিপত্তি নারীকে মুগ্ধ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে কৃতিত্ব, খেলাধূলায় শ্রেষ্ঠত্ব, বক্তৃতায় সফলতা, রচনায় মাধুৰ্য ইত্যাদি গুণে মুগ্ধ হইয়া নারী সেই সেই পুরুষকে দেখিবার পূর্বেই ভালবাসিয়া ফেলিতে পারে। লেডি হ্যামিণ্টন নেলসনের বিজয়ের বার্তা শুনিয়া আত্মহারা হইয়া উঠিতেন। সাধুসমাজে নিন্দনীয় বিবেচিত হইয়া থাকিলেও উহাদের মধ্যে সত্যকার প্ৰেম বিদ্যমান ছিল। বিখ্যাত অভিনেত্রী ও অভিনেতাদের প্রতি বহু নরনারী আকৃষ্ট হয়। লেখকের লেখা পড়িয়া বা সুখ্যাতি শুনি যা অনেক নারীর তাঁহার প্রেমে পড়বার দৃষ্টান্ত বিরল নহে।

বায়বনের দৈহিক বিকৃতি অনেকের মনে ঘৃণার উদ্রেক কারিত, কিন্তু তাঁহার কবিত্বের সুখ্যাতিতে বহু নারী তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিল। রবার্ট এবং এলিজাবেথ ব্ৰাউনিং-এর পরিণয়ের উপাখ্যান মধুর।

এলিজাবেথ শৈশব হইতেই রুগ্না ছিলেন। ঘরের মাঝে রোগশয্যায় থাকিয়া থাকিয়াই তিনি মনের উচ্ছাসে কবিতা লিখিতেন এবং এইরূপ কতকগুলি কবিতা প্রকাশিতও হয়। তাঁহার একটি কবিতায় রবার্ট ব্রাউনিং-এর একখানি গ্রন্থের সুখ্যাতি করা হয়। ব্রাউনিং ইহাতে মুগ্ধ হইয়া পত্রালাপ শুরু করেন এবং উভয়ের মধ্যে প্ৰগাঢ় প্রেমের সুচনা হয়। উভয় করি দেখাসাক্ষাতের পর পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইবার ইচ্ছা প্ৰকাশ করেন, কিন্তু এলিজাবেথের পিতা প্ৰচণ্ডভাবে বাধা দেন। পিতার অনুপস্থিতিতে এলিজাবেথ গীর্জায় গিয়া ব্রাউনিং-এর সহিত বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হইলেন এবং দেশ ছাডিয়া ফ্রান্স হইতে ইতালীতে গিয়া বসবাস আরম্ভ করেন। উভয়েই কবিতা-চৰ্চা করিয়া প্ৰসিদ্ধি লাভ করেন। এলিজাবেথের রোগের উপশম ও স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় এবং ১৫ বৎসর নিরবচ্ছিন্ন দাম্পত্য সুখ অতিবাহিত করিয়া তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। এলিজাবেথের সুস্পর্শে ও সাহচর্যে ব্রাউনিং-এর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ হয়।

নিজে লিখি বলিয়াই যে সুলিখিত কথার প্রভাব ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে কম অনুভব করি তাহা নহে। অনেক লেখকেরই কথার লালিত্যে সম্মোহিত হইয়া ভাবি, ‘শিল্পী, কি মোহিনী জানি তুমি, কি মধুর তোমার রচনাভঙ্গী।’ চিন্তাশীল অনেক লেখকেরই জ্ঞানবিকিরণের ক্ষমতা দেখিয়া মুগ্ধ, বিস্মিত হইয়া মনে মনে বলি, ‘গুণি! কি গভীর তোমার জ্ঞান, কি অপূর্ব তোমাব প্রকাশের শক্তি।’ এইরূপ মনোমুগ্ধকর অনুভূতির সন্ধান আজীবনই করিব।

সৌন্দর্যের আদর্শ গডিয়া তুলিয়া ঐরূপ ব্যক্তির অপেক্ষাতেও অনেক নরনারী বসিয়া থাকে। সৌন্দর্যের উপকরণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন হইয়া থাকে। সুন্দরের পরিকল্পনা যে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন হইতে পারে, তাহা আমি চতুর্থ অধ্যায়ে উল্লেখ করিয়াছি। পুরুষ ও নারীর পক্ষে সৌন্দর্যের পূর্ণতাই হইল ইহাদের পৌরুষ ও নারীত্ব। সেইজন্য শরীরে ও মনে পুরুষালীভাব প্ৰধান পুরুষই মেয়েদের, এবং মেয়েলীভাবাপন্না মেয়ে পুরুষদের আকৃষ্ট করে এবং বিপরীত ধরনের ব্যক্তির বিরক্তি ও ঘৃণার উদ্রেক করে।

অনেক ক্ষেত্রে শৈশবে বল্যে বা কৈশোরে কাহারও কোন ও শারীরিক বিশেষত্ব বা ভঙ্গী অত্যধিক মনঃপূত হইয়া পড়িয়া উহা মনে বদ্ধমূল হইয়া যায় (Infantile fixation), ঐরূপ বিশেষত্ব-বিশিষ্ট কোন ব্যক্তিকে যৌবনে দেখিতে পাইলেই উহার প্ৰতি মন আনু্রক্ত হইয়া পড়িতে পারে।

মনের পূর্ব প্রস্তুতি (mental predisposition) নর ও নারীকে প্রেমে পড়িতে উন্মুখ করিয়া রাখে। ইহার পরই উপযুক্ত ব্যক্তির সাক্ষাতে উহার প্রকৃত সুচনা দেখা যায়। এই সাক্ষাৎকাব সম্পূৰ্ণ দৈব বা আকস্মিক হইতে পারে। পার্টিতে বসিয়া দৃষ্টি বিনিময়, পথিপার্শ্বে বাক্যবিনিময়-এইরূপ সম্পূর্ণ অপ্ৰত্যাশিতভাবেও প্রেমের সুচনা হইতে পারে ও হইয়া থাকে। ‘মেয়েটি ভারী সুন্দর—আমার দিকে তার বক্র চাহনির মানে কি?’ ‘ছেলেটি ভারী সুশ্ৰী–কথার ভঙ্গীও কি মধুর!’–বিদ্যুৎচমকের মত এইরূপ ক্ষণিক ভাবাবেশে পরবর্তীকালে উন্মাদনার সৃষ্টি করে। প্ৰেমাস্পদের প্রতি প্ৰেম সুচিত হইবার পরে প্রেমিকের দৃষ্টি মোহাচ্ছন্ন এরং মন মুগ্ধ হইয়া যায়। প্ৰেমাস্পদের অনুপস্থিতিতেও তাহার কল্পনায় উহার মন ভরিয়া উঠে। সকল রূপের প্রতীক এই ইনি, সকল গুণের অধিকারী এই-ইনি, সকল পবিত্রতা, মাধুৰ্য, গরিমা, মহিমা যেন একত্রীভূত এই ইঁহাতে।(8)

বার্টন দম্পতি

সংস্কৃত ‘কামসূত্র’ আববী ‘আরব্য উপন্যাস’ ও ‘সুগন্ধি কানন’, ইত্যাদির অনুবাদক বিখ্যাত স্যার রিচার্ড বার্টন (Sir Richard Burton) হার্টফোর্ডশায়ারে ১৮২১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অক্সফোর্ডে শিক্ষাকালে আরবী আয়ত্ব করেন। সৈন্য বিভাগে ভর্তি হইয়া ১৮৪২ সালে বোম্বে আসেন ও হিন্দুস্থানী ও অন্যান্য প্ৰাচ্য ভাষা শিক্ষা করেন। প্ৰাচ্যদেশীয় বণিক এবং পারে হজযাত্রী সাজিয়া তিনি মক্কায় পৰ্যন্ত প্ৰবেশ করেন। কেউ তাহার সঠিক পরিচয় পায় নাই।

তিনি নানা দেশে পবিভ্ৰমণ করেন এবং বুলোন (Boulogne) শহরে তাঁহার সঙ্গে একজন সন্ত্রান্ত বংশীয়া নারী মিস ইসাবেলের (Isabel) সাক্ষাৎ ঘটে। এই নারীর ‘মনের মানুষটি ইনিই’ বলিয়া মনে হয় এবং শুধু একবার দেখিয়াই তিনি তাঁহার ভগ্নীকে বলেন, ‘এই ভদ্র লোকটি আমাকে বিয়ে করবেন।’ পরের দিন বার্টন সাহেব দেখা দিয়া দেওয়ালে খড়িমাটি দিয়া লিখিয়া নিবেদন করিলেন, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি কি?’ উনি জবাবে লিখিলেন, ‘না, মা রাগ করবেন।’ মা লেখা দেখিয়া রাগও করিয়াছিলেন!

পরে বন্ধুবান্ধবীর সহযোগিতায় উভয়ের সাক্ষাৎ ঘটে এবং অল্প পরিচয়ের পরেই ইসাবেলকে বুলেন ছাড়িয়া যাইতে হয়। তিনি ভাবেন, ‘আর কি দেখা হবে?’

এর পরে বাটন সাহেব মক্কা, মদিনা ভ্ৰমণ করিয়া ভারতে আসেন। তার পরে সোমালিল্যাণ্ড অভিযানে আহত হইয়া বিলাতে ফিরেন। কিছু দিন পরে আরার ক্রিমিয়ান যুদ্ধে যোগদান করেন। বেচারী ইসাবেল বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকেন।

অবশেষে উভয়ের সাক্ষাত ঘটে এবং কয়েক দিন পরেই বার্টন সাহেব বিবাহের প্রস্তাব করিয়া বলেন, ‘এক্ষুনিই উত্তর দিতে হবে না, ভেবে বলবেন।’

এবার প্ৰেমিকার উদ্দীপ্ত উত্তর শুনুন : ‘I do not want to think it over–I have been thinking it over for six years, ever since I first saw you at Boulogne. I have prayed for you every morning and night, I have follo’ wed your career minutely, I have read every word you ever wrote, and I would rather have a crust and a tent with you than be queen of all the world; and so I say now, ‘yes, yes, yes!’ অর্থাৎ ‘আমার ভাববার দরকার নেই–আপনাকে দেখার পর থেকেই ছয় বছর যাবৎ ভেবে আসছি। প্ৰতিদিন সকাল সন্ধ্যায় আপনাকে পারাব প্রার্থনা করেছি, আপনার জীবনযাত্রার প্রতি ধাপ লক্ষ্য করে এসেছি, আপনার লেখা প্ৰত্যেকটি শব্দ পডেছি- আর আপনার সঙ্গে এক টুকবো রুটি আর তাঁবুই হবে আমার সারা দুনিয়ার সম্রাজ্ঞী হবার চেযে বেশী কাম্য! তাই আমি এক্ষুনি বলছি: হ্যাঁ, হ্যাঁগো, হ্যাঁ। আমি রাজী!’

বলুন ত! কি আত্মসমৰ্পণ!

তবুও নানা বাধাবিপত্তির দরুন আরও ৪ বছব পর তাঁহাদের বিবাহ হয়। তাঁহাদের প্ৰেম সারা জীবন অটুট, অক্ষয় থাকে।

লায়লীর কুকুরকে জড়াইয়া ধরিয়া মজনুর আত্মনিবেদন অপরের কাছে হাস্যকর মনে হইতে পারে, কিন্তু প্ৰেমাস্পদের সাহচৰ্যলাভ করিয়াছিল বলিয়াই কুকুরও তাহার কাছে প্রিয়। মজনুকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল–লায়লীর দেহে এত রূপ কোথায়? সে উত্তর করিয়াছিল–লায়লীর রূপ উপভোগ করতে চাইলে আমার চোখ দিয়া দেখ।

প্রেমিকের কাছে প্রেমাস্পদের চেহারার মলিনতা উবিয়া যায়, তাহার চরিত্রের ক্রটি বিচ্যুতি উড়িয়া যায়। প্রেমিক তাহাকে সর্বাঙ্গসুন্দর মনে করিতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে Crystalization বা Idealization বলে। এই অবস্থায় প্ৰেমাস্পদ প্ৰকৃত সত্তা হারাইয়া, প্রেমিকের স্বাক্ষত্রিত এক আদর্শ জীবে পরিণত হয়। তাহার দোষ-ত্রুটি, ক্ৰটিবিচ্যুতি, প্রেমিকের চোখে পড়েই না। প্ৰেমাস্পদের পক্ষ হইতে স্বীকৃতি, সম্মতি, অনুমোদন প্রেমিকের মনে অনির্বচনীয় আনন্দ ঢালিয়া দেয়; তাহার বিরাগ ও বিতৃষ্ণা দারুণ উদ্বেগের বিষয় হইয়া পড়ে।

প্রেমের মহিমা

উভয়ের পরম্পরের প্রতি প্ৰেমের প্ৰতিষ্ঠা লাভ করিলে উভয়ে উভয়কেই আবাধ্য মনে করে। এই অবস্থা মানবজীবনে সর্বাপেক্ষা তৃপ্তিকর। সৰ্বতোভাবে দেহমানের সুখ, শান্তি ও উন্নতির কারণ। এইরূপ প্রেমিক-প্ৰেমাস্পদের জীবন ধন্য; প্ৰেম পরশমণি। ইহা নীচকে মহৎ, নিষ্ঠুরকে সহৃদয়, স্বার্থপরকে ত্যাগী ও ভীরুকে সাহসী করে।

এই প্রেমের সুর কাব্যে, সাহিত্যে, ধর্মে ঝঙ্কত। এই প্রেমের মহিমা সকল দেশে সকল সুরে গীত। হেলেন, জোলেখা, লায়লী, শিরী, শকুন্তলা, দময়ন্তী, জগতে অমর। চণ্ডীদাসের নিবেদন,-‘শুন রজকিনী রামী, ও দু’টি চরণ শীতল জানিয়া শরণ লইনু আমি’ সকলেরই মর্মস্পর্শী।

প্রেমের খাতিরে অর্থ, প্ৰতিপত্তি, এমন কি সিংহাসন ছাড়িয়া দেওয়াও বিচিত্র নহে। এই সেদিন ইংলণ্ডের রাজা এডওয়ার্ডের পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় সাম্রাজ্যের অধীশ্বর থাকিবার সাধও হেলায় ছাড়িবার কারণ প্ৰেমাস্পদের মিলন-কামনা। প্ৰেমাস্পদের জন্য প্রেমিক সর্বপ্রকার দুঃখ, কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করিতে সর্বদাই প্ৰস্তুত।(9)

————
(1) এ সম্বন্ধে আলোচনা এবং উদাহরণের উল্লেখ আমি আইএ পুস্তকের ‘যৌন-ইন্দ্রিয়সমহ’ অধ্যায়ের ‘বিভিন্ন প্রকার প্রজনন’ অনুচ্ছেদে এবং আমার ‘মাতৃমঙ্গল’, ‘জন্মবিজ্ঞান’, ও ‘সুসন্তান লাভ’ পুস্তকের ‘প্রজনন প্রক্রিয়া’ শীর্ষক অধ্যায়ে করিয়াছি।
(2) ডঃ কিন্‌যেদের মন্তব্য : ‘Erotic stimulation, whatever its source, eflects a series of physiologic changes, which, as far as we yet know, appear to involve adren a secretion, typically autonomic reactions, increased pulse rate, increased blood pressure, an increase in peripheral circulation and a consequent rise in the temperature of the body; a flow of blood into such distensible organs as the eyes, the lips, the lobes of the ears, the nippies of the breast, the penus of the male, and the clitors, the genital labia, and the vaginal walls of the female; a partial but often consider rable loss of perceptive capacity (sight, hearing, touch, taste, smell); an increase in so-called nervous tension, some degree of rigidits of some part or of the whole of the body at the moment of maximum tension and then a sudden release which produces local spasms or more exter save or all consulaning convulsions. The moment of sudden release is the point commonly recognised among biologists as orgasm.’
(3) উদ্দীপনাকে Tumuslance বলা হয়। আর প্রশমন ও নিবৃত্তিকে Detumuscence I হ্যাভলক এলিসের কথায় :–‘Tumescence is the piling on of the fuel, detumescence is the leaping out of the devouring flame whence is lighted the torch of life, to be handed on from generation to generation, in tumescence the organism is slowly wound up and force is accumulated; in the act of detunescence the accumulated force is let go, and by its liberation the sperm-bearing instrument is driven home.’
(4) ফোরেল বলেন, ‘Love in the primitive sense of word is the sex-instinct guided by the brain, that organ of the soul.’
(5) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে ‘বিষবৃক্ষের ফল’ শীর্ষক দ্বাত্রিংতম অধ্যায় নগেন্ত্রের প্রতি হরদেব ঘোষালের পত্র হইতে উদ্ভূত।
(6) ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর
প্ৰতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্ৰতি অঙ্গ মোর’–জ্ঞানদাস
(7) ‘I am for you, and you are for me,
Not only for our own sake, but for others’ sakes,
Envelop’d in you sleep greater heroes and bards,
They refuse to awakeat the touch of any nan but me.’
–Walt Whitman
(8) *’তুমি সন্ধ্যার মেঘ শান্ত সুন্দর, সকল সাধের সাধনা।
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা।’
(9) প্ৰেমিক বলেন–
‘আমি জনমে জনমে হব ধূলিকণা, তুমি ধূলি ‘পরে চলে যেও হে
রাঙা চরণ পরশে পারিবে বুঝিতে হৃদয়ে কত যে বেদনা’

Print Friendly
%d bloggers like this: