সহস্র এক আরব্য রজনী (আলিফ লায়লা)
প্রথম খণ্ড

.০১ বাদশাহ শারিয়ার তার ভাই বাদশাহ শাহজামানের কাহিনী

এক সময়ে শাসন বংশের এক প্রবল পরাক্রান্ত শাহেনশা প্রাচ্যের এক বিশাল সলতানিয়তের শাসক ছিলেন। তার ছিলো বিরাট সৈন্যবাহিনী, অগণিত ক্রীতদাস, আর ছিলো পেয়ারা প্রজাবৃন্দ। তাঁর দুই পুত্র।

বড়টি দীর্ঘকায়, সুঠামদেহী, যোদ্ধা। আর ছোটটি ছিলো বেঁটে-খাটো, কিন্তু যুদ্ধবিদ্যায় জাঁদরেল। দুজনেই দুর্ধর্ষ ঘোড়সোয়ার। বড়টির তাগাদ আর বুদ্ধি ছোটর তুলনায় কিছু বেশী। হুকুমতে তার জুড়ি ছিলো না কেউ। প্রজাদের সুখ-দুঃখ, অভাব অভিযোগ দরদ দিয়ে বুঝতো। সেই কারণে, প্রজারাও তাকে জান প্ৰাণ দিয়ে ভালোবাসতো। তার নাম ছিলো বাদশাহ শারিয়ার। আর ছোট ভাইয়ের নাম বাদশাহ শাহজামান। সে শাসন করতে সমরখন্দের আল-আজম প্রদেশ। সেও ভারি পাক্কা শাসক-প্রজারা খুব ভালোবাসতো তাকে।

এই ভাবে বছর কুড়ি কেটে গেছে। খ্যাতি প্রতিপত্তিতে দুজনেই তখন শীর্ষে। অনেককাল ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা নাই। বাদশাহ শারিয়ারের মন উতলা হয়ে উঠলো ভাইকে দেখার জন্য। উজিরকে ডেকে ফরমাশ করলো, একবার শাহজামানের কাছে যাও। গিয়ে বলো, আমি একবার দেখতে চাই তাকে। কেন জানি না, মনটা আমার অস্থির হয়ে উঠেছে, তাকে দেখার জন্যে। তাড়াতাড়ি যাবার ব্যবস্থা করে–নিয়ে এসো তাকে।

উজির করজোড়ে বললো, যো হুকুম, জাঁহাপনা।

লোকলস্কর নিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত করে রওনা হয়ে গেলো। উজির। দুদিনের পথ। আল্লাহর দোয়ায় নিরাপদে শাহজামানের দরবারে পৌঁছে বাদশাহ শারিয়ারের অভিপ্ৰায় পেশ করলো।

শাহজামান বললো; আমি আজই সব ব্যবস্থা করে রওনা হচ্ছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। বাদশাহের প্রাসাদে সাজো সাজোরব পড়ে গেলো। ভালো ভালো তীবু, দামি দামি উট, গাধা, খচ্চর নেওয়া হলো। বাছাই করা হলো ক্রীতদাস, পালোয়ান। তারপর উজিরকে শাসকের ক্ষমতায় বসিয়ে রওনা হলো দাদার দেশে।

বেশ খানিকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। রাত্রি তখন দ্বিতীয় প্রহর। শাহজামানের হঠাৎ মনে পড়লো, দাদাকে যে জিনিসটা উপহার দেবে ভেবেছিলো, সেইটেই সঙ্গে নিতে ভুল হয়ে গেছে। তাই আবার ফিরতে হলো প্রাসাদে। হারেমে ঢুকেই সোজা চলে এলো খাস বেগমের ঘরে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই থমকে গেলো। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো না। মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগলো। সারা দুনিয়া আঁধার হয়ে গেলো তার সামনে। তার খাস বেগম একেবারে বিবস্ত্ৰা, একটা আবলুস-কালো নিগ্রো ক্রীতদাসের সঙ্গে জড়ােজড়ি করে অকাতরে ঘুমুচ্ছে। হায় খোদা, একী দেখালে আমাকে? আমার এতোদিনের এতো ভালোবাসা, সব কি মিথ্যে? মাত্র কয়েকঘণ্টা, প্রাসাদ ছেড়ে গেছি আমি, তার মধ্যে এই কাণ্ড! না জানি, বড়ভাইয়ের কাছে থাকার কালে, আরও কত কী ঘটতো! খাপ থেকে তলোয়ার খুলে, প্রচণ্ড এক কোপে দু’জনকেই দু’খানা করে ফেললো শাহজামান।

আর কালবিলম্ব না করে আবার দাদার উদ্দেশ্যে পথে বেরিয়ে পড়লো। দুদিন দুরাত্রি চলার পর বড়ভাইয়ের শহরে পৌঁছলো সে।

ভাইকে পেয়ে বাদশাহ শারিয়ার আনন্দে আত্মহারা। সারা প্রাসাদে হৈচৈ পড়ে গেলো।

ভাইকে বুকে জড়িয়ে আদর করলো। কতকাল পরে দেখা। কত কথা জমা হয়ে আছে। সব যেন একনাগাড়ে বলতে চায় শারিয়ার।

কিন্তু শাহজামানের মুখে কোনও হাসি নাই। বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে তার দেহে, মনে। বড় ভাইয়ের আনন্দে তাল দিতে পারলো না সে। কোনরকমে হুঁ, না বলে কথার জবাব দিতে থাকলো। তার মনে তখন সেই একই প্রশ্ন। এতো প্রেম, ভালোবাসা পায়ে দলে, কী করে সে পরপুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার করতে পারলো? দুনিয়ায় কি ভালোবাসা, বিশ্বাসের কোনও দাম নাই?

চিন্তায় চিন্তায় চোয়াল দু’টো তুবড়ে ঝুলে পড়েছে। সারা দেহটা যেন বৈশাখী ঝড়ে বিধ্বস্ত এক শাল গাছ। শাহজামানকে চিন্তাক্লিষ্ট দেখে শারিয়ার ভাবে, নিজের দেশ ছেড়ে এসে ভাই বোধ হয় স্বস্তি পাচ্ছে না। নানা চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। সেদিন আর কথা না বাড়িয়ে বিশ্রাম করতে বলে চলে গেলো। পরদিন সকালে আবার এলো ভাইকে দেখতে। দেখলো, সেই একই অবস্থা। খানাপিনা প্রায় করেনি বললেই চলে। শারিয়ার জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে তোমার, ভাই? কাল থেকে লক্ষ্য করছি, তুমি ভীষণ চিন্তিত। তোমার মুখে হাসি দেখিনি একবারও। কী ব্যাপার, খুলে বলো তো।

শাহজামান বললো, বুকের ভেতরটা হু হু করে পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন, সেকথা বলতে পারবো না এখন।

বেগমের সেই জঘন্য ব্যভিচারের কথা বলবেই বা কী করে?

শারিয়ার বুঝলো, নেহাতই ব্যক্তিগত ব্যাপার। সে প্রসঙ্গে আর না গিয়ে বললো, চলো, শিকারে যাই। দেখবে দেহ, মন বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

শাহজামান বললো, তুমি একাই যাও, দাদা। আমার কিছুই ভালো লাগছে না। শিকারে গেলেও ভালো লাগবে না। বরং তোমার আনন্দ মাটি করে দেবো।

শারিয়ার আর ঘাঁটাঘাঁটি করলো না তাকে। একাই বেরিয়ে পড়লো শিকার সন্ধানে। সঙ্গে গেলো লটবহর, লোক-লস্কর। এলাহি ব্যাপার।

প্রাসাদের যে ঘরে শাহজামানকে থাকতে দেওয়া হয়েছিলো, সে-ঘরের জানােলা দিয়ে ওপাশের বাগিচা দেখা যায়। নানা ফুলের গাছে ভরা। মাঝখানে সান বঁধানো বিরাট এক চৌবাচ্চা। তার মাঝখানে এক জলের ফোয়ারা। অবিরাম ধারা-বর্ষণ করে চলেছে। বড় সুন্দর, বড় মনোরম।

প্রাসাদের পিছনের দরজা খুলে গেলো। আর সঙ্গে সঙ্গে কিলবিল করে বেরিয়ে এলো কুড়িটা ক্রীতদাসী আর কুড়িটা ক্রীতদাস। আর তাদের সঙ্গে এসে যোগ দিলো স্বয়ং বেগম সাহেবা। সবাই বিবস্ত্ৰ, নগ্ন হয়ে জোড়ায় জোড়ায় গিয়ে বসলো-বাগিচার নানা জায়গায়। হঠাৎ কঁকিয়ে উঠলো। বেগম, মাসুদ ও মাসুদ।

একটা দৈত্যের মতো নিগ্ৰো ছুঁটে গেলো বেগমের দিকে। দু’হাতে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে এসে আলতোভাবে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিলো বেগমকে। তারপর নিগ্রোটার ওই বিশাল বপুর উথাল পাথাল পেষণে পিষ্ট হতে থাকলো বেগমের কুসুম-কোমল দেহটা। এইভাবে চলতে থাকে সুরত সারা রাত ধরে। বেগমের ইঙ্গিতে তার দাসদাসীরাও একই রঙ্গে মেতে ওঠে।

এই দৃশ্য দেখে নিজের মনে খানিকটা সান্ত্বনা পায় শাহজামান। হায় খোদা, দাদার দুর্ভাগ্য তো দেখছি আমার চেয়েও বেশী। বুকটা ঈষৎ হাস্কা বোধ করলো। একটু সরাব নিলো, একটু খানা খেলো। ধীরে-ধীরে চাঙ্গা হতে লাগলো দেহ-মন ৷

এদিকে বাদশাহ শারিয়ার শিকার শেষে প্রসাদে ফিরে, ভাইয়ের কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে গেলো। দেখে খুশি হলো, ভাই তার বিষণ্ণদশা কাটিয়ে বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

পরদিন সকালে এসে শারিয়ার প্রশ্ন করে, কেমন করে আবার খুশ মেজাজ ফিরে পেলে, ভাই?

শাহজামান বললো, তবে বলি শোনো, কেন আমি আমন বিষাদে ডুবে গিয়েছিলাম। যখন তুমি তোমার উজিরকে পাঠালে আমার কাছে, আনন্দে নেচে উঠলো আমার মন। কতকাল বাদে তোমার সাথে মিলবো, খুশি না হয়ে পারি! লোকলস্কর সঙ্গে করে তোমার শহরের পথে পা বাড়ালাম। কিন্তু কিছু দূর আসার পর মনে পড়লো, একটা দরকারি জিনিস সঙ্গে নিতে ভুলে গেছি। আবার ফিরতে হলো প্রাসাদে। কিন্তু প্রাসাদে এসে, হারেমে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে তামাম দুনিয়া বরবাদ হয়ে গেলো আমার কাছে! আমার খাস বেগম, আমাকে ছেড়ে একটা দিন সে থাকতে পারতো না। আমার আদর্শন সইতে পারতো না একদম। সেই বেগমকে দেখলাম, বিবস্ত্রা, উলঙ্গ হয়ে এক নিগ্রো ক্রীতদাসকে জড়িয়ে ধরে আমারই পালঙ্কে শুয়ে ঘুমুচ্ছে। মাথায় খুন চেপে গেলো। তলোয়ারের এক কোপে দু’জনকে দু’খানা করে দিয়ে এসেছি।

কেন এতো ভেঙে পড়েছিলাম। আমি, সেকথা শুনলে। কিন্তু কী করে সব শোক তাপ ভুলে আবার খোশ-মেজাজ ফিরে পেলাম সেকথা আমাকে জিজ্ঞেস করো না, দাদা। বলতে পারবো না।

শাহজামানের এ কথা শুনে অধৈর্য হয়ে পড়লো শারিয়ার। হায় আল্লাহ, তোমাকে এতো করে বলছি, তবু কেন বলতে চাইছো না? সঙ্কোচ করার কোনো কারণ নাই, তুমি খুলে বলো, দেখি।

শাহজামান খুলে বললো সব। শুনে অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রইলো শারিয়ার। তারপর বললো, নিজের চোখে দেখতে চাই আমি! তুমি হয়তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে খোয়াব দেখেছো, ভাই। শাহজামান হেসে বলে, না দাদা, ঘুম আমার ছিলো না চোখে। ওই ঘটনার পর, নাওয়া খাওয়া ঘুম কিছুই করিনি। আমি। আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয় তবে নিজের চোখে একদিন দেখো। আবার তুমি ঢাড়া দিয়ে দাও, তুমি আবার শিকারে যাবে। আসলে কিন্তু যাবে না। আমার ঘরে এসে লুকিয়ে থাকবে। দেখো, যেন কেউ টের না পায়। তারপর নিজের চোখেই দেখতে পাবে, ওদের সব কাণ্ডকারখানা!

তিল মাত্র দেরী না করে তখুনি ঢাড়া পিটিয়ে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হলো। বাদশাহ যাবেন। শিকারে। আবার সাজো সাজো রব। লটবহর, লোকলাস্কর নিয়ে রওনা হলো বাদশাহ শারিয়ার। বাদশাহর খাস নোকর ছিলো দুটি। খুব বিশ্বাসী। ওদের বললো, আজ রাতে আমি তাবুর বাইরে যাবো। কিন্তু সাবধান, কাকপক্ষীও যেন জানতে না পারে। যদি কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়, স্রেফ ভাগিয়ে দিবি। বলবি, বাদশাহর তবিয়াৎ আচ্ছা নাই, দেখা হবে না। তার বারণ আছে। তা সে স্বয়ং উজিরও যদি আসে, তাকেও এই একই কথা বলে ফিরিয়ে দিবি, বুঝলি?

রাত যখন ঘনিয়ে এলো, এক ফকিরের ছদ্মবেশে তাবু থেকে বেরিয়ে পড়লো শারিয়ার। হন। হন করে হেঁটে চলে এলো প্রাসাদের খিড়কীর দরজার কাছে। এদিক ওদিক দেখে নিয়ে, টুক করে ঢুকে পড়লো। তারপর সোজা শাহজামানের ঘরে। সেই জানালার পাশে বসে আপলক চোখে তাকিয়ে রইলো বাগিচার দিকে।

ঘণ্টাখানেক বাদে হারেমের পিছনের দরজা খুলে গেলো। আর হুড়মুড় করে বেড়িয়ে এলো কুড়ি জোড়া দাসদাসী। আর এলো বেগম। আবার সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি। হুবহু এক। শারিয়ার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। এই ব্যভিচারিণীকে সে এতোকাল বিশ্বাস করেছে, ভালোবেসেছে! ঘৃণায় রিরি করে ওঠে। সারা শরীর।

রাত্রি শেষ হয়ে আসে, ওরা আবার ঢুকে পড়ে হারেমে। ইত্যাকার দৃশ্য দেখে শারিয়ারেরু পায়ের তলার মাটি সরে যেতে থাকে। শাহজামানকে বললো, ঢের হয়েছে, চালো ভাই এই নরক থেকে, এই পাপপুরী থেকে আমরা কেটে পড়ি। এমন দেশে যেতে চাই, যেখানে এই সব অনাচার, ব্যভিচার নাই, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা নাই। আমাদের মতো আর কোন হতভাগ্যের সন্ধান মেলে কিনা তাও একবার খুঁজে প্ৰকল্পও পেতে দেখি।

শাহজামানেরও সেই কথা। এই বিশ্বাসঘাতকতা, এই প্রতারণার দুনিয়ায় বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুও অনেক ভালো।

সেই রাতেই প্রাসাদের খিড়কীর দরজা দিয়ে নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়লো তারা। দিনের পর দিন রাতের পর রাত চলতে থাকে। অবশেষে একদিন এক সমুদ্রের উপকূলে এসে হাজির হলো। নির্জন সৈকত। কাছের এক বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে বিশ্রাম করতে থাকে তারা।

ঘণ্টাখানেক কেটেছে। হঠাৎ নজরে পড়লো, দূরে সমুদ্রের মাঝখানে এক ধোঁয়ার কুণ্ডলী ক্রমশ আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে ঐ কুণ্ডলীটা এক বিকটাকার আফ্রিদি দৈত্যের রূপ ধারণ করলো। এই না দেখে দু’ভাইয়ের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। দৈত্যটা কুলের দিকে এগিয়ে আসছে। উপায়ন্তর না দেখে গুড়ি বেয়ে গাছের ডালে গিয়ে বসলো দুজনে। লম্বা লম্বা পা ফেলে ওদের গাছের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগলো আফ্রিদি। ভয়ে বুক শুকিয়ে গেলো। আরো কাছে আসতেই নজরে পড়লো, তার মাথায় বিরাট একটা বাক্স। গাছের তলায় এসে বাক্সটা নামিয়ে বসে পড়লো সে। বাক্সটার ভেতর থেকে একটা লোহার সিন্দুক বের করলো। সিন্দুকটা খুললো। কী আশ্চর্য! তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলো বেহেস্তের পরীর মতো পরমা সুন্দরী এক যুবতী! কী তার রূপের ছটা! গাছের তলাটা আলোয় ঝলমল করে উঠলো। কাব্য করে বলতে গেলে বলা যায় :

তার রূপের আলো সকালবেলার সূর্য ওঠার মতো।
আঁধার রাতেও আসে যদি, দিনের আলো দেখি।
দেহটা কি সূর্যকণায় গড়া?
মরি মরি, ধার করা রহস্যের ওড়নায় ঢাকা,
নিরন্তর বন্দী হয়ে আছে বুঝি চাঁদ।
তামাম দুনিয়ার যত পৌরুষপ্রেম পায়ে থাকে তার!

মুগ্ধ নয়নে, অনেকক্ষণ ধরে, দৈত্যটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো তার রূপ, যৌবন। তারপর আদর করে বলতে লাগলো, বুকের কলিজা, তোমার শাদীর দিনে তোমাকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছি। সেই দিন থেকে আমার চোখে ঘুম নাই। দুস্তর সাহারা সমুদ্র ঘুরে বেড়িয়েছি তোমাকে মাথায় করে। আজ আমি বড় ক্লান্ত। ঘুমে চোখ আমার বুজে আসছে। একটু ঘুমুতে চাই।

এই বলে মেয়েটির কোলে মাথা রেখেই নাক ডাকতে লাগলো।

একা একা বসে এদিক ওদিক চাইতে চাইতে, মাথার ওপরে গাছের ডালে শাহজামানদের দুজনকে দেখতে পায় মেয়েটি। আফ্রিদির মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে ইশারা করলো। ওদের, হাতছানি দিয়ে ডাকলো। নিচে নেমে আসতে বললো। আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলো, দৈত্যের ঘুম এখন ভাঙবে না, তোমরা নিৰ্ভয়ে নিচে নামতে পারো।

গাছের ওপর থেকে ওরাও ইশারাতেই জানালো, খোদা তোমার ভালো করবেন। কিন্তু তুমি আমাদের মাফ করো। না হলে আমরা মরে যাবো।

যুবতী ভরসা দিলো। খোদার নামে হলফ করে জানালো, তাদের কোন ক্ষতি হবে না। তড়িঘড়ি নেমে আসার জন্যে হুকুম করলো। আর জানালো, তার হুকুম যদি তামিল না করে তারা, তবে আখেরে ভালো হবে না। আফ্রিদিকে জাগিয়ে শায়েস্তা করা হবে। গলা টিপে মেরে ফেলবে সে। এখনো সময় আছে, ওরা নেমে এসে তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুক। না হলে সে দৈত্যকে জাগাতে বাধ্য হবে। আর তার পরিণাম অবধারিত মৃত্যু।

গাছের ডালে বসে, অসহায়ের মতো এ ওর দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে দুই ভাই। শারিয়ার জানায়, তুমি আমার ছোট ভাই, তুমি আগে নামো। শাহজামান জানায়, না, তা হয় না। চলো দুজনে একসঙ্গেই নামবো। মরতে হয় দু’জনে এক সঙ্গেই মরবো। এক যাত্রায় পৃথক ফল হবে না।

ওরা ভয়ে ভয়ে নেমে এসে দাঁড়ালো মেয়েটির পাশে। আর তৎক্ষণাৎ মেয়েটি মাটির উপর শুয়ে পড়ে ডাকলো, তোমরা এক এক করে এসে আমার দেহের জ্বালা জুড়িয়ে দাও। তোমাদের একজন চলে এসো এখুনি। আর দেরি করো না। আমি আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। সইতে পারছি না। এই যন্ত্রণা। এসো। চটপট।

কিন্তু কে আগে যাবে! এওকে ঠেলে। বড় বলে, তুমি ছোট, তুমি আগে যাও। ছোট বলে, তা হয় না। তুমি বড়, তোমার পর আমার পালা।

কারো মুখে ভাষা নাই। চোখের ইশারাতেই বলাবলি করতে থাকে তারা। মেয়েটি বিরক্ত হয়। ক্রুদ্ধ হয়। তর্জনী নাচিয়ে জানায়, চোখ নাচিয়ে নাচিয়ে কী কথা হচ্ছে তোমাদের? আমি আর এক লহমা দেরি করবো না কিন্তু! এক্ষুনি আসবে তো এসো, না হলে আফ্রিদিকে ডাকছি।

দৈত্যের হাতে প্ৰাণে মারা যাবার ভয়ে দু’ভাই-ই পরপর যুবতীর সম্ভোগের শিকার হলো। যে ভাবে চাইলো সেই ভাবে খুশি করতে হলো তাকে।

ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো মেয়েটির। বললো, তোমরা দুজনেই জব্বর কায়দা-কানুন জানো, দেখছি!

সেমিজের পকেট থেকে একটা ছোট্ট থলে বের করলো মেয়েটি। থলেটার ভেতর থেকে তুলে ধরলো একটা আংটির ছড়া। বললো, জানো, এগুলো কী? এই চেনে একশো সত্তরটি আংটি রয়েছে। এই মুখপোড়া আফ্রিদিটার চোখে ধুলো দিয়ে যাদের দিয়ে আমার কাম হাসিল করিয়েছি তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে একটা করে আংটি নিয়ে এই চেনে গেথে রেখেছি। এগুলো আমার স্মৃতি চিহ্ন। তোমাদের কাছেও চাইছি। দুটো আংটি। দাও, এর সঙ্গে গেথে রাখবো। পরে যখন দেখবো, তোমাদের সঙ্গে আজকের এই সুখ-সম্ভোগের কথা মনে পড়বে আমার।

এ কথা শুনে স্তম্ভিত হলো ওরা। দুজনেই একটা করে আংটি খুলে দিলো রূপসীর হাতে। মেয়েটি বললো, জানো, এই শয়তান দৈত্যটা আমার শাদীর রাতে চুরি করে নিয়ে এসেছে আমাকে। এই লোহার সিন্দুকে কয়েদ করে, সিন্দুকটাকে আবার ঐ বাক্সটায় ভরে, লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে, মাথায় করে ঘুরেছে নির্জন মরুপ্রান্তরে, জঙ্গলে, পাহাড়ে পর্বতে। কোথাও গিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। শেষে, ঐ সমুদ্রের তলায় নেমে গিয়ে অন্য পুরুষের সান্নিধ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে আমাকে। কিন্তু ও ব্যাটা জানে না, আমরা—মেয়েরা যা চাইবো, যেন-তেন-প্রকারেণ তা পূরণ করবোই। কেউ কখনো তা রোধ করতে পারেনি, পারবে না। তাহলে কবির ভাষায় শোনো :

ওগো বন্ধু, বিশ্বাস করো না তাকে।
মুচকি হেসে উপেক্ষা করো তার ভালোবাসার প্রতিজ্ঞ।
দলিতের জন্যে ছলাকলা,
আর প্রতারণা—কিছুই অসাধ্য নয় তার।
গাল ভরা মিথ্যা বলে ভালোবাসার অভিনয়ে পটিয়সী সে।
একান্ত নিবিষ্ট মনে যখন সে পশমের কারুকার্যে রত,
তখনো আচ্ছন্ন থাকে পরকীয়া প্রেমে
মনে রেখো। সেই কথা—ইউসুফের,
কান পেতে শোনো সেই আদমের মর্মভেদী করুণ ক্ৰন্দন–
আজও শোনা যায়…

শাহজাদাদের চৈতন্য উদয় হয়। এই ভয়ঙ্কর দৈত্যের এমন দুর্ভেদ্য সুরক্ষাকে কলা দেখিয়ে এই সুন্দরী কলাবতী যেভাবে তার কাম হাসিল করে চলেছে তা কল্পনাতীত! এর তুলনায় তাদের বেগমদের প্রহরা কিছুই নয়। এই ভেবে কিছুটা সান্ত্বনা পেলে ওরা। আর কালবিলম্ব না করে তক্ষুনি নিজের নিজের শহরে ফিরে গেলো।

প্রাসাদে পা দিয়েই বাদশাহ শারিয়ার নিজের হাতে বেগমের গর্দান নিলো। হারেমে যত দাসদাসী ছিলো সবাইকে কেতিল করার হুকুম দিলো। তারপর উজিরকে ডেকে বললো, আজ থেকে প্রতি সন্ধ্যায় একটি কুমারী মেয়ে চাই আমার শোবার ঘরে। সারা রাত ধরে তাকে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করবো। আমি। আর ভোর বেলায় নিজের হাতে হত্যা করবো তাকে। যাতে সে অন্য পুরুষের অঙ্কশায়িনী না হতে পারে। উজির, এখন তোমার কাজ হলো—প্রতি রাত্রে একটি করে কুমারী মেয়ে জোগাড় করে আনা।

বাদশাহর হুকুমে তিনটি বছর ধরে প্রতি রাত্রে একটি করে মেয়ে জোগাড় করে আনতে থাকে উজির। দেশব্যাপী নিদারুণ আতঙ্ক। যাদের ঘরে ডাগর মেয়ে ছিলো তারা প্ৰাণ ভয়ে দেশান্তরী হতে লাগলো। যারা পালাতে পারলো না—তাদের মেয়েরা বাদশাহর এই নারকীয় নৃশংস খেয়ালের শিকার হতে লাগলো। আদরের দুলালীকে বুকে আড়াল করে খানা খন্দে, বনে জঙ্গলে, পাহাড়ে প্রান্তরে পালিয়ে বেড়াতে থাকে প্রজারা। যে বাদশাহকে একদিন আল্লাহর পয়গম্বর জ্ঞানে শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসা জানাতো সেই বাদশাহর নাম শুনে আজ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় তারা। তার সর্বনাশ, তার মৃত্যু কামনা করতে থাকে নিয়ত।

কিন্তু বাদশাহর রোষ থেকে রক্ষা পাওয়া শক্ত। পাহাড় পর্বত প্রান্তরে পালিয়ে থাকা মানুষের বুক থেকেও ছিনিয়ে নিয়ে আসে তাদের আদরের কন্যা। এইভাবে তােমাম দেশের কুমারী কন্যা নিঃশেষ হয়ে গেলো।

অবশেষে একদিন সারা দেশ চষে বেড়িয়েও একটি ডাগর কুমারী মেয়ে জোগাড় হলো না। সারাদিন পথে পথে ঘুরে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে শূন্য হাতে ফিরে এলো উজির। বাড়ি ফিরে বিষণ্ণ মনে বসে বসে নিজের নসীবের কথা চিন্তা করতে থাকে। খালি হাতে বাদশাহর সামনে দাঁড়ানো মানেই গর্দান বাড়িয়ে দেওয়া।

উজিরের দুই কন্যা। দুটিই পরমা সুন্দরী। রূপের চেয়ে গুণ আরও অনেক বেশী। রুচি, প্রকৃতি, বিদ্যা-বুদ্ধি, বিচক্ষণতায় তাদের জুড়ি নাই। বড় কন্যার নাম শাহরাজাদ। আর ছোটটির নাম দুনিয়াজাদ। শাহরাজাদ। ইতিহাসে পণ্ডিত। সেকালের নবাব-বাদশাহদের কাহিনী, নানা দেশের বিচিত্র কিংবদন্তী তার ঠোঁটস্থ। হাজার হাজার গল্প-গাথা পড়েছে সে। তার বিনম্র ব্যবহার, আর সুললিত কণ্ঠের গানে মুগ্ধ হয় সবাই।

বাবাকে ওইভাবে বিষণ্ণ, চিন্তিত দেখে বড় মেয়ে শাহরাজাদ জিজ্ঞেস করে, আব্বাজান, তোমাকে আজ এমন চিন্তায় উদ্বিগ্ন দেখছি কেন? কী হয়েছে? কোন বিপদ আপদ ঘটেছে কি? তুমি তো জানো, আব্বাজান, কবি বলেছেন : কোন কিছুর জন্যেই শোকে দুঃখে কাতর হয়ে ভেঙে পড়া উচিত নয়। কারণ, সুখ। যেমন চিরদিন থাকে না তেমনি দুঃখও চিরস্থায়ী নয়।

মেয়ের কথা শুনে একটু ভালো লাগে। বাদশাহর নৃশংস খামখেয়ালীপনার আদ্যোপােন্ত সব কাহিনী বললো, উজির।

শাহরজাদ বললো, খোদা ভরসা, আব্বাজান, আজ রাতেই তুমি আমার শাদী করিয়ে দাও বাদশাহ শারিয়ারের সঙ্গে। আমি যদি সাচ্চা মুসলমানের মেয়ে খুঁজেনই হয়ে থাকি তবে বেঁচে থাকবো। আর যদি মরতেই হয় তবে এমন কাজ করে মরবো যাতে বাদশাহর ভয়ে কোন মানুষকে দেশ ছেড়ে পালাতে না হয়।

মেয়ের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলো, উজির, আল্লাহ তোমার ভালো করবেন, মা। এই বিপদের দিনে একটা কথা তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, তোমার আসল পরিচয় কখনও ফাঁস করো না তার কাছে।

শাহরাজাদ বললো, তা আমি খুব ভালো করেই জানি, আব্বাজান।

উজির বললো, সেই গাধা, বলদ আর গৃহস্বামীর উপাখ্যান শুনেছো? তা হলে বলি, শোনো।

Share This