খবরটা ছাপা হয়েছে। পত্রিকার প্রথম পাতায়। ছবি সহ বক্স নিউজ। এখনকার পত্রিকাগুলি অন্যরকম হয়ে গেছে, গুরুত্বহীন খবরগুলি প্রথমপাতায় ছাপা হয়। মিথ্যা খবর দিয়ে লিড নিউজ আসে। আগে ধর্ষণ সংক্রান্ত খবরগুলি ছাপা হত ম্যাগাজিনে। দৈনিক পত্রিকাওয়ালারা দেখল–এমন একটা মজাদার আইটেম তাদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে–তারাও শুরু করল ধারাবাহিক ধর্ষণ প্রতিবেদন।

ধর্ষণের পরের আইটেম ধারাবাহিক গালাগালি প্রতিবেদন। সরকার প্রধান বিরোধীদলকে গালি দিয়ে কী বললেন, আবার বিরোধীদলের প্রধান সরকারকে গালাগালি দিয়ে কী বললেন তার বিশদ বর্ণনা।

রাজনীতির খেলা যত জমে পত্রিকাওয়ালাদের ততই রমরমা। রাজনীতিবিদরা তাদের খেলা খেলেন, পত্রিকাওয়ালারা খেলেন তাদের খেলা। তারা যে নিরপেক্ষ ভাবে খেলেন, তা না। প্রতিটি পত্রিকামালিক কোনো–না–কোনো রাজনীতিবিদের থলেতে বসে খেলেন। এই সিনড্রমের একটা নাম ক্যাঙ্গারু সিনড্রম। ক্যাঙ্গারুর ছানার মত থলোয় বসে খেলাধুলা।

আজকের প্রথম পাতায় বক্স করে ছাপা সংবাদটার সঙ্গে রাজনীতি জড়িত না, হিমুনীতি খানিকটা জড়িত বলে খবরটা দুবার পড়লাম। পত্রিকা পড়া আমার কাজ না। আজকের কাগজটা কিনিয়েছি। জুঁই এর কোন খবর পত্রিকায় উঠেছে কি-না দেখার জন্যে। পুলিশ কর্মকর্তার কন্যা নিখোজ এই শিরোনামে পত্রিকাওয়ালারা কিছু লিখেছে কি? কিন্যা নিখোজ আইটেম ধর্ষণের মত ইন্টারেষ্টিং না হলেও খারাপ না।

এ জাতীয় কোনো খবর নেই। তবে অন্য খবর আছে। প্রথম পাতায় সেই খবর পেয়ে আমার চক্ষু স্থির হয়ে গেল–

তপ্ত নগরীতে প্রথম বৃষ্টিধারা
এক দল নগ্ন মানুষের উল্লাস নৃত্য

(নিজস্ব প্রতিবেদন)

দীর্ঘ দাবীদাহের পর গতকাল রাজধানীতে শান্তির বারিধারা হয়েছে। রাত একটার দিকে হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তুমুল ঝড়ো বাতাস বইতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুষল ধারে বর্ষণ শুরু হয়। দাবীদাহে অতিষ্ট মানুষের মনে নেমে আসে প্রশান্তি।
এই সঙ্গে নিউ পল্টন এলাকায় একটি অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। জনৈক বিশালবপু মুসলেম মিয়ার নেতৃত্বে একদল মানুষ বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ দিগম্বর হয়ে নাচতে শুরু করে। তাদের প্রত্যেকের গলায় ছিল বেলী ফুলের মালা। তাদের উদ্যাম নৃত্য দেখে আতংকিত কিছু মানুষ পুলিশে খবর দেন। পুলিশ অকুস্থলে উপস্থিত হওয়া মাত্র নৃত্যরত নগ্নদলের সবাই ছত্ৰভঙ্গ হয়ে পলায়ন করে, শুধু নাটের গুরু মুসলেম মিয়া পুলিশের হাতে ধৃত হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মুসলেম বলে, প্রথম বৃষ্টিতে নগ্ন নৃত্যু করলে পাপ কাটা যায়। সে যেহেতু বিরাট পাপী ব্যক্তি, পাপ কাটানোর জন্যেই সে এই কাণ্ড করেছে। পুলিশ আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে তাকে দুদিনের রিমান্ডে নেবার আয়োজন করেছে।
পুলিশ হাজতে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে মুসলেম মিয়ার কিছু কথাবার্তা হয়। প্রতিবেদককে সে জানায়— প্রথম বৃষ্টিতে নগ্ন স্নান করার ফলে সে এখন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ। এমন নিষ্পাপ অবস্থাতেই সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চায়। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। উল্লেখ্য প্রতিবেদকের সঙ্গে কথাবার্তা চলাকালীন পুলিশ কর্তৃপক্ষ তাকে পরিধানের জন্যে একটি লুংগী দিলে সে তা প্রত্যাখ্যান করে।
ঘটনাটি জনমনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। আগামীকাল মুসলেম মিয়া এবং তার জীবন দর্শন নিয়ে আমরা একটি সম্পূর্ণ প্রতিবেদন পাঠকপাঠিকাদের উপহার দেব।

প্রতিবেদন পড়ে আমি হিমু কিছুক্ষণ ঝিমু হয়ে বসে রইলাম। পত্রিকাওয়ালারা মুসলেম মিয়াকে নিয়ে যে হৈ চৈ টা করবে তা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। প্রতিবেদনের পর প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে। একদল মানুষের কাছে সে রাতারাতি আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পন্ন সাধক হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে। তাকে নিয়ে নানান ধরনের বিস্ময়কর খবর রটিতে থাকবে। একটা সময়ে রাজনীতিবিদরা, মন্ত্রীরা, বড় বড় আমলারা গভীর রাতে গোপনে গাড়িতে করে তার কাছে আসতে শুরু করবেন। কারণ নেংটি বাবার দোয়া তাদের দরকার।

পুলিশ দুএকদিনের মধ্যে আমাকে এসে ধরে নিয়ে যাবে এই আশঙ্কাও আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না। মুসলেম মিয়া আমার নামটা পুলিশের কাছে বললেই আমি ফেঁসে যাব। পুলিশ জোর তদন্ত শুরু করে দেবে। যে–কোনো হাস্যকর ব্যাপারে জোর তদন্ত চালাতে পুলিশ বড়ই ভালবাসে।

আমার মনে ক্ষীণ সন্দেহ হতে লাগল— আজই আমাকে পুলিশ ধরবে, ঘন্টা দুতিনেকের মধ্যেই পুলিশের জীপ এসে উপস্থিত হবে। এটাকে সিক্সথ সেন্স বলব কি-না বুঝতে পারাচ্ছি না। সিক্সথ সেন্সই হোক আর সেভেনথ সেন্সই হোক হাজতে যেতে হলে তার জন্যে প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। বাথরুম সারিতে হবে (বড়টা)। হাজতে নেবার সঙ্গে–সঙ্গে প্রথম যে জিনিসটা পায় তার নাম বড় বাথরুম। হাজতে বাথরুমের ব্যবস্থা নেই। বাথরুম পেলে গার্ড পুলিশের কাছে অনেকক্ষণ ধরে হাত কচলাতে হয়, নরম গলায় অনেক আবেদন নিবেদন করতে হয়। গার্ড সাহেবের দয়া হলে হাজাতের ঘর খুলে তিনি বাথরুমে নিয়ে যান।

মাথার চুল কাটতে হবে। সবচে ভাল মাথাটা কামিয়ে ফেললে। চুল বড় বড় থাকলে খুবই গরম লাগে। তারচেয়েও বড় কথা প্রথম রাত কাটিয়ে দ্বিতীয় রাতে পড়লেই মাথা ভর্তি হয়ে যায় উকুনে। উকুনগুলি বাইরে থেকে আসে, না এক রাতেই মাথায় গজায় এই রহস্যের মিমাংসা আমি এখনো করতে পারিনি। হাজাতি–উকুনের আরেকটা মজার ব্যাপারে হচ্ছে, হাজত থেকে ছাড়া পাবার সঙ্গে–সঙ্গে উকুনও চলে যায়। হাজতি–উকুন মনে হয় হাজত ছাড়া অন্য কোনো পরিবেশে বাঁচে না।

আমি হাজত বাসের প্রস্তুতি নিয়ে বড় বাথরুম সারলাম। রাস্তার পাশে ইটালিয়ান সেলুন থেকে তিন টাকা দিয়ে মাথা নেড়া করলাম। নাপিত আবার মাথা নেড়ার পর কিছুক্ষণ মাথা মালিশ করে দিল। যে উৎসাহের সঙ্গে নাপিত মাথা মালিশ করল তাতে মনে হল–মাথা মালিশ করে সে খুবই মজা পেয়েছে।

মেসে ফিরে দেখি পুলিশ এসে গেছে। একজন সাব ইন্সপেক্টর ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে আমার ঘরের সামনে পায়চারি করছেন। তিনি আমাকে দেখেই প্রায় হুঙ্কার দিলেন। ভুল ইংরেজিতে বললেন–You name Himu?

আমি বললাম, ইয়েস স্যার। I name Himu.

তিনি দ্বিতীয়বার হুংকার দিলেন— এবারের হুংকার খাটি বাংলা ভাষায়, চল থানায় চল।

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, স্যার চলুন।

 

থানায় ওসি সাহেব আমার পূর্ব পরিচিত। নাম রকিব উদ্দিন, চাঁদপুরে বাড়ি। বছর দুই আগে তিনি কিছুদিন আমাকে হাজতে রেখেছিলেন। অত্যন্ত উগ্রমেজাজের মানুষ, তবে শেষের দিকে তাঁর সঙ্গে আমার খুবই খাতির হয়ে গিয়েছিল। সেই খাতির এখন কাজ করার কথা না। পুলিশ বড়ই বিস্মরণ প্রিয়। তারা অতীত মনে রাখে না। রকিবউদ্দিন সাহেব মনে রাখবেন সেই আশা আমি করিনি। দেখা গেল। ভদ্রলোকের মনে আছে। আমার দিকে কিছুক্ষণ বিরক্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, বসুন। আমি বসলাম। যে সেকেন্ড অফিসার আমাকে ধরে নিয়ে এসেছেন রকিব উদ্দিন সাহেব তার দিকে তাকিয়ে আগের চেয়েও বিরক্ত গলায় বললেন, হ্যাণ্ডকাফ লাগিয়েছেন কেন? হ্যান্ডকাফ লাগানোর দরকার ছিল না। খুলে দিন।

আমার হ্যান্ডকাফ খুলে দেয়া হল। ওসি সাহেব চা দিতে বললেন।

চা দেয়া হল।

সিগারেটের প্যাকেট এবং দেয়াশলাই আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি সিগারেট ধরালাম।

রকিবউদ্দিন এবার আমার দিকে ঝুকে এসে বললেন, আজই মাথা কামিয়েছেন?

আমি বললাম, জ্বি।

মাথা কামিয়েছেন কেন?

পুলিশের লোকজন সত্যি কথা কখনই গ্ৰহণ করতে পারে না। উদ্ভট মিথ্যা তারা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করে। মাথা কেন কামিয়েছি। এই সত্য বলে লাভ হবে না, নানান ভাবে পেঁচাবে। মাথা কামানো নিয়ে ঘন্টা খানিক কথা বলতে হবে তারচে মিথ্যা বলাই ভাল। আমি বললাম, আজ একটি বিশেষ দিন। বৌদ্ধ পূর্ণিমা। এই পূর্ণিমায় মহামতি সিদ্ধাৰ্থ মস্তক মুন্ডন করে গৃহত্যাগ করেন। তাকে স্মরণ করে এই কাজটা করেছি। এখন স্যার বলেন। আপনি কেমন আছেন?

ওসি সাহেব বিরস গলায় বললেন, ভাল আছি।

আমাকে কেন আনিয়েছেন জানতে পারি কি স্যার?

হ্যাঁ জানতে পারেন। কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করব?

মুসলেম মিয়া সম্পর্কে?

কোন মুসলেম মিয়া?

খবরের কাগজে যার নিউজ ছাপা হয়েছে। নাঙ্গু বাবা।

ওসি সাহেব আগ্রহের সঙ্গে বললেন, মুসলেম মিয়াকে চেনেন না-কি?

জি চিনি।

রকিবউদ্দিন সাহেব বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, বলেন কী?

তার গলার আগ্রহ থেকেই বোঝা যাচ্ছে নাঙ্গু বাবা ইতিমধ্যেই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তাকে নিয়ে গল্প গুজব ছড়াচ্ছে। আমি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললাম, সামান্য পরিচয় আছে।

কোথায় পরিচয়?

আমি রাতে বিরাতে হাঁটি তো। সেখানেই দেখা।

লোকটার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা তো প্ৰচণ্ড।

তাই না-কি?

হ্যা প্রচন্ড। অন্তর্ভেদি দৃষ্টি। যখন তাকায় তখন মনে হয়— মনের ভেতর যা আছে সব পড়ে ফেলেছে। তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসে। ঠান্ডা টাইপ হাসি। এরকম হাসি আমি কাউকে হাসতে দেখিনি।

সে কি এই হাজতেই আছে?

না। উনি আছেন ধানমণ্ডি থানায়।

ওসি সাহেব আমার দিকে আরো খানিকটা ঝুকে এসে গলা নামিয়ে ফিলফিস করে বললেন, খুবই স্ট্রেঞ্জ একটা ঘটনা। আপনাকে না বলেও পারছি না। ধানমন্ডি থানায় ওসি সাহেবের এক শালী।–মেনস্ট্রেশন টাইমে তার প্রচণ্ড ব্যথা হয়। মাঝে মধ্যে অজ্ঞানও হয়ে যায়। তার ব্যথা উঠেছে ওসি সাহেব কি মনে করে মুসলেম সাহেবকে ঘটনাটা বললেন। শুনেই মুসলেম সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই মেয়ের ব্যথা চলে গেল।

ও।

এই ভাবে ও বললেন কেন? বিশ্বাস হচ্ছে না। ধানমন্ডি থানার ওসি সাহেব নিজের মুখে ঘটনাটা আমাকে বলেছেন।

আমরা কি মুসলেম মিয়াকে নিয়েই কথা বলব?

অবশ্যই না। আসুন যে জন্যে ডেকেছি। এটা শেষ করি তারপর আপনাকে নিয়ে মুসলেম সাহেবের কাছে যাব। আপনার সঙ্গে পরিচয় কেমন?

খুবই খারাপ ধরনের পরিচয়। আমাকে দুচোখে দেখতে পারে না। একবার দাঁত–টাত বের করে কামড়াতে এসেছিল।

তা হলে থাক। এই ধরনের মানুষ অবশ্যি খুব সামান্যতেই ভায়োলেন্ট হন। এদের ঘাটাতে নেই। আচ্ছা এখন আসল কাজে আসি। তার আগে আর এককাপ চ খেয়ে নেবেন।

জ্বি না।

কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দেবেন। মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। অনুমানে কিছু বলবেন না। প্রশ্নের উত্তর যদি জানা না থাকে বলবেন জানি না।

জ্বি আচ্ছা।

হাদিকে চেনেন?

একজনকে চিনি। হাদিউজ্জামান খান তক্ষকের মত মুখ। লম্বা।

তার চেহারার বর্ণনা দিতে তো আপনাকে বলিনি। তাকে চেনেন কি না জানতে চেয়েছি।

চিনি।

তার সঙ্গে শেষ দেখা করে হয়েছে?

গত পরশু।

কী কথা হয়েছে?

কোনো কথা হয়নি।

তাকে চেনেন। অথচ কথা হয়নি কেন?

মালিহা খালার বাড়িতে উনি ফ্যান নামাতে গেছেন। কাজে ব্যস্ত ছিলেন বলে কথা হয়নি।

ফ্যান কি একা একা নামাচ্ছিল না। সঙ্গে কেউ ছিল?

একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ছিল।

ইলেকট্রিক মিস্ত্রীর নাম?

নাম জানি না। ইলেকট্রিক মিস্ত্রী বা কল সারাই মিস্ত্রী, কিংবা টেলিফোনের মিস্ত্রী–এদের নাম সাধারণত জিজ্ঞেস করা হয় না।

যে ইলেকট্রিক মিস্ত্রীকে হাদিউজামানের সঙ্গে দেখেছিলেন তাকে দেখলে চিনতে পারবেন?

হ্যাঁ পারব।

তা হলে একটু হাজতে আসুন–আইডেনটিফাই করবেন?

ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ভয়ংকর কিছু কি করেছে?

সে একা করেনি দুজনে মিলে করেছে। আচমকা খুন একজন করে। কিন্তু ক্যালকুলেটিভ মার্ডারের বেলায় একমপ্লিশ লাগে। খুন করেছে হাদিউজ্জামান, ইলেকট্রিক মিস্ত্রী সালাম হল তার একমপ্লিশ।।

খুন কে হয়েছে?

মালিহা বেগম। আপনার খালা হন সম্ভবত।

আমি অবাক হয়ে রকিবউদ্দিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার এক আত্মীয় খুন হয়েছে এই খবরটা ওসি সাহেব আমাকে এখন দিচ্ছেন। খুন-টুনের ব্যাপারগুলি পুলিশের কাছে এতই গুরুত্বহীন?

ওসি সাহেব বললেন, আপনার খালার খুন হবার খবর আপনি পাননি?

জ্বি না।

কাগজে উঠেছে তো। কাগজ পড়েননি?

খুন খারাবির নিউজগুলি আমি পড়ি না। এখন মনে হচ্ছে পড়া দরকার। আমার খালু, আরেফিন সাহেব উনি কোথায়?……

উনাকেও খুন করার চেষ্টা হয়েছে। উনি হাসপাতালে আছেন। ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন।

ও আচ্ছা।

ওসি সাহেব বললেন, চলুন তো আমার সঙ্গে সালামকে আইডেনটিফাই করবেন।

হাদি সাহেবও কি হাজতে আছেন?

হ্যাঁ। আছে। তবে জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না। যে ডলা খেয়েছে। তার খবর হয়ে গেছে।

হাজাতের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় দুজনেই পড়ে আছে। মুখ ফুলে এমন হয়েছে যে অতি পরিচিত জনেরও এদেরকে চেনার কথা না। ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ছেলেটা পড়ে আছে খালি গায়ে। তার বুক হাপরের মত ওঠানামা করছে। আমি আমার জীবনে কারো বুক এ ভাবে ওঠানামা করতে দেখিনি। একেকবার বুক ফুলে উঠছে আর মনে হচ্ছে ছেলেটার হৃদপিন্ড পােজর ফুড়ে বের হয়ে আসবে।

ওসি সাহেব বললেন, চিনতে পারছেন?

আমি বললাম, না।

হাদিকেও চিনতে পারছেন না?

জ্বি না। যে মার মেরেছেন— মুখ যে ভাবে ফুলেছে আমি কেন পাখি এসেও চিনবে না।

পাখি কে?

পাখি তাঁর মেয়ে। বারো তারিখ মেয়েটার জন্মদিন। আমার দাওয়াত আছে। কোনো কাজ না থাকলে সেদিন আপনিও চলুন।

ওসি সাহেব রাগী গলায় বললেন— আপনার খালা খুন হয়ে গেছেন আর আপনার মাথায় ঘুরছে— জন্মদিনের দাওয়াত? আপনার ফালতু কথা বলার অভ্যাসটা দূর করুন। থানায় এসে একটা বাড়তি কথা বলবেন না।

জ্বি আচ্ছা। আমি কি হাদি সাহেবের সঙ্গে দুটা কথা বলব?

বলুন।

আমি অনেকক্ষণ হাদি সাহেব, হাদি সাহেব বলে ডাকলাম। কেউ জবাব দিল না। অজ্ঞান মানুষ প্রশ্নের জবাব দেয় না। তবে ইলেকট্রিক মিস্ত্রী উঠে বসে আমার দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করে কী যেন বলল। তার ঠোঁট কেটে দুফাক হয়ে গেছে, দাঁত ভেঙেছে। সে হাত তুলে আমাকে সালামও দিল। মনে হয় আমাকেও পুলিশের কেউ ভেবেছে।

আমি ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি নিশ্চিত যে এরাই খুন করেছে?

ওসি সাহেব বললেন, অবশ্যই। কিছু–কিছু খুনের মিমাংসা অতি দ্রুত হয়ে যায়, আবার কিছু কিছু খুনের মিমাংসাই হয় না। এই ক্ষেত্রে খুনের মিমাংসা দ্রুত হয়ে গেল।

হাদি সাহেব স্বীকার করেছেন যে খুনটা উনি করেছেন?

সে করে নাই। তবে সালাম করেছে। তাকে রাজসাক্ষি করে দেব। ওসি সাহেব সালামের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি রে তুই খুন করেছিস?

সালাম হ্যাঁ–সুচক মাথা নাড়ল। তার কাটা ঠোঁটের কোণায় সামান্য হাসিও দেখা গেল। যেন খুন করে সে আনন্দিত।

আমরা হাজত থেকে বের হয়ে এলাম। ওসি সাহেব বললেন, এ্যামেচার মাের্ডারার। হাদি আপনার খালার ঢাকার বিষয় সম্পত্তির লোভে খুনটা করেছে। ক্যালকুলেশনস ছিল পুওর। ভজঘট করে ফেলেছে। বড় ক্রাইমের ক্রিমিন্যাল সব সময় ধরা পড়ে যায়। ক্রাইমে সে কিছু–না-কিছু খুঁত রেখে যায়। নিজের কিছু চিহ্ন রাখে। একমাত্র পুলিশই পারে কোনো রকম খুঁত ছাড়া ক্রাইম করতে। কারণ তারা খুঁতগুলি জানে।

স্যার আপনার কথা শুনে ভাল লাগছে।

ভাল লাগার মত কী কথা বললাম। ভাল লাগার মত আমি কিছুই বলিনি। আপনি আপনার স্বভাবমত আমাকে নিয়ে ফান করার চেষ্টা করছেন। দয়া করে করবেন না।

জি আচ্ছ। আমি কি চলে যাব, না থাকব?

তদন্তের স্বার্থে আমার উচিত আপনাকে থানায় আটকে রাখা। কিন্তু আমার উপর নির্দেশ আছে আপনাকে ছেড়ে দেয়ার।

নির্দেশটা কে দিয়েছেন? জুঁই-এর বাবা?

হ্যা স্যারের নির্দেশ।

জুঁই-এর এখনো কোনো খবর পাওয়া যায়নি?

আমি জানি না।

আমি কি টেলিফোনে একটু খোঁজ নিয়ে দেখব?

রকিবউদ্দিন সাহেব কিছুক্ষণ ভাবলেন তারপর টেলিফোন সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি আমার মোবাইলে টেলিফোন করলাম। সঙ্গে সঙ্গেই জুঁই-এর বাবার গলা শোনা গেল। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বললেন, হ্যালো হ্যালো। কে বলছেন?

স্যার আমি হিমু।

ও তুমি।

জুঁই-এর কি কোনো খবর পাওয়া গেছে?

না।

টেলিফোন করেনি?

না।

আধ্যাত্মিক লাইনে চেষ্টা চালালে কেমন হয়। স্যার?

তার মানে?

খুবই উচ্চশ্রেণীর এক সাধক ধানমন্ডি থানা হাজতে আছেন। তার নাম মুসলেম মিয়া। তবে এই নামে কেউ তাকে ডাকে না। এতে বেয়াদবী হয় এই জন্যেই। কেউ–কেউ তাকে ডাকেন নাঙ্গু বাবা, কারণ তিনি নগ্ন থাকেন। আবার কেউ–কেউ ডাকেন। বেলী বাবা। কারণ উনি সব সময় বেলী ফুলের মালা গলায় দিয়ে থাকেন। অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন স্যারশীত কালে যখন বেলী ফুলের সিজন না, তখনো তাঁর গলায় টাটকা বেলী ফুলের মালা দেখা যায়। বাবার কাছে একবার গিয়ে দেখলে হত।

আমি কি করব না করব তা আমি ঠিক করব। তোমাকে ভাবতে হবে না।

জি আচ্ছা।

তুমি কোথেকে কথা বলছ?

থানা থেকে। আমার এক খালা খুন হয়েছেন। পুলিশ এই জন্যে আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে। তবে ওসি সাহেব বলেছেন, ছেড়ে দেবেন।

তুমি আর কিছু বলবে না-কি অর্থহীন বক বক করবে? যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা না–থাকে তাহলে টেলিফোনটা রাখা। আমি এই টেলিফোনের লাইনটা সব সময় খোলা রাখতে চাই।

জি আচ্ছা স্যার।

আমি টেলিফোন নামিয়ে রাখলাম। ওসি সাহেবের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে পথে নামলাম।

আজ সারাদিনে কোথায়–কোথায় যাব ঠিক করা দরকার। মালিহা খালার বাড়িতে যাব না। মৃত মানুষকে দেখতে যাওয়া অর্থহীন। এখানে দেখাটা হয় একতরফা। একজন দেখে–অন্যজন তাকিয়ে থাকে, দেখে না।

আরেফিন খালু সাহেবকে অবশ্যই দেখতে যাব। জীবন–মৃত্যুর মাঝখানে যারা থাকে তাদের দেখতে বড় ভাল লাগে। এরা তখন অদ্ভুতঅদ্ভুত কথা বলে। একজনকে পেয়েছিলাম যে বারবারই বিস্মিত হয়ে বলছিল–বেহেশত দেখতে পাইতেছি। আচানক বিষয় বেহেশত দেখতেছি। ও আল্লা একটা বাগান। বাগানটা পানির মধ্যে। কী সুন্দর টলটিলা পানি। পানির মধ্যে এইটা কী আচানক বাগান। ঘর বাড়ি আছে— পানির রং বদলাইতেছে–ও আল্লা, বাগানের গাছগুলান হাসে। গাছ মানুষের মত হাসে। গাছগুলা আবার এক জায়গা থাইক্যা আরেক জায়গায় যায়… এইটা কি পানির মধ্যে পাখি উড়তাছে!!…

হাদি সাহেবের কন্যা পাখির সঙ্গেও দেখা করা দরকার। বেচারীর জন্মদিন যেন ভেস্তে না যায়। সার্কাস পাটিরও খোেজ নেয়া দরকার। কারো কাছে যদি হাতির বাচ্চা থাকে তা হলে একদিনের জন্যে ভাড়া করতে চাই। কে জানে একদিনের ভাড়া কত?

আজ আকাশ মেঘমেদুর। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। এক পশলা বৃষ্টি মনে হয় হয়েছে। পিচ ঢালা রাজপথ বৃষ্টির পানিতে ভেজা। রূপার পাতের মত চক চক করছে। রাস্তাগুলিতে নদী–নদী ভাব চলে এসেছে।

Print Friendly
%d bloggers like this: