প্রথম শেখের কাহিনী

প্রথম শেখ তখন বলতে শুরু করে। শোনো, দৈত্য সম্রাট, এই যে বুনো রামছাগলটা দেখছো, আসলে কিন্তু এটা কোনও জন্তু জানোয়ার না। এ হচ্ছে আমার চাচার মেয়ে-আমার শাদী করা বিবি। তিরিশটা বছর এক সঙ্গে ঘর করেছি। ছোটবেলা থেকেই যাদুকরী ছিলো সে। নানা রকম যাদুবিদ্যা দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিতো আমাকে।

একে নিয়ে তিরিশ বছর ঘর করলাম, কিন্তু দুঃখ যে, একটা ছেলেপুলে হলো না। আমাদের! তাই আমি আমার বাডির দাসীকে রক্ষিতা করে তার গর্ভে একটা ছেলে তৈরি করলাম। ছেলের বয়েস যখন পনেরো, তখন একদিন কাজের ধান্দায় ভিনদেশে যেতে হয়েছিলো আমাকে। আমার অবর্তমানে আমার এই বিবি, যাদু করে, ছেলেটাকে বাছুর, আর মাকে গাই গরু বানিয়ে রেখে দিলো। কিছুদিন বাদে ঘরে ফিরে বিবিকে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলে আর তার মা কোথায়। তখন সে আমাকে মিথ্যে করে বললো, দাসীটা মরে গেছে। আর ছেলেটা কোথায় উধাও হয়ে গেছে বলতে পারে না।

বিবির কথা শুনে আমি শোকে দুঃখে ভেঙে পড়লাম। সারাটা বছর কেঁদে কেঁদে কাটালাম। তারপর আমাদের পরবের দিন বকরি।-ঈদ এসে গেলো। এই দিনটা আমরা কোরবানী করি গরু, ছাগল, মোষ যার যা ইচ্ছে। পছন্দসই একটা গরু নিয়ে আসতে বললাম। আমার নোকারটাকে। নিয়ে এলো সে একটা গাই। জবাই করার জন্য ছুরি নিয়ে যখন এগিয়ে গেলাম তার কাছে, দেখি, তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। আর অদ্ভুতভাবে গোঙাচ্ছে। আমার কেমন মায়া হলো। পারলাম না। নোকরটার হাতে ছুরি দিয়ে বললাম, নে, তুই কর। আমি পারবো না।

তখন কী জানতাম গাইটা আসলে গাই না! ও আমার দাসী-রক্ষিতা, আমার ছেলের মা! যাই হোক, নোকরটা জবাই করলে ওকে। আর কী আশ্চর্য, গরুটা আর গরু নাই, আমার সেই দাসী-রক্ষিতার ধড় আর মুণ্ডুটা আলাদা হয়ে পড়ে আছে। দুঃখ হলো খুব! যাই হোক, নোকরিটাকে বললাম, যা একটা তাগড়াই দেখে বাছুর নিয়ে আয়। নোকর আমার কথা মতো নিয়ে এলো একটা হৃষ্টপুষ্ট বাছুর। কিন্তু বাছুরটাকে আনতেই সে লুটিয়ে পড়লো আমার পায়ের কাছে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, কী যেন সে বলতে চায়, পারছে না। মুখে ভাষা নাই, কি করে সে বলবে, আমাকে মেরো না, আমি তোমার একমাত্র ছেলে।

আমার মনের মধ্যে কী যে হলো, বোঝাতে পারবো না। নোকরটাকে বললাম, বাছুরটাকে আর মারবো না রে। তুই অন্য গরু নিয়ে আয়।

গল্পটা এই অবধি বলা হয়েছে, শাহরাজাদ দেখলো, রাতের আঁধার কেটে যাচ্ছে। চুপ করে গেলো সে।

ছোট বোন দুনিয়াজাদ প্রশংসা-গদগদ হয়ে বললো, কি মিষ্টি তোমার গল্প দিদি। আর কি সুন্দর করেই না বলতে পারো।

শাহরাজাদ বলে, তা ঠিক। কিন্তু আসল গল্প তো শুরুই হয়নি, বোন। শাহজাদার কৃপায় যদি বেঁচে থাকি, তবে কাল রাতে আবার বাকীটা শোনাবো। এখন ঘুমিয়ে পড়ো।

দুনিয়াজাদ ঘুমিয়ে পড়লো। বাদশাহ শারিয়ার ভাবলো, ভারি মজার গল্প তো! শেষটুকু না শুনে তো মেয়েটাকে হত্যা করা যায় না।

এরপর শাহরাজাদ ঘুমে ঢলে পড়লো বাদশাহ শারিয়ারের কোলে। শারিয়ারেরও চোখ জড়িয়ে আসে ঘুমে। শাহরাজাদকে বুকে জড়িয়ে সেও ঘুমিয়ে পড়ে তখুনি।

যখন ঘুম ভাঙে, বেলা তখন অনেক। নিজেকে তৈরি করে নিয়ে দরবারে গিয়ে ঢুকলো বাদশাহ। উজির, আমির, ওমরাহ উঠে দাঁড়িয়ে আভুমি নত হয়ে কুর্নিশ করলো বাদশাহকে। উজিরের পাশে এক ক্রীতদাস-এর হাতে একটা সোনার থালা। সেই থালার ওপরে তুলেট কাগজে জড়ানো একটা পান্না। সেটা তুলে নিয়ে বাদশাহর সামনে খুলে ধরলো, উজির। এটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সারারাত ধরে উপভোগ করে সকাল বেলায় নিজের হাতে মেয়েটার গর্দান নেয় বাদশাহ। প্রতিদিন। আজ তিন বছর ধরে এই একই নারকীয় কাণ্ড করে চলেছে। বাদশাহ। আর প্রতিদিন দরবারে এসে সেই হত্যাকাণ্ডের, দরবারী কায়দায়, ঘোষণা করা হয়। ঐ পান্নায় সেই ফরমানই লেখা থাকে। বাদশাহর ইঙ্গিতে পাঠ করে শোনায় উজির।

উজির জানতো, রোজাকার মতো আজ সকালেও হত্যা করেছে মেয়েটিকে। আর আজকের মেয়ে তারই নিজেরই মেয়ে। আদরের দুলালী। কান্নায় চোখ বুজে আসে। কিন্তু বাদশাহর মনে কোন সন্দেহ জাগে, এই আশঙ্কায় প্ৰাণ-পণে শক্ত করে রাখে নিজেকে। পান্নাটা তুলে নিয়ে মুডি যায়। বাদশাহ হাতের ইশারায়য় থামিয়ে দেয় উজিরকে। দরকার নাই। আর যা যা আছে নিয়ে এসো।

অবাক বিস্ময়ে ভাবতে থাকে উজির, একি অদ্ভুত কথা! সব যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকে। তবে কি তার নয়নের মণি, আদরের ধন, শাহরাজাদ এখনো বেঁচে আছে?

সারাদিন ধরে দরবারে নানা কাজ শেষ করে বাদশাহ ফিরে এলো খাসমহলে। নিজের শয়নকক্ষে। তখন সন্ধ্যা গডিয়ে গেছে।

রাত্রে আবার আব্দার ধরলো দুনিয়াজাদ। দিদি, সেই সওদাগর আর আফ্রিদির কাহিনীটা শোনাও এবার।

নিশ্চয় শোনাবো, বোন। কিন্তু সবই নির্ভর করছে জাঁহাপনার ইচ্ছে-অনিচ্ছের ওপর।

শারিয়ার হাসলো। নাও, শুরু করো, আমারও শুনতে খুব ইচ্ছে।

—শাহরাজাদ বলতে আরম্ভ করে। যখন সেই প্রথম শেখ দেখলো, বাছুরটা কাঁদছে, তখন সে তার নোকরিটাকে বললো, তুই এক কাজ কর। বাছুরটাকে খোয়াড়ে রেখে অন্য গরু নিয়ে আয়।

এই অস্বাভাবিক কাহিনী শুনতে শুনতে আফ্রিদি দৈত্য তো অবাক!

প্রথম শেখ বলে চলে, আমার চাচার মেয়ে, আমার বিবি এই রামছাগলটা তখন দাঁড়িয়েছিলো পাশেই। বললো, না না, এই বাছুরটাকেই জবাই করো আজ। দেখছে না, কেমন মোটাসোটা, তাগড়াই। বেশ ভালো মাংস হবে।

কিন্তু আমার মন সায় দিলো না। বড় মায়া হলো। নোকারটাকে বললাম, যা, তুই আর একটা ভালো দেখে নিয়ে আয়।

পরদিন বাডিতে বসে আছি, নোকারটা ছুটতে ছুটতে এসে বললো, একটা ভালো খবর আছে, মালিক। আমার লেড়কী যাদুবিদ্যা আর ঝাড়ফুকের মন্তর-তন্তর শিখেছিলো এক বুডির কাছে। সেই বুডিটা এখন আমার বাডিতেই থাকে। কাল যখন তুমি আমাকে বললে, বাছুরটাকে নিয়ে যা, তখন ওকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম আমার লেড়কীর কাছে। বাছুরটাকে দেখা মাত্র মেয়ে আমার, নাকাব দিয়ে মুখখানা ঢেকে ফেললো। বুঝতে পারলাম না। আমি ছাড়া অন্য কোন পরী-পুরুষ তো ছিলো না সেখানে! তবে কেন সে শরম করলো! বাছুরটাকে দেখতে দেখতে প্রথমে সে ফিক ফিক করে হাসতে লাগলো। কিন্তু তারপর কেঁদে ফেললো। আমাকে বললো, বাপজান, তুমি এই বাছুরটাকে নিয়ে এলে কেন আমার কাছে? তোমার মনে কি কোন সন্দেহ হয়েছে? ও যে আসলে একটা বাছুর না, মানুষের ছেলে, সে কথা কি জানতে?

-কী বলছিস তুই? কোথায় মানুষের ছেলে? আর ওকে দেখতে দেখতে কেনই বা কাঁদলি, আর হাসলিই বা কেন? কি ব্যাপার?

তখন মেয়ে বললো, এই বাছুরটা আমাদের মালিকের ছেলে। ওর সৎমা যাদু করে ওকে বাছুর বানিয়ে রেখেছে। শুধুওকে না, ওর মাকেও গাই করে রেখেছিলো সে। তোমরা তাকে আজ জবাই করেছো? বাছুরটা যখন বললো, তার বিমাতা তাকে আর মাকে যাদু করে বাছুর আর গাই করে রেখেছে তখন আমি হেসেছিলাম। কিন্তু যখন শুনলাম, তার মাকে তােমরা আজ জবাই করে মেরেছে তখন আমি কেঁদেছি।

আমার লেড়কীর কথা শুনে তো আমি থ! এ আবার কি ভুতুড়ে কাণ্ড। এমন আবার হয় নাকি! সারাটা রাত ঘুম নাই চোখে। কখন সকাল হবে, কখন তোমাকে জানাবো, সেই জন্যে ছটফট করছি।

নোকরের এই কথা শোনামাত্র তাকে নিয়ে বেডিয়ে পড়লাম। আনন্দে তখন আমি এমনই আত্মহারা যে, এমন সুখবর যে এনে দিলো তাকে যে একটু দারুপানি খাওয়াবো, তাও বেমালুম ভুলে গেলাম। তখন আমার শুধু এক চিন্তা, কতক্ষণে আমার জানের কলিজা—প্রাণের বাছাকে দেখতে পাবো।

নোকরেরবাড়ি পৌঁছতেই ওর সুন্দরী মেয়ে আমাকে আপ্যায়ন করে বসালো। আর বাছুরটা এসে আমার পায়ের কাছে গডিয়ে পড়লো। মেয়েটিকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি যা বলেছে। মা তাকি সত্যি?

মেয়েটি অবাক হলো। বললো, ওমা, সত্যি হবে না কেন? ও আপনার ছেলে, মালিক।

আমি বললাম, তোমার কথাই যদি ঠিক হয় মা, আর তুমি যদি আমার ছেলেকে আবার ফিরিয়ে দিতে পারো, তবে তুমি যা চাও তাই দেবো। আমি। তোমার বাবা আমার যে সব গরু ছাগল মোষ দেখাশোনা করে, সব তোমার হবে। আমার গোলায় দানা-শস্য যা মজুত আছে, সব দেবো তোমাকে।

মেয়েটি বললো, মালিক, আপনার এই সব মূল্যবান বিষয় সম্পত্তি আমি নিতে পারি দু’টোশর্তে। প্রথম শর্ত হলো, আপনার ছেলের সঙ্গে আমার শাদী দিতে হবে। আর পরের শর্ত হলো, আপনার ঐ ডাইনী বিবিকে যাদুমন্ত্র দিয়ে আমার ইচ্ছে মতো একটা জানোয়ার বানিয়ে রাখবো। আমি। যাদুবিদ্যা বড় বিদ্যা। তা শিখে তার অপব্যবহার করা মস্ত পাপ। আর এই জন্যেই তাকে শাস্তি দিতে চাই আমি। আপনি যদি রাজি থাকেন, বলুন মালিক, আমি এখুনি আপনার ছেলেকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।

-শোনো, দৈত্য সম্রাট, তখন আমার মনের অবস্থা নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছে; নোকরের মেয়ের শর্তে রাজি হয়ে গেলাম। বললাম, তুমি যা বলবে তাই হবে, মা। তুমি এখন আমার ছেলেকে মানুষ করে দাও। তার সঙ্গে আজই তোমার শাদী দিয়ে দেবো। তুমি আমার ঘরে যাবে। সব বিষয় সম্পত্তি তোমার হবে। তোমার কথা মতোই সব হবে। তুমি যা চাও তাই হবে। আমার বিবিকে তুমি যা বানাতে চাও তাই বানিয়ে রেখো। কোন আপত্তি করবো না। শুধু আমার ছেলেকে আবার মানুষ করে দাও।

আমার কথা শোনার পর, একটা ছোট্ট তামার বাসন নিয়ে এলো সে। পানিতে ভরা। বিড় বিড় করে কী সব মন্ত্র পড়তে লাগলো। সেই পানির ওপর। তারপর সেই পানিটুকু হাতে নিয়ে বাছুরটার গায়ে ছিটিয়ে দিতে দিতে বলতে থাকলো, খোদা যদি তোমায় বাছুর বানিয়ে থাকে তবে তুমি বাছুরই থাকবে। আর যদি কোন ডাইনী তোমাকে যাদু করে বাছুর বানিয়ে রাখে তবে, আল্লার দোয়ায়, তোমার আসল চেহারায় ফিরে এসো।

কি আশ্চর্য বাছুরটা ধীরে ধীরে একটা মানুষের চেহারা ফিরে পেতে লাগলো। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কঁদিতে বললাম, তোমার এই দশা কে করেছিলো, বাপজান?

তখন সে গোড়া থেকে সব বৃত্তান্ত বলতে লাগলো। এই বুনো রামছাগলটা—আমার চাচার মেয়ে—কি করে তাকে আর তার মাকে বাছুর আর গাই বানিয়ে রেখেছিলো তার বিস্তারিত কাহিনী শোনালো। আমি তাকে আদর করতে করতে বললাম, তোমার সৎমা এমন শয়তানী করেছিলো যে, না জেনে, হয়তো তোমাকে নিজের হাতেই কোরবানী করে ফেলতাম আমি। কিন্তু খোদা মেহেরবান, তিনিই তোমাকে বাঁচিয়েছেন। আর তোমাকে ফিরে পেলাম আজ। এই মা-জননীর দয়ায়। আমি তাকে কথা দিয়েছি, বাপজান, তোমার সঙ্গে তার আমি শাদী করিয়ে দেবো।

সেই দিনই শাদী দিলাম ছেলের। নোকরের মেয়েকে ছেলের বৌ করে ঘরে নিয়ে এলাম। তার যাদুমন্ত্রে আমার চাচার মেয়ে—আমার তিরিশ বছরের বিবি বুনো রামছাগল হয়ে গেলো। ছেলে বৌয়ের হাতে সংসার তুলে দিয়ে এখন আমি দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই। এখন আমার পথের সাথী। আমার চাচার মেয়ে—আমার তিরিশ বছরের ঘর-করা বিবি-এই বুনো রামছাগল।

এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম! দেখি, বটবৃক্ষের নিচে বসে কাঁদছে। এই সওদাগর। মায়া হলো। কাছে এলাম। শুনলাম তার দুর্ভাগ্যের কাহিনী। তারপর অপেক্ষায় ছিলাম। কী ঘটে, দেখে যাই।

আফ্রিদি দৈত্য খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। বড় মজাদার কিসসা। যাও, তোমার জন্যে সওদাগরের একভাগ গুনাহ মাফ করে দিলাম আমি।

এরপর দ্বিতীয় শেখ—সেই দুই গ্রে-হাউন্ড কুকুরের মালিক-এগিয়ে এসে সালাম জানালো আফ্রিদিকে। আমার কাহিনী যদি শোনো, দৈত্য সম্রাট, থ হয়ে যাবে তুমি।

এতক্ষণ যে কাহিনী শুনলে, তার চেয়েও মজাদার। আমার গল্প শুনে যদি তোমার ভালো লাগে তবে বেচারী সওদাগরের আর একটু অপরাধ মাফ করে দিও।

আফ্রিদি ঘাড় নেড়ে বললো, তাই হবে, শেখ সাহেব, অবশ্য তোমার গল্প যদি সত্যই আমার ভালো লাগে ।

%d bloggers like this: