নিশাবসানে পৌরজন নিদ্রাত্যাগ করিয়া দেখিল, নগরের হট্টে রাশি রাশি খাদ্য স্তুপীকৃত হইয়াছে। ঘূত, তৈল, শালি-তণ্ডুল, গোধূম, চণক, শাক-সব্জীি—কোনও বস্তুরই অভাব নাই। কোথা হইতে খাদ্য আসিল, কেহ জানিল না। শুধু দেখা গেল, বুদ্ধ তথ্যগতের পাষাণময় বিহারের অভ্যন্তর হইতে এই খাদ্য-স্রোত নিঃসৃত হইতেছে। নাগরিকগণ উর্ধর্ব কণ্ঠে সীেগতের জয়ঘোষণা করিতে করিতে হট্টের অভিমুখে ছুটিল।

মহারাজ চন্দ্ৰগুপ্ত তখন মল্লাগাহের সুচিক্কণ শীতল মণি-কুট্টিমের উপর শিয়ান ছিলেন, দুই জন নিহাপিত সুগন্ধি তৈল দ্বারা তাঁহার হস্তপদাদি মর্দন করিয়া দিতেছিল। নাগরিকদের এই আনন্দনিনাদ তাঁহার কৰ্ণে প্রবেশ করিল; তিনি মুদিত চক্ষু ঈষান্মাত্র উল্মীলিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বল্লভ, কিসের চিৎকার? চন্দ্রবর্মা কি দুর্গপ্ৰবেশ করিল?”

সন্নিধাতা বল্লভ সুবৰ্ণস্থলীর উপর স্ফটিকপত্রপূর্ণ ফলান্নারস লইয়া অদূরে দাঁড়াইয়া ছিল—মহারাজ স্নানান্তে পান করিয়া শরীর স্নিগ্ধ করিকেন। সে বলিল, “না অজজ, বহুদিন পরে পৌরজন খাদ্য পাইয়াছে, তাই মহারাজের জয়-ধ্বনি করিতেছে।” চন্দ্ৰগুপ্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, “খাদ্য কোথা হইতে আসিল?” বল্লভ সবিশেষ জানিত না, তথাপি মহারাজের কথার উত্তর দিতে হইবে; বলিল, “বিহারমধ্যে খাদ্য সঞ্চিত ছিল, ভিক্ষুগণ তাঁহাই বিতরণ করিতেছেন।”

চন্দ্রগুপ্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, “খাদ্য কোথা হইতে আসিল?”

বল্লভ সবিশেষ জানিত না, তথাপি মহারাজের কথার উত্তর দিতে হইবে; বলিল “বিহারমধ্যে খাদ্য সঞ্চিত ছিল, ভিক্ষুগণ তাহাই বিতরণ করিতেছেন।”

মহারাজ আর প্রশ্ন করিলেন না, পুনশ্চ চক্ষু মুদিত করিয়া কহিলেন, “ভাল, মহাদেবীকে সমাচার দাও। তিনি প্রকৃতিপুঞ্জের জন্য বড়ই ব্যাকুল হইয়াছিলেন।”

মহারাজের গূঢ় শ্লেষ বল্লভ অনুধাবন করিল না, মহাদেবী বলিতে প্ৰেয়সী সোমদত্তাকেই বুঝিল। “যথা আজ্ঞা!”—বলিয়া বাহিরে গেল। বাহিরে গিয়া দেখিল, অসংবৃতকুন্তলা এক তরুণী দাসী দ্রুতপদে বহির্মুখে যাইতেছে। বল্লভ ইঙ্গিত করিয়া তাহাকে কাছে ডাকিল, বলিল, “জয়ন্তী, তোমার কেশবেশ যেরূপ বিস্রস্ত, বাহিরে গেলে লোকে নিন্দা করিবে!”

জয়ন্তী মথিত-কজল চক্ষু মার্জনা করিয়া কহিল, “কি প্রয়োজন তাই বল না, রসিকতার সময় নাই। আমি কাজে যাইতেছি।”

বল্লভ বলিল, “কাজ পরে করিও, এখন অন্দরে ফিরিয়া যাও।”—বলিয়া তাহার মুখে সংবাদ পঠাইয়া দিল।

জয়ন্তী সংবাদ লইতেই আসিতেছিল, ফিরিয়া গিয়া সোমদত্তাকে সকল কথা জানাইল।

সোমদত্তা তখন শীতল হর্ম্যতলে পড়িয়া দুই বাহুর উপর মুখ রাখিয়া চিন্তা করিতেছিল। কি গহন, কি কুটিল তাহার চিন্তা, তাহা কে বলিবে? দাসীর কথা শুনিয়া সে উঠিয়া বসিল। দুই চক্ষু কালিমাবেষ্টিত হইয়া যেন আরও উজ্জ্বল আরও প্রভাময় হইয়াছে, শিশির-কালের প্রস্ফুট হিমচম্পকের ন্যায় কপোল দুইটি পাণ্ডুর। রূপের বুঝি অন্ত নাই। দাসী এই ক্লান্ত-সন্তপ্ত সৌন্দর্যের সম্মুখ হইতে বোধ করি লজ্জা পাইয়া ধীরে ধীরে সরিয়া যাইতেছিল; সোমদত্তা ডাকিল, “জয়ন্তী!”

দাসী ফিরিয়া আসিয়া সসন্ত্রমে বলিল, “অজ্জা!”

অধোমুখে কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া সোমদত্তা বলিল, “তুই একবার বাহিরে যা। বৌদ্ধ-বিহারে গিয়া শ্রমণাচার্য ভিক্ষু অকিঞ্চনকে আমার কাছে ডাকিয়া আন। বলিবি যে ভিক্ষুণী দীপান্বিতা তাঁহাকে স্মরণ করিয়াছে। আর কঞ্চকী যদি তাঁর পুরপ্রবেশে বাধা দেয়, এই মুদ্রা দেখাস।”–বলিয়া আপন কণ্ঠের রত্নহার হইতে সুবর্ণমুদ্রা খুলিয়া দাসীর হস্তে দিল।

জয়ন্তীর মুখ পাংশু হইয়া গেল, সে ভীতকণ্ঠে বলিল, “কিন্তু অজ্জা, কুমারদেবী জানিতে পারিলে—”

সোমদত্ত কহিল, “ত্যক্ত করিস না, যা বলিলাম কর।”

জয়ন্তী প্রস্থান করিল, মনে মনে বলিতে বলিতে গেল, “তোমার আর কি! অন্দরে বৌদ্ধ ভিক্ষু ডাকিয়াছি শুনিলে পট্টদেবী আমার মাথাটি খাইবেন।”

ভিক্ষু অকিঞ্চনকে লইয়া যখন জয়ন্তী ফিরিল, তখন সোমদত্ত স্নান করিয়া শুদ্ধশুচি হইয়া বসিয়াছে। ললাটে কুকুম-তিলক পরিয়াছে, বক্ষে কাচুলি বাঁধিয়া উচ্ছল দেহলাবণ্য সংযত করিয়াছে। ভিক্ষু কক্ষে প্রবেশ করিয়া সোমদত্তাকে আশীবাদ করিলেন এবং আসন পরিগ্রহ করিয়া জিজ্ঞাসু নোত্রে তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া রহিলেন। সংঘস্থবিরের বয়স হইয়াছে, মস্তক ও মুখ মুণ্ডিত, পরিধানে পীতবস্ত্ৰ, শান্ত সৌম্য মূর্তি। কৃচ্ছসাধনের ফলে কিছু কৃশ, কিন্তু মুখমণ্ডলে ব্ৰহ্মচর্যের নির্মল দীপ্তি জাজ্বল্যমান।

সোমদত্তা জয়ন্তীকে চলিয়া যাইতে ইঙ্গিত করিল। জয়ন্তী প্রস্থান করিলে সে ভিক্ষুকে প্ৰণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল, “অহঁৎ, আত্ম-পরিচয় গোপন করিয়া সংঘারামে গিয়েছিলাম-ক্ষমা করুন!”

অকিঞ্চন কহিলেন, “আত্মগোপন করিয়া যে আর্তের সেবা করে, সিদ্ধার্থ তাহাকে অধিক কৃপা করেন।”

সোমদত্ত কহিল, “আজ রাত্ৰে বোধ হয় সংঘারামে যাইবার অবকাশ হইবে না। তাই অজা কুমারদেবীর বৌদ্ধ-বিদ্বেষ জানিয়াও আপনাকে এখানে আহ্বান করিয়াছি। আমার কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।”

অকিঞ্চন কহিলেন, “সময় উপস্থিত হইলে ভগবান শাক্যসিংহ কুমারদেবীকে সুমতি দিবেন। …তোমার জিজ্ঞাস্য কি?”

সোমদত্ত কহিল, “শুনিলাম, নগরে খাদ্য আসিয়াছে; এ কথা সত্য?”

“সত্য।”

“কি করিয়া আসিল?”

ভিক্ষু কিছুক্ষণ স্থির থাকিয়া বলিলেন, “তথ্যগতের কৃপায়।”

সোমদত্ত ঈষৎ অধীর হইয়া বলিলেন, “তাহা জানি। কিন্তু কোথা হইতে কোন পথে আসিল?”

অকিঞ্চন মৃদুহাস্যে বলিলেন, “সংঘের পথে।”

শিরঃসঞ্চালন করিয়া সোমদত্ত কহিল, “তাহাও জানি; খাদ্য সংঘারামে সঞ্চিত ছিল?”

“না।”

“তবে?”

“এ অতি গূঢ় বৃত্তান্ত। দীপান্বিতে, তুমি কৌতুহল প্রকাশ করিও না,–আমি বলিব না।”

“তবে আমিই বলিতেছি। সংঘমধ্যে কোনও সুড়ঙ্গ আবিষ্কৃত হইয়াছে, সেই পথে দুর্গের বাহির হইতে খাদ্য আসিতেছে–সত্য কি না?”

ইতস্তত করিয়া ভিক্ষু কহিলেন, “সত্য। জান যদি, প্রশ্ন করিতেছ কেন?”

“জানি না, অনুমান করিয়াছি মাত্র। অৰ্হৎ, কন্যার প্রতি একটি অনুগ্রহ করুন। কি করিয়া কবে এই সুড়ঙ্গ আবিষ্কৃত হইল, আমাকে বলুন।”

কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া সংঘাচার্য বলিলেন, “ভাল, শুন। এই সুড়ঙ্গের সন্ধান একপক্ষ পূর্ব পর্যন্ত আমি অথবা অন্য কেহ জানিত না। আমার পূর্ববর্তী সংঘস্থবির নিবণের পূর্বে মোহপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাই ইহার কথা আমাকে বলিয়া যাইতে পারেন নাই।”

নির্নিমেষ চক্ষুদ্বয় ভিক্ষুর মুখের উপর স্থাপন করিয়া সোমদত্তা শুনিতে লাগিল।

অকিঞ্চন বলিতে লাগিলেন, “সংঘের মধ্যে ভূগর্ভস্থ যে প্রকোষ্ঠে বুদ্ধের অস্থি রক্ষিত আছে, তাহার উপরে আর একটি কক্ষ আছে, তুমি দেখিয়া থাকিবে। কক্ষটি সচরাচর ব্যবহৃত হয় না, কদাচি আমি মননাদির জন্য উহা ব্যবহার করিয়া থাকি। গত পূর্ণিমা-তিথিতে আমি সেই কক্ষে প্ৰবেশ করিয়া দেখি, ঘরটি অত্যন্ত অপরিষ্কার হইয়াছে এবং ছাদের মধ্যস্থলে যে প্রস্তরের ধর্মচক্র ক্ষোদিত আছে, তাহার উপর মধুমক্ষিকা চক্ৰনির্মাণ করিয়াছে। ঘরটিকে মলনির্মুক্ত করিবার মানসে আমি প্রথমে একটি বংশদণ্ডাগ্রে মশাল যোজিত করিয়া ধূম প্রয়োগ দ্বারা মধুমক্ষিকাগুলিকে বিদূরিত করিলম, তারপর মধুচক্ৰটি স্থানচ্যুত করিবার অভিপ্ৰায়ে বংশদণ্ডদ্বারা উহা তাড়িত করিবামাত্ৰ এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিল। ধৰ্মচক্রের মধ্যস্থলে যে ক্ষুদ্র ছিদ্র আছে, তাহার মধ্যে বংশের অগ্রভাগ প্ৰবেশ করিবার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষপ্রাচীরের এক স্থানে প্রস্তর সরিয়া গিয়া একটা চতুষ্কোণ গহ্বর দেখা দিল। আমি অতিশয় বিস্মিত হইয়া সেই রন্ধটি পরীক্ষা করিলম, দেখিলাম, অন্ধকার মধ্যে সোপান নামিয়া গিয়াছে।

“পাছে অন্য কেহ আসিয়া পড়ে, এ জন্য তখন আর কিছু করিলম না—কক্ষের কবাট বন্ধ করিয়া ফিরিয়া আসিলাম। রাত্ৰিতে সকলে ঘুমাইলে, প্ৰদীপ লইয়া কক্ষের ভিতর হইতে অর্গলবদ্ধ করিয়া দিয়া সুড়ঙ্গের মধ্যে প্ৰবেশ করিলম। প্রস্তর ও ইষ্টকনির্মিত সুড়ঙ্গ, অতিশয় সংকীর্ণ ও অনুচ্চ, মস্তক অবনত করিয়া চলিতে হয়। অর্ধ ক্রোশাস্তরে বায়ুপ্রবাহের জন্য কৃপ আছে–সেই কূপ সকল লঙঘন করিয়া অগ্রসর হইতে হয়। আমি এইভাবে বহুদূর পর্যন্ত গমন করিয়াও সুড়ঙ্গের শেষ পাইলাম না। প্রদীপের তৈল নিঃশেষ হইয়া আসিতেছিল, সে রাত্রিতে ভগ্নোদ্যমে ফিরিয়া আসিলাম। তারপর উপযুপরি পঞ্চরাত্রি চেষ্টার পর ষষ্ঠরাত্রিতে সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে পৌঁছিলাম। কুক্কুটপাদ বিহারের অঙ্গনে গিয়া সুড়ঙ্গ শেষ হইয়াছে…”

সংহত নিশ্বাসে সোমদত্তা বলিল, “তারপর?”

নিশ্বাস ফেলিয়া অকিঞ্চন কহিলেন, “কুকুটপাদ বিহারের পূর্বশ্ৰী আর নাই, এখন উহা জনহীন ভগ্নপ্রায়, শ্বাপদের বাসভূমি। কিন্তু গোতমের করুণার উৎস এখনো শতমুখে উৎসারিত হইতেছে। তাই ভগবান পথ দেখাইয়া দিলেন। আমি ফিরিয়া আসিয়া সান্ধিবিগ্রহিককে সংবাদ দিলাম, বলিলাম, সংঘের পথেই বুভুক্ষিতের ক্ষুধা নিবারণ হউক।”

ভিক্ষু নীরব হইলেন। সোমদত্তা নতমুখে চিন্তা করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ। এইভাবে কাটিবার পর ভিক্ষু আসন ত্যাগ করিয়া উঠিবার উপক্ৰম করিলেন। তখন সোমদত্তা যুক্তপাণি হইয়া বলিল, “শ্ৰীমন, আর একটি প্রশ্ন আছে। এই রাজপুরী যিনি নির্মাণ করিয়াছিলেন, তিনি কি বৌদ্ধ ছিলেন?”

অকিঞ্চন কহিলেন, “হাঁ, শুনিয়াছি, অশোক প্রিয়াদশী এই পুরী নির্মাণ করাইয়াছিলেন, সংঘারামও তাঁহারই প্রতিষ্ঠিত।”

সোমদত্তা প্ৰণাম করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, “ভগবন, আশীবাদ করুন, যেন পূর্ণমনোরথ হইতে পারি।”

হাস্যমুখে অকিঞ্চন কহিলেন, “সুমঙ্গলে, গোতমের ইচ্ছায় তোমার মনস্কাম সিদ্ধ হইবে—গোতম অন্তর্যামী।”

সংঘস্থবির বিদায় হইলে সোমদত্তা কক্ষমধ্যে পদচারণ করিতে করিতে ভাবিতে লাগিল। দীর্ঘকাল গভীর চিন্তা করিল। ধৰ্মচক্ৰ! ধৰ্মচক্ৰ! কিন্তু পুরীমধ্যে কোথাও তো ধৰ্মচক্ৰ নাই। বুদ্ধের মূর্তি, ধৰ্মচক্র প্রভৃতি যাহা ছিল, তাহা অপসারিত করিয়া তৎপরিবর্তে দেবমূর্তি স্থাপিত হইয়াছে।

ভাবিতে ভাবিতে অজ্ঞাতসারে তাহার চক্ষু ঊর্ধ্বে নিপতিত হইল। তখন বিস্ফারিত নেত্রে স্তম্ভিত বক্ষে সোমদত্তা দেখিল, উচ্চ ছাদের মধ্যস্থলে রক্তপ্রস্তরে উৎকীর্ণ ধর্মচক্ৰ—এবং তাহার কেন্দ্রমধ্যে ক্ষুদ্র সূগোল একটি ছিদ্ৰ!

বহুক্ষণ তদাবস্থ থাকিবার পর সোমদত্তা ছুটিয়া গিয়া জয়ন্তীকে ডাকিল। উত্তেজিত কণ্ঠে কহিল, “জয়ন্তী, শীঘ্ৰ যা-অস্ত্রাগার হইতে ধনুবাণ লইয়া আয়! জিজ্ঞাসা করিলে বলিস, মহাদেবী সোমদত্তা লক্ষ্যবোধ শিক্ষা করিবেন।”

 

শব্দতরঙ্গে অন্ধকার পরিপূর্ণ করিয়া বাঁশি বাজিতেছিল। সোমদত্তা প্রদীপের সম্মুখে বসিয়া করতলে চিবুক রাখিয়া এই দূরাগত বংশীধ্বনি শুনিতেছিল। আমি প্রাকার-কুড্য আশ্রয় করিয়া দাঁড়াইয়া ছিলাম।

বাঁশি প্রথমে বসন্ত-রাগ ধরিল; তারপর কিছুক্ষণ গুর্জরী-রািগ লইয়া ক্রীড়া করিয়া আবার বসন্ত-রাগে ফিরিয়া আসিল। শেষে এই দুই রাগ ছাড়িয়া বাঁশি মালকোষ ধরিল। কত নিপুণ সূরের কৌশল, কত মীড়-গমক-ঝংকার, কত তান-লয়ের পরিবর্তন দেখাইল। তারপর সহসা বাঁশি স্তব্ধ হইল।

“বাঁশি কি বলিল?”

সোমদত্তা যেন তন্দ্রার ঘোর হইতে জাগিয়া উঠিল। অতি দীর্ঘ এক নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল, “তুমি যাহা চাও পাইবে। চন্দ্ৰবর্মা তোমাকে মগধের ক্ষত্রপ নিযুক্ত করিবেন। আগামী অমাবস্যর রাত্ৰিতে দ্বিতীয় প্রহর ঘোষিত হইবার পর আমি এই প্ৰদীপ দ্বারা রাজপুরীতে অগ্নিসংযোগ করিব। অগ্নি যখন ব্যাপ্ত হইয়া আকাশ লেহন করিবে, সেই সময় তুমি গৌতম-দ্বারের অর্গল খুলিয়া দিবে। রাজপ্রাসাদে অগ্নিসংযোগই সংকেত; এই সংকেত পাইয়া চন্দ্ৰবর্মার সেনা দুর্গপ্রবেশের জন্য প্রস্তুত থাকিবে, তুমি দ্বার খুলিয়া দিলেই তাহারা প্রবেশ করিবে। পৌরজন রাজপুরী রক্ষার্থ ব্যস্ত থাকিবে, সেই অবসরে চন্দ্রবর্মা বিনা বাধায় পাটলিপুত্ৰ অধিকার করিবেন।”

আমি উত্তেজিত হইয়া বলিলাম, “অমাবস্যর রাত্রি? তার তো বিলম্ব নাই-আগামী পরশ্ব!”

“হাঁ। অধিক বিলম্বে ভয় আছে, লিচ্ছবিগণ আসিয়া পড়িতে পারে।”

ইহার পর সোমদত্তা আবার মৌন অবলম্বন করিল, করলগ্নকপোলে নিষ্পলক দৃষ্টিতে দীপশিখার দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল। আমিও সহসা কি কথা বলিব ভাবিয়া পাইলাম না, মানসিক উত্তেজনা রসনাকে যেন জড় করিয়া দিল। তথাপি চেষ্টা করিয়া কহিলাম, “বাঁশি তো রাগ-রাগিণীর আলাপ করিল, তুমি এত কথা বুঝিলে কি করিয়া?”

সোমদত্তা অন্যমনে কহিল, “ঐ রাগ-রাগিণীতে সংযুক্ত কথাগুলা আমার জানিত। যিনি বাঁশি। বাজাইতেছিলেন, তিনি আমার গীতাচার্য ছিলেন।”

অতঃপর আবার দীর্ঘ নীরবতা বিরাজ করিতে লাগিল। কাহারও মুখে কথা নাই। এই সুকঠিন মৌন আর সহ্য করিতে না পারিয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলম, “কি ভাবিতেছ?”

সোমদত্তা মুখ তুলিয়া বলিল, “ভাবিতেছি, কি অপরিমেয় শক্তি এই ক্ষুদ্র মৃৎপ্রদীপের! এত তুচ্ছ, ভঙ্গুর—মাটিতে পড়িলে ভাঙিয়া শতখণ্ড হইবে; অথচ একটা রাজ্য ধ্বংস করিবার শক্তি ইহার আছে। এমনি কতশত ছার মৃৎপ্রদীপ কেবল রূপশিখার অনলে সংসার ভস্মীভূত করিতেছে।”

আমি তাহার বাক্যের মর্ম বুঝিয়া হস্তধারণপূর্বক বলিলাম, “মৃৎপ্রদীপ নয়, সোমদত্তা, তুমি রত্নপ্ৰদীপ! তোমার দীপ্তিতে মগধ আলোকিত হইবে।”

সোমদত্ত উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, “আমি শ্মশানের আলো!… এখন চলিলাম, সেই অমাবস্যর রাত্ৰিতে আবার সাক্ষাৎ হইবে। চন্দ্রবর্মাকে সঙ্গে লইয়া প্রাসাদে যাইও, আমি মন্ত্ৰগৃহে প্রতীক্ষায় থাকিব।”

আমি তাহাকে সাদরে নিকটে টানিয়া লইয়া বলিলাম, “সেই দিন আমাদের মনোরথ পূর্ণ হইবে।”

ঈষৎ হাসিয়া সোমদত্তা বলিল, “হাঁ, সেই দিন আমার মনোরথ পূর্ণ হইবে।”

 

মহারাজ চন্দ্ৰগুপ্ত সোমদত্তার কক্ষে রাত্রিকালে নিদ্রা যাইতেছিলেন। অকস্মাৎ তীব্র শ্বাসরোধকর ধূমের গন্ধে তাঁহার নিদ্ৰাভঙ্গ হইল। চক্ষু না খুলিয়াই ডাকিলেন, “সোমদত্তা।” উত্তর পাইলেন না। তখন নিদ্ৰাকষায়নেত্ৰ উন্মীলন করিয়া দেখিলেন, শয্যায় সোমদত্তা নাই। কক্ষের চারিদিকে চাহিলেন, সোমদত্তাকে দেখিতে পাইলেন না।

বাহিরে তখন সমস্ত পুরী জাগিয়া উঠিয়াছে। সদ্যোখিত নারীদের ভীত চিৎকার, গৃহপালিত ময়ুর শারিকা প্রভৃতি পক্ষীদের সচকিত আর্তস্বর এবং সবোপরি বিস্তারশীল। অগ্নির গর্জন নৈশ বায়ুকে বিলোড়িত করিতেছে। দারুপ্রাসাদে আগুন লাগিলে রক্ষা করিবার কোনও উপায় নাই, পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করাই একমাত্র পথ। পুরীস্থ সকলে মহাকোলাহল করিয়া নিজ নিজ মূল্যবান দ্রব্য যাহা পাইতেছে, লইয়া পলাইতেছে। কে পড়িয়া রহিল, রাজা-রানী কে মরিল কে বাঁচিল, কাহারও দেখিবার অবসর নাই। নিজের প্রাণ বাঁচাইবার জন্য সকলেরই উগ্র বাহ্যজ্ঞানশূন্য ত্বরা।

অগ্নি ক্রমশ আরও ব্যাপ্ত হইতে লাগিল, এক প্রাসাদ ছাড়িয়া সংলগ্ন প্রাসাদসকল আক্রমণ করিল। বায়ুর বেগ বাড়িয়া গেল। অমাবস্যা রাত্রির মসীতুল্য অন্ধকার এই ভীষণ অগ্নিকাণ্ডে যেন বিদীর্ণ শতখণ্ড হইয়া গেল। বহুদূর পর্যন্ত নগর রক্তাভ আলোকে উদ্ভাসিত হইল!

নাগরিকগণ জাগিয়া উঠিয়া কোলাহল করিতে করিতে রাজপুরীর দিকে ছুটিল। উত্তেজিত বিহ্বল নর-নারী স্থালিতবাসনে মুক্ত-কেশে বাহ্যজ্ঞানশূন্যভাবে জ্বলন্ত রাজ-প্রাসাদের চতুর্দিকে সমবেত হইতে লাগিল।

সহসা বহুদূরে সম্মিলিত সহস্ৰকণ্ঠে মহাজয়ধ্বনি শ্রুত হইল। রাজপুরীর চারিপাশে সমবেত নাগরিকগণ উর্ধর্বমুখে অনলোল্লাস দেখিতেছিল, তাহার মধ্য হইতে কে একজন চিৎকার করিয়া বলিল, “পালাও! পালাও! নগরে শত্রু প্রবেশ করিয়াছে!”-অমনই বিক্ষুব্ধ জনতা উন্মত্তের ন্যায় চারিদিকে দৌড়িতে আরম্ভ করিল। কেহ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে ছুটিতে পড়িয়া গিয়া জানু ভাঙিল, কেহ জনমার্দের চরণতলে পড়িয়া পিষ্ট হইয়া গেল। ক্ৰন্দন, হাহাকার এতক্ষণ রাজপুরীর মধ্যে নিবদ্ধ ছিল, এবার নগরময় ছড়াইয়া পড়িল।

সোমদত্তা তখন কোথায়?

সোমদত্তা তখন আলুলায়িত কুন্তলে, লুষ্ঠিত বসনে পট্টমহাদেবীর প্রাসাদে প্রবেশ করিতেছে। কুমারদেবীর ভবনে তখনও ভালো করিয়া আগুন লাগে নাই, কিন্তু দাসী, কিঙ্করী, প্রহরিণী—যে যেখানে ছিল সকলে পলাইয়াছে। কুমারদেবীর অরক্ষিত শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া সোমদত্তা দেখিল, বিস্তৃত শয্যার উপর পুত্রকে বুকের কাছে লইয়া তিনি তখনও নিদ্রিতা।

সোমদত্তা সবলে তাঁহার অঙ্গে নাড়া দিয়া বলিল, “দেবী, উঠুন, উঠুন—প্রাসাদে আগুন লাগিয়াছে!”

কুমারদেবী চক্ষু মুছিয়া শয্যায় উঠিয়া বলিলেন, “কে?”

“আমি, সোমদত্তা। আর বিলম্ব করিবেন না, শীঘ্ৰ শয্যাত্যাগ করুন”—বলিয়া ঘুমন্ত সমুদ্রগুপ্তকে ক্ৰোড়ে তুলিয়া লইতে গেল।

কুমারদেবীর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ও কঠিন হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন, “আমার পুত্রকে স্পর্শ করিও না। দাসীরা কোথায়?”

“কেহ নাই, সকলে প্রাণভয়ে পলাইয়াছে।”

“মহলে কি করিয়া আগুন লাগিল?”

আর গোপন করিবার প্রয়ােজন ছিল না। সোমদত্তা স্থিরদৃষ্টিতে কুমারদেবীর মুখের পানে চাহিয়া বলিল, “আমি মহলে আগুন দিয়াছি।”

কুমারদেবী চিৎকার করিয়া কহিলেন, “স্বৈরিণী! তাহা জানি। যখন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে ঘরে আনিয়াছিস তখনি তোর অভিসন্ধি বুঝিয়েছি।”

সোমদত্ত কহিল, “অজ্জা, ক্ৰোধে অন্ধ হইয়া নিদোষের প্রতি দোষারোপ করিবেন না। সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুর প্রসাদেই আজ। আপনাদের প্রাণরক্ষা করিতে পারিব। এখন আসুন, পুরী এতক্ষণে ভস্মসাৎ হইল। আর বিলম্ব করিলে বুঝি আপনাদের বাঁচাইতে পারিব না।”

“তুই বাঁচাইবি? কেন, আমি কি আত্মরক্ষা করিতে জানি না?”

“না অজ্জা, আজ আমি ভিন্ন আর কেহ আপনাদের বাঁচাইতে পরিবে না।”

“তার অর্থ?”

“তার অর্থ চন্দ্ৰবর্মার সেনা দুর্গে প্রবেশ করিয়াছে, এতক্ষণে বোধ করি রাজপুরী ঘিরিল।” কুমারদেবীর চক্ষু দিয়া অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইতে লাগিল, “ডাকিনী! এ তোর কার্য; তুই মগধরাজ্য ছারখারে দিলি।”

সোমদত্তা স্থিরভাবে বলিল, “স্বীকার করিলাম। কিন্তু আর বিলম্ব করিলে কুমারকে বাঁচাইতে পারিব না। ঐ দেখুন, অগ্নি প্রসাদ বেষ্টন করিয়াছি।”

এই সময় অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি বাতায়নপথে অগ্নির আরক্ত লোলরিসনা ও কুণ্ডলিত ধূমোদাগার কক্ষে প্ৰবেশ করিল।

সোমদত্ত সমুদ্রগুপ্তকে ক্রেগড়ে তুলিয়া লইয়া বলিল, “আজ আমার স্বামীর বংশধরকে বাঁচাইব বলিয়া আসিয়াছি, নহিলে আসিতাম না। আপনি থাকিতে হয় থাকুন, আমি চলিলাম”—বলিয়া স্বারের দিকে অগ্রসর হইল।

কুমারদেবী ছুটিয়া আসিয়া তাহার বাহু ধরিলেন, বলিলেন, “রাক্ষসী, ছাড়িয়া দে, আমার পুত্রকে ছাড়িয়া দে!”

সোমদত্তা প্রজ্বলিত নয়নে ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “দুর্ভাগিনী, নিজের ইষ্ট বুঝিতে পার না? আমার স্বামীর পুত্র কি আমার পুত্র নয়? এ রাজ্যে আগুন আমি জ্বলি নাই, জ্বালিয়াছে তোমার দুরন্ত অন্ধ অভিমান। সেই আগুনে তুমি পুড়িয়া মর!”

কুমারদেবীর হাত ছাড়াইয়া পুত্র বুকে লইয়া সোমদত্তা ধূম্রােন্ধকার অলিন্দের ভিতর দিয়া ছুটিয়া চলিল। কাঁদিতে কাঁদিতে উন্মাদিনীর ন্যায় কুমারদেবী তাহার পশ্চাত চলিলেন।

নিজ শয়নকক্ষে ফিরিয়া আসিয়া সোমদত্তা দেখিল, রাজা অভিভূতের ন্যায় শয্যাপার্শ্বে বসিয়াআছেন—চতুর্দিকে কি ঘটিতেছে, তাঁহার যেন কোনও ধারণা নাই। ঘর ধূমাচ্ছন্ন—ঘরের চারিকোণে চারিটি সুবৰ্ণ-প্ৰদীপ তখনও ক্ষীণ আলোক বিস্তার করিয়া জ্বলিতেছে।

হাঁপাইতে হাঁপাইতে পুত্রকে স্বামীর ক্রোড়ে ফেলিয়া দিয়া সোমদত্তা ছুটিয়া গিয়া ধনুর্বাণ লইয়া আসিল। ভালো দেখা যায় না, দুই চক্ষু বহিয়া অশ্রুধারা ঝরিতেছে, সোমদত্তা ধর্মচক্রের মধ্যস্থল লক্ষ্য করিয়া শরসন্ধান করিল। লক্ষ্যভ্রষ্ট শর পাথরে লাগিয়া ফিরিয়া আসিল। আবার শরনিক্ষেপ করিল, ব্যর্থ শর আবার প্রতিহত হইয়া ভূমিতে পড়িল। অদম্য ক্ৰন্দনের আবেগে সোমদত্তার বক্ষ ফাটিয়া যাইবার উপক্রম হইল। তবে কি গুপ্তদ্বার খুলিবে না?

এদিকে ঘরের মধ্যে অগ্নির অসহ্য উত্তাপ উত্তরোত্তর বাড়িতেছে। রাজা এবং কুমারদেবী নিবাক নিষ্পলক হইয়া সোমদত্তার এই উন্মত্তবৎ কার্য দেখিতে লাগিলেন। সোমদত্তা অসীম বলে আপনাকে সংযত করিয়া পুনশ্চ ধনুবাণ তুলিয়া লইল। লক্ষ্যবস্তু নিকটেই কিন্তু ভালো করিয়া দেখা যায় না, হাত কাঁপে, চক্ষু কুলে কুলে ভরিয়া উঠে! বহুক্ষণ ধরিয়া, অনেকবার চক্ষু মুছিয়া, অতি সাবধানে লক্ষ্য স্থির করিয়া সোমদত্তা তীর ছুড়িল। এবার আর তীর ফিরিয়া আসিল না—ধৰ্মচক্রের মধ্যস্থলে বিধিয়া রহিল। সোমদত্তা ধনু ফেলিয়া দিয়া একবার ক্ষণকালের জন্য মাটিতে লুটাইয়া পড়িল।

কিন্তু পরক্ষণেই চক্ষু মুছিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। কুমারদেবীর নিকটে গিয়া বলিল, “অজ্জা, এইবার স্বামিপুত্ৰ লইয়া এই সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করুন। সুড়ঙ্গ নগর বাহিরে কুকুটপাদ বিহারে গিয়া শেষ হইয়াছে। সেখানে শত্রু নাই, সেখান হইতে সহজেই নিরাপদ স্থানে যাইতে পরিবেন।”

চন্দ্ৰগুপ্ত সুড়ঙ্গমুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া ছিলেন, এতক্ষণে প্রথম কথা কহিলেন, “নগরের বাহিরে যাইবার প্রয়োজন কি?”

সোমদত্ত কহিল, “প্রয়োজন আছে। শত্রু নগর অধিকার করিয়াছে।”

তখন পুত্ৰ লইয়া দুইজনে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করিলেন। সোমদত্তা চন্দ্রগুপ্তের চরণে মস্তক রাখিয়া প্ৰণাম করিয়া কহিল, “প্রিয়তম! এইবার বিদায় দাও।”

সহসা চন্দ্ৰগুপ্ত যেন তাঁহার সমস্ত চেতনা ফিরিয়া পাইলেন; ভীষণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, “সোমদত্তা, তুমি আসিবে না?”

সোমদত্তা দুই হাতে মুখ ঢাকিল; বলিল, “না প্রিয়তম, আমি আর তোমার সঙ্গে যাইবার যোগ্য নাহি। কেন নহি, তাহা দেবীর মুখে শুনিও। চন্দ্রবর্মা আমার পিতা—এই কথা মনে করিয়া যদি পারো, আমাকে ক্ষমা করিও। তোমরা যাও–আমি ভিন্ন পথে যাইব।”

হৃদয়-বিদারক স্বরে চন্দ্ৰগুপ্ত ডাকিলেন, “সোমদত্তা!” দুই হস্তে কৰ্ণ আবরণ করিয়া সোমদত্তা কাঁদিয়া উঠিল, “না, না, ডাকিও না-আমি যাইতে পারিব না। আমায় মরিতে হইবে। প্ৰাণাধিক, আবার জন্মান্তরে দেখা হইবে, তখন তোমার সোমদত্তাকে সঙ্গে লইও।”

এই বলিয়া সবলে টানিয়া সুড়ঙ্গের পাষাণ-দ্বার বন্ধ করিয়া দিল। চন্দ্রগুপ্তের মুখনিঃসৃত অধোঁচ্চিারিত বাণী পাষাণ-প্ৰাচীরে লাগিয়া স্তব্ধ হইয়া গেল।

তখন সেই উত্তপ্ত হর্ম্যতলে পড়িয়া, বসুধা আলিঙ্গন করিয়া, কেশ বিকীর্ণ করিয়া, ভূতলে ললাট প্ৰহত করিয়া সোমদত্তা কাঁদিল।

কিন্তু তবু অগ্নি নিবিল না।

 

এক হস্তে মুক্ত তরবারি, অন্য হস্তে প্ৰজ্বলিত উল্কা লইয়া দুগবিরোধকারী সেনা গৌতম-দ্বার দিয়া প্রবেশ করিল। তাঁহাদের পুরোভাগে লীেহবমাবৃত ধাতুনির্মিত শিরস্ত্ৰাণধারী ভীষণাকৃতি স্বয়ং চন্দ্রবমর্ণ। দ্বারের প্রহরীদিগকে পূর্বেই সরাইয়া দিয়াছিলাম, সুতরাং একবিন্দুও রক্তপাত হইল না।

চন্দ্রবর্মা আমাকে দেখিয়া পুরুষকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমিই বিশ্বাসঘাতক দ্বারপাল?”

কথার ভাবটা ভালো লাগিল না। যাহার জন্য বিশ্বাসঘাতকতা করিলম, সে-ই বিশ্বাসঘাতক বলে! যাহা হউক, বিনীত কণ্ঠে বলিলাম, “হাঁ আমিই। সম্রাটের জয় হউক।”

চন্দ্রবর্মা নিষ্করুণ আরক্ত দুই চক্ষু আমার মুখের উপর স্থাপন করিয়া মনে মনে কি যেন গবেষণা করিলেন, তারপর বলিলেন, “ভালো, সর্বাগ্রে পথ দেখাইয়া রাজপ্রাসাদে লইয়া চল।”

পথ দেখাইয়া লইয়া যাইবার কোনও প্রয়োজন ছিল না। বিরাট অনলস্তম্ভের মতো প্রাসাদ তখন জ্বলিতেছে—সমস্ত নগর আলোকিত করিয়াছে। আপনার প্রভায় রাজপুরী স্বয়ংপ্রকাশ।

সেনাদলের অগ্ৰে অগ্রে আমি চলিলাম। পথে কেহ গতিরোধ করিবার চেষ্টা করিল না, যে সম্মুখে পড়িল চৈত্রের বায়ুতাড়িত শুষ্কপত্রের মতো নিমেষমধ্যে বিপরীত মুখে অন্তৰ্হিত হইল।

প্রাসাদের শূন্য তোরণ পার হইয়া সদলবলে সম্মুখস্থ মন্ত্ৰগৃহে প্রবেশ করিলম। অগ্নি তখনও মন্ত্ৰগৃহ পর্যন্ত সংক্রামিত হয় নাই, তবে দীর্ঘ জিহ্বা বিস্তার করিয়া অগ্রসর হইতেছে—অচিরাৎ গ্রাস করিবে।

বিশাল বহুস্তম্ভযুক্ত মন্ত্ৰগৃহ প্রায়ান্ধকার, জনশূন্য। কেবল তাহার মধ্যস্থলে সিংহাসনের বেদীর সম্মুখে সোমদত্তা দাঁড়াইয়া আছে। অশনিপূর্ণ বৈশাখী মেঘের ন্যায় তাহার মূর্তি; বক্ষে পৃষ্ঠে মুক্ত কৃষ্ণ কেশজাল, ললাটে রক্তরেখা, নয়নের কৃষ্ণতারকায় জ্বালাময় বিদ্যুৎ।

বহু মশালের দীপ্তিতে মন্ত্ৰগৃহ আলোকিত হইল। তখন সোমদত্তা চন্দ্রবর্মাকে দেখিতে পাইয়া দ্রুতপদে আসিয়া তাঁহাকে প্ৰণাম করিল।

“বৎসে! কল্যাণী!”—বলিয়া চন্দ্রবর্মা সোমদত্তাকে পদপ্রান্ত হইতে তুলিলেন। ক্ষণকালের জন্য এই ভীষণ দুর্ধর্ষ যোদ্ধার কণ্ঠস্বর যেন প্রসাদগুণ প্রাপ্ত হইল।

সোমদত্তা অবরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, “পিতা, আপনার কার্য সিদ্ধ হইয়াছে।”

চন্দ্ৰবর্মা বলিলেন, “পুত্রী, সে তোমারই জন্য! তোমার যোগ্য পুরস্কার আমি সযত্নে সঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছি। এখন এই রত্নহার গ্রহণ কর।”—বলিয়া নিজ বক্ষ হইতে অমূল্য রশ্মিকলাপ মণিহার খুলিয়া সোমদত্তার হস্তে দিলেন।

সোমদত্তা হার দুই হস্তে ছিঁড়িয়া দূরে ফেলিয়া দিল; বলিল, “আর আমার পুরস্কারের প্রয়োজন নাই। আমার জীবনের সমস্ত প্রয়োজন শেষ হইয়াছে।”

চন্দ্ৰবর্মা বলিলেন, “সে কি! চন্দ্ৰগুপ্ত কোথায়?”

সোমদত্ত কহিল, “তা নয়, আমি বিধবা হই নাই। কিন্তু আমার স্বামীকে আর আপনি খুঁজিয়া পাইবেন না। তিনি পুরী ত্যাগ করিয়াছেন।”

“পুরী ত্যাগ করিয়াছেন! কোথায় গেল?”

“তাঁহাকে গুপ্তপথে দুর্গের বাহিরে পাঠাইয়াছি।”

“কন্যা, এ কার্য কেন করিলে?”

“দেব, এ ভিন্ন আমার আর অন্য পথ ছিল না। তিনি থাকিলে সকল কথা জানিতে পারিতেন, তাহা হইলে মরিয়াও আমার এ নরক-যন্ত্রণা শেষ হইত না। পিতা, আমার কিছুই নাই—সব গিয়াছে। নারীর যাহা কিছু মূল্যবান, যাহা কিছু প্রেয়, এক নরকের পশু তাহা হরণ করিয়াছে।”

অঙ্গারের মতো দুই চক্ষু সোমদত্তা আমার দিকে ফিরাইল। তর্জনী প্রসারিত করিয়া বিকৃতমুখে চিৎকার করিয়া কহিল, “এই নরকের পশু আমার সর্বস্ব হরণ করিয়াছে!”

অল্পকালের জন্য সমস্ত পৃথিবী যেন নীরব হইয়া গেল। আমি আমার হৃৎপিণ্ডের মধ্যে রক্তপ্রবাহের শব্দ শুনিতে পাইলাম। তারপর ব্যান্ত্রের মতো গর্জন করিয়া চন্দ্রবর্মা আসিয়া আমার কেশমুষ্টি ধারণ করিলেন। অন্য হস্তের অঙ্গুলিগুলা আমার চক্ষু উৎপাটিত করিবার জন্য অগ্রসর হইতেছিল, ক্রুর হাসি হাসিয়া সোমদত্ত কহিল, “পিতা, ক্ষণকাল অপেক্ষা করুন, আমি পুরস্কার লাইব। এই পিশাচকে এখনি মারিবেন না, ইহাকে তিলে তিলে দগ্ধ করিয়া মারিবেন। দীর্ঘকাল ধরিয়া বিষকন্টকপূর্ণ অন্ধকূপে যেন এই নিরাধম পচিয়া পচিয়া মরে, গলিত ক্রিমিপূর্ণ শূকরমাংস ভিন্ন যেন অন্য খাদ্য না পায়; মরিবার পূর্বে যেন ইহার প্রত্যেক অঙ্গ গলিয়া খসিয়া পড়ে। আমার আত্মা পরলোক হইতে দেখিয়া সুখী হইবে।”

চন্দ্রবমর্ণ আমার কেশ ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, “তাঁহাই করিব!…ইহাকে বাঁধিয়া রাখ।”

দশ জন মিলিয়া আমাকে বাঁধিয়া মাটিতে ফেলিল। তখন সোমদত্তা আমার নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল। আমার প্রতি অগ্নিপূর্ণ দুই চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া থাকিয়া সে আমার মুখে একবার পদাঘাত করিল। তারপর চন্দ্ৰবর্মার নিকট ফিরিয়া গিয়া স্থির শান্ত স্বরে কহিল, “পিতা, এইবার পিতার কার্য করুন।”

চন্দ্ৰবর্মার বজের মতো কণ্ঠস্বর কাঁপিয়া উঠিল, “কি কাৰ্য বৎসে?”

সোমদত্তা বলিল, “এ দেহ আপনিই দিয়াছিলেন, আপনিই ইহার নাশ করুন।”

পাষাণ-স্তম্ভের মতো চন্দ্ৰবিমী দাঁড়াইয়া রহিলেন।

সোমদত্তা পুনরায় কহিল, “আমার মন নিষ্কলুষ, এই দূষিত দেহ হইতে তাহাকে মুক্ত করিয়া পিতার কর্তব্য করুন।”

বহুক্ষণ পরে অস্ফুট কণ্ঠে চন্দ্ৰবৰ্মা বলিলেন, “সেই ভালো, সেই ভালো।”

সোমদত্তা তখন দুই হস্তে বক্ষের কঞ্চুলী ছিঁড়িয়া ফেলিয়া পিতার সম্মুখে নতজানু হইয়া বসিল।

চন্দ্রবমর্ণ দক্ষিণহস্তে সুতীক্ষ্ণ ভল্ল তুলিয়া লইয়া চতুর্দিকে চাহিয়া কৰ্কশভয়ানক কণ্ঠে কহিলেন, “সকলে শুন, আমার কন্যার দেহ অশুচি হইয়াছিল, আমি তাহা ধ্বংস করিলাম।”—বলিয়া দুই পদ। পিছু হটিয়া গিয়া ভল্ল ঊর্ধ্বে তুলিলেন। সোমদত্তা উন্মুক্ত বক্ষে নির্ভীক নিষ্পলক দৃষ্টিতে পিতার মুখের প্রতি চাহিয়া রহিল।

আমি সভয়ে চক্ষু মুদিলাম।

পুনরায় যখন চক্ষু উল্মীলিত করিলম, তখন দেখিলাম, রক্তচন্দন-চর্চিত শৈবালবেষ্টিত শ্বেত কমলিনীর মতো সোমদত্তার বিগতপ্ৰাণ দেহ মাটিতে পড়িয়া আছে।

১ বৈশাখ, ১৩৩৮

%d bloggers like this: