বিষয়বস্তু (ধর্মসূত্র)

সামবেদের গৌতম ধর্মসূত্র (ধর্মশাস্ত্ৰ নামেও পরিচিত) সম্ভবত প্রাচীনতম রচনা; তা আঠাশটি অধ্যায়ে বিভক্ত। ছত্রিশতম অধ্যায়টি সামবিধান থেকে হুবহু উদ্ধৃত হয়েছে; প্ৰায়শ্চিত্ত ও শুদ্ধীকরণ সংক্রান্ত যেসব বিবরণ রচনায় উল্লিখিত, তাদের মধ্যে ন’টি বিখ্যাত সামমন্ত্র স্থান পেয়েছে–এ-সমস্ত সামবেদের সঙ্গে গৌতম ধর্মসূত্রের যোগসূত্রটি প্রতিষ্ঠিত করে। যবন শব্দের উল্লেখ থেকে মনে হয়, এই গ্রন্থের উচ্চতম সীমা খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর কাছাকাছি।

দীক্ষানুষ্ঠান দিয়ে রচনার শুরু এবং ক্রমে ক্ৰমে প্ৰায়শ্চিত্ত ও শুদ্ধীকরণ অনুষ্ঠান এবং ব্ৰহ্মচর্য এতে আলোচিত হয়েছে। এর অব্যবহিত পরে যথাক্রমে সন্ন্যাসী, বানপ্ৰস্থ ও গৃহন্থের জীবন সম্পর্কিত নিয়মাবলী বিবৃত হয়েছে। এই চতুরাশ্রমের পরে চতুবর্ণের উপযুক্ত অভিবাদন বিধি, বিভিন্ন অবস্থান এবং আপতিক অবস্থার জন্য উদ্ভাবিত বিশেষ নিয়মাবলী স্থান পেয়েছে। অষ্টম অধ্যায় রাজা ও বেদবিদ ব্রাহ্মণকে পৃথিবীর নৈতিক শৃঙ্খলার নিয়ন্তাররূপে অভিহিত করে ব্রাহ্মণের বিশেষ অধিকারগুলি বিবৃত করেছে। পরবর্তী অধ্যায়ে কতকটা আকস্মিকভাবে স্নাতকদের কর্তব্য ও অধিকার আলোচনা করে চতুর্বর্ণের যথাযোগ্য বিধিসন্মত বৃত্তির তালিকা দিয়েছে। দশম অধ্যায়ে রাজার কর্তব্য, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন এবং সাক্ষ্যদান সংক্রান্ত আইন লিপিবদ্ধ হয়েছে। পরবর্তী অধ্যায়গুলির বিষয়বস্তু হল আনুষ্ঠানিক অশুচিতা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সংশ্লিষ্ট অর্ঘ্য, বেদাধ্যয়ন এবং খাদ্যাখ্যাদ বিচার। নারীর দায়িত্ব ও অধিকার সংক্রান্ত একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ের পরে নয়টি সম্পূর্ণ অধ্যায়ে বিবিধ অপরাধের জন্য (আনুষ্ঠানিক, সামাজিক ও পারিবারিক) তপস্যার কথা আলোচিত হয়েছে। শেষ অধ্যায়ে রয়েছে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিধিগুলি।

কালানুক্রমিক বিচারে মনে হয়, বৌধায়ন ধর্মসূত্রের স্থান ঠিক এর পরেই। গৌতমের মত এটিও দাক্ষিণাত্যে উদ্ভূত হয়েছিল। আলোচ্য রচনাটি যে শুধু গৌতম ধর্মসূত্রের সঙ্গে পরিচিত ছিল, তাই নয়; প্রকৃতপক্ষে এর তৃতীয় অধ্যায়টি শেষোক্ত গ্রন্থের উনিশতম অধ্যায় থেকে প্রচুর ঋণ গ্রহণ করেছে। বৌধায়নের প্রথম দুটি অধ্যায়ে রয়েছে বিস্তর পুনরাবৃত্তি। মোটামুটিভাবে এই গ্রন্থ বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে গৌতমের অনুরূপ; বস্তুত উল্লিখিত বিষয়সমূহ সমস্ত ধর্মসূত্রের পক্ষেই সাধারণ, তবে আলোচ্য গ্রহে বিষয়বস্তু ও বিন্যাস-পদ্ধতিতে শৃঙ্খলা অপেক্ষাকৃত কম। তৈত্তিরীয় শাখার অন্তৰ্গত হলেও বৌধায়ন অন্যান্য অনেক শাখার মধ্যেই জনপ্ৰিয়তা অর্জন করেছিল এবং একে বহু ধর্মসূত্রের প্রধান আকর গ্ৰন্থরূপে গ্ৰহণ করা হয়ে থাকে। তৃতীয় প্রশ্নের ষষ্ঠ অধ্যায়ের সঙ্গে বিষ্ণুস্মৃতির আটচল্লিশতম অধ্যায়ের নিবিড় সাদৃশ্য লক্ষণীয়। বৌধায়ন অশব্য কল্পসূত্রের চতুর্বিত্র রচনায় বিন্যস্ত সম্পূর্ণ সূত্র-সাহিত্যের নিদর্শন রেখে যায় নি; বৌধায়ন রচিত বিভিন্ন অংশ যে আঙ্গিকে উপস্থিত হয়েছে, তা থেকে প্রমাণিত হয় যে মূল রচনার বিপুল অংশ লুপ্ত হয়ে গেছে এবং প্রচলিত সূত্রগুলিও অপটুভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। অনেক বিক্ষিপ্ত অংশই স্পষ্টত পরবর্তীকালে রচিত হয়েছিল। গ্রন্থের প্রায় সমস্তই অংশই গদ্যে রচিত, শুধু চতুর্থ প্রশ্ন মূলত পদ্যে গ্রথিত; এতে পরবর্তীকালের প্রত্নপৌরাণিক দেবতা এবং এমনকি, তান্ত্রিক উপাসনা পদ্ধতিও আলোচিত হয়েছে।

বৌধায়নের বিষয়বস্তু অন্যান্য ধর্মসূত্রগুলির অনুরূপ–প্ৰথম তিন বর্ণের উপযোগী চতুরাশ্রম আলোচিত হয়েছে। খাদ্য সম্বন্ধে বিধিনিষেধ, একত্রভোজন বিষয়ে নিয়ম, শ্ৰাদ্ধ, তপস্যার বিবিধ পদ্ধতি, আইন ও বিচারপদ্ধতি, জীবনের তৃতীয় ও চতুর্থ আশ্রমে কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ ও উপযুক্ত আচারবিধি ইত্যাদির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধের বৃত্তে বহু যতি-সম্প্রদায় ও তাদের আচরিত জীবনযাপন পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয় কেননা এ সম্প্রদায় ক্রমশই প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করায় এদের আর অবহেলা করা সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওযার পর সামাজিক ও রাজনৈতিক অপরাধ ও তৎসংশ্লিষ্ট শান্তির সংখ্যা ক্ৰমাগত বধিত হচ্ছিল; পাপ, অপরাধ ও শান্তি-বিষয়ক বিপুল কলেবর আলোচনার মধ্যে তা প্ৰতিফলিত হয়েছে। ভারতবর্ষে কখনো কোনো সুবিন্যস্ত কেন্দ্রীয় ধর্মশাসকমণ্ডলী ছিল না; তাই কেন্দ্রীয় যাজকমণ্ডলীর স্বাভাবিক কর্তব্য রাজনৈতিক শাসকদের উপর অর্পিত হয়েছিল; এরা নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক অপরাধের জন্য শান্তি বিধান করতেন। একাজে শাসকের পরামর্শদাতারূপে পুরোহিত ও অমাত্যরা সক্রিয় ছিলেন; তাদের ব্রাহ্মণ পরিচয়ের ফলে তারা রাষ্ট্রের ধর্মযাজক ও রাজনৈতিক বাহুরূপে ভূমিকা গ্ৰহণ করেছিলেন। পরিবার, সম্পত্তি, রাষ্ট্র ও ধম, তাদের অধিকার ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের সীমা-এই জটিল প্ৰায়োগিক পদ্ধতির দ্বারা কেন্দ্রীভূত করে তুলেছিল–সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে রাজা তার ব্ৰাহ্মণ উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিভিন্ন কার্য পরিচালনা করতেন।

ত্রিশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রের বিষয়বস্তু অন্যান্য গ্রন্থগুলির অনুরূপ। সম্ভবত এর একমাত্র মৌলিক উপাদান হল সেই অংশটি যেখানে চতুৰ্বর্ণের উৎপত্তি ও নারীর স্বাভাবিক অপবিত্ৰতা বর্ণিত হয়েছে। জঘন্য পাপের শান্তিরূপে সমাজ থেকে বহিষ্কার এবং উপযুক্ত তপস্যার পর পুনগ্রহণের অনুমতির উল্লেখ থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করা যায় যে গনগোষ্ঠীর সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। এর দীর্ঘতম অংশের বিষয়বস্তু হল তপস্যা। এখানে ব্ৰাহ্মণদের অগ্নিতুল্য সম্মানের অধিকারী বলা হয়েছে এবং তাদের প্রাপ্য দক্ষিণার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর প্রকৃতি থেকে রচনার অর্বাচীনতার ইঙ্গিত পাওয়া যায় |

দুটি প্রশ্নে বিন্যস্ত আপস্তম্ব ধর্মসূত্র এই শ্রেণীর অন্যতম প্রধান রচনা এবং বৌধায়নের পরেই তার স্থান। বক্তব্যের মৌলিক ভাবনার বিচারে তা ব্ৰাহ্মণ-সাহিত্যের অধিক নিকটবর্তী। এই গ্রন্থের প্রথম সূত্রেই যুগোপযোগী আইন ও সামাজিকভাবে অনুমোদিত প্রথার সঙ্কলনরূপে সমগ্র রচনার পরিধিকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে; ধাৰ্মিক ব্যক্তির আচরণ এবং বেদকে এ-ব্যাপারে দুটি প্রামাণ্যরূপে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

প্ৰথম তিনটি বর্ণের আচরণ আলোচ্য গ্রন্থের প্রধান বর্ণনীয় বিষয়; তাই এই তিন বর্ণের সেবাকে শূদ্রের একমাত্র কর্তব্যরূপে এখানে নির্দেশ করা হয়েছে। ধর্মসূত্রগুলির মধ্যে এটি এ প্রাচীনতর রচনার অন্যতম, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মিশ্র উপবর্ণ সম্পর্কিত নিয়মাবলীর অনুপস্থিতি এবং গোমাংস ভক্ষণ সম্বন্ধে অকুণ্ঠ অনুমোদন ও তেজারিতি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিয়মাবলী থেকে। ব্রাহ্মাণ্য সমাজের রীতিনীতি ও আচার আচরণকে সমর্থন জানানো ও বিধিবদ্ধ করাই যেন এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। একাদিক্ৰমে জীবনের চতুরাশ্রম এতে আলোচিত; এর সূত্রপাত ব্ৰহ্মচর্য পর্যায়ে করণীয় ও অকরণীয় বিষয়গুলির বর্ণনায়–তপস্যা সংক্রান্ত নিয়মাবলী থেকে স্খলিত হলে তা নরকবাসের কারণরূপে নির্দেশিত হয়েছে। আচার্যের প্রতি ব্যক্তিগত সেবা ও অতিরিক্ত আনুগত্য প্রকাশের মধ্যে তন্ত্র প্রভৃতি প্ৰতিবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে গুরুর ভূমিকার গুরুত্ব আভাসিত। এই গ্রন্থে প্রতিফলিত সমাজে বর্ণভেদ সম্পর্কিত নিয়মাবলী স্পষ্টত কঠোরভাবে পালিত হত; বিভিন্ন বর্ণের আচরণ সম্পর্কিত নির্দেশের অসংখ্য অনুপুঙ্খ থেকে আমরা এই সম্পর্কে অবহিত হই। খুবই বিস্ময়করভাবে নিষিদ্ধ খাদ্যের তালিকায় গোমাংস ও কুক্কট মাংস অন্তর্ভুক্তি হয় নি। যেসব জনগোষ্ঠীর কাছে খাদ্যগ্রহণে বাধা ছিল, তাদের বিষয়ে সুদীর্ঘ আলোচনা থেকে একত্র আহার ও সামাজিকভাবে জাতিচ্যুত ব্যক্তিদের সম্পর্কে প্রচলিত নিয়মাবলী সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা পাই; এই তালিকার মধ্যে রয়েছে লোকশিল্পী ও কারিগর, যোদ্ধা, অর্থের বিনিময়ে আতিথ্যদানকারী ব্যক্তি, চিকিৎসা, কুসীদজীবী, নপুংসক, রাজভৃত্য, উম্মাদ, রুগ্‌ণ, পাপী ও ব্রাহ্মণ্য-বিধি-বহির্ভূতভাবে তপস্যার নিরত ব্যক্তি।

জীবনের চারটি স্বীকৃত লক্ষ্য, অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ—এই চতুর্বর্গ সম্বন্ধে এখানে প্রচুর আলোচনা রয়েছে। আপাত-নীরস বিষয়বস্তুর মধ্যে কখনো কখনো বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক চিন্তাসমৃদ্ধ শ্লোক সন্নিবিষ্ট হয়েছে। সাধারণত প্রতি আচরণবিধি সম্পর্কেই অতিরিক্ত সূক্ষ্ম অনুপুঙ্খ পাওয়া যায়। হত্যার পাপ-ক্ষালন সম্পর্কিত নির্দেশাবলী থেকে আমরা সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস বিষয়ে বেশ ভাল একটি ধারণা পাই; যেমন, বলা হয়েছে, ক্ষত্রিয়হত্যার প্রায়শ্চিত্ত একসহস্ৰ গোদান, বৈশ্যহত্যার জন্য একশত এবং শূদ্র বা নারী হত্যার জন্য দশটি গরু ও একটি ষাঁড় দান করতে হবে। ব্ৰাহ্মণ হত্যা মহাপাপ বলে গণ্য হত; এর যথাযথ প্ৰায়শ্চিত্ত ছিল অরণ্যে দ্বাদশবর্ষব্যাপী কঠোর তপস্যা কিংবা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন। বিবিধ শ্রেণীর পাখি, নীচ প্ৰাণী ও নারী এবং শূদ্রহত্যার একই প্ৰায়শ্চিত্ত নির্দেশ করা হত। আপাতদৃষ্টিতে প্ৰত্যেক জঘন্য পাপের জন্যই প্ৰায়শ্চিত্ত বিহিত হয়েছিল। কখনো কখনো আমরা মানবতাবাদেরও আশ্চৰ্য আভাস পাই। কিছু কিছু প্ৰায়শ্চিত্তের পদ্ধতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদের নিদর্শনও পাওয়া যায়। চতুৰ্বর্ণের উপযুক্ত কর্ম এবং আপতিক অবস্থা সম্পর্কিত নিয়মাবলীর পরেই দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। আট প্রকার বৈধ বিবাহ-প্রক্রিয়ার মধ্যে কেবলমাত্র প্রথম তিনটিকে প্রশংসা করা হয়েছে; গন্ধৰ্ব বিবাহ থেকে শুরু করে অন্যান্য বিবাহ-রীতিকে তুলনামূলকভাবে হীনতার ভাবা হয়েছে। তাছাড়া যৌতুক অপেক্ষা কন্যা-শুষ্ককে অধিক গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা হত। বিভিন্ন বর্ণের পত্নীর পুত্রদের ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে বর্গীকরণ করা হত-পিতা ও জন্মদাতার প্রতি তাদের দায়িত্বও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। পত্নীকে স্বামীর সম্পদের যৌথ অধিকারিণী বলে ভাবা হত; অবশ্য তা দান বা বিক্রয়ে তার অধিকার ছিল না, ধর্মীয় কর্ম, পুণ্য ও সম্পদ ভোগের ব্যাপারে পত্নী তার স্বামীর সমান অংশ-ভাগিনী হতেন এমন কথাও কোথাও কোথাও আছে। ক্রমশ শ্রাদ্ধ অধিকতর তাৎপর্য অর্জন করেছে; বহু অংশে প্রচুর অনুপুঙ্খসহ শ্ৰাদ্ধ বিষয়ে নানাবিধ নিয়ম লিপিবদ্ধ হয়েছে। মাংস–বিশেষত গরু ও মোষের মাংস–পিতৃপুরুষের পক্ষে অত্যন্ত প্রীতিপ্ৰদ বলে বিবেচিত হত। মাছ এবং গণ্ডার সমেত অন্যান্য জন্তুর মাংস অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পক্ষে উপযুক্ত খাদ্যার্ঘ্য রূপে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বৈরাগ্য; এই বিশেষ পর্যায়ে জীবনযাপন প্ৰণালী সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নিয়ম প্রণীত হয়েছিল। এই সমস্ত নিয়মের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম ও অন্যান্য সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অভিব্যক্ত; তবে বৌদ্ধধর্ম অপেক্ষা অধিক কঠোরতা এদের মধ্যে নির্দেশিত হয়েছে। এই যুগে ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ও সন্ন্যাসমূলক ধর্মের প্রবণতার মধ্যে প্রবল বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। প্রতি ধারার গুণাবলী যথাযথভাবে বর্ণিত হয়েছে; তবে শেষ পর্যন্ত ব্ৰাহ্মণ্যধর্মের ওপরেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কেননা সন্ন্যাসধর্মকে শুধুমাত্র অত্যন্ত বৃদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। অবশ্য অহিংসাকে জীবনের মূল চালিকাশক্তিরূপে প্ৰশংসা করায় যজ্ঞধর্মের শুরুত্ব অনেকটা যেন হ্রাস পেয়েছে। রাজপ্রাসাদ, এর স্থাপত্য, রাজকীয় অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে একটি অংশ গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট আছে; এতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন এবং ব্ৰাহ্মণের প্রতি রাজকীয় দান আলোচিত হয়েছে। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে, ব্ৰাহ্মণের করদান থেকেও অব্যাহতি পেতেন; অবশ্য সেই সঙ্গে প্ৰতিবন্ধী, নারী, শিশু এবং সন্ন্যাসীদেরও কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হত–অবশ্য এই শোষোক্তদের সম্পত্তিতেই অধিকার ছিল না, যা ব্ৰাহ্মণের ছিল। একটি মানবিক বিধি অনুযায়ী ধর্ষিতা নারীকে রাজা ভরণপোষণ দিতেন; অপরাধী পুরুষকে হত্যা করে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান দেওয়া হয়েছিল। কৃষিক্ষেত্রে অবহেলার ফলে শস্যহানি ঘটলে সেজন্যও শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।

তিনটি অধ্যায় বিন্যস্ত বৈখানস্‌ ধর্মসূত্র সম্ভবত খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে রচিত। শ্রৌতসূত্র ও ধর্মসূত্রগুলি একই গ্রন্থে ক্রমান্বয়ে সন্নিবিষ্ট হয়েছিল; এই দুটি অংশকে একত্রে ‘বৈখানস প্রশ্ন’ রূপে অভিহিত করা হয়। রচনাটির নাম তাকে একটি বিশিষ্ট সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে; বস্তুত এই রচনা জীবনের চতুর্থ পৰ্যায়কে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে বিভিন্ন যতি-সম্প্রদায়ের রীতিনীতিকে স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে। এই গ্ৰন্থকে চারটি প্রধান ভাগে বিন্যস্ত করা যায়, যার প্রতিটি অংশে তপস্যার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির আলোচনা করা হয়েছে। তবে গ্রন্থটির নামকরণে যে বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত রয়েছে, তার সঙ্গে প্রকৃত সংজ্ঞার ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। তা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণ্যধর্মের পরিধির মধ্যে সন্ন্যাসমূলক ধর্মচারকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা এবং সে চেষ্টার সাফল্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই রচনা সেই তাৎপৰ্যপূণ যুগের অন্তর্গত, যখন মোক্ষাদানে প্রতিশ্রুতিকদ্ধ অনানুষ্ঠানিক উপাসনা-পদ্ধতির প্রতি উপনিষদের বিশেষ সুবিধাদানের প্রবণতা বাস্তবায়িত হয়ে উঠেছিল। নীতিগতভাবে মৌলিক আপোসের প্রবণতা যখন গৃহীত হল, বিভিন্ন সন্ন্যাসী সম্প্রদায়কে ধর্মীয় পরিমণ্ডলে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার জটিল ও দুরূহ কর্তব্য সম্পাদনের ভার সমাজের উপর এসে পড়ল; ততদিনে ঐসব সম্প্রদায়ের নাম অতিপরিচিত কিংবদন্তীতে পরিণত স্পয়েছে, ফলে শেষ দুটি আশ্রমে এদের স্থান নির্দেশ করা হল।

বৈখানস ধর্মসূত্র অরণ্যে অবসর-গ্রহণের পর্যায়কে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছে : পত্নীসহ ও একাকী বানপ্ৰস্ত গ্ৰহণ। এদের মধ্যে প্ৰথম ক্ষেত্রে পাঁচটি ও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে একত্রিশটি উপরিভাগ রয়েছে। চতুর্থ আশ্রমের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম সক্রিয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বানপ্রন্থের সারমর্ম ও বিশদ বিবরণ রয়েছে; তাছাড়া এতে বিস্তৃতভাবে আচরণবিধি ও কর্তব্যে শিথিলতার জন্য প্ৰায়শ্চিত্ত বৰ্ণিত হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায় গৃহস্থের কর্তব্য দিয়ে শুরু হলেও পুনরায় জীবনের শেষ দুটি অধ্যায় আলোচিত হয়েছে। কেশব, নারায়ণ ও দেবেশের মত নবাগত প্রত্ন-পৗরাণিক দেবতারা সর্বশক্তিমানরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। নিরামিষ ভোজনের প্রশংসা ও মিশ্রবর্ণ সম্পর্কিত আলোচনা থাকার ফলে এই গ্রন্থের তুলনামূলক অর্বাচীনতা স্পষ্ট। উপযুক্ত আচরণের নিয়মগুলিও এতে ভিন্ন, কারণ এই পর্যায়ে তা বৰ্ণভেদ ও সামাজিক অবস্থান দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, মানবিক ভাবনা তত গুরুত্ব পায় নি।

বিষ্ণুস্মৃতি ধর্ম-সূত্ররূপে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে বহু অর্বাচীন কালের ও অপেক্ষাকৃত অপ্ৰমাণ্য গ্রন্থ। এতে পাপ ও শাস্তির উপর প্রভূত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং অপরাধীদের জন্য নির্দিষ্ট নরকের সংখ্যাও এতে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।