পুতুলনাচের ইতিকথা (উপন্যাস)

পুতুল নাচের ইতিকথা বাঙালি সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাস। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রামের ডাক্তার শশী। গ্রামের পটভূমিতে শশী, কুসুম-সহ অন্যান্য চরিত্রগুলোর মাঝে বিদ্যমান জটিল সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গড়ে উঠেছে এর কাহিনী ও প্রেক্ষাপট।

০১. খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছ

পুতুলনাচের ইতিকথা (উপন্যাস)  ১ খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল।  আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন। হারুর মাথায় কাঁচা-পাকা চুল আর বসন্তের দাগভরা রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া পুড়িয়া গেল। সে কিন্তু কিছুই টের পাইল না। শতাব্দীর পুরাতন তরুটির মূক অবচেতনার সঙ্গে একান্ন বছরের আত্মমমতায় গড়িয়া তোলা জগৎটি তাহার চোখের […]

০২. শশীর চরিত্র

শশীর চরিত্রে দুই সুস্পষ্ট ভাগ আছে। একদিকে তাহার মধ্যে যেমন কল্পনা, ভাবাবেগ ও রসবোধের অভাব নাই, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ সাংসারিক বুদ্ধি ও ধনসম্পত্তির প্রতি মমতাও তাহার যথেষ্ট। তাহার কল্পনাময় অংশটুকু গোপন ও মূক। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে তাহার সঙ্গে না মিশিলে একথা কেহ টের পাইবে না যে তার ভিতরেও জীবনের সৌন্দর্য ও শ্রীহীনতার একটা গভীর সহানুভূতিমূলক বিচার-পদ্ধতি […]

০৩. মতির জন্য পাত্ৰ দেখিতে গিয়া

মতির জন্য পাত্ৰ দেখিতে গিয়া কালের ধারে বটগাছের তলে হারু ঘোষ অপঘাতে প্রাণ দিয়াছিল। গ্রামে কি মতির পাত্র মিলিত না? হারুর ছিল উচ্চ আশা। ছেলেবেলা হারু স্কুলে পড়িয়াছিল, বড় হইয়া হার বড়লোক হইয়াছিল। তারপর গরিব হইয়া পড়িলেও মনটা হারুর বিশেষ বদলায় নাই। গাওদিয়ার গোপ-সমাজ পরিহাস করিয়া তাহাকে বলিত ভম্বরলোক। বিশেষ করিয়া বলিত নিতাই। নিতাইয়ের অবস্থা […]

০৪. এবার কার্তিক মাসে পূজা

এবার কার্তিক মাসে পূজা। সেনদিদির সর্বাঙ্গে ব্রনগুলি পাকিয়া উঠিতে উঠিতে গ্রামের পূজার উৎসব শুরু হইয়া গেল। উৎসব সহজ নয়, গ্রামের জমিদার শীতলবাবুর বাড়ি তিনদিন যাত্রা, পুতুলনাচ, বাজি পোড়ানো, সাতগাঁ মেলা-পূজা তো আছেই। গ্রামবাসীর ঝিমানো জীবন প্রবাহে হঠাত প্রবল উত্তেজনার সঞ্চার হইয়াছে, কেবল শশী এবার সেনদিদিকে লইয়া বড় ব্যস্ত। যাত্রা আরম্ভ হয় সপ্তমীর রাত্রে। যাত্রার দল […]

০৫. যামিনী কবিরাজের বউ সেনদিদি

যামিনী কবিরাজের বউ বাঁচিয়া উঠিয়াছে। ভগবানের দয়া, যামিনী কবিরাজের বউ-এর কপাল, শশীর গৌরব। গোপাল ছেলের সঙ্গে আজকাল প্রায় কথা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। যামিনী কবিরাজের বউ বাঁচিয়া উঠিয়াছে বলিয়া নয়, অন্য কারণে। অন্য সাধারণ মানুষের তাই ধরিয়ালওয়া উচিত। ব্যাপারটা হইয়াছিল এই। শশীর বেশ পসার হইয়াছে। বাজিতপুরের সরকারি ডাক্তারকে ডাকিতে খরচ অনেক। অনেকে শশীকেই ডাকে। যামিনী কবিরাজের […]

০৬. গ্রাম্য জীবনে শশীর বিতৃষ্ণা

গ্রাম্য জীবনে আবার শশীর বিতৃষ্ণা আসিয়াছে। মাঝখানে কিছুদিন সে যেন এখানে বাস করিয়াছিল অন্যমনস্কের মতো। আধখানা মন দিয়া সবসময় সে তাহার কাম্য জীবনের কথা ভাবিত,-শিক্ষা সভ্যতা ও আভিজাত্যের আবেষ্টনীতে উজ্জ্বল কোলাহলমুখর উপভোগ্য জীবন। এখানকার মশকদষ্ট মৃত্তিকালীন জীবন এই সাম্ভনার জন্য শশীর সহ্য হইয়া আসিয়াছিল যে, যখন খুশি গ্রাম ছাড়িয়া যেখানে খুশি গিয়া মনের মতন করিয়া […]

০৭. মতিকে লইয়া কুমুদ চলিয়া গিয়াছ

বিবাহের পর মতিকে লইয়া কুমুদ চলিয়া গিয়াছ। কোথায়! হনিমুনে! গাওদিয়ার গেঁয়ো মেয়ে মতি, তাকে লইয়া কুমুদ চলিল হনিমুনে। কিছু টাকা দে শশী। পরাণের কাছে এ ব্যাপারটা বড় দুর্বোধ্য ঠেকিয়াছে। কনে-বউকে সঙ্গে লইয়া অনির্দিষ্ট ভ্রমণে বাহির হওয়া? এ কোনদেশী রীতি মতিকে লইয়া গিয়া উঠিতে পারে এমন আত্মীয়স্বজন কুমুদের কেহ নাই পরাণ তাহা জানিত। সে আশা করিয়াছিল […]

০৮. গ্রামে না-ফিরিবার প্রতিজ্ঞা

এক মাস গ্রামে না-ফিরিবার প্রতিজ্ঞা দুদিনের বেশি টিকিল না শশীর। এ-গাঁয়ে ও-গাঁয়ে অসহায় বিপন্ন রোগীরা যে পথ চাহিয়া আছে। বিন্দুর সঙ্গে দেখা করিবার ইচ্ছা শশীর আর ছিল না। রওনা হওয়ার দিন বিকালে হঠাৎ অনিচ্ছা জয় করিয়া সে হাজির হইল নন্দও বাড়িতে। নন্দ বাড়ি ছিল। বিন্দু? না, বিন্দুকে এখনো এ-বাড়িতে আনা হয় নাই। নন্দ বলিল, ও […]

০৯. নৌকার দোলনে দুলিয়া

নৌকার দোলনে দুলিয়া চুলিয়া কুসুমের বাবার ঘুম আসে। কুসুম ছইয়ের মধ্যে পিছনে হালের দিকে তাহার শোবার ব্যবস্থা করিয়া দিল। সে ঘুমাইয়া পড়িলে শশীকে ডাকিয়া বলিল, হঠাৎ আমাকে বাপের বাড়ি পৌঁছে দেবার শখ হল কেন শুনি? বলিয়া মৃদু হাসিল কুসুম। শশী বলিল, তুমি ভাবছ কাজ নেই, না? তোমার জন্য যাচ্ছি শুধু? উকিলের সঙ্গে দেখা করব। মামলা […]

১০. মতির কথা

মতির কথা গোড়া হইতে বলি। রাজপুত্র প্রবীরকে স্বামী হিসাবে পাইয়া মতির সুখের সীমা নাই। গ্রাম ছাড়িতে চোখে জল আসে, অজানা ভবিষ্যতের কথা ভাবিয়া একটা রহস্যময় ভীতি বুক চাপিয়া ধরে, তবু আহ্বাদে মেয়েটা মনে মনে যেন গলিয়া গেল। এইটুকু বয়সে এমন উপভোগ্য মনকেমন-করা! স্টিমার ছাড়িলে জেটিতে দাঁড়ানো পরাণকে ঘোমটার ফাঁকে দেখিতে দেখিতে ভিতরটা যখন তোলপাড় করিতে […]

১১. নতুন আশার সঞ্চারে

নতুন আশার সঞ্চারে মতির মন আবার মোহে ভরিয়া যায়। চৌকিতে সে সযত্নে বিছানা পাতে; টেবিলে সাজাইয়া রাখে তাহার সামান্য প্রসাধনের উপকরণ; কাপড়-জামা কুচাইয়া গুছাইয়া রাখে আলনায়। টেবিলল্যাম্পে তেল ভরিয়া সন্ধ্যা হইতে-না-হইতেই জ্বালিয়া দেয়। বার বার সলিতাটা বাড়ায় কমায়। কতখানি বাড়াইবে ঠিক করিতে পারে না। আর বাড়াব? না কমিয়ে দেব? একটু কমিয়েই দি, কী বলো? কুমুদ […]

১২. হাসপাতালের নবনির্মিত গৃহটি

হাসপাতালের নবনির্মিত গৃহটি দেখিতে ভারি সুন্দর হইয়াছে। ইটের উপরে লাল-রঙ-করা ছোটখাটো ঝকঝকে সুশ্রী বাড়িখানা দেখিয়া আপসোস হয় যে একটা না দেখিয়া যাদবের মরা উচিত হয় নাই। সামনে কানিশের নিচে ইংরেজিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা হইয়াছে—যাদব মেমোরিয়াল হস্পিটাল। তবু লোকে মুখে বলিতে বলে, শশী ডাক্তারের হাসপাতাল। যাদবকে যে লোকে ভুলিয়া গিয়াছে তা নয়। যাদবের সঙ্গে হাসপাতালের […]

১৩. সূর্যাস্ত দেখিবার শখ

ঝোঁকের মাথায় কাজ করার অভ্যাস শশীর কোনোদিন ছিল না। মনের হঠাৎ-জাগা ইচ্ছাগুলিকে চিরদিন সামলাইয়া চলিবার চেষ্টা করে। তবে এমন কতকগুলি অসাধারণ জোরালো হঠাৎ-জাগা ইচ্ছা মানুষের মধ্যে মাঝে মাঝে জাগিয়া ওঠে, যে, সেসব দমন করার ক্ষমতা কারো হয় না। সকালে উঠিয়া কিছুই সে যেন ভাবিল না, কোনো কথা বিবেচনা করিয়া দেখিল না, সোজা পরানের বাড়ি গিয়া […]