বিষ্ণু দে

বিষ্ণু দে (১৮ জুলাই ১৯০৯ - ৩ ডিসেম্বর ১৯৮২) একজন বিখ্যাত বাঙালি কবি লেখক এবং চলচ্চিত্র সমালোচক । তিনি ১৯৭১ সালে তাঁর স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ বইটির জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জ্ঞানপীঠ লাভ করেন ।

অন্ধকারে আর

অন্ধকারে আর রেখো না ভয়, আমার হাতে ঢাকো তোমার মুখ দু-চোখে দিয়ে দাও দুঃখ সুখ, দু-বাহু ঘিরে গড়ো তোমার জয়, আমার তালে গাঁথো তোমার লয় | অসহ আলো আজ ঘৃণায় দগ্ধ, দূষিত দিনে আর নেইকো রুচি, অন্ধকারই একমাত্র শুচি,প্রেমের নহবত ঘৃণায় স্তব্ ধ | আমার হাতে ঢাকো তোমার মুখ ||

আলেখ্য

আঁটসাঁট বেঁধে আচল জড়ালো কোমরে, মুগ্ধ চোখের এক নিমেষের দেরিতে লঘু লাবণ্যে লাফ দিয়ে হল পার | কালো পাহাড়ের গায় চমকাল রেখা, শাড়ির শাদায় কস্তাপাড়ের সিঁদুরে কষ্টিতে ঋজু কোমল শরীরে তরল স্রোতের ছন্দ | এই লাবণ্যে এই নিশ্চিত ছন্দে আমরা সবাই কেনইবা পার হব না সামনের এই পাহাড়ের খাড়া খন্দ ?

ইলোরা

আকাশে তোমার মুক্তি; ? যে কৈলাশ বেঁধেছ ভাস্কর তোমার উর্মিল নৃত্যে, নীলিমা সে নৃত্যের সঙ্গিনী ; সেখানে নেইকো সোনা কৌটিল্যের নেই বিকিকিনি, সেখানে শূণ্যের চোখে সম্পূর্ণতা স্বাধীন, ভাস্বর | সে-দক্ষযজ্ঞের নাটে স্থিতি কাঁপে সংহারে-সংহারে, রাজসূয় অসূয়ার যুগ গত কুমার সম্ভবে ; নটরাজ সর্বহারা নীলকণ্ঠ গালবাদ্যরবে পায়ে-পায়ে পৃথ্বী জাগে সতী তোলে সর্বংসহারে | সন্ন্যাসী, তোমার মুক্তি […]

উর্বশী

আমি নহি পুরূরবা। হে উর্বশী, ক্ষনিকের মরালকায় ইন্দ্রিয়ের হর্ষে, জান গড়ে তুলি আমার ভুবন? এসো তুমি সে ভুবনে, কদম্বের রোমাঞ্চ ছড়িয়ে। ক্ষণেক সেখানে থাকো, তোমার দেহের হায় অন্তহীন আমন্ত্রণবীথি ঘুরি যে সময় নেই- শুধু তুমি থাকো ক্ষণকাল, ক্ষণিকের আনন্দাঅলোয় অন্ধকার আকাশসভায় নগ্নতায় দীপ্ত তনু জ্বালিয়ে যাও নৃত্যময় দীপ্ত দেয়ালিতে। আর রাত্রি, রবে কি উর্বশী, আকাশের […]

এবং লখিন্দর!

হৃদয় তোমাকে পেয়েছি, স্রোতস্বিনী! তুমি থেকে থেকে উত্তাল হয়ে ছোটো, কখনো জোয়ারে আকণ্ঠ বেয়ে ওঠো তোমার সে-রূপ বেহুলার মতো চিনি। তোমার উৎসে স্মৃতি করে যাওয়া আসা মনে-মনে চলি চঞ্চল অভিযানে, সাহচর্যেই চলি, নয় অভিমানে, আমার কথায় তোমারই তো পাওয়া ভাষা। রক্তের স্রোতে জানি তুমি খরতোয়া, ঊর্মিল জলে পেতেছি আসনপিঁড়ি, থৈথৈ করে আমার ঘাটের সিঁড়ি, কখনো-বা […]

গার্হাস্থ্যাশ্রম (পূর্বরঙ্গ)

তোমায় লেগেছে ভালো – সে-কথা তো জানো ? তোমার ও কটা চোখ – যদিচ বাঙালি, বুধবার থেকে কেন মনে পড়ে খালি ! লোকে যাকে প্রেম বলে – সে কি তুমি মানো ? জেনে-শুনে চোখ দিয়ে আমাকে কি টানো ? না কি তুমি অজানিতে ভরে যাও ডালি ? না কি আমি সংস্কৃত, প্রাকৃত ও পালি পড়েছি […]

ঘোরসাওয়ার

জন সমুদ্রে নেমেছে জোয়ার, হৃদয় আমার চড়া | চোরাবালি আমি দূর দিগন্তে ডাকি— কোথায় ঘোড়সওয়ার? দীপ্ত বিশ্ববিজয়ী! বর্শা তোলো | কোন ভয়? কেন বীরের ভরসা ভোলো? নয়নে ঘনায় বারে বারে ওঠাপড়া? চোরাবালি আমি দূর দিগন্তে ডাকি?হৃদয় আমার চড়া? অঙ্গে রাখিনা কারোই অঙ্গিকার? চাঁদের আলোয় চাঁচর বালির চড়া | এখানে কখনো বাসর হয় না গড়া? মৃগতৃষ্ণিকা […]

জল দাও

তোমার স্রোতের বুঝি শেষ নেই, জোয়ার ভাঁটায় এ-দেশে ও-দেশে নিত্য ঊর্মিল কল্লোলে পাড় গড়ে পাড় ভেঙে মিছিলে জাঠায় মরিয়া বন্যায় যুদ্ধে কখনো-বা ফল্গু বা পল্বলে কখনো নিভৃত মৌন বাগানের আত্মস্থ প্রসাদে বিলাও বেগের আভা আমি দূরে কখনো-বা কাছে পালে-পালে কখনো-বা হালে তোমার স্রোতের সহযাত্রী চলি, ভোলো তুমি পাছে তাই চলি সর্বদাই যদি তুমি ম্লান অবসাদে […]

তিনটি কাঠবিড়ালী

অনেক দিনের অনেক যত্নে কমিয়েছি সন্ত্রাস। এদিকে আমার ছুটি শেষ হ’ল প্রায়, আজ তিনটেতে গাছ থেকে নেমে বসেছিলো জানলায়। এত ভীরু এত বিনীত কেন যে! এরাই তো ছিল খাস সমুদ্র-জয়ী সীতা-সন্ধানী সেতুবন্ধের সঙ্গী; দীন সজ্জন সাহসী উত্সাহিত মজুরেরই মত ভঙ্গী। এরা কেন ভয়ে ডালে-ডালে ঘোরে আজ? এরা কোনও কালে করেনি তো লাফঝাঁপ রামরাজত্বে সরকারি রামদাস! […]

তুমিই মালিনী

তুমিই মালিনী, তুমিই তো ফুল জানি । ফুল দিয়ে যাও হৃদয়ের দ্বারে, মালিনী, বাতাসে গন্ধ, উৎস কি ফুলদানি, নাকি সে তোমার হৃদয়সুরভি হাওয়া ? দেহের অতীতে স্মৃতির ধূপ তো জ্বালি নি কালের বাগানে থামে নি কো আসা যাওয়া ত্রিকাল বেঁধেছ গুচ্ছে তোমার চুলে, একটি প্রহর ফুলহার দাও খুলে,কালের মালিনী ! তোমাকেই ফুল জানি, তোমারই শরীরে […]

বাংলাই আমাদের

আমরা বাংলার লোক, বাংলাই আমাদের, এদের ওদের সবার জীবন | আমাদের রক্তে ছন্দ এই নদি মাঠ ঘাট এই আমজাম বন, এই স্বচ্ছ রৌদ্রজলে অন্তরঙ্গ ঘরোয়া ভাষার হাস্যস্নাত অশ্রুদীপ্ত পেশল বিস্তার| চোখে কানে ঘ্রাণে প্রাণে দেহমনে কথায় স্নায়ুতে গঙ্গার পদ্মার হাসি একাকার, সমগ্র সত্তার অজেয় আয়ুতে নিত্য মৃত্যুত্তীর্ণ দুঃখে হর্ষে ছন্দে বর্ণে বেঁধে দেবে কোমল কঠিন […]

ভিড়

নানামুনি দেয় নানাবিধ মত মন্বন্তর আসে! তবুও শহরে ওসারে বহরে জড়কবন্ধ ভিড়! বহু সাপ্লাই উঠে গেল শুনি, তবু আজো লাগে চিড় পদাতিক পথে, ট্রামে কারে ট্রাকে করে বিড়বিড় দরকারী বিনাদরকরী কেউ সরকারী চোরাকারবারী ফ’ড়ে আমীর ওমরা মজুতদারের পাশে আমরা সবাই-তুমি আর আমি মৃত্যুর প্রতিভাসে মিশে যাই,-জানি মিথ্যা নেহাত্; দুর্বার জীবনের অবাধ প্রগতি মন্দাকিনী কি বালুচরে […]

মনে হয় প্রত্যেকে লেনিন

তোমাদেরও মনে হয়, মনে হয় তোমারও প্রত্যেকে লেনিন ? লাজুক সুকান্ত ওই কথাটাই বলেছিল কৈশোর সংরাগে বহুদিন আগে – সহজ কিশোর বিনম্র কবি বাংলায় তার কথা শতবর্ষে জাগে | কারণ লেনিন নন দেবতা বা পুরাণ-নায়ক, তিনি একালের বীর, স্থির ধীর, ভাবুক, আত্মস্থ, নেতা, মানবিক ; নিজেকে জাহির কখনোই করেননি ; এমনকি কোন্ এক সভাঘরে স্বয়ং […]

সুজলা সুফলা

সুজলা সুফলা সেই মলয়শীতলা ধরণীভরণী বন্দনীয় মাতৃভূমি ঋষি (ও হাকিম) বঙ্কিমচন্দ্রের সেই গণ-স্তোত্রগান এখনও হয়তো আনন্দের শীর্ষ-চূড়ে কোনো সভায় স্বয়ম্ রবিঠাকুরের সুরে সর্বাঙ্গ শিহরে অচৈতন্য শব্ দব্রহ্মে ধনী সমকণ্ঠে ওঠে সহস্রের গান, পাশের দূরের দেহমনে সমভাব, মৈত্রী — রাখীবন্ধনে শপথে | সে-গান প্রাণের রন্ধ্রে, মন জাগে ধ্রুব ছন্দে, গানে ভাবের সমুদ্র থেকে ভাষা ওঠে দোঁহে […]

সে কবে

সে কবে গেয়েছি আমি তোমার কীর্তনে কৃতার্থ দোহার | পদাবলী ধুয়ে গেছে অনেক শ্রাবণে ; স্মৃতি আছে তার | রৌদ্র-জলে সেই-স্মৃতি মরে না, আয়ু যে দুরন্ত লোহার | শুধু লেগে আছে মনে ব্যথার স্নায়ুতে মর্চের বাহার ||