যৌনশাস্ত্রের যৌনবিজ্ঞানে পরিণতি

প্রাচীন যৌনশাস্ত্রের ধারা

আমরা এতক্ষণ প্রাচীন ও আধুনিক যৌনশাস্ত্রের মোটামুটি একটা ইতিহাস দিলাম। পুরাতন গ্ৰীতি বলিয়া একটা মনোভাব অনেকের মধ্যেই রহিয়া গিয়াছে এবং যৌনবিষয়ে বহু প্ৰাচীন পুথি পুস্তক, শাস্ত্ৰাদি পাওয়াও যায় বলিয়া পাঠক-পাঠিকাকে প্রকৃত জ্ঞানলাভ করিতে কোনটাকে কতটা মূল্য দিতে হইবে না হইবে, এখানে তাহা বলিয়া রাখিতে চাই।

আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখিতে পাইব যে, মানবসৃষ্টি বা উদ্বর্তনের প্ৰথম হইতে নর ও নারী ইতর জন্তু ও পশু-পক্ষীদের মত যৌন-সম্পর্কের মধ্যস্থতায়ই বংশবদ্ধি করিয়া আসিতেছে। এই যে বংশবদ্ধির পদ্ধতি ইহার সম্যক জ্ঞানলাভ অন্যান্য প্রাণীর পক্ষে সম্ভব নহে। মানুষও বহুকাল পৰ্যন্ত ইহাকে একটি অজ্ঞেয় রহস্যই মনে করিত। তবে জন্ম-মৃত্যু বিষয়েও মানব মনের তীব্র কৌতুহলবোধ ও জিজ্ঞাসা একেবাবে নিরস্ত হইয়া রহে নাই।

ধর্মের প্রবর্তন

সারা প্ৰকৃতির একজন নিয়ন্ত বা একাধিক পবিচালক যে রহিয়াছেন, এই ধাবণ মানব-মনে আপনা হইতেই উদ্ভূত হইল। জন্ম-মৃত্যু প্ৰভৃতি ইহাদেরই পরিচালনাধীন এবং এই হেতু ইহার ভক্তির যোগ্য, এই মনোভাব হইতেই ধর্মমতের প্রবর্তন হইল।

জনসাধারণ সহজেই বিশ্বাস করিয়া বসিল যে, মানববুদ্ধি শক্তিশালী ও প্রখর হইলেও জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি রহস্যোদঘাটনে অক্ষম, প্ৰকৃত জ্ঞানের উৎস উধরলোকে; সেখান হইতে জ্ঞানচ্ছটা মানব-মনে প্ৰতিফলিত না হইলে বহু তথ্য জানিবার আর উপায় নাই। এই বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়া মেধাৰী নেতারা চিন্তাধ্যান করিয়া জ্ঞানলাভে ব্ৰতী হইলেন এবং নিজেদের সাধনা প্রস্তুত জ্ঞানে নিজেরাই বিস্থিত হইয়া ঊর্ধ্বলোক হইতে তথ্য প্রাপ্ত হইয়াছেন, এমত সরল বিশ্বাসে শাস্ত্রের বাণী রচনা করিয়া ফেলিলেন। তঁহারা নিজেরা এবং জনসাধারণ বিশ্বাস করিয়া বসিলেন যে, এরূপ জ্ঞান অলৌকিক ও অভ্রান্ত এবং তাঁহাদের প্রবর্তিত বিধিনিষেধ বিধাতার অভিপ্ৰায় অনুযায়ী।

যৌনবিষয়ে বিধিনিষেধের দরকার বোধ হইল যৌনবৃত্তির তীব্ৰতা লক্ষ্য করিয়া। উহাকে নিয়ন্ত্রিত না করিলে যৌন-যথেচ্ছাচার সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করিতে বাধ্য, এ সত্য সর্বদাই প্রকট হইয়াছে। তাই ধর্মপ্রণেতা তথা সমাজগুরুরা যৌনবৃত্তি নিয়ন্ত্রণকল্পে বিবাহের প্রচলন করেন; শুধু তাঁহাই নহে, বিবাহিত জীবনে কি কর্তব্য, কি নিষিদ্ধ তাহারও নির্দেশ দেন। মানব সমাজে বিবাহ তাই নানা ধর্মের নানাভাবে বিধিনিষেধেব দ্বারা শৃঙ্খলিত হইয়া পড়িয়াছে।

বিবাহজীবনে যৌন-আচরণ ছাড়া যৌন-বিষয়ে অন্যান্য তথ্যের বর্ণনা বা প্রশ্নের উত্তরও জনসাধারণ ধর্মগুরু বা  তাঁহাদের স্থলাভিষিক্ত জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিকট হইতে প্ৰত্যাশা করিত। তাঁহারা জ্ঞান-বিশ্বাস মতে ইহাদের কৌতুহল নিবৃত্ত করিতে চেষ্টাও করিতেন। তাঁহাদের উক্তি বা নির্দেশ সাধারণত তখনকার জ্ঞানের স্তরের তুলনায় খুব উঁচুদরের হইত। তাঁহাদের আন্তবিকতাপূৰ্ণ সরল বিশ্বাস জনসাধারণের মনে ভক্তির উদ্রেক কারিত। এখনও অনেক ক্ষেত্রে উহা বান্তবিকই মূল্যবান বলিয়া বিবেচিত হয়।

কিন্তু তাই বলিয়া তাঁহাদের সকল উক্তিই অকাট, সকল তথ্যই নির্ভুল বা সকল নির্দেশই পালনযোগ্য এ কথা মানব-মন এখন আর মানিতে চায় না। তাহার কারণ :

(১) নানা ধর্মে একই তথ্যের বিভিন্ন ব্যাখ্যা এবং একই অবস্থায় বিভিন্ন নির্দেশ দেখা যায়। শুধু তাহাই নহে,–কতক মতামত আবার সম্পূর্ণ পরম্পর বিরোধী। একই উৎস হইতে এত বিভিন্নভাব সৃষ্টি হইবে কি করিয়া?

(২) একই উৎস বা কি করিয়া বলা যায়? যুগের পর যুগ ধরিয়া বিশ্বপ্ৰকৃতির পরিচালকদের সংখ্যা বাড়িতে ও কমিতে থাকিল; দেবতা, উপদেবতার সংখ্যার ব্যতিক্রম দেখা গেল; ধর্মমতের ছড়াছড়ি হইতে হইতে এমন এক সময় আসিল যখন তাঁহাদের মধ্যে সংঘাত ও বিরোধ বাধিয়া গেল। পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন দেবতা সকলেই আরাধ্য হন কি করিয়া? পরস্পরবিরোধী মতবাদসমূহের সবগুলিই বিধাতার নির্দেশ বলিয়া মানা যায় কি করিয়া?

(৩) ইহার উপরে আবার বহু তথ্য ও মত যাহা পূর্বে অকাট্য ও অভ্রান্ত বলিয়া বিবেচিত হইত, পরবর্তী পরীক্ষামূলক অনুসন্ধানের ফলে অসার ও অসত্য বলিয়া প্ৰমাণিত হইয়া গেল। ইহাতে তথাকথিত ভগবাণী সম্বন্ধে মানুষের সন্দেহের উদ্ৰেক হইল। বিধাতার জ্ঞান যদি অসীম হয়, তাহা হইলে তাহার উক্তিতে আসার কথার সমাবেশ থাকিবে কেন?

মোট কথা, মানুষ বুঝিতে পারিল, মানুষই জ্ঞানবুদ্ধিমতে ধ্যান-ধারণা দ্বারা বিবিধ সমস্যার সাময়িক সমাধান করিয়াছে, প্রশ্নের যথাসম্ভব উত্তর দিয়াছে,–কিন্তু সরল বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়া নিজেবাই ঐ সকল তথ্য ও উত্তরের উৎস ঊর্ধ্বলোকে আরোপ করিয়াছে, এবং অপরেও অন্ধভাবে ঐ রূপ বিশ্বাস করিয়া আসিয়াছে।*

এই সকল বুঝিয়া ও ভাবিয়া মানব-মন ক্রমশঃ যুক্তিবাদী হইতে চলিয়াছে। কোনও কোনও ধর্মীয় মতবাদ যৌনজীবনে সে কত অকল্যাণকর আবহাওয়া সৃষ্টি করিয়াছে, তাহার কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক :

শুক্রস্খলনে অপবিত্রতা

বিধিসম্মত দাস্পত্যবিহারও যে অপবিত্রতাব সূচনা করে এমত ধারণা অনেক ধর্ম ও শাম্বেই আছে। দুঃখেব বিষয, যে প্ৰতিক্রিযার সহিত মানবসৃষ্টিপদ্ধতিই সংযোজিত, তাহাকে না বুঝিযা প্রাচীনকালেব লোকে বা ঘূণ্য কাজ মনে করিয়াছে এবং শাস্ত্রেব সাহায্যে নিজেদেব ধাবণ বিবাতাব বিধান বলিয়া চালাইয়া দিয়াছে।

শুক্ৰস্খলন অনিচ্ছাসত্ত্বে বা অজ্ঞাতসারে হইলেও যে অপবিত্রতা আনে পূর্বেকার শাস্ত্ৰাদিতে এ বিষয়ের উল্লেখ দেখা যায়। বাইবেলে আছে :

“যদি পুরুষের শুক্ৰস্খলন হয়, তাহা হইলে সে সমস্ত শরীব জলে ধুইয়া ফেলিবে, তাহা না করা পর্যন্ত সে অপবিত্র থাকিবে। আর যে সকল কাপড় বা চামড়ায় শুক্ৰ লাগিবে তাহা জলে ধুইয়া ফেলিবে; তাহা না করা পর্যন্ত উহা অপবিত্র থাকিবে!” হিন্দুশাস্ত্রেও কতকটা এইরূপ বিধান আছে।

ইসলামে স্নান ও ধুইবার বিধিও বোধ হয়। উক্ত ব্যবস্থা হইতে গৃহীত। বিধিসন্মত দাম্পত্যবিহারের পরেও স্নানাদি করিয়া পবিত্র হওয়ার বিধি অনেক ধর্মে আছে।

“Behold, I was shapen in iniquity; and in sin did my mother conceive me.’…অর্থাৎ আমি পাপের মধ্যে গড়িয়া উঠিয়াছি; আমার মাতা আমাকে পাপের মধ্য দিয়া গর্ভে ধারণ করিয়াছেন”—বাইবেলের এই উক্তি যে জগতে কত অকল্যাণকর মনোভাবের মূলে রহিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই।

“নারী-পুরুষ মিলিত হইলে উভয়ের স্নান করিতে হইবে এবং তাহা না করা পর্যন্ত উভয়েই অপবিত্র থাকিবে”-বাইবেলের এই উক্তি ইহুদী-খ্ৰীষ্টান ছাড়াইয়া মুসলমানদের ও শাস্ত্ৰবিধিতে ঝঙ্কৃত হইয়াছে। ইহার উপরে খ্ৰীষ্ট্রর জন্ম সম্বন্ধে কুমাৰী প্রজননের কাহিনী প্ৰচলিত হওয়ায় এবং খ্ৰীষ্ট নিজে অবিবাহিত থাকিয়া যাওয়ায় খ্ৰীষ্টীয় জগতে সমস্ত যৌন-সংক্রান্ত ব্যাপারকে ঘূণ্য মনে করা হইয়াছে। বিজ্ঞান পরিষ্কার-পবিচ্ছন্নতার জন্য স্নানাদি সমর্থন করে, কিন্তু এইরূপ সুন্নানাদি করিতেই হইবে, না করিলে শবীর-মন অশুদ্ধ থাকিবে বা ধর্মকর্মে বাধা হইবে, বিজ্ঞান এমত ধারণার পক্ষপাতী নহে। স্নান না করিতে পারিলে বা চাহিলে মুছিযা বা ধুইযাও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হইলে দোষ নাই। ‘শুচিতা’ ‘পবিত্রতা’ ইত্যাদি মনের খেযাল মাত্র। মানবের শরীর ও মন সকল সমযেই পবিত্র, ইহাই ধারণা করা ও রাখা উচিত।

ঋতুমতীর প্রতি অবজ্ঞার ভাব নারীব ঋতুস্রাবেব প্রকৃত কারণ না বুঝিতে পারায়। উহাকে প্ৰকাণ্ড অশুভ ও অশুচি ব্যাপার মনে করিয়া নারীর লজ্জাবোধ ও মনঃক্ষোভ এবং পুরুষেরা অবজ্ঞা ও ঘূণাব উদ্রেক করিবাব প্ৰয়াসও পুৰাতন ধর্মপ্রবর্তকেরা পাইয়াছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ উক্ত বিষয়ে বাইবেলের অভিমত ও বিধান মোটামুটি এইরূপ–

নারীর ঋতুস্রাব হইলে তাহাকে সাতদিন পর্যন্ত আলাদা রাখিতে হইবে এবং তাহাকে যে কেহ স্পর্শ করিবে সেই অপবিত্র হইবে। শুধু এই নহে, ঐ নারী যে বিছানায় শুইবে বা বসিবে তাহা স্পর্শ করিলেও স্নান করিতে হইবে। পুরুষ একত্ৰ শয়ন করিলে সে সাতদিন পৰ্যন্ত অশুচি থাকিবে। স্রাবের সময় আরও দীর্ঘ হইলে নারীকে আরও বেশীদিন আলাদা থাকতে হইবে এবং সে অশুচি থাকিবে।

পার্শী সমাজেও এইরূপ বিধান আছে। হিন্দুশাস্ত্ৰেও ঋতুমতী নারী অস্পৃশ্য ও তাহার স্পর্শে সব জিনিস অশুচি হয়।

বিনা দোষে নারীকে এইভাবে অস্পৃশ্য করিয়া দিবার মত কুসংস্কার তখনকার লোকের থাকা সম্ভব নয়; কিন্তু এখনকার লোকেরাও ঐরূপ উক্তি ও বিধান বিধাতাব উপর আরোপ করিতে পারে। ইহাই বিস্ময়কর।

আমি নারী হইলে এইরূপ অজ্ঞ উক্তি ও অবিচারমূলক ব্যবস্থায় বিদ্রোহ করিবার ন্যায্য কারণ দেখাইতাম এবং তথাকথিত ভগবদ্বাণী যে স্পষ্টতঃই কুসংস্কায়াচ্ছন্ন মনুষ্যরচিত উপকথা মাত্র তাহা ঘোষণা করিতাম। আশা করি, মা-বোনেরা এইরূপ উক্তি বা ব্যবস্থাকে, সে যে ধর্মেই থাকুক না কেন, কোন মূল্যই দিবেন না।

ঋতুস্রাবের কারণ ও উহাতে পালনযোগ্য বিধিনিষেধোব আলোচনা আমি এই পুস্তকের অন্যত্র এবং আরও বিশদভাবে “মাতৃমঙ্গল” পুস্তকে করিয়াছি।

বধূর কুমারীত্ব সম্বন্ধে কড়াকড়ি

নারীর সতীচ্ছদ (hymen) প্ৰথম পুরুষ-সংসর্গে ছিন্ন হইয়া থাকে। এ কথা এবং উহা যে অন্যান্য বহু কারণেও অজ্ঞাতসারে বা অসতর্কতা সত্ত্বেও ছিন্ন হইতে পারে, তাহা অন্যত্র বর্ণনা করিয়াছি। বধূর কুমারীত্ব বজায় ছিল কিনা ইহার নির্ভুল বিচার করা প্ৰায় এক রকম অসাধ্য, অথচ পূর্বেকার লোকদের এ সম্বন্ধে মাবাত্মক এক ব্যবস্থার উল্লেখ বাইবেলে দেখা যায় :-

“যদি কোনও পুরুষ বিবাহ করিয়া স্ত্রীর সংসর্গে আসিয়া উহাকে ঘৃণা করে এবং এই বলিয়া উহার সম্বন্ধে কুৎসা প্রচার করে যে, উহাকে বিবাহ করার পরে সে দেখিতে পায় যে সে কুমারী ছিল না, তাহা হইলে কন্যার পিতা ও মাতা নগরের প্রধানদের সম্মুখে উহার কৌমার্যের প্রমাণ উপস্থাপিত কবিবে। তাঁহারা বলিবে দেখুন, আমার কন্যাকে ইহার সহিত বিবাহ দিয়াছি, কিন্তু সে উহার সম্বন্ধে কুৎসা প্রচার করিয়া বলিতেছে যে, উহার কুমারীত্ব ছিল না, অথচ উহার কুমারীত্বের এই সকল প্রমাণ রহিয়াছে। ইহা বলিয়া তাহাদের প্রধানদের সম্মুখে কাপড় ছড়াইয়া দিবে।” (বোধ হয় প্রথম সহবাসের রক্তস্রাবের চিহ্নবাহী কাপড়ের কথা বলা হইতেছে।)

“ইহা করিলে প্রধানরা পুরুষটিকে ধরিয়া ধমকাইয়া দিবেন এবং তাঁহারা উহার নিকট হইতে একশত রৌপ্যমূদ্রা লইয়া কন্যার পিতাকে দিবেন, কারণ সে ইসরাইল বংশের একটি কুমারী কন্যার অখ্যাতি করিয়াছে। এবং ঐ কন্যা উহার স্ত্রীই থাকিবে এবং সারাজীবন সে স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিতে পারিবে না।” “আর যদি ঐ রূপ অভিযোগ সত্যই হয় এবং কন্যাটির কুমারীত্বের প্রমাণ না থাকে, তাহা হইলে প্রধানরা উহাকে তাহার পিতার বাড়ীর সামনে আনিবে এবং ঐ নগরের লোকেরা উহাকে পাথর ছুঁড়িয়া মারিয়া ফেলিবে, কারণ, সে পিছত্রালয়ে বেশ্যার মত ব্যবহার করিয়াছে। এইভাবে তোমরা তোমাদের মধ্য হইতে পাপ দূর করিবে।

তখনকার লোকদের অজ্ঞতা, পুরুষদের ধৃষ্টতা ও নারীর প্রতি আবিচারের নমুনা স্বরূপ পুরাতন ব্যবস্থা ধর্মবাণী বলিয়া শ্ৰদ্ধা পাইয়া আসিয়াছে। অথচ এইরূপ অভিমত ও ব্যবস্থা যে কত হাস্যাস্পদ ও নিষ্ঠুর তাহা সামান্য বিচার বুদ্ধিতেই প্রতীয়মান হওয়া উচিত। কন্যাটিকে পাথর দিয়া মারিয়া ফেলিতে হইবে, অথচ বরটি সামান্য জরিমানা দিয়াই সারিবে! বীরটির কুমারত্বের কোনও বিচার হইবে না? আর অসহায় পিতামাতা কি-ই বা প্ৰমাণ দিবে?

দুঃখের বিষয়, এখনও কোটি কোটি লোক নিজ নিজ ধর্মের পুরাতন শাস্ত্ৰ আওড়াইয়া বহু তথ্যের অকাট্যতা প্ৰমাণে ব্যস্ত, অথচ জ্ঞানবিজ্ঞান উহাদের অসারতা স্পষ্ট করিয়া প্ৰতিপন্ন করিতেছে।

কুমারীর প্রজনন

মানব-সমাজেও কুমারীর বা অপৈত্রিক প্ৰজনন সম্ভবপর এরূপ বিশ্বাস বহুকাল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। শুধু তাহাই নহে, এখনও ধর্মীয় উপখ্যান আশ্রয় করিয়া অসংখ্য লোক এমন অসাব সম্ভাব্যতায়ও বিশ্বাসবান। যৌনমিলন নোংরা ও অপবিত্ৰ বলিয়া যে ধারণার কথা একটু পূর্বেই উল্লেখ করি গিয়াছে তাহার বশবর্তী হইয়া অথবা জারজ জন্ম ঢাকিবার উদ্দেশ্যে যীশুখ্ৰীষ্ট, মহাবীর ইত্যাদি বহু ধর্মপ্রবর্তক যে কুমারী প্রজননের ফল, ইত্যাকার দাবিও করা হইয়া থাকে। জরোষ্টার (Zoroaster), টলেমী (Ptolemy), কনফুসিয়াস (Confucius), প্লেটো (Plato), জুলিয়াস সিজার (Julius Caesar), আলেকজাণ্ডার (Alexandar), এবং যীশুখ্রীষ্ট (Jesus Christ) এইরূপভাবেই জন্মিয়াছিলেন বলিয়া অলীক উপাখ্যান প্ৰচলিত আছে।

গ্ৰীক, হিন্দু ইত্যাদি পুরাণে দেবতাদের মানবী স্ত্রী থাকার কথা এমন কি নানা ক্ষেত্রে বহু-নারী-সংসর্গের কথা থাকায়, এবং এমন কি বাইবেলও স্বৰ্গীয় জীবের মানবনারীর সংসৰ্গ করিতে পারে এইরূপ উক্তি থাকায় উক্তরূপ প্রজননের ধারণা প্রচলিত হইয়া পড়িয়াছিল।

মধ্যযুগে ইংলণ্ড এবং মধ্য-ইউরোপের অনেক দেশে ডাইনী সন্দেহ কারিয়া বহু রমণীকে জীবন্ত দগ্ধ করা হইয়াছে। এই সকল ডাইনী নামধারী রমণীরা প্ৰকাশ্য বিচারালয়ে স্বীকার করিয়াছে যে, স্বৰ্গীয় দূত শয়তান কিংবা কোনও দৈত্য-দানব বর্ণনাতীত এক অদ্ভূত জীবের আকার ধারণ করিয়া গোপনে তাহাদের সঙ্গে মিলিত হইয়াছে এবং ফলে তাঁহারা গর্ভবতী হইয়া পড়িয়াছে। এইরূপ স্বীকারোক্তিতে বিচারে তাহারা ডাইনী সাব্যস্ত হইবে এবং সেইজন্য তাহাদের বধ করা হইবে ইহা জানিয়াও তাঁহারা অকপটে এইরূপ অদ্ভুত কাহিনী প্ৰকাশ করিত। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংলণ্ডের কোন এক ডাইনীর বিচারে প্রকাশিত হয় যে, ক্রমাগত তিন বৎসর ধরিয়া কোনও এক দানবের সঙ্গে সহবাসের ফলে সেই রমণী পর পর তিনটি সন্তান প্রসব করিয়াছে।

বাস্তবিকই কি কোন অতিপ্ৰাকৃত জীব, ভূতপ্ৰেত, শয়তান, দৈত্য-দানব বা বিধাতার কোনও অশরীরী প্ৰতিনিধি বক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়? স্বর্গ হইতে এক ঝলক দিব্যালোক আসিয়া যীশুমাতা মেরীকে গর্ভবতী করিয়া দিল, পঞ্চপাণ্ডবের জননী কুন্তী ও মাদ্রী দেবতাদের দ্বারা সন্তানবতী হইয়াছিলেন—ইত্যাদি কাল্পনিক উদ্ভব কিভাবে হইল, তাহা ভাবিবার বিষয়! ইহা ছাড়া পুরুষেরা দৃষ্টিমাত্র বা স্পর্শমাত্র অথবা পুরুষের আরামকেদারায় বসিয়া, শয্যায শয়ন করিয়া, পরিত্যক্ত বস্ত্ৰ পবিধান করিয়া সত্যু ঋতুমতী নারী গর্ভবতী হইয়াছে, এরূপ অলীক রূপকথা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং ভারতবর্ষেও এককালে প্ৰচলিত ছিল।

মধ্যযুগে খ্ৰীষ্টীয় এবং বৌদ্ধ জগতে অগণিত সন্ন্যাসীদের মঠ, সন্ন্যাসিনীদের আশ্রম এবং ভিক্ষু ও ভিক্ষণীদের বিহারে লক্ষ লক্ষ কুমার-কুমারী মুক্তিসাধনায় নিরত থাকিত। পঞ্চদশ শতকে ফ্রান্সেব আশ্রমবাসিনী রমণীগণ মঠাধ্যক্ষের নিকট অভিযোগ করিত যে, স্বপ্লেব ঘোবে ভূতপ্ৰেত আসিয়া তাহাদিগকে প্ৰলুব্ধ করিতে চেষ্টা করে এবং তাঁহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাহাদিগকে ধর্ষণ করিয়া যায়। বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের মধ্যেও স্বভাবতঃই আদিরসের পবিবেশন, প্ৰেম নিবেদন এবং নৈশ অভিসার চলিত। ফলে গর্ভসঞ্চার হইলে তাহা বিনাশের চেষ্টা করা হইত, আর উক্ত চেষ্টা বিফল হইলে সমস্ত দোষ চাপানো হইত ভূতপ্রেতের উপর!

প্রকৃত ব্যাপার

প্রকৃত ব্যাপারটা কি তাহা বিজ্ঞানীর দৃষ্টিভঙ্গী লইয়া এবার আলোচনা করা যাক :

(১) ভূতপ্ৰেত, শয়তান, জিন দেবতা কিংবা ঈশ্বরের প্রতিনিধি কোনদিনই মানবীকে ধর্ষণ করে না। ইহাদের অস্তিত্বই কাল্পনিক। বস্তুতঃ নারী পুরুষের দ্বারাই সন্তানবতী হইতে পারে, ইহাই বিজ্ঞানের অভিমত। অন্ধ ভক্তেরা ভক্তির পাত্রকে বাড়াইয়া তুলিবার বা ঐশ্বরিক গুণে বিভূষিত করিবার উদ্দেশ্যে এইরূপ আজগুবি গল্পের অবতারণা ও প্রচার করিয়া থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আসল পিতার নাম গোপন বা উহার ক্রিয়াকলাপকে আচ্ছাদন করিবার চেষ্টা করা হয়।

(২) কতক ক্ষেত্রে জারজ সন্তান জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া মহান হইয়া গেলে ভক্তরা তাঁহাদের পিতৃত্ব দেবতার বা ঐশ্বরিক উৎসে আরোপ করে। এরূপ ক্ষেত্রে দিব্যালোক, দূত বা ফেরেস্তার মধ্যস্থতার দাবি করা হইয়া থাকে!

(৩) পুরাতন ধর্মগ্রন্থে বা পুরাণাদিতে স্বর্গীয় জীবের বা দৈত্যদানবের মানবী সম্ভোগের কথা থাকাতে অনেক নারীর মতিভ্রম হইত বা হয়। অবিরত ঐরূপ ধ্যান-ধারণা করিতে করিতে নারীদের মস্তিষ্কবিকৃতি হয় এবং তাঁহারা নিজেদের ডাইনী শ্রেণীভুক্ত মনে করিয়া থাকে।

আমাদেব ভুল দেখা অনেকটা ভুল ভাবা-র উপর নির্ভর করে। জ্যোৎস্না রাত্ৰিতে ভযে ভয়ে হাঁটিতে হাঁটিতে পথে পড়িয়া থাকা দড়িকে সাপ মনে করা ও এরূপ সাব্যস্ত কবার পাব বাতাসে উহ নডিলে সাপই দৌডাইতেছে এরূপ বোধ হওয়া মোটেই আশ্চৰ্যজনক নহে। জ্যোৎস্নারাতে বাতাসে গাছের পাতা নড়িলে তাহার ছায়ার নাডা দেখিয়া প্ৰেতিনীর ঘোমটা নড়িতেছে মনে হইতে পারে। ইহাকে ইংরেজীতে Illusion কহে। এইরূপ ভাব মনে বদ্ধমূল হইয়া গেলে বাড়ীর বাহির হইলেন রাস্তায় সাপ দেখা ও ভয় পাওয়া বারে বারেই ঘটিতে পারে। এই অবস্থাকে Delusion বলে। একেবারে ভিত্তিহীন কল্পনাপ্রসূত দৃশ্য বা মূর্তিও ভীতিগ্ৰস্ত লোক দেখিতে পারে। ইহাতে চক্ষুর ভ্রম হয় মাত্র। অমাবশ্যার রাত্রে শ্মশানঘাটে ভূত চলাফেরা করে, এ কথা বিশ্বাস করিলে মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তি বিকট দৃশ্যাবলী দেখিতেও পারে। ইহাকে Hallucination কহে।

বস্তুতঃ ঐক্সপ ব্যক্তি ঐরূপ দৃশ্য দেখে না। কিন্তু দেখে বলিয়া মনে করে। ইহা চোখের ও মনের ভ্ৰম। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্ৰ চট্টোপাধ্যায় “শ্ৰীকান্ত” উপন্যাসের প্রথম ভাগে নায়ক শ্ৰীকান্তের বাজি রাখিয়া শ্মশানে যাওষার সময়ে নানারূপ দৃশ্য দেখা ও শোনার কথা মনে করুন। কোনও ভীরু অন্ধবিশ্বাসী লোক ঐগুলি ভূতের কাণ্ড বলিয়াই মনে করিতে পায়ে।!

নারীরা অন্ধবিশ্বাস বশতঃ ভূতপ্ৰেত বা জিন-ফেরেস্তায় বিশ্বাস করিলে উহাদের ঐরূপ ভুল দেখা কাল্পনিক সম্ভোগ হওয়া আশ্চৰ্য নয়। ইহাতে নারীর ভয়, বিক্ষোভ, উত্তেজনা, সুখানুভূতি এমন কি সহবাস-জনিত চরম আনন্দলাভও হইতে পারে। কল্পনায় ও স্বপ্নেও পুরুষের মিলন অনুভব করিয়া নারীর পুলকবোধ মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয়। এমনকি ঐ রূপ ভাবিতে ভাবিতে নারী কাল্পনিক গর্ভেরও লক্ষণ দেখিতে পারে। কিন্তু ঐ পৰ্যন্তই সম্ভব। উহার বেশী নহে। অর্থাৎ বাস্তব গর্ভের সঞ্চার কল্পনায়, স্বপ্নে বা ঐরূপ সম্ভোগভ্ৰমে হইতে পারে না। উহার জন্য পুরুষের শুক্ৰকীট ও নারীর ডিম্বের সংযোগের দরকার। এ সম্বন্ধে পরে আলোচনা করা হইতেছে।

(৪) বাস্তব গর্ভসঞ্চারের জন্য পুরুষ-সংসর্গ চাই। আজকাল যে কৃত্রিম গর্ভোৎপাদনের উপায় বাহিব হইয়াছে, উহাতেও পুরুষের শুক্র কীটের প্রয়োজন হয়ই। তাই যেখানে বাস্তব গর্ভসঞ্চাব বা সস্তানের জন্ম হয়, সেখানে ধবিয়া লইতে হইবে : (ক) কোনও কুচক্ৰী পুরুষ নারীকে ঘুমন্ত বা মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় সম্ভোগ করিয়াছে।। দৈত্য-দানবের মূতি পরিগ্রহ করিয়া অন্ধকারে বা নির্যালয প্রতারণ করা ও অসম্ভব নয়, প্ৰকৃত সম্ভোগ ব্যতিরেকেই ঘর্ষণাদির ফলে বা বস্ত্ৰখণ্ড হইতে নারীর গোপনাঙ্গে কোনও ক্রমে পুরুষের শুক্র কীট প্রবেশ করিবার সুযোগ পাইলে উহা গর্ভোৎপাদনা করিতে পারে। অথবা (খ) ধূর্ত নারী চালাকী করিয়া বা অনন্যোপায় হইয়া স্বীয় লজ্জা গোপন করিবার জন্য নানারূপ কল্পিত কাহিনী উদ্ভাবন করতঃ সরলপ্ৰাণ আত্মীয়স্বজন বা বিশ্বাসপ্রবণ সমাজের চক্ষে ধূলি দিতে চেষ্টা করিয়াছে। আধুনিক যুগেও ভূতপ্রেতের ঘাড়ে দোষ চাপাইয়া স্ত্রী-পুরুষেরা অবৈধ আচরণকে গোপন করিবার চেষ্টা করা যে না হয় এমন নহে। কোনও সুযোগে প্রেমিকপ্ৰেমিকার নিভৃত মিলন ঘটে, প্ৰাকৃতিক নিয়মে গর্ভসঞ্চারেব লক্ষণ প্ৰকাশ পাইয়া বসে-তখন উপায়? অসহায়া নারী ভান করিয়া ভূতাক্রান্ত হয়।

আমাদেব এত কথা বলা, দৃষ্টান্ত দেওয়ার উদ্দেশ্য ইহাই প্ৰতিপন্ন করা যে, যৌনবিজ্ঞানের আধুনিক নির্দেশাবলী অনেক ক্ষেত্রে পুরাতন ধর্মশান্ত্রের বিপরীত হইতে বাধ্য, কারণ তখনকার লোকদের জানিবার উপায় সীমাবদ্ধ ছিল এবং অন্ধবিশ্বাস সূক্ষ্ম অনুসন্ধানে প্ৰবৃত্তিকে নিরন্তু করিত। এখন শুধু মহাজনের উক্তির (words of wisdom) দোহাই দিলে চলিবে না, যুক্তিসঙ্গত প্ৰমাণাদি উপস্থাপিত করিতে হইবে।

পুরাতন রতিশাস্ত্রের ধারা

ধর্মানুশাসন অবলম্বন বা অগ্ৰাহ করিয়া নারীপুরুষের প্রেম-বিনিময়, মিলন-কৌশল, রতিবাসনাব বৈচিত্ৰ্য ইত্যাদি বিষয়ে প্রাচীন লেখকগণ নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং পুরাতন মতামত হইতে যাহা কিছু লিখিতেন, তাহাই ‘রতিশাস্ত্ৰ’ বলিয়া মনে করা হইত। ধর্ম নারীপুরুষের যৌনজীবনকে সংযত কবিয ফেলিয়াছে, উহা বিবাহবিধি এবং বিবাহিত নরনারীর মিলনবিধি রচনা করিয়াছে; কিন্তু প্ৰেম সীমা বা শাসন মানে নাই, নারীপুরুষের যৌনবাসনা ও মিলনাকাজক্ষা তার চরিতার্থতা চাহিয়াছে। বিবাহিত জীবনে নারীপুরুষ কর্তব্য পালন করিয়া যায় মাত্র, কিন্তু প্ৰেম পাত্রান্তরে নিবন্ধ হয় ইত্যাদি ধারণাই এইরূপ ‘রতিশাস্ত্ৰে’ দেওয়া হইত। ওভিডের প্ৰেমকাব্য সম্বন্ধে পূর্বেই বলা হইয়াছে। উহাতে যে প্রেমের কর্ষণের কথা বলা হইয়াছে তাহা স্বামী-স্ত্রীর প্ৰেম নয়-প্রেমিক-প্ৰেমিকার সম্বন্ধ। নির নারীকে চাহিবে, উভয়ে উভয়ের কৌশলজাল বিস্তার করিবে, মনস্তুষ্টি সম্পাদনা করিয়া একে অপরকে প্ৰেমাবদ্ধ করিবে, প্ৰেমাস্পদের মিলন সুমধুর করিবে-ইত্যাদিরই ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। বাৎস্যায়ন, কোকা পণ্ডিত প্ৰভৃতিরও যৌনশাস্ত্ৰ অনেকটা ধর্ম-নিরপেক্ষ।

এই সমস্ত শাস্ত্রের ভাল দিক হইল। এই যে, নারীপুরুষের সম্বন্ধই লেখকগণ স্বাধীনভাবে আলোচনা করিয়াছেন; আর ক্রটি হইল যে, ধর্মমতের ধার না ধারিলেও লেখকেরা অপরের মতামত নির্বিচারে উদ্ধৃত করিয়াছেন, প্ৰচলিত প্ৰবাদ ও ধারণা বিনা-পরীক্ষায় মানিয়া লইয়াছেন এবং নিজেদের অন্ধ-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের প্রভাব হইতে মুক্ত হইতে পারেন নাই।

এই সমস্ত গবেষকদের গবেষণা সদিচ্ছাপ্রণোদিত হইলেও কতকগুলি দোষে দুষ্ট ছিল :

(১) যাদু, মন্ত্র-তন্ত্র এবং দৈবে বিশ্বাস।
(২) আগ্ৰহাতিশয্যের প্রভাব।
(৩) পক্ষপাতদোষশূন্য পরীক্ষার অভাব।
(৪) পরমত উদ্ধৃতির অভাব।
(৫) সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের যন্ত্রপাতি ও সুযোগসুবিধার অবিদ্যমানতা।

আমি এখানে এগুলি সম্বন্ধে সামান্য কয়েকটি কথা বলিব :

(১) যাদু, তন্ত্ৰ, মন্ত্র, দৈব ইত্যাদিতে পূর্ধেকার লোকদের বিশ্বাস একরূপ সাৰ্বজনীনই ছিল। স্বৰ্গীয় দেবতা, দেবী, দৈত্য, দানব, ফেরেস্তা, জিন, পরী ইত্যাদি সম্বন্ধে কেবলমাত্র ধারণাই নহে, উহাদের কাল্পনিক নাম, শক্তি কর্মবিভাগ, কার্যকলাপ ইত্যাদির ধারণাও প্রচলিত ছিল ও প্রচারিত হইল। এক একটি উপাখ্যানে রীতিমত ধারাবাহিক বিবরণ দিয়া মানুষের বিশ্বাস উদ্রিক্ত করা হইত। বস্তুত; যাহা কিছু দুর্বোধ্য, দুজ্ঞেয় এবং আপাততঃ অতিপ্রাকৃতিক বলিয়া মনে হইত, তাহাকেই কেন্দ্ৰ করিয়া মানুষের দুর্বল মন বিশ্বাসযোগ্য কাহিনী রচনা করিয়া ফেলিত।

পুরাতন রতিশাস্ত্ৰে তাই মন্ত্ৰ-তন্ত্র দ্বারা নারী-পুরুষকে বশীকরণ, কবচ, যাদু, দরগায় শিরনি এবং মন্দিরে ভোগ ইত্যাদি দিয়া সন্তানলাভ, হিজিবিজি লিখিয়া অঙ্গে ধারণ করিয়া রতিশক্তিবৃদ্ধিকরণ ইত্যাদির উল্লেখ দেখা যায়।

আধুনিক শিক্ষিত মন অযৌক্তিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস হারাইয়াছে। আমার মাথার চুল অমুকে চুরি করিয়া নিয়া মন্ত্র সহকারে পোড়াইল, তাহাতে আমার কি অনিষ্ট হইতে পারে ইহা আমরা বুঝি না, বিশ্বাস করি না বলিয়া কোন অনিষ্ট হয় না।

প্রাচীন ও আধুনিক গবেষণার তুলনা

আধুনিক যৌনবিজ্ঞান যাদু, মন্ত্র, তন্ত্র, দৈব ও অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাসাবান নহে। শারীরতত্ব, মনস্তত্ব ও জড় পদার্থের গুণাগুণের উপরই উহা নির্ভরশীল। তাই উহা কাৰ্যপরম্পরা ও প্ৰকৃত কারণ উদঘাটন করিয়া প্ৰতিষেধ ও প্ৰতিকার করিবার এবং পরীক্ষামূলক অনুসন্ধানের পর কোন বস্তু সিদ্ধান্ত করা ও এরূপ সত্যই প্রচারের পক্ষপাতী।

(২) পুৰ্বেকার গবেষকদের আগ্রহাতিশয্যের জন্য গবেষণাফলে অনেক ত্রুটি রহিয়া গিয়াছে। অতিবিশ্বাসের দরুন সামান্য পরীক্ষা দ্বারাই সন্তুষ্ট হইয়া গবেষকেরা মহামূল্য আবিষ্কারের আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেন। বহু ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্ৰকৃতির উপর ঐ রূপ আবিষ্কারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করিয়া দেখিবার মত ধৈৰ্য-এবং বোধ হয়। সুযোগও তাঁহাদের থাকিত না। তাই এইরূপ মনোভাব বা প্ৰকৃতি লইয়া তাঁহারা বহু ঔষধ, প্রক্রিয়া, তথ্য ইত্যাদি ২-৪টি ক্ষেত্রে সফল হইতে দেখিয়া ও বহু অসাফল্যের দৃষ্টান্তগুলি অগ্রাহ কারিয়া, তাহাদের সম্বন্ধে জোরের সঙ্গে অকাট্যতার দাবি করিয়া বসিতেন।

আধুনিক যৌনবিজ্ঞানে কোনও তথ্য বা সত্য কেহ আবিষ্কার করিলে তাহার সত্যতা যাচাই করিবার জন্য সারা পৃথিবীর গবেষকদের আহ্বান করা হয়। বহু ক্ষেত্রে পরীক্ষা দ্বারা ঐ তথ্য নির্ভুল প্ৰমাণিত না হওয়া পৰ্যন্ত অকাট্যতার দাবি কেহ করেন না। আবার পরবর্তী কালের গবেষণার ফল অন্যরূপ দাঁড়াইলে কেহ অযথা পশ্চাৎমুখী হইয়া রহেন না।

(৩) পূর্বেকাব গবেষকদের পক্ষপাতিদোষ তাহাদের পরীক্ষা কাৰ্য এবং উহার ফল-বিশ্লেষণকে অনেকটা আড়ষ্ট করিয়া ফেলিয়াছিল। গোপনে প্রচারিত মতবাদের মূল্য অধিক বলিয়া অনুমিত হইত। এক একটি সূত্র বাহির করিয়া উহা সযত্নে গোপন রাখিয়া পুত্রপৌত্ৰাদিক্ৰমে চালাইয়া দিবার চেষ্টাও কম হয নাই। এইজন্যই স্বপ্নে প্ৰাপ্ত, সন্ন্যাসীপ্রদত্ত অথবা দৈব আখ্যাত ঔষধ বা প্রক্রিয়ান্য সাধারণ লোকের বিশ্বাস বেশী ছিল।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাপ্রণালী ইহার ঠিক বিপরীত। শক্রকেও পরীক্ষা করিয়া মতামত প্ৰকাশ করিতে আমন্ত্রণ করা আজকালকার গবেষকদের রীতি। নিরপেক্ষ বিচার বিশ্লেষণ দ্বারাই সত্য প্রচারিত হয় এবং তাহাই আধুনিক যৌনবিজ্ঞানের ভূষণ।

(৪) পূর্বেকার গবেষকদের একটা দোষ ছিল পরমত উদ্ধৃতি। অবশ্য আজকালও এক গবেষক অন্য গবেষকদের দোহাই দিয়া থাকেন, কিন্তু নির্বিচারে নয়। বিচার, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ না করিয়াই পূর্বকালে পণ্ডিতের পর পণ্ডিত বহু তথ্য ঔষধ ও প্রক্রিয়া সম্বন্ধে সত্য, পরীক্ষিত অভ্ৰান্ত, নিঃসন্দেহ প্রভৃতি মন্তব্য করিয়া গিয়াছেন*; কিন্তু কাহার কাহার দ্বারা কত ক্ষেত্রে পরীক্ষিত বা লেখক নিজে পরীক্ষা করিয়াছেন কিনা অপবাদের পরীক্ষায় ও লেখকদের নিজস্ব পরীক্ষায় ঠিক ঠিক কত ক্ষেত্রে সফলতা এবং কত ক্ষেত্রে বিফলতা লাভ হইয়াছিল সে বিষয়ে উল্লেখ না থাকায় ঐ সব মতেব মূল্য কমিয়া গিয়াছে। আধুনিক যৌনবিজ্ঞান সূক্ষ্মভাবে যাচাই করিয়া তাহার ফলাফল লিখিয়া না। রাখিয়া এরূপ দৃঢ়তার সহিত সত্য, পরীক্ষিত প্ৰভৃতি মতামত প্ৰকাশ করে না।

————–
*আল্লামা জালালুদ্দীন সাইয়ুতীর “কিতাবূৎ তিব্বি উয়াল হিকমাহ্‌” আরবী কেতাবে ঐরূপ ‘সত্য ও পরীক্ষিত’ কতগুলো উদ্ধৃতির অসারতা দেখিয়া আমি দুঃখিত হইয়াছিলাম।
————–

(৫) সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের যন্ত্রপাতি এবং অপর সুযোগ-সুবিধা তখনকার দিনে ছিলও কম। এজন্য গবেষকদের বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না। শরীর ব্যবচ্ছেদ করিয়া দেখিবার মত প্ৰবৃত্তি বা সামাজিক অনুমতিও এই সেদিন মাত্র হইয়াছে। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কার না হইলে আমরা এখনও পর্যন্ত শুক্ৰকীট এবং ডিম্বের অস্তিত্বই ধরিতে পারিতাম না। জন্ম রহস্য উদঘাটন করা সম্ভবপর হইয়াছে ন্যূনাধিক মাত্র একশত বৎসর পূর্বে। আধুনিক যৌনবিজ্ঞান শারীরতত্ত্ব, মনস্তত্ব, রসায়নশাস্ত্ৰ, পদার্থবিদ্যা, সমাজতত্ত্ব, সংখ্যাবিজ্ঞান (Statistics), চিকিৎসা-বিজ্ঞান প্ৰভৃতি হইতে সাহায্য লয় এবং ঐ সকল জ্ঞানশাখার বহুমূল্য তথ্যাদির দ্বারা উপকৃত হয়।

মোট কথা, পুরাতন যৌনশাস্ত্ৰ ধৰ্ম, অধৰ্ম, কাহিনী, উপাখ্যান, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবান্বিত, এবং বিশ্লেষণ-রীতি ও পরীক্ষার ফলাফল লিখিয়া রাখিয়া তাহা প্রচারের প্রচলন না থাকায়, পরমত উদ্ধৃতির দ্বারা কণ্টকিত হইয়াছে এবং অসংলগ্ন ও অসংবদ্ধ তথ্যাবলীর সমষ্টিই রহিয়া গিয়াছে। আধুনিক যৌনবিজ্ঞান পূর্বমতের সত্যটুকু গ্রহণ ও অসারটুকু বর্জন করিয়া নূতনভাবে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণাদির দ্বাবা নানা বিজ্ঞান শাখা হইতে আরও নূতন তথ্যাদি আহরণ করিয়া মানবজীবনকে সুখী ও সমৃদ্ধ করিতেছে।

পাঠক-পাঠিকার নিকট নিবেদন, তাহারা যেন আমার পুস্তকসমূহে আলোচিত বহু বিষয়ে নিজেদের পূর্বমত বা সিদ্ধান্ত খণ্ডিত হইতে দেখিয়া অসন্তুষ্ট না হন। আমি যৌনবিজ্ঞানের আলোচনা করিতেছি; রতিশাস্ত্রের নয়।

Print Friendly, PDF & Email
%d bloggers like this: