শুল্বসূত্র

শুল্বসূত্র নামে পরিচিত সূত্র সাহিত্যের একটি ক্ষুদ্র অংশে যজ্ঞবেদী ও যজ্ঞগৃহের মত যজ্ঞীয় স্থাপত্যের জ্যামিতিক ভিত্তি আলোচিত হয়েছে। শুল্ব শব্দটির অর্থ প্রমাণসূত্র (বা মাপাবার ফিতে)। শুল্বসূত্রের নিদর্শনরূপে খুব বেশি সংখ্যক রচনা আমাদের কাছে পৌঁছয় নি। আমরা মোট সাতটি শুল্বসূত্রের সন্ধান পেয়েছি : বৌধায়ন, কাত্যায়ন, আপস্তম্ব, সত্যাষাঢ়, মানব, বারাহ ও মৈত্রায়ণী। এই গ্ৰন্থসমূহের বিষয়বস্তু যেহেতু পরিমাপ এবং তৎসংশ্লিষ্ট জ্যামিতি ও গণিত তাই এদের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। বেদী ও যজ্ঞ গৃহের একই ধরনের জ্যামিতিক পরিমাপের জন্য সবগুলি গ্ৰন্থ একই ধরনের প্রয়োগিক পরিভাষা ব্যবহার করেছে।

সংক্ষেপে কাত্যায়ন ও আপস্তম্ব রচিত দুটি শুত্বসূত্রের আলোচনা করা যায়৷ অবশিষ্ট রচনাগুলির মধ্যে বোধায়নের গ্রন্থটি সেই শাখার শ্রৌতসূত্রেরই অনুপূরক গ্ৰন্থ, শুল্বসূত্রটি প্রকৃতপক্ষে পূর্বোক্ত গ্রন্থের শেষ বা ত্রিশতম প্রশ্নেই পাওয়া যায়। বরাহ ও মানব নামমাত্র ভিন্ন কেননা এদের রচনায় কিছুমাত্র প্রভেদ নেই। এই দুটি রচনাই তিনটি অংশে বিভক্ত; ‘মানবশুল্ব’ নামে পরিচিত প্ৰথম অংশটি পদ্যে রচিত ও চারটি অংশে বিন্যস্ত। উত্তরাষ্টক নামে পরিচিত দ্বিতীয় অংশটি পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত এবং মূলত গদ্যে রচিত—শুধু শেষ খণ্ড পদ্যে রচিত। ‘বৈষ্ণব’ নামে পরিচিত তৃতীয় অংশে মূলত পদ্যে রচিত ও সাতটি খণ্ডে বিন্যস্ত। এই গ্রন্থগুলিতে পদ্যের প্রাধান্য রচনার অর্বাচীনতার ইঙ্গিত বহন করছে, বিশেষত যখন আমরা স্মরণ করি যে প্রাচীনতর গদ্য রচনাগুলির ভাষ্যকাররা নিজেদের ভায্যের সমাপ্তিতে বেশ কিছুসংখ্যক শ্লোক ব্যবহার করেছেন। আশ্বিলায়ন ও শুল্বসূত্র মৈত্রায়ণী শাখার অন্তর্গত এবং সত্যাষাঢ় ও আপস্তম্ব শুল্বসূত্র সম্পূর্ণভাবে পরস্পরের অনুরূপ। রচনাগুলি কয়েকটি ‘পটল’ ও ‘খণ্ডে’ বিন্যস্ত।

কাত্যায়ন শুল্বসূত্র ছ’টি অধ্যায়ে বিভক্ত একটি ক্ষুদ্র গ্রন্থ। এর সূচনায় রয়েছে বৃত্ত সম্পর্কিত প্রয়োগিক নির্দেশ এবং সেই সঙ্গে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিক নির্ণয়ের পদ্ধতি। বৃত্ত, আয়তক্ষেত্র ও অর্ধবৃত্ত–এই তিনটি ভিন্ন আকৃতিতে তিনটি ভিন্ন অগ্নির জন্য যজ্ঞ গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে বিবিধ জ্যামিতিক অনুপুঙ্খ আলোচিত হয়েছে। পূর্বোক্ত যজ্ঞ গৃহগুলির যথাযথ অবস্থান ও পারস্পরিক দূরত্ব পরিমাপ করাই এই গ্রন্থের প্রকৃত বিষয়বস্তু। এর অব্যবহিত পরে বিভিন্ন যজ্ঞ সংশ্লিষ্ট উপকরণ রাখার নির্দেশাবলী বিবৃত হয়েছে।

বিভিন্ন খণ্ডে বিন্যস্ত মোট ছ’টি পটলে গ্রথিত আপস্তম্ব শুষ্কসূত্রেরও একই লক্ষ্য। অর্থাৎ যজ্ঞ গৃহ ও বেদী নির্মাণ। গ্রন্থের সূচনায় রয়েছে যজ্ঞ গৃহ পরিমাপের প্রমাণসূত্রের বর্ণনা এবং পরে কুড়িটি বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে একটি বৰ্গক্ষেত্রের মধ্যে বৃত্তাকৃতি বস্তু স্থাপনের স্থাপত্য-বিষয়ক সমস্যার জ্যামিতিক সমাধান। অন্তিম অংশগুলিতে সোম, দর্শপুর্ণমাস, সৌত্রামণী, অশ্বমেধ, নিরূঢ়-পশুবদ্ধ প্রভৃতি প্রধান যাগগুলির জন্য প্রয়োজনীয় যজ্ঞবেদী নির্মাণ পদ্ধতি। এই প্রন্থে ব্যবহৃত এগারোটি প্ৰায়োগিক পরিভাষা থেকে কৃষিকার্য ও স্থাপত্য সংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক জ্যামিতিবিষয়ক উন্নততর জ্ঞানের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা অবহিত হই। এছাড়া এই গ্রন্থে গণিত ও বীজগণিত সম্পর্কিত জ্ঞানের পরিচয়ও রয়েছে।

প্ৰত্যাশিতভাবেই শুল্বসূত্রগুলির বিশিষ্ট চরিত্রলক্ষণ হল গণিত শাস্ত্রের উপযোগী যথার্থতা; তবুও রচনাশৈলীতে ব্যাকরণ গ্রন্থের তুলনায় ঐগুলি কম রহস্যময় ও সংক্ষিপ্ত। কারণ সম্ভবত স্থাপত্য ও যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য প্ৰায়োগিক নির্দেশ অধিকতর স্পষ্টতা ও প্ৰাঞ্জলতা দাবি করে এবং এদের কখনো অতিরিক্ত মাত্রার সংক্ষেপিত বা সঙ্কুচিত করে আনা সম্ভব নয়। কাত্যায়ন শুল্বসূত্রের সমাপ্তিতে ভাষ্যকাররা প্রয়োগিক পরিভাষা ও অনুপুঙ্খ সম্পর্কে বেশ কিছুসংখ্যক শ্লোক সংযোজিত করেছেন।

এর সম্ভাব্য কারণ এই যে প্রকৃত যজ্ঞানুষ্ঠান বন্ধ বা ধ্বংসোন্মুখ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এইসব পরিভাষা সম্পর্কিত জ্ঞান ক্রমশ ক্ষীণ ও অস্পষ্ট হয়ে পড়ছিল। শ্রৌত, গৃহ ও ধর্মসূত্রগুলির সঙ্গে চীনদেশের বিখ্যাত গ্ৰন্থ ‘লি-খি’র প্রবল সাদৃশ্য রয়েছে। এই গ্রন্থেও রণ-নৈতিক, প্রশাসনিক, আনুষ্ঠানিক, সামাজিক ও পারিবারিক আচরণ সম্পর্কে নিয়মাবলী লিপিবদ্ধ হয়েছে। তবে ‘লি-খি’র মত সূত্র সাহিত্য কোনো প্ৰকৃত অনুষ্ঠানের যথার্থ ইতিহাস প্রণয়ন করে নি, যেহেতু ভারতবর্ষে ব্ৰাহ্মণ সাহিত্য তা পূর্বেই আলোচিত হয়েছিল।