প্রাচীন বাঙালীর সৃষ্টির ধারায় গভীর মনন, প্রশস্ত ভাবনা-কল্পনার অভাব

ভাব-কল্পনা ও সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রাচীন বাঙালীর অনুরাগ, আগেই দেখিয়াছি, জীবনের ছোটখাট সুখদুঃখ-আনন্দবেদনার দিকে, দৈনন্দিন সংসারের বিচিত্র লীলার দিকে। সেখানে হৃদয়াবেগ প্ৰাণধর্ম ও ইন্দ্ৰিয়ালুতার সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি। এই অভিব্যক্তির রূপক্ষেত্র স্বল্পায়তন। ভারতবর্ষে অন্যত্ৰ— বাঘ, অজস্তা, এলোরায়-বিস্তৃত গুহাপ্রাচীরগাত্রে দীর্ঘািয়ত মণ্ডিত রেখায় ও গভীর রঙের মণ্ডিত প্রলেপে শিল্পীর গভীর ও প্রসারিত ভাব-কল্পনা ও বুদ্ধি রূপায়িত; দেবদেবী, মানুষ, পশুপক্ষী, নিসর্গ-প্রকৃতি সকলে মিলিয়া সেখানে জীবনের সুগভীর সুবিস্তৃত সমৃদ্ধি। বাঙালী শিল্পী ছবি আঁকিয়াছেন স্বল্পায়তন পুঁথিপত্রের সীমার মধ্যে; সেই ছবিতে কলাকৌশলের কোনো শৈথিল্য বা দুর্বলতা নাই, কিন্তু ভাব-কল্পনার কোনো সমৃদ্ধিও নাই, না মননের গভীরতায়, না বিস্তৃতিতে। দেবতা, মানুষ, প্রকৃতি সবই আছে সেই ছবিতে, আবেগ-গভীরতা ও সূক্ষ্ম অনুভূতির ঐশ্বৰ্য্যও কম নয়; কিন্তু সমস্তই যেন স্বল্পতার মধ্যে, সীমিত রূপািয়তনের মধ্যে অভিব্যক্ত, জীবনের আবর্তিত বিস্তৃতি ও মননের গভীরতার পরিচয় সেখানে নাই। প্রাচীন বাঙালী মন্দির-বিহার প্রভৃতিও গড়িয়াছে, কিন্তু ভূবনেশ্বর, খাজুরহো বা দক্ষিণ-ভারতের মতো প্রসারিত, বিস্তৃতায়তন মন্দির-নগরী গড়ে নাই, এবং বিহার বা মন্দির যাহা গড়িয়াছে, এক পাহাড়পুর এবং অন্য দুই একটি স্থান ছাড়া আর কোথাও সে-মন্দির বা বিহার খুব বৃহদায়তন নয়, আকাশচুম্বাও নয়; অধিকাংশ মন্দিরই ছিল স্বল্পায়তন। বস্তুত, প্রাচীন বাঙলার স্থাপত্যের ক্ষেত্রে বৃহৎ দুঃসাহসী কল্পনা-ভাবনা, বৃহৎ কৰ্মশক্তি বা গভীর গঠন নৈপুণ্যের পরিচয় বিশেষ নাই। শুধু স্থাপত্যের ক্ষেত্রেই নয়, ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেও প্রাচীন বাঙালী খুব বৃহৎ দুঃসাহসী মনন ও কল্পনা-ভাবনার দিকে কোথাও অগ্রসর হয় নাই। সারনাথের বুদ্ধ-প্রতিমায়, মধ্যভারতে উদয়গিরির ভাস্কর্যে, এলিফান্টা ও এলোরার ভাস্কর্যে, দক্ষিণ-ভারতের নটরাজ-প্রতিমায় যে গভীর দুঃসাহসী মনন ও ভাবনা-কল্পনা বিস্তার, ভাব ও আয়তন উভয়ত, বাঙলার ভাস্কর্যে তাহার পরিচয় কোথাও বিশেষ নাই। কিন্তু, সূক্ষ্ম কমনীয়তা, হৃদয়ের আবেগ এবং ইন্দ্ৰিয়ালুতার গভীরতায় আবার তাহার তুলনা বিরল; তবে এ-সমস্তই স্বল্পায়তনে, সংকীর্ণ ভাবসীমায় সীমিত। মৃৎফলক শিল্পও পরস্পর বিচ্ছিন্ন; দীর্ঘািয়ত একটি কাহিনী রূপায়ন নয়, ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন টুকরা টুকরা জীবনচিত্র পর পর চলিয়াছে প্রাচীরগাত্র জুড়িয়া; বিস্তৃতায়ত গভীর জীবনের পরিচয় সেখানে নাই। মৃৎফলক-শিল্পে হয়তো তাহা সম্ভবও নয়। সে-ক্ষেত্রে শিল্পদূষ্টির জন্মই বিচ্ছিন্ন ক্ষণিক মুহুর্তের মধ্যে। যাহা হউক, এই স্বল্পায়ত এবং সীমিত সৃষ্টিভাবনার কারণ কী তাহার আলোচনা অন্যত্র করিয়াছি, এখানে আর তাহার পুনরুক্তি করিব না। সংক্ষেপে শুধু বলা যায়, প্রাচীন বাঙালীর কৃষিনির্ভর জীবনের সমৃদ্ধি ও অভিজ্ঞতা ছিল পরিমিত, চিত্তসমৃদ্ধি ছিল ক্ষীণায়ত, বৃহৎ গভীর, মননসমৃদ্ধ দুঃসাহসী জীবনের প্রশস্ত কোনো স্পর্শ সে-জীবনে লাগে নাই। কাজেই শিল্পেও সে-পরিচয় নাই।

সৃষ্টিভাবনার এই বৈশিষ্ট্য ধরা পড়িয়াছে ছোট ছোট গীতিকবিতার প্রতি প্রাচীন বাঙালীর অনুরাগের মধ্যেও। প্রাচীন বাঙালী কোনো মহাকাব্য রচনা করে নাই, সার্থক, বৃহৎ ও গভীর ভাবকল্পনার কোনো নাটকও নয়। ধোয়ীর পবনদূত ও জয়দেবের গীতগোবিন্দ তো গীতিকাব্যই; গোবর্ধনের সপ্তদশীও তাঁহাই। সন্ধ্যাকর-নন্দীর রামচরিত কিংবা শ্ৰীহর্ষের নৈষধচরিতকেও বৃহৎ ও গভীর ভাবনা-কল্পনার কাব্য বলা চলে না, যদিও ইহাদের পরিসর একেবারে তুচ্ছ করিবার মত নয়। বস্তুত, বৃহৎপরিসরের কাব্য, এমন কি ছোট ছোট, রসহীন অথচ পণ্ডিত্যপূর্ণ, রূপকলংকারবহুল কাব্য বোধহয় প্রাচীন বাঙালীর খুব রুচিকর ছিল না; তাহার বেশি রুচিকর ছিল অপভ্রংশ এবং প্রাকৃত গীতির পদ ও ছড়া, যে ধরনের পদ ও ছড়া আমরা চর্যাপদ, দোহাকোষ, প্রাকৃতপৈঙ্গল প্রভৃতি গ্রন্থে দেখিতে পাই। তা ছাড়া ছোট ছোট সংস্কৃত কবিতা, প্রকীর্ণ শ্লোক, গীতিকবিতার মূল রূপটি অর্থাৎ সংকীর্ণ পরিসরে হৃদয়ের গভীর আবেগ ও প্রাণস্পর্শটি যাহাদের মধ্যে ধরা পড়িয়াছে, এমন শ্লোক ও খণ্ড কবিতাও বাঙালীর খুব প্রিয় ছিল, যেমন কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় বা সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থের পদ ও শ্লোক। বস্তুত, এই ধরনের গীতিকবিতা-সংগ্রহ বা চয়নিকার ধারার উদ্ভব এই বাঙলাদেশেই, এবং মধ্যযুগে পদ্যাবলী হইতে আরম্ভ করিয়া নানা বৈষ্ণব মহাজনদের পদসংগ্ৰহ এই ধারায়ই চলিয়া আসিয়াছে। শুধু তাঁহাই নয়, গীতিকবিতার প্রতি এই অনুরাগই মধ্যযুগীয় বাঙলা-সাহিত্যের বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলীর প্রসার ও সমাদৃতির মূলে। গীতিকবিতাতেই যেন বাঙালীর প্রতিভা মুক্তি পাইয়াছে, এবং এই গীতিকবিতাই বাঙালীর চিত্তে আজও সাড়া জাগায়। মহাকাব্যের বিরাট প্রসার ও গভীর আবর্ত যেন তাহার ভিত রুচিকর নয়। বস্তুত, প্রাচীন বাঙালীর সাহিত্যে কোথাও মননের গভীর গাম্ভীর্য ও ভাবকল্পনার বিরাট প্রসার নাই; তাহার পরিবর্তে আছে প্ৰাণধর্ম ও হৃদয়াবেগের সূক্ষ্ম ইন্দ্ৰিয়ালু। গভীরতা এবং সীমিত ব্যাপ্তির মধ্যে ভাবানুভূতির তীব্ৰতা। ইহাই বাঙালীর সৃজন প্রতিভার বৈশিষ্ট্য।

%d bloggers like this: